"আপা, আসবো?"
হঠাৎ করে কারো কন্ঠ কানে যেতেই প্রার্থনা কেমন যেন ধড়ফুড়িয়ে ওঠে বলল,
"কে?"
"আপা, আমি আরু। এমন করছো কেন?"
দরজার দিকে তাকিয়ে আরজু কে দেখতে পেয়ে প্রার্থনা একটু স্বাভাবিক হলো।
"ও তুই। আয় ভিতরে আয়।"
আরজু ভিতরে এলো। প্রার্থনা তখন বিছানার উপর বসা। আরজু ওর পাশে বসে বলল,
"ভয় পেয়ে গিয়েছিলে কেন?"
"এমনিতেই। আসলে ভাবনার মাঝে ছিলাম তো। তার মধ্যে হঠাৎ করে তুই এসে ডাকাশ একটু চমকে উঠেছিলাম আর কি। কিছু বলবি?"
"তোমার কি কিছু বলার আছে আমায়?"
আরজুর এমন প্রশ্নের মানে প্রার্থনা ঠিক বুঝতে পারলো না। নিজেও পাল্টা প্রশ্ন করল,
"মানে কি বলার থাকবে?"
আরজু ফের প্রশ্ন করলো,
"সত্যিই কি কিছু বলার নেই?"
প্রার্থনা তাও বুঝতে পারল না কি ব্যাপারে আরজু বলছে। ফলস্বরুপ অবুঝের মতন বলল,
"কিছু বুঝতে পারছি না আরু। কি বলার কথা বলছিস? কিছু কি বলার কথা ছিল আমার?"
"ইলহাম রাইয়্যান, মানে সাহিত্য ওনার ব্যাপারে কি তোমার কিছুই বলার নেই? আমি কিন্তু গতকাল দেখা করে এসেছি ওনার সাথে। একবারও তো আমাকে জিজ্ঞাসা করলে না কি কথা হলো, উনি কেমন আছেন। তোমার এতটা নির্লিপ্ততা এই বিষয়ে আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।"
এতক্ষণে প্রার্থনা বুঝলে আরজু বারবার কি বলার কথা বলছিলো। সাহিত্য কেমন আছে, কোথায় আছে এগুলো জানার জন্য তো প্রার্থনার মনটা উশখুশ করছে। একবার তো দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে, তবে যে মুখ ফুটে সেই কথাটা বলতে পারছে না। নিজের ভেতর থেকে কেউ যেন একটা প্রার্থনা কে বারবার বাধা দিচ্ছে।
মনে হচ্ছে প্রার্থনা তো এখন আর আগের মতন নেই। ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, স্বামী মা'রা গেছে। মা'রা গেছে বললে ভুল হবে, প্রার্থনা তো খু'ন করেছে। কেউ না জানুক প্রার্থনাতো জানে যে ও খুনি। এখন তো আর প্রার্থনা আগের মতন পবিত্র নেই। সাহিত্য বিয়ে করেছে কি করেনি সেটা জানে না, কিন্তু প্রার্থনার গায়ে তো কলঙ্ক লেগে গেছে। এখন যে সাহিত্যের পাশে প্রার্থনাকে মানায় না।
প্রার্থনা কি করে নিজের ভালোবাসার দাবি নিয়ে সাহিত্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। এখন যে সাহিত্যর যোগ্য নেই প্রার্থনা।
প্রার্থনার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আরজু ফের বলে উঠলো,
"কি হল আপা? তোমার কিছুই বলার নেই এই বিষয়ে?"
প্রার্থনা বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
"না রে আরু, আমার কিছু বলার নেই। কিই বা বলার থাকবে বল।"
আরজুর কপালে একটা সুক্ষ্ম ভাজ তৈরি হলো। কপাল কুঁচকে বলল,
"কিছু বলার নেই মানে? ভালোবাসা না ওনাকে আর?"
