দরজা খোলার শব্দ শুনে মহুয়া মাথা উঁচু করে দরজার দিকে তাকালো। রাহুল কে দেখে মহুয়ার ভীষণ রাগ হলো । রাগ হবে নাই বা কেন। সারাটা দিন চলে গেল রাতও চলে গেল এখন বাজে ভোর পাঁচটা । এতো সময় ধরে একটা মেয়েকে একা একটা রুমের ভেতর বন্দি করে রেখে চলে গেছে । এক বারও কি মনে হয়নি যে ঘরে একটা মেয়েকে বন্দি করে রেখে আসছে সে।
কেন তার এগুলো মনে হবে ,? সে তো একজন পাষান মনের মানুষ । যার ভেতর কোন দয়া, মায়া , ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই আছে শুধু নারী ভো'গ করার নেশা। এই নেশাই একদিন তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিবে। সেদিন কেউ বাঁচাতে পারবে না তাকে। কারন আল্লাহ ছাড়া দেয় কিন্তু ছেড়ে দেয় না।
এসব ভাবনার মাঝে অস্ফুটন স্বরে রাহুল বলল- সুইটহার্ট আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবে ?... মাথাটা প্রচুর ব্যাথা করছে । প্লিজ সোনা না করো না । একটা আবদার রাখো। আর কখনো তোমায় কিছু বলবো না । আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করছি ।
এই বলে রাহুল মহুয়ার উ,রু,র উপর মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো ।
মহুয়া রাহুলের মাথাটা তার কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে সোজা জানালার পাশে গিয়ে একটা বেঞ্চ নিয়ে বসে পড়লো।
রাহুল সেখানেই শুয়ে রইলো।
মহুয়া জানলার দিকে তাকিয়ে আনমনে কি যেন ভেবে যাচ্ছে । তখনি রাহুল রেগে গিয়ে বলে উঠলো- আমার সাথে এমন আচরন না করলে কি তোমার শান্তি হয় না ।
কেন আমার সাথে এমন করতেছো। তুমি জানো আমি যদি এখনই মিনিকে ডাকতাম ও এক মুহূর্তও দেরি না করে আমার সেবা করার জন্য চলে আসতো । আর তুমি এতো অবাধ্য কেন মহুয়া ।
মহুয়ার রাগটাও তখন বেড়ে গেল । সে রাহুলের কাছে এসে বললো - তো ডাকুন না আপনার সেই থার্ড ক্লাস গার্লফ্রেন্ড মিনিকে। আমি চলে যাচ্ছি। এখনি চলে যাচ্ছি। আপনি থাকেন আপনার মতো আর আমি থাকি আমার মতো । এই বলে মহুয়া ছোট একটা ব্যাগে নিজের কয়েকটা কাপড় গুছিয়ে নিয়ে দরজা খুলতেই পিছন থেকে রাহুল হত ধরে বললো । কোথায় যাবে তুমি?
মহুয়া রাহুলের থেকে হাত ঝাড়ি দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো - যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে চলে যাবো।
--আমি যদি নিজেকে শুধরে নেই তুমি থাকবে আমার সাথে?
এই বলে মহুয়াকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে জরিয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো মহুয়ার বুকে মুখ গুঁজে কান্না করতে লাগলো।
-আমি আর এইসব পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে পারছি না মহুয়া ।
কাঁদতে কাঁদতে মহুয়ার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বাইরে। মহুয়া রাহুলের থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু পারছে না অবশেষে ক্লান্ত হয়ে রাহুলের পিছনে পিছনে যেতেই হলো। একদম কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে ,সদ্য মাটি দেওয়া কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল । দুই হাতে দুই মুষ্টি মাটি নিয়ে বললো দেখো না এখানে আমার অস্তিত্ব শুয়ে আছে । চিরদিনের জন্য সে হারিয়ে গেছে । আর কখনো সে ফিরে আসবে না মহুয়া ! আর কখনো না ।এ ছোট শিশুটিকে আমি একাই নিজে হাতে দাফন করেছি ।
মহুয়া রাহুলের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলো না।
রাহুল আবার বলে উঠলো - ওর .... ওর মায়ের মতো তুমিও যেন আমার সাথে দুই নাম্বারি করো না মহুয়া । এক নাম্বার ছলোনাময়ী ছিলো ওর মা । ওর আগমনের কথা একটা বারের জন্য আমাকে বলেনি । আমি কি এতোটাই খারাপ যে আমাকে বলা যেত না?
মহুয়ার কাছে এবার সব পরিষ্কার হয়ে গেল । সে রাহুলের কাঁধে হাত রেখে বলল- তারমানে উনি আপনার সন্তান ? আর ওর মা কোথায়? আপনি তার মানে আমাকে বিয়ে করার আগে আরো একটা বিয়ে করেছেন?
