সকাল দশটা। সূর্যের নরম, সোনালি আলো ঘরে ঢুকে চারপাশকে মৃদু ঝলমলে আভায় ভরে দিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা রোদ কণার মতো সূক্ষ্ম রেখা মেঝেতে নাচছে, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে হালকা সকালের শীতলতা। রাহুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, হালকা পারফিউমের মৃদু সুবাসে ঘ্রাণময় হয়ে, চুলগুলো নিখুঁতভাবে আঁচড়ালো। ছয় ফুট চার ইঞ্চি লম্বা সুঠাম দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, গাঢ় বাদামী চোখে এক অদ্ভুত ঝলক,যেন গভীর সমুদ্রের মতো রহস্যময লাগছে ।ফর্সা গায়ের রং সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। মুখে ছোট ছোট চাপদাড়ি তার রুক্ষ পুরুষালি আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে ।দেখতে একদম সালমান শাহ্ এর মতো লাগছে।
যে মেয়ে একবার দেখবে সেই মেয়েই তার প্রেমে একেবারে দিওয়ানা হয়ে যাবে।
রাহুল হাতের ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে নিলো, তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই পিছন থেকে মহুয়া ডাক দিয়ে বললো-“কোথায় যাচ্ছেন?”
রাহুল গম্ভীর গলায় বলল- ডিউটি আছে। হসপিটালে যাচ্ছি। নিজের খেয়াল রেখো।
এই বলে কোনো দিকে না তাকিয়েই দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে।
দরজার ফাঁক দিয়ে রাহুলের চলে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে রইলো মহুয়া। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কম্পন উঠলো। এই প্রথম সে রাহুলকে এতটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে ।সেই কঠিন, রূঢ় মানুষটার মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত শান্ত সৌন্দর্য খুঁজে পেল আজ। সাদা শার্টে ঝকঝকে, দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটা রাহুলকে মুহূর্তের জন্যে তার চোখে একদম নিখুঁত, পরিপূর্ণ একজন মানুষ মনে হলো ,যেন কোনো সিনেমার নায়ক।
মহুয়া নিজের অজান্তেই হালকা হাসলো।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো --
এই মানুষটা তো কেবলই জঘন্য এক নোংরা, নিকৃষ্ট পিশাচ, যার মুখে মানুষের ছাপ থাকলেও হৃদয়টা পচে গেছে নরকের আগুনে। তার চোখে তো কোনো অনুভূতি নেই, আছে শুধু নোংরা লালসা, বিকৃত আনন্দের ক্ষুধা।
তাকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবা মানে নিজের আত্মাকে কলুষিত করা; এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং এক ভয়ংকর আত্মঘাতী মহাপাপ। এমন মানুষকে মনে স্থান দেওয়াটাই যেন নিজেকে সেই নৃশংসতার অংশ বানানো।
এই নরপশুর জন্যই তো আমার বাবার আজ সমাজে কোনো মুখ নেই, সম্মানটুকু ধুলোয় মিশে গেছে। যে মানুষটা সারাজীবন সততা আর সন্মানের উপর দাঁড়িয়ে নিজের পরিবার গড়েছিলেন, আজ তাকে মাথা নিচু করে চলতে হচ্ছে মানুষের সামনে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাটে-বাজারে, সর্বত্রই বাবার আর আমার নাম নিয়ে ফিসফিস করছে লোকজন আর বিদ্রূপের হাসি ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। একসময় যাদের চোখে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার প্রতীক, আজ তাদের সেই চোখেই শুধু উপহাস আর ঘৃণার পাত্র হয়েছে আমার বাবা। শুধু এই মানুষটার জন্য।
