অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ৪

🟢

নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল, চারপাশের সব শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে শুধু সেই এক নামের প্রতিধ্বনি বাজতে লাগল রাহুলের কানে। মনে হচ্ছিল, নিজের ভেতরের গোপন সত্য টা হঠাৎ কারও সামনে উলঙ্গ হয়ে গেছে তার ।

গলা শুকিয়ে এলো, হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠলো। বুকের ভেতর ঢাকের মতো শব্দ হচ্ছিল, আর মাথার ভেতর শুধু সেই এক নাম ঘুরে বেড়াচ্ছিল

“মহুয়া…”

রাতের সেই দৃশ্য যেন তার চোখের ভেতর গেঁথে গেছে প্রতিটি মুহূর্ত, মহুয়ার শরীরের গন্ধ, তার ঠোঁটের স্পর্শ, নিঃশ্বাসের উষ্ণতা… সবকিছু আগুনের মতো মনে কাঁপন ধরাচ্ছিল। যতবার চোখ বন্ধ করছে, ততবারই সেই মুহূর্তগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আর ভেতরের উত্তাপ তাকে প্রায় পাগল করে দিচ্ছে।

ডাইনিং টেবিলে রাখা কাঁচের জগের দিকে হাত বাড়াতেই আঙুল কাঁপতে লাগলো। গ্লাসে পানি ঢালার সময় ঠকঠক শব্দ হলো, ফোঁটা ফোঁটা পানি ছিটকে পড়লো টেবিলে। সে আর দেরি না করে এক নিশ্বাসে ঢকঢক করে পুরোটা শেষ করে দিলো, কিন্তু গলা দিয়ে নামা ঠাণ্ডা পানিও তার ভেতরের আগুন নেভাতে পারলো না। বরং বুকের ভেতরটা আরও জ্বলে উঠলো, নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।

একসময় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো, দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো। শরীর কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল শিরা-উপশিরায় বিদ্যুৎ দৌড়াচ্ছে। ঠোঁট ফাঁক করে ভারী নিঃশ্বাস ফেলছিল, যেন বাতাসের প্রতিটা কণা উত্তেজনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে আবার মহুয়ার সেই রূপ, সেই অনাবৃত মুহূর্ত যা থেকে পালানোর আর কোনো উপায় নেই।

রাহুলের চোখে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল।

তার মনে হলো, এত বছর ধরে কত মেয়ের সান্নিধ্যে এসেছে সে কেউ শুধু দেহের লোভে, কেউ আবার ক্ষণিকের আনন্দের জন্য। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখার পর আমার বুকের ভেতরটা যেন অচেনা এক কম্পনে দুলে উঠল। কেন এমন হচ্ছে,?

নিজের অজান্তেই রাহুল ফিসফিস করে বলল-

“জীবনে কত মেয়ে ইউস করলাম, কিন্তু এই মেয়েটা… এই মেয়েটা যেন আমার অন্তরের গভীরে অচেনা ঝড় তুলেছে। কী আছে এর মধ্যে? কেন মনে হচ্ছে ওকে ছুঁতে গেলেই ভেঙে যাব আমি, আবার না ছুঁলেই পুড়ে ছাই হয়ে যাব!”

মিনি ধীরে ধীরে ঝুঁকে এল, তার চোখ ভিজে উঠেছে অশ্রুর কুয়াশায়।

কাঁপা কাঁপা হাতে রাহুলের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল-

“তোমার কী হয়েছে রাহুল? কেন তুমি এমন অচেনা হয়ে যাচ্ছো প্রতিদিন? আজ রাতেও তুমি গিয়েছিলে না রিসোর্টে অন্য মেয়ের সঙ্গে? বলো তো, ওই মেয়েদের মধ্যে কী আছে, যা আমি তোমাকে দিতে পারি না? আমি কি এতটাই কম সুন্দরী, এতটাই কম আকর্ষণীয়, যে প্রতিরাতে তুমি আমার ভালোবাসাকে পায়ে মাড়িয়ে অন্য কারও বাহুতে আশ্রয় খুঁজে বেড়াও? কেন তুমি বারবার আমার মন ভেঙে দাও, রাহুল? কেন আমাকে এমন দুঃসহ অপমান আর কষ্টের মধ্যে ফেলো?”

