অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ২৮

🟢

আরিয়ানকে দেখামাত্রই মহুয়ার শরীরের শিরা-উপশিরায় যেন আগুন জ্বলে উঠলো। তার ভেতরের সকল রাগ, ঘৃণা আর বঞ্চনার অনুভূতি একসাথে উথলে উঠলো। রাগে তার গা গুলিয়ে এলো, মনে হলো যেন এই মুহূর্তে সে আরিয়ানকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই তার ক্ষোভে রূপান্তরিত হলো।

-তোমাকে স্বাগতম মহুয়া মাহী।

আরিয়ানের কথা শুনে মহুয়ার রাগটা আরো বেড়ে গেল।

মহুয়া চিৎকার করে বললো আমার হাসব্যান্ড কোথায়?

-এতো চিৎকার করছো কেন?

-তুমি এতো নিচে নামতে পারো আরিয়ান ছিঃ ছিঃ।

এই বলে মহুয়া আরিয়ানের মুখে থুথু দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো কিন্তু আরিয়ান মহুয়ার হাত ধরে বললো

-আমি নিচে নেমেছি ? আমি যদি নিচে নামি তাহলে তুই কি করেছিস ? সেটা ভুলে গেছিস?

তুই একজন ধর্ষককে বিয়ে করেছিস । আচ্ছা বুঝলাম রাহুল তোকে জোর করে ধর্ষণ করেছে ।

আবার জোর করে বিয়ে করেছে । জোর করে তোর সাথে সংসার করছে এখন । এতো বড় বড় ভুল করার পরেও সেই মানুষটির প্রতি তোর এত দরদ কেন ? তুই নিজেই ভেবে দেখ নিজে কতো বড় ভুল করেছিস একজন ধর্ষককে বিয়ে করে।কতো নিচে নেমে গেছিস। ।

আমি তো সামান্য কিছু ভুল করেছি আর তোর রাহুল কতো বড় বড় ভুল করেছে সেটা তুই এখনো জানিস না ?

-আমি সব জানি । রাহুল আগে কি করেছে সেগুলো আমি সব জানি । কিন্তু এখন রাহুল আমাকে ভালোবেসে ।

আরিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল -ভালোবাসা ? তুই ভালোবাসার মানে বুঝিস?

আমিও তো তোকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতাম কিন্তু তুই আমার ভালোবাসা বুঝেছিস?

-তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসতে তাহলে যেদিন আমার বিচার হয়েছিল সেদিন আর কেউ আমাকে সাপোর্ট না করুক তুমি অন্ততঃ আমাকে সাপোর্ট করতে , আমার হাত টা ধরে বলতে পারতে -আমি আছি তোমার পাশে। কিন্তু হায় ,আমি সেদিন তোমার চোখে একটুও ভালোবাসা দেখিনি । তুমি সুদিনে আমাকে ভালোবেসেছো কিন্তু আমার বিপদের সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো । সেদিনের তোমার সেই আচরণে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কি না তা আমার জানা নেই। বিশ্বাস করো আরিয়ান তুমি যদি সেদিন আমাকে সাপোর্ট করতে আমি সবকিছু ছেড়ে তোমার হাত টা ধরতাম । সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তোমার হয়ে যেতাম।

-তুই আমার হাত ধরলেও আমি তোর হাত ছেড়ে দিতাম । কারন আমি তোর মতো ধর্ষিতাকে কখনোই বউ হিসাবে মেনে নিতাম না। তোর জন্য রাহুলের মতো নিকৃষ্ট পাপীই বেটার ।

- আমি জানি রাহুল অনেক অনেক পাপ করেছে ।সে অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। সেই শাস্তি ও পাবে, কিন্তু এতো এতো পাপের মাঝে ও আমাকে ভালোবেসেছে। আমার জন্য করা রাহুলের পাগলামিগুলোই প্রমাণ করে দিয়েছে যে রাহুল আমাকে ভালোবাসে। আমার কষ্টে তার বুকের বাম পাশে সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সেই মুহূর্তের তার বিচলিত চাহনি আর নিরুপায় মুখভঙ্গি স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়, তার ভালোবাসাটা কোনো সাধারণ অনুভূতি নয়, বরং আমার অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে গ্রথিত এক তীব্র আবেগ।

