"আমি বিয়ে করবো মহুয়াকে! আর সেটা এখনি এই মুহূর্তে! "
বাক্য টা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো। পিছনে তাকিয়ে সবাই আরো অবাক হয়ে গেল! এটা তো প্রিন্সিপাল স্যার এর একমাত্র ছেলে রাহুল চৌধুরী।
মহুয়াও চমকে উঠলো। মনে মনে বলতে লাগলো
-কালকে রাতে ঠিক এই মুহূর্তে এই নরপিশাচ টা আমার শরীর নিয়ে মত্ত্ব ছিলো । যার জন্য আমি আমার আরিয়ান কে হারালাম ,যার জন্য আমি সবার কাছে লাঞ্ছিত হলাম, শুধু এই মানুষটার জন্য আমার বাবার মান সম্মান ধুলোয় মিশে গেল। আর আজ সে আমাকে এই ভরা মজলিসে বিয়ের প্রস্তাব দিলো কেন? আমার সাথে ওর কিসের সম্পর্ক? ও চায় টা কি? ও বলল আর আমি নাচতে নাচতে বিয়ে করে নেবো ? কখনোই না। ও যেমন আমার মান-সন্মান সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছে । আমিও আজ সবার সামনে ওর মুখোশ উন্মোচন করে দেবো!
কিন্তু পরক্ষণেই কি মনে করে আর বললো না।
রাহুল ধীরে ধীরে মহিদুল প্রধান এর দিকে এগিয়ে এলো । একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো - প্রধান সাহেব আপনি তো আমার বাবাকে খুব ভালো করেই চিনেন তাইনা?
মহিদুল প্রধান বলল- আসলে আমি তোমাকে চিনতে পারলাম না তো বাবা তুমি কে ? তোমার বাবার নাম কি?
রাহুল: আমি রায়হান চৌধুরীর ছেলে রাহুল চৌধুরী। আমার বাবা আমার বাবা চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রির মালিক।
মহিদুল প্রধান:- ওহ তাহলে তুমি রায়হান এর ছেলে । তোমার বাবা তো আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। আমরা একই কলেজে পড়েছি।
কিন্তু বাবা তুমি হটাৎ এখানে কি কারণে এসেছো? এসেছো সেটা বড় কথা নয় কথা হচ্ছে তুমি মহুয়াকে কেন বিয়ে করতে চাচ্ছো?.ঐ মেয়েটা তো কালকে রাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে।ওর ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছে। এমন অবস্থায় তুমি কি ভেবে ওকে বিয়ে করতে চাইছো? আর মহুয়া ও তার পরিবার কি তোমাকে মেনে নেবে? "
রাহুল: মেনে নেওয়া না নেওয়া সেটা পরের ব্যাপার । আমি ওকে বিয়ে করব এটাই ফাইনাল। এই রাহুল চৌধুরী যেটা চায় সেটা যতোই অন্দরমহলে থাকুক না কেন চিলের মতো ছোঁ মেরে ছিনিয়ে আনবেই। ওর পরিবার কেন চৌদ্দ গুষ্টি অমত থাকলেও আমি ওকে আমার করেই ছাড়বো।
আরিয়ান : সেই মাল ! আজ রাতে কোন এক নাগরের বিছানা গরম করে আসছে।
কথা শেষ না হতেই পর পর দুইটা ঘুষি পড়লো আরিয়ানের নাক বরাবর।
রাহুলের শক্তপোক্ত হাতের ঘুষি খেয়ে আরিয়ানের নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগলো।
আরিয়ান এক হাতে মুখ চেপে ধরলো, কিন্তু রক্ত থামলো না, বরং আঙুল ফাঁক গলে টুপটাপ করে নিচে ঝরে পড়তে লাগলো।
চারপাশে থাকা লোকজন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
ভিড় ঠেলে মহুয়া দৌড়ে গিয়ে নিজের ওড়না দিয়ে আরিয়ানের নাক চেপে ধরল।
"জনি কাজি সাহেব কে ডাক আমি আসছি । "
এই বলে মহুয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরে সামনাসামনি দাঁড় করালো রাহুল।
রাহুল:- এই মেয়ে কি সমস্যা তোমার? ঐ জানোয়ার টার প্রতি এতো দরদ কেন তোমার? আমার প্রতি দয়া হয় না ।?
