অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ২৩

🟢

নিপা তখনও ঘুমের গভীরে ডুবে আছে। জানালার ফাঁক গলে ভোরের আলো ধীরে ধীরে তার ঘরে ঢুকে পড়লেও তার চোখের পাতা নড়ে না। বুকের ওঠানামা শান্ত, মুখে শিশুসুলভ এক ধরনের নিশ্চিন্ততা ,যেন পৃথিবীর কোনো অশুভ সংবাদ আজ তার কাছে পৌঁছাবে না। তার স্বপ্নের ভেতর সবই স্বাভাবিক, সবই চেনা।

নিপার কল্পনাতেও আসেনি যে আজকের দিনটা তার জীবনের মানচিত্র বদলে দেবে। যে বাবা প্রতিদিন সকালে তাকে ডাকতেন, আজ তিনি নতুন এক জীবনের পথে হাঁটবেন; আর যে মায়ের কণ্ঠে সে ঘুম ভাঙার গান শুনত, সেই মা নীরবে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন চিরতরে। এসব কিছুই তখনো তার অজানা।

রোজকার মতোই সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে, যেন সময় আজও তার প্রতি দয়ালু থাকবে। অথচ সেই সময়ই নিঃশব্দে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সকালটা প্রস্তুত করছে।

বাহিরের অস্বাভাবিক হৈচৈ, কান ফাটানো চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ির শব্দে হঠাৎ করেই নিপার ঘুম ভেঙে গেল। বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগল তার, যেন অচেনা কোনো আশঙ্কা ঘুমের ঘোর ভেঙে তাকে টেনে তুলেছে। চোখ দুটো ঘুমে ভারী হয়ে আছে এখনও, মাথা ঝিমুনি ভরা, তবু অজানা ভয়ে সে আর শুয়ে থাকতে পারল না।

খোলা চুল, এলোমেলো পায়ে সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। উঠোনজুড়ে মানুষের ভিড়, ফিসফিস আর কান্নার শব্দে বাতাস ভারী হয়ে আছে। নিপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার চোখ আটকে গেল সেই দৃশ্যে কয়েকজন মানুষ তার মাকে ধরে ঘর থেকে বের করে আনছে। মায়ের নিথর শরীর, নিস্তব্ধ মুখ, আর চোখ বুজে থাকা সেই চেনা মানুষটা আজ কেমন অচেনা লাগছে।

কেউ মায়ের হাত ধরেছে, কেউ পা ।নিপা শুধু দাঁড়িয়ে আছে বোবা হয়ে। বুঝে উঠতে পারছে না, কেন মাকে এভাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটু পরেই কারো মুখ থেকে ভেসে এলো চাপা কণ্ঠে বলা কথা“শেষ গোসলের জন্য নিয়ে যাচ্ছে।”

শব্দগুলো নিপার কানে ঢুকে বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বসে গেল। মুহূর্তেই তার চারপাশের সবকিছু ঘোলাটে হয়ে এলো।

যেন সময়টা হঠাৎ থমকে গেল নিপার চারপাশে। শব্দ, মানুষ, কান্না সবকিছু একসাথে মিলেমিশে ঝাপসা হয়ে গেল তার চোখের সামনে। মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খেতে লাগল -শেষ গোসল? এই কথার মানে কি তবে সত্যিই…?

নিপার পা দুটো আর তাকে ধরে রাখতে পারল না। মাটিতে বসে পড়ল সে, হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল উঠোনের ভেজা মাটি। বুকের ভেতর জমে থাকা বাতাস যেন একসাথে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ এক চিৎকারে

“মা....আ!”

কিন্তু সেই ডাক আর কারো কানে পৌঁছাল না। সবাই ব্যস্ত, সবাই ছুটছে নিজেদের নিয়মে। কেউ তাকে ধরে তুলতে এলো, কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কাঁদিস না মা… আল্লাহর ইচ্ছা।” অথচ নিপা কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। তার চোখ দুটো শুধু মায়ের নিথর মুখটার দিকেই আটকে আছে যে মুখটা একটু পরেই সাদা কাপড়ে ঢেকে ফেলা হবে, যাকে আর কখনো ‘মা’ বলে ডাকা যাবে না।

