মেয়েটার নাম তামিমা। মা-বাবা হারা এই মেয়েটিকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো পরীর দেশ থেকে ভুল করে নেমে এসেছে পৃথিবীতে। দুধে আলতা গায়ের রঙ, মুখটা গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল, আর চোখ দুটি বড় বড়, যেন গভীর জলরাশিতে ঝিকমিক করা নীল আভা। চুলগুলো ঘন কালো, কোমর ছুঁয়ে নেমে গেছে, হাঁটলে বাতাসে ওড়ে । সেই দৃশ্য দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
সারা কলেজে যদি সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, প্রথম স্থান অধিকার করবে একমাত্র তামিমাই। তার হাসিটা এত মিষ্টি যে, যেই একবার দেখবে, সেই হয়তো সারাজীবন ভুলতে পারবে না।
তামিমা শুধু সুন্দরীই নয় সে এক জন্মগত শিল্পী। নাচের তালে তার দেহভঙ্গি এত সাবলীল, এত সুরেলা যে মনে হয় সুর যেন তার শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। গান গাইলে তার কণ্ঠের মাধুর্য মুগ্ধ করে ফেলে চারপাশের মানুষকে। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে কলেজের অডিটোরিয়াম পর্যন্ত।
পড়াশোনায় যদিও সে খুব একটা মনোযোগী নয়, তবু কেউ কখনও তার ওপর রাগ করতে পারে না। কারণ তার সেই নির্ভেজাল হাসি, মায়াভরা চোখ আর প্রাণচঞ্চল স্বভাব । সবকিছু মিলিয়ে সে যেন সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে।
তামিমা যেন এক রঙিন স্বপ্ন, যাকে সবাই ছুঁয়ে দেখতে চায়, কিন্তু সে নিজেই নিজের জগতে হারিয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ রূপকথা।
এতো কিছুর মাঝেও চাচা-চাচীর অবহেলা মেয়েটার কোমল মনটাকে ধীরে ধীরে বিষিয়ে তুলেছিল। প্রতিদিন সকালে তাদের ঠান্ডা দৃষ্টি, উপেক্ষার শব্দ, আর পরোক্ষ কটুক্তিগুলো যেন এক এক করে তার ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে গলিয়ে দিত। একসময় সে বুঝতে পারলো এই বাড়িটা তার জন্য নয়, এখানে তার শ্বাস নেওয়াও বোঝা।
তাই একদিন, সবার অগোচরে চোখের পানি মুছে, এক বান্ধবীর সহায়তায় সব ঠিক করে নিলো। ছোট্ট একটা ব্যাগে কয়েকটা জামাকাপড়, বই আর তার মায়ের একটা পুরোনো ছবিটা নিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে এলো। শহরের এক নিরিবিলি গলিতে, মেয়েদের একটা মেসে থাকার ব্যবস্থা করেছিল বান্ধবী। সেখানে প্রথম রাতে সে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল অচেনা জায়গা, অচেনা মানুষ, কিন্তু এক অদ্ভুত মুক্তির গন্ধ তার বুক ভরে যাচ্ছিল।
তবে স্বাধীনতা সহজ নয়। এখানে থাকতে গেলে মাসিক ভাড়া, খাবারের খরচ সবকিছুরই টাকা লাগে। চাচার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর সেখান থেকে একটাকাও আর আসেনি। তাই নিজের যোগ্যতাতেই বাঁচার সিদ্ধান্ত নিলো সে। কয়েকটা টিউশনি করে ধীরে ধীরে নিজের খরচ নিজেই চালাতে শুরু করলো।
প্রতিদিন বিকেলে ক্লাস শেষে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াতে যেত সে। ওদের নিষ্পাপ মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তার বুকের কষ্টটা একটু হলেও হালকা হয়ে যেত। ক্লান্ত শরীর নিয়ে রাতে ফিরে এসে চুপচাপ জানালার ধারে বসে থাকতো হয়তো তখনও মনে মনে মা’কে বলতো, “দেখো মা, আমি পারছি… একা হয়েও পারছি।”
একটা টিউশনি শেষ করে সেদিন সন্ধ্যায় তামিমা ক্লান্ত পায়ে মেসের দিকে ফিরছিলো। আকাশে তখন সূর্য প্রায় অস্ত যাচ্ছে, লালচে আলোয় চারদিক ধূসর হয়ে এসেছে। রাস্তার পাশে কচি পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাস বইছে, দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে ..সেই শব্দে এক ধরনের শান্তি, কিন্তু তার মনের ভেতর অজানা ক্লান্তি।
ঠিক তখনই, হঠাৎ একটা চকচকে কালো প্রাইভেট কার সাঁই সাঁই শব্দ তুলে এসে তার সামনে হঠাৎ থেমে গেল। তামিমা চমকে দাঁড়িয়ে গেল । মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠলো। মনে হলো, কেউ হয়তো তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবে! একটুখানি ভয় আর শঙ্কা তার মনের মধ্যে ভেসে উঠলো।
কিন্তু পরক্ষণেই দরজা খুলে গাড়ি থকে নেমে এলো রায়হান চৌধুরী স্যার। যাকে সবাই এক নামে চেনে।
তামিমা তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করে সালাম করলো। ভদ্রভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো, কিন্তু পিছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠে স্যার ডাকলেন-
“এই মেয়ে, তুমি এই সন্ধ্যায় কোথায় যাচ্ছিলে?”
তামিমা থমকে দাঁড়ালো। হৃদস্পন্দন যেন আরও জোরে বাজতে লাগলো। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে হকচকিয়ে বলল,
“স্যার, আমি… আমি একটা মেয়েকে পড়াতে গিয়েছিলাম।”
রায়হান চৌধুরী কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন চোখ দিয়ে তার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলতে চাইছেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন-
“মাস শেষে কত টাকা পাও?”
তামিমা জানতো, সে আসলে মাসে এক হাজার টাকা পায়। কিন্তু স্যারের সামনে নিজেকে একটু স্বাবলম্বী দেখানোর ইচ্ছে হলো। মুখে মৃদু হাসি এনে বলল -
“দুই হাজার টাকা, স্যার।”
স্যার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বললেন,
“এই টাকা দিয়ে মাস চলে?”
তামিমা একটু কুণ্ঠিত গলায় উত্তর দিল,
“বেশ চলে, স্যার।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর রায়হান চৌধুরী বললেন&
“আমার অফিসে চাকরি করবে?”
তামিমা কিছুটা অবাক, কিছুটা দুশ্চিন্তিত হয়ে বলল-
“স্যার, পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করলে মনোযোগ হারিয়ে যাবে না?”
রায়হান স্যার এবার গাড়ির দরজায় ভর দিয়ে ঠান্ডা স্বরে বললেন-
“সাত ঘণ্টা কাজ করলে পড়াশোনার মনোযোগ হারায় না। বরং বাস্তবতা শেখা যায়। আমি তোমাকে মোটা অংকের টাকা স্যালারি দেবো।”
-আমি ভেবে দেখি।
এই বলে তামিমা চলে যেতে লাগলো।
-“একটা মিনিট, তামিমা!”
তামিমা পেছন ফিরে তাকাল। স্যার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলেন, তার হাতে একটা ছোট্ট সাদা কার্ড।
-“কালকের মধ্যে আমাকে জানিয়ে দেবে,”
তারপর কার্ডটা তামিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
-“এখানে আমার ফোন নাম্বার আছে। তুমি যদি আমার অফিসে চাকরি করতে চাও, তাহলে এই নাম্বারে ফোন দিয়ে জানিয়ে দেবে।”
তামিমা দ্বিধাভরা চোখে কার্ডটা হাতে নিল। কার্ডে সোনালি অক্ষরে লেখা স্যারের নাম, নিচে বড় করে লেখা চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রি. তামিমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল তার।
-"স্যার, আমাকে কোন পোস্টে কাজ করতে হবে?”
