তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৬৩

🟢

ভার্সিটিতে ক্লাস চলাকালীন হঠাৎই তুমুল হইচই এর শব্দ ভেসে এলো আকাঙ্ক্ষার কানে। ক্লাসের বাকি সবার কানেও সেই শব্দটাই গেছে। ভার্সিটির মাঠে ঝামেলা লেগেছে। এক পর্যায়ে গিয়ে ঝামেলাটা তুমুল আকার ধারণ করলো। ক্লাস আর শেষ হলো না। অমনি সবাই বাড়ি যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো লাগালো।

এমন ঝামেলা দেখে আকাঙ্ক্ষা একটুও অবাক হলো না। ও অভ্যস্ত এসব ঝামেলায়। তেমন একটা ভয়ও লাগে না, তাই খুব বেশি আতঙ্কিতও হতে দেখা গেলো না আকাঙ্ক্ষাকে। নিচে নামতেই প্রার্থনার এক বান্ধবীর সাথে ধাক্কা খেল। মেয়েটা হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুই এখনো বেরোসনি কেন? তাড়াতাড়ি চলে এখান থেকে, বেরোতে হবে।”

“আরে এত তাড়াহুড়োর কি আছে? ঝামেলা তো থেমে গেছে অনেকটা।”

“আরে কিচ্ছু ঠাণ্ডা হয়নি। খু’ন হয়েছে।”

মেয়েটার কথা শুনে আকাঙ্ক্ষা চমকে উঠে বলল,

“কি বলছিস? কে খু’ন হয়েছে? আর কে করল খু'ন?”

“আরে দুপক্ষের মধ্যে ঝামেলা লেগেছে। রাজনীতি মানেই তো ঝামেলা। আমাদের ভার্সিটির সিনিয়র তাওকীর, ওনাকে মে'রে দিয়েছে।”

তাওকীর নামটা শুনতেই আকাঙ্ক্ষা চিনতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে ফের আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কে খু'ন করলো?”

“আরে সেসব জানিনা। আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ভার্সিটির পিছন দিকটায় ছিলাম। এদিকেই আসছিলাম ঝামেলার আওয়াজ পেয়ে। হঠাৎ করে দেখি ওখানে তাওকীর মাটিতে পড়ে আছে। মাথা ফেটে র’ক্ত পড়ছে, ওখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ওকে দেখে তো আমরা দুজনে ভয়ে ছুটে এসেছি। তুই তাড়াতাড়ি চল এখান থেকে।”

“তুই ওভাবে ওনাকে ফেলে রেখে চলে এলি? তুই কি পা'গল? মানুষটা হয়তো বেঁচে ছিল।”

“চুপ কর তো। ওনাকে বাঁচাতে গেলে এখন ঝামেলায় পড়বো। দেখবি যারা মে'রেছে তাদের সাথে অযথা আমার শত্রুতা তৈরি হয়ে যাবে। তুই চল এখান থেকে।”

আকাঙ্ক্ষা শুনলো না মেয়েটার কথা। তাই বলে এভাবে একজন আহত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে পালাতে পারে না। মেয়েটাও এক পর্যায়ে গিয়ে বিরক্ত হয়ে চলে গেল।

আকাঙ্ক্ষা ভার্সিটির পিছন দিকটায় গেল। সত্যি মেয়েটার কথা মতো তাওকীর পড়ে আছে। মাথা ফেটে র’ক্ত পড়ছে।

হঠাৎ করে এত র’ক্ত দেখে আকাঙ্ক্ষার নিজের মাথাটাই যেন ঘুরে উঠলো। কি করবে বুঝতে পারছে না। আশেপাশে কাউকে দেখছেও না। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে তাওকীরের পাশে বসে তাওকীরকে নাম ধরে কয়েকবার ডাকলো। তাওকীরের জ্ঞান নেই, তবে নিশ্বাস এখনো চলছে। আকাঙ্ক্ষা তাড়াহুড়ো করে ব্যাগের ভেতর থেকে স্কার্ফ বের করে তাওকীরের মাথায় সেটা শক্ত করে বেঁধে দিল। দৌড়ে গেল সাহায্যের জন্য। একটু পর কয়েকজনকে পেল। তাদেরকে নিয়ে এসে তাওকীর কে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে হসপিটালে ভর্তি করালো।

