ভার্সিটির মাঠের একটা কোণার দিকে দাঁড়িয়ে আছে আকাঙ্ক্ষা। কোন দিকে যাবে সে, কোন রুমে ক্লাস হবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কেউ পরিচিত নেই যে তাকে একটু জিজ্ঞেস করবে।
দুদিন হলো কেবলমাত্র গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। কোন বন্ধুবান্ধব নেই, পরিচিত কেউ নেই। এমনিতেই তো নিজেকে অসহায় মনে হয়, তার মধ্যে এই ভার্সিটির মাঠে দাঁড়িয়ে আরো বেশি অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে। চারিদিকে কত মানুষ, সবারই কেউ না কেউ আছেই, শুধু আকাঙ্ক্ষা একা।
বেশ অনেকটা সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে আকাঙ্ক্ষা সিদ্ধান্ত নিল যে কাউকে একটা গিয়ে জিজ্ঞেস করবে।
ভার্সিটির এত এত মডার্ন মেয়ের মাঝে আকাঙ্ক্ষা তখন নিতান্তই সহজ সরল একটা মেয়ে। পরনে একটা সাধারন সুতি থ্রি পিস। সেই থ্রি পিসটাও আবার ইস্ত্রি করা হয়নি। কোমর সমান লম্বা চুল গুলো খুব সাধারণভাবে একটা বেনি করেছে। মুখে কোন মেকআপ তো দূর শুষ্ক ঠোঁটে একটু ভ্যাসলিন অব্দি লাগায়নি। পায়ে একটা সাধারণ স্যান্ডেল পরেছে। আর কাঁধে ঝুলছে একটা ব্যাগ। ব্যাগের আবার কয়েক জায়গায় একটু ছিঁড়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ পুরনো একটা ব্যাগ। তবে প্রার্থনা আজও এই ব্যাগটার সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবহারের জন্য।
আকাঙ্ক্ষার সহজ সরল ভাবটা দেখেই তখনকার সময়ের ভার্সিটির সব থেকে সুদর্শন যুবক, তরুণ ছাত্রনেতা, মেয়েদের পছন্দের তালিকায় যার নাম সবসময় শীর্ষে থাকে, সেই তাওকীর এহসানের নজরে পড়েছিল আকাঙ্ক্ষা।
দোষটা অবশ্য আকাঙ্ক্ষা নিজেরই দেয়। কেননা মাঠে হাজারো মানুষের উপস্থিত থাকতে আকাঙ্ক্ষা গিয়ে তাওকীরের কাছ থেকে সাহায্য চেয়োছিল। জিজ্ঞেস করেছিল বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রথম বর্ষের ক্লাস কোথায় হচ্ছে।
ভার্সিটিতে সে সময় তাওকীরের অন্যান্য বিষয়ে সুখ্যাতি থাকলেও, জুনিয়ারদের বিরক্ত করার ব্যাপারে বেশ কুখ্যাতি ছিল। বিশেষ করে তাদের বিরক্ত করতে খুব বেশি ভালো লাগতো যাদের চেহারার মাঝে একটা সরলতা প্রকাশ পেত। এমন গ্রামের সহজ সরল মেয়েদের বিরক্ত করার মাঝেই তো আসল মজা।
তবে প্রথম দিন তাওকীরের তেমন কিছু একটা করার ইচ্ছে হয়নি আকাঙ্ক্ষার সাথে। শুধু আকাঙ্ক্ষা জানতে চেয়েছিল বাংলা ডিপার্টমেন্টের কথা তাওকীর ওকে দেখিয়ে দিয়েছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্ট।
নিজের গন্তব্যের ঠিকানা পেয়ে আকাঙ্ক্ষা ক্লাসের উদ্দেশ্যে চলে গেল। তাওকীর সেখানেই নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বসে দীর্ঘ একটা সময় আড্ডা দিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে তাওকীরের ক্লাসও আছে, তবে ক্লাস করতে ইচ্ছে করলো না।
বেশ কিছুক্ষণ পর তাওকীর খেয়াল করলো আবারো আকাঙ্ক্ষা ওদের দিকে আসছে। তাওকীর ভাবলো নিশ্চয়ই ভুল ডিপার্টমেন্ট এ ক্লাস করতে যাওয়ার জন্য ক্লাসে বেশ হাসাহাসি হয়েছে মেয়েটাকে নিয়ে। স্যারের কাছে বকাও খেতে পারে, যে এত বড় একটা মেয়ে অথচ ভুল ডিপার্টমেন্টে এসে ক্লাস করছে কি করে।
মেয়েটা এখন নিশ্চয়ই এসে কান্নাকাটি করে বলবে যে কেন ওর সাথে এমন করলো তাওকীর, ওর তো কোন শত্রুতা ছিল না তাওকীরের সাথে।
আকাঙ্ক্ষাকে নিজের দিকে আসতে দেখে তাওকীর খুব বেশি একটা পাত্তা দিল না। এমন ভাব দেখালো যেন আকাঙ্ক্ষাকে দেখেনি, এত সময় নেই তাওকীরের।
তবে আকাঙ্ক্ষা কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই আর অবজ্ঞা করার কোন উপায় রইল না। একটু ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,
“আরো কিছু বলবে? ক্লাস তো এখনো শেষ হয়নি, বেরিয়ে এলে কেন?”
