অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ৩

🟢

চো-য়াল শ*ক্ত করে দাঁতে দাঁত চে*পে আরিয়ানের চোখ দুটো রা*গে লাল হয়ে উঠল। বুকটা ধ*ড়ফড় করছে, কণ্ঠস্বর যেন ছু*রি হয়ে বাতাস কে*টে বেরোচ্ছে।

আরিয়ান: “ এই বে'শ্যা'র মা*'গী, কয়জনরে দে*হ বিলা*বি তুই? এতদিন ধরে আমার সাথে ভালোবাসার নাটক করলি কেন বল? অন্যকেউ যখন তোর ঠোঁটে ঠোঁ*ট রেখে চু*মু খাইছে তখন এই আরিয়ানের কথা মনে পড়েনি? শা*লা নিমকহারাম! এই মুখ দ্বিতীয়বার আর আমাকে দেখাবি না। আমার চোখের সামনে থেকে সরে* যা।”

মহুয়ার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা বাবলু ভাইয়ের কাজ । আরিয়ান কে সব বলে দিয়েছে। মানুষগুলো যে কি সুখ পায় অন্যের দোষ ত্রুটি ছড়িয়ে দিয়ে!

মহুয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কাঁ*পছে, হাত কেঁ*পে যাচ্ছে, চোখে পানি জমে উঠছে। ঠোঁ*ট নড়ল, কিন্তু স্বর ভেঙে এল।

মহুয়া: “আমার কথা তো একবার শুনবে আরিয়ান? আমি...”

আরিয়ানের দৃষ্টি তী*ক্ষ্ণ ছু*রির মতো কে*টে গেল তার মুখের ওপর দিয়ে। মুখের রে*খা শ*ক্ত রেখে বললো -

আরিয়ান: “তোর কোন কথা আমি শুনতে চাই না। আজ রাত দশটায় মহল্লায় তোর বিচার হবে। আমি তোকে কোনো সা*হায্য করতে পারবো না।”

এই কথায় মহুয়া যেন হিমশীতল হয়ে গেল। চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল , কাঁ*পা কাঁ-পা গলায় বলল -

মহুয়া: “বিচা*র? কিসের বি-চার? আমি তো কোনো অ*ন্যায় করিনি!”

আরিয়ান ঠোঁট চে*পে একটা বাঁকা হাসি দিল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল-

আরিয়ান: “সেটা রাত হলেই বুঝতে পারবি।”

মহুয়ার চোখে জল গড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠ ভে*ঙে গেল, দম নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।

মহুয়া: “আরিয়ান, অন্তত একবার আমাকে বোঝার চেষ্টা করো... আমি কিছু করিনি... আমাকে জোর করে রে*প করা হয়েছে।”

এই কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ বাজ পড়ার মতো একটা থা*প্প*ড় পড়লো মহুয়ার গা*লে।মহুয়ার মাথা একপাশে দুলে গেল, ফর্সা গালটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে গেল তার।

আরিয়ান: “চুপ! এই নোং*রা* মুখে আর নোং*রা কথা বলবি না। আয়নায় দেখেছিস নিজেকে? গলা থেকে গাল, ঠোঁ*ট সব জায়গাতেই লাভ বাইটের দা*গ! কজনকে তোর এসব মিথ্যা কথা বিশ্বাস করাবি বল?”

মহুয়া চোখ নামিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা ওঠানামা করছে, ঠোঁট কাঁ*পছে, কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলার সাহ*স আর অবশিষ্ট নেই। হাতটা অজান্তেই গাল আর গলায় চলে গেল যেখানে কালকে রাতে ঐ নরপশু টা ..…....

আরিয়ান দাঁত চে*পে*, ভেতরের ক্ষোভকে আর সামলাতে না পেরে কাঁ*পা কণ্ঠে বলে উঠলো-

আরিয়ান: "তিন বছরের সম্পর্ক…! এইভাবে শেষ না করলেও পারতি মহুয়া!"

