নিপাকে একটা অন্ধকার কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়েছে প্রায় এক ঘন্টা হতে চললো। অজ্ঞাত সে ব্যক্তিরা তাকে এই ঘরে আটকে রেখে গেছে কিন্তু এখন সারা ঘর জুড়ে পিনপতন নীরবতা। চারিদিকে কোন আওয়াজ সেই ঘরে নেই , নিপার কাছে এই ঘরটা একটা কবরের মতো মনে হলো।
তবুও, নিপা হাত বাড়িয়ে দেয়ালের সন্ধান করছিল; তার হাতের তালুতে শ্যাওলা ধরা, পাথুরে শীতলতার একটি অপ্রত্যাশিত স্পর্শ পেল। মেঝেটা পিচ্ছিল, মনে হচ্ছে পুরনো নর্দমার জমাট বাঁধা জল জমে আছে। যতবারই সে পা টিপে টিপে সরতে চাইছে, ততবারই তার জুতো থেকে আসা 'চপচপ' শব্দ এই মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
নিপার কানের কাছে তার নিজেরই রক্তস্রোতের দ্রুত শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাতাসের ভারি গন্ধটা যেন তার গলার কাছে এসে চেপে ধরেছে। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় সে অনুভব করছে, সে যেন পুরনো কয়লার গুঁড়ো এবং পচা পাতার গন্ধ টেনে নিচ্ছে ফুসফুসে। তার দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে।
হঠাৎ, তীক্ষ্ণ 'ক্যার্-ক্যার-র্' শব্দে নিপা চমকে উঠল, তার হৃৎপিণ্ড যেন এক লাফে কণ্ঠনালীতে উঠে এসেছে। সে সভয়ে চোখ ফেরালো শব্দটির উৎসের দিকে।
কপাট দুটি নিঃশব্দে ভেতরের দিকে সামান্য ফাঁক হয়ে গেল।
রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার এক মুহূর্ত পরই, সেই ফাঁকা অংশ দিয়ে বাইরে থেকে ভেসে আসা ম্লান, হলুদাভ আলো ভেতরে প্রবেশ করল, যা ঘরের আবছা অন্ধকারকে আরও রহস্যময় করে তুলল।
সেই আলোর রেখা অনুসরণ করে, একটি ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। মেয়েটির পদক্ষেপগুলি ছিল পরিচিত এক ছন্দের মতো, প্রতিটি পদক্ষেপেই যেন নিপার স্মৃতিতে এক ঝলক চেনা মুখ উঁকি দিচ্ছিল। নিপা তীব্র কৌতূহল ও চাপা উদ্বেগে তার আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে রইল, বারবার মনে হচ্ছে মেয়েটি তার ভীষণ চেনা কেউ। তার হাঁটার ভঙ্গি, শারীরিক গঠন ,সবই যেন এক গভীর পরিচিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু মেয়েটার মুখ মাস্ক দিয়ে ঢেকে থাকার কারণে স্পষ্ট ভাবে চেনা যাচ্ছে না ।
অপরিচিত মেয়েটা নিপার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো কেমন আছো নিপা?
নিপা চমকে উঠলো। আস্তে করে বললো - মিনি........ ভাবি.....
-তুমি কেন আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো? আর তুমি এসব খারাপ ছেলেদের সাথে কেন ?
-সেটা একটু পরেই জানতে পারবে ।
এই বলে মিনি পিছনের পকেট থেকে একটি মোবাইল ফোন বের করে নিপার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কঠিন স্বরে নির্দেশ দিল-
"এই নাও। এখুনি রাহুলকে ফোন দাও আর আমার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী তাকে এখানে আসতে বলো।"
নিপা ফোনটি ধরেও যেন এক পলক দ্বিধা করল। তার চোখ মিনির কঠিন মুখ আর চারপাশের অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই দ্বিধা দেখে মিনি যেন আরও ক্রুদ্ধ হলো। সে নিপার একেবারে সামনে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে, যা ছিল আদেশের চেয়েও তীক্ষ্ণ:
"কিন্তু একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো!"
