অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ১৭

🟢

তামিমা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজের ভয় আর ঘৃণাকে পেছনে ফেলে দিয়ে ,ধীরে ধীরে মৃদু সুরে পা বাড়ালো,

গানের তালে তালে তার নাচ শুরু হলো। হাতের আন্দোলন, শরীরের ঘূর্ণন, চোখের ভিবি সবই যেন গানটির সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন কাহিনি বলছে। প্রতিটি পা মাটিতে স্পর্শ করার সাথে সাথেই যেন হলের স্থিরতা ছিঁড়ে যাচ্ছে, মন আর হৃদয়ে জাগছে অন্য রকম একটা অনুভূতি।

নাচ শেষে স্টেজ থেকে নামতেই রায়হান এসে তার হাত ধরে বললো চলো আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসছি ।

তামিমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো , মনে হলো আজকেই হয়তো তার শেষ দিন । প্রথমে না না করলেও পরে রায়হান চৌধুরীর জোড়া জোড়িতে মেয়েটা বাধ্য হয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।

গাড়ি চলেছে আপন গতিতে কিন্তু গাড়িতে বসে থাকা মেয়েটার মনে প্রচন্ড ঝড় বইছে। যা বাইরের কেউ টের পাচ্ছে না।

গাড়িটি এসে থামলো এক আভিজাত্য রিসোর্টের সামনে । তামিমা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে বরফের মত জমে গেল। কি থেকে কি হয়ে গেল ।

রায়হান চৌধুরী তামিমাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা রুমের দিকে পা বাড়ালো । মেয়েটা ছটফট করতে লাগলো । পিছু হটতে চাইছিল, চিৎকার করতে চাইছিল। কিন্তু তার শব্দ যেন কোনোকিছুতে আটকে গেছে, চারপাশে নিস্তব্ধতা আর দমবন্ধ করা হাওয়া।

কিন্তু সেসবে কোন পাত্তাই দিল না কামুক পুরুষটা । মনে হচ্ছে নিজের পুরুষত্বটা দেখাতে পারলেই বাঁচে।

অবশেষে একটা নরপশুর কাছে ধরা দিতেই হলো মেয়েটিকে।

-আমি কি তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবো ?

- সেটার আর প্রয়োজন নেই রায়হান চৌধুরী!আর‌ কখনো আমি আপনার সামনে আসবো না । কখনোই না । মেয়েটার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পরছে।

- তোমাকে আসতেই হবে তামিমা কারন তোমার ইজ্জত এখন আমার হাতে এই বলে মোবাইল ফোন অন করে তার নগ্নতার ভিডিও বের করে দিলো ।

তামিমা কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো।আজ তাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই । গগনবিদারী চিৎকার দিলেও মেয়েটার দুঃখ কমবে না ‌।

দরজা খুলে বাইরে আসতে গেলে রায়হান চৌধুরী তামিমার হাতটা নিজের শক্ত পোক্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে - যাচ্ছো কোথায়?

-জাহান্নামের চৌরাস্তায়।

-যেখানেই যাও কিন্তু একটা কথা সবসময় মাথায় রাখবে । তোমাকে আমার প্রয়োজন । আর যখন ডাকবো আমার ডাকে সাড়া না দিলে । আজকের এই ভিডিওটা পুরো বিশ্ব দেখবে ।

তামিমার পা ওখানেই আটকে গেল। পায়ের ধাপ আর সামনের দিকে এগুচ্ছে না । তবু কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল । মেয়েটা।

এভাবে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করে রিসোর্টে নিয়ে যেত সরল মেয়েটাকে।

অবুঝ মেয়েটা এখন অনেককিছুই বুঝতে শিখেছে।সে আর এই পাপের খেলা খেলতে চায় না সে চায় একটা হালাল সম্পর্ক। কারণ এছাড়া তার আর কোন উপায় নেই । রায়হান চৌধুরী তাকে ছাড়বে না , অন্য কোথাও বিয়ে করতেও দিবে না।

কূটবুদ্ধিসম্পন্য পুরুষ টা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শুধু মেয়েদের ব্যাবহার করতে চায় । এতে সে পৈশাচিক আনন্দ পায় ।

তামিমা বহুবার বলেছে তাকে বিয়ে করতে, আর না হয় এই অবৈধ সম্পর্কের ইতি টানতে কিন্তু রায়হান চৌধুরী শুধু সময় চায় ।কারন সে যদি আরো একটা বিয়ে করে তাহলে সমাজের চোখে সে চরিত্রহীন উপাধি পাবে ‌আর তামিমার মতো একটা সুন্দরী মেয়েকে ছেড়ে দিলে তার পস্তাতে হবে।

