অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ২১

🟢

আজকে রাহুল সন্ধ্যা সাতটার দিকে হাসপাতাল থেকে ফেরার পর থেকেই তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। যেন দিনের পর দিন জমে থাকা রাগ আর অস্থিরতা তাকে ভিতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে তুলেছে। দরজায় হাত রাখতেই মহুয়া ছুটে এসে দরজা খুলে দিলো ,কিন্তু দরজা খোলার পর যে দৃশ্যটা ঘটলো, তা মহুয়া কল্পনাতেও আনতে পারেনি।

দরজা খোলামাত্রই রাহুল যেন রাগের ঝড়ে অন্ধ হয়ে গেল। কোনো কথা না বলে, কোনো কিছু না ভেবে এক ধাক্কায় মহুয়াকে সরিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। মহুয়া সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল না সে ভারসাম্য হারিয়ে ফ্লোরে জোরে ধপ করে পড়ে গেল। তার মাথার ডান পাশের অংশটা ফ্লোরে লেগে মুহূর্তেই ফেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাজা রক্ত গরমধোঁয়া নিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। ব্যথার তীব্রতায় মহুয়া চিৎকার করে উঠল । 'আ’হ... রাহুল!'

কিন্তু সেই আর্তনাদ যেন ঘরের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল। রাহুলের চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র কোমলতা নেই ।সে যেন শুনতেই পায়নি মহুয়ার চিৎকার।। রাগ আর সন্দেহের বশে পাগলের মতো ঘরময় ছুটে ছুটে মহুয়ার মোবাইল ফোন খুঁজতে লাগলো।

টেবিল, ড্রয়ার, আলমারি এক মুহুর্তের মধ্যেই সব এলোমেলো করে ফেললো তবুও কোথাও ফোনটি পেলো না ।

বারবার কল দিচ্ছিল সে, কিন্তু ফোন বন্ধ। এটা যেন রাহুলের রাগকে আরো বহুগুনে বাড়িয়ে দিলো।

রাহুল হাপাতে হাপাতে মহুয়ার সামনে এলো। মেয়েটা তখনো ফ্লোরে আধশোয়া অবস্থায় এক হাত মাথায় চেপে ধরে নিথর হয়ে পরে আছে আছে। রাহুল এক টানে তাকে টেনে তুলতেই মহুয়ার হাত থেকে ফোনটা পিছলে ফ্লোরে পড়ে গেল ।

আর সেই মুহূর্তেই মহুয়া যেন সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেললো… টলমল করে রাহুলের বুকে ঢলে পড়ল।

তখনই রাহুলের দৃষ্টি আটকে গেল মহুয়ার রক্তমাখা কপালে ।গা ছমছমে ভাবে বুঝলো, পুরো ফ্লোরজুড়ে রক্ত ছড়িয়ে আছে। রক্তের গন্ধে ঘর ভারী হয়ে উঠেছে।

হঠাৎ যেন পুরো পৃথিবী থমকে গেল রাহুলের।

তার ভেতরের রাগ মুহূর্তে হাওয়া হয়ে উড়ে গেল মহাশূন্যে। রাহুল অপরাধবোধে ভেঙ্গে পড়ল।।

আলতো করে মহুয়াকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার এনে শুইয়ে দিলো । নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলতে লাগলো - এই মহুয়া চোখ খোলো । খুব বেশি ব্যাথা পেয়েছো তাইনা ? আচ্ছা ঠিক আছে তুমি সুস্থ হয়ে আমাকে এর চেয়ে দ্বিগুণ ব্যাথা দিও । এখন একবার আমার দিকে তাকাও । ও সুইটহার্ট দেখো আমি আর একটুও রেগে নেই তোমার ওপর । এই পাগলি ওঠো ।

কিন্তু কথাগুলো আদৌ মহুয়ার কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে কি না রাহুলের সেই ধারণা ছিল না। সে শুধু নিজের ভাঙা গলায়, কাঁপা শ্বাসে, অসংলগ্ন কথাগুলো বলেই যাচ্ছিল। যেন শব্দগুলো তার মনের ভেতরের অপরাধবোধকে ধুয়ে ফেলতে চাইছে। অথচ মহুয়া নিশ্চুপ হয়ে আছে। কোনো সাড়া নেই, কোনো নড়াচড়া নেই। যেন সমস্ত ব্যথা আর যন্ত্রণা তাকে এক অচেতন অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছে।