মহুয়ার কথা শেষ হওয়ার এক মুহূর্তও সময় দিল না আরিয়ান। তার চোখে তখন এক অসহিষ্ণুতার আগুন জ্বলছিল। মহুয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আরিয়ান তার হাতটা শক্ত করে টেনে নিয়ে গেল একটা অন্ধকার কক্ষে । যেখানে তারা রাহুলকে বন্দি করে রেখেছে ।

হটাৎ করে পেছনের দিক থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো মহুয়ার কানে - নিজের ভালো চাইলে আমার রাহুলকে আমাকে দিয়ে দাও আর অর্থাৎ তুমি রাহুলকে ডিভোর্স দিয়ে দাও।

পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল লাল বেনারসী শাড়ি পরে মাথায় ইয়া বড় একটা ঘোমটা দিয়ে মিনি দাঁড়িয়ে আছে ।

এই গায়ে পড়া স্বভাবের মেয়েটাকে দেখে মহুয়ার ভেতরে তীব্র জমাট বাঁধা রাগের জন্ম দিচ্ছিল। রাগে মহুয়ার কানের পাশে যেন রক্তের দ্রুত প্রবাহের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সে।

মনে মনে ভাবলো আরিয়ানের সাথে মিনির কিভাবে দেখা হলো । সেই উত্তর মহুয়ার অজানা।

এরই মাঝে মিনি মহুয়ার সামনে এসে তুড়ি মেরে বললো- কি হলো আমার কথা শুনতে পাওনি।

মহুয়া আবার চমকে উঠলো ।

মিনি আবার বলে উঠলো -তুমি যদি এই মুহূর্তে রাহুলকে ডিভোর্স না দাও তো তুমি এখান থেকে জীবিত ফেরত যেতে পারবে না ।

মহুয়া এবার অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললো -রাহুলের সাথে আমার এমন কিছু হয়নি যে আমি রাহুলকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। আর কি যেন বলছিলে আমি জীবিত ফেরত যেতে পারবো না? তুমি শুধু এটা দেখো কে জীবিত থাকে আর কে মরে।

মিনি অট্টহাসিতে ফেটে পরে ।

- দেখো আমার গ্যাং কতো বড় । এই বলে জোড়ে একটা শিষ দেয় আর বিশ পঁচিশ জন ছেলে এসে মিনির পেছনে দাঁড়িয়ে যায় । সবার পড়নে কালো পোশাক।

মিনি ছেলেগুলোর দিকে দেখিয়ে দিয়ে বললো - এই এতোবড় গ্যাং এর লিডার আমি ।

মহুয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মিনি মহুয়ার চারপাশে ঘুরছে আর বলছে - আমি জানি তোমার মনে অনেক প্রশ্নের ঝুড়ি । তবে সবগুলোর উত্তর পেয়ে যাবে।

এই গ্যাং তৈরির একটাই উদ্দেশ্য রাহুল ও তার বাবার সব সম্পত্তি আমার নামে করে নেওয়া ।

মহুয়া এবার আর চুপ থাকতে পারলো না। মিনির অট্টহাসি আর কালো পোশাক পরা গ্যাং-এর দিকে তাকিয়ে তার চোখ জ্বলে উঠল। ভেতরে জমাট বাঁধা ভয়টা মুহূর্তেই তীব্র ক্রোধে রূপান্তরিত হলো।

"সম্পত্তির জন্য এত নিকৃষ্ট হতে পারো তোমরা?" মহুয়ার কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ, স্থির, কিন্তু তাতে বজ্রের কঠোরতা। "রাহুলের বাবার সম্পত্তি তোমার নামে হবে? শোনো মিনি, তুমি আর তোমার এই গুণ্ডাবাহিনী জানো না কার সাথে লড়তে এসেছো।"

মিনি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "কার সাথে? এক ধর্ষকের স্ত্রীকে? যে নিজের স্বামীকে বাঁচাতে মরতে এসেছে? যা তোকে বললাম, ডিভোর্স দে আর এখান থেকে ভাগ। নাহলে তোর পরিণতি..."

মহুয়া মিনির বাক্য শেষ হতে দিল না। বিদ্যুৎগতিতে সে মিনির দিকে এগিয়ে গেল। মহুয়ার এই আকস্মিক এবং আক্রমণাত্মক পদক্ষেপে মিনিও প্রস্তুত ছিল না।

"আমার পরিণতি কী হবে সেটা তুমি দেখবে," গর্জন করে উঠল মহুয়া। সে মিনির মাথায় থাকা ঘোমটা এক টানে খুলে ফেলল, চুলের মুঠি ধরে সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল মিনির গালে।

চড়ের শব্দে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠল। মিনি হতভম্ব হয়ে দু'পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়, অপমান আর তীব্র আক্রোশ।

"তোরা দেখছিস কী?" মিনি চিৎকার করে তার গ্যাং-এর ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলল। "ধর ওকে! শেষ করে দে!"

