সূর্যের প্রথম আলো জানলার ফাঁক গলে এসে সরাসরি মহুয়ার মুখে পড়লো। চোখ মেলে তাকাতেই চারদিক যেন ঘুরে উঠলো। নিজের শরীরের দিকে একবার তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। রাতের ভয়াবহ স্মৃতি এক ঝটকায় ফিরে এলো মনে কালো আঁধারে গিলে খাওয়া সেই রাতটা যেন আবারও তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে মহুয়ার বুক ভেঙে কান্না ঝরে পড়লো। অঝোর ধারা নামলো চোখ থেকে। কাঁপতে কাঁপতে সে ফিসফিস করে বললো-
"আমি আমার বাবা-মাকে কী জবাব দেবো? উনারা যদি জেনে যায়, তাহলে লজ্জায় মরে যাবে। আমি কেনো যে কাল রাতে কলেজে এসেছিলাম! কেনো ওই শকুনের চোখে পড়লাম!"
কাঁদতে কাঁদতে মহুয়ার হেচকি উঠে গেল। তবুও সে নিজেকে কিছুটা শক্ত করে তার কাপড়গুলো নিচে থেকে তুলে রুমের মধ্যে থাকা ওয়াশরুমে চলে গেল।
ওয়াশরুমে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো মহুয়া।শাওয়ারের নিচে বসে একভাবে কেঁদে চলেছে সে।তার কান্না যেন বাঁধই মানছে নাহ্।নিজেকে অনেকবার সামলানোর চেষ্টা করেছে।তারপরেও কেন জানি পারছে না!
অনেক কষ্টে শাওয়ার নেয়া শেষ করে কাপড় পড়ে বাইরে বের হয়ে এলো।বিছানার চাদরের দিকে চোখ পড়তেই তার চোখ আবার ভিজে গেল।কারণ সেখানে খানিকটা রক্ত লেগে আছে।
আল্লাহ্ কেন হলো আমার সাথে এমন!আমি কি এমন পাপ করেছিলাম।
ব্যাগটা কাঁপা হাতে টেনে নিয়ে মহুয়া ফোন বের করল। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল,চল্লিশবার মিসড কল! ডায়ালপ্যাড খুলতেই নামগুলো চোখে ভাসল মা, নিশাত, আরিয়ান। হঠাৎই পৃথিবীটা যেন ঝাপসা হয়ে গেল।
মাথার ভেতরে তীব্র যন্ত্রণার মতো একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল-
“মাকে কি বলবো আমি? বলবো, এক নরপশু আমার সবকিছু লুটে নিয়েছে? না…এটা কখনো বলা যাবে না!”
চোখে অঝোর জল নেমে এলো। মনে হলো বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
“আর আরিয়ান… ওকে আমি কী বলবো? আমাদের এতদিনের সম্পর্ক, ভালোবাসা সব শেষ হয়ে যাবে। কেউই তো চাইবে না একটা ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করতে!”
মহুয়ার মনে হলো মাথাটা ফেটে যাবে, ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই সে কানে হাত চেপে ধরে অসহায় কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল-
“না… আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না… না-আ-আ-আ…!”
গগনবিদারী সেই আর্তনাদ ঘর ভরিয়ে দিল। পরক্ষণেই তার পা কেঁপে উঠল, চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়ল মহুয়া, আর সেই সাথেই নিথর হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
-----
রাহুল বিরক্ত স্বরে গর্জে উঠল
রাহুল: “বেলা এগারোটা বাজে, তবুও এই মা'গী'টা ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেন রে জনি? যা, গিয়ে একটু দেখে আয় তো ।”
জনি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি টেনে উত্তর দিল-
জনি: “রাতে মনে হয় ডোজটা একটু বেশি হয়ে গেছে, বস। তাই তো এখনো ঘুমাচ্ছে।”
রাহুল রাগে টেবিলে হাত চাপড়ে বলে উঠলো -
রাহুল: “এতো বকবক করিস কেন? যেটা বলেছি সেটা কর।”
আদেশ পেয়েই জনি দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ধীরে ধীরে কপাট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। ঠান্ডা মেঝেতে মহুয়া নিথর হয়ে পড়ে আছে, মুখটা বিবর্ণ, চোখদুটো অর্ধেক খোলা, চারপাশে যেন এক ভয়ানক নীরবতা বিরাজ করছে।
জনির গলায় কাঁপন ধরল-
জনি: “বস… এই মেয়েটা তো জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে!”
রাহুল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে এসে, মুখে বিস্ময় আর বিরক্তির ছাপ নিয়ে বললো
রাহুল: “বলিস কী! সত্যি অজ্ঞান হয়ে গেছে?”
