অগ্নিকন্যা মহুয়া

পর্ব - ১৪

🟢

একজন নরপিশাচের কাছে দ্বিতীয়বারের মতো নিজের সবকিছু সঁপে দিতে হলো মহুয়াকে। সেই মুহূর্তে যেন পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে গেল তার ভেতরে। শরীরটা নিথর হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু মনটা যেন ঝড়ে উড়ে যাচ্ছে ছিন্নভিন্ন পাতার মতো। নিজের ওপর এক আকাশসমান রাগ, ঘৃণা, আর অপমানের ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল বারবার। চোখের সামনে যেন হাজারটা আয়না ভেঙে গিয়ে তারই প্রতিচ্ছবি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।

বুকের ভেতর একটা ভারি পাথর চেপে বসেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে মনে বারবার বলছে, “আমি কিভাবে পারলাম? আমি কীভাবে এমনটা হতে দিলাম?” নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে যেন এই হাতগুলোই অপরাধী। সারা দেহে অপরাধবোধের বিষ ছড়িয়ে পড়েছে, একরাশ বেদনা আর অনুতাপ তাকে ভেতর থেকে খুঁড়ে খাচ্ছে।

এসব ভাবতে ভাবতে মহুয়া ধীরে ধীরে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। পায়ের শব্দ যেন ভারী হয়ে উঠেছে প্রতিটা পদক্ষেপে অপরাধবোধের ভার মাটিতে গিয়ে পড়ছে। দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর এক টানেই শাওয়ার চালু করল।

ঠান্ডা পানির স্রোত ঝরে পড়তে লাগল তার গায়ে, কিন্তু সেই পানির ফোঁটা যেন আগুনের মতো জ্বালিয়ে দিচ্ছিল ত্বক। মহুয়া চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল, জল গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে, যেন প্রতিটা ফোঁটা তার লজ্জা, ঘৃণা আর অনুশোচনা ধুয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু যতই পানি পড়ছে, ততই মনে হচ্ছে ভিতরের ময়লা যেন আরও গভীর হয়ে জমে যাচ্ছে।

চুলের ভেতর দিয়ে পানি গড়িয়ে নামছে, ঠোঁট কাঁপছে নিঃশব্দ কান্নায়। সে মনে মনে বলছে, “সব কিছু যদি এভাবেই ধুয়ে ফেলা যেত… যদি মনটা এমনই পরিষ্কার হয়ে যেত…” কিন্তু সে জানে এই অপরাধবোধের দাগ কোনো পানি দিয়ে মুছবে না।

এই অপরাধের একমাত্র বিচার অপরাধীর মৃত্যু দন্ড । মহুয়ার মন বলেছে, এই কলঙ্ক ও কষ্ট যতদিন পৃথিবীতে থাকবে, তার শান কদাচিৎ ফিরে পাবে না; তাই অপরাধীদের মুখোমুখি হয়ে তাদের অস্তিত্বই মুছে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সে নিজের ভিতরে একটা বরফঠান্ডা সঙ্কল্প অনুভব করে চোখে অদৃশ্য এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে।

এই বিচার হবে নিখুঁত, অবিকল ও নির্মম এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যা তাদের নাম, স্মৃতি, ও অপরাধের ছাপ সমানভাবে ঝেড়ে ফেলে দেবে। মনে মনে মহুয়া ভাবে, ‘যতদিন তারা আছে, আমার শান্তি নেই; তাদের নিশ্চিহ্ন করলেই হয়ত আমার ভিতরের ক্ষতরা চাপা পড়ে যাবে।’

সকালের মিষ্টি রোদটাও যেন তার কাছে বিষক্রিয়ার মতো লাগছে। যে রোদে একসময় সে প্রাণ ফিরে পেত, আজ সেই আলোই চোখে বিঁধে যাচ্ছে। জানালার পর্দা ভেদ করে ঢুকে পড়া সোনালি রশ্মিগুলো যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা অন্ধকারকে বিদ্ধ করতে চাইছে। চারপাশে পাখির কলরব, বাতাসে ফুলের গন্ধ সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত ক্লান্তি, এক অসহনীয় ভার। মনে হচ্ছে, এই আলো, এই সকাল সবই তার জীবনের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ।