বিশ-পঁচিশ জন কালো পোশাক পরা ছেলে একসাথে মহুয়ার দিকে তেড়ে এলো। মহুয়া এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে পালটা আক্রমণ শুরু করল। দীর্ঘদিনের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ আজ তার কাজে এলো। তার শরীরী ভাষা পালটে গেল, সে যেন মুহূর্তেই এক শান্ত মেয়ে থেকে রণরঙ্গিনীতে পরিণত হলো।

প্রথমেই যে ছেলেটি এগিয়ে এসেছিল, মহুয়া তার পেটে তীব্র লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিল। পরমুহূর্তে আরেকজন তার হাত ধরতে এলে, মহুয়া তার হাত মুচড়ে ধরে শরীরের উপর দিয়ে ছুঁড়ে মারল। তার প্রতিটি আঘাত ছিল নির্ভুল ও প্রাণঘাতী। সে হাত-পা ব্যবহার করছিল ক্ষিপ্র গতিতে, যেন সে মানব শরীরের দুর্বল স্থানগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞ।

বিজ্ঞাপন

আরিয়ান এতক্ষণ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মহুয়ার এই রূপ দেখে সেও কিছুটা চমকে গিয়েছিল।

"তোমরা পারছ না কেন ওকে ধরতে?" আরিয়ান চিৎকার করল। "ও একা! তোরা এতগুলো ছেলে!"

মহুয়া চারপাশের আক্রমণের মধ্যেও আরিয়ানকে লক্ষ্য করে বলল, "আমি একা নই আরিয়ান! আমার সাথে আমার ভালোবাসা আছে, রাহুলকে বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা আছে! তোমাদের মতো কাপুরুষদের সাথে লড়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট!"

মহুয়া একটানা প্রায় পাঁচ-ছয়জনকে মাটিতে ফেলে দিল। কিছু ছেলে আহত হয়ে কাতরাচ্ছিল, বাকিরা ভয় পেয়ে মহুয়াকে ঘিরে ইতস্তত করছিল। এই সুযোগে মিনি পকেট থেকে একটি ছোট ছুরি বের করে মহুয়ার দিকে ছুটল।

মহুয়ার চোখ কিন্তু এড়ায়নি। সে দ্রুত একটি ছেলের কাছ থেকে একটি লোহার রড ছিনিয়ে নিয়ে মিনির দিকে তাক করল। মিনি কাছাকাছি আসতেই মহুয়া রডটি মিনির হাতে আঘাত করল। যন্ত্রণায় মিনি ছুরি ফেলে হাত চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল।

"এবার বল তোমার পরিণতি কী হবে?" মহুয়া রড হাতে নিয়ে মিনির সামনে দাঁড়াল।

মিনি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "তোকে আমি ছাড়ব না! এই ছুরি তোর বুকে ঢুকিয়ে দেব!"

কথা শেষ না হতেই মহুয়া বিদ্যুতের মতো দ্রুত গতিতে রডটি মিনির পেটে সজোরে ঢুকিয়ে দিল। মিনি এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল, তার চোখ কপালে উঠে গেল। রক্তে ভিজে গেল লাল বেনারসী শাড়ি। মিনি স্থির হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, তার নিঃশ্বাস চিরতরে থেমে গেল।

মহুয়ার চোখ স্থির। মিনিকে শেষ করে সে যেন এক কঠিন প্রতিজ্ঞার ভারমুক্ত হলো। গ্যাং-এর ছেলেগুলো তাদের নেত্রীর এই মর্মান্তিক পরিণতি দেখে ভয়ে জবুথবু হয়ে গেল।

এই সুযোগে আরিয়ান, যে এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়েছিল, সে একটি চেয়ারে বাঁধা রাহুলকে টেনে হিঁচড়ে অন্ধকার কক্ষ থেকে বের করে আনল।

"মহুয়া, থাম! তুই খুন করেছিস! পুলিশ আসবে! এবার তোর আর রাহুলের মুক্তি নেই!" আরিয়ান চেঁচিয়ে উঠল, তার হাতে একটি কাঁচের বোতল।