স্যার কিছুক্ষণ তামিমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
-“পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।”
এক মুহূর্ত যেন বাতাস থেমে গেল। তামিমা চুপ করে রইল। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। স্যার তখন গাড়ির দিকে ফিরে গেলেন, গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে একবার জানালার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকালেন, তারপর গাড়িটা ধীরে ধীরে সরে গেল।
তামিমা ধীরে ধীরে মেসের দিকে হাঁটতে লাগল। সাঁঝের নরম আলোয় চারদিক তখন হালকা কমলা রঙে রাঙানো, রাস্তায় একফালি বাতাস বয়ে যাচ্ছে, তার ওড়নাটা হালকা দুলে উঠছে সেই বাতাসে। সারাটা পথ সে নিঃশব্দে চলল মনের ভেতর এক অদ্ভুত টানাপোড়েন, যেন কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে আজই।
মেসে ফিরে সে নিঃশব্দে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করল। ছোট্ট রুমটা পরিচিত গন্ধে ভরে আছে । মাটির গন্ধ, বইয়ের ধুলো, আর জানালার পাশে রাখা একগুচ্ছ শুকনো ফুলের সুবাস। ব্যাগটা বিছানার পাশে রেখে তামিমা ওয়াশরুমে ঢুকে মুখে জল দিল, ঠান্ডা জলে যেন মাথাটা একটু হালকা লাগল। ফ্রেশ হয়ে এসে সে চা আর বিস্কুট নিয়ে বসলো, ততক্ষণে রুমমেট বান্ধবী সুমাইয়া বই হাতে চুপচাপ বসে ছিল।
তামিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎই সব খুলে বলল। কীভাবে স্যার তাকে ডাকলেন, কার্ড দিলেন, চাকরির প্রস্তাব রাখলেন। সুমাইয়া মন দিয়ে শুনল সবকিছু, তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল।
-"দেখ তামিমা, চাকরিটা তোর জন্য সত্যিই দরকার। চাচা-চাচী তো তোর খোঁজও নেয় না। তুই এখন একা, নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে কে তোর পাশে থাকবে বল?”
তামিমা চুপচাপ বসে রইল। চোখ দুটো জানালার বাইরে চলে গেল আকাশে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে, দূরের আলোগুলো ঝাপসা হয়ে উঠছে। মনে হলো, জীবনের একটা নতুন অধ্যায় হয়তো দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু সেই দরজার ওপাশে কী আছে ,আলো না অন্ধকার তা সে নিজেও জানে না।
----------------------
সেই কখন থেকে একটানা, বিরামহীনভাবে ফোনটা বেজেই চলেছে ।ঘরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সেই শব্দটা মহুয়ার মস্তিষ্কে সূচের মতো বিঁধছিল, তবুও সে কোনো আগ্রহ দেখাল না।
এই অমানুষটার সাথে তার কথা বলার কোন আগ্রহ নেই।
তবুওমনের অজান্তে, অবচেতন টানেই সে ফোনটার দিকে তাকালো। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ৩৩টা মিসড কল।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল মহুয়া। বুকের ভেতর হালকা একটা ব্যথা খেলল।
ফোনটা হাতে তুলে নিল সে হাত টা কেঁপে উঠল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর ধীরে ধীরে নাম্বারটার উপর চাপ দিল “Add to Blacklist.”
কিছুক্ষণ পর মহুয়ার কানে এল মৃদু একটা আওয়াজ ।মিনি যেন কারো সঙ্গে কথা বলছে। মহুয়া প্রথমে পাত্তা দিতে চায়নি, কিন্তু কৌতূহলটা যেন তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিল। সে নিঃশব্দে কয়েক কদম এগিয়ে গেল দরজার কাছে।
দূর থেকে শব্দগুলো ভেসে আসছে ভাঙা ভাঙা ভাবে, তবুও কিছুটা বোঝা গেল।
মিনির কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা, যেন অতীতের কোনো গোপন ভালোবাসার সুর ঘুরে ফিরে এসেছে তার গলায়।
"তুমি এখনো আগের মতই আমাকে ভালোবেসো, আমি জানি... আমার ভালোবাসা তোমাকে আমার থেকে দূরে থাকতে দেবে না..."