রওশন আরা বেগমের ডাকে মহুয়া নিচে নেমে এলো।

রাহুল তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, এলোমেলো চুল, আধখোলা ঠোঁট, শান্ত মুখে একরাশ ক্লান্তি লেগে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সকালের নরম আলোটা এসে পড়েছে তার মুখের ওপর, তবুও সে নড়ল না । যেন পৃথিবীর কোন কোলাহলই তাকে আর জাগাতে পারবে না।

রওশন আরা বেগম তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত। হাঁড়ির ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে, ভাজা পেঁয়াজ আর মশলার গন্ধে পুরো ঘরটা ভরে গেছে। সকালের রোদ জানালার জালি পেরিয়ে এসে সেই ধোঁয়ায় মিশে একরকম সোনালি কুয়াশার মতো পরিবেশ তৈরি করেছে। ঠিক সেই সময় মহুয়া নরম পায়ে ভেতরে ঢুকে শাশুড়ি মায়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।

-আসসালামু আলাইকুম, মা।

রওশন আরা বেগম পেছন ফিরে তাকালেন, মুখে হালকা ক্লান্তি কিন্তু চোখে একটুকরো মমতা।

-ওয়ালাইকুম সালাম মা, এসেছো? আজ হয়তো তোমার শ্বশুর মশায় আসবেন বাড়িতে, তাই সকাল সকাল রান্না বসিয়েছি। যাও, একটু রাহুলের জন্য নাস্তা রেডি করে দাও।

-যে মানুষ আপনাকে এত কষ্ট দিয়েছে, মা… এত অপমান, এত অবহেলা করে তবু আপনি কেন এখনও তার জন্য চোখের পানি ফেলেন? মহুয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল, বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যেন কথার সঙ্গে বেরিয়ে এলো।

-আপনার মতো একটা বউ রেখে, যে মানুষটা বছরের পর বছর অন্য নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে থাকে, মিথ্যে ভালোবাসার অভিনয় করে, সে কি আদৌ ভালোবাসার যোগ্য? বলুন তো মা, এমন মানুষের জন্য এখনও আপনার এত আদিখ্য কেন?

রওশন আরা বেগম তখন চুপচাপ বসে ছিলেন। মুখের কোণে কাঁটার মতো একটুখানি মিথ্যে হাসি, কিন্তু চোখের গভীরে বিষণ্নতার কালো ছায়া নেমে এসেছে। চুলের ধূসর রেখাগুলো জানালার আলোয় আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছিল। নিরবে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো -

মেয়েদের জীবন এমনই রে মা!

জন্মের পর থেকেই যেন এক অদৃশ্য বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। ছোটবেলায় বাবার বাড়িতে নিয়মের বেড়াজাল, যৌবনে স্বামীর ঘরে ত্যাগ আর সহ্যের পরীক্ষা। নিজের স্বপ্ন, নিজের হাসি, নিজের ইচ্ছে সব কিছু এক এক করে উৎসর্গ করতে করতে একদিন বুঝতেই পারে না কখন চোখের আলো নিভে গেছে। তবুও মুখে হাসি ধরে রাখতে হয়, কারণ এ সমাজ চায় “সহনশীলা নারী”।

শেষমেশ একদিন, যখন শরীর ক্লান্ত হয়ে চোখের জল শুকিয়ে যায়।

তখন মৃত্যু এসে দুয়ারে কড়া নাড়ে।

সেই মুহূর্তে হয়তো মেয়েটি নিঃশব্দে ভাবে, “এবার বোধহয় মুক্তি মিলবে এই অনন্ত কষ্টের জীবন থেকে।”