রাহুল হাত দিয়ে মেয়েটির কবর দেখিয়ে দিয়ে বললো - ওর মা ওখানে শুয়ে আছে ।
আর ওর মা আমার বিয়ে করা বউ নয় আমি শুধু তাকে ভালোবাসতাম ।
রাহুলের কথা শেষ না হতেই মহুয়া রাহুলের গালে সজোরে পর পর দুইটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
-লজজা করে না এসব করতে এই অবৈধ পাপের খেলা আর কতোদিন খেলবেন? বন্ধ করুন এসব পাপের খেলা । অবৈধ সন্তান বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেছে সেটাই ভালো হয়েছে । এখনে তো কান্নার কোন কারণ নেই।
- ও যে দেখতে আমার মতো হয়েছিলো মহুয়া ওর চেহারাটা আমার সামনে ভাসছে । তুমি পারবে মহুয়া ওর মতো একটা বৈধ সন্তান আমাকে দিতে । বিশ্বাস করো আমি সবকিছু ছেড়ে দেবো।
মহুয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল - ভুতের মুখে রাম নাম মানায় না মি. রাহুল। আমি কখনোই আপনার অস্তিত্ব পেটে ধরবো না ।
এই বলে হনহন করে ঘরে চলে গেল মহুয়া । রাহুলও মহুয়ার পেছন পেছন ঘরে ঢুকলো।
তখন চারপাশে যেন শান্তির রাজত্ব নেমে এসেছে; গাছগাছালির মধ্যে পাখিদের কিচিরমিচিরও তীব্র নীরবতা। আকাশের নীলছায়া ধীরে ধীরে উজ্জ্বল কমলায় মিশতে শুরু করছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্য লাজুকভাবে তার প্রথম রৌদ্রের আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে, আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে কুয়াশাচ্ছন্ন মাঠ আর শিশিরভেজা পাতা; প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন এক দিনের উন্মেষের প্রতিশ্রুতি বহন করছে।
কালকের মতো আজকেও মহুয়াকে ঘরে আটকে রেখে রাহুল বেরিয়ে গেল।
________
রওশন আরা বেগম ছেলের প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে দিতে আস্তে করে বললো মেয়েটাকে খাবার দিয়ে আয় । নয়তো কালকের মতো আজকেও সে না খেয়ে পড়ে থাকবে ঘরে।
রাহুল এক লোকমা খাবার মুখে নিয়ে বললো সেই চিন্তা তোমাকে করতে হবে না । ও ওখানে মরে যাক।
রওশন আরা বেগম দাঁত কটমট করতে করতে বলল পাষান একটা । জাতের মতোয় হইছে। বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে।
রওশন আরা বেগমের কথা শুনে রায়হান চৌধুরী রেগে গেলেন । সে এখনই ঘুম থেকে উঠেছে আর এই কথা শুনে বললো - ও কেন বেরিয়ে যাবে রওশন । ও তো আমার একমাত্র উত্তরসুরী । বেরিয়ে গেলে এ বাড়ির মহিলারা বেরিয়ে যাবে ।
এই বলে রাহুলের পিঠে হাত দিয়ে বললো - তো বাপ ! বিয়ে শাদি করেছিস ভালো কথা কিন্তু বউকে এ বাড়িতে আনিসনি কেন । আমার একমাত্র পুত্র বিয়ে করেছে আর আমি বউ এর মুখ দেখবো না সেটা হয় নাকি ।
- বাবা এ ব্যাপারে আমাকে জোর করে কোন লাভ হবে না কারণ মহুয়াকে আমি একটা ফুলের টোকাও লাগতে দেবো না।
এই বলে রাহুল হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল ।
রোজকার মতো আজও হাসপাতালের করিডোরে রোগীর ভিড় জমতে শুরু করেছে। রাহুলের চেম্বারের দরজার সামনে লম্বা লাইন।
দেয়ালের ঘড়িতে মিনিটের কাটাগুলো শুধু এগিয়েই যাচ্ছে, আর রাহুল একের পর এক রোগী দেখে চলেছে। কপালে হালকা ক্লান্তির রেখা, কালকে রাতের ঘটনা তাকে বার বার ভেতরটা ভেঙে দিচ্ছিল তবুও মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখছে।
ঠিক এমন সময় দরজার ফাঁক দিয়ে ধীর পায়ে ঢুকলো এক অল্পবয়সী মেয়ে। কালো নিকাবের আড়ালে তার মুখের প্রায় কিছুই বোঝা যায় না শুধু চোখদুটো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, অদ্ভুত পরিচিত।
রাহুল প্রেসক্রিপশন লিখতে গিয়ে থমকে গেল।হৃদপিণ্ড যেন একবার ধপ করে থেমে আবার জোরে ধুকপুক করতে লাগল।
মেয়েটির চোখের সেই পরিচিত সুর, সেই নিস্তব্ধ দৃষ্টি… রাহুলের মনে হলো কোথাও যেন আগে দেখেছে। কিন্তু মনে করার চেষ্টা করেও কোনোকিছুই স্পষ্টভাবে মনে পড়ল না।
কৌতূহল ও অস্বস্তির মিশ্র অনুভূতি তাকে অবচেতনেই কথা বলতে বাধ্য করল।
-“নাম কি তোমার?”
নিকাবের ভেতর থেকে মেয়েটি ধীরে, অস্বাভাবিক শান্ত স্বরে বলল
-“তামিমা।”
নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাহুলের ভ্রু কুঁচকে গেল।
তার জীবনে “তামিমা” নামে কোনো মেয়ে ছিল না আর না কোনো সম্পর্ক, না কোনো স্মৃতি।তবুও কেন যেন বুকের ভেতর একটা অনির্বচনীয় ধাক্কা অনুভব করলো সে।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো কিছু একটা সম্পর্ক আছে এই মেয়েটার সাথে।
তবু পেশাদারিত্ব ধরে রাহুল আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না।
চেয়ার সামান্য পিছনে ঠেলে প্রেসক্রিপশনের কাগজটা সামনে রাখল।কিন্তু মাথার ভেতর প্রশ্নটা তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে এই ‘তামিমা’ কে?
আর কেনই বা তাকে দেখে রাহুলের বুকটা এভাবে কাঁপলো?