শব্দগুলো ছুরি*র মতো এসে বিদ্ধ হলো মহুয়ার বুকে। বুকের ভেতরটা কেঁ*পে উঠলো, চোখে জমে উঠলো অশ্রু, কিন্তু সে জোর করে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো—

মহুয়া: "আমার একটুও দোষ নেই আরিয়ান… তুমি অন্তত আমাকে বোঝার চেষ্টা করো প্লিজজজ!"

আরিয়ানের চোখে তখন শুধু অভিমান আর রা*গের ঝড়। সে যেন পাথরের মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আরিয়ান: "তোর কোন ক্ষমা নেই। আজ থেকে এই আরিয়ান ভুলে যাবে যে তার জীবনে কখনো ‘মহুয়া’ নামের কেউ ছিলো। তোর আর আমার পথ… আজ থেকে আলাদা!"

শেষ কথাগুলো বজ্রপাতের মতো আঘাত হানলো মহুয়ার কানে। “তোর আর আমার পথ আজ থেকে আলাদা… আলাদা…” শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনির মতো বাজতে লাগলো তার ভেতরে। মনে হচ্ছিল চারপাশের সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেছে, কেবল আরিয়ানের সেই নির্মম উচ্চারণই তাকে ঘিরে ধরছে।

মহুয়া কাঁপা ঠোঁটে, চোখ ভিজে গিয়ে ফিসফিস করে বললো-

মহুয়া: "ঠিক আছে… সবাই আমার থেকে দূরে সরে যাক। কিন্তু আমি প্রমাণ করেই ছাড়বো যে আমি নির্দোষ।"

তার চোখে তখন ব্যথা আর অদম্য প্রতিজ্ঞার মিশ্রণ যেন দুনিয়ার সব ঝড়-বৃষ্টি পেরিয়েও সে নিজের সত্যিটা প্রমাণ করবে।

এক ধাক্কায় নিজের সামনে থেকে আরিয়ান কে সরিয়ে দিয়ে হনহনিয়ে নিজের বাসার দিকে হাঁটতে লাগলো।

আরিয়ান সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যে মহুয়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতো না, যার চোখে শুধুই ভালবাসা ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর আজ সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল , আমিও এর শেষটা দেখেই ছাড়বো। দেখি আমি ছাড়া ও কোন নাগরকে জীবন সঙ্গী করে, হুহ!

বিজ্ঞাপন

___________

"মিনি… এই মিনি, তুই কোথায় রে? তারাতাড়ি খাবার রেডি কর, আমার পেটের ভেতর আগুন জ্বলছে! ভাত দে, নইলে তোকেই চিবিয়ে খাবো।”

সদর দরজা ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকলো রাহুল। দুপুরের কড়া রোদে ঝলসানো গরমে তার গা ঘামেভেজা, সাদা শার্টটা শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন ভিজে কাপড় শুকোনোর আগেই পরে নিয়েছে। কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে চোখের পাশে,

ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে মিনি। গোলাপি পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা দুপুরের আলো তার মুখমণ্ডলে মায়াবী আভা ফেলেছে। টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে বাহারি রকমের গয়না আর রঙিন কসমেটিকস ।ঝলমলে কাঁচের কানের দুল, সোনালি চুড়ি, চেইনের ঝিকিমিকি আলোতে ঘর যেন একটুখানি দীপাবলি হয়ে উঠেছে। হাতে কাজল কলম, আয়নার সামনে ধীরে ধীরে আঁকছে চোখের রেখা। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের ছোঁয়া, গালে লালচে ব্লাশের আভা। চুলগুলো খোলা, ব্রাশ চালাতে চালাতে বারবার ঝুলে পড়ছে কপালের ওপর। সাজের নেশায় যেন চারপাশ ভুলে গেছে, আয়নার ভেতরকার নিজের প্রতিচ্ছবিকেই সে সবচেয়ে বড় সঙ্গী মনে করছে।