সেই চৌদ্দ বছর বয়সে শ্বশুরবাড়িতে এসেছি।

বয়সটা তখন পুতুল খেলার, স্কুলের বইয়ে ফুল-প্রজাপতি আঁকার, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় ভরপুর থাকার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য গল্প লিখেছিল আমার জন্য। একদিন লাল টুকটুকে বেনারসী শাড়ি পরে অচেনা এক বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে এলাম।

চৌদ্দ বছরের কিশোরী আমি তখনো বুঝিনি সংসারের ভার কাকে বলে, বুঝিনি মেয়েদের হাসির আড়ালে কত অশ্রু লুকিয়ে থাকে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও, তাদের অন্তরে আমি ছিলাম বিষের মতো। নিজের বাড়ির উঠোন, মায়ের কোলে মাথা রাখা, বাবার স্নেহমাখা ডাক সবকিছু একদিনে ফিকে হয়ে গেল।

সেই চৌদ্দ বছর থেকেই শুরু হলো এক নতুন জীবন, যেখানে খেলনা বদলে গেল হাঁড়ি-পাতিলে, আর স্বপ্নের জায়গা নিল দায়িত্ব আর সহ্যের অনন্ত পথ।

শ্বশুর-শাশুড়ি একে একে চলে গেলেন পরপারে।

সেই সময় মনে হয়েছিল এবার বুঝি জীবনের কষ্টগুলো একটু হালকা হবে। এতদিন ঘর-সংসারের বোঝা মাথায় নিয়ে কত রাত কেটেছে চোখের জল গোপন করে। ভেবেছিলাম, এখন অন্তত স্বামীকে পাশে পাবো, দু’জন মিলে নতুন করে ঘর সাজাবো, একটু শান্তি, একটু হাসি খুঁজে পাবো।

কিন্তু সেই আশাটাও ছিল মরীচিকার মতো দূর থেকে ঝলমলে, কাছে গেলে নিঃস্ব।

দিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারলাম, আমার স্বামী আর আগের মতো নেই। কথায় একরকম অনীহা, চোখে এক অচেনা উদাস ভাব। ঘরে ফিরেও যেন মনটা থাকে অন্য কোথাও। একসময় যার চোখে আমি ছিলাম তার পৃথিবীর কেন্দ্র, এখন সেই চোখে দেখি কেবল এড়িয়ে যাওয়া দৃষ্টি।

বিজ্ঞাপন

একদিন হঠাৎই সত্যিটা সামনে এলো সে অন্য এক নারীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

সেই মুহূর্তে মনে হলো, যেন বুকের ভেতর কেউ একমুঠো আগুন ঢেলে দিলো। সবকিছু ঘোলাটে হয়ে গেল, ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো লজ্জা আর যন্ত্রণায়। নিজেরই সংসারে যেন আমি এক পরবাসিনী এক অনাহূত অতিথি হয়ে গেলাম।

রাতের পর রাত জেগে থেকেছি, ভেবেছি ভালোবাসা কি এত সহজে মরে যায়?

যে মানুষকে এত বছর ধরে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছি, সে কীভাবে এমন পর হয়ে যেতে পারে? তবুও বাইরে থেকে হাসি ধরে রাখতে হয়েছিল, কারণ সমাজ বলে "নারীর কষ্ট গোপন রাখাই তার অলঙ্কার।"

কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি ভেঙে পড়ছিলাম প্রতিদিন, নিঃশব্দে, অদেখাভাবে, যেন শুকিয়ে যাওয়া গাছের পাতার মতো যার ঝরা কারও চোখে পড়ে না, তবুও পড়ে যায় প্রতিদিন।

এইটুকু বলে রওশন আরা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছলেন। সেই চোখে ছিল বহু বছরের দুঃখের স্তর জমে থাকা জল ।যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর তলদেশে এখনও লুকিয়ে আছে অশ্রুর স্রোত।