প্রার্থনা এবারে মলিন হেসে বলল,
"ভালো তো কখনো সাহিত্য ব্যতিত আর কাউকে বাসিনি, আর না কখনো বাসতে পারবো। এমন না যে ওর প্রতি কখনো আমার ভালবাসা কমে গিয়েছে, তবে তোর এই প্রশ্নটার কোন ভিত্তি নেই।"
"তাহলে ওনার খোঁজ পেয়েছি কথাটা জানার পরে একবারও ওনার সাথে দেখা করতে চাইলে না, ওনার সাথে কথা বলতে চাইলে, এর কারণটা কি জানতে পারি?"
"কারণটা খুবই সাধারণ আরু। আমাদের মাঝে যা ছিল সবটাই এখনো অতীত, আগের মতন আর কিছুই নেই। আমিও আগের মতন নেই,সাহিত্যও হয়তো জীবনে এগিয়ে গেছে।"
"না, উনি বিয়ে করেননি।"
প্রার্থনা একটু চমকালো, আবার হয়তো চমকালো না। ওর হয়তো চমকানো উচিত না। প্রার্থনার তো নিজের ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস ছিল, তবে তো ওর জানা কথা যে সাহিত্য নিজের জীবনে প্রার্থনা ব্যতীত আর কাউকে গ্রহণ করবে না।
নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,
"এখন করেনি, কিছুদিন পর নিশ্চয়ই করবে। আমি ওর যোগ্য নেই আর। আমার থেকে অনেক ভালো কেউ সাহিত্যর জীবনে আসুক সেটাই প্রার্থনা করি।"
আরজু কিঞ্চিৎ বিরক্তি কর গলায় বলল, অ
"অযথা এক কথা বলো না আপা। ওনার বিয়ের খবর শুনলে যে তুমি ভালো থাকবে না সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। আর তুমি ওনার যোগ্য আছো নাকি নেই এই কথাগুলো বাদ দাও। ভালোবাসায় এসব যোগ্যতা দেখতে নেই। সেই দিক থেকে বলতে গেলে আমিও আরমানের যোগ্য না, কিন্তু উনি আমায় ভালোবাসেন।"
প্রার্থনা এবার একটু ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
" তোর আবার কি হলো আরু আজকে? তুই তো সাহিত্যকে পছন্দ করিস না, আজ আবার ওর হয়ে কথা বলছিস যে?"
আরজু একটু নড়েচড়ে উঠে বলল,
"ওনারা হয়ে কথা বলছি না, তবে আমি জানি তুমি হয়তো ওনার সাথে থাকলে ভালো থাকবে সেজন্য বলছি। কারন তুমি ওনাকে ভালোবাসা, হয়তো উনিও তোমায় এখনো ভালোবাসে।"
"না আরি, সাহিত্যর ভালোবাসাটা হয়তো আর আগের মতন নেই। দেখলি না ও আমার খোঁজ পেয়েছে অথচ পুরো একটা দিন পার হয়ে গেল নিজ থেকে একটা বারও আমার সাথে কথা বলতে চাইলো না। ও তো নিশ্চয়ই জানে আমি এখানে আছি, তারপরও একটা বার দেখা করতে এলো না, একবারও জানতে চাইলো না আমি কেমন আছি।"
প্রার্থনার কন্ঠে এবারে অভিমান প্রকাশ পেল। প্রার্থনা জানেনা ওর এই অভিমানটা সাজে কিনা, তবে তারপরেও অভিমান করলো। নিজের অজান্তেই অভিমান করে বসে আছে সাহিত্যের উপর।
কে জানে আরজু সেসব বুঝলো কিনা, তবে সেখানে থাকতে ইচ্ছে করলো না। উঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আসছি। আর একটা কথা বলি আপা, জীবনে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এখন আর এসব মান অভিমানের সময় নেই।"
কথাটা বলে বেরিয়ে গেল আরজু ঘর থেকে।
প্রার্থনা খুব বেশি ভাবতে ইচ্ছে করলো না এসব নিয়ে, তবে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও বারবার মাথায় সেই কথাগুলো চলে আসছে। মনটা তো চাইছে ছুটে যেতে সাহিত্যের কাছে, তবে পারছে না যে প্রার্থনা যেতে। বারবার শুধু মনে হচ্ছে সাহিত্যর সাথে প্রার্থনা কে মানায় না।
_________
ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছে আরমান, আরজু আসেনি আজ। আরমানের কপালে চিন্তায় রেখা ফুটে উঠেছে। ওর পাশে বসে আছে মুনতাসির, ও চা খাচ্ছে। মূলত মুনতাসিরের বলা কিছু কথা শুনে আরমানের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে।