আকাঙ্ক্ষাকে বেশ শান্ত দেখালো। কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো তাওকীরের দিকে। তাওকীর আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টি দেখে যেন একটু এলোমেলো হয়ে গেল। মেয়েটার দৃষ্টি বড্ড অদ্ভুত। যেমন সুন্দর তেমনি তীক্ষ্ম। মেয়েটা যে দেখতেও রূপবতী সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তাওকীরের এসব ভাবনার মাঝেই আকাঙ্ক্ষা বলে উঠলো,
“না জেনে ভুল করা আর জেনে বুঝে অপরাধ করার মাঝে পার্থক্য বোঝেন?”
হঠাৎ করে আকাঙ্ক্ষার এমন প্রশ্ন তাওকীর কে একটু ভ্যাবাচ্যাকায় ফেলল। ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“এই যে আপনি আমাকে আজ সবার সামনে হাসির পাত্রী বানালেন, এতে কিন্তু আপনি নিজের পরিচয় দিলেন। ভার্সিটির প্রথম দিনটা আপনার জন্য আমার ভীষণ খারাপ কাটল। আজ আমি আপনার কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি তার বদলে আমায় অপমান ফিরিয়ে দিলেন। প্রকৃতির নিয়ম কিন্তু বড্ড কঠিন। দেখবেন কোনো একদিন এমন একটা পরিস্থিতি ঠিক তৈরি হবে, যেদিন আপনি আমার দিকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াবেন। তবে আমি আপনাদের শহুরে মানুষদের মতন অমানুষ নই। গ্রামে থাকার কারণে হয়তো আমার কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক আশাক আপনাদের থেকে অনেকটা অনুন্নত। তবে আমরা প্রকৃত মানুষ। কেউ সাহায্যের হাত বাড়ালে হোক সেটা রাস্তার কুকুর কিংবা আপনার মতো ভার্সিটির সস্তা নেতা, আমরা তাকে ফিরিয়ে দেই না।”
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তাওকীরের। চোখে মুখে ফুটে উঠল হিংস্র ভাব।
“ভার্সিটিতে প্রথম দিনেই আমার সাথে লাগতে এসোনা। এমন অবস্থা করব ভার্সিটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে।”
আকাঙ্ক্ষা আলতো হেসে বলল,
“আমাকেও আমার সরলতার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করবেন না। এমন অবস্থা করবো জীবনে আর কোনদিন কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে কথা বলার সাহস পাবেন না।”
তাওকীর ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“কি ক্ষমতা আছে তোমার, যে তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো? তোমাকে যদি গুম করেও রেখে দেই না, কেউ খোঁজ করতে আসবে না। সবাই যদি জানেও যে তাওকীর এহসান তোমায় গুম করেছে, তাও কারো ক্ষমতা হবে না মুখ ফুটে আমার নাম বলার।”
অতীতের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো রূপসী। মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি। তাওকীর ভুল বলেনি। সত্যি জলজ্যান্ত একটা মেয়ে হারিয়ে গেল শহর থেকে, এত মানুষের মাঝ থেকে তবুও কেউ একবারও খোঁজ করার চেষ্টা করলো না যে মেয়েটা কোথায় গেল। ওর বাড়ির লোকজন খোঁজ করেছিল কিনা কে জানে। হয়তো কারো মনেই নেই আকাঙ্ক্ষার কথা।
তবে রূপসীর একটা কথা ভেবে ভীষণ হাসি পেল, ওর মতন মেয়ে কি করে তাওকীর এর মতন মুখোশধারী ছেলেকে ভালোবেসে ফেলল। ভালোবেসে সম্পর্কটা কত দূর এগিয়ে গিয়েছিল। তবে বিশ্বাসঘাতকটা আকাঙ্ক্ষাকে ছুঁড়ে ফেলতে একবারের জন্য ভাবেনি, একটুও বুক কাঁপেনি।