মিনি তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নিপার কাঁধে খোঁচা দিল, যেন প্রতিটি শব্দ নিপার মনের গভীরে গেঁথে যায়।
"ভুল করেও রাহুলকে বলবে না যে তুমি আমাদের হাতে বন্দী আছো।
মিনির চোখে ছিল শীতল ধূর্ততা। সে নিপাকে দ্রুত তাগাদা দিল, তার কণ্ঠস্বরে কোনো রকম দর কষাকষির অবকাশ ছিল না:
"কুইক! সময় নষ্ট করো না।"
নিপার হৃদস্পন্দন তখন দ্রুতগতির ড্রামের মতো বাজছে, সে কাঁপতে কাঁপতে ফোনের স্ক্রিনে রাহুলের নম্বর টিপল। রিং হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে রাহুলের পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
নিপা তার গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু সামান্য কাঁপুনি ধরা পড়লই। সে মিনির মুখস্থ করে দেওয়া কথাগুলোই আউড়ে গেল:
"রাহুল... আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। তুমি কি এখনই [মিনির দেওয়া ঠিকানার নাম]-এ আসতে পারবে? হ্যাঁ, ঐ যে... পুরনো গুদামের কাছের জায়গাটা। একটু তাড়াতাড়ি এসো।"
নিপা ফোন রেখে দেওয়ার পর মিনি তার দিকে বিজয়ীর মতো হাসল। তাদের প্রথম চাল সফল হলো। এখন শুধু রাহুলের আসার অপেক্ষা।
________
রায়হান চৌধুরীর হৃৎপিণ্ডটি যেন বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। প্রতিটা স্পন্দন তার কানে ঢোল বাজাচ্ছে। মহুয়ার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে একটি গভীর শ্বাস নিল তাও যেন ভেতরের অস্থিরতা কমাতে পারলো না।
ফিসফিস করে সে দরজার শীতল হাতলটি স্পর্শ করলো। হাতলটি ধরে তার আঙুলগুলো কাঁপছিল, যেন কোনো এক নিষিদ্ধ গোপনীয়তা স্পর্শ করছে সে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে, চোখ বন্ধ করে, সে অতি সন্তর্পণে দরজাটি ঠেললো।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই কক্ষের ভেতরের মৃদু আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিন্তু আলোর উৎসকে ছাপিয়ে গিয়েছিল যে দৃশ্য, তা দেখে রায়হান স্তম্ভিত, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো যেন সময় থেমে গেছে।
সে দেখলো, মহুয়া সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
জীবনের পথ চলতে গিয়ে রায়হান বহু নারীর রূপ দেখেছে, বহু চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়েছে। কিন্তু মহুয়ার মধ্যে ছিল এমন কিছু যা তার সকল পূর্ব অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ করে দিল। তার সৌন্দর্য কেবল মুখের গড়নে বা ত্বকের লাবণ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা যেন ছিল তার সত্তা থেকে বিচ্ছুরিত এক দুর্লভ জ্যোতি।
মহুয়াকে দেখে রায়হানের সুপ্ত বাসনা কেবল চাঙ্গা হয়ে ওঠেনি, বরং তা এক গভীর, অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ে রূপান্তরিত হলো। তার চোখে মহুয়া রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ ছিল না; সে ছিল যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো আস্ত পরী, শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক নিখুঁত ছবি, বা কোনো প্রাচীন কাব্যের জীবন্ত উপমা।
মুহূর্তের জন্য রায়হানের মনে হলো, "এতো নিষ্কলঙ্ক, অপার্থিব সৌন্দর্য কি বাস্তবে সম্ভব?" এই রূপে কোনো খুঁত থাকতে পারে না, এই মানুষটির দিকে কেবল তাকিয়ে থাকা যায়। তার হৃদয়ে আবেগ আর বিস্ময়ের এক প্রবল ঢেউ উঠলো যা তার আকাঙ্ক্ষাকে আরও গভীর, আরও অস্থির করে তুললো।
মহুয়া তখন সম্পূর্ণভাবে অন্য জগতে মগ্ন। জানালার ধারে মৃদু আলোয় দাঁড়িয়ে সে রাহুলের সঙ্গে একান্ত ফোন আলাপনে ব্যস্ত। ফোনের অন্য প্রান্তের স্বর তার কানে এতই প্রিয় আর মনোযোগ আকর্ষণকারী ছিল যে, ঘরের ভেতরের বা বাইরের সামান্যতম নড়াচড়াতেও তার কান ছিল না। তার মুখে ছিল মিষ্টি হাসির রেখা, আর সে ধীরে ধীরে ঘরের কার্পেটে পা ঘষছিল, কথোপকথনের গভীরতায় সম্পূর্ণ আবিষ্ট।
ঠিক সেই সময়, রায়হান চৌধুরী নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করলো। সে যখন দরজা বন্ধ করলো, কাঠের ভারী কপাট জোড়া হওয়ার সেই ধীর, চাপা 'ক্লিক' শব্দটি মহুয়ার কানে পৌঁছাল যা নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে তীক্ষ্ণ অস্বাভাবিকতার সৃষ্টি করলো।