রাহুল কাঁপা হাতে তাকে বুকে থেকে আলতো করে নামিয়ে রেখে ছুটে গেল ফার্স্ট এইড বক্স আনতে। ফিরে এসে আলতো করে মহুয়ার মাথা তুলে নিলো তার কোলে। সারা মুখে তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আর উদ্বেগ জমে উঠেছে।

সাবধানে তুলোর উপর অ্যান্টিসেপ্টিক নিয়ে সে ক্ষতস্থানে স্পর্শ করতেই মহুয়ার নিস্তেজ মুখে এক ক্ষণিকের যন্ত্রণা খেলে গেল ।যেন খুব ক্ষীণ একটি ছটফট, মহুয়ার সেই ছটফটানিই রাহুলকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ধীরে ধীরে ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো।

তারপর নিজের হাতে ফ্লোরে পড়ে থাকা র ক্ত মুছে ফ্লোর পরিষ্কার করলো।

রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই।অন্ধকারে ঢেকে গেছে ধরনী । চারিদিকে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। নিস্তব্ধতা এমন ঘন হয়ে নেমে এসেছে, যেন শ্বাস নিলেও শব্দ হয়। ঘরের ম্লান আলোয় রাহুলের মুখটা বিবর্ণ দেখাচ্ছে। সে মহুয়াকে দু’হাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রেখেছে ঠিক যেন ছোট্ট, পাখিটাকে আগলে রাখছে। মনে হচ্ছে, একটু আলগা করলেই মহুয়া যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, অথবা এই অন্ধকার তাকে নিয়ে গিলে ফেলবে।

রাহুলের কাঁপা আঙুলে বারবার মহুয়ার গাল স্পর্শ করে দেখছে। বারবার পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মহুয়ার চোখ দুটো যেন পাথরের দরজার মতো শক্ত হয়ে বন্ধ হয়ে আছে। কোনো সাড়া নেই মহুয়ার।

রাহুলের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ বরফশীতল একটা স্রোত নেমে এলো ।এমন ঠাণ্ডা, যা মুহূর্তেই তার হাত-পা অবশ করে দিলো। মনে হলো কেউ যেন বুকের গভীরে বরফ চুঁইয়ে দিয়ে গেছে, সেই শীতলতা ধীরে ধীরে তার শরীরময় ছড়িয়ে পড়ছে। হৃদপিণ্ডটা কাঁপতে কাঁপতে থেমে যাবে মনে হচ্ছে। শ্বাসের ভেতর ভয়, শ্বাসের বাইরে আতঙ্ক।এ যেন মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার আগের অচেনা শীতল অনুভূতি, যা রাহুলকে ভিতর থেকে জমাট বরফের টুকরো বানিয়ে ফেলছে।

কিন্তু ঠিক তখনই নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে মহুয়া অত্যন্ত ক্ষীণভাবে একবার নড়ে উঠল।

রাহুল যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না। তার বুকে থমকে গেল । হৃদস্পন্দন হঠাৎ জোরে লাফিয়ে উঠল। মহুয়ার চোখের পাতা কেপে উঠলো। নিঃশ্বাসটা একটু ভারী হয়ে উঠল যেন।

রাহুলের বুকের ভেতরের বরফশীতল স্রোতটা মুহূর্তেই যেন গলে উষ্ণতায় পরিণত হলো।সে মহুয়াকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো । দু’হাতে মহুয়ার মুখটা ধরে তুলে ফিসফিস করে ডাকল,

“মহুয়া এই মহুয়া… শুনতে পাচ্ছো? তুমি ঠিক আছো তো সুইটহার্ট ? আমাকে ভীষণ টেনশনে ফেলে দিয়েছিলে। "

মহুয়া কোন কথা বললো না । মাথায় হালকা ব্যথা অনুভব করছে তাই মাথায় হাত দিতেই চমকে উঠলো। আর তখনই মনে পড়লো সন্ধ্যার ঘটনা। রাহুল তাকে ধাক্কা দিয়েছিলো ।

রাহুলের ওপর তার ভীষণ রাগ হলো । কি কারণে তাকে এমন করেছে সেটাও মহুয়ার অজানা।

সে রাহুলের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে কিন্তু রাহুল কিছুতেই তাকে ছেড়ে দিচ্ছে না।

মহুয়া এবার দাঁতে দাঁত চেপে বললো ছাড়ুন আমাকে । আঘাত দিয়ে কেন আবার আলগা পিড়িত দেখাতে আসছেন । এই ঘর থেকে বেরিয়ে যান নয়তো আমি বের হয়ে যাবো সারা জীবনের জন্য। এই বলে মহুয়া উঠে চলে আসতে নিলে পিছনে থেকে রাহুল তার হাত ধরে ফেলে..

-আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি সুইটহার্ট। যখন দেখেছি তুমি আরিয়ানের সাথে কথা বলছো । তোমার প্রতি আমার এতো পরিমাণ রাগ হয়েছিল যে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলাম ।

মহুয়া রাহুলের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো ।

- এক মিনিট মি. রাহুল চোধুরী । আপনি জানলেন কি করে আমি আরিয়ানের সাথেই কথা বলেছি । সিসি ক্যামেরায় তো আর দেখা যাবে না যে আমি কার সাথে কথা বলছি। আমি তো একবারও আরিয়ানের নাম উচ্চারণ করিনি তাহলে.....

মহুয়ার কথা শেষ না হতেই রাহুল ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মেশানো একটুকরো হাসি ফুটিয়ে বলল- তোমার পেছনে জ্বীন লাগিয়ে রেখেছি সুইটহার্ট তুমি যখন যেটা করো সেই জ্বীনটা আমাকে গিয়ে সব বলে দেয় ।

মহুয়া ভ্রু সামান্য কুঁচকে তার দিকে তাকাল। রাহুলের এই বানোয়াট কথা মহুয়ার বিন্দু মাত্র বিশ্বাস হলো না ।

- আপনার এসব কথা শুনলে কোনো গাধাও বিশ্বাস করবে না । তাই এগুলো আমার কাছে বলবেন না।

সত্যি করে বলুন আপনি কিভাবে জানলেন যে আমি আরিয়ান এর সাথে কথা বলেছি।

রাহুল মহুয়ার কথার কোন উত্তর না দিয়ে সোজা মহুয়াকে জড়িয়ে ধরে বললো - এসব কথা এখন থাক । তোমার এখন রেস্ট নেওয়া দরকার সুইটহার্ট ।

কিন্তু রাহুলের বলা এই মিষ্টি মিষ্টি কথা, মহুয়ার জমাট বাঁধা রাগের দেয়াল ভেদ করতে পারল না। তার চোখে তখন ঝড় বইছে, আর বুকের ভেতরে দমচাপা কষ্টের আগুন জ্বলছে ।এক মুহূর্তে যেন সব সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল মেয়েটার।

রাহুল একটু এগিয়ে এসে হাত বাড়াতেই মহুয়া হঠাৎ জোরে ধাক্কা দিলো। রাহুল ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের দিকে টাল খেয়ে পড়ে গেলো মেঝেতে। ধাক্কার শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল, কিন্তু মহুয়ার চোখে কোনো দয়া, কোনো দ্বিধা ছিল না ,শুধু এক আকাশ সমান অভিমান হলো তার।

এক দৌড়ে সে দরজার দিকে গেল। হোঁচট খাওয়ায় চুলগুলো মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়লো কিন্তু সেসবে তোয়াক্কা না করে হাঁপাতে হাঁপাতে দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

শরীরটা রাগে অভিমানে কাঁপছে, চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু সে থামল না।

রাহুল ততক্ষণে উঠে তার পিছু ছুটল।

“মহুয়া, থামো! প্লিজ থামো, কথা তো শোনো!”

কিন্তু মহুয়া যেন কিছুই শুনল না। বারান্দা পেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে গেটের দিকে ছুটে গেল সে। বাইরে যাওয়ার ঠিক আগে পিছনে ফিরে তাকালো একবার ।সেই দৃষ্টিটা রাগে-অভিমানে ভরা, আর যেন এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দিল রাহুলের দিকে।

গেটের বাইরে গিয়েই সে ধপ করে দরজাটা টেনে লাগিয়ে দিলো।

বিজ্ঞাপন

রাহুল বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলল,

“মহুয়া, শোনো! প্লিজ, এমন করে যেয়ো না! আমি ভীষণ কষ্ট পাবো সুইটহার্ট।"