মহুয়া থমকে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। তার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে মিনি রাহুলের সাথেই কথা বলছে।
ফোনের ওপাশ থেকে কি বলা হলো তা বোঝা গেল না, কিন্তু মুহূর্তের নীরবতার পর মিনি আবার ফিসফিস করে বলল-
"আজ রাতেই সেটা হবে..."
ফোনটা টেবিলে রেখে দিল মিনি, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর গুনগুন করতে করতে কোনো পুরনো গানের সুর তুলল।
"তুমি আসবে বলে, মন আজও জানালা খুলে রাখে..."
গান গাইতে গাইতে সে সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগল, তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল ।
মহুয়া স্থির দাঁড়িয়ে রইল দরজার পাশে, বুকের ভেতরটা যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটাচ্ছে।
সন্ধ্যা নেমে আসতেই রাহুল আর নিপা একসাথে বাড়ি ফিরলো। বাহিরে থেকে এদের দুই ভাইবোনকে দেখলে চেনার উপায় নেই যে এরা দুজন আলাদা মনের মানুষ। একজন ভালো আরেকজন খারাপ।
রাহুল আসার সাথে সাথেই মিনি গিয়ে তার শার্ট খুলে দিতে লাগলো কিন্তু রাহুল মিনিকে এক ধাক্কায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে হনহনিয়ে ঘরে ঢুকলো।
- সুইটহার্ট তোমার ফোন টা আমাকে একটু দাও তো ।
মহুয়া ফোন টা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিতেই সে পুরো ঘরজুড়ে একটা শব্দ হলো । মহুয়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
- এ...... এটা আপনি কী করলেন?
- যেটা দিয়ে আমরা সাথে কথা বলো নি সেটার অস্তিত্ব আমি এ বাড়িতে রাখবো না।
- আর আমি যদি বলি যে মেয়ে আমার স্বামীর দিকে নজর দিবে আমি তার অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে দিবো।
- কি বললে তুমি সুইটহার্ট? আমি তোমার স্বামী? তুমি আমাকে স্বামীর মর্যাদা দাও? আমি মানছি আমি খারাপ কিন্তু এই রাহুল যদি এই পৃথিবীতে কাওকে মন থেকে ভালোবেসে থাকে তাহলে সেটা একমাত্র তুমি। এই খারাপ মানুষটাকে তুমি মানিয়ে নাও।
- বুঝলাম আপনি খারাপ কিন্তু তাই বলে আপনি মিনির সাথে কি কথা বলেছেন। আর রিয়া নাকি আপনার গার্লফ্রেন্ড ছিল?
- নিজের বিয়ে করা বউ যদি আমাকে এ্যাভোয়েট করে তাহলে আমার কিই বা করার করা উচিত? বউকে সাজিয়ে রাখার জন্য বিয়ে করিনি ,, সারাদিন বউ এর সাথে শুয়ে থাকার জন্য বিয়ে করেছি। মাইন্ড ইট!
আর কি বললে রিয়া আমার গার্লফ্রেন্ড?
তুমি জানলে কি করে যে রিয়া আমার গার্লফ্রেন্ড? এবাড়িতে পা দিতে না দিতেই গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিয়েছো, ?
