দশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে মহুয়া এখনো সেই ঘরেই বন্দি হয়ে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলোটা মলিন হয়ে এসে পড়ছে দেয়ালে, ঘরের ভেতরে জমে আছে এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা। একবারও কেউ দরজার কাছে এসে তাকায়নি। দুপুরবেলা রওশন আরা বেগম চুপচাপ এসে শুধু একটা থালা নামিয়ে গিয়েছিলেন কোনো কথা বলেননি, চোখে মেলেও তাকাননি মহুয়ার দিকে।
আজ যেন তাকে চিনতেই পারছে না মহুয়া। এই সেই মানুষ? যিনি এতদিন ধরে তার সাথে গল্প করতেন, হাসতেন, অতীতের কষ্টের কথা শোনাতেন, কখনো মায়ের মতো স্নেহ দিতেন! সেই রওশন আরা বেগম আজ যেন পুরো অন্য কেউ ,একদম অপরিচিত একজন মানুষ।
বুকে এক অজানা শূন্যতা নিয়ে মহুয়া চেয়ে থাকে দরজার দিকে। একবারও কেউ জিজ্ঞেস করল না কেন তাকে আটকে রাখা হয়েছে, কী তার দোষ! এমন এক অবহেলার অনুভূতি সে আগে কখনো পায়নি।
নিপার কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। “নিপা তো আসতে পারত একবার… নাকি সেও বদলে গেছে?” নিজেকেই প্রশ্ন করে মহুয়া। নিপার কাছ থেকে জানার তো অনেক কিছুই ছিল । অসংখ্য উত্তরহীন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার মনে।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। একসময় চিন্তার ভারে চোখ ভারী হয়ে আসে। জানালার বাইরের জোনাকির আলো ঝাপসা হয়ে মিশে যায় তার নিঃশব্দ অশ্রুর সাথে। এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মহুয়া, সে নিজেও টের পায় না । শুধু জানালার বাইরে হালকা বাতাসটা নীরবে পর্দা দুলিয়ে যায়, যেন কোনো অজানা সান্ত্বনা দিতে চায় তাকে।
রাত তখন প্রায় আটটা। ঘরের ভেতর নিঃশব্দ এক অন্ধকার জমে আছে ।জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের হালকা আলো ঢুকে পড়েছে, তাতে দেয়ালের ছায়াগুলোও যেন নিঃশব্দে নড়ছে। ঠিক সেই সময় হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকে উঠল মহুয়া।
তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল এক অজানা আশায় কেউ এল? তাড়াহুড়ো করে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে, পায়ের শব্দে মেঝেতে যেন প্রতিধ্বনি উঠল। হাত কাঁপতে কাঁপতে দরজার ছিটকিনি খুলল মহুয়া।
দরজাটা খুলেই দেখতে পেলো নিপা এসেছে ।
- তুমি এসেছো? আমি তোমার কথায় ভাবছিলাম নিপা ।
তোমার থেকে আমার অনেক কিছু জানার আছে।
নিপা তাড়াতাড়ি করে ঘরে ঢুকে দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিলো ।
মহুয়া আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল জানালা বন্ধ করলে কেন?
- আজ আমার বাবা বাড়িতে এসেছে তাই এমনটা করলাম।
-কিন্ত কেন ?
নিপা একটু চুপ করে থেকে বলল - তোমাকে আমি সেদিন বললাম না যে ভাইয়া যাকে ভালোবাসতো অর্থাৎ রিয়া সুইসাইড করেছে । আজ তার কারণটা বলবো।
রিয়া যেদিন তার মামাতো ভাইয়ের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল এটা সম্পূর্ণ একটা বানানো নাটক ছিলো । আর এই নাটকের পরিচালক ছিলেন আমার বাবা অর্থাৎ তোমার শশুর।
-রিয়ার সাথে তোমার বাবার কি সম্পর্ক ?
আমার বাবা রিয়াকে জোর করে রেপ করেছিলেন। কারন সে তোমার মতো আগুন সুন্দরী ছিলো । যার রুপের আগুনে সবাই জ্বলে যেতো।
- কিহ নিজের ছেলের গার্লফ্রেন্ড এর সাথে এগুলো??
-হুম । রিয়াও আমার ভাইকে খুব ভালোবাসতো তাই এই নষ্টামি সহ্য করতে না পেরে সুইসাইড করেছে।
- তোমার ভাইয়া সেটা জানতো?
-হুম কিন্তু ভাইয়া নিরুপায় ছিলো । কারন এই কথাগুলো সমাজের মানুষ জানলে আমাদের মান ইজ্জত সব ধুলোই মিশে যাবে । তাই ভাইয়া চুপ করে ছিলো।
নিপা কাঁদতে কাঁদতে মহুয়ার হাত ধরে বললো - মহুয়া বাবার এসব নষ্টামির কথা মনে করলে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা মরে যায় ।
মহুয়া শুধু চুপচাপ শুনে যাচ্ছে ।
নিপা আবার বলে উঠলো ভাইয়া তোমার ভালো চায় তাই এখানে আটকে রেখেছে । তুমি যেন কখনো বাবার সামনে যেও না ।তাহলে তুমিও ...........
