অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ২৫

🟢

নিপা হসপিটালের ব্যস্ততম ইনডোর বিভাগে এখন যেন এক চাপা যুদ্ধের আবহ। ইমার্জেন্সি রুম থেকে নতুন রোগীর স্ট্রেচার সবেমাত্র ভেতরে ঢুকেছে, এবং একই সাথে ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়ার শেষ মুহূর্ত চলছে। প্রতিটি মিনিট তার কাছে এখন সোনার চেয়েও দামি মনে হচ্ছে। একটার পর একটা ফাইল দেখা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া আর নার্সদের নির্দেশনা দিতেই সে ব্যস্ত।

ঠিক এমন সময়, পকেটে রাখা ফোনটা বারবার ভাইব্রেট করে চলেছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে আসিফের নামটা।

প্রথম দুইবার সে উপেক্ষা করল, মনোযোগ দিল রোগী দেখায়।তৃতীয়বার ফোনটা বাজার সময় সে বিরক্তি নিয়ে ঠোঁট কামড়াল। এরপর এলো চতুর্থ কল। ফোনের মৃদু গুঞ্জন তার কানের কাছে যেন এক উচ্চশব্দের সাইরেনের মতো লাগতে শুরু করল। করিডোরে তখন তীব্র আলোর নিচে মানুষের আনাগোনা, নিপা কোনোমতে একটি ফাঁকা কোণ খুঁজে নিয়ে বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে কলটি রিসিভ করল।

"হ্যালো, আসিফ? এখন না! আমি... " নিপার বাক্যটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে আসিফের কণ্ঠস্বর প্রায় ভেসে এলো।

"নিপা, তুমি. তাড়াতাড়ি হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসো! এখুনি! এক মুহূর্তও দেরি করো না!"

নিপা বলল আমি একটু পরে আসছি তুমি একটু বাহিরে অপেক্ষা করো।

আসিফ সবেমাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। সে একজন সদ্য পাশ করা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আসিফ।

কিন্তু এই কঠোর, যুক্তিবাদী ইঞ্জিনিয়ারটির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রাকচার’টি তৈরি হয়েছিল তিন বছর আগে, যার স্থপতি ছিল নিপা।

তাদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ ঘরোয়া আবহে। তিন বছর আগে আসিফ গিয়েছিল তার মামাতো বোনের বিয়েতে। আর সেখানেই, ঝলমলে আলোর নিচে, শাড়ি-গহনার ভিড়ে সে প্রথম দেখেছিল নিপাকে। সেই প্রথম দেখাতেই যেন দুটি ভিন্ন জগতের মানুষ একে অপরের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করল।

সেই থেকে শুরু হয় তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। তারা একে অপরের স্বপ্নকে উৎসাহ দিয়েছে, কঠিন পরীক্ষায় সাহস জুগিয়েছে এবং জীবনের প্রতিটা বাঁককে একসাথে পার করেছে। তাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটা নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা সেতুর মতো একদিকে আসিফের যুক্তির ইস্পাত, অন্যদিকে নিপার সহানুভূতির কোমল কংক্রিট, যা একে অপরের ভর বহন করে চলত।

অথচ, আজ যখন আসিফের সেই পরিচিত, শান্ত স্বরটির বদলে তীব্র আতঙ্ক ঝরে পড়ল ফোনে, তখন নিপা বুঝতে পারল, তাদের সম্পর্কের এই নিখুঁত কাঠামোটি হয়তো কোনো অজানা বাহ্যিক ফোর্সের কারণে হুমকির মুখে।

নিপা খুব দ্রুত কাজ শেষ করে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলো।তার পরনে থাকা সাদা অ্যাপ্রোনটা আজ যেন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে। সারাদিনের ব্যস্ততা, আর ক্লান্তির ছাপ তার মুখে স্পষ্ট হলেও, মনের ভেতরে একটি তাড়না তাকে দ্রুত টেনে আনলো বাইরের খোলা হাওয়ায়।

হসপিটালের ভেতরের জীবাণুমুক্ত, ভারী আবহাওয়া ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই তার চোখ খুঁজে নিল চেনা সেই দৃশ্যটি। গেটের ঠিক উল্টো দিকে, একটি পুরনো লোহার বেঞ্চে বসে আছে আসিফ। দুপুরের নরম আলোয় তার নিষ্পাপ, শান্ত মুখটা যেন এক অন্যরকম মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। কিন্তু আজ সেই চেনা শান্তিতে মিশে আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা।

মুহূর্ত দেরি না করে নিপা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল আসিফের দিকে। বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে ডাকলো, "আসিফ!"