আঁচলের ভেজা প্রান্তে কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো সাক্ষী দিচ্ছিল, কতবার তিনি নিজের কষ্ট চাপা দিয়ে শক্ত থাকার ভান করেছেন। মুখে শান্ত একটা হাসি রাখলেও, সেই মুহূর্তে তাঁর মুখের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে উঠলো জীবনের ক্লান্তি, ত্যাগ, আর অগণিত অবহেলার দাগ।

মহুয়া আর এক মুহূর্তও রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। রাগে মুখটা লাল হয়ে উঠলো । বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠছে অগ্নিগর্ভ আগুনে। চৌধুরী পরিবারের পুরুষদের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার ঘৃণায় শরীরটা কেঁপে উঠলো। এরা বাইরে থেকে যত ভদ্র, ততটাই ভেতরে নোংরা ,মিথ্যে ভালোবাসা, মিথ্যে সম্মান আর আড়াল করা পরকীয়ার নেশায় ডুবে থাকা মানুষ এরা !

একজন উচ্চবিত্ত পরিবারের সব পুরুষ যদি এমন হয় যারা নারীর সম্মান বোঝে না, সম্পর্কের পবিত্রতাকে তুচ্ছ করে পরকীয়ায় লিপ্ত থাকে তাহলে সেটা শুধু সেই পরিবারের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য এক ভয়ংকর অভিশাপ।

যে মানুষ সমাজে আদর্শ স্থাপন করার কথা, তারাই যদি লালসা আর ভণ্ডামির বিষ ছড়ায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী শিক্ষা নেবে? তখন নীতির জায়গায় আসবে প্রবঞ্চনা, ভালোবাসার জায়গায় কপটতা, আর বিবেকের জায়গায় আসবে অন্ধ অন্ধকার।

মহুয়ার বুকের ভেতর যেন কাঁটার মতো বিঁধে গেলো।

মহুয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো- এদের এই পাপের খেলা বন্ধ করবো আমি ।

----------------

সবকিছু ভালোভাবে ভেবে, নিজেকে অনেক সামলে নিয়ে পরের দিন সকালে তামিমা রায়হান চৌধুরীর নাম্বারে ফোন দিলো। হাতটা কাঁপছিল, বুকের ভেতরটা কেমন জানি অজানা আতঙ্কে ধকধক করছিল। ছোট্ট পুরোনো বাটন ফোনটা দিয়ে নাম্বার তুলে স্যারের কাছে ফোন দিলো।

কিন্তু যতবারই কল দিল ততোবারই একই শব্দ ভেসে উঠল- The number you are calling is switched off.

প্রথমে সে ভেবেছিল হয়তো নেটওয়ার্কের সমস্যা, আবার চেষ্টা করল। তারপর আবার। বারবার। প্রতিবারই একই যান্ত্রিক আওয়াজ, একই নির্লিপ্ত বার্তা।

তামিমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি শূন্য হয়ে গেল।যেন কেউ শূন্যতা ছুঁড়ে মেরেছে সেখানে। মাথায় ঘুরতে লাগল হাজারটা প্রশ্ন । স্যার কি ইচ্ছে করেই নাম্বারটা বন্ধ রেখেছেন? নাকি কিছু হয়েছে? চোখের কোণে অজান্তেই জল চলে এলো। ফোনটা শক্ত করে ধরে সে চুপচাপ বসে রইল।

কিন্তু পরক্ষণেই তামিমার মনে পড়ে গেল সকাল আটটার মধ্যেই তো তাকে টিউশনি করাতে যেতে হবে! ঘড়ির কাঁটা তখন সাতটা পেরিয়ে গেছে, মানে হাতে একেবারেই সময় নেই। মনটা তখনও ভারী হয়ে আছে। কিন্তু দায়িত্বের টানে সে দ্রুত উঠে পড়ল।

