মহুয়া সোজা তার বাবার বাড়ি চলে গেল । রাত তখন প্রায় দুইটা বাজে । পুরো পৃথিবী যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। চারপাশের নীরবতা এতটাই ঘন হয়ে উঠেছে যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও স্পষ্ট শোনা যায়।
এতো রাতে মনোয়ারা বেগম মেয়েকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেল । মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো কি হয়েছে মা এতো রাতে তুই কেন এসেছিস আর জামাই কোথায় ?
মহুয়া কোন কথা না বলে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। মনোয়ারা বেগম মেয়ের পিছন পিছন গেল । মেয়েকে বারবার জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে , এতো রাতে সে কেন এসেছে ? কিন্তু মহুয়া কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললো মা তুমি একটু বাহিরে চলে যাও আর আমাকে একা থাকতে দাও ।
মেয়ের কথা শুনে মনোয়ারা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর মহুয়া শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে শাওয়ারের নিচে বসে পরলো। প্রায় এক ঘন্টা ধরে সে শাওয়ারের নিচে বসে আছে । মহুয়ার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পরছে।
মহুয়ার চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ে কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে, ঠোঁট কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারি হয়ে উঠছে। চোখ দুটো যেন লাল হয়ে ফুলে গেছে, তবুও অঝোরে পানি ঝরছে । শাওয়ারের জলের সাথে মিশে যাচ্ছে মহুয়ার কান্না। তার ভেতরের সব শক্তি যেন ভেঙে ভেঙে পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। পুরো বাথরুম কেমন একটা দমবন্ধ নীরবতায় ঢেকে গেছে, শুধু মহুয়ার অব্যক্ত কান্না আর জলের শব্দ মিলেমিশে এক অদৃশ্য যন্ত্রণার সুর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
রাহুলের করা আঘাতটা তার অন্তরে লেগেছে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে বিছানার দিকে তাকিয়ে রাহুলকে আধশোয়া অবস্থায় ফোন স্কল করতে দেখে ভুত দেখার মত চমকে উঠলো মহুয়া।
-আপনি কিভাবে এলেন?
কিন্তু রাহুল মহুয়ার কথার উত্তর না দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে ।সেই দৃষ্টি যেন ঘরের সমস্ত আলো টেনে নিয়ে শুধু মহুয়ার গায়ের ভেজা ফোঁটাগুলোতেই আটকে গেছে। সদ্য গোসল করে আসা মহুয়ার চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে, গলায় জমে থাকা পানির ফোঁটা ধীরে ধীরে বেয়ে নামছে কাঁধের দিকে।
রাহুলের দৃষ্টি ক্রমে গভীরতর হয়ে উঠছে। নিঃশব্দ, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ভারী। মহুয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেল, সে নিজের হাত দুটো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল অস্বস্তিতে, তবুও রাহুলের চোখ যেন তাকে ছেদ করে যাচ্ছে।
হঠাৎ রাহুলের বুকটা সামান্য ওঠানামা করল, যেন সে সিদ্ধান্ত নিল কিছু একটা। বিছানায় আধশোয়া অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসল। তারপর নিঃশব্দে পা নামিয়ে দাঁড়িয়ে গেল ।তার পুরো ভঙ্গিতেই এক ধরনের তীব্রতা, যেন ঘরে শব্দহীন ঝড় বইতে শুরু করেছে।
মহুয়া এক পা পিছিয়ে গেল, আর রাহুল ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো ।চোখে সেই একই স্থির, অপ্রকাশ্য অনুভূতির ঝড় নিয়ে।
মহুয়া পেছিয়ে আসতেই রাহুলের ভেতরের কোনও নিঃশব্দ ঝড় যেন আরও গভীর হলো। তার পায়ের শব্দ নেই, কিন্তু উপস্থিতির ভার যেন পুরো ঘরটাকে দমবন্ধ করে ফেলছে। মহুয়া দেয়ালের খুব কাছে এসে দাঁড়ালো ...ভেজা গায়ে শীতের মতো একটা স্রোত নেমে যাচ্ছে, তবুও শরীরের গভীরে অদ্ভুত উষ্ণতা জমতে লাগল।
রাহুল খুব কাছে এসে থামল। এতটাই কাছে যে মহুয়া তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করতে পারছে, যেন নিজের মধ্যকার সিদ্ধান্ত সে এখনও সম্পূর্ণ করে উঠতে পারেনি।
মহুয়া চোখ নামিয়ে নিল, কিন্তু রাহুলের দৃষ্টি তার মুখ ছাড়ল না। সেই দৃষ্টির ভেতরে রাগ নেই, অভিযোগ নেই বরং অন্য কিছু… যেন অনেকদিন চাপা পড়ে থাকা অনুভূতি নীরবে ফেটে বেরোতে চাইছে।
মুহূর্তটা এতটাই নিস্তব্ধ হয়ে উঠল যে মনে হচ্ছিল, ঘরের বাইরের পৃথিবী থেমে গেছে।
হালকা ভেজা চুলের ওপর রাহুল তার আঙুল ছুঁতে না ছুতেই মহুয়ার শরীর কেঁপে উঠল। রাহুলের আঙুলের ডগায় গরম আর শীতলতার মিশ্রণ, আর তার চোখে এক অনাবিষ্কৃত কোমলতা যা মহুয়া এতদিন দেখে নি, হয়তো বিশ্বাসও করতে পারেনি।
রাহুল আস্তে করে ডাক দিলো
-মহুয়া...