এই বলে মহুয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রাহুল বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
মহুয়ার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। ফোনটা তার বাবা তাকে গিফট করছিলো। সেটা আজ লন্ডভন্ড হয়ে গেল। অজান্তেই কান্নায় ভেঙে পড়লো সে।
রওশন আরা বেগম তখন রান্নাঘরে রান্না করছিলেন মহুয়ার কান্নার শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখেন ভাঙ্গা ফোন টা বুকে জড়িয়ে কাঁদছে।
রওশন আরা বেগম মহুয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো - কাঁদিস না মা আমি রাহুল কে বলবেো তোর জন্য আরো একটা ফোন নিয়ে আসতে।
আমার ছেলেটা একটু রাগী । ও এমনই করে । একটু মানিয়ে নে মা । স্বামী যতই খারাপ হোক না কেন স্ত্রীর উচিত স্বামীকে আগলে রাখা । ভালোবাসা দিয়ে আটকে রাখা । নয়তো পুরুষ মানুষের মন কখন কি হয় বলা যায় না।
রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি।
দরজায় কড়া নাড়তেই মহুয়া দরজা খুলে দিল। রাহুল এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মহুয়ার গায়ের উপর।
ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আচমকা ভারী হয়ে উঠল। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে মনে হলো, শুধু রাহুলের টলমল পায়ের শব্দ ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপে যেন মেঝের ওপর গলে পড়ছে তার মাতলামির ছায়া। বাতাসে তীব্র মদের গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে ঘামের ভারি, উষ্ণ গন্ধ ,যা ধীরে ধীরে মহুয়ার নিঃশ্বাসে ঢুকে বুকের ভেতর পর্যন্ত জ্বালিয়ে তুলছে।
এই ঘরটা হঠাৎ করে আর চেনা লাগছে না। চারপাশের দেয়ালগুলো যেন সরে এসে মহুয়াকে ঘিরে ফেলেছে ।একটা অচেনা অন্ধকার খাঁচার ভেতরে সে বন্দি, আর সেই খাঁচার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রাহুল একজন মানুষ নয়, যেন এক শিকারি পশু, যার চোখে রক্তচাপা আগুন।
রাহুলের চোখে মাতাল ক্রোধ, আর অস্থিরতা একসঙ্গে মিশে এক পাগলাটে শিখায় পরিণত হয়েছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত দহন যা একই সঙ্গে মহুয়ার মনে ভয় আবার অজানা এক টানেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
মহুয়া জানে না সে কী করব, কোনদিকে পালাবে। শরীর কাঁপছে, বুকের ভেতরটা টানটান হয়ে আছে। যেন চারপাশের বাতাসও জমে গেছে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
ঠিক তখনই রাহুল টলতে টলতে এগিয়ে এল মহুয়ার দিকে। তার নিঃশ্বাসে ভারী মদের গন্ধ, কপালের ঘাম গড়িয়ে গলা বেয়ে পড়ছে তার উষ্ণ শরীরের তাপ মহুয়ার চারপাশের বাতাসকেও গরম করে তুলছে।
এটা দ্বিতীয় বার সে কোনো পুরুষের এতটা কাছে এতটা অস্বস্তিকর অজানা ভাবে বিদ্যুতায়িত হচ্ছিল।
মহুয়া পেছাতে গিয়ে হঠাৎ দেয়ালে ঠেকে গেলো ।দেয়ালটা ঠান্ডা, কিন্তু মহুয়ার শরীর জ্বলছে।
পালানোর কোনো পথ নেই।
এক মুহূর্তের জন্য মহুয়া আর রাহুলের চোখ এক হলো একটা দীর্ঘ, নীরব, ভয়ংকর দৃষ্টি, যেখানে ভয়, রাগ, আর এক অচেনা আকর্ষণ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। মহুয়ার বুকের ভেতর ধুকপুক ধ্বনি তীব্র হয়ে উঠছে, মনে হচ্ছে যেন এই শব্দটাই ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ফেলবে।
রাহুলের চোখে তখন আর ক্রোধ নেই ।বরং এক গভীর, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি। মদের ঘোর ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে, তার জায়গায় জন্ম নিচ্ছে এক অন্যরকম আকাঙ্ক্ষা। মহুয়া অনুভব করছে তার নিজের ভেতরেও কিছু একটা বদলে যাচ্ছে ।ভয়ের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এক অদ্ভুত টান, এক ঝড়ের মতো অজানা অনুভব।
চারপাশ নিস্তব্ধ। জানালার কাঁচে বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে, পর্দা দুলে উঠছে। বাইরে হয়তো রাত আরও গভীর হচ্ছে, কিন্তু ভেতরে… ভেতরে দুইজন মানুষ এক অদ্ভুত সীমারেখায় দাঁড়িয়ে ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অনিশ্চয়তা আর নীরব উত্তেজনার জটিল জালে আটকে।