আরমান কে এভাবে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে মুনতাসির বলে উঠলো,
"কি হলো ভাই? বেশি চিন্তায় ফেলে দিলাম কি আপনাকে? আমার মনে হয় এই কথাটা বলা উচিত হয়নি।"
আরমান রাগী দৃষ্টিতে মুনতাসিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"সম্পর্কের দিক দিয়ে তুমি আমার বউয়ের বড় ভাই, শুধু সেই কারণে আমার কাছে মা'র খাওয়ার হাত থেকে তুমি বেঁচে গেলে। নয়তো এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা দেরিতে জানানোর জন্য আজ সত্যি তুমি আমার কাছে মা'র খেতে মুনতাসির।"
মুনতাসির মাথা নামিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
"সবে মাত্র বিয়ে করেছেন আপনারা, এই মুহূর্তে আমি বিরক্ত করতে চাইনি আপনাদের।"
আরমান তেঁতে উঠে বলল,
"দুটো মিনিট কথা বললে কি এমন বিরক্ত করা হতো? নতুন বিয়ে করেছি জন্য কি সারাদিন আমি বউয়ের সাথে প্রেম করি বলে তোমার মনে হয়? তোমার কি মনে হয় তোমার বোন প্রেম করার মেয়ে?"
মুনতাসির ঠোঁট টিপে হাসি সংবরণ করে বলল,
"না, সেটা জানি, তবে তারপরেও ঝামেলা থেকে দূরে থাকার জন্যই তো গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে আবার আমি ঝামেলায় ফেলতাম এসব বলে।"
"সেসব আমি বুঝে নিতাম। তোমার কাছে একের পর এক হুমকি আসছে আর তুমি আমায় একটা বার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না? তুমি থানায় কমপ্লেন পর্যন্ত করোনি? মানে পেয়েছোটা কি তুমি? কি ভেবেছে যা ইচ্ছে তাই করবে? তোমার কি মনে হয় তোমাকে খু'ন করা খুব কঠিন? দুই মিনিটও লাগবে না মুনতাসির তোমাকে মা'রতে। আরে ছেলে, এসব যখন জানোনা, সামলাতে পারবে না তাহলে রাজনীতিতে এসেছিল কোন দুঃখে? আমার মুখ দেখতে?"
মুনতাসির আরমানের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,
"সত্যি বলতে ভাই আপনাকে দেখেই রাজনীতিতে আসা।"
আরমান ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না মুনতাসিরের এই কথার প্রেক্ষিতে ওর কি বলা উচিত। অসহায় গলায় বলল,
"আমাকে দেখে করার মতন আর কিছু খুঁজে পেলে না। আরে পড়াশোনাতেও তো আমি ভালো, আমাকে দেখে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে। আমি আমার ব্যবসা সামলাই, সেটা দেখে না হয় নিজের বাপের ব্যবসায় যোগ দিতে। রাজনীতিটাই কেন ধরতে গেলে? আবার ধরলে যখন আমার দলে কেন এলেনা? সোজা চলে গেলে বিপক্ষ দলে।"
"আপনার দলে তানভীর বিরক্ত করছিল সেজন্য আর ওই দলে যাইনি। আর তাছাড়া আমার বাবা ওই দলেরই ছিল, সেজন্য এই দলেই যোগ দিয়েছি। তবে অনুপ্রেরণা আপনি।"
আরমান বিরক্তিকর গলায় বলল,
"ধ্যাত ছেলে, চুপ কর। জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে গেছে, অনুপ্রেরণা। শোনো এক ঘন্টা পর আমি ভার্সিটি থেকে বের হব, সোজা তোমায় নিয়ে থানায় গিয়ে কমপ্লেন করবো।"
"কিন্তু ভাই বাড়িতে জানলে মা, মৃন্ময়ী, ইরা চিন্তায় করবে।"
আরমান পুনরায় ঝাঁঝালো গলায় বলল,
"এসব রাজনীতিতে আসার আগে হুঁশ ছিল না যে বাড়িতে মা, বোন, বউ আছে? বিয়ে করে তো এখনো বউকে ঠিকমতো কাছেই পেলে না, এর মাঝেই ম'রো। বাচ্চাকাচ্চা আর হতে হবে না।"
"কি ব্যাপার, মুড এত খারাপ কেন? বাড়িতে বউ আছে তারপরও মুড এত খারাপ হলে চলবে?"