জনি: জ্বী বস।
রাহুল: ডাঃ কে ফোন কর ,আর এই কথা যেন কোন ভাবেই বাহিরে প্রকাশ না হয়।কথাটা মাথায় রাখিস।
জনি দ্রুত ডাক্তারের কাছে ফোন দিয়ে আসতে বললো।
আধা ঘন্টা পর ডাক্তার আসলো।
চেকআপ করে ডাক্তার রাহুলকে বললো-" অতিরিক্ত টেনশনের কারনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি এগুলো খাওয়ালে ঠিক হয়ে যাবে
ইন শা আল্লাহ। কিন্তু এই মেয়েটা আপনার কে হয় মি. রাহুল? "
রাহুল:-ইয়ে মানে উনি আমার বান্ধবী হয় আমরা একি সাথে পড়তাম ।
ডাঃ: আচ্ছা ঠিক আছে নিয়মিত ঔষধ খাওয়ান তাহলেই ঠিক হয়ে যাবে । আমি। এখন আসি।
ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই রাহুল মহুয়ার গলা চেপে ধরলো।
রাহুল:বল কেন এমন নাটক করলি ? এতো মেয়ের সাথে আমি রাত কাটাইছি কিন্তু তোর মতো অদ্ভুত মেয়ে আমি আজকেই প্রথম বার দেখলাম । অজ্ঞান হয়েছিলি কেন বল? রাহুল চিৎকার দিয়ে উঠলো।
মহুয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল -আসলে আমি......
রাহুল: " একটা কথাও বলিস না । এখনি এখান থেকে বেরিয়ে যা নয়তো আবার বিছানায় নিয়ে যাবো। তোর দিকে তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না । তুই কোন সাধারণ মানুষ নয় তুই অন্য কিছু । রুপের আগুনে তুই আমাকে ঝলসে দিবি। এখনি বেরিয়ে যা । "
পার্স ব্যাগটা নিয়ে আস্তে আস্তে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে গেল মহুয়া।
হাঁটু অব্দি লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চোখের কাজল লেপ্টে আছে। শাড়ির আঁচল মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মহুয়ার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পরছে । আশেপাশের সবাই তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে ।
মহুয়া আনমনে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
হঠাৎ করে পরিচিত কন্ঠ ভেসে এলো কানে- আরে এটা মোখলেছ মাস্টারের মাইয়া মহুয়া না? এইহানে কি করছে? এইটা তো খারাপ জায়গা । এখানে তো বড়ো লোকের পোলা-মাইয়ারা অবৈধ মেলামেশা করে?
কথাগুলো কানে বিঁধে যায় ভাঙা কাঁচের মতো, টুকরো টুকরো করে দেয় ভেতরের নীরবতাকে। মহুয়া চুপচাপ হাঁটে, তবুও সেই কটু শব্দগুলো যেন প্রতিটি পদক্ষেপে পিছু নিয়ে তার কানে ধাক্কা মারে বারবার। মানুষের মুখ থেকে ঝরে পড়া সেই বিষাক্ত বিচার তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে বসে। ঠিক তখনই, পাশে থাকা একজন হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল-
"হ ভাই আপনি ঠিকই কইছেন এইটা খারাপ জায়গা এইখানে অবৈধ মেলামেশা হয় । কিন্তু আমারো তো একই প্রশ্ন মহুয়া এইখানে কি করতাছে । ওর তো আরিয়ান ভাইয়ের সাথে বিয়ের কথাবার্তা চলতেছে । আর এক মাস পরই তো ওদের বিয়ে।
মহুয়া ধীরে ধীরে পিছনে তাকাতেই চোখে পড়লো এরা তো তাদের এলাকার সেই পুরোনো চেনা মুখ, আবুল মিয়া আর বাবলু ভাই। দু’জনকে দেখেই বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠলো। ছোটবেলা থেকেই মহুয়া জানে, এদের কাজই হলো মানুষের পেছনে লেগে থাকা, দোষ খুঁজে বেড়ানো, আর সেই দোষকে রঙচঙে করে সবার সামনে ছড়িয়ে দেওয়া।
আবুল মিয়া যেন একেবারেই অলস মানুষ; তবু আশেপাশের সবার জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে নাক গলানোই তার নিত্য অভ্যাস। কার মেয়েটা কখন বাড়ি ফিরছে, কে কার সঙ্গে কোথায় যাচ্ছে সবকিছুর খোঁজ রাখাই তার নেশা। মুখে সর্বদা বিদ্রূপ মাখানো হাসি, চোখে শিকারির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
আর বাবলু ভাই তো এক ধাপ এগিয়ে যেন মহল্লার অনাহূত খবরের কাগজ। ছোটখাটো ঘটনা হলেও বাড়িয়ে বলার কৌশল তার রক্তে মিশে আছে। কোনো পরিবারের সামান্য ভুলচুকও তার মুখে পৌঁছালে তা মুহূর্তেই রূপ নেয় বড়সড় কেলেঙ্কারিতে। মানুষের গোপন কষ্টকে সে রসিকতায় পরিণত করে, আর তার কথায় হাসাহাসি করে আনন্দ পায় আশেপাশের লোকজন।
মহুয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, যদি এরা সত্যিই কথাগুলো সবার সামনে বলে দেয়, তাহলে বাবার আজীবন গড়ে তোলা সম্মান, সমাজে তাঁর মান-মর্যাদা সব এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে যাবে। শিরদাঁড়া বেয়ে অজানা আতঙ্ক নেমে আসছিল, পায়ের নিচে মাটি যেন বারবার সরে যাচ্ছিল।
শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে মনের গভীরে এক আকাশসমান ভয় জমে গিয়েছিল। হাঁটতে হাঁটতে সে যেন হোঁচট খেতে খেতেই কলেজ ক্যাম্পাসের ফটকের ভেতর ঢুকলো। শরীরটা ভারী লাগছিল, কিন্তু মনটা ছিল আরও ভারাক্রান্ত।
ঠিক তখনই পিছন দিক থেকে হঠাৎ চঞ্চল কণ্ঠ ভেসে এলো।
“এই মাহীর বাচ্চা মাহী!”