রূপসীর এসব ভাবনার মাঝে বাইরে একটু হৈচৈ এর আওয়াজ কানে এলো। বাইরে থেকে একটা মেয়ে ছুটে রূপসীর ঘরে এসে হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় বলল,
“কাল রাতে যারা এসেছিল আজ আবার তারা এসেছে। সঙ্গে আরো একজন ছেলে কে নিয়ে এসেছে। ও এখন ঝামেলা করছে, তোর সাথে দেখা করতে চাইছে।”
রূপসী ইশারায় মেয়েটাকে চলে যেতে বলল। বিছানা থেকে নেমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। টিপের পাতা থেকে একটা বড় লাল টিপ কপালে পরলো, ঠোঁটে লাগালো টকটকে লাল রঙের লিপস্টিক, চোখে মোটা করে কাজল পরল। পানের বাটা থেকে একটা পান নিয়ে সেটা মুখে পুরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ঘর থেকে বের হতেই রূপসী আরজু আর আরমানকে দেখতে পেল। তবে সঙ্গে আরেকজন ছেলে আছে, যে রূপসীর ছেলেদের সাথে ঝামেলা করছে। বোধহয় রূপসীর সাথে দেখা করতে চাইছে। তবে ওরা তো দেবে না দেখা করতে। কেননা রূপসী নিষেধ করে দিয়েছে।
রূপসী একবার ফিরোজকে খুব ভালোভাবে দেখল। অনেক ছোটবেলায় দেখেছিলো তবে তাও রূপসীর চিনতে অসুবিধা হলো না। ছোটবেলা থেকে যাকে নিজে মানুষ করেছে, এত আদর ভালোবাসা দিয়েছে, যার ভবিষ্যৎটা নিশ্চিত করার জন্য গ্রাম থেকে শহরে এসে দিনরাত পরিশ্রম করেছে তাকে কি করে ভুলে যাবে রূপসী। ফিরোজদের সামনে যাওয়ার আগেই চোখের জলটুকু মুছে নিয়ে নিজেকে শক্ত করল।
রূপসী ওদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গলা উঁচিয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরে বাবু, অযথা ঝামেলা করছিস কেন? দিনের বেলায় এসব কাজ চলে না আমাদের এখানে। মেয়ে পাবি রাতের।”
কন্ঠটা কানে যেতেই ফিরোজ থমকালো। খুব ভয়ে ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। টকটকে লাল রঙের চুমকি পাথরের কাজ করা শাড়ি পরে একজন মহিলা ওদের দিকে এগিয়ে এলো। বেশ অদ্ভুত তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, বেশ অদ্ভুত তার কথাবার্তা, বেশ অদ্ভুত তার সাজগোজ। তবে কন্ঠটা যে ফিরোজের চেনা লাগলো।
রূপসীকে আসতে দেখে আরজু এগিয়ে গিয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই দেখ ফিরোজ। তুই বল এটা আমাদের বড় আপা না? আমি না হয় চিনতে ভুল করলাম, তাই বলে তুইও চিনতে ভুল করবি। দেখ কন্ঠও আমাদের বড় আপার মতন। কিন্তু আপা কোনমতেই স্বীকার করছে না। আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে কাল।”
রূপসী আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে কালকেই বলেছিলাম কোন ঝামেলা করবি না, কিন্তু তুই দেখছি আমার কথা শুনিসই না। আমার মাথা বেশি গরম করবি তো সত্যি কিন্তু তোকে এখানে বন্দি করে রাখব। একটারও ক্ষমতা নেই যে রূপসীর অনুমতি ছাড়া এখান থেকে বেরোবি।”
আরজুকে কথাটা বলে পিছনে দাঁড়ানো আরমানকে উদ্দেশ্য করে রূপসী বলল,
“আর এই যে বাবু, তুমি যত বড় নেতাই হও না কেন একবার যদি আমি তোমাদের পিছনে লাগি কাউকে কিন্তু বাঁচতে দেব না। তোমার বউকে সোজা ঘরে ঢুকিয়ে দেবো কাস্টমারের।”
আরমান হিংস্র গলায় বলল,
“আপনাকে আমি কাল সাবধান করেছিলাম আমার স্ত্রীকে নিয়ে কোন কথা বলবেন না। আপনি আমার সাথে লাগতে আসবেন না, নয়তো আপনি আর আপনার এই সাম্রাজ্য কোনটাই টিকবে না। তাওসিফ আরমানকে চ্যালেঞ্জ করতে আসবেন না।”