তার চোখ বেয়ে নেমে এল অশ্রু, গলায় জমে থাকা অভিমানে কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।

“আমি কি তোমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নই? আমি কি সত্যিই এতটাই তুচ্ছ তোমার কাছে, যে আমার ভালোবাসা কোনোদিন তোমার মন ছুঁতে পারবে না? উত্তর দাও, রাহুল… আমি আজ তোমার মুখ থেকে সত্যিটা শুনব।

রাহুলের চোখ হঠাৎ রক্তিম হয়ে উঠল, চোয়াল শক্ত করে দাঁত চেপে ফেটে পড়ল সে। কণ্ঠে আগুনের ঝাঁঝ মিশিয়ে গর্জে উঠল-

“ব্যাস! অনেক হয়েছে, মিনি। এবার মুখে তালা লাগিয়ে দে! এসব নীতিবাক্য, উপদেশ এসব শোনার জন্য তোকে আমি ডাকি নাই। মাথা খাচ্ছিস কেন বারবার? আমি তোকে কোনোদিন ভালোবাসার কথা বলেছি? কখনো তোকে আমার করার স্বপ্ন দেখিয়েছি? না! তাহলে কেন এমন পাগলের মতো আঁকড়ে ধরে থাকিস ? আমাকে পাওয়ার স্বপ্ন কেন দেখিস? এসব মন থেকে মুছে ফেল!

রাহুলের রাগে বুক ওঠানামা করছিল, চোখে আগুন ঝলকাচ্ছিল। তার প্রতিটি শব্দ যেন ছুরি হয়ে মিনির হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছিল। ঘরের বাতাস এক নিমিষে ভারী হয়ে উঠল মিনির চোখে অশ্রু জমে ঝাপসা হয়ে গেল চারপাশ, কিন্তু রাহুলের কণ্ঠে কোনো কোমলতা আর অবশিষ্ট রইল না।

মিনি: চাইলেই ভালোবাসার মানুষকে মন থেকে মুছে ফেলা যায় না রাহুল । তুমি আমাকে ভালো না বাসো সমস্যা নেই কিন্তু আমার মনের গভীরে একমাত্র তুমিই আছো আর ভবিষ্যতেও তুমিই থাকবে।

রাহুল:-আমাকে ভালোবাসতেই পারিস এতে আমার কোন সমস্যা নেই, কিন্তু কোন অধিকার নিয়ে আমার সামনে দাঁড়াবি না ।। তোকে ভালোবাসার জন্য আমাকে কখনোই জোর করবি না।

চিৎকার–চেঁচামেচির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন কেঁপে উঠছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ ঘরের দরজা ধাক্কা মেরে খুলে বেরিয়ে এল রাহুলের মা রওশন আরা বেগম। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল রাগে, চেহারায় কঠিন একটা ঝড়ের ছাপ। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি রাহুলের গালে ডান-বাম দু’দিকে দুটো শক্ত থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। থাপ্পড়ের শব্দ যেন নিস্তব্ধ ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিল, মিনিও চমকে উঠল।

বিজ্ঞাপন

রওশন আরার বুক ভরা দম আটকে থাকা ক্ষোভ যেন শব্দ হয়ে বেরিয়ে এলো

“লজ্জা নেই তোর, রাহুল? এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে খুব মজা লাগে তোর? পাশের বাসার লোকজন কি তোর নাটক শুনে তোর প্রশংসা করবে ভেবেছিস? এত বড়ো দামড়া ছেলে হয়েছিস, তবু মাথায় একফোঁটা জ্ঞান ঢোকে না! এলাকার মানুষ শুধু তোর বাবার ইজ্জতের জন্য মুখ বুজে থাকে। নইলে অনেক আগেই আমাদের এই এলাকা ছেড়ে পালাতে হতো, জানিস? আর কতকাল এই লজ্জা বইব আমরা? মেয়ে নিয়ে খেলা বন্ধ কর রাহুল! বন্ধ করে দে এই মা'গী'বা"জি!”

মিনি দৌড়ে এসে রওশন আরা বেগমের হাত শক্ত করে ধরে বলল-

“দোহাই লাগে মামি, রাহুলকে আর এভাবে মারবেন না। আমি ওকে সামলে নেবো, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”

রওশন আরা বেগমের চোখে রাগের শিখা জ্বলছিল। ঠোঁট বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ সুরে বললেন-

“সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। এতো সুন্দর রূপ দিয়েও একটা ছেলেকে সামলাতে পারছো না, আর কী দিয়ে আটকাবে বলো দেখি?”