দৌড়ে এসে নিশাত তাকে জড়িয়ে ধরলো। নিশাতের হাতের উষ্ণ চাপ আর মুখের উদ্বিগ্ন ভঙ্গি দেখে মহুয়ার বুকটা হালকা হলেও চোখে জল চলে এল। নিশাত ভ্রু কুঁচকে তাড়াহুড়া করে বলল,
“দেখ তো, তোর ফোনে কতবার কল দিয়েছিলাম, একবারও রিসিভ করিসনি কেন? কাল রাতে তুই কোথায় ছিলি রে?”
নিশাতের চোখেমুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা, অথচ মহুয়ার বুকের ভেতরে যেন আরও অস্থিরতা জমে উঠছিল। তার ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছিল, উত্তর দিতে গিয়ে গলার স্বর যেন আটকে আসছিল…
মহুয়া আস্তে করে বলল -কোথাও না।
নিশাত আবার বলে উঠলো : তুই জানিস আরিয়ান ভাইয়া কতো টেনশন করতেছে কালকে রাত থেকে । একবার ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখ ভাইয়া কতোবার ফোন দিয়েছে?
আরিয়ান কে বলে দিস আমি আর ওনার সাথে কথা বলবো না রে।
নিশাত: কেন ? এতো বছরের সম্পর্ক ......এমন কথা তো আগে কখনো বলিসনি।
মহুয়া: আমি বাড়ি যাবো ।
নিশাত : তুই এমন করতেছিস কেন রে মাহী ? তোর কি হয়েছে? আঙ্কেল আন্টি কিছু বলেছে নাকি তোকে? তুই এমন মনমরা হয়ে আছিস কেন ?
মহুয়া: এমনি।
নিশাত: ঠিক আছে তুই তাহলে বাসায় যা।
দুপুরের কড়া রোদ যেন আগুন ছড়াচ্ছে চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে মহুয়ার কপালে ঘাম জমেছে, শাড়ির আঁচল দিয়ে বারবার মুছলেও গরমটা একটুও কমছে না। মেইন রোডের ভিড় আর ধোঁয়াটে কোলাহল পেরিয়ে যখন সে গলির ভেতরে ঢুকলো, চারপাশটা হঠাৎ অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই সামনে থেকে ভেসে আসলো ভারি পদক্ষেপের শব্দ। চোখ তুলে তাকাতেই মহুয়ার বুক কেঁপে উঠলো। আরিয়ান সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। কপাল কুঁচকানো, চোখে অস্বস্তিকর তীব্র দৃষ্টি, ঠোঁট শক্তভাবে চেপে রাখা। যেন অনেকক্ষণ ধরে রা*গ জমে আছে তার ভেতরে, আর মহুয়াকে দেখেই সেই রাগটা আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।
গরম দুপুরের আঁচও যেন মুহূর্তে ফিকে লাগছিল আরিয়ানের চোখের সেই তীক্ষ্ণ রাগের সামনে। মহুয়ার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠলো, সে বুঝতে পারছিল আজ কিছু একটা হতে চলেছে।
আরিয়ান হঠাৎ মহুয়ার কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন র*ক্তচক্ষুর মতো লাল দৃষ্টি, শ্বাসগুলো ক্ষিপ্র আর ভারী। মুহূর্তেই সে মহুয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরল, যেন লোহায় বাঁধা শেকল। ব্যথায় মহুয়ার আঙুলগুলো কেঁপে উঠলেও, ছাড়াতে পারল না।
চোয়াল শক্ত করে, দাঁত চেপে আরিয়ান কণ্ঠ থেকে বিষ উগরে দিল-
“বে'শ্যা'র মা'গী', কয়জনরে দেহ বিলাবি তুই?"