“তুমি প্রার্থনার বোন আরজু! প্রার্থনা কোথায়? কেমন আছে?”
ইলহামের মুখ থেকে কথাটা শুনতেই আরজু রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,
“ভালো আছে আমার আপা, খুব ভালো আছে। আপনার মতন একটা প্রতারককে ছেড়ে ভালো আছে আমার আপা। খবরদার আমার আপার নাম মুখে নেবেন না।”
ইলহাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো আরজুর রাগের কারণ। প্রার্থনার থেকে শুনেছিল ওর বোন প্রার্থনাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। সেখানে ওর ওপরে যে আরজুর রাগ হবে, এটাই স্বাভাবিক। আরজুর কথাগুলোতে মোটেও মনঃক্ষুন্ন হলো না ইলহাম। বরং শান্ত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“নীরাঞ্জনা কে ভেতরে নিয়ে এসে বসা তাওসিফ। একটু ঠান্ডা জল খাওয়া, এসব কথাবার্তা পরেও হবে।”
ইলহামের এমন গা ছাড়া কথাবার্তা শুনে গা পিত্তি জ্ব'লে উঠলো আরজুর। এখানে কি ও পানি খেতে এসেছে নাকি মাথায় ঠান্ডা করতে এসেছে। ও এসেছে এই লোকটাকে উচিত শিক্ষা দিতে। এখন আরমান যদি আরজু কে ধরে না থাকতো তবে এতক্ষণে হয়তো ইলহাম আরজুর কাছে দু'চারটে চ'ড় অনায়াসে খেয়ে নিত। আরজু জানেনা আর কি কি করতো ইলহামের সাথে। পুনরায় খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“জুতো মে'রে গরু দান করছেন? আমার আপার জীবনটা নষ্ট করে এখন আমার প্রতি দরদ দেখাতে এসেছেন।”
আরমান এবারে মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ করুন আরু। শুধু একাই বলে যাচ্ছেন তখন থেকে, ওনার কথাটাও তো শুনতে হবে, ওনাকেও তো বলার সুযোগ দিতে হবে। মানলাম অপরাধী, তবে অপরাধীকে নিজের অপরাধটা স্বীকার করতে দিন।”
আরজু বড্ড ধৈর্যহীন। আসলে জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গিয়েছে যে এখন ধৈর্য শব্দটাকেই ঘৃণা হয়। মনে হয় কি হবে ধৈর্য ধরে। পরিস্থিতি তো বদলায় না, অযথা সময় নষ্ট। বরং যা করার তৎক্ষণাৎ করে নেওয়াই ভালো।
পুনরাও অধৈর্য হয়ে কিছু বলতে নিল আরজু তবে তার আগেই ইলহাম হাত উঠিয়ে আরজুকে থামিয়ে দিল। শান্ত গলা আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
"ছেড়ে দে ওনাকে তাওসিফ।”
আরমানকে কথাটা বলে ইলহাম শান্ত গলাতেই আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি আমাকে যেভাবে ইচ্ছে ভর্ৎসনা করতে পারেন, যত ইচ্ছে আঘাত করতে পারেন। আমি আপনাকে বাধা দেব না। আমি নিজেও জানি আমি অপরাধী। নিজের অপরাধ স্বীকার করতে আমার কোন লজ্জা নেই। তবে আমার এই অপরাধের জন্য আমার কোন আফসোসও নেই।”
ইলহামের কথা শুনে আরজু অবাক না হয়ে পারলো না। একটা লোক ঠিক কতটা নির্লজ্জ হলে একটা মেয়ের জীবন এভাবে শেষ করে দেওয়ার পরেও বলে কোন আফসোস নেই। লোকটা নিজের অপরাধ স্বীকার করছে ঠিকই, তবে বলছে কোন আফসোস নেই। আদৌ কি মানুষটা র'ক্তে-মাংস গড়া, আদৌ কি এর শরীরে মানুষের র'ক্ত বইছে না কোন পশুর র'ক্ত বইছে।
আরজু সরাসরি ইলহামকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“লজ্জা করলো না এই কথাটা বলতে? একটা মেয়ের চরিত্রের উপর প্রশ্ন উঠলো আপনার জন্য আর আপনি তাকে একা ফেলে চলে এলেন এবং ভরা মজলিসে পুরো দোষটা আপনি তার ওপরে দিয়ে দিলেন। আবার এখন বলছেন আপনার এর জন্য কোন আফসোস নেই। আদৌ আপনি মানুষ?”