কিন্ত মহুয়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। কাঁপা পায়ে মেইন রোডের দিকে হাঁটা ধরল। রাস্তার বাতিগুলো তার ছায়াকে লম্বা করে ফেলছে।

রাতের হাওয়া ধীরে ধীরে বয়ে এসে তার চুলগুলোকে মৃদু ঝড়ের মতো উড়িয়ে দিচ্ছিল। এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলের ফাঁকে চোখের পানি শুকিয়ে লবণ দাগ রেখে গেছে। কিন্তু সে চোখের পানি মুছলো না।

মেইন রোডে পৌঁছে সে চারদিকে তাকিয়ে গুটিয়ে আসা কান্নাটা আড়াল করার চেষ্টা করল।

ঠিক তখনই একটা রিকশা ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল।

মহুয়া কোনো কথা না বলেই উঠে বসল।

রিকশা চলতে শুরু করল, আর পেছনে ফেলে গেল রাহুলের অসহায়, ভাঙা দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ চেহারাটা। তবুও মনে একটুও মায়া হলো না রাহুলের জন্য । শুধু মনে হলো সে একজন পাষান।

অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ

রাত তখন প্রায় বারোটার কাছাকাছি। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আছে। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে এক আভিজাত্য রিসোর্টের বারান্দার নরম সোনালি আলোয় দাঁড়িয়ে আছে তামিমা আর রায়হান চৌধুরী। আলো-আঁধারির সেই পরিবেশে তামিমার মুখ ছায়ায় ডুবে আছে।

আজ রায়হান চৌধুরীকে যেন আরও বেশি অস্থির লাগছে । মনে হচ্ছে কোনো ভারী চিন্তা তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছে মহাসমুদ্রের অতল গহ্বরে । ঠান্ডা বাতাসে তার মাথার চুলগুলো হালকা নড়ছে, কিন্তু তার মন যেন বরফের মতো জমে আছে, আর অদ্ভুত এক অজানা ভয়ের ছায়ায় ঢাকা।

তামিমা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে রায়হান চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল -

- আপনি কি আমাকে বউ হিসাবে মেনে নিবেন নাকি আমি সুইসাইড করতে বাধ্য হবো রায়হান চৌধুরী ?

আর সুইসাইড নোটে অবশ্যই লিখে যাবো আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী আপনি।

তামিমার কথা শুনে রায়হান চৌধুরী একটু অবাক হয়ে গেল । সে কি বলবে ভেবে উঠতে পারছে না । মেয়েটা মারা গেলে তার কোন সমস্যা হবে না । কিন্তু যদি সবাই যেনে যায় যে তার সাথে মেয়েটার সম্পর্ক ছিল তাহলে তো. মানসম্মান সব শেষ হয়ে যাবে আমার ।

আমতা আমতা করে মেয়েটাকে বলল -তুমি তো চাইলেই বাচ্চাটা নষ্ট করতে পারো তামিমা!

তামিমার মাথায় যেন হঠাৎ করেই পুরো আকাশটাই ভেঙে পড়ল রায়হান চৌধুরীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সেই নিষ্ঠুর বাক্য শুনে।

মেয়েটার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল, ধীরে ধীরে অশ্রুতে ভরে উঠতে লাগল যেন ভেতরের সমস্ত ব্যথা চোখের জল হয়ে পথ খুঁজে নিচ্ছে। চোখের পানির সেই চিকচিকে স্তরটা বারান্দার হালকা আলোয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল, আর মনে হচ্ছে আর এক মুহূর্ত দেরি হলেই সেই অশ্রুধারা সবকিছু প্লাবিত হয়ে যাবে।

ভাসা ভাসা চোখে রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে তামিমা বলল- আপনি এটা কি বলছেন মি. রায়হান চৌধুরী । আপনার মাথা ঠিক আছে তো ? এটা আমার প্রথম সন্তান, আমি কি করে এটা নষ্ট করতে পারি বলেন? এই কথাগুলো বলতে আপনার বুক একটুও কাপলো না । আপনি কি মানুষ না অন্য কিছু ।

এসব কথা যেন রায়হান চৌধুরীর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে । তার নজর তো শুধু তামিমার শরীরে আটকে আছে ।

