রায়হান চৌধুরী আজ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে । যাওয়ার সময় বলে গেছেন সে তিন দিন বাড়ি আসবেন না।
রওশন আরা বেগম রাহুলকে ফেন দিয়ে বললো - তোর বাবা তিন দিন পর বাড়ি ফিরবে । মহুয়াকে এই তিন দিন স্বাধীন ভাবে থাকতে দে । মেয়েটা এই দুটো দিন একেবারে ঘরবন্দি হয়ে আছে।
ওপাশ থেকে রাহুল বলল- মা হায়'নার মুখে দেওয়ার চেয়ে ঘরবন্দি করে রাখা অনেক ভালো মা ।
রওশন আরা বেগম বলল- হুম সেটা বুঝেছি এবার ফোন রেখে তুই নিচে আয় ।
রওশন আরা বেগম ফোন রেখে দিয়ে জানালার গ্রিল ধরে আনমনে ভেবে যাচ্ছে চোখের সামনে নিজের স্বামী কিভাবে অন্য নারী নিয়ে মত্ত ছিলো ।নিজের ছেলের গার্লফ্রেন্ড কেও ছাড় দেয়নি হায়'না'টা । এসব ভাবনার মাঝে চোখ হটাৎ আটকে গেল কবরস্থানের দিকে । কবরস্থানে নতুন দুইটা কবর দেখে আঁতকে উঠলো রওশন আরা বেগম । মুখে হাত দিয়ে বললো হায় আল্লাহ এই কবর দুটো কার । তাও আবার আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে। রাহুল নিচে এলে ওকে একবার জিজ্ঞেস করতে হবে। এই বলে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।
রাহুল কিছু ঔষধ এনে মহুয়াকে দিন বলল- এগুলো খেয়ে নিও সুইটহার্ট । তোমার শরীর খুব দূর্বল হয়ে গেছে এই দুই দিনে ।
মহুয়া ঔষধগুলো ফেলে দিয়ে বললো - লাগবে না আমার এই ঔষধগুলো । আপনার ঔষধ আপনিই খান বেশি করে।
রাহুল মহুয়ার একদম কাছে এসে মহুয়ার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খেতে শুরু করলো । প্রায় পাঁচ মিনিট পর ছেড়ে দিয়ে বললো তাহলে রোজ দশবার এই ডোজ গ্রহণ করতে হবে । পারবে ? নাকি ঔষধ খাবে?
মহুয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রাহুলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো । তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিল না।
রাহুল মহুয়ার সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললো - দুইটার মধ্যে একটা বেছে নিতে হবে সুইটহার্ট। এবার সিদ্ধান্ত তোমার , তুমি কোনটা গ্রহণ করবে।
রাহুলের হাত থেকে ঔষধ এর বক্স টা কেড়ে নিয়ে মহুয়া বললো - আমি ঔষধ খাবো তবুও আপনার .......
- আমার কি ? থামলে কেন বলো বলো!
-কিছু না।
রাহুল হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একটু পরে আবার ফিরে এসে বললো আজ তোমাকে আটকে রাখবো না সুইটহার্ট । যাও শাশুড়ির সাথে কাজে হেল্প করো ।
মহুয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে রাহুল আবার মহুয়ার হাত ধরে বললো - আর একটু আমার সামনে থাকো না সুইটহার্ট। আজ তোমাকে এতো মিষ্টি লাগছে কেন ? আমার শার্টের বোতামগুলো একটু লাগিয়ে দিবে?
মহুয়া রাহুলের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা।
- এতো পালাই পালাই করছো কেন বেইবি । আমি কি বললাম কথা কানে যায়নি । শার্টের বোতামগুলো লাগিয়ে দাও ।
মহুয়া হাত ঝাড়ি দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো - আমি পারবো না আপনার শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতে । নিজের কাজ নিজেই করে নিন আমাকে বলছেন কেন ?
- ওকে তবে দাঁড়াও । এই বলে রাহুল মহুয়াকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো ।
মহুয়া ছটফট করতে লাগলো ।
-ছাড়ুন আমাকে । অসভ্য কোথাকার । যখন তখন এমন করেন কেন?
- তাহলে বোতামগুলো লাগিয়ে দাও। নয়তো সারাদিনও তোমায় ছাড়বো না ।
মহুয়া রাগে গজগজ করতে করতে বোতামগুলো লাগিয়ে দিলো ।
রাহুল মহুয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল - এবার আসতে পারো তুমি।
মহুয়া দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে রাহুল আবার বলে উঠলো -আর একটা কাজ করে দিবে আমার।
-কি কাজ ।
-একটু খাইয়ে দিবে ? প্লিজ ।
মহুয়া নিচে গিয়ে রাহুলের জন্য প্লেটে করে খাবার বেড়ে নিয়ে এসে বললো নিজের খাবার নিজে খেয়ে নিন । কিন্তু নাছোড়বান্দা রাহুলের কাছে পরাজিত হয়ে মহুয়া তাকে খাবার খাইয়ে দিতে লাগলো।
এক লোকমা খাবার তুলে মুখের সামনে ধরল কিন্তু রাহুল হা করলো না ।
মহুয়া একটু রাগ দেখিয়ে বললো হাঁ করতেও পারবেন না? নাকি সেটাও করে দিতে হবে?
