অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ৩০

🟢

রাত তখন প্রায় তিনটার কাছাকাছি। জানালার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর তন্দ্রাচ্ছন্ন মফস্বলের নীরবতা। ঘরের ভেতরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে নয় বছরের ছেলেটি তার মায়ের কোল ঘেঁষে শুয়ে আছে। তার চোখে ঘুম নেই, আছে একরাশ কৌতূহল আর অবুঝ এক হাহাকার।

মায়ের থেকে গল্প শুনতে শুনতে ছেলেটি হঠাত্‍ শান্ত স্বরে বলে উঠল, "মা, এতদিন তুমি আমার কাছে বাবার সত্যটা লুকিয়ে রেখেছিলে কেন? আমার সব সহপাঠীরা জানে আমার বাবা মারা গেছে। স্কুলের ফর্মে বাবার নামের পাশে কেন তুমি 'প্রয়াত' লিখেছিলে মা?"

মহুয়া শিউরে উঠল। তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ছেলের কপালে অবিন্যস্ত চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে আলতো করে একটা চুমু খেল সে। জানালার ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল, "কাল তোর বাবা মুক্ত হবে। দীর্ঘ দশটা বছর পর সে আকাশের নিচে দাঁড়াবে। জানি না এই দশ বছরে মানুষটাকে জেলখানায় কতটা পরিবর্তন হয়েছে।"

ছেলেটি উঠে বসল। মায়ের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে এক অকল্পনীয় প্রশ্ন করে বসল, "মা, তোমার গল্প শুনে যা বুঝলাম, আমার দাদুর খুনটা তো তুমি করেছিলে। তবে বাবা কেন নিজের কাঁধে দোষ নিয়ে জেলে গেল? সে কেন প্রতিবাদ করল না ?"

মহুয়ার দৃষ্টি তখন ঝাপসা হয়ে এসেছে। অতীতের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধরা গলায় বলল, "কারণ তোর বাবা আমাকে ভালোবাসতো রে। তার সেই ভালোবাসা ছিল অন্ধ কিন্তু অটল। আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে নিজে সুখে থাকার চেয়ে সে অন্ধকার কুঠুরিতে পচে মরাকেই শ্রেয় মনে করেছিল। সে চেয়েছিল আমি যেন মুক্ত থাকি। সে আমাকে কোনো কষ্টের মুখে ফেলে দিতে চায়নি।"

কিছুক্ষণ নীরবতা। ঘরের দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছেলেটি আবার প্রশ্ন করল, "মা, তুমি যে তামিমা নামের মেয়েটার কথা বললে...সেই মেয়েটা এখন কোথায়?"

মহুয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো - শুনেছি বাচ্চা প্রসবের সময় মারা গেছে।

মাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটা বলে উঠলো - আমার প্রচুর পরিমাণে ঘুম পাচ্ছে মা ।

মহুয়া মুহিব এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো।

ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিতেই অতীতের বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা মনে হতে লাগলো মহুয়ার।

স্বামীকে ছাড়া মা হওয়ার গল্প টা মোটেই সহজ ছিল না মহুয়ার । এই দশটা বছর সে স্বামী ছাড়া কাটিয়েছে ।

একেকটা রাত যেন একেকটা যুগের মতো মনে হতো তার কাছে।

দীর্ঘ দশটি বছর কেটে গেছে।এই দশটি বছর সে তার পিতৃগৃহের আশ্রয়ে নিজেকে আগলে রেখেছে। একবারের জন্যও যে ভিটায় সে পা রাখেনি, তা কেবল দূরত্বের কারণে নয় বরং চরম ঘৃণায়।