ইলহাম ভীষণ সুন্দর করে হেসে বলল,
“না, আমি সামান্য এক প্রেমিক। প্রেমের নিয়ম আলাদা, প্রেমের আইন আলাদা, সে আইন ভঙ্গ করলে শাস্তিও আলাদা হয়। আপনি কি কখনো প্রেমে পড়েছেন? কখনো কি সেই প্রেমের আইন ভঙ্গ করেছেন, ভঙ্গ করার শাস্তি কি কখনো পেয়েছেন? যদি না পেয়ে থাকেন তবে আপনি আমার কথাগুলোর মানে বুঝবে না।”
আরজু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“এত কিছু তো বোঝার আমার দরকার নেই। শুধু আমায় এতোটুকু বলুন কেন করলেন আমার আপার সাথে এমনটা? যদি হাত ছাড়ারই ছিল তবে ধরেছিলেন কেন? যদি বিশ্বাস ভাঙারই ছিল তবে বিশ্বাস গড়েছিলেন কেন?”
“আপনি তো আমার কোন কথা শুনতে রাজি নন, তবে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো কি আমি দিলে আপনি বুঝবেন আমার কথার মর্মার্থ?”
“ভণিতা না করে সরাসরি বলুন তাহলেই বুঝবো। এখানে আমি আপনার কাব্যিক কথা শুনতে আসিনি। আর নিজেকে প্রেমিক হিসেবে দাবি করার দুঃসাহস দ্বিতীয় বার দেখাবেন না।”
“অবশ্যই দেখাবো। প্রেমে যদি দুঃসাহসই না দেখালাম তবে প্রেমিক হলাম কি করে। শুনুন নীরাঞ্জনা, ভালো যখন বেসেছিলাম তবে সেই ভালোবাসাকে ত্যাগ করে চলে আসা আমার পক্ষে সহজ ছিল না। আমি জানতাম আমি চলে আসার পর প্রার্থনা অন্য কারো হয়ে যাবে, এটা জানা সত্বেও আমার পক্ষে ওই জায়গাটা ত্যাগ করা যে ঠিক কতটা কঠিন ছিল সেটা কেবলমাত্র আমি জানি।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“কি এমন বাধ্যবাধকতা ছিল আপনার?”
“কেন, এত কিছু জানেনা আর এই সামান্য কথাটুকু জানেন না। যেখানে আমার থেকে কোন প্রশ্নের উত্তর না জেনে আমাকে বিচার করে নিলেন, আমার ভালোবাসাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন সেখানে এতোটুকু জানেন না যে আমার বাধ্যবাধকতা কি ছিল? এতটা অজ্ঞতা আপনাকে মানাচ্ছে না নীরাঞ্জনা।”
কেন যেন ইলহামের এই কথার প্রেক্ষিতে আরজু কিছু বলতে পারল না। ওর পিছনে দাঁড়ানো আরমান ইলহাম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরুর কথা ছাড়ো, তুমি বলো।”
“বেশ তবে আমিই বলি। প্রার্থনার নিজের ভাই আর ওর চাচাতো ভাইয়ের জন্য।”
ইলহামকে পরবর্তী কথা বলতে না দিয়ে আরজু বলল,
“জানি ওরা কিছু করেছিল। তবে আমার কথা একটাই, আপনি ওভাবে স্বার্থপরের মতন আমার আপাকে একা ফেলে রেখে পালিয়ে এলেন কি করে? আপনি আমার আপার বিরুদ্ধে কত নোংরা অপবাদ দিয়ে এসেছিলেন জানেন? ওই গ্রামে আমার আপা আর কোনদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি কারো সামনে, এরপরও আপনি বলবেন আপনার কোন আফসোস নেই?”
ইলহাম সহাস্যে বলল,
“না, কোন আফসোস নেই। কেননা আমি জানি বাকিদের দেওয়া কলঙ্কে প্রার্থনার যায় আসে না, ওর কেবল যায় আসে আমার বিশ্বাসে। সে যে আমার কাছে মোটেও কলঙ্কিনী না, সে যে আমার কাছে ভীষণ পবিত্র। আমি যে তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম নীরাঞ্জনা। আমি তখন কতটা নিরুপায় ছিলাম ভাবতে পারছেন, যে নিজের প্রেমিকাকে সকলের সামনে কলঙ্কিনী বানিয়ে ছিলাম। আমার অসহায়ত্বটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। প্রার্থনা তো তবুও আপনার কাছে কাঁদতে পেরেছে, নিজের অসহায়ত্বের কথা জানাতে পেরেছে, আমাকে ছাড়া ও ঠিক কতটা কষ্টে আছে সেসব ও প্রকাশ করতে পেরেছে, তবে আমি তো পারিনি, কেউ তো ছিল না আমার পাশে।”
“থাকার তো কথাও না। কেউ আপনার পাশে কখনো ছিল না জন্যই তো আমার আপা আপনার হাত ধরতে চেয়েছিল, আর সেই আপনি আমার আপাকে ছেড়ে চলে গেলেন। কি করতো ফিরোজ? খুব বেশি হলে হয়তো আপনাদের মে'রেই ফেলতো। ভালো যখন বাসলেন তখন সেই ভালোবাসার জন্য জীবন ত্যাগ করার সাহস হলো না? ম'রলে দুজনে একসঙ্গে ম'র'তেন। এতোটুকু প্রতিজ্ঞা কি করেননি কখনো যে সুখে দুখে সবসময় একে অপরের পাশে থাকবেন, বাঁচার হলে একসঙ্গে বাঁচবেন, ম'রার হলে একসঙ্গে ম'র'বেন?”