তিন বছর আগে হঠাৎ এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মিনির বাবা-মা দুজনেই প্রাণ হারান। সুখী সংসার মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, অথচ দুনিয়ায় রয়ে গেল তাদের দুই অবুঝ সন্তান মিনি আর ছোট ভাই আরহাম। অল্প বয়সে এতিম হয়ে যাওয়া এই দুই অসহায় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চারদিকে শুরু হলো টানাপোড়েন। কে নেবে তাদের দায়িত্ব? কে হবে অভিভাবক?

আত্মীয়-স্বজনের ভেতর কেউ মুখে সহানুভূতির কথা বললেও, আসল বোঝা কাঁধে নেওয়ার জন্য কেউই এগিয়ে আসছিল না। একেকজন একেক রকম অজুহাত দেখিয়ে সরে যাচ্ছিল। যেন এ দুই শিশু কোনো মানুষ নয়, কেবল বোঝা, দায় ,যা কাঁধে তুলে নিলে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভাটা পড়বে।

শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন রায়হান চৌধুরী অর্থাৎ রাহুলের বাবা। শহরের নামকরা বিজনেস ম্যান তিনি। শিক্ষিত, প্রভাবশালী এবং ধনী পরিবারে তার নামডাক আছে। টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, আভিজাত্যের কোনো অভাব নেই তার জীবনে। আর মিনি ও আরহাম তার বোনের সন্তান । রক্তের টান তো শেষ পর্যন্ত রক্তই। তাই নিজের বাড়িতেই আশ্রয় দিলেন এ দুই এতিমকে।

নিপা:(রাহুলের বোন): মিনি ভাবি তোমার সাজ কমপ্লেট হলে নিচে আসো তারাতাড়ি । ভাইয়া আসছে!

মিনি : - ইসসসসস ! এখনো তোমার ভাইয়ের বউ হইনি নিপা। ভাবী না বলে আপু বলো!

নিপা:ওয়াও ভাবি। আজ ভাইয়া তোমাকে দেখলে নিশ্চিত মরে যাবে তোমার রুপের আগুনে পুড়ে। এতো সুন্দর কেন তুমি মিনি!

মিনি:-ইসসসস ! এভাবে বলো না নিপা। তুমিও কম সুন্দরী নাকি । আমার ননদ বলে কথা!

-"কি হলো মিনি কোথায় তুই?"

রাহুল আবার ডেকে উঠলো।

মিনি আয়নায় নিজের চুল আলতো করে ঠিক করে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি দিয়ে সুমিষ্ট কন্ঠে বলল -আরে, এইতো আমি আসছি!

কথা শেষ করেই ধীরে ধীরে উঠলো সে। কানের দুল দুলে উঠলো পায়ের প্রতিটি ভরকেন্দ্রে। ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো, হাতে শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। হাঁটার ভঙ্গিমায় যেন এক অদ্ভুত নরম ছন্দ, আর তাতে ঘরের বাতাসেই ছড়িয়ে পড়লো তার উপস্থিতির স্নিগ্ধতা।

রান্নাঘরে ঢুকেই ঢাকনা তুলে ভাতের হাঁড়িতে হাত দিলো মিনি। ধোঁয়া উঠতে থাকা সাদা ভাতের ঘ্রাণে সারা ঘর ভরে গেল। কাঠের খুন্তি দিয়ে ভাত নেড়ে একটা বড় পাত্রে উঠিয়ে রাখতে রাখতে বললো - "আমাকে কবে তোমার বউ বানাবে রাহুল। তোমার বউ হওয়ার বাসনা তিলে তিলে আমাকে শেষ করে দিচ্ছে । এটার সমাপ্তি ঘটাও রাহুল। শুরু করো নতুন রঙীন জীবন।"