বাবার বাড়ির চেনা আঙিনায় দশটি বসন্ত পার করে দিলেও, শ্বশুরবাড়ির কথা মনে পড়লেই আজও তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সেই বাড়ির প্রতিটি ইটে যেন এক বীভৎস ইতিহাস মিশে আছে। যখনই অবচেতন মনে সেই বাড়ির কথা উঁকি দেয়, তখনই শ্বশুরের সেই ঘৃণ্য অপকর্মের স্মৃতিগুলো তপ্ত সিসার মতো মগজে এসে বিঁধতে থাকে। মনে হয়, স্মৃতির আলমারি থেকে কোনো একটা কদর্য দানব বেরিয়ে এসে তাকে আবার খামচে ধরবে। সেই আতঙ্ক আর ঘৃণার দহন তাকে এতটাই গ্রাস করে যে, ওই পথ দিয়ে হাঁটার কথা ভাবলেও তার পা থমকে যায়।

অতীতের সেই বিষাক্ত স্মৃতিগুলো যখন মহুয়ার মনে ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এলো ফজরের আযানের সুমধুর সুর। চারপাশের প্রকৃতি যেন এক পবিত্র স্নিগ্ধতায় জেগে উঠছে। মসজিদের মিনার থেকে আসা সেই আহ্বান মহুয়ার বিক্ষিপ্ত মনের ভেতর এক পশলা বৃষ্টির মতো প্রশান্তি নামিয়ে আনলো। স্মৃতির সেই অন্ধকার গলি থেকে সে যেন হঠাৎ আলোর মুখ দেখতে পেল।

সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলতো পায়ে গিয়ে অজুর পানি স্পর্শ করতেই শরীরের সব ক্লান্তি আর মনের সব গ্লানি যেন ধুয়ে মুছে যেতে লাগল। অজুর পর শীতল সতেজতায় মহুয়া যখন জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়াল, তার অশান্ত মনটা তখন পরম করুণাময়ের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য তৈরি। বিনম্র চিত্তে সে নামাজ আদায় করে নিল; প্রতিটি সিজদায় যেন সে তার দশ বছরের জমে থাকা সব হাহাকার সপে দিল স্রষ্টার দরবারে।

নামাজ শেষে মহুয়া পরম মমতায় কুরআন শরিফটা হাতে তুলে নিল। ভোরের আধো-আলো আর আধো-আঁধারের মাঝে তার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হলো ঐশী বাণীর পবিত্র তিলাওয়াত। ঘরের কোণে কোণে সেই সুর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। প্রতিটি আয়াতের সাথে সাথে তার বুকের ভেতর চেপে থাকা পাথরটা যেন হালকা হয়ে আসছিল। দীর্ঘ দশ বছরের সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো কুরআন তিলাওয়াতের এই স্নিগ্ধ ধারায় কিছুটা হলেও আজ ম্লান হতে শুরু করেছে।

অতীতের কালো মেঘ আর ভোরের ইবাদত শেষে মহুয়ার মনে এখন এক অদ্ভুত সংকল্পের ছাপ। পাশের বিছানায় মুহিব তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন; নিষ্পাপ মুখখানায় ভোরের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে। মহুয়া পরম মমতায় ঝুঁকে পড়ে ছেলের কপালে একটি দীর্ঘ চুমু খেল। এই সন্তানই তার দশ বছরের বেঁচে থাকার অবলম্বন। আলমারি থেকে বোরকাটা বের করে গায়ে জড়িয়ে যখন সে ঘরের বাইরে পা বাড়াল, তখন তার চোখেমুখে এক অনড় দৃঢ়তা।

বাইরের বারান্দায় তজবি হাতে বসে ছিলেন মনোয়ারা বেগম। আঙুলের ভাঁজে তজবির দানাগুলো ঘুরছে আর ঠোঁট দুটো বিড়বিড় করছে জিকিরে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে মহুয়াকে বোরকা পরে তৈরি হতে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হয়ে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। প্রশ্ন করলেন, "এত সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছিস রে মা?"