রূপসী আরো কিছু বলতে যাবে তবে তার আগেই ফিরোজ ওর বাহু চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। রূপসী এবার তেঁতে উঠে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোর আবার কি হলো?”
ফিরোজ কাঁপাকাঁপা হাতটা রূপসীর গালে রাখলো। রূপসীর সমস্ত মুখে হাত বোলালো, যেন অনুভব করার চেষ্টা করল যে এটাই ওর আপা কিনা। রূপসী কেন যেন চেয়েও বাঁধা দিতে পারল না ফিরোজ কে, ভয় দেখাতে পারলো না, না রেগে যেতে পারলে। তবে কাঁদলোও না।
তবে চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো ফিরোজের। এক পর্যায়ে গিয়ে গাল বেয়ে জল গড়িয়া পরল। কম্পিত গলায় বলল,
“আপা।”
রূপসীর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।তবে রূপসী সত্যি ভুল চেনেনি। এটাই ওর আবির। ইচ্ছে করলো শক্ত করে আবিরকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, আদর করতে, একটু জিজ্ঞেস করতে যে কেমন আছে। তবে সেসব হলো না। এদিকে রূপসীর থেকে কোন উত্তর না পেয়ে ফিরোজ ফের বলে উঠলো,
“তুমি আমাকে ভুলে যাবে এটা তো হতে পারে না আপা। আমার কাছে তোমার যে সম্পদ আমানত আছে সেটাও ভুলে যাবে সেটা হতে পারে না। তবে অস্বীকার করছ কেন নিজের পরিচয়? আরজু কে চিনবে না এমনটাও তো হতে পারে না।”
ধ্যান ভাঙল রূপসীর। বুঝলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে এদের সামনে দুর্বল হলে চলবে না। এক ঝটকায় ফিরোজের হাতটা সরিয়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়ে বিরক্তি মাখা গলায় বলল,
“ইচ্ছে করছে তোদের সব কটার ঠ্যাং ভাঙ্গি। শালারা দিন নেই, রাত নেই যখন তখন চলে আসিস আমাকে নিজেদের আপা বানাতে। শোন, আমার এত গুষ্টির দরকার নেই। এই সমাজে অনেক এতিম অসহায় মেয়ে আছে, তাদেরকে গিয়ে নিজেদের আপা বানিয়ে নে। আমার পিছু ছাড় তোরা।”
রূপসীর থেকে এমন একটা কথা আশা করেনি ফিরোজ। ফিরোজ বুঝতে পারল এতদিন পর ওকে দেখার পরেও যখন রূপসী স্বীকার করেনি যে ও আকাঙ্ক্ষা, তাহলে সহজে করবেও না। নিশ্চয়ই স্বীকার না করার পেছনেও কোন কারণ আছে। অবাক করার বিষয় হলো ফিরোজও দুর্বল হলো না।
আরজু গিয়ে ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই তুই চুপ করে গেলি কেন? তোকে কথা বলার জন্য এখানে এনেছি। আপা হয়তো চিনতে পারছে না। তুই বলনা তুই আবির।”
ফিরোজ শান্ত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরজুকে এখান থেকে নিয়ে যাও আরমান। ওর জন্য এমন জায়গা ঠিক না। আমার এখানে কিছু কাজ আছে।”
ফিরোজের কথায় আরমান আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না, তোমায় এই জায়গায় রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।”
“চিন্তা করো না। এই জায়গা গুলো আমার জন্য নতুন নয়। তবে তোমার কিংবা আরজু দুজনের জন্যই নতুন। তোমরা যাও এখান থেকে। আমি সামলে নিতে পারব সবটা।”
আরজু এবারে খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“তোকে এত কথা বলতে বলেছি আমি? তোকে আমার জন্য ভাবতে বলেছি? যেটা করার জন্য এসেছি সেটা কর। আপা এখনো বলছে না কেন যে ওটাই আমাদের আপা? কি করলি তবে তুই?”