আমাদের ঘরের দরজাটা যেন চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে পৃথিবীর সামনে।
এমন এক নরখাদককে ভালোবাসা তো দূরের কথা, এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ক্ষমা করা মানে নিজের আত্মাকে অপবিত্র করা। মহুয়ার বুকের গভীর থেকে ঘৃণার আগুন যেন জ্বলে উঠল একটা জ্বলন্ত লাভার মতো তা ছড়িয়ে পড়ল রক্তের প্রতিটি শিরা উপশিরায়।মনে হলো, তার অস্তিত্বই এই পৃথিবীর জন্য এক অভিশাপ, এক অন্ধকার ছায়া, যার উপস্থিতিতে আলো পর্যন্ত মরে যায়।
মহুয়া মনে মনে বলতে লাগলো -
রাহুলের চোখে আমি শুধু লালসার বিষ দেখেছি। তার হাসিতে লুকিয়ে থাকে প্রতারণার বিষাক্ত ফণা। এই মানুষটা যেন জন্মেছে শুধু অন্যের জীবন ধ্বংস করতে, অন্যের সুখ কেড়ে নিতে।
মহুয়ার ভেতরটা উথাল-পাথাল করতে লাগলো। ঘৃণা, রাগ আর এক অজানা প্রতিশোধের আগুন মিশে এক হয়ে গেল তার মনে। মনে মনে বললো , পৃথিবীর বুকে যদি সত্যিই ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকে, তবে এই নরখাদককে মাটির নিচে পুঁতে রাখা ছাড়া সেই ন্যায়বিচার কখনোই পূর্ণ হবে না।
এসব ভাবনার ভেতরেই হঠাৎ রওশন আরা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো নিচ থেকে । মহুয়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।
নিচে এসে দেখে, রওশন আরা বেগম সোফার এক কোণে বসে আছেন।
মহুয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেই তিনি মাথা তুলে মহুয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন -
“মা রে… যদি পারিস, আমার ছেলেকে ক্ষমা করে দিস। শুনেছি রাহুল তোকে জোর করে বিয়ে করেছে। আমি জানি, একটা মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে করা কত বড় অন্যায়… কতটা অসম্মান।”
বলতে বলতে তার গলাটা ভারী হয়ে গেল। চোখের কোনে অশ্রুবিন্দু চিকচিক করে উঠল। তিনি হাতদুটো জোড় করে বললেন-
“এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, তবু আমি মায়ের হৃদয় নিয়ে তোর সামনে দাঁড়িয়েছি। আমি ওর হয়ে তোর কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, মা। তুই যদি পারিস ওকে ক্ষমা করে দে। জানি, এতে হয়তো তোর কষ্ট কমবে না, কিন্তু আমার বুকের বোঝাটা একটু হলেও হালকা হবে।”
ঘরটিতে কিছুক্ষণের জন্য এক নিঃশব্দতা নেমে এলো । মহুয়ার বুকের ভেতর যেন একটা ঢেউ উঠল। রওশন আরা বেগমের চোখের সেই অনুতাপের দৃষ্টি মহুয়ার মনে এক অজানা ভার নামিয়ে দিল।
প্রতিশোধ , রাগ, অভিমান সবকিছু এক মুহূর্তে গলে যেতে লাগল শাশুড়ি মায়ের নিঃস্বার্থ অনুনয়ে।
মহুয়া কোনো কথা বলল না, শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই ।না রাগ, না সহানুভূতি, আর না করুণা।
রওশন আরা বেগমের বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চোখের কোণ ভিজে উঠেছে, তিনি ওড়না দিয়ে চোখ মুছলেন , তবুও অশ্রু থামছে না। কণ্ঠটা কাঁপছে, কিন্তু তিনি বলতেই থাকলেন-
“ছোটবেলা থেকেই আমি কত চেষ্টা করেছি রে, রাহুলকে মানুষ করার। ভালো পথে ফেরাতে চেয়েছি, বারবার বলেছি নারীর প্রতি সম্মান রাখ, ওদের চোখের জল যেন তোর কারণে না ঝরে। কিন্তু ও শুনলো না। যত বলেছি, ততই যেন দূরে সরে গেছে আমার কাছ থেকে। , আমার মেয়ে, ঠিকই আমার মতো হয়েছে। নম্র, শান্ত, ভদ্র। কিন্তু ছেলেটা… ও আর হলো না। হবেই বা কীভাবে?
