মহুয়া হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপতে লাগলো, তার চোখ বিস্ফারিত, হাতে তখনও আঘাতের পেপারওয়েটের শীতল স্পর্শের রেশ। তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও অনিয়মিত হচ্ছে। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না, কী ভয়াবহ কাজটি সে এইমাত্র করে ফেললো। মেঝেতে পড়ে থাকা রায়হান চৌধুরীকে দেখে তার শরীর শীতল হয়ে গেল।
পরক্ষণেই মহুয়ার সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত অপরাধবোধ যেন মুহূর্তে দূর হয়ে গেল। মনে হলো, মাথার উপর থেকে এক রাশ কালো মেঘ সরে গিয়ে এক ঝলক কঠিন সত্যের আলো এসে পড়ল।
সে বুঝতে পারল, ভুল সে কিছুই করেনি; যা করেছে তা কেবলই খাঁটি আত্মরক্ষা। জীবনের প্রতি যে স্বাভাবিক টান, সেই প্রবল সহজাত প্রবৃত্তির বশেই সে কেবল আঘাতের পাল্টা আঘাত হেনেছে। তার হাত থেকে যে আঘাতটি নির্গত হয়েছে, তা কোনো মানুষের শরীর স্পর্শ করেনি; আঘাতটি গিয়ে পড়েছে সভ্যতার সীমা লঙ্ঘনকারী এক হিংস্র, লোমশ প্রাণীর উপর যে কেবল নারীর গন্ধ চেনে। এই ভাবনাটা আসতেই তার বুক থেকে একটা বিশাল ভার নেমে গেল।
রায়হান চৌধুরীর শরীর থেকে তপ্ত, গাঢ় রক্ত যেন এক উত্তাল স্রোতের মতো গলগল করে বেরিয়ে আসছিল। তার মাথার গভীর ক্ষতস্থান থেকে নির্গত সেই রক্ত অবাধ্য ধারায় মেঝেতে মিশে গিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল যেন এক ভয়ঙ্কর লাল আল্পনা আঁকছে সাদা মার্বেলের উপর। রক্তের সেই পিচ্ছিল আভা চারপাশের আলোয় বীভৎসভাবে চকচক করছিল।
মৃত্যু যখন তার চোখের সামনে কালো পর্দা নামিয়ে আনতে চাইছে, সেই ভীষণ যন্ত্রণার মধ্যেও তার জিদ হারায়নি। দেহের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে, ছিন্নভিন্ন কণ্ঠস্বরে শেষবারের মতো সে মহুয়ার দিকে হাত বাড়াল। তার রক্তে ভেজা হাতটা মহুয়ার শাড়ির আঁচলটা হিংস্র মুঠোয় চেপে ধরল। প্রাণহীন দৃষ্টিতে মহুয়ার দিকে তাকিয়ে, তার ক্ষীণ কন্ঠস্বরটা যেন ফিসফিস করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, "আমার থেকে পালিয়ে কোথায় যাবে?"
মহুয়া চমকে রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকালো । নিজের শাড়ির আঁচল একটানে ছাড়িয়ে নিলো রায়হান চৌধুরীর হাত থেকে ।
মহুয়া বারবার স্থাণুর মতো অবাক হচ্ছিল এই ভেবে যে, মানুষটার শারীরিক অবস্থার এমন চরম অধঃপতন ঘটেছে , মাথা থেকে প্রাণবায়ুর সাথে সাথে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, শরীর প্রায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে তবুও তার ক্ষয়ে যাওয়া মনে , নিথর হওয়া শিরায় - উপশিরায় এখনো সেই কামনার লেলিহান শিখা জ্বলছে। এই উদ্ভট, ভয়াল লালসা যেন জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোকেও বীভৎস করে তুলেছে, যা দেখে মহুয়ার গা গুলিয়ে আসছিল।
কিন্তু রায়হান চৌধুরীকে আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মহুয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু দরজায় চাবি দিয়ে রেখেছিলো চতুর লোকটা ।
মহুয়া কোন দিকে যাবে ভেবে পাচ্ছে না । তার মনে ভয় হতে লাগলো ।এই মুহূর্তে কি করবে কিছুই মাথায় আসছেনা । পাগলের মতো বাঁচতে চাওয়ার তাগিদ এবং তীব্র আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে মহুয়া এক কাণ্ড করে বসল। সে আশেপাশে কিছু না ভেবেই হাতের কাছে একটা ফুলদানি পেলো সেই ভারী কাঁচের ফুলদানিটা তুলে নিল হাতে, তারপর সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে, হিংস্র শক্তিতে সেই ফুলদানি দিয়ে আবারো রায়হান চৌধুরীর মাথার সেই একই রক্তাক্ত অংশে আঘাত করে বসল।