আরজুর প্রশ্নের ফিরোজ কোনো উত্তর দিল না। রূপসীর দিকে দু কদম এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
“তুমি তবে আমার আপা না? তুমি বলতে চাইছো তুমি আকাঙ্ক্ষা নও, তুমি রূপসী তাইতো?”
রূপসী জোর গলায় বলল,
“হ্যাঁ আমি রূপসী। আমার পরিচয় আমি এই নিষিদ্ধ পল্লীর একজন বে’শ্যা, আর আমার নাম হলো রূপসী।”
“বেশ মেনে নিলাম। তবে আমার সাথে ঘরে চলো। তোমাদের যা পেশা সেটাই করাবো। যদি তুমি আমার আপা না হয়ে থাকো তবে তোমার তো আমার সাথে ঘরে যেতে কোন অসুবিধা নেই তাই না?”
রূপসী চোখ গরম করে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি। বেরিয়ে যা এখান থেকে।”
ফিরোজ মানলো মা রূপসীর কথা। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে রূপসীর হাত ধরে বলল,
“যাবনা। কত টাকা চাও বলো, সব দেব। যত টাকা চাও তত টাকা দেব। তার বিনিময়ে তুমি শুধু আমার সাথে ঘরে যাবে, আর তারপর তোমাদের মতন মেয়েদের যা কাজ সেটাই করবে। তুমি যদি আমার আপা না হয়ে থাকো, তবে আশা করছি তোমার কোন অসুবিধা নেই। কারণ তোমার পরিচয়ই তো এটা।”
ফিরোজ কথাটা বলতেই রূপসী কষিয়ে ফিরোজকে একটা চড় লাগিয়ে রাগে হিশহিশ করতে করতে বলল,
“ভেবেছিলাম পরিস্থিতি যেমনই হোক তুই অন্তত মানুষ হবি। তবে তুই তো দেখছি একটা জানোয়ার তৈরি হয়েছিস।”
রূপসীর কথার প্রেক্ষিতে ফিরোজ আলতো হেসে বলল,
“এরপরেও বলবে তুমি আমার আপা নও?”
রূপসীর যেন ধ্যান ভাঙলো। বুঝলো এমন কিছু বলে ফেলেছে যা ওর বলা উচিত হয়নি। তবে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,
“অবশ্যই বলবো। আমি তোর কেন, তোদের কারোরই আপা নই।”
“তবে কেন ভেবেছিলে যে আমি মানুষ তৈরি হবো? তুমি কি করে বুঝলে আমার জীবনের পরিস্থিতি কি ছিল?”