চোখের কোণে এখনো শুকিয়ে না যাওয়া অশ্রু ,তবুও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিল। তাড়াহুড়ো করে ওড়নাটা কাঁধে জড়ালো, চুলগুলো ঠিক করারও সময় পেল না। ছোট ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে চলে গেল।

বাইরে তখন ভোরের হালকা কুয়াশা, রাস্তায় অল্প অল্প আলো ফুটেছে। মনটা ভারী হলেও পা দুটি যেন নিজে থেকেই চলতে লাগলো কারণ জীবন তো থেমে থাকে না, যতই মন ভেঙে যাক না কেন জীবন চলে জীবনের গতিতে।

তামিমা টিউশনি শেষ করে ব্যাগটা কাঁধে তুলে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। সকালটা ছিল হালকা রোদে ঝলমল, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ ভাসছে। যেন জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছিল। মাথায় ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে সে হাঁটছিলো ।

ঠিক সেই মুহূর্তে, হঠাৎ করেই পিছন দিক থেকে একটা প্রাইভেট কার সাঁই সাঁই শব্দ তুলে তার সামনে গিয়ে থামল। চমকে থেমে গেল তামিমা। দৃশ্যটা যেন হুবহু গতকালের মতো। রোদে চকচক করা গাড়িটার জানালায় অন্ধকার কাঁচ, ভেতরে কে আছে বোঝা যায় না। তার পায়ের নিচের মাটি যেন কেঁপে উঠল, বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা আর কৌতূহল মিশে গেল একসাথে। মনে পড়লো, কালও ঠিক এমনভাবেই একটা গাড়ি তার সামনে দাঁড়িয়েছিল… আর আজও যেন একই দৃশ্য। মনে মনে বললো- স্যার কি আমাকে ফলো করছে নাকি?

এসব ভাবনার মাঝে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো রায়হান চৌধুরী।

- কলেজ শেষে অফিসে আসবে।

তামিমা মাথা নিচু করে বললো ঠিক আছে স্যার।

রায়হান চৌধুরী গাড়ির কাছে গিয়ে আবার ফিরে এসে তামিমাকে বলল- তুমি তো কলেজেই যাচ্ছো , চাইলে আমার গাড়িতে উঠতে পারো। আমি তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবো।

তামিমা প্রথম না করলেও পরে স্যারের জোড়া জোড়ি তে গাড়িতে উঠে পড়লো।

আজ প্রথমবার তামিমা প্রাইভেট কারের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ হলো। কালো, চকচকে বডি, হালকা রোদে ঝলমল করা তার পেইন্ট, হাত স্পর্শ করতেই যেন ঠোঁটের কাছে এক অচেনা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। দোরের হ্যান্ডেলটি ধরল, শক্তি আর স্থিতিশীলতার এক ধরনের মিশ্রণ অনুভব হলো।

তারপর ধীরে ধীরে গাড়ির সিটে বসলো ,নরম, সুঘ্রাণপূর্ণ চামড়ার আসন, পায়ের নিচে মসৃণ কারপেট। প্রতিটি মুহূর্ত যেন তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতার দরজা খুলে দিল আজ প্রথমবারই এই প্রাইভেট কারে বসার আনন্দ আর অচেনা উত্তেজনা একসাথে অনুভব করল তামিমা, মনে হলো যেন ছোট্ট এক অজানা জগত তার হাতের কাছে এসে দাঁড়াল।

এসব ভাবতে ভাবতে সে কলেজে এসে পৌঁছালো।তামিমা তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে চলে গেল নিজের ডিপার্টমেন্ট এ। যাতে কেউ দেখতে না পায় যে সে রায়হান চৌধুরীর গাড়িতে চড়ে আসছে। কারন রায়হান চৌধুরীকে সবাই এক নামে চেনে। শহরের নামকরা একজন মানুষ।

বিজ্ঞাপন
অগ্নিকন্যা মহুয়া গল্পটি আজেরিন হিরানুর-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক ও থ্রিলারভিত্তিক গল্প