আসিফ মাথা তুলে তাকাতেই নিপা আর কোনো কথা না বলে তার শীতল হাতটা আলতো করে নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। সেই পরিচিত স্পর্শে আসিফের শরীর সামান্য কেঁপে উঠলো।

"চলো, আমরা সামনের দিকে একটু হাঁটি," নিপা বলল।

আসিফও কোনো প্রশ্ন করলো না। নিপার হাতের মৃদু টানে সে উঠে দাঁড়ালো এবং তার হাত ধরে মন্থর পায়ে হাসপাতালের সীমানা পেরিয়ে সামনের নিরুদ্দেশ রাস্তার দিকে এগোতে শুরু করলো।

কিন্তু এই পথচলাটা আজ আর রোজকার মতো আনন্দময় বা উচ্ছল মনে হলো না নিপার কাছে।সাধারণত নিপাকে দেখতে পেলে আসিফের চোখে যে নিবিড় আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠত, আজ তার লেশমাত্র নেই। তার চওড়া কপালে আজ আনন্দের বদলে জমেছে এক ঘন বিস্ময়, এক অলিখিত প্রশ্নচিহ্ন। তার চেনা-জানা পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করেই অচেনা কোনো মোড় নিয়েছে, আর এই নতুন পথের প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে বিহ্বল।

হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলো। আসিফ খাবার অর্ডার করলো । কিন্তু নিপা তখন চুপচাপ বসে ছিলো ।তার ভেতরের তোলপাড় তখনো থামেনি। রেস্তোরাঁর রঙিন আলোর নিচেও আসিফের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে আর বিষণ্ণ লাগছিলো।

নিপা ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সংবরণ করল, কিন্তু ভেতরের প্রশ্নগুলো যেন তার মগজে হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল।

সে টেবিলের ওপর রাখা আসিফের হাতের দিকে চাইল ,হাতটা কেমন যেন স্থির, মুঠোটা সামান্য শক্ত, ঠিক যেন ডুবতে থাকা কোনো জাহাজ আঁকড়ে ধরার ভঙ্গিমা। নিপার মন তাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছিল।এই নীরবতা কি শুধু ক্লান্তি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর গোপন কথা, যা তাদের সম্পর্কের বাঁধনকেও আলগা করে দিতে পারে?

আসিফের এমন অবস্থা দেখে নিপা আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল তোমার কি হয়েছে খুলে বলো । তোমাকে আজ এমন দেখাচ্ছে কেন?

নিপার কথা শুনে আসিফ বলল- তেমন কিছু না ।আসলে আমি তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি ।

বিজ্ঞাপন

- একটা কেন , হাজার টা কথা তুমি আমাকে বলতে পারো।

-আমি.....

-বলো ? আমি কি!?

-আমি ___

-আমি তোমাকে ভালোবাসি। এম আই রাইট?

-আমি আমার খালাতো বোন মেহরুকে বিয়ে করেছি ।

নিপার ভেতরে মহাপ্রলয় সৃষ্টির জন্য আসিফের এই একটা কথায় যথেষ্ট ছিলো ‌।

সে নিথর হয়ে বসে রইল, যেন এইমাত্র তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। বিয়ে! মেহরু! এই দুটি শব্দ নিপার বহু যত্নে সাজানো স্বপ্নের বাগানকে এক লহমায় পুড়িয়ে ছাই করে দিল।

নিপা অনুভব করল, তার হৃৎপিণ্ড যেন তার বুকের পাঁজরের নিচে লাফাচ্ছে না, বরং বরফের মতো জমাট বেঁধে গেছে। এই মানুষটা, যার জন্য সে বহু রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে, যার প্রতিটি হাসি-কান্নাকে সে নিজের করে জানত, সে-ই তাকে এমন অচেনা, নির্মম আঘাত দিল!

তার চোখ ফেটে জল আসছিল না, কারণ শোকের প্রাথমিক আঘাতটা এতটাই তীব্র ছিল যে, অশ্রুও যেন পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। সে কেবলই ফিসফিস করে নিজেকে জিজ্ঞেস করল কেন? কেন তুমি আমাকে মিথ্যা স্বপ্নে আটকে রেখেছিলে?

আসিফ তখনো মাথা নিচু করে মুখ বন্ধ করে বসে আছে ,কিন্তু নিপার কাছে মনে হলো, সে যেন বহু দূরে, অন্য কোনো গ্রহের বাসিন্দা। মাঝখানে কেবলই এক অদৃশ্য, ভঙ্গুর কাঁচের দেয়াল।

নিপা আর আসিফের সাথে কথা বলার মত ভাষা খুঁজে পেলো না । তীব্র আবেগ ও অসহায়ত্বে তার চোখ ভরে এলো। চোখের কোণে জমা জল দ্রুত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সজোরে মুছে নিয়ে, সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। বুকফাটা যন্ত্রণা নিয়ে, মাথা নিচু করে সেখান থেকে প্রস্থান করলো।

আসিফ পেছন থেকে বার বার নিপাকে ডেকে যাচ্ছে কিন্তু নিপা তার কথায় কোন কর্ণপাত করছে না । সে তার মতো করে হেঁটে যাচ্ছে। তার মনে বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে । যে মানুষটা আমাকে পাগলের মত ভালোবাসতো সে আমাকে বিয়ে না করে অন্য মেয়েকে কি করে বিয়ে করতে পারে!