যাদের রক্তে নারীর দেহভোগের নেশা জন্ম থেকেই মিশে থাকে, যাদের পুরুষত্বের গর্ব মানেই কোনো অসহায় মেয়ের চোখে অশ্রু আনা তারা কি কখনো ভালো হতে পারে, মা? না, পারবে না... ওর রক্তে যেন সেই পাপের আগুন এখনও জ্বলছে। আমি বারবার চেষ্টা করেছি প্রার্থনা করেছি, চোখের পানি ফেলেছি, ভালোবাসা দিয়ে সেই অন্ধকার মুছে দিতে চেয়েছি, কিন্তু পারিনি। যতই আলোর দিকে টানতে চেয়েছি, ওর ভেতরের ছায়া ততই গভীর হয়েছে। মনে হয়, ওর শিরায় এখনো বইছে সেই অভিশপ্ত বংশের রক্ত । যেখানে ভালোবাসা নয়, শুধু অধিকার আর লালসা ছিল জীবনের মন্ত্র।
রওশন আরা বেগম একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন -
ওর বাবা আজ পনেরো দিন ধরে বাড়ি ফেরেনি। অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, সে নিয়মিত সেখানে যায়, কিন্তু বাড়ি ফেরে না। কোথায় থাকে, কার সঙ্গে দিন কাটায় সবই আমি জানি। আমার অজানার কিছুই নেই, তবুও আমি কিছু বলি না, কিছু জিজ্ঞেসও করি না।
চুপ করে থাকি, কারণ আমি জানি আমার জীবন, আমার মান-অভিমান, সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও যেন আমার মেয়েটার জীবনে কোনো ছায়া না পড়ে। ওর গায়ে যেন কোনো কলঙ্কের দাগ না লাগে, সমাজের চোখে ও যেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। আমি শুধু চাই, ওর মুখে যেন হাসিটা অটুট থাকে, ওর সন্মান যেন কোনোভাবে ক্ষুন্ন না হয়। নিজের বুকের ভার নিজেই চেপে রাখি । কারণ একজন মা যতই ভেঙে পড়ুক, তবুও মেয়ের সম্মানের জন্য নিজের যন্ত্রণাটা লুকিয়ে রাখতেই হয়।
রওশন আরা বেগমের কথা শুনে মুহূর্তেই মহুয়া যেন পাথর হয়ে গেলো। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন একসাথে জমে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। যেন কেউ তার বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ সমস্ত বাতাস টেনে নিয়েছে।
কিছুক্ষণের জন্য তার মস্তিষ্ক একদম কাজ করা বন্ধ করে দিলো। নিজের শ্বাসের আওয়াজটাও যেন দূরে কোথাও মিলিয়ে গেল। শুধু কানে বাজছে রওশন আরা বেগমের সেই কথাগুলো ।
---------------------
-তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো তাহলে আমি তোমার মুখোশ সবার সামনে উন্মোচন করে দেবো। তখন দেখবো, তোমার তথাকথিত সম্মান কোথায় লুকাবে তুমি।
-তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আমি অবশ্যই তোমাকে বিয়ে করবো, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। তুমি আমার জীবনের একমাত্র মানুষ, তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই নই। কিন্তু... আমাকে একটু সময় দাও, প্লিজ।
-সময়? তুমি বারবার এই কথাটাই বলো। তুমি আর কতোদিন অপেক্ষা করাবে আমায় বলো? এভাবে অপেক্ষা করতে আমার মোটেও ভালো লাগে না জান।
-এইতো আর কয়েকটা দিন... একটু ধৈর্য ধরো। আমি সব ঠিক করে ফেলেছি। তোমার জন্য আমি আমার পরিবার, সমাজ সবকিছুর সঙ্গে লড়বো। তারপর তুমি শুধু আমার হবে, শুধু আমার।
-তোমার এই ‘কিছুদিন’ কথাটা এখন আমার মনে আতঙ্ক জাগায়। আমি জানি না তুমি সত্যিই আমায় ভালোবাসো কিনা, নাকি আমার আবেগকে ব্যবহার করছো নিজের মতো করে।
-না... এমন কথা বলো না। আমি তোমাকে হারানোর কথা ভাবতেও পারি না। তুমি জানো না, তোমার রাগ, তোমার অভিমান—সবকিছু আমার কাছে কত প্রিয়।
-তাহলে কথা দাও... আর কোনো অজুহাত নয়। পরের পূর্ণিমার রাতেই তুমি আসবে, বিয়ে করবে আমাকে।
-আচ্ছা বাবা কথা দিচ্ছি... পরের পূর্ণিমার আলোয় তোমাকে লাল টুকটুকে বেনারসী শাড়িতে দেখবো।
-যদি না আসো?
-তাহলে আমি বেঁচে থাকবো না... কারণ তোমার ছাড়া এই পৃথিবী আমার কাছে মরুভূমির মতো শূন্য।
৪৮ বছর বয়সী একটা পুরুষের উদম বুকে হাত বুলাতে বুলাতে ১৯ বছর বয়সী এক কিশোরী কথাগুলো বলছে।