ইলহাম এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“এ তো তবে গল্প হয়ে যেত নীরাঞ্জনা। আমার তো ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর কোনো ইচ্ছে ছিল না, আমার নিজেকে ইতিহাসের কোন বিখ্যাত প্রেমিক চরিত্র বানানোর ইচ্ছেও ছিল না। আমার শুধু ইচ্ছে ছিল আমি আমার প্রেমিকাকে বাঁচাবো। সে আমার জীবন দিয়ে হলেও আমি বাঁচাবো। যাকে ভালোবাসি তার মৃ'ত দেহটা বহন করার শক্তি যে আমার ছিলো না। আপনি বলুন আরমানের মৃ'তদেহ বহন করার শক্তি আছে আপনার মাঝে?”
আরজু চমকে উঠে রাগান্বিত দৃষ্টিতে ইলহামের দিকে তাকিয়ে সাবধানী গলায় বলল,
“আমার আরমানকে এর ভেতরে টানবেন না। ও হাজার বছর বাঁচবে, ওকে আমি আমার আয়ু দিয়ে দেবো, কিচ্ছু হবে না ওর।”
“আপনি বললেই তো আর ও বাঁচবে না। আপনার আর ফিরোজের ব্যাপারটাও তো আমি একটু একটু জানি। আমি নিশ্চিত আজ নয়তো কাল আপনাকে আরমানের মৃ'তদেহটা নিজের হাতে বহন করতেই হবে। ফিরোজ কোনো না কোনো একদিন প্রতিশোধ নেবেই, আরমানকে আপনার থেকে আলাদা করবেই। আরমানের শরীরটা র'ক্তা'ক্ত অবস্থায় আপনাকে দেখতে হবেই।”
আরজু আর্তনাদ করে বলল,
“কোনদিনও না। আমি আছি আরমানের সাথে।”
“সেটাই তো সব থেকে বড় ভয়। আপনি তো আরমানের জীবন সংশয়ের সব থেকে বড় কারণ। আপনাকে না পাওয়ার যন্ত্রণায়, কষ্ট , রাগ থেকেই তো ফিরোজ আরমান কে খু'ন করবে। আপনিও জানেন আমিও জানি, এটা নিশ্চিত, এটাই আরমানের ভবিতব্য যে ফিরোজের হাতে ও শেষ হবে।”
আরজু পূর্বের থেকেও দ্বিগুণ বেশি জোরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“কোনদিনও না, এমন কক্ষনো হবে না। আমি আরমানের জীবন সংশয়ের সব থেকে বড় কারণ যদি হই তবে আমি চলে যাব। দরকার পড়লে আমি ধরা দেব ফিরোজের কাছে, তবুও আরমানের কিছু হতে দেব না। যে আমাকে বেঁচে থাকা শিখিয়েছে আমি তার মৃ'ত্যুর কারণ হবো এটা অসম্ভব।”
“তবে তো আপনি ব্যর্থ হয়ে গেলেন। এই সামান্য একটা কারণে প্রেমিকের হাত ছেড়ে পালিয়ে যাবেন, তবে তো আপনার ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে গেল।”
আরজু এবারে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
“ব্যর্থতা নয়, এটাই আমার সফলতা। আর আমার ভালোবাসা সত্যি বলেই আমি আরমান কে বাঁচানোর জন্য ওকে ছেড়ে দূরে চলে যাবো। আমি ওকে ভালোবাসি বলেই আমার নিজের জীবন ধ্বংসের মুখে ফেলে দিতেও দুবার ভাববো না। আমি শুধু চাই আরমান বেঁচে থাকুক, ভালো থাকুক।”
ইলহাম এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আরজু ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বেশ গুরুতর একটা আলোচনা চলছিল এর মাঝে তবে হঠাৎ করে এভাবে হেসে উঠল কেন। আরজু অবুঝের মতন আরমানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“উনি হাসছেন কেন আরমান?”