মহুয়া ফিসফিস করে বলল - মি . রাহুল আপনিও কি জানোয়ারের চেয়ে কম নাকি? আরিয়ান আমার বহুদিনের ভালোবাসা ।আর আপনি একজন ধর্ষণকারী।!!!
রাহুল:- আরিয়ান যদি তোমাকে এতোই ভালোবাসে তাহলে জনসম্মুখে তোমার দোষ তুলে ধরতেছে কেন?
মহুয়া: সেই প্রশ্নের জবাব আমি আপনাকে দিতে বাধ্য নয় । এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে চলে যান।
রাহুল:- যাবো তো সুইটহার্ট তবে আমি তোমাকে সাথে নিয়েই যাবো। তোমাকে না নিয়ে এক পাও নড়বো না।
এই কথাগুলো বলতে বলতে সে মহুয়ার কবজি আরও শক্ত করে ধরল। রাহুলের নখ দিয়ে মহুয়ার চামড়ায় হালকা খাঁজ পড়লো।
দাঁত কটমট করতে করতে মহুয়া বললো :- আপনি শুধু আঘাত করতেই জানেন মি. রাহুল।
রাহুল: সবে তো শুরু ।আগে শুধু বিয়েটা হতে দাও সুইটহার্ট । তারপর দেখে নিয়ো আঘাত কতো প্রকার ও কি কি।
মহুয়া :- আজ আমি এই জনসম্মুখে বলে দেবো আপনিই আমাকে ধর্ষণ করেছেন।
রাহুল:- ওহ মাই সুইটহার্ট ! তুমি এতো বোকা কেন? নিজের হবু স্বামীর কথা কি কেউ পাবলিক প্লেসে বলে নাকি?
তাদের কথা বলার মাঝে মোখলেছুর রহমান এগিয়ে এসে রাহুলের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল তুমি কে ? কি তোমার পরিচয় ? আমার মেয়ে ধর্ষিতা জেনেও তুমি তাকে বিয়ে করতে চাচ্ছো কেন ?
রাহুল:- আপাতত আপনার এসব প্রশ্নগুলো আলমারিতে তুলে রাখেন শশুর মশাই। এখন কাজী সাহেব চলে আসছে অতি শীঘ্রই আপনার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিন।
মহুয়া:- না দিলে কি করবেন?
রাহুল:- তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো। আর আমার পথে যে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে তাকে খুন করে ফেলবো আমি । যেকোনো মূল্যে আমি তোমাকে চাই।
মোখলেছুর রহমান আশ্চর্য হয়ে রাহুলের দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক টা খুব বিপদে পড়ে যাবেন যদি সরাসরি এ বিয়ে আটকাতে যান। তাই তিনি ভাবলেন কৌশলে এ বিয়েটা আটকাতে হবে।
মোখলেছুর রহমান:- বাবা আমাদের আর কয়েকটা দিন সময় দাও আমরা একটু ভেবে দেখি।
রাগী গলায় মহুয়া বললো ভাবাভাবির কি আছে বাবা , আমি একে বিয়ে করতে পারবো না মরে গেলেও না।
রাহুল : "শশুর মশাই , যদি বলেন আর এক ঘন্টা সময় দাও । সেটাও আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
জনি কাজি সাহেবকে এইদিকে নিয়ে আয় । আমার আর তর সইছে না রে জনি তারাতাড়ি কর।"
মহুয়া: না আমি এ বিয়ে করবো না। বাবা তুমি এই বিয়েটা আটকাও। প্রধান সাহেব আপনি অন্তত কিছু একটা করুন। আর আপনারা এতো গুলো মানুষ চেয়ে চেয়ে কি দেখছেন ? কেউ আমাকে সাহায্য করুন। আমি এ বিয়ে করবো না।
মোখলেছুর রহমান এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল - আমার আর কিছু করার নেই রে মা! মহুয়া তুই এমন পাগলামী করিস না রাজি হয়ে যা যা ।
মহুয়া: বাবা তুমিও আমার বিপরীতে গেলে!