রূপসী একটা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
“তোদের দেখে ভদ্র বাড়ির মনে হয় জন্য ভেবেছিলাম তোরা মানুষ হবি। অথচ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম ভদ্র বাড়ির ছেলেমেয়েরা আরো বেশি অমানুষ হয়। এসব জায়গায় তো ভদ্র বাড়ির ছেলেদের আনাগােনাই বেশি থাকে।”
“কথা ঘোরাবে না।”
“আরে যা তো তোরা। তোদের কাছে কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য না। আর শোন তোকে বলছি, এই রূপসী এখন এই পুরো ধান্দাটা চালায়, নিজে আর ধান্দায় নামে না।”
ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলে রূপসী নিজের লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই সবকটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দে তো। আর পরেরবার থেকে যদি এরা এখানে এসে কোন ঝামেলা করার চেষ্টা করে তবে সোজা জেলে ঢুকিয়ে দেবো। পুলিশকে কত টাকা দিতে হয় সেটা দিয়ে আয়।”
কথাটা বলে রূপসী আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। আবারো নিজের ঘরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। পিছন থেকে আরজু কতবার ডাকলো, তবে একবারে পিছনে ফিরে তাকালো না।
আরমান বুঝলো এখানে থেকেও কোন লাভ হবে না। যদিও বা রূপসী আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকে তবে কোন এমন কারণ আছে যার জন্য স্বীকার করতে চাইছে না। আর তাই এভাবে বারবার এসে চাপ প্রয়োগ করলেও স্বীকার করবে মনে হয় না। বেরিয়ে এলো ফিরোজ আর আরজুকে নিয়ে সেখান থেকে।
রাস্তায় এসে আরজু কান্নায় ভেঙে পড়লো। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে বসে পড়ল ফিরোজও।
আরজু কে বেশি কাঁদতে দেখে ফিরোজ আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি আরজু কে নিয়ে বাড়ি চলে যাও।”
আরজু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুই কি করবি?”
“আমার কিছু কাজ আছে।”
“আর আপা? আপা তো স্বীকার করছে না। কি করবি?”
“দেখি কি করতে পারি। আপাতত তুই যা।”
আরজুরও মনে হলো এবারে বোধহয় যাওয়া দরকার। আরমানের সাথে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আবারও থেমে গেল আরজু। পিছনে ফিরে তাকিয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“অযথা বাইরে ঘুরিস না। আমার বাড়িতে আসিস। খুব বেশি দরকারি কাজ থাকলে খাওয়া দাওয়া করে আবার কাজে যাস।”
ফিরোজ চমকে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই আমায় তোর বাড়িতে যেতে বলছিস?”
“হ্যাঁ বলছি। তার কারণ তোর এখন এখানে থাকাটা দরকার। আপাকে ফিরে পাওয়ার জন্য হলেও তোকে দরকার।”
“ঠিক আছে। প্রয়োজন হলে আসব, তুই যা।”
চলে গেল আরজুরা। তবে ফিরোজ এখান থেকে যেতে পারলো না। কারণ ওর মন বলছে আকাঙ্ক্ষা যদি সত্যি রুপসী হয়ে থাকে তবে আবার খোঁজ করবে যে ফিরোজ গিয়েছে কিনা। সেজন্য ফিরোজ ঠিক করলো সারাদিন এখানেই থাকবে। আকাঙ্ক্ষা তো জানে ওর ভাই কতটা জেদি। যখন দেখবে যে ফিরোজ হাল ছাড়ছে না তখন নিশ্চয়ই নিজের পরিচয় দেবে।
_________
“রূপসী, ছেলেগুলো এখনো যায়নি।”
রূপসী ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কোন ছেলেগুলো?”
“আরে সকালে যারা এসেছিল। যে ছেলেটা তোর হাত ধরেছিল ও এখনো বাইরে বসে আছে। অনেকবার গিয়ে ভয় দেখিয়েছি, তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু কাজ হয়নি। তুই তো গায়ে হাত তুলতেও বারণ করেছিস, সেজন্য আর কিছু করতে পারছি না।”
রূপসী অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“এখনো যায়নি! এখনো বসে আছে! ছোটবেলা থেকেই ছেলেটার জেদ দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। এখনও ওর জেদ কমেনি।”
“আর আমার মনে হয় কমবেও না। তুই গিয়ে না হয় একবার কথা বলে আয়। পরিচয় দিলেই বা কি। তোকে তো গ্রহণ করবে না ওরা। এখন অযথা এসেছে দরদ দেখাতে।”
“আর আমি এখান থেকে বেরোতে চাইও না। আমার জীবনটা তো শেষ। আমি এখান থেকে বেরোলে আমার ভাই এর জীবনটাও নষ্ট হয়ে যাবে। আরজুর কত বড় বাড়িতে বিয়ে হয়েছে, প্রার্থনারও নিশ্চয়ই ভালো কোন জায়গাতেই বিয়ে হয়েছে। যদি খবর পায় যে ওদের বোন নিষিদ্ধ পল্লীর একজন মেয়ে ছিল, তবে ওদের সংসারের প্রভাব পড়বে।”
ছেলেটার একটু মায়া হলো রূপসীর জন্য। ফের বলে উঠল রূপসীকে,
“তাহলে কি করব? কথা বলবি ছেলেটার সাথে?”