হঠাৎ করে একটা মেয়েলী কন্ঠ আরমানের কানে যেতেই থেমে গেল আরমান। বুঝতে আর বাকি রইল না যে এটা কার কন্ঠ, তবে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো না।
হিয়া বুঝলো এই ছেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাবে না ওর দিকে, তাই নিজ থেকেই আরমানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
"গতকাল রাতে কল করেছিলাম তোকে, তোর বউ তোকে জানিয়েছিল?"
আরমান স্বাভাবিক গলায় বলল,
"না জানানোর কি আছে?"
"তাহলে কল ব্যাক করলি না যে, নাকি বউ করতে দেয়নি?"
আরমান মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
"হুদাই একটা কথা বলবি না হিয়া। তুই খুব ভালো করেই জানিস আগে থেকেই আমার কল ব্যাক করার স্বভাব নেই।"
"সেটা তো শুধু আমার ক্ষেত্রে, বাকিদের ক্ষেত্রে তো না।"
"তুই তো জানিস শুধু তোর ক্ষেত্রে, তাহলে অযথা আমার বউকে দোষ দিচ্ছিস কেন? ওর নামে কিছু বলবি না, আমার পছন্দ না।"
"বাহ! এই কয়দিনে এত ভালোবাসা! ভালোবাসা তো একদম উতলে পড়ছে।"
"হ্যাঁ, উতলেই পড়ছে। আমার বউকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।"
হুয়া এবারে অসহায় গলায় বলল,
"আর আমি যে তোকে কতটা ভালোবাসি সেটা তো বলার সুযোগটুকুও দিলি না আমায়।"
চমকে উঠলো মুনতাসির। বিস্মিত নয়নে তাকালো আরমানের দিকে। মুনতাসির কে নিজের দিকে এভাবে তাকাতে দেখে আরমান বিরক্তিকর গলায় বলল,
"তুমি এভাবে তাকাচ্ছো কেন? নাকি বোনের মতন তোমার আবার সন্দেহ বাতিক জেগে গেছে? আবার বলো না যে এর সাথে আমার বিয়ের পরেও সম্পর্ক চলছে।"
আরমানের এক ধমকে মুনতাসির স্বাভাবিক হয়ে গেল। আরমান এবারে হিয়া কে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা গলায় বলল,
"দেখ হিয়া, আমি এখন বিবাহিত। ঘরে আমার বউ আছে, কিছুদিন পর বাচ্চাও হবে। তাই তুই আমার সামনে এই ধরনের কথাবার্তা বলিস না, আমার অস্বস্তি হয়।"
"আমি তোর সংসার ভাঙাতে আসিনি আরমান।"
"সেটা ভাঙতে পারবিও না।"
"আমি ভাঙবোও না। বিয়ে যখন করেছিস ভালোবেসেই তো করেছিস, আর তুই কাউকে ভালোবাসলে যে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসবি সেটা আমি জানি। আসলে সেই লোভেই তোকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তবে একটাই আফসোস, কখনো জানানোর সুযোগটাই পেলাম না, তার আগেই তুই অন্য কারো হয়ে গেলি।"
"তাহলে তোর এই আফসোসটা দূর করে দেই আমি। তুই যদি আমাকে নিজের মনের কথা জানাতি তারপরেও আমার উত্তরটা হ্যাঁ হতো না হিয়া। আমি সব সময় তোকে শুধু মাত্র আমার একজন ভালো বন্ধু হিসেবে দেখেছি, এর থেকে বেশি আর কিছু না।"
হিয়া সন্দেহী গলায় বলল,
"তুই বুঝতে পেরেছিলি আমার মনের কথা তাই না? সেজন্য হঠাৎ করে আমায় কেমন ইগনোর করা শুরু করলি?"
