রাহুল পাগলের মতো নিপাকে দু'হাতে আঁকড়ে ধরেছিল। তার শার্টের বোতাম খুলে, বুকের মাঝে নিপার নিস্তেজ মাথাটা রেখে সে ছুটে চলছিল। সাথে মহুয়াও ছিলো। এতো কিছুর মাঝে সে ভুলেই গিয়েছিল সে একজনকে খুন করে এসেছে।
হসপিটালের স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজা পেরিয়ে সে যেন আর অপেক্ষা করতে পারছিল না, চিৎকার করে নার্সদের ডাকল ।
দ্রুতগতিতে নিপাকে ইমার্জেন্সি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সবকিছুই এক ভয়ংকর কুয়াশার মতো রাহুলের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। সে দরজার বাইরে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, তার জামাকাপড় ঘামে ভিজে চিপচিপ করছে।
কিছুক্ষণ পরে, ইমার্জেন্সি রুমের দরজা খুলে গম্ভীর মুখে ডাক্তার বেরিয়ে বললেন "আমরা চেষ্টা করেছি... কিন্তু এখানে আনার আগেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। সময়টা আমাদের হাতে ছিল না, মিস্টার রাহুল। আমরা দুঃখিত। রোগীকে আমরা মৃত বলে ঘোষণা করছি।"
শব্দগুলো রাহুলের কানে বোমা ফাটার মতো শোনাল। তার হাত-পা অবশ হয়ে গেল, যেন পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তার চোখে তখন অবিশ্বাস আর তীব্র শূন্যতায় ভরে গেল।
ডাক্তারের ঘোষণা শোনার পর রাহুল যখন পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মহুয়া তখন যেন এক অদৃশ্য ঘূর্ণাবর্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। নিপার মর্মান্তিক মৃত্যু এক গভীর শোকের কালো ছায়া ফেলেছিল, কিন্তু মহুয়ার হৃদয়ে শোকের চেয়েও তীব্র একটি জিনিস ছিল সেটা হলো ভয় এবং চরম অপরাধবোধ।
রাহুলের মুখের দিকে তাকাতেই তার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এই মানুষটা যখন দুইটি ভয়াবহ ক্ষতির কথা শুনবে তখন তার অবস্থা কেমন হবে।
মহুয়া কাঁপছিল, তার ঠোঁটদুটো বারবার খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল। শব্দগুলো যেন গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে, তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে।
সে কী বলবে?
"রাহুল, নিপার এই অবস্থার জন্য আমি দুঃখিত, কিন্তু তোমার বাবাকে আমি খুন করেছি?"
কথাগুলো তার কাছে বিষাক্ত তীরের মতো মনে হচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই সত্যটা বলার সাথে সাথেই হয়তো রাহুল তার কাছ থেকে চিরতরে দূরে সরে যাবে, হয়তো তাকে ঘৃণা করবে। এই মুহূর্তে যখন রাহুলের সবচেয়ে বেশি সমর্থনের প্রয়োজন, তখন তার সবথেকে কাছের মানুষটিই কি তার হাতে দ্বিতীয় আঘাত তুলে দেবে?
মহুয়ার মস্তিষ্কে বিপরীতমুখী ভাবনাগুলো ঝড় তুলছিল। সে একদিকে যেমন সত্য বলার তীব্র তাগিদ অনুভব করছিল যাতে এই গোপনীয়তা তাকে আর পুড়িয়ে না মারে তেমনি অন্যদিকে রাহুলকে হারানোর আতঙ্ক তাকে নিরব থাকতে বাধ্য করছিল।
সে যেন এক অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। তার পা কাঁপছে, আর সে অসহায় চোখে রাহুলের বিধ্বস্ত মুখটির দিকে তাকিয়ে ভাবছে: "কোন সময়টা সঠিক? এই কি সেই সময়? নাকি এই মুহূর্তে বললে রাহুল পুরোপুরি ভেঙে পড়বে?"
এই গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের ভারে মহুয়ার গোটা অস্তিত্ব যেন দুমড়ে যাচ্ছিল।
তামিমা মেয়েটার কথাও মনে হচ্ছিল বার বার । অসহায় মেয়েটা যে এখন কি অবস্থায় আছে কে জানে?
