চেয়ার সামান্য পিছনে ঠেলে প্রেসক্রিপশনের কাগজটা সামনে রাখল।কিন্তু মাথার ভেতর প্রশ্নটা তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে এই ‘তামিমা’ কে?
আর কেনই বা তাকে দেখে রাহুলের বুকটা এভাবে কাঁপলো?
কিন্তু সেসবে তোয়াক্কা না করে রাহুল মেয়েটাকে বললো কি সমস্যা তোমার?
মেয়েটি চুপচাপ বসে ছিল। নিকাবের আড়াল থেকে তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা পর্যন্ত রাহুল শুনতে পাচ্ছিল।
রাহুল যখন রোগের কথা জানতে চাইল, মেয়েটা ধীরে মাথা নুইয়ে ফেলল।
কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল-“গত কয়েক দিন ধরে… আমার কিছু সমস্যা হচ্ছে… যেগুলো সাধারণত প্রেগন্যান্সি থাকলে হয়।”
কথাটা বলেই মেয়েটি আঙুল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল, যেন নিজের নার্ভাসনেস লুকোতে চাইছে।
রাহুল মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।তামিমার কণ্ঠে যেমন এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব, তেমনি একটা লুকোনো ভয় আছে ,যা রাহুলকে আরো বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
চোখের সামনে যেন এক মুহূর্তে অনেকগুলো প্রশ্ন ভেসে উঠল।এই মেয়েটা কে? এর জীবনে কি ঘটছে? এত ছোট বয়সে এমন অবস্থায় সে কেন এসেছে?
কিন্তু প্রশ্নগুলো আর করা হলো না।
পেশাদার মনোভাব বজায় রেখে রাহুল গলা পরিষ্কার করে বলল-
“আচ্ছা, ব্যাপারটা ঠিক আছে। কিছু টেস্ট করতে হবে। সেগুলোর রিপোর্ট দেখেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
কথা বলতে বলতে সে দ্রুত প্রেসক্রিপশন প্যাডে লিখতে শুরু করলো।
প্রতিটি পরীক্ষার নাম সযত্নে লিখে, পাশে টিক চিহ্ন দিয়ে দিল।
কিন্তু মনে হচ্ছিল ভেতরে কোথাও যেন একটা অচেনা অস্থিরতা কাজ করছে। কাগজটা তামিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে রাহুল আরও বলল-
“এই টেস্টগুলো আজকেই করিয়ে নেবেন। আর রিপোর্ট আসার পর গাইনী ডাক্তারকে দেখাবেন। উনারা বিস্তারিত দেখে সঠিক সিদ্ধান্ত দেবেন।”
তামিমা ধীরে মাথা নাড়ল।
তার চোখে স্পষ্ট দেখা গেল ভয়, লজ্জা, আর অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।
রাহুল জানে, সে পেশাগতভাবে শুধু রোগী দেখছে…
তবুও তামিমার এই অদ্ভুত পরিচিত মুখ, তার কাঁপা কণ্ঠ, আর নামের অচেনা পরিচয় সব মিলিয়ে রাহুলের ভেতরে একটা অজানা দীর্ঘশ্বাস জমে উঠলো।
কেন এই মেয়েটিকে দেখে এমন অনুভূতি হচ্ছে?
কেন মনে হচ্ছে তার জীবনের সঙ্গে কোথাও যেন লুকিয়ে আছে একটি অচেনা সংযোগ?