আকাঙ্ক্ষাও সাথে গেল। যে ছেলেগুলো সাথে এসেছিল ওরাই তাওকীরের পরিবারকে খবর দিল। একটু পর তাওকীরের পরিবারের লোকজন চলে আসাতে আকাঙ্ক্ষার সেখানে থাকতে ইচ্ছে করলো না।

সে যাত্রায় তাওকীর বেঁচে গিয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর এটাও জেনেছিল যে আকাঙ্ক্ষা সাহায্য করেছিল। যদি আকাঙ্ক্ষা খোঁজ না দিত তবে কেউ হয়তো জানতেও পারত না যে তাওকীর ওভাবে ওখানে পড়ে আছে। হয়তো এভাবেই একসময় প্রাণটাও বেরিয়ে যেত।

এরপরে আকাঙ্ক্ষার প্রতি তাওকীরের এক তীব্র কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হয়। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানানোর পর মেয়েটার মাঝে বিশেষ কোন অভিব্যক্তিই লক্ষ্য করা গেল না। তাওকীর খুব ভালোভাবে, বিনীত কন্ঠে আকাঙ্ক্ষাকে নিজের কৃতজ্ঞতাবোধ জানালো, তবে তারপরেও আকাঙ্ক্ষার মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোল লক্ষ্য করা গেল না। তাওকীর কে একবার ঠেস দিয়ে কথাও বলল না, খোঁচালোও না। বরং তাওকীরের এত এত ধন্যবাদ এর বদলে আকাঙ্ক্ষা একটা বাক্যই বলেছিল,

“আপনার জায়গায় অন্য যে কেউ থাকলে আমি এটাই করতাম।”

আর কোন কথাই বলল না তাওকীর এর সাথে। যেখানে তাওকীর আকাঙ্ক্ষার সাথে কথা বলার তীব্র ইচ্ছে প্রকাশ করছিল, সেখানে আকাঙ্ক্ষার মাঝে এমন কোন ইচ্ছে দেখা গেল না। বরং কথা বলতে তীব্র অনিহা প্রকাশ পাচ্ছে আকাঙ্ক্ষার মাঝে।

কেন যেন এই ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগলো না তাওকীরের, আবার একটু অদ্ভুতও লাগলো। যেখানে সব মেয়েরা তাওকীরের সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকে অথচ তাওকীর পাত্তা দেয় না, সেখানে তাওকীর নিজ থেকে এই মেয়েটার সাথে কথা বলতে এগিয়ে যাচ্ছে আর এই মেয়েটা কিনা অনিহা প্রকাশ করছে কথা বলতে। এতে কি তাওকীর কে অপমান করা হলো না?

এরপরে তাওকীর ঠিক করলো আর কথাই বলবে না আকাঙ্ক্ষার সাথে এগিয়ে গিয়ে। মেয়েটাকে বোধহয় একটু বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, সেজন্য ভাব দেখাচ্ছিল তাওকীরকে। এখন তাওকীর কথা না বললে নিশ্চয়ই এগিয়ে এসে কথা বলবে।

তবে তেমন কিছুই হলো না। রোজ আকাঙ্ক্ষা ভার্সিটিতে আসে, তাওকীরের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায় তবে একবার ফিরেও তাকায় না তাওকীরের দিকে।

মাঝে দু একদিন তাওকীর আকাঙ্ক্ষার মনোযোগ পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কাও খেয়েছে, তবে তাও আকাঙ্ক্ষার মনোযোগ পায়নি।

এভাবেই বেশ কয়েকটা মাস কাটলো। তাওকীর বিভিন্নভাবে চেষ্টা করলো আকাঙ্ক্ষার মনোযোগ পাওয়ার জন্য, তবে তেমন কিছুই হলো না। আকাঙ্ক্ষা নিজের মতো ভার্সিটিতে আসে, ক্লাস শেষে আবার চলে যায়, তবে তাওকীরের দিকে তাকায় না।

তবে তাওকীর আর সহ্য করতে পারল না। মনে হলো এবারে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আকাঙ্ক্ষার সাথে এবারে কথা বলা দরকার। নিজেকে আর আটকাতে পারলে না তাওকীর। বরং মনে হলো এখনো যদি আকাঙ্ক্ষার সাথে কথা না বলে তবে নিজের উপরে জুলুম করা হবে।

ক্লাস শেষে চলে যাওয়ার সময় গেটের কাছে আসতেই আকাঙ্ক্ষার সামনে তাওকীর এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে সামনে আসায় আকাঙ্ক্ষা একটু চমকে দু কদম পিছিয়ে গেল। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে সম্মুখে দাঁড়ানো তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে রাগী গলায় বলল,

“এটা কেমন আচরণ?”

তাওকীর হকচকালো। একটু অস্বস্তিও হলো, তবে নিজের অস্বস্তিটুকু আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে না দিয়ে বলল,

“কি হয়েছে? কথা বলার আছে তোমার সাথে, সেজন্য আটকালাম।”

“আমার নাম ধরেও তো ডাকা যেত। হুট করে রাস্তার সামনে চলে আসার মানেটা কি? এ ধরনের আচরণ কারা করে জানেন? বখাটে আর গুন্ডারা।”

তাওকীরও এবার পাল্টা রাগী গলায় বলল,

“এই মেয়ে, একদম নিজের সীমা অতিক্রম করবে না। তোমার মনে হয় না তুমি একটু বেশি ভাব দেখাও? না তুমি দেখতে এতটা সুন্দরী, না তোমার মাঝে এমন বিশেষ কিছু আছে যার জন্য তুমি এত ভাব দেখাতে পারো।”

“আমারও তো কথা এটাই। না আমি দেখতে এতটা সুন্দরী, না আমার মাঝে এমন বিশেষ কোন গুণ আছে যার জন্য আপনি আমার পিছনে পড়ে থাকতে পারেন। আপনার সাথে ঝামেলা বাড়াতে চাইনা সেই জন্য আপনার সব কর্মকান্ড আমি দেখেও না দেখার ভান করেছি, কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে আপনি ঝামেলা না করে ছাড়বেন না আমার পিছু। এখন কি চাইছেন আমি আপনার নামে কমপ্লেইন করি অথরিটির কাছে?”

তাওকীর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“কমপ্লেইন করবে আমার নামে? ঠিক আছে করো। দেখি কি করতে পারো আমার। তুমি হয়তো জানো না আমি কার ছেলে।”

“নিজের বাবার ভয় দেখাতে হয় তার আবার এত গরম? ক্ষমতা থাকে তো নিজের পরিচয় দিয়ে ভয় দেখান। আমি তো মেয়ে, দুর্বল আমাকে ভয় দেখানোর জন্যই যেখানে আপনাকে অন্যের ক্ষমতার উপরে নির্ভর করতে হয় সেখানে আপনি যে আমার কতটা কি করতে পারবেন সেটা আমার খুব ভালো করে জানা আছে। আমাকে দেখুন, আমি সৎ সাহস নিয়ে বলতে পারি আপনাকে সোজা করার জন্য আমি একাই যথেষ্ট।”

“তুমি অত্যাধিক বেয়াদব একটা মেয়ে। আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে তোমার সাথে কথা বলতে এসেছিলাম। চেয়েছিলাম তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে। কিন্তু তুমি কাউকে সম্মান দিতে জানোনা।”

“সম্মান অর্জন করে নিতে হয়।আপনি সম্মান পাওয়ার মতন এখনো কিছু করেননি। এই যে আপনার দলের ছেলেরা আছে না, এরা শুধু আপনাকে ভয়ে ভক্তি করে। আড়ালে গিয়ে এরাই আপনার নামে কত যে আজেবাজে কথা বলে সে সম্বন্ধে আপনার বিন্দুমাত্র কোন আন্দাজ নেই। এই ভার্সিটির প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট শুধু মুখে আপনাকে সম্মান করে, আর আপনার পেছনে আপনাকে সস্তার রাজনীতিবিদ বলে। আর আমি যা বলার আপনাকে মুখের উপরে বলি। আগে সম্মান পাওয়ার মতন কাজ করুন, তারপরে আমার থেকে সম্মান আশা করবেন।”

কথাটা বলে আকাঙ্ক্ষা চলে গেল। তাওকীরও আর আটকাতে পারল না। আকাঙ্ক্ষা যে কথাগুলো বলে গেল সেগুলো যে ভুল না সেটা তাওকীর বেশ ভালোই জানে।

তবে একটা কথা তাওকীরকে ভীষণ মানসিক অশান্তির মাঝে ফেলল। সেটা হলো আকাঙ্ক্ষা তাওকীর কে সম্মান করে না। কেন যেন তাওকীরের এই কথাটা একদমই পছন্দ হয়নি।

তাওকীর মুখ ফুটে বলল যে আকাঙ্ক্ষার সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য এসেছিল, অথচ মেয়েটা সেই কথাটা একবারও তুলল না। একটু বললও না যে তাওকীরের সাথে বন্ধুত্ব করা যায়।

হুট করে তাওকীরের মনের মাঝে একটা জেদ চেপে বসলো। ও এমন কিছু করবে যেন আকাঙ্ক্ষা ওকে সম্মান করতে পারে, যেন নিজ থেকে এগিয়ে এসে তাওকীর কে বলে যে তাওকীরের সাথে বন্ধুত্ব করা যায়।

তারপরে আর কি, তাওকীর নিজের মতন করে সব রকমের চেষ্টা করলো। খুব চেষ্টা করলো আকাঙ্ক্ষার চোখে ভালো হওয়ার জন্য। কেন চেষ্টা করলো জানে না। আকাঙ্ক্ষা কে অযথা বিরক্ত করে ছেড়ে দিল, যেখানে সেখানে হুটহাট ধাক্কা খাওয়া বন্ধ করে দিল, হঠাৎ করে সামনে এসে পথ রোধ করা থামিয়ে দিল, সেই সাথে থামালো বিভিন্ন আজেবাজে কাজকর্ম।

তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে জুনিয়রদের বিরক্ত করা। কে জানে আরো কত শত বদ অভ্যাস নিজের অজান্তে ছেড়ে দিয়েছিলো তাওকীর আকাঙ্ক্ষার জন্য। কেন ছেড়েছিলো জানেনা, আকাঙ্ক্ষা ছাড়তেও বলেনি। তাওকীর নিজ থেকেই ছেড়েছে, আকাঙ্ক্ষার থেকে সম্মান পাওয়ার জন্য।

আবারও বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ করে একদিন আকাঙ্ক্ষার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তাওকীর। আজ আকাঙ্ক্ষা কেন যেন তাওকীরের উপস্থিতিতে বিরক্ত হলো না। তাওকীরের থেকে আকাঙ্ক্ষা দূরে থেকেও যেন অনুভব করতে পেরেছে তাওকীরের পরিবর্তন। তাওকীর নিজেকে পরিবর্তন করেছে শুধুমাত্র আকাঙ্ক্ষার সম্মান পাওয়ার জন্য, এই ব্যাপারটা আকাঙ্ক্ষাকে খুব অবাক করতো। কেন যেন বিশ্বাস হতে চাইতো না যে কেউ একজন আকাঙ্ক্ষার মতন নগণ্য একজন মানুষের থেকে সম্মান পাওয়ার জন্য নিজের সমস্ত বদ অভ্যাস ঝেড়ে ফেলছে। তাও আকাঙ্ক্ষা না বলাতেই।

কেন তাওকীর এসব করেছিলো আকাঙ্ক্ষার জানা ছিল না। আকাঙ্ক্ষার থেকে কি শুধুমাত্র সম্মান চাইতো, নাকি এর থেকেও বড় কোন কিছুর দাবিদার ছিল সেটা জানা ছিল না আকাঙ্ক্ষার। তবে ভালো লাগতো। মনে হতো না চাইতেও কারো জীবনে আকাঙ্ক্ষার গুরুত্ব আছে, আকাঙ্ক্ষার ভালো লাগার গুরুত্ব আছে, মন্দ লাগার গুরুত্ব আছে।

আকাঙ্ক্ষা কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাওকীর এর দিকে। তাওকীরের ঠোঁটের নির্ভেজাল হাসিটাই যেন অনেক কিছু প্রমাণ দিচ্ছে। আকাঙ্ক্ষার তাকিয়ে থাকার মাঝেই তাওকীর হাত বাড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,

“বন্ধুত্ব করবে আমার সাথে? আপাতত শুধুই বন্ধুত্ব। পরের ধাপে যাব কিনা সেসব না হয় পরে ভাবা যাবে। কি হলো করবে বন্ধুত্ব?”

আকাঙ্ক্ষা তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিতে পারল না। বন্ধুত্বে খুব একটা অভ্যস্ত না আকাঙ্ক্ষা। খুব বেশি বন্ধুও নেই। হাতে গোনা দু একজন আছে যাদের জীবনে আকাঙ্ক্ষা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নেই। বন্ধুত্ব সম্পর্কটায় তেমন একটা ভরসাও নেই। তাই তাওকীর কে নিজের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যায় কিনা এই ব্যাপারে বেশ চিন্তার মাঝে পড়লো। সত্যিই কি তাওকীর কে বিশ্বাস করা যায়? এই প্রশ্নের উত্তরটা আকাঙ্ক্ষা খুঁজে পাচ্ছিল না।

আকাঙ্ক্ষার চোখে ভেসে ওঠা সেই প্রশ্নগুলো যেন তাওকীর খুব সহজেই পড়তে পারল। আকাঙ্ক্ষার মনে সৃষ্টি হওয়া ভয়টা দূর করার উদ্দেশ্যে বলল,

“নিজেকে শোধরানোর সব রকমের চেষ্টা করেছি, শুধুমাত্র তোমার সাথে বন্ধুত্ব করব বলে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যাকে তাকে অন্তত তুমি নিজের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না। যে মানুষটা শুধুমাত্র তোমার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করল তাকে কি বিশ্বাস করা যায় না? আচ্ছা বিশ্বাস নাহয় নাই করলে, অবিশ্বাস করেই না হয় একবার বন্ধুত্ব করে দেখলে।”

আকাঙ্ক্ষার কেন যেন একটু হলেও ভরসা হলো তাওকীরের কথায়। নিজেও পাল্টা হালকা হেসে বলল,

“ঠিক আছে। অবিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করেই বন্ধুত্ব করলাম।”

বিজ্ঞাপন

তাওকীর ইশারায় নিজের হাতটা দেখিয়ে বলল,

“তাহলে হাত মেলাও।”

আকাঙ্ক্ষা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে তাওকীরের প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“না। একবার হাত মেলালে এই হাত ধরে বহুদূর যেতে হতে পারে। আর অনেকটা পথ চলে যাওয়ার পর যদি আপনি ফেরত আসতে বলেন, তবে আমার একার পক্ষে হয়তো ফেরত আসা সম্ভব হবে না। তাই হাত আমি ধরবো না।”

“একবার যদি আমার হাতটা ধরো তবে কথা দিচ্ছি আর একা ফেরত আসতে হবে না। আমি ফেরত আসতে দেবো না।”

“সত্যি কথা দিচ্ছেন?”

“সত্যি কথা দিচ্ছি। একবার হাতটা ধরে দেখো, আমি ফেরত আসতে দেবো না তোমায়। তুমি ফেরত আসতে চাইলেও জোর করে ধরে রাখবো। এটা তাওকীর এহসানের দেওয়া কথা।”

°°°°°°°°°°

“সে কথা দিয়েছিল কিন্তু নিজের কথা রাখেনি। বন্ধুত্বের শুরুতে আমি তাকে বলেছিলাম আমার ভয় হয়, যদি অনেকটা পথ চলে যাওয়ার পর আমি একা ফেরত না আসতে পারি। সে আমাকে আশ্বস্ত করেছিল। তবে দিনশেষে সে আমায় একটা নির্জন অন্ধকার রাস্তায় একা ফেলে রেখে হারিয়ে গিয়েছিল।”

আকাঙ্ক্ষার মুখ থেকে কথাগুলো শুনতেই আরমান ধপ করে বসে পড়লো সোফায়। অন্যপাশের সোফায় বসে আছে আকাঙ্ক্ষা। ওর দুই পাশে বসে আছে প্রার্থনা আর আরজু।

আকাঙ্ক্ষা অতীতের কিছু গল্প শোনালো ওদেরকে। আরমানের কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না আকাঙ্ক্ষার জীবনের আজ যে করুণ দশা তার জন্য তাওকীর দায়ী। এটা তো হতে পারে না। তাওকীর তো এমন না, তাওকীর ভীষণ ভালো। কারো জীবন নষ্ট করতে পারে না তাওকীর।

অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই আরমানের চোখ জোড়া ভিজে উঠল। আরজু উঠে গিয়ে আরমানের পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“ঠিক আছেন আপনি?”

আরমান একটু চমকে উঠলো। শার্টের হাতায় চোখ দুটো মুছে নিয়ে আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আচ্ছা আপা, তাওকীর নামে তো আরো অনেকে থাকতে পারে তাই না? হয়তো নাম এক, চেহারারও মিল আছে, হয়তো একই ভার্সিটিতে পড়েছে। তবে এমনটাও তো হতে পারে যে ওটা আমার তাওকীর ভাই না। হয়তো সকালে যাকে দেখেছিলেন তার সাথে আপনার বলা তাওকীরের চেহারার মিল আছে, তবে সে আসলে আমার তাওকীর ভাই না। এমনটা তো হতেই পারে তাই না?”

আকাঙ্ক্ষা মলিন হেসে বলল,

“যাকে সবথেকে বেশি ভালোবেসেছি, আবার যাকে সবথেকে বেশি ঘৃণাও করেছি তাকে চিনতে ভুল করব আমি?”

“আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করছেন না। হয়তো ভুল হয়ে গেছে। অনেকদিন হলো তো দেখেন না, অনেকগুলো বছর তো মধ্যে কেটে গেছে তাইনা? আচ্ছা দাঁড়ান আমি আপনাকে ছবি দেখাচ্ছি।”

কথাটা বলে আরমান তাড়াহুড়ো করে নিজের ফোন থেকে কিছু ছবি বের করলো। উঠে গিয়ে আকাঙ্ক্ষার পাশে বসে সেই ছবিগুলো আকাঙ্ক্ষাকে দেখিয়ে বলল,

“এই দেখুন আপা, এটা আমার তাওকীর ভাই। খুব ভালো আমার ভাই। আমাদের সবাইকে খুব ভালোবাসে, আমাদের পরিবারের গর্ব আমার তাওকীর ভাই। এই যে দেখুন এটা হচ্ছে ভাবি আর ভাইয়ের মেয়ে তাহি। ভাই ভাবিকে খুব ভালোবাসে, খুব সম্মান করে ভাই মেয়েদের। সেখানে আপনার সাথে এমনটা কি করে করবে বলুন? দেখুন কত সুন্দর একটা পরিবার। ভাবি খুব ভালো।”

আরমানের হাত থেকে আকাঙ্ক্ষা ফোনটা নিজের হাতে নিল। স্ক্রিনে তিনটা মানুষ জলজল করছে। তাওকীরের কোলে একটা ছোট্ট মেয়ে আর ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাওকীরের স্ত্রী হিমি। কি সুন্দর সুখী একটা পরিবার। দেখলে যে কারো চোখ জুড়িয়ে যাবে।

আকাঙ্ক্ষার রাগ হলো না আফসোস হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। তবে মনে হলো এমন একটা পরিবার আকাঙ্ক্ষারও হতে পারতো। আজ হিমির জায়গায় আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারতো, আর তাওকীরের এই মেয়েটার জায়গায় ফারিহা থাকতে পারতো। সেই সাথে এটা ভেবে অবাক হলো যে আকাঙ্ক্ষার জীবনটা শেষ করে দিয়ে তাওকীর কি সুন্দর সুখে শান্তিতে সংসার করছে। এমন একটা অমানুষকে আকাঙ্ক্ষা ভালোবেসেছিলো এই কথাটা যেন বিশ্বাসই হয় না। এমন তো ছিল না তাওকীর। তবে হঠাৎ করে এতটা পরিবর্তন হলো কি করে?

আকাঙ্ক্ষাকে খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখতে দেখে আরমান বলে উঠলো,

“দেখেছেন আপা, এখন আপনার অপরিচিত মনে হচ্ছে না? আমি বলেছিলাম আপনাকে আপনি যার কথা বলছেন সে আমার তাওকীর ভাই না। আমার ভাই খুবই ভালো।”

“আজ কয় তারিখ বলতে পারো?”

আরমান খুব চেষ্টা করল মনে করার যে আজ কয় তারিখ, কিন্তু বলতে পারল না। অপর পাশ থেকে আরজু বলে উঠলো,

“এপ্রিল মাসের আঠারো তারিখ।”

আকাঙ্ক্ষা চমকে উঠলো। একেই কি বলে নিয়তি। আজ এমন একটা দিনেই আবার তাওকীরের সাথে দেখা হলো। ভাগ্য সত্যি অদ্ভুত।

আকাঙ্ক্ষা আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাওকীর একটা সময় আমায় খুব ভালোবেসেছিল, তবে আমার খুব ভয় হতো। মনে হতো হয়তো ও আমার হাতটা ছেড়ে দেবে। জানো, ও আমার সেই ভয়টা দূর করতে একদিন হঠাৎ করে বলল বিয়ে করবে। জানিনা আমার কি হলো, আমিও করে নিলাম বিয়ে। আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী। আজ আমার আর তাওকীরের পনেরোতম বিবাহ বার্ষিকী। শুনতে হাস্যকর লাগলেও এটাই সত্যি। কারণ আমাদের তালাক হয়নি। রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে এখনো হয়তো আমাদের বিয়ের প্রমাণ পাওয়া যাবে।”

আরমান বুঝতে পারছে আকাঙ্ক্ষা যা বলছে তার কোনটাই মিথ্যে না, তবে আরমানের মন চাইছে সবকিছু যেন মিথ্যে হয়ে যায়। চাইছে সবকিছু একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে যাক। আরমানের মনটা খুব করে চাইছে আকাঙ্ক্ষা যে তাওকীরের কথা বলছে, সেই তাওকীর যেন আরমানের ভাই না হয়।

আরমান কি করে সহ্য করবে, পুরো পরিবার, হিমি কি করে সহ্য করবে? সবাই যে ভেঙে পড়বে। তাওকীর তো ওদের সব ভাইবোনের আদর্শ। তাওকীরের সম্মান থাকবে না কারোর চোখে। তাওকীর যে আর কখনো কারো সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেনা, ওদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে না, ওদের এই সুখের পরিবারে সবাই যে আর কখনো হাসতে পারবে না প্রাণ খুলে।

নিজের অজান্তেই আরমানের চোখ দুটাে আবারও ভিজে উঠলো। আরজু চায়না আরমানকে কষ্ট দিতে, তবে আজ যে আরমানকে কষ্ট পেতেই হবে। কিছু করার নেই আরজুর। কেননা আরমান এমন কিছু মানুষকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করেছে যারা আরমানের ভরসার যোগ্য না, তবে যে কষ্ট পেতেই হবে। ঠিক যেমন আকাঙ্ক্ষা ভুল মানুষকে ভরসা করে কষ্ট পেয়েছিল।

আরজু উঠে দাড়িয়ে আকাঙ্ক্ষার দিকে এগিয়ে এসে আকাঙ্ক্ষার হাতটা ধরে বলল,

“চলো আপা।”

আকাঙ্ক্ষা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কোথায় যাব?”

“আজ তোমার বিবাহ বার্ষিকী না, আজ তোমার আত্মার মৃত্যুবার্ষিকী। আর যে তোমার আত্মার খু’নি তাকে জানাতে হবে না এই কথাটা। তাকে তো মনে করিয়ে দিতে হবে যে আজ থেকে পনেরো বছর আগে সে একটা খু’ন করেছিল। সে তো শুধু তোমার জীবন নষ্ট করেনি, এখনো আরো একটা মেয়ের জীবন ক্রমাগতভাবে মিথ্যে বলে নষ্ট করছে। সে তার স্ত্রী চোখে আদর্শ, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী, সেই মেয়েটার ভুল ধারণা ভাঙতে হবে তো। যে বাচ্চাটা নিজের বাবাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা বলে ভাবছে, তাকে বোঝাতে হবে না যে তার বাবা একটা অমানুষ। তার জন্মদাতা পিতা, জন্মদাত্রী মাকে জানাতে হবে না যে তারা মানুষ না, একটা পশু জন্ম দিয়েছে।”

আকাঙ্ক্ষা একটু ভয় পেল। আতঙ্কিত গলায় বলল,

“না আরু, আমরা যাব না। তাওকীর যেন কখনো না জানে যে আমি এই বাড়িতে আছি। তোর শ্বশুর বাড়ির কেউ যেন না জানে যে আমার মতন একটা মেয়ে তোর বোন, তবে যে তোর সংসার নষ্ট হয়ে যাবে আরু। আমি চাইনা আমার জন্য আমার বোনের সংসার নষ্ট হোক।”

আরজু দৃঢ় গলায় বলল,

“কিচ্ছু হবে না। আমি তাওকীরকে ভালোবাসিনি আপা, আমি আরমানকে ভালোবেসেছি। তারপরও যদি এই কথাটা প্রকাশের পর আমার সংসারে অশান্তি হয় তবে হোক, আমার সংসার নষ্ট হলে হোক। তবে যে এই জঘন্য পাপটা করেছে তাকে তো আমি শাস্তি দেবোই। তার ভালো মানুষের মুখোশ যদি আজ আমি তার পুরো পরিবারের সামনে টেনে না খুলেছি তবে আমার নাম আরজু না।”

“এমনটা করবেন না আরু।”

আরমানের কাতর গলার আকুতিটা আরজুর কানে যেতেই একটু চমকালো। বিশ্বাস হলো না যে আরমান এই কথাটা ওকে বলল। আরমান বলছে ওকে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে! আরজু অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“এ কথাটা আপনি আমায় বলছেন আরমান? আমার আপার সাথে আপনার ভাই যে জঘন্য খেলাটা খেলেছে তারপরও আপনি আমায় বলছেন সবকিছু লুকিয়ে রাখতে?”

আরমানের ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে এই কথাগুলো বলতে। নিজেকে কেমন যেন ছোট লাগছে, স্বার্থপর মনে হচ্ছে। তবে বারবার চোখের সামনে যখন তাওকীরের সুখের সংসারের ছবিটা ভেসে উঠছে তখন পারছে না নিজেকে আটকাতে। আবার যখনই আকাঙ্ক্ষা কে দেখছে তীব্র ঘৃণা জন্মাচ্ছে তাওকীরের প্রতি।

“ভাবির জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে আরু। তাহি একটা রাতও কোথাও থাকতে পারেনা ওর বাবাকে ছাড়া। এই কথাটা শোনার পর ভাবি না পারবে ভাইয়ের সাথে সংসার করতে, না পারবে ভাইয়ের থেকে দূরে সরে যেতে। ওদের দুজনের তো কোন দোষ নেই বলুন?”

“তাহলে কি বলতে চাইছেন আপনি, শাস্তি পাবে না উনি?”

“অবশ্যই পাবে। শাস্তি পেতেই হবে। আমি বোধহয় ভুলভাল কথা বলছি। না আরু আপনি যান। আপনি যা ইচ্ছে করুন। আমি আটকাবো না আপনাকে।”

আকাঙ্ক্ষার মনে হলো এবারে শেষ একটা সত্যি সবাইকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। বুঝতে পারছে আরমানের কষ্ট হচ্ছে নিজের ভাইকে অপরাধী হিসেবে মেনে নিতে, তবে হয়তো এই শেষ সত্যিটা বললে আরমানের কষ্ট একটু কম হবে।

“তাওকীরের মেয়ে ওকে ছাড়া একটা রাতও কাটাতে পারে না তাই না আরমান?”

“হ্যাঁ আপা। মেয়েটা খুব ভালোবাসে ওর বাবাকে। আমি ওকে কি জবাব দেবো?”

আকাঙ্ক্ষা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“অথচ জানো, আমার মেয়েটা জীবনের চৌদ্দটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে নিজের আসল বাবা-মার পরিচয় ছাড়া। ও কখনো জানতেই পারেনি যে ওর আসল বাবা-মা কে। আর না ভবিষ্যতে কখনো জানতে পারবে। ও কখনোই ওর বাবার আদর পায়নি। ও এত বড় বংশের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও আশ্রয়হীন এর মতন এখান থেকে ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছে। ওর পরিচয় ও তাওকীর এহসানের মেয়ে, তবে সবাই ওকে চেনে সন্ত্রাসীর মেয়ে হিসেবে।”

উপস্থিত তিনজনেই চমকে উঠলো। আকাঙ্ক্ষার কথা শুনে তিন জোড়া বিস্ময় ভরা দৃষ্টি একসাথে নিক্ষিপ্ত হলো আকাঙ্ক্ষার উপরে। আরমান কম্পিত গলায় বলল

“মেয়ে মানে? তাওকীর ভাইয়ের মেয়ে তো তাহি।”

“সে তো তাওকীর আর হিমির মেয়ে। তাওকীর আর আকাঙ্ক্ষারও যে একটা মেয়ে আছে। তার নামও যে তাহি। তার বাবার পছন্দ করা নামই আমি রেখেছি। আমার মেয়েটা যে জীবনে কিচ্ছু পেল না আরমান। এই অভিযোগ আমি কার কাছে করবো?”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প