অবুঝ মেয়েটা সেটা আস্তে আস্তে বুঝতে শিখে গেছে । কিন্তু সে নিরুপায় কারন তার নগ্ন ভিডিও যে এই নরপিশাচটার কাছে আছে । ছলে বলে কৌশলে বহুবার চেষ্টা করেছে ভিডিও ডিলিট করার কিন্তু কোন ভাবেই সে পারেনি।

আজো একই ভাবে রায়হান চৌধুরীর কাছে আবদার করছে মেয়েটা আমাকে বিয়ে করে তোমার ঘরে নিয়ে যাও কিন্তু রোজকার মতন আজকেও একই স্বান্তনা আর কটা দিন সময় দাও ।

_______________

রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি রাহুল এখনো হসপিটালেই আছে । আজকে রাত দশটা ত্রিশ মিনিটে একটা জটিল অপারেশন আছে ।

রাতের অন্ধকার ভেদ করে সাঁই সাঁই করে হসপিটালের দিকে ছুটে আসছে একটা প্রাইভেট কার। গাড়ির ভেতর মেয়েটি প্রসব বেদনায় ছটফট করছে । অবশেষে গাড়িটি হসপিটালের সামনে এসে থামলো। গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো চারজন মানুষ তিনজন মহিলা আর একজন পুরুষ । তিনজন মহিলার মধ্যে একজন প্রসব বেদনায় ছটফট করছে।

একটা নার্স এসে জানালো রোগীকে তাড়াতাড়ি ভর্তি করাতে হবে । রাইশা নামের মেয়েটিকে ভর্তি করানো হলো । এক ঘন্টা পর। অপারেশন করা হবে ।

একজন নার্স এসে রাহুল কে বলে গেল স্যার একটা জটিল অপারেশন করতে হবে আর সেই অপারেশন টা আপনাকে করতে হবে ।

রাহুল শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো ।

এক ঘন্টা পর অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে রাহুল রীতিমতো অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে গেলো । ওটিতে থাকা মেয়েটি আর কেউ নয় তারই প্রাক্তন প্রেমিকা রাইশা জামান।

শরীরের ভারে মেয়েটি নুইয়ে পড়েছে । এতোক্ষণ ধরে প্রসব বেদনায় ছটফট করলেও এখন সে অজ্ঞান হয়ে বেডে শুইয়ে আছে ।

বিজ্ঞাপন

এই সেই রূপবতী মেয়েটা যাকে রাহুল চৌধুরী প্রেমের ফাঁদে ফেলে মেয়েটার সরলতার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিলো । আজ থেকে প্রায় নয় মাস আগে মেয়েটার সাথে সে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণ একটাই ,রাহুলের নতুন একজন মেয়ে প্রয়োজন । রাইশা বহুবার সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।

অবশেষে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে কিন্তু ছোট একটা অস্তিত্ব যে রয়ে যাবে সেটা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি কেউ।

দিন যতই যাচ্ছে রাইশার শারীরিক পরিবর্তন ততই বেশি হচ্ছে । হাজার চেষ্টা করেও সেই নিষ্ঠুর গোপন সত্যটা লুকাতে পারলো না সে । অবশেষে সমাজের কাছে বে'শ্যা উপাধি পেয়ে একটা নির্জন জায়গায় বাস করতে হলো তাকে । বাবা মা অনেকবার বলেছে এই জা'র'জ সন্তান টা নষ্ট করে দিতে । কিন্তু রাইশা এই সন্তান টাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । বাবা মায়ের কথা অমান্য করায় বাবা মাও একদিন বাড়ি থেকে বের করে দিলো। দিবে নাই বা কেন । সমাজ যে তাদের আলাদা করে রেখেছে।

অসহায় মেয়েটা একটা বুড়ির কুটিরে আশ্রয় নিলো। বুড়ি আর কতো ভালো করেই বা দেখভাল করবে, তারই তো নুন আনতে পান্তা ফুরায়।

যেখানে প্রেগন্যান্সি থাকাবস্থায় একটা মেয়েকে পুষ্টিকর খাবার খেতে হয় , সেখান রাইশা শুধু দু বেলা দু মুঠো খাবার খেয়েই দিন কাটতো।

এভাবেই নয়টা মাস পেরিয়ে গেলে । একেকটা রাত যেন একেকটা বছরের মতো মনে হতো তার কাছে । অনেকবার রাহুলের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি ।

অতঃপর একদিন প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে হসপিটালে আসতে লাগলো আর একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা লেগে গগনবিদারী চিৎকার করে সেখানেই লুটিয়ে পড়লো।

আজ রাহুল নিজেই মেয়েটার অপারেশন করলো । কিন্তু হায় ! ভেতরের সেই ছোট্ট প্রানটা পৃথীবিতে আসার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেছে ।