চমকে উঠে মহুয়া দ্রুত ফোন থেকে মুখ সরালো এবং বিদ্যুৎবেগে পিছনে তাকালো। এক মুহূর্তের জন্য তার হৃৎপিণ্ড যেন থেমে গেল।
নিজের ব্যক্তিগত শয়নকক্ষে শ্বশুরমশাই রায়হান চৌধুরীকে অপ্রত্যাশিতভাবে, দরজায় তালা লাগিয়ে দাঁড়াতে দেখে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিস্ময়, আতঙ্ক এবং এক শীতল আশঙ্কা তার সমস্ত শরীর দিয়ে যেন বয়ে গেল।
একটানা নীরবতা নেমে এলো ঘরে। মহুয়ার চোখে তখন কেবল প্রশ্ন নয়, বরং এক স্বীকৃত ভয় ফুটে উঠেছিল। রায়হানের চরিত্র এবং তার চারিত্রিক স্খলন সম্পর্কে সে আগে থেকেই শুনেছিল। লোকটির দৃষ্টিতে সে আগেও বহুবার সেই লুকানো ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছে যা একজন শ্বশুর-এর চোখে পুত্রবধূর জন্য থাকা উচিত নয়। মহুয়ার মন এক মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠলো এক্ষুনি রায়হানের এভাবে ঘরে আসা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
ভীষণ অস্বস্তিতে তার হাত থেকে প্রায় ফোনটি পড়ে যাচ্ছিল। সে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে ফোনটি দ্রুত কেটে দিলো, কিন্তু ততক্ষণে সে বুঝতে পেরেছিল এই পরিস্থিতিতে সে এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
রায়হান দরজা বন্ধ করে চাবি ঘোরানোর পরই মহুয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। তার মুখে ছিল এমন এক কদর্য হাসি যা মহুয়ার সমস্ত রক্ত হিম করে দিল। ঘরের অস্বস্তিকর নীরবতা ভেদ করে রায়হানের ভারী নিঃশ্বাস মহুয়ার কানে পৌঁছাল, যা তার ভেতরে চরম ভয় সৃষ্টি করল।
মহুয়া তখনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তার ভেতরের আতঙ্ক তাকে দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য চিৎকার করছিল।
রায়হান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল এক শীতল দখলদারীর ভাব যেন সে নিশ্চিত, তার এই অন্যায় আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে চলেছে।
"মহুয়া... এতো সুন্দর তুমি," রায়হানের কণ্ঠস্বর ছিল অস্বাভাবিক রকম চাপা এবং বিকৃত। সেই কণ্ঠস্বর মহুয়ার কাছে বিষাক্ত সাপের ফিসফিসানির মতো মনে হলো।
যখন রায়হান প্রায় তার কাছে পৌঁছে গেল, মহুয়া এক ধাপ পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার দ্রুত সরে যাওয়ার আগেই রায়হান বিদ্যুৎগতিতে তার হাত বাড়ালো।
মহুয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই রায়হান চৌধুরীর শক্ত, নোংরা আঙুলগুলো তার বাহু জাপটে ধরলো। সেই স্পর্শে কোনো আত্মীয়তা ছিল না, ছিল কেবল চরম লালসা এবং অধিকারবোধের কদর্য মিশ্রণ। সেই অপ্রত্যাশিত, আগ্রাসী স্পর্শে মহুয়ার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো, যেন কেউ তার ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছে।
"ছাড়ুন! আপনি কী করছেন?" মহুয়া আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলো। তার গলার স্বর কাঁপছিল, তবে তা চাপা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলো।
কিন্তু রায়হান তার কথা শুনতে পেল না বা শুনতে চাইল না। সে মহুয়ার বাহু আরও শক্ত করে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনলো। তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল—মহুয়ার কোমল ত্বকে তার অপবিত্র হাত ছোয়ানোর চেষ্টা। মহুয়ার শরীরের দিকে ঝুঁকে এসে রায়হান তার কাঁধের কাছে মুখ নিয়ে গেল।
মহুয়া ঘৃণা ও আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে তীব্রভাবে শরীর মোচড়াতে শুরু করলো, প্রাণপণে সেই অসহ্য, পঙ্কিল স্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো। তার মনে হলো সে যেন এক নরকের কীট দ্বারা আক্রান্ত।
মহুয়া তখনও রায়হানের হিংস্র থাবার মধ্যে ছটফট করছে। তার আতঙ্কের চিৎকার রায়হানের কানে প্রবেশ করলো না, বরং তা তার লালসাকে আরও উসকে দিল। রায়হানের হাত তখন তার শরীরকে আরও শক্ত করে চেপে ধরেছে, যেন সে তার শিকারকে কিছুতেই পালাতে দেবে না।