**

ভোরের আলো তখনও ঠিকভাবে ঘরে ঢোকেনি। রাতের ক্লান্তি, কান্না আর না বলা কথাগুলো মিলেমিশে ঘরটা ভারী করে রেখেছে। মহুয়া আধচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে, চোখ বুজলেও ঘুম আসছে না। পাশে রাহুল নিঃশব্দে শুয়ে আছে ,শ্বাসের ওঠানামা অস্থির, যেন ঘুমের ভেতরেও কোনো অজানা আশঙ্কা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

ঠিক সকাল সাতটার সময় হঠাৎ করে মোবাইল ফোনের তীক্ষ্ণ রিং ঘরের নীরবতা চিরে দিল।

মহুয়া চমকে উঠল। রাহুলও ধড়মড় করে উঠে বসল।

একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই রাহুলের মুখের রঙ বদলে গেল। জনি নামটা দেখে তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা, তারপর অজানা ভয়ের ছায়া নেমে এলো। কলটা ধরতেই সে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল।

“হ্যালো…?”

ওপাশ থেকে ভেসে এলো জনির কান্নাভেজা কণ্ঠ। কথাগুলো সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রাহুলের মুখের সমস্ত রক্ত যেন হঠাৎ করে সরে গেল।

তার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। শরীরটা শক্ত হয়ে গেল, চোখ দুটো ফাঁকা।

“না… না… এটা হতে পারে না…” কণ্ঠটা ভেঙে এলো, বাকিটা আর বেরোল না।

মহুয়া বুঝে গেল এই নীরবতা কোনো সাধারণ খবরের নয়। সে ধীরে ধীরে রাহুলের কাছে এগিয়ে গেল। “কি হয়েছে?”

কথাটা বললেও ভেতর থেকে সে উত্তরটা আগেই বুঝে ফেলেছে।

রাহুল ফোনটা কানে চেপে ধরে শুধু একটা কথাই বলল, “আমি আসছি… এখনই…”

কল কেটে গেল।

ঘরের ভেতর এবার সম্পূর্ণ নীরবতা। কিন্তু এই নীরবতা রাতের মতো নয় ,এটা ভারী, ঠান্ডা, শ্বাসরুদ্ধ করা।

বিজ্ঞাপন

রাহুল ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। কণ্ঠ যেন কোথাও আটকে গেছে। কিছুক্ষণ পর খুব নিচু স্বরে বলল, “মা আর নেই…”

এই একটা বাক্যেই সব ভেঙে পড়ল।

রাহুলের কাঁধ দুটো কেঁপে উঠল। সে মুখ ঢেকে ফেলল দুই হাতে। এবার আর কোনো সংযম নেই ,নিঃশব্দ কান্না ভেঙে পড়ল শিশুর মতো।

মহুয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে তীব্রভাবে মোচড় দিয়ে উঠল, যেন অদৃশ্য কোনো হাত ভেতর থেকে হৃদয়টা শক্ত করে চেপে ধরেছে। রাহুলের কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত সেই দুটি শব্দ তার কানে ঢুকতেই শরীরের সমস্ত রক্ত মুহূর্তের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে গেল।

“মা… আর নেই…”

এই মা শব্দটার অর্থ বুঝতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। এটা তার নিজের জন্মদাত্রী মা নয় ,এটা সেই মানুষটা, যাকে সে শাশুড়ি মা বলে ডাকত, যিনি কখনো কঠিন ছিলেন, কখনো নীরব, আবার কখনো অদ্ভুত মমতায় ছুঁয়ে দিতেন। যাঁর চোখে সে সবসময় স্পষ্ট ভালোবাসা না দেখলেও, অদৃশ্য এক অধিকার আর সম্পর্কের বন্ধন অনুভব করত।

মহুয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। কথা বেরোল না, শুধু নিঃশ্বাসটা ভারী হয়ে এল। বুকের ভেতর জমে থাকা বাতাস যেন আটকে গেল কোথাও। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো।

সে কিছু না ভেবেই রাহুলকে জড়িয়ে ধরল। রাহুল তার কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফেলল, যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীতে রাহুলের আর কোনো আশ্রয় নেই।

প্রণয়ের কুঁড়িটা ঠিকমতো মেলে ধরার আগেই রাহুলের জীবনে অশনি সঙ্কেতের মতো নেমে এলো বিষাদের ঘন ছায়া। যে অনুভূতি নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিল, তা হঠাৎই থমকে গেল অজানা দুঃখ আর নিঃশব্দ ভারে। হাসির আলো নিভে গিয়ে তার চারপাশ জুড়ে ধরল এক গভীর শূন্যতা যেন ভালোবাসার প্রথম পথচলাতেই কপাল লিখে রেখেছিল বেদনাবহ এক অধ্যায়।