কেনো সে আমাকে বিয়ে করলো না ? আমার মধ্যে কি নেই যা ঐ মেয়েটার মধ্যে আছে? আমি কি তার থেকে এতোটাই অযোগ্য যে আমাকে বিয়ে করা যাবে না ।

মেয়েটির মন তখন যেন হাজারো অনিরীক্ষিত প্রশ্নের এক বিশাল ঝুড়ি, যা অদৃশ্য এক বোঝা হয়ে তার মস্তিষ্কে চেপে বসেছিল। সেই ভারে নুইয়ে পড়া অবস্থায় সে উদ্দেশ্যহীনভাবে কেবল হেঁটে চলছিল।

হটাৎ করে পেছনের একটা গাড়ি থেকে অপরিচিত পুরুষালি কন্ঠ ভেসে এলো - এই মেয়েটা ই তো তাই না ।

পাশ থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠে বললো হুম।

নিপাপেছনে তাকাতেই ঝড়ের বেগে দু-তিনজন ছেলে তাকে ঘিরে ফেললো, যেন তারা শিকারকে জালবন্দী করতে প্রস্তুত। পরিস্থিতিটির আকস্মিকতায় নিপা একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার চোখ বিস্ফারিত হলো বিস্ময় ও ভয়ে।

বিস্ময় কাটিয়ে ওঠার আগেই সে কর্কশ স্বরে ছেলেগুলোকে দ্রুত সরে যেতে বলল, কিন্তু তার কথায় কোনো কাজ হলো না। বরং ছেলেগুলো তার আদেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আরও ঘনিষ্ঠ হলো। নিপার প্রতিবাদের সুযোগটুকু না দিয়েই, তারা শক্তিশালী বাহু দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। তাদের বর্বর শক্তি এবং নিপার অসহায়তার মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা হলো না। এক মুহূর্তের মধ্যে, জোর করে টেনে হিঁচড়ে তাকে একটি অপেক্ষমাণ গাড়িতে উঠিয়ে নিল।

গাড়ির ভেতরে চোখ পড়তেই নিপা থমকে গেল। সেখানে বসে থাকা মেয়েটি যেন এক অদ্ভুত পরিচিতির ধাঁধা। নিপার মনে হলো সে তাকে হাজারবার দেখেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে কোনোভাবেই নাম বা মুখ মনে করতে পারছিল না; স্মৃতি যেন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল।

মেয়েটার কালো জিন্স প্যান্ট কালো শার্ট আর মুখে কালো মাস্ক পড়া ছিল । শুধু মেয়েটা নয় গাড়িতে বসে থাকা সবারই একই ড্রেস ।

এই সম্মিলিত অন্ধকার বেশভূষা পুরো গাড়ির অভ্যন্তরকে এক গোপন সংগঠনের আস্তানা বা অশুভ উদ্দেশ্যের মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরছিল, যা নিপার মনে আরও গভীর সন্দেহ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করল।

গাড়ির ভেতরে নিপার হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়ছিল। আতঙ্ক ও অজানা আশঙ্কায় সে বারবার মাথা ঝাঁকিয়ে এবং অস্পষ্ট ইঙ্গিতে প্রশ্নগুলো জানতে চাইছিল , তোমরা কারা? কেন আমাকে নিয়ে যাচ্ছো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?" তার অস্থির চোখগুলি একের পর এক মুখোশধারী ব্যক্তিদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারছিল, যেন সে তার নীরবতা ভেদ করে উত্তর আদায় করবে।

কিন্তু সেই চেষ্টা ছিল সম্পূর্ণ বৃথা। তার কোনো প্রশ্নই তাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই, এক নিষ্ঠুর নীরবতা তার মুখ চেপে ধরেছিল। দ্রুত ও কঠোর হাতে তার মুখে একটি শক্তিশালী পট্টি বা কাপড়ের বাঁধন পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন তার মুখ থেকে কোনো আর্তনাদ বা শব্দ বেরোনো অসম্ভব। নিপা অনুভব করলো যেন তার বাকস্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তার ভেতরে জমে থাকা তীব্র প্রতিবাদ ও ভয় এখন কেবল গলার গভীরে একটি অসহায় গোঙানির মতো আটকে থাকলো।

সবাই একটু কমেন্ট করে বলেন গল্প টা কেমন হয়েছে

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প