মিনির ভঙ্গিমায় ছিলো এক ধরনের কোমলতা, এক ধরনের অনড় চাহনি যা রাহুলের মনকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। মিনির সুমিষ্ট কণ্ঠ, আর তার চোখের খুনসুটি সব মিলেমিশে মুহূর্তটিকে এমন এক আবেশে ভরিয়ে দিল, যে রাহুল নিজেকে আটকাতে পারলো না।

ঝাপিয়ে পড়লো মিনির লিপস্টিক মাখানো লাল টকটকে ঠোঁটের উপর।

রাহুলের প্রতিটি স্পর্শ যেন মিনির সময়কে থামিয়ে দিল।

মিনি সেই মুহূর্তে স্থির হয়ে রইল, চোখে লাজুক হাসি, আর অন্তর থেকে জাগা উত্তেজনার ছোঁয়া। তার মনও যেন ঝড়ে উঠল । রাহুলের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিলে এক অদ্ভুত, নীরব আকর্ষণের খেলায় যেন তারা দুইজনেই হারিয়ে গিয়েছে।

রাহুল:- তুই আমাকে এতো ভালোবাসিস কেন মিনি? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল । তুই জানিস না, আমি কোনো জিনিস একবারের বেশি ধরে রাখি না, এক জিনিস বারবার ইউস করি না। তবুও কেন আমার নাম শুনলেই তোর বুক ধড়ফড় করে ওঠে? কেন তুই প্রতিটা মুহূর্তে আমার চারপাশে ঘুরঘুর করিস? আমাকে বিয়ে করার জন্য এত লাফাস কেন, বল তো? আমি তো তোকে কখনো স্বপ্ন দেখাইনি, কখনো আশ্বাস দেইনি। তাও কেন তুই আমার জন্য এমন পাগলামি করিস, মিনি?

মিনি :- তুমি চাও বা না চাও আমি তোমাকে ভালোবেসে যাবো। আমার ভালোবাসার জয় একদিন হবেই।

রাহুল:-সেই আশা নিয়েই বসে থাক গাধা!

মিনি:- হুম তোমার গাধা। আচ্ছা তুমি আমাকে একটা কথা বলোতো-

"আমি ছাড়া তোমার মনে আর কেউ কি আছে, যাকে তুমি আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসো? একটু স্পষ্ট করে বলো কার স্মৃতি,কার নাম বাড়তি আলো জ্বালায় তোমার জীবনে? রাতে যখন সব আলো নিভে যায় আর তোমার হৃদয় চুপচাপ ওঠা নামা করে, তখন যে ভাবনায় তোমার ঠোঁট নিজে থেকেই নরমস্বরে ঝাঁক করে ওঠে, সে ভাবনাটা কার? সেই অনুভূতির পেছনে কার নাম জড়িয়ে আছে? আমার বসন্তহীন সকালগুলোর বদলে যে তোমার দিনগুলো আলোকিত করে, তার নাম কি আমার চেয়ে বড় জায়গা দখল করে আছে তোমার মনে? বলো ?তোমার এই অন্তরঘরে কি কেউ আছে, যে আমার চেয়েও তোমার বেশি প্রিয়? "

মিনির মুখে এই কথাগুলো শুনে রাহুলের বুকের ভেতর হঠাৎ যেন ঝড় বয়ে গেল। চোখের পলকে ভেতরে ভেতরে অস্থিরতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল, শিরায় শিরায় অজানা কাঁপুনি নেমে এলো। ঠোঁট শুকিয়ে গেলেও যেন নিজের অজান্তেই শব্দ বেরিয়ে এলো, গলার ভেতরটা ভারি হয়ে কেঁপে উঠল-

“...মহুয়া।”

সে নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল, চারপাশের সব শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে শুধু সেই এক নামের প্রতিধ্বনি বাজতে লাগল । মনে হচ্ছিল, নিজের গোপন ভেতরটা হঠাৎ কারও সামনে উলঙ্গ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প