মহুয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো আমি তোমার বাবার সামনে অবশ্যই যাবো । কিন্তু এমনভাবে যাবো , তোমার বাবার আত্মা শুকিয়ে যাবে।
নিপা মহুয়ার হাত ধরে বললো প্লিজ ভাবি এমন টা করো না । বাবা যতোদিন এবাড়িতে থাকবে ততদিন তুমি এই ঘরেই বন্দী থাকবে । নয়তো ঐ নরপশু তোমাকে শেষ করে দিবে ।
-আমার আর বাকি আছেই বা কি বলো নিপা? একদিন যে মেয়েটা নিজের স্বপ্ন, নিজের আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল… আজ সে শুধু একটা দেহ হয়ে গেছে। রাহুল কি আমার সম্মান রেখেছে?
কথাগুলো বলতে বলতে তার বুক ওঠানামা করতে লাগল, যেন প্রতিটি শব্দ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে অন্তরের গভীর ক্ষত থেকে।
-আমাকে ধর্ষণ করে… সে আমার সম্মানকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, নিপা… ধুলোয় গড়িয়ে দিয়েছে সব। আমার নিজের ছায়াটাকেও আজ ঘৃণা লাগে।
মহুয়া মুখ ঢেকে বসে পড়ল মেঝেতে। তার কাঁপা কণ্ঠের শব্দ মিলিয়ে গেল রাতের নীরবতার ভেতর, আর বাতাসের হালকা শব্দে মনে হলো, ঘরের দেয়ালও যেন কেঁপে উঠল তার যন্ত্রণায়।
__________________
মেসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো পা দুটো কাজ করছে না ।ভেতরে ঢোকার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। বুকের ভেতর ভারি একটা পাথরচাপা কষ্ট, আর চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্যারের সেই বিকৃত হাসি আর কুপ্রস্তাবটা। তবুও ধীরে ধীরে সে পা বাড়ালো দরজার দিকে, ভেতরে ঢোকার আগেই আবার চোখ বেয়ে নেমে এলো নিঃশব্দ অশ্রুধারা।
তামিমা রুমে এসে সোজা শাওযার নিতে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করতেই যেন বাইরের পৃথিবীটা হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল। ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে সে ধীরে ধীরে আয়নায় নিজের মুখটা দেখে নিজেই চমকে উঠল ।চোখদুটো লাল, মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। কোনো শব্দ করছে না সে, শুধু নিঃশব্দে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠান্ডা পানির ধারাগুলো গড়িয়ে পড়ছে তার চুল বেয়ে, মুখ বেয়ে, গলায়। কিন্তু সেই পানিও যেন ধুয়ে নিতে পারছে না স্যারের বলা শ্বাসরুদ্ধ কথাগুলোর দগদগে দাগ। প্রতিটি শব্দ এখনো কানে বাজছে।
তামিমার মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কেউ যেন চেপে ধরেছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকে সে, যেন পানির শব্দের আড়ালে নিজের কান্না লুকিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু যতই চেষ্টা করুক, স্যারের সেই কথাগুলো যেন তার মনের দেয়ালে বারবার ধাক্কা মারে একটা দুঃস্বপ্নের মতো, যেখান থেকে সে বেরোতে পারছে না।
একটা মেয়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যে একটা মানুষ এমন একটা কাজ করতে পারে তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি তামিমা।
মনে হচ্ছে যেন নিজের পৃথিবীটাই ভেঙে পড়েছে তার ওপর। যে মানুষটিকে সে ভরসা ভেবেছিল, সেই হাতই আজ তার সম্মান ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় আছে ।তামিমার চোখে অশ্রু এসে ঝাপসা করে দিচ্ছে সবকিছু মনের ভেতর একরাশ ঘৃণা, লজ্জা আর অবিশ্বাসের ঢেউয়ে সে যেন ডুবে যাচ্ছে, কোনো দিকেই আর আলো খুঁজে পাচ্ছে না।
কোন দিকে যাবে? তার এই কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে সে কলেজ থেকে বহিষ্কার করবে। তখন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এতো দিনের পরিশ্রম সব বিফলে যাবে।
আবার কালকে নাকি কলেজে প্রোগ্রাম আছে । পার্টিসিপেট করতে হবে।
যে মানুষটা আজকে আমাকে কুপ্রস্তাব দিলো আর কালকে কি করে আমি তার সামনে নাচবো।!