তাড়াতাড়ি করে তারা বাড়ির দিকে রওনা দিলো, পায়ের ধাপ যেন সময়ের তাড়নায় দ্রুত ছুটছে। সঙ্গে মহুয়ার মা-বাবাও ছিলেন।

রাহুল যখন বাসায় পৌঁছালো, তখন তার মা নিস্তব্ধভাবে খাটিয়ায় শুয়ে আছেন, শরীরটা যেন সমস্ত ক্লান্তি আর কষ্টের ভারে নীরবভাবে ঢেকে গেছে। খাটির চারপাশে কয়েকজন মাদ্রাসার ছাত্র কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করছে; তাদের মৃদু, স্বরসুধার সুর যেন ঘরটি ভরিয়ে দিচ্ছিল এক শান্ত, নীরব মনোরম বেদনার আবহে। বাতাসে কোরআনের শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল সূক্ষ্ম আর্দ্রতার গন্ধ।

রাহুলের হৃদয় যেন ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য আগুনে ঝলসে উঠল কষ্ট আর শোকের তীব্র তূর্য্য বয়ে চলল তার রক্তের সঙ্গে, প্রতিটি স্পন্দনে বোনা অনুভূতির এক গভীর জটিল জাল বুনে ফেলল। মনে হচ্ছিল, বুকের ভিতর একটা ভারী চাপ জমে গেছে, নীরব চোখের জলে মিশে থাকা বেদনার এক এক ফোঁটা তার আত্মাকে ঘিরে রাখছে, আর প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন সেই অশ্রুবর্ষণের সঙ্গে মিলেমিশে আরও গভীর বিষাদের নদীতে তাকে টেনে নিচ্ছে।

আজ থেকে আর কেউ তাকে ছোটোখাটো ভুলের জন্য বকা দেবে না, আর কেউ রাতের নীরবতায় ল্যাম্পের আলোয় তার জন্য ধৈর্যের সঙ্গে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করবে না। আর কেউ তার ক্লান্ত শরীরকে কোমল মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরবে না, হাতের উষ্ণতা ছুঁয়ে দেবে না সেই নিরাপত্তা ও সান্ত্বনার অভাবনীয় স্পর্শ। সবকিছুই যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে গেছে সেই পরিচিত যত্ন, স্নেহ আর ভালোবাসার উষ্ণ ছায়া, যা তার জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো মুহূর্তকে আলোকিত করতো, আজ অনন্ত নিরবতার আড়ালে মিলিয়ে গেলো।

রাহুল এখনো জানেনা তার মা কেন মারা গিয়েছে । নিপার কাছেও বিষয়টা অজানা।

তাই সবকিছু বাদ দিয়ে রাহুল আর নিপা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গেলো । সিসিটিভি ফুটেজ এর মাধ্যমেই তারা জানতে পারলো তার মায়ের মৃত্যুটা তার বাবার কারণেই হয়েছে।

মৃত মাকে খাটিয়ার উপর শুইয়ে রেখে রাহুল উন্মাদের মতো সারা বাড়ি চষে বেড়াচ্ছে। নিথর দেহটার দিকে একবার তাকালেই বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, তবু থামছে না সে। কাঁপতে থাকা পা নিয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়াচ্ছে।কিন্তু রায়হান চৌধুরীর কোনো সাড়া পাচ্ছে না।

অবশেষে বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল তার বাবা কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে। আর পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাহুল একছুটে সেদিকে গিয়ে বাবার শার্টের কলার চেপে ধরে বললো - কেন করলেন এমনটা ।

কিন্তু রায়হান চৌধুরী নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে , সে নিজেও এই ঘটনা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলো না ।আর পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।

রায়হান চৌধুরীর থেকে কোন উত্তর না পেয়ে রাহুল মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো । মেয়েটা আরো ভয় পেয়ে গেল।

- তুমি সেদিন আমার চেম্বারে গিয়েছিলে তাই না?

-হুম।

-ঠিক আছে আর কিছু বলতে হবে না ।

এই বলে রাহুল রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে চলে গেল।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প