পরক্ষণেই মনে হলো কালকে রাতের কথা । রাহীর কথা। রাহীও তো প্রেগন্যান্ট ছিল…
এই উপলব্ধি তাকে বিদ্যুতের মতো ঝাঁকুনি দিল।একটা ভারী নিঃশ্বাস বুকের ভিতর জমে থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল,যেন দীর্ঘদিনের চাপা ব্যথা হঠাৎ করেই ফুঁড়ে উঠছে।
সমাজ, পরিবারের লোকজন কেউই তো তার আর আমার অস্তিত্বকে মেনে নেয়নি । তাহলে ও কেমন করে একা এসব সামলে নিয়ে অস্তিত্বটাকে আগলে রেখেছিল ! তার ভীষণ কষ্ট হয়েছিলো তাই না? আজ যদি ও বেঁচে থাকতো তাহলে ওকে আর কোথাও যেতে দিতাম না । একেবারে বুকের গভীরে আগলে রাখতাম ।
এসব ভাবতে ভাবতে রাহুলের ভেতরটা হঠাৎই কেমন যেন ফাঁপা হয়ে গেলযেন কেউ তার বুকে অদৃশ্য ছুরি চালিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরটা খালি করে দিচ্ছে। এক গভীর শূন্যতা তাকে মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাসহীন করে তুলল।
হৃদয়ের ঠিক মাঝখানেএক ধরনের ঝাঁঝরা ব্যথা জমে উঠল যা চিৎকার করতে পারে না,কাঁদতে পারে না,শুধু নীরবে রক্তক্ষরণ করে।
কিন্তু এই ভাবনা টা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না । আরেকটা রুগির সিরিয়াল পরে গেল।
সারাটা দিন গেল মহুয়াকে একটা বারের জন্যও ফোন করেনি রাহুল । ইচ্ছে করেই করেনি । মহুয়ার একটা কথা রাহুলের ভীষণ খারাপ লেগেছে।
বার বার সেটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে -আমি কখনোই আপনার অস্তিত্ব পেটে ধরবো না ।
কথাটা মনে হতেই রাহুলের বুকটা কেমন করে উঠল।
আটকে থাকা শ্বাস গলার কাছে এসে থমকে গেল।মনে হলো, যেন কোনো অচেনা তীর সরাসরি এসে বিঁধেছে হৃদয়ের সবচেয়ে কোমল স্থানে।
তারপরেও ফোনটা বের করে ফোন দিলো মহুয়াকে ।
কিন্তু বার বার ফোন দেওয়ার পরেও ফোন রিসিভ করছে না দেখে রাহুল একটা মেসেজ দিলো- সুইটহার্ট তুমি এখন কি করছো?
একটা মেসেজ দেওয়ার পরে আবার আরেকটা মেসেজ দিলো -আমি নিপাকে বলছি তোমাকে খাবার দিয়ে আসতে । খাবার খেয়ে নাও আর তৈরি থেকো আমার অস্তিত্ব পেটে ধরার জন্য । এক ঘন্টার মধ্যে আমি আসছি।
মহুয়া তখন অচেতন অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে আছে ।
তার লম্বা চুলগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে,মুখটা ফ্যাকাশে, নিঃশ্বাস যেন খুবই ক্ষীণ হয়ে গেছে। ঘরের জানালা দিয়ে ঢোকা হালকা চাঁদের আলো মহুয়ার গালের ওপর পরে এক অদ্ভুত মলিন ছায়া ফেলছে।
ফোন টা এক সাইডে পরে আছে । সেদিকে কোন খেয়াল দিতে পারছে না ।
নিপা এসে অনেকবার দরজা ধাক্কা দিয়েছে কিন্তু ভেতরে থেকে কোন সারা না পেয়ে সে চলে গেছে । মনে করেছে মহুয়া হয়তো ঘুমিয়েছে তাই সে চলে গেছে।
রাত দশটার দিকে রাহুল এসে বার বার দরজা ধাক্কা দেওয়ার পরেও মহুয়া দরজা খুলছে না।
-মহুয়া প্লিজ দরজা খোলো ।
কিন্তু ভেতর থেকে কোন সারা শব্দ নেই। রাহুলের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে ভিতরে কিছু একটা হয়েছে । সে নিপাকে ফোন করে বললো বাবার সাথে একটু গল্প জুড়ে দে আর আমি দরজাটা ভেঙ্গে ফেলি ।
নিপা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- ভিতরে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হয়েছে । নয়তো মহু দরজা খুলবে না কেন?