- এতো কর্কশ গলায় না বলে একটু আদর করেও তো বলতে পারো যে - হা করো সোনা তোমাকে খাইয়ে দেই।
- আমি এতো রং ঢং করতে পারবো না এবার হা করুন আমি খাইয়ে দেই।
রাহুল। এবার হা করে খাবার খেলো ।
খাওয়া শেষে রাহুল করে মহুয়ার ওড়নায় মুখ মুছতে মুছতে বললো - এভাবে প্রতিদিন খাইয়ে দিলে.....
কথা শেষ না হতেই মহুয়া ওড়না টান দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।
রওশন আরা বেগম সোফায় বসে রাহুলের জন্য অপেক্ষা করছে অনেক্ষণ ধরে। মহুয়া নেমে আসতেই রওশন আরা বেগম মহুয়াকে বলল- রাহুলকে তারাতাড়ি আসতে বলো ।
মহুয়া উপরে তাকাতেই দেখলো রাহুল সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছে।
রওশন আরা বেগম রাহুলের সামনে এসে দাড়াতেই রাহুল বলল- আমি বুঝতে পারছি মা । আর বলতে হবে না মহুয়া আজ তোমার সাথেই থাকবে।
- আমি সেটা জানতে চাইছি না রাহুল ,আমি জানতে চাইছি আমাদের কবরস্থানে দুইটা নতুন কবর । সেগুলো কার।
-রাহী আর আমার.....
কথাগুলো বলতে গিয়ে রাহুল থেমে গেল ।সে তার মায়ের সামনে কিভাবে বলবে যে সে একজন মেয়ের সাথে দিনের পর দিন রাত কাটিয়েছে । আর এখানে শুয়ে আছে তার অস্তিত্ব।
রওশন আরা বেগম রাহুলের আরো একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল তোর কে ?
রাহুল তার মায়ের দুই বাহু আলতো করে ধরে বলল - মা ওই দু'জন আমার পেশেন্ট ছিলো । সেদিন রাতে মেয়েটি প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে হসপিটালে এসেছিলো । তার সাথে কেউ ছিল না । মেয়েটার কোন ঠিকানা আমাদের জানা নেই তাই সবাই মিলে পরামর্শ করে মেয়েটাকে এখানে এনে কবরস্থ করা হয়েছে । আর তার বাচ্চাটাও মারা গেছে।
রাহুল তার মাকে ছোট ছেলেটার কবর দেখিয়ে দিয়ে বললো ঐ যে কবরটা দেখতে পাচ্ছো মা? ওটা ছোট ছেলেটার। মা পিচ্চি টা ভীষণ সুন্দর হয়েছিলো । জানো মা আমি ওকে কোলে নিয়েছিলাম।
রওশন আরা বেগম রাহুলের কথা শুনে বললো হয়েছে থাক আর বলতে হবে না।
রাহুল তার মাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে করে নিয়ে বললো - ওর মতো একটা সন্তান কি আমার হবে না মা?
তোমার ছেলের বউকে একটু বোঝাও না মা প্লিজ আমি বাবা ডাক শুনতে চাই।
রওশন আরা বেগম ছেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো আমি মহুয়াকে বলবো কিন্তু একটা শর্ত আছে।
-কি শর্ত মা?
-তুই আমাকে কথা দে যে তুই আর কখনো কোন মেয়ের সাথে রাত কাটাতে যাবি না ।
রওশন আরা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন।
- বিয়ের আগে যা করেছিস কর কিন্তু ঘরে বউ রেখে আর এসব করিস না বাবা । আমার মতো এই নিরিহ মেয়েটাকে কষ্ট না দিলে আমি খুব খুশি হতাম।
-ঠিক আছে মা আমি আর এসব করবো না । তুমি ওকে বলবে তোমার একটা নাতি/ নাতনি দরকার।
রাহুল চলে গেল হসপিটালে। রওশন আরা বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত রান্না করতে । মহুয়া অনেক বার এসে জিজ্ঞেস করল মা আপনার কি কিছু লাগবে ? আমি আপনাকে সাহায্য করবো? কিন্তু রওশন আরা বেগমের কাট কাট জবাব , আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে রান্না ঘরে আসতে হবে না । তুমি বরং তোমার স্বামীকে সময় দাও।
মহুয়া নিজের ঘরে চলে এলো । তার আর কোন কাজ নেই । চোখের সামনে বার বার সকালের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠতেই মহুয়া লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
তখনি পাশে থাকা ফোনটা ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠলো । ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই দেখতে পেল পরিচিত নাম্বার । কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো বহুদিনের পরিচিত কন্ঠ।
-কেমন আছো মহুয়া।
-খুব ভালো আছি । তুমি কেমন আছো?
- যেমন রেখেছো। তেমনি আছি। আজকে হসপিটাল থেকে বাসায় আসছি। তুমি ফিরে এসো আমার কাছে । আমি রাগের মাথায় তোমায় উল্টো পাল্টা অনেককিছুই বলেছি প্লিজ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও
এটুকু বলতেই মহুয়া ফোন টা কেটে দিলো। আরিয়ান এর সাথে কথা বলার আর ইচ্ছে নেই তার।
আরিয়ান বার বার ফোন এসএমএস দিয়েই যাচ্ছে কিন্তু মহুয়া ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কান্না করে যাচ্ছে।
শেষ সময় এসে আরিয়ান আমার সাথে বেইমানি না করলেও পারতো। সবাই বেইমান সবাই । কেউ আমাকে ভালোবাসে না কেউ না । এই বলে হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো।