তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৬৫

🟢

ছেলের হঠাৎ এমন আচরণে মুহিব হোসেন অবাক না হয়ে পারলেন না। কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলেন না তিনি। তানভীর তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে তাওকীরের থেকে মুহিব হোসেনের কলার ছাড়ানোর চেষ্টা করল তবে তানভীর পারলো না। তানভীর সাহায্যের জন্য আরমানের দিকে তাকালো তবে আরমান এগিয়ে এলোনা।

“ভাইয়া ছাড়ো। কি করছো? বাবার গায়ে হাত তুলছো কেন?”

“উনি আমার বাবা না তানভীর? এই লোকটা সারা জীবন নিজের সুবিধার জন্য, নিজের টাকা পয়সা, সম্পত্তি, ক্ষমতার জন্য আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। আরে আমার মেয়ে বেঁচে আছে! মানুষটা আমায় চৌদ্দটা বছর ধরে মিথ্যে বলে আসছে। এই মানুষটার জন্য আমি দিনের পর দিন হিমিকে মিথ্যে বলে গিয়েছি, এই মানুষটার জন্য এতগুলো বছর আকাঙ্ক্ষা কষ্ট করেছে। আকাঙ্ক্ষাকে কথা দেওয়া সত্ত্বেও আমায় ওর হাত ছাড়তে হয়েছে, আমার আরেক মেয়ে এতিমের বড় হয়েছে। তুই বল উনি কি আমার বাবা হতে পারে? যিনি শুধুমাত্র নিজের স্বার্থটাই দেখেন সে কখনো কারো বাবা হতে পারে না।”

তানভীর বহু কষ্টে তাওকীরের থেকে মুহিব হোসেনকে ছাড়াতে সক্ষম হলো। তাওকীরকে ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। উদ্ভ্রান্তের মতন করছে সে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। একদিকে দেখলো মেঝের ওপরে হিমি বসে আছে, অন্যদিকে আকাঙ্ক্ষা দাঁড়িয়ে আছে। তাওকীরের এক মেয়ে উপরে ঘরে আর অন্য মেয়ের খোঁজ তাওকীর জানেনা। এদিকে যাকে সারাটা জীবন ধরে এতটা সম্মান করলো, চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করলো শেষে জানতে পারলো সেই মানুষটাই তাওকীরের জীবনের সবথেকে বড় শত্রু। তাওকীরের জীবন নষ্টের পেছনে তার অবদান সব থেকে বেশি।

তাওকীর আবার এগিয়ে গেল আকাঙ্ক্ষার দিকে। উদভ্রান্তের মতন বলল,

“আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস করো আমি কিচ্ছু জানতাম না। তুমি বলো, আমার বাবাকে বিশ্বাস করা কি আমার ভুল? বিশ্বাস করো সত্যি আমি জানতাম না আমাদের মেয়ে বেঁচে আছে। কোথায় ও? আমায় একবার একটু দেখতে দেবে? আমি একবার দেখা করবো ওর সাথে। আমার যে ওর কাছেও ক্ষমা চাইতে হবে।”

“তুমি ভাবলে কি করে আমি ওকে তোমার সংস্পর্শে আসতে দেবো? তুমি কোনদিন জানতে পারবে না তোমার মেয়ে কে।”

তাওকীর আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে সরাসরি আকাঙ্ক্ষার পায়ের কাছে বসে পড়লো। দুই হাতে আকাঙ্ক্ষার পা জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“আকাঙ্ক্ষা বিশ্বাস করো আমি সত্যিই জানতাম না যে আমাদের মেয়ে বেঁচে আছে। একটাবার… একটাবার আমায় অন্তত দূর থেকে ওকে দেখতে দাও। আমি জানতাম না তুমি এতদিন এত খারাপ পরিস্থিতিতে ছিলে। বিশ্বাস করো আমি তোমায় অনেক খুঁজেছি।”

কথাটা বলে তাওকীর কান্নায় ভেঙে পড়লো। আকাঙ্ক্ষা নিজেও কাঁদছে। হিমি শুধু হা করে তাকিয়ে আছে আকাঙ্ক্ষা আর তাওকীরের দিকে। তাওকীর কি সুন্দর নির্দ্বিধায় বারবার বলে যাচ্ছে ওর সন্তান ওর সন্তান অথচ পাশে যে হিমি বসে আছে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। তবে তাহি কে? হিমির পরিচয় কি? ওরা তো তাওকীরের জীবনে বাড়তি! যদি আকাঙ্ক্ষা আর ওর সন্তান থাকতো তবে তো হিমি আর ওর সন্তান জায়গা পেতো না তাওকীরের জীবনে।

হিমি ক্রন্দনরত গলায় তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে নির্জীব গলায় বলল,

“আমার পরিচয় কি তাওকীর? আমি কে? তোমার তো স্ত্রীর সন্তান সবাই আছে তবে আমি আর তাহি কে? আমরা দুজন কি শুধুই তোমার দায়িত্ববোধ? শুধুই কি তোমার জীবনের বোঝা?”

থেমে গেল তাওকীর। হঠাৎ করে তাওকীরের কান্না থেমে গেল। হিমি ছলছল দৃষ্টিতে তাওকীরের দিকে তাকিয়ে আছে। তাওকীর কি বলে হিমিকে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারছে না। কি বলা উচিত হিমিকে উদ্দেশ্য করে? কিভাবে সান্ত্বনা দেবে? এই কথাটা তো সত্যি যে দায়িত্ববোধ থেকে ধীরে ধীরে হিমিকে ভালোবেসেছে তাওকীর? কিন্তু হিমি তো কথাটা শুনলে ভীষণ কষ্ট পাবে।

আকাঙ্ক্ষা সরে দাঁড়ালো তাওকীরের কাছ থেকে। আকাঙ্ক্ষা এবারে হিমির দিকে তাকালো। আকাঙ্ক্ষার কন্ঠটাও পূর্বের তুলনায় বেশ অনেকটাই নরম হলো।

“তোমার পরিচয় তুমি তাওকীরের স্ত্রী। তুমি এই বাড়ির মালকিন, তাওকীরের জীবনের সব। তোমার সব রকম যোগ্যতা আছে তাওকীরের স্ত্রী হওয়ার কিন্তু আমার কোন যোগ্যতা নেই সেজন্যই তো আজ আমার এই অবস্থা। আমায় ক্ষমা করে দিও বোন তোমার সুখের সংসারে আমি আ’গু’ন লাগাতে চাইনি। তবে কথাগুলো না জানালে তোমার সাথে অন্যায় করা হতো। জানো, আজ চৌদ্দটা বছর হলো আমি একটা জা’হা’ন্না’মের মাঝে ছিলাম। আমার মেয়ে কত বড় হয়ে গেছে অথচ আমি কখনো ওর মুখটা অব্দি দেখতে পারিনি। আমার কি অন্যায় ছিল বলো, আমি তো তাওরীরকে জোর করিনি কখনো আমায় ভালোবাসতে, না কখনো আমায় বিয়ে করতে জোর করে ছিলাম। কিন্তু তবু সব শাস্তি আমিই পেলাম। এই অ’মা’নু’ষ’টার দিকে তাকিয়ে দেখো ও কিন্তু দিব্যি তোমার সাথে সংসার করছিলো। তোমাকে ভালোবেসে বিয়েও করেছে।”

আকাঙ্ক্ষা কথাটা বলতেই হিমি বিরোধিতা করে বলল,

“না, আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি তাওকীর। বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছিল।”

হিমি এবারে উঠে তাওকীর এর দিকে এগিয়ে গেল। আবারো তাওকীর এর সামনে মেঝের উপরে বসে বলল,

“বিয়ের পর প্রথম বছরটা আমাদের খুব খারাপ কেটেছিল তাওকীর তোমার মনে আছে? তুমি কথায় কথায় আমার সাথে রাগারাগি করতে, ভীষণ বিরক্ত হতে আমার উপস্থিতিতে। আমি এখনো ভুলিনি আমাদের বিয়ের পর দীর্ঘ অনেকগুলো মাস তুমি আমাকে স্পর্শ অব্দি করোনি। অথচ আমাকে বিয়ের আগে জানানো হয়েছিল যে তুমি নাকি আমাকে পছন্দ করেছো বলেই এ বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব গেছে। তোমার মনে আছে তুমি মাঝে মাঝে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে যেতে তবে কি সেই দুঃস্বপ্নে আকাঙ্ক্ষা আসতো? আচ্ছা তুমি যে আমার সাথে রাগারাগি করতে তার কারণ কি আকাঙ্ক্ষা ছিল? তুমি আমায় ভালোবাসতে না, তাই না? ধীরে ধীরে বাধ্য হয়েছো আমার সাথে সংসার করতে? আমি তোমার জীবনের একটা বোঝা তাই না?”

তাওকীর ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“না হিমি, তুমি আমার জীবনের বোঝা না।”

“কিন্তু ভালোবাসোও না।”

“না, তুমি আমার ভালোবাসা। আমি তোমায় ভালোবাসি। আমি আমাদের মেয়েকে ভালোবাসি।”

হিমি ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,

“একদম মিথ্যে বলবে না। তুমি সব সময় এই মেয়েটাকে ভালোবেসেছো। আজ আমি বুঝতে পারছি কেন তাহি আসার খবর পাওয়ার পর তুমি বদলে গিয়েছিলে। তুমি আমাদের তাহির মাঝে তোমার আর আকাঙ্ক্ষার মেয়েকে খুঁজতে তাই না? তোমার মাঝে একটা অপরাধবোধ ছিল বলে তুমি তাহি আসার কথা শুনে এতটা খুশি হয়েছিলে তাই না? তার মানে কি দাঁড়ালো জানো তাওকীর? তুমি আকাঙ্ক্ষাকে ভালোবেসেছো, তোমার আর আকাঙ্ক্ষার মেয়েকে ভালোবেসেছো, আমাদের তাহিকে ভালোবেসেছো কিন্তু আমাকে ভালোবাসনি? তোমাদের সবার এই নোংরা খেলার মাঝে আমি ফেঁসে গেছি। আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে। তোমরা হিসেব করছো তোমরা কি পেয়েছো কি পাওনি, আরে সারা জীবন তো আমি একটা মিথ্যের মাঝে ছিলাম। এমন একটা সংসার, এমন একটা মানুষকে নিজের ভেবে গিয়েছে যে কোনদিন আমার ছিলই না।”

তাওকীর ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“এসব কি বলছো তুমি হিমি? তুমি ভুল বুঝছো আমায়। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি। আমাদের সংসারটা হয়তো মিথ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল তবে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা মিথ্যে না।”

হিমি বসা থেকে উঠে আকাঙ্ক্ষার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলল,

“তাহলে এই মেয়েটা কে? এই মেয়েটা কেন নিজেকে তোমার স্ত্রী বলে পরিচয় দিচ্ছে? কেন বারবার এই মেয়েটা তোমাদের সন্তানের কথা বলছে? তুমি কি জোর গলায় বলতে পারবে এসব মিথ্যে? আর যদি এসব সত্যি হয়ে থাকে তাহলে তো আমার অস্তিত্ব মিথ্যে। তোমার জীবনে আমার তো কোন জায়গা নেই তাওকীর।”

তাওকীর থেমে গেল। অসহায় দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইল হিমির দিকে। কি বলা উচিত, কি বলবে কিছু বুঝতে পারছে না। তাওকীরের থেকে কোন জবাব না পেয়ে হিমি পুনরায় বলে উঠলো,

“এই মেয়ের সাথে তুমি যে অন্যায়টা করেছো তার কোন ক্ষমা হয় না। আমি জানিনা এর পেছনে প্রধান অপরাধী হিসেবে তুমি কাকে দাঁড় করাতে চাইছো, তবে আমার নজরে তুমিই প্রধান অপরাধী। তোমার সাথে তো সংসার করা যায় না তাওকীর। তোমার মতন একটা পাপীর সংস্পর্শে থাকলে আমার মেয়েটার জীবনও নষ্ট হয়ে যাবে। তোমার সাথে আমি এক ছাদের নিচে থাকতে পারবো না। আমার কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।”

হিমিকে প্রচন্ড অস্থির দেখালো। সেই সাথে অস্থির হয়ে উঠল তাওকীরও। নিজের অস্থিরতাকে দমাতে না পেরে তাওকীর ডুকরে কেঁদে উঠলো। হিমির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করলো তবে হিমি এক ঝটকায় তাওকীরের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ঘৃণা ভরা গলায় বলল,

“একদম আমাকে স্পর্শ করবে না পা’পী কোথাকার। যে হাত দিয়ে তুমি আমায় ছুঁয়েছো সেই হাত দিয়ে আমাকে ছোঁয়ার আগে অন্য কোন নারীকে স্পর্শ করেছো এটা ভাবলেই আমার গা গুলিয়ে উঠছে। আমি তোমাকে ভাবতাম কি আর তুমি আসলে কি। বিশ্বাস করো, আমি আমার জীবনে তোমার মতন নোং’রা লোক আর দুটো দেখিনি আর না কখনো দেখবো। তোমার থেকে বেশি নোং’রা হয়তো এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।”

তাওকীর অসহায় গলায় বলল,

“এভাবে বলো না হিমি। তুমি আর তাহি আমার জীবন। তোমাদের ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না হিমি। মানুষের অতীতে তো কত কিছুই থাকে তাই না? ভুলে যাও না আমার অতীতটা। অতীতে আমি যে তাওকীর ছিলাম এখন আর সেই তাওকীর নেই আমি। এগুলোর জন্য আমি রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছি। তুমি বলো আমাদের বিয়ের এতগুলো বছরে তুমি আমার প্রতি কোন অভিযোগ করতে পারবে? আমি আমার দায়িত্বে কখনো অবহেলা করেছি? আমি তোমায় কখনো কষ্ট দিয়েছি?”

“অভিযোগ করবো কি করে তুমি তো একটা মুখোশ পড়ে ছিলে। তোমার সাথে আমি কি করে থাকবো বলো তো, যেখানে তোমার ওপরে দুটো মানুষের জীবন নষ্টের দায় আছে। এই মেয়েটা কি কোনদিন তোমায় ক্ষমা করতে পারবে? ও তো তোমার স্ত্রী, ওর তো অধিকার আছে। তুমি পারবে ওকে ওর অধিকারটা দিতে? তোমাদের তো একটা মেয়ে আছে তাওকীর। ওই মেয়েটার কি হবে? ওকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিতে পারবে? আমি জানি তুমি এসব পারবে না, তবে যে ওদের অভিশাপ গুলো আমার আর আমার মেয়ের ওপর এসেও পড়বে। তোমার পাপের অংশীদার তো আমি হতে পারব না।”

কথাটা বলে হিমি উঠে দাঁড়ালো। মেয়েকে খুঁজতে লাগলো। মনে পড়লো তাহি তো ঘরে। হিমি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে যেতে ধরলে তাওকীর ওকে আটকালো। হিমি মানলোনা তাওকীরের বাঁধা, কোন কথা শোনার প্রয়োজনও মনে করলো না।

কেন যেন তাওকীরের মুখটাও দেখতে ইচ্ছে করছে না।

বিজ্ঞাপন

হিমি চলে গেল। ওর পিছন পিছন কল্পনাও গেল। তাওকীর সোজা গিয়ে আকাঙ্ক্ষার পায়ের কাছে বসে পড়লো। দুই হাত জোর করে আকাঙ্ক্ষা কে উদ্দেশ্য করে,

“দয়া করো আমার উপরে আকাঙ্ক্ষা! তোমার সাথে যা হয়েছে তা অন্যায় আমি জানি। তোমার জীবনে অনেক কিছু পাওয়া কথা ছিল, কিন্তু তুমি কিছুই পাওনি। বরং তোমাকে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে। তবু দোহাই লাগে আমার সংসারটা বাঁচিয়ে দাও তুমি। তুমি যা চাইবে আমি তাই দেবো, আমাকে যে শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব, শুধু আমার সংসারটা বাঁচানোর একটা ব্যবস্থা করে দাও।”

আকাঙ্ক্ষার খুব কষ্ট হলো তাওকীরের কথাগুলো শুনে। আজ আকাঙ্ক্ষার হঠাৎ করে মনে হলো যতগুলো দিন নিষিদ্ধ পল্লীর মতন একটা জঘন্য জায়গায় ছিল তখনও হয়ত এতটা কষ্ট পায়নি, যতটা আজ তাওকীরের কথাগুলো শুনে পাচ্ছে।

একটু আগে আকাঙ্ক্ষার মনে হয়েছিল যে তাওকীর কিছু জানে না, হয়তো ওর অজানা সবটা। হয়ত তাওকীরের মনে এখনো আকাঙ্ক্ষার জন্য কিঞ্চিত পরিমাণ ভালোবাসা রয়ে গেছে। নিজের মেয়ের কথা শুনে কতটা ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল তাওকীর। হয়তো আকাঙ্ক্ষার প্রতিও একটু হলেও ভালোবাসা থেকে গিয়েছে, তবে না সে সব মিথ্যে।

তাওকীরের পুরো জীবন জুড়ে তো এখন শুধুই হিমি আর তাহি। আকাঙ্ক্ষার কোন জায়গা নেই। তাওকীরের একটুও মনে নেই ওদের ভালোবাসার কথা। যদি মনেই থাকতো তবে কি আর আকাঙ্ক্ষার কাছে এভাবে এসে নিজের সংসার ভিক্ষে চাইতে পারতো।

আকাঙ্ক্ষা নিজে পাল্টা ক্রন্দনরত গলায় তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তবে তুমি আমায় আমার সংসার ফিরিয়ে দাও। আমায় ফিরিয়ে দাও আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া চৌদ্দটা বছর। আমায় ফিরিয়ে দাও আমার সম্মান, আমায় আমার স্বামী ফিরিয়ে দাও, আমায় পুরনো ভালোবাসা ফিরিয়ে দাও। আজ আমি যদি তোমার স্ত্রী হওয়ার অধিকার চাই, আজ আমি যদি এই বাড়ির বউ হওয়ার মর্যাদা চাই তবে তুমি আমাকে তা ফেরত দিতে পারবে তাওকীর?”

তাওকীরের কান্না থেমে গেল। আকাঙ্ক্ষার এত কিছু পাওনা আছে, এত কিছুর দাবিদার তাওকীরের কাছে সেটা তাওকীর ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা যেগুলো চাইছে সেগুলো যে তাওকীরের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। তাওকীর অসহায় গলায় বলল,

“এসব তোমায় কি করে আমি ফেরত দেই। এতগুলো বছর কেটে গেছে মাঝে, সবকিছু যে বদলে গেছে আকাঙ্ক্ষা। আমার পুরো জীবন জুড়ে যে এখন শুধুই হিমি আছে।”

আকাঙ্ক্ষার এবারে খুব রাগ হলো নিজের প্রতি। কার জন্যে কাঁদছে আকাঙ্ক্ষা, যার জীবনে ওর কোনো অস্তিত্বই নেই? কি সহজে তাওকীর নিজের দায়িত্ব থেকে সরে আসতে চাইছে। কি সুন্দর ভাবে বলে দিল ওর জীবন জুড়ে এখন হিমি। আকাঙ্ক্ষা নিজের কান্না থামালো। দু হাতে নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে বলল,

“আমি আমার অধিকার চাই। আমি স্বীকৃতি চাই তোমার থেকে তাওকীর। আমি চাই সবাই জানুক যে তাওকীর এহসানের প্রথম স্ত্রী আর সন্তান আছে। আমি চাই সবাই আমার আর আমার মেয়ের পরিচয় জানুক। আমাকে আমার অধিকার দাও।”

আকাঙ্ক্ষা কথাগুলো বলতেই ওর কানে হিমির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আমি তো ছেড়ে দিলাম আমার জায়গা। অনেকগুলো বছর তো সংসার করলাম আমি এই বাড়িতে, এবার বরং তুমি থাকো এখানে। এই জায়গাটা তো আসলে তোমারই, আমি কিছুদিনের অতিথি হয়ে এসেছিলাম। আমি ছেড়ে দিলাম তোমার সে জায়গা।”

তাওকীর চমকে তাকালো পিছনে। দেখলো হিমি তাহির হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। পেছনে কল্পনাও আছে।

হিমি বেড়িয়ে যাওয়ার আগে আরো একবার আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে বলল,

“বিশ্বাস করো আমি জানতাম না তাওকীরের জীবনে আমার আগেও কেউ ছিল। যেদিন থেকে ওর সাথে বিয়ে হয়েছে ওকে খুব ভালোবেসেছি, সংসারটাকে খুব ভালোবেসেছি। তবে আমি জানতাম না এই সব কিছু তোমার ছিল। আর আজ এগুলো জানার পর আমার পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব না। এই ঘৃণ্য মানুষটার সাথে আমার পক্ষে আর থাকা সম্ভব না। তোমার কাছে একটাই অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে যেন কখনো অভিশাপ দিওনা। আমি কিংবা আমার মেয়ে কেউ এসব জানতাম না গো। দয়া করে আমার মেয়েটাকে কখনো বদদোয়া দিও না।”

আকাঙ্ক্ষা আঁৎকে উঠে বলল,

“কি বলছো এসব? ও তো ছোট বাচ্চা, ওর কি দোষ। আমি এমন মানুষ না।”

“আমি বুঝতে পারছি তুমি খুব ভালো মানুষ। সেজন্যই তো এইভাবে ঠকে গেছো, এরা তোমায় ঠকাতে পেরেছে, ঠিক যেমন আমায় ঠকিয়েছে।”

হিমি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অবাক করার বিষয় হলো তাওকীর বাদে একটা মানুষও ওকে আটকানোর চেষ্টা করছে না। তাওকীর খুব করে বোঝানোর চেষ্টা করলো হিমি কে। তবে হিমি তাওকীরের কোন কথা শুনতেই রাজি না।

তাহি ভীষণ কাঁদলো নিজের বাবাকে ছেড়ে যাবে না বলে। তবে হিমিকে রাজি করানো গেল না। এক পর্যায়ে গিয়ে তাওকীর বুঝতে পারলো এখন আর হিমিকে রাজি করানো সম্ভব না। শেষে মেয়েকে কোলে নিয়ে সারা মুখে অজস্র চুমু খেয়ে আদূরে গলায় বলল,

“তুমি এখন যাও আম্মু, বাবা রাতে আসবে। আজ না তোমার জন্মদিন। বাবা রাতে তোমার জন্য উপহার নিয়ে আসবে।”

হিমি আর সেখানে অপেক্ষা করলো না। তাওকীরের কোল থেকে তাহি কে নিয়ে চলে গেল। আরমান তানভীরকে ইশারায় ওদের সাথে পাঠালো। তানভীর বুঝতে পেরে আর অপেক্ষা না করে চলে গেলো হিমি কে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে দেবে বলে।

হিমি চলে যেতেই তাওকীর দুই হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়লো। ড্রয়িং রুমের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে আকাঙ্ক্ষা, যার বৃষ্টি তখন তাওকীরের দিকে। আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারছে না আজ আবার নতুন করে ওর এতটা কষ্ট কেন হচ্ছে? এসব কিছু তো আকাঙ্ক্ষা জানতোই তারপরও আজ আবার কাঁদছে কেন? কেন এই কথাটা ভেবে কষ্ট হচ্ছে যে, যে মানুষটা একসময় আকাঙ্ক্ষাকে ভীষণ ভালোবাসতো সে আর এখন আকাঙ্ক্ষাকে একটুও ভালোবাসে না। হিমির প্রতি তাওকীরের এটাতো ভালোবাসা দেখে কষ্ট হচ্ছে আকাঙ্ক্ষার।

হঠাৎ করে কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই আকাঙ্ক্ষা চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখা আরজু ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আকাঙ্ক্ষাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে আরজু বলে উঠলো,

“এই জা’নো’য়া’র গুলোর কাছে তোমাকে দেবার মতন কিছু নেই আপা। তুমি জীবনে খুব বড় ভুল করেছিলে এই লোকটাকে ভালোবেসে। বিশ্বাস করো আমি বুঝতে পারছি তোমার এখন কষ্ট হচ্ছে কিন্তু একটু বোঝার চেষ্টা করো এখানে তোমার জন্য কিছু নেই। যে একটা সময় তোমার ছিল আজকে সে অন্য কারো হয়ে গিয়েছে।”

“আমি কি আজ ঐ মেয়েটার অন্যায় করলাম আরু? আমার জন্য কি ঐ নিষ্পাপ মেয়েটার সংসার ভেঙে গেল? আমার জন্য কি ওই বাচ্চাটা বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হলো? আমি কি খুব বড় অন্যায় করে ফেললাম আরু?”

আরমান এগিয়ে এসে আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নের উত্তরটা দিল।

“আপনি একদম ঠিক কাজ করেছেন আপা। আজ আপনি যদি সাহস করে পদক্ষেপটা না নিতেন তবে এতগুলো দিন যাবত আমি যে মানুষটাকে আমার বাবার মতন সম্মান করেছি তার আসল চেহারাটা সম্বন্ধে আমি জানতেই পারতাম না। সে আসলে মানুষ হিসেবে কেমন আমি জানতেই পারতাম না কখনো। আপনি খুব সাহস দেখিয়েছেন আপা।”

“ওই মেয়েটার সংসার যে ভেঙে গেল।”

“এই সংসারটা ভাঙারই ছিল হয়তো আপা।”

আরমান আকাঙ্ক্ষাকে কথাটা বলে এবার মুহিব হোসেন কে বলল,

“মানুষ চিনতে এতটা ভুল করলাম আমি। যার আদর্শের নিজেকে গড়ে তুলতে চেয়েছি সেই মানুষটা এত নোংরা। আমি আমার বাবাকে কি করে এই কথাটা বলবো বল তো বড় আব্বু যে তার বড় ভাই ঠিক এমন মানুষ? আমি কাকাকে কি করে বলবো যাকে সে নিজের পিতার স্থান দিয়েছে সে কেমন মানুষ?”

মুহিব হোসেনের মুখ থেকে কোন কথা বের হলো না। এখানে আরমানের আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরু, আপাকে নিয়ে চলে আসুন। আর একটা কথা, আপা যদি সত্যি নিজের অধিকার চায় তবে আপা সেটা পাবে। তার জন্য যা যা করতে হয়, যেখানে যেখানে দৌড়াতে হয় আমি তার সব ব্যবস্থা করব। সেই সাথে যারা আপার সাথে অন্যায় করেছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থাও আমি নিজে করবো।”

আগে আকাঙ্ক্ষা আর আরজু বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আকাঙ্ক্ষা একবারও তাওকীরের দিকে তাকালোও না। আরমান তাওকীরকে পাশ কাটিয়া চলে যেতে ধরলে আরমানের হাত টেনে ধরলো। আরমান থামলো কিন্তু পিছন ফিরে তাকালো না।

“একবার আবার কথাটা শোন তাওসিফ! আমি ভীষণ একা। একটু আমার কথাটা শোন!”

আরমান নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে তাওকীরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি লজ্জায়, ঘৃণায় তোমার দিকে তাকাতে পারছি না। আমার ভাই এমন কি করে হতে পারে? বিশ্বাস করো তোমার কথা শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নেই। যে নিজের স্ত্রী, সন্তানকে ভুলে যেতে পারে, এতটা অবহেলা করতে পারে তাকে আমি মানুষ হিসেবেই গণ্য করিনা।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প