একদিকে পুরো কলেজ আমার জন্য অপেক্ষা করবে কালকে ।
এসব অজানা চিন্তা মাথায় ঘুরতে ঘুরতে তামিমা অজান্তে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ফ্লোরে। হৃদয়টা দ্রুত ধুকধুক করছে, ভেতরের অস্থিরতা যেন প্রতিটি শ্বাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
আজ রাতটা তামিমার জন্য যেন এক অসীম, অন্ধকারের সমুদ্র হয়ে গিয়েছিল চোখে এক মুহূর্তেরও ঘুমের ভার নেই, মন জর্জরিত অজানা উদ্বেগে, হৃদয় কাঁপছে প্রতিটি স্পন্দনে, আর মস্তিষ্কে ভিড় করছে অপূর্ব, অব্যক্ত চিন্তাধারার এক অস্থির মেলা। ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে আছে নিঃশব্দতা, কখনও দূরের ঘণ্টাধ্বনি কানে আসে এক রহস্যময় প্রতিধ্বনির মতো। প্রতিটি সেকেন্ড যেন স্থির, সময় থেমে গেছে, ঘুমের নরম স্পর্শও তার কাছে আজ অচেনা, অদৃশ্য শূন্যতার মাঝে হারিয়ে গেছে নিজের অস্তিত্ব।
দূরের মিনার থেকে ফজরের আযানের সুরেলা, কোমল ধ্বনি ভেসে এলো, বাতাসে যেন একটা শান্তি মিশে গেলেও, তামিমার চোখে ঘুমের পরশ আসল না। হৃদয় এখনও অস্থির, মন অজানা চিন্তার জালে আটকা, আর আযানের প্রতিটি শব্দ যেন তার অস্থিরতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলছে। ঘরটা ধীরে ধীরে আলোর আলোকচ্ছটায় ভরে উঠলেও, তার অন্তর এবং চোখে যেন অন্ধকারের পারদ ঝুলেই আছে।
প্রতিদিনের মত আজো নিয়মের ব্যতিক্রম করেনি তামিমা। টিউশনি শেষ করে কলেজে গিয়ে উপস্থিত হতেই সব বান্ধবীরা আবদার করে বসলো আজকে অনুষ্ঠানে তোকে আমরা প্রথম হিসেবে দেখতে চাই ।
টিউশনি শেষ করে কলেজের গেটে পা রাখতেই তামিমার চারপাশে জমে গেল তার সব বান্ধবীর তারা একসাথে আবদার করতে লাগল “আজকে অনুষ্ঠানে তোকে আমরা প্রথম হিসেবে দেখতে চাই!” শব্দগুলো যেন পুরো হলকে আনন্দের সুরে ভরে দিল। কিন্তু তামিমা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো, বুকের ভেতর অজানা অস্থিরতা, এবং মৃদু হেসে সে তাদের আবদার এড়িয়ে গেল।
কিন্তু বান্ধবীরা মানতে রাজি হল না। তারা হাসি-মজা আর চিড়িয়াখেলার মধ্যে তাকে জোর করে ধরে, সাবধানে সাজিয়ে দিলো, চুলে ফুল লাগালো, জামাকাপড় ঠিক করলো, মুখে হালকা লিপস্টিক ছুঁয়ে দিলো। এরপর ধীরে ধীরে তাকে স্টেজের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। স্টেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলোর ঝলক তার চোখে পড়ল, এবং চারপাশের সমর্থনপূর্ণ হাততালি তাকে এক অচেনা কিন্তু উচ্ছ্বাসময় অনুভূতি দিল।
রায়হান চৌধুরী স্টেজের একদম সামনের সারিতেই বসে আছেন। চকচকে কালো কোট, গলায় লাল টাই, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা সব মিলিয়ে তাঁর চেহারায় একধরনের অহংকার মিশে আছে। আলো-ঝলমলে অডিটোরিয়ামে তিনি যেন একা একটা কালো ছায়া হয়ে বসে আছেন।
তামিমা মাইক্রোফোনের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের কোণ দিয়ে একবার তাকাতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এর আগেও তো স্যার এমন করেই সামনে বসতেন, কিন্তু আজকে কেন জানি তাঁর মুখটা দেখলেই তীব্র ঘৃণায় মনটা বিদ্রোহ করছে। মনে হচ্ছিল, তাঁর সেই পরিপাটি সাজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার, এক বিকৃত মুখ, যা কেবল তামিমাই বুঝে ফেলেছে।
সারা হলজুড়ে করতালি পড়ছে, সবাই হাসছে, কিন্তু তামিমার মনে হচ্ছিল সে যেন এক বিষাক্ত দৃষ্টির নিচে বন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । রায়হান চৌধুরীর চোখদুটো ঠিক তার দিকেই নিবদ্ধ, স্থির, ভারী… যেন প্রতিটা মুহূর্তে তার ভেতরটা ভেদ করে যাচ্ছে।