রূপসী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“কোথায় আছে ও?”
“আরে গলির মধ্যে এক কোনায় বসে আছে।”
“ওকে ঘরে নিয়ে আয়। পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসা।”
ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।
ছেলেটা সেখান থেকে চলে যেতেই রূপসী ফের গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। নিজেকে দেখতে নিজেরই কেমন যেন গা শিউরে উঠলো। আকাঙ্ক্ষা সাজগোজ একদমই পছন্দ করত না, তবে রূপসী সাজতে ভীষণ পছন্দ করে। আকাঙ্ক্ষার সৌন্দর্য এতটাই বেশি ছিল যে কখনো কাউকে আকৃষ্ট করার জন্য কিংবা নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য আলাদা করে সাজগোজ করার দরকার হয়নি। তবে রূপসীর রূপ যতই বেশি থাকুক সাজতে হবেই, এটাই নিয়ম।
তবে রূপসী হঠাৎ করে ঠিক করল ফিরোজের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে আকাঙ্ক্ষা হিসেবে। তবে তো রূপসীর এই সাজ পোশাক ছাড়তে হবে।
রূপসী আলমারি থেকে একটা সাদা শাড়ি বের করল। মনে হয় এই রং এর শাড়িটা আকাঙ্ক্ষার সাথে বেশ মানাবে। মুখ ধুয়ে সব সাজ তুলে ফেলল। সাদা শাড়িটা পরে একটা স্বাভাবিক মানুষের মতন দেখাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে না রূপসীকে দেখে যে এই রূপসী নিষিদ্ধ পল্লীর একজন সদস্য।
নিজেকে আয়নায় দেখে রূপসীর হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল ফের পুরনো কিছু কথা। ভার্সিটির বসন্ত উৎসবে যখন সবাই হলুদ আর বাসন্তী রংয়ের শাড়ি পরে সাজগোজ করে ভার্সিটির অনুষ্ঠানে এসেছিল, তখন আকাঙ্ক্ষা ওর বান্ধবীর কথায় শাড়ি পরতে বাধ্য হয়েছিল ঠিকই, তবে নতুন করে আর বাসন্তী কিংবা হলুদ রঙের শাড়ি কেনার টাকা ছিল না। সেজন্য ওর কাছে থাকা পুরনো ওর মায়ের এমন একটা সাদা রঙের শাড়ি পরেছিল।
সেই প্রথম তাওকীরের নজর পড়েছিল আকাঙ্ক্ষার ওপর। ভার্সিটির এত সুন্দর মডার্ন মেয়েদের মাঝে তাওকীর যখন হা করে আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন না জানি কত মেয়ে হিংসায় ম’রে যাচ্ছিল। না জানি কত মেয়ের রাগ হচ্ছিল আকাঙ্ক্ষার প্রতি, যে কেন আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ওরা থাকলো না, কেন তাওকীরের দৃষ্টি ওদের উপরে পড়লো না।
পুরানো সেই কথাগুলো ভাবতেই হো হো করে হেসে উঠল আকাঙ্ক্ষা। সেই মেয়েগুলোর কথা ভেবে ভীষণ হাসি পেল, যারা একসময় আকাঙ্ক্ষাকে হিংসা করতো। সেই সাথে ভাবলো ভাগ্যিস ওরা এখন আকাঙ্ক্ষার পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানে না। জানলে মনে মনে হাজারবার সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানাতো যে ভাগ্যিস আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ওরা ছিল না।