আরমানের মনে হল মিথ্যা বলে লাভ নেই। যত মিথ্যে বলবে ততই হিয়ার আফসোস বাড়বে। তার থেকে বরং সত্যিটা বলে দিলে মেয়েটা বুঝতে পারবে যে ভুল পথে হাঁটছিল।
"হ্যাঁ। আসলে আমি চাইনি যে তুই কখনো এই কথাটা বলায় আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট হোক, কিন্তু একটা সময় গিয়ে আমি বুঝতে পারলাম যে কোন এক পক্ষের মনে যখন বন্ধুত্বের থেকে অনুভূতিটা বেড়ে যায় তখন সেই সম্পর্কটা আর কেবল বন্ধুত্বের মাঝে রাখলে স্বাভাবিক থাকে না। অস্বস্তি হওয়া শুরু করে, যেটা আমার হয়। সেজন্য আমি ধীরে ধীরে তোর থেকে দূরত্ব বাড়ানো শুরু করি। আর আমি এতেই খুশি। আমি চাই তুইও নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করার কথা ভাব। আমার মনে তোর জন্য কখনো অনুভূতি ছিল না। আশা করছি সেটা তুই আমার ব্যবহারে বুঝে গেছিস।"
নিজের আত্মসম্মান আর বিসর্জন দিতে পারবে না হিয়া। এতদিন তাে আরমানের জীবনে কেউ ছিল না, তখনই হিয়া কখনো আরমানকে জোর করেনি ওর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, কিংবা ওর থেকে একটু সময় পাওয়ার জন্য। আর এখন তো আরমান কারোর স্বামী। হিয়া এতটা নির্লজ্জ না, যে তাই বলে ভালোবাসার জন্য অন্যের স্বামীকে নিয়ে টানাটানি শুরু করবে। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে আর নিজের অনুভূতিগুলোকে সামলে নিয়ে বলল,
"এসব কথা আর না তুলি। সামনের মাসে আমি আমার আপুর কাছে অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছি, তবে যাওয়ার আগে তোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে আমার ভাইয়ের ব্যাপারে।"
হিয়া ওর ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলবে, মানে হামিদের ব্যাপারে কথা বলবে, এটা শুনতেই আরমান বুঝতে পারলো কথাটা নিশ্চয়ই গুরুতর। আরমান নিজেও পাল্টা গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
"হুম বল। হামিদ তো এখন জেলে আছে।"
"হ্যাঁ জেলে আছে। আমার বাবা খুব চেষ্টা করছে ওকে ছাড়ানোর, তবে সফল হবে কিনা জানিনা। তবে একটা কথা বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারছি, আমার বাবা আর ভাই দুজনেরই তোর আর তোর প্রিয় মুনতাসির এর উপর ভীষণ রাগ জমে আছে। আমি জানিনা কি করবে, তবে ওদেরকে আমি বিশ্বাস করি না, তাই তোকে বলবো সাবধানে থাকিস। আমার ভাইয়ের জন্য যদি তোর কোন ক্ষতি হয় আমার নিজের খুব খারাপ লাগবে আরমান।"
"তুই কি কিছু আন্দাজ করতে পারছিস? মানে তোর কানে কিছু এসেছে যে ওরা কি করতে পারে?"