মহুয়া আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে নিচু স্বরে কিন্তু পরিষ্কার গলায় বলল, "থানায় যাচ্ছি মা। তুমি মুহিবের দিকে একটু খেয়াল রেখো, ও ঘুমাচ্ছে।"

মেয়ের উত্তরের ধরনে মনোয়ারা বেগমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। দিনটি আজ তবে এসেই গেল! মনে পড়ে গেল দশ বছর আগের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা। রাহুল যখন নিজের আর বাবার অপরাধের দায়ে শ্রীঘরে গেল, তার ঠিক পরপরই মহুয়া জানতে পেরেছিল সে মা হতে চলেছে। সেই খবর যখন কান্নারত মহুয়া তার মাকে দিয়েছিল, মনোয়ারা বেগম বিচলিত হননি। বরং মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, "ধৈর্য ধর মা। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। দিনরাত শুধু তাঁর কাছেই প্রার্থনা কর, যাতে তোর সন্তান ওই পাপিষ্ঠদের মতো না হয়। রক্ত যেন পূর্বপুরুষের হয়, কিন্তু স্বভাব যেন হয় স্বচ্ছ পানির মতো পবিত্র।"

মহুয়াই তা-ই করেছিল। গত দশটি বছর সে তার গর্ভের সন্তানকে ঘিরে এক আধ্যাত্মিক দুর্গ গড়ে তুলেছিল। নামাজের মোসল্লায় চোখের জল ফেলা আর পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াতে সে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিল শুধু এই আশায় যে, মুহিব যেন তার বাবা বা দাদার মতো কোনো অন্ধকার সত্তা হয়ে বড় না হয়। আজ সেই প্রার্থনারই ফল কি না কে জানে, মুহিবের শান্ত অবয়বে এক স্বর্গীয় নূর যেন খেলা করে।

মহুয়া বেরিয়ে যেতেই মনোয়ারা বেগম ধীর পায়ে নাতির ঘরের দিকে এগোলেন। মুহিবের শিয়রে বসে মায়াবী চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চুলে বিলি কেটে দিয়ে মৃদু স্বরে ডাকলেন, "ভাইজান, ওঠো... সকাল হয়ে গেছে।" কিন্তু রাত জেগে পড়ালেখা কিংবা হয়তো কোনো কারণে দেরি করে ঘুমানোর ফলে মুহিবের চোখের পাতা তখনো ভারী হয়ে আছে। নানির র ডাকে সাড়া না দিয়ে সে পাশ ফিরে শুলো। মনোয়ারা বেগম আর ডাকলেন না; বরং এক রাশ মমতা নিয়ে নাতির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, "তোর মা তোর জন্য এক নতুন সকাল আনতে গেছে রে নানাভাই।"

থানার সীমানা পেরিয়ে মহুয়া যখন জেলগেটের সেই নির্দিষ্ট কক্ষটিতে পৌঁছাল, তখন চারদিকের পরিবেশটা এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় ঘেরা। লোহার শলাকার ওপাশে রাহুল বসে আছে। দশ বছর আগের সেই উদ্ধত যুবকটি আজ নেই; তার বদলে সেখানে বসে আছে এক শীর্ণকায়, জীর্ণ মানুষ। চারপাশের অন্য কয়েদিরা তাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের চোখেমুখে রাহুলের প্রতি এক ধরণের সমীহ আর অনুরোধ। সবাই চাচ্ছে, আজ বিদায়ের আগে রাহুল তাদের শেষবারের মতো একটা গান গেয়ে শোনাক।

সবাই যখন গানের জন্য পীড়াপীড়ি করছিল, রাহুল তখন একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর মাথা নিচু করে বসল। হঠাৎ তার কণ্ঠ চিরে কোনো গান নয়, বরং বেরিয়ে এল এক করুণ আর হাহাকারভরা গজল।

পৃথিবী না জানুক, আমি তো জানি।

আমি কি পাপ করেছি হায়!

বিজ্ঞাপন

আমার পাপের করলে বিচার,

বাঁচার আমার নাই উপায় ।

দয়াময় তুমি মাফ করো আমায়

মাফ করো আমায়।

দয়াময় তুমি মাফ করো আমায়

মাফ করো আমায়।..........