পিঙ্ক কালারের ওপর ব্ল্যাক কালার হাতের কাজ করা জর্জেট থ্রিপিস পরে মেয়েটিকে একদম পরির মত লাগছে । হালকা বাতাস এসে খোলা চুলগুলো উড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

রায়হান চৌধুরী এক ধ্যানে সেদিকেই তাকিয়ে আছে । মনে হচ্ছে চোখের পলক পড়লেই মেয়েটা হারিয়ে যাবে।

এরকম করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তামিমা তেড়ে এসে রায়হান চৌধুরীর শার্টের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো - আমার প্রশ্নের উত্তর দিন ..… এই মুহূর্তে নিজের লা'ল'সা দমিয়ে রাখুন ।

কিন্তু রায়হান চৌধুরী সেদিকে পাত্তা না দিয়ে তামিমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিলো ।

তামিমার রাগটা এবার চরম সীমায় পৌঁছে গেলো। সে এক ধাক্কায় রায়হান চৌধুরীকে সরিয়ে দিয়ে বললো অনেক ভোগ করেছেন আমায় এবার ত্যাগ করুন । এই মুহূর্তে আমাকে বিয়ে করুন নয়তো আমি এখনি এই দশ তলা ভবন থেকে ঝাঁ প দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিবো।

-প্লিজ তামিমা তুমি বাচ্চাটা নষ্ট করে দাও । তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করব।

- যে পুরুষ মাতৃত্বের মর্যাদা দিতে জানে না তা সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই ।

এই বলে তামিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে রায়হান চৌধুরী তাকে জাপটে ধরে আবার ঘরে নিয়ে এলো।

-আমি এখনি এখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিবো। ছাড়ুন আমাকে।

-এখনই বিয়ে করবো তামাকে ।

এই বলে রায়হান চৌধুরী কার কাছে যেন ফোন দিলো ।

প্রায় এক ঘন্টা পর সেখানে কাজি সাহেব কে দেখে তামিমার বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। হাত পা কেমন যেন অসাড় হয়ে গেল।

এতো দিন যতই বিয়ে বিয়ে করুক না কেন কিন্তু এখন এই মূহুর্তে তার মনে হচ্ছে সে কি করে এই বয়সের একটা মানুষ কে বিয়ে করবে । আবার ভাবছে এটা ছাড়া তার আর কোন উপায় নেই। সে যে একেবারে নিরুপায় হয়ে গেছে।

আলতো করে পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল -তোর জন্য আমি সব করতে পারি । আমি যদি এখন এই মানুষটাকে বিয়ে না করি তাহলে তুই যে আমার মতোই একদম অসহায় হয়ে যাবি রে। তুই যাতে একটা আশ্রয় পাশ সে জন্যই বিয়েটা করছি । নয়তো এখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিতাম।

এই বলে চোখের পানি মুছতে মুছতে কাবিননামায় সই করে দিলো ।

কান্না যেন এবার আর কোনো বাঁধ মানছিল না মেয়েটার।

দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা কষ্টগুলো যেন একসাথে পথ খুঁজে বেরিয়ে এলো। তার চোখ দু’টো হঠাৎ করেই নদীর মতো উথাল পাথাল হয়ে উঠল। গলার ভেতর জমে থাকা সমস্ত হাহাকার বেরিয়ে এসে কাঁপিয়ে দিল পুরো শরীরটা।

হাত দু’টো কাঁপছিল, বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দে যেন পৃথিবীর সমস্ত যন্ত্রণাকে জানিয়ে দিচ্ছিল সে

“আমি আর পারছি না… সত্যিই পারছি না…”

রায়হান চৌধুরী একপাশে দাঁড়িয়ে নিরবে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছে ।

একটু পরে তামিমার পাশে এসে বললো এবার শান্তি পেয়েছো ? আমার মান ইজ্জত সব ধুলোই মিশিয়ে দিয়ে ! ফুর্তি করো এখন।

এই বলে চুলের মুঠি ধরে এক ধাক্কায় মেঝেতে ফেলে দিলো । মেয়েটা ব্যাথায় চি,ৎকা,র। করে উঠলো ।

এখন মেয়েটার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে এর জন্য তো আপনি দায়ী। তাহলে আমাকে কেন দোষারোপ করছেন।

কিন্তু কথাগুলো আর মুখ দিয়ে বের হলো না ।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প