"আসলে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারছি না, তবে প্রতিশোধ তো আমার ভাই নেবেই। আর সেটা কিন্তু খুব ভয়ানক ভাবেই নেবে। আমার ভাই আর বাবা এরা খুব ভালো করেই জানে যে যদি তোর কোনো ক্ষতি করে তবে ছাড় পাবে না, তবে তোর মুনতাসিরে পিছনে এমন শক্তপোক্ত কেউ নেই, এটা মাথায় রাখিস।"
আরমানের হৃদয়টা ধ্বক করে উঠলো। তারমানে আরমান যেটা সন্দেহ করছিল সেটাই ঠিক। মুনতাসির এর কাছে ক্রমাগতভাবে হুমকি হামিদের লোকদের থেকেই আসছে। হিয়ার বলা কথাগুলো মুনতাসিরের কানেও গেল,তবে ওকে খুব বেশি বিচলিত হতে দেখা গেল না। মুনতাসির ভাগ্যে বিশ্বাসী। ওর বিশ্বাস যদি ওর আয়ু থেকে থাকে তবে কেউ ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
এদিকে হিয়ার যেটুকু যা জানানোর ছিল সব বলল আরমানকে। খুব বেশি কিছু হিয়ার জানা নেই। সব কথাবার্তা শেষে সেখান থেকে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়ে আরমান কে বলল,
"আজ তবে আসি। যদি তোর সময় হয় তবে যাওয়ার আগে একদিন দেখা করিস আমার সাথে।"
"একদিন বাড়ি আয়।"
হিয়া আলতো হেসে বলল,
"না, তোর বাড়িতে কোনদিনও পা রাখা হবে না। তোর বউকে দেখতে পারবো না, খুব কষ্ট হবে দেখলে। তোর বউ এখন তোর বাড়িতে যে পরিচয়ে আছে, ইচ্ছে ছিল আমি একদিন নিজে তোর বাড়িতে সেই পরিচয়ে থাকবো। তবে সেটা যখন আর হলো না তোর বাড়িতে পা-ও রাখবো না, তোর বউ কেও দেখব না। অনেক কষ্ট আর হতাশা নিয়ে এই দেশ ছেড়ে যাচ্ছি। আমার যত অপূর্ণতার গল্প গুলো আছে সব এই দেশে ছেড়ে রেখে যেতে চাইছি, তবে তোর বউকে দেখলে কিছু হতাশা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে যেটা আমি চাই না।"
"আমি তোর সাথে একটা স্বাভাবিক বন্ধুত্ব রাখতে চাই হিয়া। ভার্সিটি তে পাওয়া তুই আমার প্রথম বন্ধু, অনেক ভালো বন্ধু তুই আমার। তবে আমার মনে হয় আমাদের মাঝে স্বাভাবিক বন্ধুত্বটা সেদিনই আবার শুরু করা সম্ভব যেদিন তুই জীবনে এগোবি।"
আরমানের কথার ইঙ্গিতটা হিয়া বুঝতে পেরে ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
"চিন্তা করিস না, জীবনে যদি কখনো এগোতে পারি তবেই আবার তোর সাথে যোগাযোগ করব। তার আগে যোগাযোগ করে তোকে অশান্তিতে ফেলবো না। আজ আসছি, ভালো থাকিস। প্রেমিক হিসেবে না হলেও বন্ধু হিসেবে তুই খুব ভালো আরমান, খুব ভালো। আমার পাওয়া সব থেকে ভালো বন্ধু তুই।"
কথাটা বলেই হিয়া সেখান থেকে চলে গেল। অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও আরমানের কেন যেন খারাপ লাগছে।
ভালোবাসার অনুভূতিগুলো সুন্দর হলেও মাঝে মাঝে কিছু সুন্দর সম্পর্কের মাঝে চলে এসে সেই সম্পর্কটা বিষাক্ত করে দেয়। শুরুর দিকে হিয়া আর আরমানের সম্পর্কটা কি দারুন ছিল, তবে ধীরে ধীরে যখনই হিয়ার মনে আরমানের জন্য অনুভূতিটা বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসায় পরিণত হলো, তখনই যেন ধীরে ধীরে সবটা শেষ হয়ে গেল। আগের মত সেই স্বাভাবিক কথাবার্তা হত না, সব সময় অস্বস্তি হতো।
সব সময় ভালোবাসার অনুভূতিটা সবার জন্য মঙ্গলজনক হয় না। মাঝে মাঝে কিছু সম্পর্কের জন্য এই অনুভূতিটা অভিশাপের মতন হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক যেমন একটা সুন্দর বন্ধুত্বকে নষ্ট করে দিল।