মহুয়ার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পরছে। সে কি করে পারে একটা ধর্ষণকারীকে বিয়ে করতে। কিন্তূ মোখলেছুর রহমান এর কথায় তিনি রাজি হয়ে গেলেন। চোখের পানি মুছে তিনি বললেন - "ঠিক আছে আমি এ বিয়ে করবো।"
পুরো মহল্লার মানুষ চেয়েছিলো মহুয়ার আজ চুড়ান্ত বিচার হবে।তাকে বেত্রাঘাত করা হবে , সবাই চেয়ে চেয়ে দেখবে আর মজা নিবে । সবাই সেই দৃশ্য দেখার জন্যই ভিড় জমিয়েছিলো । কিন্তু সেটার বিপরীত হয়ে গেলো ।
মহিদুল প্রধান সুষ্ঠু ভাবে বিচার সম্পন্ন করলেন। সেটাতে মহল্লাবাসীর কোন হিংসা হচ্ছে না। হিংসা হচ্ছে রায়হান চৌধুরীর ছেলে কেন তাকে বিয়ে করবে সেটা নিয়ে ।
রাহুলের কথা শুনে মুহূর্তেই মানুষের ভেতরে অস্বস্তি আর ঈর্ষা ছড়িয়ে পড়লো। যারা একটু আগে মহিদুল প্রধানের বিচার দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো, তারা এখন ফিসফিস করে মুখে মুখে কথা বলতে লাগলো।
-"আমরা তো ভেবেছিলাম আজ ওর ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে।”
- “ধুর! সবই এই মেয়ের, ধূর্তামি। এ মেয়ে চুপচাপ থাকতে জানে, তাতেই তো আসল ফায়দা তুলে নিলো।”
-"চুপ করে থাকলেও কথায় অনেক তেজ আছে।।"
একদল মহিলার ভিড়েও একই গুঞ্জন। ওরা একে অপরের কানে কানে বলছিলো
“আমাদের এত সুন্দর সুন্দর মেয়েরা আছে, পর্দা করে তো আমার মেয়েগুলোকে চোখেই দেখলো না ।আর যে মেয়েটা ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলে তাকেই বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে কেন?”
-"এখানে কোনো রহস্য আছে। নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে, নইলে প্রিন্সিপালের ছেলের মতো ছেলে কেন ওকে বিয়ে করবে?”
একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মুরব্বি আবার ভিন্ন কথা বললেন-“হিংসা করে লাভ কি? মেয়েটা অন্যায়ের শিকার হয়েছিলো। আল্লাহ চাইলে মানুষকে উঁচু করে দেন। বুঝলা?”
কিন্তু তার কথায় আশেপাশের কেউ কান দিলো না। বেশিরভাগ মানুষই এখনও রাগ, ঈর্ষা আর অবিশ্বাসে ভরা চোখে মহুয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
সবাইকে উপেক্ষা করে, সমাজের হাজারো বাঁধা-ধরা নিয়মকে অগ্রাহ্য করে রাহুল মহুয়াকে নিজের করে নিলো। শ্বাশত আকাশ যেন সেই মুহূর্তে তাদের মিলনের সাক্ষী হয়ে ঝলমল করছিল। কাজির কণ্ঠে ভেসে এল সেই পবিত্র শব্দ।
“তুমি কি রাহুলকে স্বামী হিসেবে কবুল করছো?”
মহুয়া কাঁপা কন্ঠে বললো, “কবুল।”
রাহুলের বুক ভরে উঠলো এক অদম্য আবেগে, যেন এতোক্ষণের সব শূন্যতা এক মুহূর্তেই পূর্ণ হয়ে গেলো। যে রাহুলকে সবাই চিনতো বেপরোয়া ছেলেটা হিসেবে ।বন্ধুদের নিয়ে হইচই, দিনের পর দিন রিসোর্টে সময় কাটানো, একের পর এক সম্পর্কের খেলা । আজ সেই রাহুল একটা মেয়েকে বিয়ে করলো। নিজের সব দম্ভ আর স্বভাব ঝেড়ে ফেলে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।
মুহূর্তেই তাদের জীবন এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গেল। তিন কবুলের পর আর কোনো সন্দেহ, কোনো আপত্তি, কোনো শত্রুত রইলো না।