সুরের মূর্ছনায় জেলের প্রতিটি কোণ যেন ডুকরে কেঁদে উঠল। মহুয়া দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে শুনল সেই আত্মোপলব্ধির বাণী।

পুলিশের বাঁশি আর জেলখানার লোহার গেটের সেই কর্কশ শব্দ আজ অন্যরকম শোনাল। মহুয়া আর রাহুলের জীবনের দীর্ঘ দশটি বছরের সেই কালো প্রাচীরটা যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। জেলগেটের ছোট দরজা দিয়ে রাহুল যখন বেরিয়ে এলো, বাইরের মুক্ত বাতাস আর সূর্যের আলো তার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল। দশ বছর পর সে আজ আকাশের নিচে দাঁড়ালো, কোনো শিকল ছাড়াই।

রাহুল লজ্জিত ভঙ্গিতে মহুয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে ছোট একটা পুটলি, তাতে দশ বছরের কারাজীবনের যৎসামান্য কিছু স্মৃতি। মহুয়া স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, "চলো।"

রাহুল অবাক হয়ে তাকাল। সে ভেবেছিল মহুয়া হয়তো তাকে মুক্তি দিয়ে একা চলে যাবে। সে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কোথায় যাব মহুয়া? আমি তো তোমার সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতাও হারিয়েছি শুধুমাত্র আমার বাবার কারণে।"

মহুয়া বললো তুমি আমার সাথে আমার বাড়ি যাবে।

রাহুল যখন বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়াল, মহুয়া হঠাৎ থেমে গিয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন একাধারে সতর্কতা এবং এক রাশ বিষাদ। সে খুব নিচু স্বরে কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল:"দাঁড়াও রাহুল। বাড়ি যাওয়ার আগে একটা কথা তোমার জেনে রাখা খুব দরকার। গত দশটা বছর মুহিবকে আমি একটা মিথ্যে পাহাড়ের ওপর বড় করেছি। ও জানে না ওর বাবা জেলে ছিল; আমি ওকে বলেছিলাম যে ওর বাবা মারা গিয়েছে।"

রাহুলের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মহুয়া আবার বলতে শুরু করল, "অবাক হয়ো না। তোমার আর তোমার বাবার যে পরিচয় ছিল, সেই পরিচয় নিয়ে ওকে আমি সমাজে ছোট হতে দিতে চাইনি। ওর সহপাঠীরা যখন জিজ্ঞেস করত ওর বাবা কোথায়, তখন ও যেন মাথা নিচু করে বলতে না হয় যে ওর বাবা একজন কয়েদি। তাই আমি ওকে এক মৃত বাবার পবিত্র স্মৃতি দিয়ে বড় করেছি। ওর কাছে তুমি ছিলে ধ্রুবতারার মতো এক আদর্শ, যে পরপারে থেকে ওকে দেখছে।"

মহুয়ার কথা শুনে রাহুলের চেহারা পাল্টে গেল।

মহুয়া এক পলক রাহুলের পাংশুটে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করল, "অবাক হচ্ছো? হ্যাঁ রাহুল, এতদিন ওকে মিথ্যে কুয়াশায় ঢেকে রেখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু গতকাল যখন এশার নামাজ শেষ করলাম, আমার মনে হলো মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে কোনোদিন সততার ইমারত গড়া যায় না। মুহিব এখন বড় হয়েছে, ও বুঝতে শিখেছে। তাই গত রাতেই আমি ওকে তোমার জীবনের সবটুকু সত্যি বলে দিয়েছি।"

রাহুলের বুকটা যেন কোনো এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। সে দেয়াল ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "সব? সব বলে দিয়েছ মহুয়া? ও কি জানে ওর বাবা আর দাদা কেমন মানুষ ছিল? ও কি জানে আমি কেন জেলে ছিলাম?"

মহুয়া শান্ত চোখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ, সবটুকু। ওকে বলেছি তোমার বাবার সেই অন্ধকার জগতের কথা, বলেছি তোমার আর আমার ভুলের কথা। এমনকি এই দশ বছর আমি কেন তোমাকে দেখতে যাইনি, সেই অভিমানের গল্পও ও জানে। আমি চাইনি ও কোনো সাজানো সত্য নিয়ে বড় হোক। আমি চেয়েছি ও জানুক ওর বাবা অপরাধী ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত সে দশ বছর ধরে করেছে। ওকে বলেছি, আজ তার বাবা এক নতুন মানুষ হয়ে ফিরে আসবে, যে আর কোনোদিন মিথ্যে বা অন্যায়ের পথে পা বাড়াবে না।"

রাহুলের দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল নামছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "ও কি আমাকে ঘৃণা করছে মহুয়া? ও কি আমাকে বাবা বলে ডাকবে?"