এই কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধল রাহুলের বুকে। মায়ের কথার প্রতিটি শব্দ তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিল। ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসতে লাগল সে। মনে মনে কণ্ঠে গর্জে উঠল -

“তাহলে এটাই কি আসল প্ল্যান? মিনিকে আমার কাছে ঠেলে দেওয়া, শুধু আমাকে থামানোর জন্য? বিশ্বাসঘাতক! সবাই বিশ্বাসঘাতক…।”

ঘামে ভিজে ওঠা শরীর কাঁপছিল রাগ আর অপমানে। বুকের ভেতর হাহাকার জমে ওঠে, অথচ মুখ দিয়ে কিছুই বের হলো না। হঠাৎ করেই ভেতরের সব কিছু ভেঙে চুরমার করে, খাবারের দিকে একবার চোখ না দিয়েই দরজা আছাড় মেরে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল রাহুল।

-----------------------------

এক ধাক্কায় আরিয়ানকে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে হনহনিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল মহুয়া। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখদুটো লাল হয়ে আছে অপমান, ক্ষোভ আর আতঙ্ক মিলেমিশে এক অদ্ভুত হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে তার চেহারায়। কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে, কারো দিকে না তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের বাসার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে।

বাড়িতে ঢুকে সোজা নিজের রুমে ঢুকে পড়ল। সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলো সে। শব্দটা কানে বাজলো মনোয়ারা বেগমের, বুকটা কেঁপে উঠলো তার। তিনি তাড়াতাড়ি ছুটে এসে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।

“মহুয়া! মা, তুই ঠিক আছিস তো? এভাবে দরজা বন্ধ করলি কেন? তোর মুখটা তো দেখলাম ,অমন বিধ্বস্ত চেহারা আগে কখনো দেখিনি। মা, দরজাটা একবার খোল... একটু কথা বল। কাল সারারাত কোথায় ছিলি তুই? কতবার ফোন দিলাম তোকে!”

ভিতর থেকে ভেসে এলো নিস্তেজ কণ্ঠে উত্তর -

“মা, আমি খুব ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নিতে চাই। এখন আমাকে একা থাকতে দাও... দয়া করে।”

মহুয়ার কণ্ঠে এমন এক যন্ত্রণা ছিল, যেটা একজন মা কখনোই অচেনা মনে করতে পারে না। তবুও আর কিছু না বলে মনোয়ারা বেগম চুপচাপ সরে গেলেন দরজার সামনে থেকে, চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছায়া।

মহুয়া ধীরে ধীরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। আয়নার সামনে নিজেকে দেখে নিজেই কেঁপে উঠল সে। হাতে ধরা শাড়িটার আঁচল খুলতে গিয়ে চমকে উঠল ,সারা গায়ে নীলচে-কালচে দাগ। যেন কেউ আঁচড়ে, টেনে ছিঁড়ে শরীরটাকে শুধু দেহ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তার শরীরের প্রতিটি চিলতে অংশে ভয় আর হেনস্তার ছাপ।

সে এক পা পেছিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভালো করে দেখল আয়নায়। যাকে দেখছে, সে কি মহুয়া? না, এ তো এক ভীত, বিধ্বস্ত, ভেঙে পড়া একটা মেয়ে, যার চোখে শুধুই অন্ধকার। বুকের ভেতর একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠছে, কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে, চোখদুটো শুকনো মরুভূমির মতো এক ফোঁটা জল নেই।

মহুয়া নিজের প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো -ওরা আদৌ মানুষ ? মানুষ হলে কেউ এমন করে?" ওরা তো মানুষ না... জানোয়ার। জানোয়ারেরা কি আদৌ ভালোবাসে? ওরা শুধু শিকার করতে জানে ,শুধু মেয়েদের শরীর ভোগ করতে জানে ,ভালোবাসতে নয়..."

এক মুহূর্তে মনে হলো, এই ঘর, এই আয়না, এমনকি নিজের শরীরটা all of it তার কাছে পর হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প