রাহুল আর বেশি কথা না বলে ফোন রেখে দিলো ।
নিপা তার বাবার ঘরে গিয়ে বাবার পাশে বসলো । রায়হান চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল মারে বিয়ে শাদি করবি না নাকি ? বয়স তো অনেক হয়ে গেল এবার বিয়েটা করে ফেল ।
- মনের মতো ছেলে পেলে তবেই বিয়ে করবো বাবা?
বাবা আমি যদি বলি আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি । তাহলে তোমরা তাকে মেনে নেবে?
রায়হান চৌধুরী বলল- আজ কাল তো এগুলো কমন ব্যাপার রে মা । তুই একজন এমবিবিএস ডাক্তার । তুই কোন ছেলেকে ভালোবাসতেই পারিস এতে মেনে নেওয়ার কি আছে?
- পরে যেন বলো না যে তুমি বিয়েতে রাজি নয় ।
-না না এই কথা কেন বলবো । তুই ছেলেটাকে একবার আমার সাথে দেখা করাস।
নিপা মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বললো ঠিক আছে বাবা আমি কালকেই তোমাকে আসিফ এর সাথে দেখা করাবো।
এখন তাহলে আসি বাবা।
রায়হান চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো আচ্ছা মা।
নিপা ঘরের বাইরে যেতেই রায়হান চৌধুরীর ফোন বেজে উঠলো। ফোনের ওপর তামিমা নামটা ভেসে উঠলো । রায়হান চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বললো এই মেয়েটা এখন কেন ফোন দিয়েছে ? রায়হান চৌধুরী একবার বাইরে দেখে নিলো ঘরের আশেপাশে কেউ আছে কিনা । কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে সে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্নাভেজা কন্ঠে তামিমা বলল- কেন এমন করলেন আমার সাথে মি. রায়হান চৌধুরী কেন এমন করলেন? আমি এখন সমাজে মুখ দেখাবো কি করে ।
এপাশ থেকে রায়হান চৌধুরী বলল-তোমার কি হয়ে...... এটুকু বলতেই রওশন আরা বেগম ঘরে ঢুকলো ।
রায়হান চৌধুরী তারাতাড়ি করে ফোনটা কেটে দিলো ।
রওশন আরা বেগম বলল-কে ফোন দিয়েছে এতো রাতে ?
রায়হান চৌধুরী আমতা আমতা করে বলল আসলে কলেজের একটা। শিক্ষাবৃত্তির ব্যাপারে কথা বলছিলো।
-ওহ।
এতোক্ষণে রাহুল দরজাটা ভেঙ্গে ফেলে ঘরে ঢুকে দেখে মহুয়া অচেতন অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে আছে।
সে তারাতাড়ি করে মহুয়ার কাছে এসে মহুয়ার গায়ে হাত দিয়ে দেখে সারা শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। রাহুল একবার চেক করে নিলো মহুয়া বেঁচে আছে কি না ?
দেখলো মহুয়া বেঁচে আছে ।
সে তারাতাড়ি মহুয়ার জ্ঞান ফিরনোর চেষ্টা করলো । অনেকবার চেষ্টা করার পরে মহুয়ার জ্ঞান ফিরলো । রাহুল মহুয়াকে একেবারে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
-সুইটহার্ট তোমার কি হয়েছে ? তুমি এমন করছো কেন একবার চোখ খোলো জান পাখি । এই দেখো আমি এসেছি তোমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবো না । এই পাগলি চলো একসাথে ডিনার করবো।
কিন্তু মহুয়ার জ্ঞান ফিরলেও সে ঠিক মতো কথা বলতে পারছে না । একটু পর পর মহুয়া আবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।
রাহুল অনেক্ষণ মহুয়ার মাথায় পানি দিয়ে দিলো । প্রায় এক ঘন্টা পর মহুয়া একটু একটু করে কথা বলছে । এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি মহুয়া ।
রাহুল তাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে এক মুহুর্তও ছেড়ে দিচ্ছে না , মনে হচ্ছে ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে সে ।