মহুয়া স্থির দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তার হাতে লেগে থাকা রক্তের দাগ যেন তার ভেতরের অগ্নিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

"আমার মুক্তি আমার হাতে আরিয়ান। আর তোর মতো কাপুরুষের সাথে আমার কোনো কথা নেই।" মহুয়া ধীরে ধীরে আরিয়ানের দিকে এগোলো।

আরিয়ান বোতলটি ছুড়ে মারল মহুয়ার দিকে। মহুয়া দ্রুত সরে গিয়ে রডটি উঁচু করে ধরে বোতলটি ভেঙে দিল। কাঁচের টুকরোগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।

এবার আরিয়ান আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না। সে রাহুলকে আরও শক্ত করে ধরে মহুয়াকে হুমকি দিল, "সামনে এলে রাহুলকে গুলি করব! আমার পকেটে পিস্তল আছে! তোর এই ধর্ষক স্বামীকে মরতে দেখতে চাস?"

মহুয়া এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রাহুল তখনো পুরোপুরি বাঁধনমুক্ত নয়, তার মুখে গোঁজা রুমালটা সরানো হয়নি।

"রাহুল আমার ভালোবাসা, আরিয়ান। ওকে তুমি কিছুই করতে পারবে না।" মহুয়ার চোখে তখন অসীম সাহস।

মহুয়া নিজের ডান হাত থেকে লোহার রডটি সজোরে আরিয়ানের দিকে ছুঁড়ে মারল। রডটি আরিয়ানের কাঁধ লক্ষ্য করে গেল এবং তার বাম কাঁধে তীব্র আঘাত করল। "আহ!" যন্ত্রণায় আরিয়ান পিস্তল ধরার কথা ভুলে গিয়ে কাঁধ চেপে ধরল। তার হাত থেকে পিস্তলটি দূরে ছিটকে পড়ল।

আরিয়ানের নিয়ন্ত্রণ আলগা হতেই মহুয়া দ্রুত রাহুলের কাছে ছুটে গেল। মহুয়া প্রথমে রাহুলের মুখের রুমালটি খুলে দিল।

মুক্ত হতেই রাহুল গভীর করে শ্বাস নিতে শুরু করল। তার ঠোঁট কাঁপছিল, চোখ দুটো আতঙ্কে বিস্ফারিত। গলা শুকিয়ে কাঠ, কথা প্রায় বের হচ্ছিল না।

"মহুয়া! তুমি... তুমি এসেছো!" রাহুল ভাঙা গলায় অস্ফুটে বলল। তারপর কোনোমতে সে মহুয়ার হাত শক্ত করে ধরল। তার চোখ দুটি তখন স্থির হয়ে ঘরের উত্তর দিক নির্দেশ করছিল।

মহুয়া তখনও তার হাতের বাঁধন কাটতে শুরু করেনি। রাহুল হঠাৎ অস্থির হয়ে তার হাত থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করল এবং ফিসফিস করে বলল তার কণ্ঠে ভয়, ঘৃণা আর অসহায়ত্বের এক মিশ্রণ:

"ওখানে... মহুয়া, ওখানে নিপাকে বেঁধে রেখেছে আরিয়ান। আমি... আমাকে এই চেয়ারে বেঁধে রেখে ওরা... ওরা নিপাকে ..

রাহুল আর কথা শেষ করতে পারল না। তার গলা ধরে এল। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল। মহুয়া দেখল, রাহুলের শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা কাঁপছে। তার চোখে এই মুহূর্তের মানসিক ট্রমা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

মহুয়ার হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। ধর্ষণ! এই শব্দটি মহুয়ার শিরায় শিরায় আবার আগুন ধরিয়ে দিল। যে কষ্ট সে নিজে ভোগ করেছিল এই মানুষটা আর আজ সেই একই বিভীষিকা তার বোনের উপর হতে দেখেছে?

তার মনে পড়ল সেই বীভৎস রাতের কথা যখন রাহুল তাকে জোর করে নিজের করে নিয়েছিল। সেই ভয়, সেই যন্ত্রণা, সেই অসহায়তা... সেই বঞ্চনার দগদগে ঘা আজও তার মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি।

আর আজ? নিপার উপর সেই একই বিভীষিকা নেমে এসেছে। যে কষ্ট মহুয়া নিজে দিনের পর দিন বয়ে বেড়িয়েছে, আজ সেই একই নৃশংসতা রাহুল, অসহায়ভাবে দেখতে বাধ্য হয়েছে!