"চুপ করো, মহুয়া! কেউ জানতে পারবে না," রায়হানের ফিসফিসানি মহুয়ার কানে বাজলো, যা তার প্রতিরোধের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিল।
সেই মুহূর্তে, মহুয়ার মাথায় বিদ্যুতের মতো চিন্তা খেলে গেল। তাকে যেকোনো মূল্যে এই ঘৃণ্য স্পর্শ থেকে মুক্ত হতে হবে। মরিয়া হয়ে সে মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে কিছু খোঁজার চেষ্টা করলো। ঠিক তার বিছানার পাশে রাখা ছোট টি-টেবিলে তার চোখে পড়লো একটি কাঁচের তৈরি ভারী পেপারওয়েট।
নিজের সমস্ত মনোবল এবং শারীরিক শক্তি একত্রিত করে মহুয়া প্রথম চেষ্টাটি করলো। সে তার বাহুগুলো সজোরে মোচড় দিল, শরীরের ভর একপাশে ঠেলে রায়হানের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইল। কিন্তু রায়হান একজন শক্তপোক্ত, পরিণত পুরুষ, যার হাতে ছিল পৈশাচিক লালসার বাড়তি শক্তি।
মহুয়ার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
বরং তার প্রতিরোধের কারণে রায়হান যেন আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠলো। সে আরও শক্ত করে মহুয়ার বাহু চেপে ধরলো, যেন মহুয়ার হাড়গুলো গুঁড়ো করে দেবে। সেই অতিরিক্ত চাপে মহুয়া যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো, কিন্তু তবুও সে হাল ছাড়লো না।
একবার, দু'বার, বারবার সে রায়হানের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইল, ধাক্কা মারলো, মোচড়ালো কিন্তু প্রতিবারই সে সেই শক্তিশালী পুরুষের হাতের ফাঁদে বারবার আবদ্ধ হয়ে গেল। রায়হানের হাত ছিল যেন এক অভেদ্য শিকল, যা মহুয়ার সকল প্রতিরোধকে তুচ্ছ করে দিচ্ছিল।
"পারবে না তুমি," রায়হান ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠে ছিল বিজয়ীর কদর্য উল্লাস।
মহুয়া অনুভব করতে পারছিল, তার শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর রায়হানের পাশবিক শক্তি তার অসহায়তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তার হৃৎপিণ্ড তীব্রভাবে ধড়ফড় করছে, আর চোখে জল জমতে শুরু করেছে মুক্তি পাওয়ার সমস্ত পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু হাল ছেড়ে দিলে চলবে না,নিজের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে, মহুয়া এক ঝটকায় রায়হানের হাত কিছুটা আলগা করে দিল। সেই সামান্য সময়ের সুযোগ নিয়ে সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে পেপারওয়েটটি তুলে নিল।
রায়হান যখন তার আরও কাছে আসতে গেল, মহুয়া তখন কোনো দ্বিধা করলো না। জীবন-মৃত্যুর সেই সন্ধিক্ষণে, আত্মরক্ষার তীব্র তাড়নায় সে পূর্ণ শক্তিতে রায়হানের মাথার দিকে পেপারওয়েটটি ছুঁড়ে মারলো।
কাঁচের ভারী বস্তুটি সপাং করে রায়হানের কানের ঠিক ওপরে, কপালের পাশে আঘাত করলো।
'ধপাস' করে একটি চাপা আওয়াজ হলো।
আঘাতটি এতই আকস্মিক এবং মারাত্মক ছিল যে রায়হান তার আগ্রাসী ভঙ্গিমা মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল। তার চোখগুলো বিস্ফারিত হয়ে গেল, যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না কী ঘটেছে। এক তীব্র যন্ত্রণার ঝলকানি তার চোখ-মুখ গ্রাস করলো। বাহুর ওপর তার ধরা মুষ্টি আলগা হয়ে গেল।
খানিকটা রক্ত দ্রুত আঘাতের স্থান থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করলো। রায়হান টলতে টলতে তার হাত মাথার কাছে নিয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার শরীর ভারসাম্য হারালো। একটি গোঙানির শব্দ করে, রায়হান চৌধুরী মেঝের ওপর ধপাস করে লুটিয়ে পড়লো, স্থির হয়ে গেল তার সমস্ত শরীর। পেপারওয়েটটি মেঝের কার্পেটে গড়িয়ে গেল।
মহুয়া হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপতে লাগলো, তার চোখ বিস্ফারিত, হাতে তখনও আঘাতের পেপারওয়েটের শীতল স্পর্শের রেশ। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও অনিয়মিত। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না, কী ভয়াবহ কাজটি সে এইমাত্র করে ফেললো। মেঝেতে পড়ে থাকা রায়হানকে দেখে তার শরীর শীতল হয়ে গেল।