মহুয়া মাথা তুলে তাকাতেই রাহুলের চোখে সেই অদ্ভুত, টানার মতো চাহনি হতচকিত, আকর্ষণ, আর এক ফোঁটা অসহায় অনুভূতির মিলন হলো।
রাহুল খুব ধীরে মহুয়ার গাল থেকে একটি পানির ফোঁটা আঙুলের ডগায় তুলে নিল। সেই মুহূর্তে মহুয়ার শ্বাস আটকে গেল।
আলতো করে মহুয়ার কপালে চুমু খেয়ে বলল - আর কখনো আমাকে একা রেখে এভাবে আসবে না সুইটহার্ট । তোমাকে ছাড়া আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে । তুমি সেটা বুঝো না?
মহুয়া আস্তে করে মাথা নাড়ল।
রাহুল আবার বলে উঠলো ,কণ্ঠটা যেন ভেজা সন্ধ্যার বাতাসে আটকে থাকা কোনো মৃদু আকুতির মতো,“আমাকে একবার… শুধু একবার মন থেকে ভালোবেসে দেখো। আমি তোমাকে কোনোকিছুতে জোর করবো না। তুমি শুধু চেষ্টা করে দেখো… দেখো এই রাহুল কীভাবে তোমার জন্য নিজের জীবনটাও হাসিমুখে দিয়ে দিতে পারে। শুধু একবার ভালোবাসো।
কথা বলতে বলতে রাহুল আরেকটু কাছে এগিয়ে এলো। তার চোখের কোণে জমে থাকা অদ্ভুত এক ভয় যেন হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক।
একটু থেমে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলল,
“আজ তুমি আমাকে একটা কথা দাও… যতদিন আমি বেঁচে আছি, তোমার স্বপ্নে যেন অন্য কোনো ছেলের ছায়া না আসে। তুমি শুধু আমার নিয়েই ভাববে… শুধু আমাকে নিয়েই।”
তার কথাগুলোতে কোনো জোরাজুরি ছিল না, বরং এক রকম শিশুসুলভ আবদার ।কিন্তু সেই আবদারের পিছনে ছিল অনেকগুলো অদৃশ্য ক্ষত, অস্থিরতা, ভালোবাসা আর একটুকরো ভয়।
মহুয়া এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইলো।
রাহুলের মুখে সেই শিশুর মতো অসহায় দৃষ্টি, চোখে একরাশ ভরসা খুঁজে বেড়ানো প্রশ্ন , সব মিলিয়ে তার মনটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে গেল।আজ কেন জানি রাহুলের এই ছোট ছোট আবদারগুলো ফেলতে পারলো না মহুয়া। হৃদয়ের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।কী যেন এক অদৃশ্য টান বুকের ভেতর গেঁথে বসলো…।রাহুলের জন্য হঠাৎই গভীর এক কষ্ট, এক মমতা, এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ জন্ম নিল তার মনে।
মনে হতে লাগলো এই মানুষটার সুখ-দুঃখের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ বোধহয় সত্যিই নেই…রাহুলকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখলে তার নিজের হৃদয়টাও আর শক্ত রাখতে পারলো না। অবশেষে সে রাহুলকে ভালোবেসে ফেললো।
----------
সকাল সাতটায় রায়হান চৌধুরী তামিমাকে নিয়ে বাড়ি এলেন । রওশন আরা বেগম দরজা খুলে দিয়ে নিজের স্বামীর সাথে অন্য একটা মেয়েকে দেখে চমকে উঠলো। সে রায়হান চৌধুরীকে বলল- এই মেয়েটা কে ? কিন্তু রায়হান চৌধুরী কোন কথা না বলে চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেল। মেয়েটাও রায়হান চৌধুরীর পেছনে পেছনে গেল।
রায়হান চৌধুরীর কাছে থেকে কে কোন উত্তর না পেয়ে রওশন আরা বেগম তার কাছে গিয়ে আবার বললো এই মেয়েটা কে?