তাই মহুয়া আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না। তার ভেতরে চেপে থাকা অপরাধবোধের তীব্র যন্ত্রণা তাকে যেন অস্থির করে তুলেছিল। ইমার্জেন্সি রুমের সামনে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ছিল জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা, এখন কেবল মৃত্যুর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।
সে তার ভীষণ কাঁপুনি সত্ত্বেও রাহুলের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রাহুল তখনো চোখ বন্ধ করে, দেয়ালে হেলান দিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। মহুয়া তার ঠান্ডা, আর্দ্র হাত বাড়িয়ে রাহুলের রক্তমাখা শার্টের বাহুতে রাখল। এই স্পর্শে রাহুল ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার চোখে ছিল নিপার চলে যাওয়ার গভীর শূন্যতা এবং অবর্ণনীয় ক্লান্তি।
মহুয়া তার গলা শুকিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, সব দ্বিধা, ভয় এবং পরিণতি ভুলে গিয়ে, অত্যন্ত চাপা ও কঠিন কণ্ঠে সেই ভয়াবহ সত্যটি উচ্চারণ করলো। তার স্বর ছিল স্ফটিকের মতো পরিষ্কার, যা হাসপাতালের নীরবতাকে চিরে দিল।
"আজ আমি তোমার বাবাকে খুন করেছি।"
শব্দগুলো যেন কোনো সাধারণ বাক্য ছিল না এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো। মহুয়ার মুখ ছিল ফ্যাকাশে, চোখ ছলছল করছে, কিন্তু তার স্থির দৃষ্টিতে ছিল মুক্তির এক ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞা। এই স্বীকারোক্তি ছিল তার আত্মসমর্পণ এবং তাদের সম্পর্কের ওপর বিধ্বংসী এক আঘাত।
রাহুল যেন প্রথমে কিছুই শুনতে পেল না। তার মগজ এই তথ্যটিকে প্রক্রিয়াকরণ করতে পারছিল না। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল, তার চোখে অবিশ্বাসের এক তীব্র, শূন্য চাহনি। তার মুখ থেকে শব্দটি উচ্চারিত হলো না, কেবল মহুয়ার দিকে তাকিয়ে রইল যেন সে এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব কথাটা শুনেছে।
রাহুল যেন আর এক মুহূর্তের জন্যও সেখানে স্থির থাকতে পারল না। নিপাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আসার অপেক্ষা করার সময়টুকুও তার কাছে মনে হলো যেন অনন্তকাল।
দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরা নিপাকে সাদা চাদরে মুড়ে গাড়িতে তুলে নিলো। রাহুল আর কিছু ভাবল না, নিপার পাশে মহুয়াকে তুলে দিলো।
এরপর সে পাগলের মতো তার বাইকের দিকে ছুটল। ইঞ্জিন চালু করার সময়টুকুকেও তার কাছে অসহনীয় মনে হলো। সে জানে, অ্যাম্বুলেন্স তার গতিতে আসতে পারবে না, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সে এক মুহূর্তও দেরি করতে চায় না। তার মনে হচ্ছিল, এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সে যদি একটিও জিনিস ঠিকঠাক করতে পারে, তবে তা-ই হয়তো তাকে এই দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করার শক্তি দেবে।
রাহুল যেন এক উন্মত্ত যোদ্ধার মতো বাইক নিয়ে রাস্তায় নামল। নিস্তব্ধ রাতের শহর, ফাঁকা রাস্তা এগুলো যেন তার আবেগপূর্ণ দ্রুততার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছিল না। তার বাইকের গতি এখন আর গতির কাঁটার তোয়াক্কা করছে না, সেটা যেন কেবল সময়ের কাঁটাকে পেছনে ফেলে বাড়ির দিকে ছুটছে। তার বাইকের হেডলাইট অন্ধকারে এক তীক্ষ্ণ ফলার মতো পথ চিরে দিচ্ছিল।
তার ভেতরের যন্ত্রণা, ক্রোধ, আর অসহায়তা সবকিছু যেন বাইকের অ্যাক্সিলারেটরের মাধ্যমে রাস্তায় ঝরে পড়ছিল।
বাড়িতে এসে ভেতরে প্রবেশ করে রাহুল দেখল, ঘরের মাঝখানে মাটিতে নিথর পড়ে আছেন রায়হান চৌধুরী। এবং তার পাশে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে আছে তামিমা। অসহায় মেয়েটা রায়হান চৌধুরীর দেহটাকে একটি সাদা চাদর দিয়ে খুব যত্নের সঙ্গে ঢেকে রেখেছে। তার চোখ দুটো ছিল ফুলা, আর মুখটা ভয়ে ও শোকে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
রাহুল তামিমাকে দেখেও যেন দেখতে পেল না। তার দৃষ্টি কেবলই জমিনের ওপর নিথর পড়ে থাকা সেই মানুষটার দিকে, যিনি ছিলেন তার বাবা। ধীরে ধীরে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে সহস্র মনের ভার নিয়ে, সে বাবার কাছে এগিয়ে গেল।
তার হাত কাঁপছিল। নিপার মৃত্যুতে সে যে চূড়ান্ত শোক পেয়েছিল, বাবার এই দৃশ্য যেন সেই শোককে দ্বিগুণ করে দিলো। রাহুল অত্যন্ত সাবধানে এবং অকুণ্ঠ শ্রদ্ধায় সাদা কাপড়টার কোণা ধরলো। তারপর আস্তে করে, যেন কোনো পবিত্র জিনিসকে স্পর্শ করছে কাপড়টা বাবার মুখমণ্ডল থেকে সরিয়ে দিলো।
এক লহমায়, নিদারুণ সত্যটা রাহুলের চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। তার বাবা... শান্ত, স্থির, চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
রাহুল নতজানু হয়ে বসল। তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জলও পড়ল না; সে যেন ততক্ষণে সবটুকু কান্না হারিয়ে ফেলেছে। তার ভেতরে শুধু এক অসীম শূন্যতা আর স্তব্ধতা। সে শেষবারের মতো তার বাবার নিথর মুখটা দেখল, মনে মনে হয়তো সেই না বলা কথাগুলো বলল, যা জীবিত থাকাকালীন বলা হয়নি। এটি ছিল এক ভয়ংকর বিদায়, যেখানে দুটি মৃত্যুর শোক তাকে একেবারে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
রাহুল তামিমার দিকে তাকিয়ে বলল আমার বাবাকে কে মেরেছে .?