ফুলদানির সেই চূড়ান্ত আঘাতের পর রায়হান চৌধুরীর শরীরটা যেন অতর্কিতে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার অর্ধেক ফোটা চোখদুটো এক লহমায় স্থির, কাঁচের মতো নিষ্প্রাণ হয়ে গেল যেখানে কিছু মুহূর্ত আগেও লালসা আর জিদের শেষ শিখা জ্বলছিল, তা চিরতরে নিভে গেল। তার রক্তমাখা হাত যা মহুয়ার আঁচল আঁকড়ে ধরেছিল, সেই বাঁধন আলগা হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
শরীরের শেষ মাংসপেশিগুলো শিথিল হয়ে যেতেই, রায়হান চৌধুরী মেঝেতে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল,।মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা তাজা রক্তের ঘন স্রোতে তার নিথর দেহটা যেন স্থির দ্বীপের মতো ভেসে রইল।
মহুয়া স্তব্ধ হয়ে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলো তার কানে শুধু বাজছে আঘাতের সেই ভয়ঙ্কর শব্দটা আর নিজের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন। রায়হান চৌধুরীর শরীর এখন নিথর হয়ে পড়ে আছে মুহূর্তের মধ্যে কক্ষের সমস্ত উত্তেজনা, সমস্ত প্রতিরোধ, সমস্ত কামনার আগুন সব শেষ হয়ে গেল।
দুনিয়া থেকে এক নরপিশাচ বিদায় হয়ে গেল।
কিন্তু এই মুহূর্তে সে কী করবে? এই প্রশ্নের উত্তর মহুয়ার কাছে ছিল না। শরীরটা তাকে পালিয়ে যেতে বারবার অনুরোধ করছে ,বহু দূরে। কিন্তু বিবেক তাকে টেনে ধরে রাখছে। পালিয়ে যাওয়া মানেই তো দোষ স্বীকার করে নেওয়া। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কি সে কাপুরুষের মতো পিঠ দেখিয়ে যাবে? নাকি সমস্ত ঝড় মাথায় নিয়েএখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।?
বারবার রাহুলের মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে।
রাহুলকে সে কী কৈফিয়ত দেবে? তার জ্বলন্ত চোখের সামনে দাঁড়িয়ে তার বাবার হ,ত্যা,র কথা সে কিভাবে বলবে? প্রতিটি সম্ভাব্য জবাব যেন তার গলায় কাঁটার মতো বিঁধে যাচ্ছে। মহুয়া অসহায়ভাবে চারদিকে তাকালো । কিন্তু কোন উত্তর খুঁজে পেলো না।
ফুলদানিটা হাতে নিয়ে সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল ।
বাহিরে তামিমার কন্ঠ শুনে তার অন্তরাত্মা আরো শুকিয়ে গেলো।
তার শরীরের অবশিষ্ট রক্তটুকুও যেন হিমশীতল হয়ে শিরা-উপশিরায় থমকে দাঁড়াল। তামিমার উপস্থিতি এই মুহূর্তে যেন স্বয়ং মৃত্যুর বার্তাবাহক।সে এই বীভৎস দৃশ্য দেখে ফেললে, খবরটা নিশ্চিত পুলিশ স্টেশনে পৌঁছাবে। প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে হতে লাগল, সময় ফুরিয়ে আসছে...! এই ভয়াবহ সত্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কথা বলার ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার সাহসও সে পাচ্ছিল না, পাছে সেই শব্দ তামিমার কানে যায়। মহুয়া দেয়ালের সাথে মিশে গেল, হৃদস্পন্দন দ্রুত ঢাকের শব্দের মতো বাজছিল, আর সে অপেক্ষা করতে থাকল বাইরের সেই কণ্ঠস্বর কখন থমকে যাবে আর হঠাৎ চিৎকারে ফেটে পড়বে।
কিন্তু সমস্ত কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তামিমা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে কোন কিছু না ভেবেই মহুয়ার হাত থেকে ফুলদানিটা নিয়ে মহুয়াকে ঘরে থেকে বেরিয়ে যেতে বললো ।
- এই ঘরে কি কি হয়েছে,বাহিরে থেকে আমি সবকিছু শুনেছি। তুমি নির্দোষ । তুমি এখান থেকে চলে যাও । নিজেকে বাঁচাও । একটু পরে সব জানাজানি হয়ে যাবে। তখন আর কিছু করার থাকবে না ।
-কিন্ত তোমার কি হবে ? তুমিও তো নির্দোষ।
-আমার যা হওয়ার তাই হবে , কিন্তু তোমার উপর কোনো ঝড় আসুক সেটা আমি চাইনা ।
এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই ।আমাকে দেখার মত কেউ নেই ।আমার কিছু হলে কারো কিছু হবে না কিন্তু তোমার সবাই আছে তাই তুমি কোন কথা না বলে চুপচাপ এখান থেকে চলে যাও।
অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটার প্রতি মহুয়ার ভেতরে এক তীব্র মায়া যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে তামিমা একা, তার ভেতরে আরও একটি নিষ্পাপ প্রাণ। মহুয়ার মন একবারের জন্যও সায় দিচ্ছিল না এই বিপদের মুখে মেয়েটিকে একা ফেলে রেখে যেতে। এই মায়া এখন তার গলার ফাঁস! সে কি করে পারে এই মানুষটিকে, যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে? কিন্তু পরক্ষণেই এক কঠিন বাস্তবতা তাকে নির্মমভাবে ধাক্কা মারল। এখন যদি সে সামান্যতম আবেগ দেখিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি বা জোড়াজুড়ি করে, তবে ফল হবে ভয়াবহ। এই ঘরের ভেতরে ঘটে যাওয়া কাণ্ড বেশি জানাজানি হতে আর এক মিনিটও বাকি নেই। দুজনই ফেঁসে যাবে, এবং তামিমার উদরে থাকা সেই ভবিষ্যৎও চরম সংকটে পড়বে। মহুয়া তাই নিজের মায়া ও অপরাধবোধকে কঠিন হাতে দমন করল। তামিমার চোখ থেকে সে বিদায় নিল না, কেবল মাথা নিচু করে নীরবে বেরিয়ে গেল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিশ ত্রিশ কদম হেঁটে যেতেই মহুয়ার ফোন বেজে উঠল । ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রাহুলের নাম দেখে ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল। তবুও ফোন রিসিভ করলো । কিন্তু রাহুলের পরিবর্তে অন্য কারো কন্ঠ শুনে ভীষণ অবাক হয়ে গেল ।
-নিজের প্রান প্রিয় স্বামীকে বাঁচাতে চাইলে এই মুহূর্তে খামারবাড়ির দিকে চলে এসো।
কন্ঠ টা চিনতে তার এক মুহুর্তও দেরি হলোনা ।
মহুয়া আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। তার ভেতরের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় তার শরীরটা যেন ভার হয়ে গেল পাথরের মতো। হঠাৎ করেই, সে আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। গগণবিদারী চিকিৎসা দিয়ে মাটিতে বসে পড়লো । না জানি রাহুল কোন বিপদে পড়েছে । এটা ভাবতেই তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো।এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত পা চালালো খামারবাড়ির দিকে। মাথার ওপরের মেঘে ঢাকা আকাশের মতোই তার ভেতরের আকাশেও তখন তোলপাড় চলছে। পথটা প্রায় এক ঘণ্টার, কিন্তু সেই এক ঘণ্টা যেন তার কাছে অন্তহীন এক যাত্রা। এই রাস্তায় কোনো গাড়ির চিহ্নও নেই, তাই ভরসা শুধু দু'টি পায়ে। জঙ্গলের ধার ঘেঁষে কাঁচা মাটির সেই পায়ে চলা পথ ধরে সে হাঁটতে লাগল, চারপাশের নীরবতা যেন তার হৃদস্পন্দনের শব্দকে আরও তীব্র করে তুলছে
রাহুলের কথা শুনে এক মুহুর্তেই মহুয়া ভুলে গেলো সে একজনকে খুন করে এসেছে ।
পথের ক্লান্তি আর মনের অস্থিরতা নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পর মহুয়া অবশেষে সেই নিঃশব্দ খামারবাড়িতে এসে পৌঁছালো। ধূলিধূসরিত পথ পেরিয়ে যখন সে খামারবাড়ির সীমানায় পা রাখল, তখনই দেখতে পেল আরিয়ান পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিচ্ছে।
তার হাতে ধরা জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী অলসভাবে উপরের দিকে উঠছিল। আরিয়ান একটা লম্বা টান নিয়ে, সেই ধোঁয়া ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে বের করে দিলো, যা বাতাসের আর্দ্রতায় মুহূর্তের জন্য জমাট বেঁধে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল।
আরিয়ানকে দেখামাত্রই মহুয়ার শরীরের শিরা-উপশিরায় যেন আগুন জ্বলে উঠলো। তার ভেতরের সকল রাগ, ঘৃণা আর বঞ্চনার অনুভূতি একসাথে উথলে উঠলো। রাগে তার গা গুলিয়ে এলো, মনে হলো যেন এই মুহূর্তে সে আরিয়ানকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই তার ক্ষোভে রূপান্তরিত হলো।