মহুয়া একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে বিষাদ মাখা। "সেটা তুমি নিজেই গিয়ে দেখো। ও সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ওর ছোট মনের ভেতর এখন এক বিশাল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একদিকে মৃত বাবার ফিরে আসার আনন্দ, অন্যদিকে তোমার অতীতের সেই অন্ধকার সব মিলিয়ে ও এখন এক বিভ্রান্তির মাঝে আছে। তবে আমি ওকে বলেছি, মানুষ তার কাজের জন্য অনুতপ্ত হলে আল্লাহও তাকে মাফ করে দেন, আর আমরা তো সামান্য মানুষ।"

তারা যখন বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল, রাহুল দেখল মুহিব দরজার আড়ালে অর্ধেক শরীর লুকিয়ে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে ভয় নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত কৌতূহল আর বিচারকের মতো একজোড়া স্থির দৃষ্টি। মহুয়া আলতো করে রাহুলের পিঠে হাত দিয়ে বলল, "যাও রাহুল, আজ নিজেকে নতুন করে ওর কাছে তুলে ধরো। আজ কোনো মিথ্যে নেই, কেবলই রক্ত-মাংসের এক বাবা আর তার ছেলের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়।"

রাহুল কম্পিত পায়ে মুহিবের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। দশ বছরের কারাজীবনের চেয়েও এই কয়েক কদম হাঁটা যেন তার কাছে অনেক বেশি কঠিন মনে হতে লাগল।

রাহুল যখন মুহিবের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, চারদিকের বাতাস যেন স্থির হয়ে গেল। মহুয়া আর মনোয়ারা বেগম দূরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে সেই দৃশ্য দেখছেন। রাহুল হাঁটু গেঁড়ে বসলো ছেলেটির সামনে, ওর চোখের উচ্চতায়। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। দশ বছরের জমানো সব অনুশোচনা যেন আজ একবিন্দু জলে পরিণত হয়ে টলমল করছে।

মুহিব কিছুক্ষণ স্থির চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। মহুয়ার বলা গত রাতের সেই কঠিন সত্যগুলো ওর কিশোর মনে এক গভীর রেখাপাত করেছে। ও ধীর গলায় প্রশ্ন করল, "তুমি কি সত্যিই পাল্টে গেছ? মা বলেছে তুমি এখন ভালো হয়ে যাবে?

রাহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠে মুহিবের ছোট্ট দুটো হাত নিজের কপালে চেপে ধরল। ভাঙা কণ্ঠে বলল, "আমাকে ক্ষমা করো বাবা। তোমার এই পাপী বাবাটা আজ নতুন করে বাঁচতে চায়। তুমি কি আমাকে একবার শুধু 'আব্বু' বলে ডাকবে?"

মুহিবের চোখের কোণেও জল চিকচিক করে উঠল। মায়ের শেখানো সেই উদারতা আর দীর্ঘ দশ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সে রাহুলের গলা জড়িয়ে ধরল। অস্ফুট স্বরে ডাকল, "আব্বু..."

উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে মহুয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো আজ আর কষ্টের নয়, বরং চরম তৃপ্তির। তপ্ত রোদে পুড়ে যাওয়া জমিতে এক পশলা বৃষ্টি নামলে যেমন ঘ্রাণ বের হয়, মহুয়ার জীবনেও আজ সেই প্রশান্তির সুবাস।

ভুলের তিমির কাটিয়ে এক নতুন ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হলো তাদের ছোট্ট সংসার। মহুয়া বুঝতে পারল, ঘৃণা দিয়ে নয়, বরং ধৈর্য আর সত্যের শক্তি দিয়েই কেবল অন্ধকারকে জয় করা সম্ভব। দীর্ঘ দশ বছরের বনবাস শেষে আজ সত্যিই এক নতুন জীবনের জয়যাত্রা শুরু হলো।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প