তামিমা আমতা আমতা করে বলল - আ.....আমি মেরেছি?
রাহুল এবার গর্জে উঠে বললো - সত্যি কথা বলো কে মেরেছে?
তামিমা এবার সব সত্যি বলে দিলো ।
সবকিছুই শুনে রাহুল যেন এক অন্ধ বিচারকের আসনে বসে আছে, যেখানে দুই পক্ষেই তার নিকটতম মানুষজন। সে জানে না এই মুহুর্তে তার আবেগ কাকে প্রাধান্য দেবে পুত্র হিসেবে পিতার শোককে, নাকি প্রেমিক হিসেবে মহুয়ার আত্মরক্ষার যন্ত্রণা এবং নিপার মৃত্যুর শোককে।
সে দিশাহারা হয়ে পড়ল। তার মনে হচ্ছিল যেন তার মস্তিষ্ক থেকে সমস্ত যুক্তিবোধ পালিয়ে গেছে। তার বুক ভরে উঠছিল তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় সে এই মুহুর্তে কাকে দোষারোপ করবে? মৃত বাবাকে, যার কারণে আজকের এই রক্তপাত? নাকি মহুয়াকে, যার হাতে এই রক্তপাত ঘটেছে?
এই চূড়ান্ত বিভ্রমের ভারে রাহুল মাথা নিচু করে ফেলল। চারপাশের শোক আর মৃত্যুর মধ্যেও সে যেন এক অদৃশ্য কয়েদখানায় বন্দী হয়ে গেল, যেখানে ন্যায় এবং অন্যায় এর পার্থক্য সম্পূর্ণ মুছে গেছে।
রাহুল যখন নৈতিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত বিভ্রমের মধ্যে দাঁড়িয়ে, তার সামনে পড়ে থাকা মরদেহ এবং মহুয়া ও তামিমার বিপরীতমুখী যন্ত্রণার দিকে তাকিয়ে, তার ভেতরের সমস্ত সংগ্রাম এক কঠিন সিদ্ধান্তে এসে থামল। সে বুঝল, এই সমস্ত ধ্বংসলীলার মূলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সে নিজেই দায়ী।
নিপার প্রতি তার অবহেলা, বাবার চরিত্রহীনতা অগ্রাহ্য করা, এবং মহুয়াকে জোর করে বিয়ে করে সুরক্ষা দিতে না পারা এসবকিছুর ফলস্বরূপ আজ দু'টি জীবন শেষ। আর নয়, এই অপরাধচক্রের সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন।
রাহুল আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তামিমাকে দিয়ে থানায় ফোন করালো ।
কিছুক্ষণ বাদেই নিপার নিথর দেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি বাড়ির উঠোনে এসে থামলো। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দটা যেন এক অশুভ নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে গেল। মহুয়া টলমল পায়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামতেই তার নজর আটকে গেল পেছনের দিকে। ধুলো উড়িয়ে সাইরেনহীন একজোড়া পুলিশের গাড়ি ঠিক তাদের পিছু পিছু এসে থামল।
পুলিশের গাড়ির নীল-লাল বাতিগুলোর প্রতিফলন মহুয়ার চোখে বিঁধছিল তীরের মতো। সেই দৃশ্য দেখা মাত্রই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, মুহূর্তেই অন্তরাত্মা কেঁপে বরফ হয়ে গেল। চারপাশের মানুষের কান্নার আওয়াজ তার কানে তখন ঝাপসা হয়ে আসছে; কেবল নিজের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।
তার অবশ মস্তিষ্কে কেবল একটি চিন্তাই বারবার আছড়ে পড়তে লাগল আজকেই কি তার মুক্ত পৃথিবীর শেষ দেখা? বাড়ির স্নিগ্ধ বারান্দা আর পরিচিত বিছানা কি আজ থেকে অতীত হয়ে যাবে? সে মনে মনে ভাবল, "তবে কি এই শেষ? আজকের পর থেকে আমার ঠিকানা কি তবে অন্ধকার এক জেলখানায়?" প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে মনে হচ্ছিল এক একটি যুগ, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের অবয়বগুলো তার কাছে যমদূতের মতো মূর্ত হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্রুত পায়ে কয়েকজন পুলিশ অফিসার ভেতরে প্রবেশ করলেন।