রায়হান চৌধুরী এবার চুপ করে না থেকে বলল- আমরা দ্বিতীয় স্ত্রী।
শব্দগুলো যেন বাতাসে ছুরি হয়ে ছুটে এলো।
রওশন আরা বেগম প্রথমে বুঝতেই পারলেন না 'আমরা’ শব্দটা ঠিক কোন সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তারপর যখন বাকিটা তার কানে স্পষ্ট হল, তিনি যেন পুরো শরীর নিয়ে থেমে গেলেন। সময় থমকে দাঁড়ালো, নিঃশ্বাস আটকে গেল।
তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো, কিন্তু সেই বিস্ময়ের নিচে ধীরে ধীরে জমতে লাগলো এমন এক ব্যথা, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তার হাতের পাতাগুলো কাঁপতে লাগলো, যেন শরীরের সব শক্তিই মুহূর্তে সরে গিয়েছে। ঠোঁটদুটো শুকিয়ে গেল।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার স্বামী, তার জীবনের অবলম্বন আজ তাকে এমন এক আঘাত দিল, যেটা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
মুহূর্তের মধ্যে রওশন আরা বেগমের মাথার ভেতর ঝড় বয়ে গেল ।বছরের পর বছর সংসার,শত ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পর্ক,তার পরিশ্রমে গড়া এই বাড়ি,তার সন্তানদের ভবিষ্যত সব কি তবে আজই মাটিতে মিলিয়ে গেল?
তিনি কিছু বলতে চাইলে শব্দ বের হলো না।গলার ভেতর যেন শক্ত কোনো পাথর আটকে গেল।তার চোখে একফোঁটা জলও পড়লো না । এমন সব আঘাত কখনো কখনো চোখের পানি বের হতেও দেয় না, শুধু ভেতরের মানুষটাকেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
রওশন আরা বেগমের চোখের সামনে সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেল। রায়হান চৌধুরীর উচ্চারিত সেই শব্দ“দ্বিতীয় স্ত্রী…”
বারবার তার কানে ধাক্কা মারছিল।
হঠাৎ যেন তার বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো। তিনি চেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরলেন, কিন্তু ততক্ষণে হাত দুটো কাঁপতে শুরু করেছে। তার ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেল, নিঃশ্বাসগুলো ভারী ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো।
"আল্লাহ…”মৃদু শব্দ বেরোল তার ঠোঁট থেকে।
পরের মুহূর্তেই তার হাঁটু ভেঙে গেল, পুরো শরীরটা নিস্তেজ হয়ে নিচে নামতে লাগলো। যেন পৃথিবী হঠাৎ করে তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। ঠাস করে এক শব্দে তিনি ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লেন। তার শাড়ির আঁচল চারদিকে ছড়িয়ে গেল, কপালের পাশে চুল মাটিতে লেগে রইলো। চোখ দুটো অর্ধেক খোলা, কিন্তু সেই চোখে কোনো দৃষ্টি নেই ,শুধু অবাক, অবিশ্বাস, আর গভীর যন্ত্রণার জমাট ছাপ।
রুমের মধ্যে একটা ভয়ানক নীরবতা নেমে এলো।
মেয়েটা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রায়হান চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন, যেন বুঝতেই পারছেন না কী ঘটলো।
রওশন আরা বেগমের নিঃশ্বাস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বুকের ওঠানামাও থেমে গেছে। তার হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে আসছে।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল রওশন আরা বেগম আর নেই।
এই অপমান, এই আঘাত, এই ধাক্কা তার হৃদয় সইতে পারেনি।