নিষ্প্রাণ দেহটাকে এক মুহূর্তের জন্য কোলে নিলো রাহুল। ছেলেটা দেখতে হুবহু তারই মতো । কোথাও একটুও অমিল নেই । এটা তারই অংশ? নাকি এটা একটা পাপের ফল ? যাকে আল্লাহ পাক ইচ্ছে করেই দুনিয়াতে না এনে একেবারে তার কাছে নিয়ে গেছে? একবার নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো ।

নার্সরা সবাই বলাবলি করছে যে রাহুল চোধুরী কেন এই মৃত বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আছে । কিন্তু রাহুল কারো কোন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে এক ধ্যানে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে।

একজন নার্স এসে বললো -স্যার মেয়েটাও মারা গেছে। আর যে লোকগুলো ওকে হসপিটালে দিয়ে গেছে তারা ওর কেউ না । মেয়েটাকে নাকি তারা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছিলো তাই হসপিটালে ভর্তি করেছে। এখন এই লাশ দুটো কোন ঠিকানায় পৌঁছে দেবো স্যার?

- আমি নিয়ে যাব এদের । তুমি সব ব্যবস্থা করো । আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। এদের।

সবাই অবাক হয়ে গেল। কারন এতো দিন এইধরনের ঘটনা কখনো ঘটেনি । যে একজন ডাক্তার একটা পরিচয়হীন মৃত রোগীকে নিয়ে গিয়ে নিজের কবরস্থানে দাফন করবে । আর রাহুল চোধুরী তো নয়ই।

কিন্তু আজ সেই রাহুল চোধুরী কেন এমন করছে । মেয়েটার সাথে তার কি সম্পর্ক? সবাই একে অপরের বলাবলি করছে ।

কিন্তু রাহুলের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই । সে তার সিদ্ধান্তে অটল ।

সবার কথা উপেক্ষা করে লা'শ দুটোকে নিয়ে আসা হলো রাহুল চোধুরীদের পারিবারিক কবরস্থানের সামনে । সেখানেই তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হলো ।

সাদা কাফ'নে মোড়ানো ছোট্ট নিষ্প্রাণ দেহটাকে কোলে নিলো রাহুল চোধুরী। কান্না যেন আজ আর বাঁধ মানছিলো না । আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কান্না করতে লাগলো ।

নিজ হাতে ছেলেটাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

-আমি আগে যদি জানতাম তুই এই দুনিয়ায় আসবি বিশ্বাস কর আমি ভালো হয়ে যেতাম । তোর মা টাও না ভীষণ চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলো । আমাকে একবারও বলেছে তোর আগমনের কথা । না বলেনি তো । এটাই বোধহয় আমার পাপের শাস্তি বুঝলি!

পারলে আমাকে মাফ করে দিস । ওপারে ভালো থাকিস ।

চারিদিকে ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে এলো রাহুলের কানে ।

দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে উঠে গেল বাড়ির দিকে । কলিং বেল বাজাতেই । রওশন আরা বেগম এসে দরজা খুলে দিলেন ।

- সারা রাত কোথায় ছিলি ? বাড়িতে বউ রেখেও অন্য মেয়েদের সাথে রাত কাটিয়ে এই ভোরবেলা বাড়ি ফিরছিস কেন বল ? তোকে আজ একটা শিক্ষা দিয়েই ছাড়বো ।

এই বলে রাহুলের কলার ধরে কানের কাছে পরপর চারটা চড় বসিয়ে দিল ।

রাহুল কোন কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মায়ের সামনে ।

- সেই কখন মেয়েটাকে একা একটা ঘরে আটকে রেখেছিস সেই খেয়াল আছে তোর? একটা মা'গি'বা'জ বাড়িতে আসছে সেটা একবারও মাথায় আসেনি তোর ? সারাটা দিন মেয়েটা কতো কষ্ট করলো সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নাই ।

-আমি যাচ্ছি মা ।

মহুয়াকে খাবার দিয়ে এসেছিলে ?

-হুম....।

-আমাকে এক কাপ কফি এনে দিতে পারবে মা? প্লিজ!

এই বলে রাহুল টলমল পায়ে ধীরে ধীরে রুমের দিকে এগিয়ে গেল। চোখদুটো লালচে, মুখটা ক্লান্ত আর বিমর্ষ হয়ে আছে। মনে হচ্ছিল যেন শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে, ভারসাম্য রাখতে রাখতে একপা একপা করে হাঁটছিল সে। তার হাঁটার শব্দটুকুও যেন ভারী লাগছিল, ঘরের নিস্তব্ধতায় সেই শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছিল এক অদ্ভুত বিষণ্নতায়। দরজার কাছে পৌঁছে এক মুহূর্ত থেমে, গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল ।তারপর আস্তে করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প