অফিসারদের চোখে ছিল পেশাদার গাম্ভীর্য এবং দৃশ্যটির ভয়াবহতা দেখে এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখেও অবিশ্বাস ফুটে উঠল। তারা এক ঝলকে দু'টি মরদেহ এবং সেখানে উপস্থিত মহুয়া ও তামিমাকে দেখে পরিস্থিতি অনুমান করে নিলেন।
অফিসারদের মধ্যে একজন, যিনি অপেক্ষাকৃত উঁচুপদে ছিলেন, সরাসরি রাহুলের দিকে এগিয়ে এলেন। রাহুল তখনো এক অপ্রাকৃতিক শান্তিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো আন্দোলন বা বাঁচার চেষ্টা ছিল না; ছিল কেবল আত্মসমর্পণের এক চূড়ান্ত ক্লান্তি।
অফিসারটি শীতল কণ্ঠে বললেন-"আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে, মিস্টার রাহুল।"
রাহুল কোনো উত্তর দিলো না, শুধু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো। যেন সে এই মুহূর্তে তার নিয়তি মেনে নিতে প্রস্তুত।
অফিসারটি যখন তার হাত বাড়িয়ে ধাতব হাতকড়া বের করলেন, সেই কর্কশ শব্দ পুরো ঘরে গমগম করে উঠল। হাতকড়া পরানোর সময়, রাহুল একবার শেষবারের মতো তার রক্তাক্ত পিতা এবং নিথর নিপার দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে ছিল না কোনো ঘৃণা, কেবল ছিল এক গভীর ব্যর্থতা এবং বেদনা।
হাতকড়া যখন তার হাতের কব্জিতে শক্ত হয়ে বসে গেল, তখন রাহুল যেন এক প্রতীকি বোঝা থেকে মুক্তি পেল। পুলিশ তাকে দু'পাশ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে এলে, সে কোনো সাহায্য ছাড়াই উঠে দাঁড়াল।
বাড়ির দরজা পেরিয়ে যাওয়ার সময় রাহুল একবার পেছন ফিরে তাকালো, যেখানে মহুয়া তখনো নিথর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। তাদের চোখাচোখি হলো, এবং সেই এক মুহূর্তের দৃষ্টি বিনিময়ে লুকিয়ে ছিল অগণিত না বলা কথা, যা হয়তো আর কোনোদিন বলা হবে না।
এরপর পুলিশ রাহুলকে গাড়িতে ওঠালো, এবং সাইরেনের আওয়াজ আবার তীক্ষ্ণ হয়ে রাতের অন্ধকার চিরে দূরে মিলিয়ে গেল। এক ভয়ংকর ট্র্যাজেডির আপাত সমাপ্তি ঘটল, এবং রাহুল সেই রাতের অন্ধকারে আইনের বেড়াজালে বন্দী হলেন।
অন্যদের করা প্রতিটি অপরাধ, প্রতিটি কৃতকর্মের গ্লানি তিনি যেন নিজের কাঁধে তুলে নিলেন বেয়াড়া ছেলেটা। তাঁর চেহারায় কোনো আক্ষেপ ছিল না, ছিল এক বিষণ্ণ সংকল্প। তিনি জানতেন, আজ যদি তিনি সব দোষ নিজের করে না নেন, তবে অনেকগুলো মানুষের জীবন তছনছ হয়ে যাবে।
রাহুলের এই মৌন সম্মতি যেন এক বিশাল ত্যাগের মহাকাব্য হয়ে উঠল। সবার পাপের কলঙ্ক যখন তাঁর শুভ্র ললাটে লেপে দেওয়া হচ্ছিল, তিনি তখন কেবল এক চিলতে ম্লান হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো পরাজয় ছিল না, ছিল পাহাড়সম ধৈর্য। তিনি একাই সেই অগ্নিপরীক্ষার পথে পা বাড়ালেন, যেন অন্যদের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে নিজেই নিজেকে অন্ধকারের হাতে সঁপে দিলেন।