মহুয়ার দৃষ্টি স্থির হলো রাহুলের দিকে। রাহুল তখন বাঁধনমুক্ত হয়েও যেন বিধ্বস্ত, তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়াচ্ছে। তার বোনের উপর নেমে আসা এই চরম অপমান আর বিপদের দৃশ্য তাকে ভেঙে দিয়েছে।

মহুয়ার মনে এক তীব্র জিজ্ঞাসা ও নৈতিক দ্বন্দ্বের ঝড় উঠল। আজ নিজের বোনকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে বলে রাহুলের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে? এই ভয়, এই যন্ত্রণার অনুভূতি এখন তাকে গ্রাস করছে।

কিন্তু রাহুল! সে নিজে যখন দিনের পর দিন সমাজের অসংখ্য মেয়ের জীবনের সাথে এমন নির্মম খেলা খেলেছে, তাদের পবিত্রতা নষ্ট করেছে, তাদের স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তখন সেই অসহায় মেয়েগুলোর কেমন কষ্ট হয়েছিল? সেই মেয়েদের মা, বাবা, ভাই-বোনেরা কেমন অসহনীয় যন্ত্রণা, অপমান আর সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়েছিল?

মহুয়ার মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল: এই চরম মানসিক যন্ত্রণা তো রাহুল নিজেই হাজারও পরিবারকে দিয়েছে! আজ প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধের চাকা কি তবে ঘুরতে শুরু করেছে? এই মুহূর্তে রাহুলের চোখে যে জল, তা কি তার অতীত পাপের ফল নয়?

মহুয়া কাঁপা হাতে শেষ বাঁধনটা কেটে দিল, কিন্তু তার মনে এই গভীর চিন্তাটা গেঁথে রইল আজ রাহুল নিজের কষ্ট বুঝতে পারছে, কারণ আঘাতটা তার নিজের পরিবারে এসেছে। এই বোধোদয় কি তার অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত?

তবে এই মুহূর্তে সেই নৈতিক হিসাব-নিকাশের সময় নয়।

সে দ্রুত সেই অন্ধকার কক্ষটির দিকে ছুটে গেল, যেদিকে রাহুল ইশারা করেছিল। রাহুল তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি, সে টলতে টলতে মহুয়ার পিছু নিল।

কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতেই মহুয়া টর্চের ক্ষীণ আলোয় এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে পেল। ঘরের উত্তর কোণে একটি ভাঙা চেয়ারে নিপাকে শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে।

দৃশ্যটি দেখে মহুয়ার সমস্ত রক্ত হিম হয়ে গেল। নিপার সারা শরীরে জামাকাপড় এলোমেলো কোনো কিছুই ঠিক জায়গায় নেই। এলোমেলো চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে, আর মুখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। সে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে, তার শরীর স্থির হয়ে গেছ। মনে হচ্ছে প্রতিরোধের চরম চেষ্টা করার পর সে জ্ঞান হারিয়েছে।

বাঁধা থাকা সত্ত্বেও চেয়ারের সাথে তাকে এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছে যে তার দেহটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নেই, বরং এক অসহায় বিকৃত ভঙ্গিতে কাত হয়ে আছে। দড়িগুলো তার কব্জি আর গোড়ালিতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

মহুয়া হাঁটু গেড়ে নিপার পাশে বসল। তার হাত কাঁপছিল। সে দ্রুত নিপার মুখে হাত রাখল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কি না বোঝার জন্য। নিপার শরীরটি ছিল অস্বাভাবিক শীতল।

"নিপা ! মহুয়া ফিসফিস করে ডাকল।

কিন্তু নিপা কোনো সাড়া দিলো না। তার চোখ সামান্য খোলা, দৃষ্টি শূন্য। মহুয়া দ্রুত তার আঙুল নিপার গলার ধমনীর ওপর রাখল কোনো স্পন্দন নেই। বুক ওঠানামা করছে না। নিপার চামড়ার নিচে যেন জীবনের উষ্ণতার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।

মহুয়ার হাত কেঁপে উঠল। সে বারবার চেষ্টা করল পালস বোঝার কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা।

রাহুল ততক্ষণে পাশে এসে নিপাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এই দৃশ্য তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে ছিল।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প