আরমানের মায়া হলো আরজুর প্রশ্নটা শুনে। হাতের আজলায় আরজুর মুখটা নিয়ে অসহায় গলায় বলল,
“আপনি এত বোকা কেন আরু? আর আমায় এতটা ভালোবাসতে হবে না যে নিজের জীবন ধ্বংসের পথে দাঁড় করিয়ে দেবেন। আমি চাই আমার আরু ভালো থাকুক, সুখে থাকুক।”
“কিন্তু উনি হাসছেন কেন? আমি আপনাকে বাঁচিয়ে নেব, দেখবেন ঠিক বাঁচিয়ে নেব। ফিরোজ কে আপনার ধারে কাছেও আসতে দেবো না।”
আরমান কিছু বলার আগেই পেছন থেকে ইলহামের ব্যঙ্গাত্মক গলা ভেসে এলো আরজুর কানে।
“আপনি ছেড়ে পালালে সফলতা, আর আমি ছেড়ে পালালে আমার ব্যর্থতা। আপনার ক্ষেত্রে ছেড়ে পালানোটা ভালোবাসা, আর আমার ক্ষেত্রে ছেড়ে পালানোটা ঠকানো, বিশ্বাস ভঙ্গ করা। এ কেমন বিচার আপনার নীরাঞ্জনা? পৃথিবীর কোনো আদালতই আপনার এই রায় মানবে না, কোনো উকিলই আপনার পক্ষে যুক্তি পেশ করতে পারবেন না। আপনার বিচার সম্পূর্ণ আইন বিরুদ্ধ। কোন বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করলেও এই বিচার সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য হবে।”
আরজু তাকালো ইলহামের মুখ পানে। বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল,
“কেন?”
“গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ জানে নীরাঞ্জনা, যে প্রার্থনা অপবিত্র নয়। যে কলঙ্কটা ছড়ানো হয়েছে সেটা ইচ্ছেকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে। সেটা প্রত্যেকটা মানুষ জানে, তবে ফিরোজের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি। আমি হয়তো বা চাইলে প্রার্থনা কে নিয়ে পালিয়ে আসতে পারতাম, তবে কোথায় যেতাম, কোথায় লুকোতাম। ফিরোজ ঠিক ধরে ফেলতো আমাদের। তারপরে ও প্রার্থনার সাথে যে ঠিক কি কি করার কথা আমায় বলেছিল সেগুলো মনে হলে আজও ভয়ে আমার গা শিউরে ওঠে। লজ্জায় আমি নিজেই নিজের কান ঢেকে ফেলি। আমিও তো প্রার্থনা কে বাঁচানোর জন্যই পালিয়েছিলাম, তবে আমি দোষী কেন?”
আরজু কোন উত্তর দিতে পারলো না কেন জানি। আরজুর নীরবতায ইলহাম অনেক কিছু বুঝে গেল। পুনরায় বলল,
“একবার আপনার আপাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখবেন, ওর এখনো পূর্ণ আস্থা আছে আমার উপর, আমার ভাোলবাসার উপর। ও জানে আমি কোন পরিস্থিতি তে পালিয়ে ছিলাম। যদি আমার প্রার্থনা কে ঠকানোর হতো তবে এতদিনে আপনি আমার একটা সংসার দেখতে পেতেন। ঠিক আপনি যে কারণে ফিরোজের কাছে নিজের ধরা দেওয়ার কথা বলছেন, ঠিক সেই কারণেই আমি প্রার্থনা কে রেখে চলে এসেছিলাম।”
এ পর্যায়ে গিয়ে আরজুর কন্ঠটা একটু শান্ত হলো। এবারে আরজুর কন্ঠটা একটু অসহায় শোনালো,
“তাই বলে এভাবে আমার আপাকে ছেড়ে পালালেন? জানেন যখন ঐ ঘটনাগুলো ঘটেছিল আমার আপার সাথে তখন আমি ছিলাম না। আমার আপার পাশে যদি সেদিন আমি থাকতাম, তবে কারোর সাহস ছিল না যে ভরা সভায় আমার আপার চরিত্রের উপর আঙুল তুলবে। আমার পরে আমার আপা আপনাকে বিশ্বাস করতো। আপনিও পারলেন না আমার আপাকে বাঁচাতে।”
ইলহাম কিছু বলতে ধরলে আরজু বাঁধা দিয়ে বলল,
“আমায় বলতে দিন। আমার আপা সারা জীবন শুধু এই হিসাবটাই করেছে আমি জীবনে কি পেয়েছি, কি পাইনি, তবে বিশ্বাস করুন আমার থেকেও আরো বেশি শূন্য আমার আপার জীবনের পূর্ণতার থলি। আমার আপা আপনাকে নিয়ে জীবনটা পূর্ণ করতে চেয়েছিলো, সেই আপনিও পালালেন।”
ইলহাম আরজুর থেকেও বেশি অসহায় গলায় বলল,
“আমি কি করতাম নীরাঞ্জনা। আমিই প্রার্থনা কে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম ওর জীবনটা আমি গুছিয়ে দেব, কিন্তু যেখানে আমার কানে এই কথাটা এলো যদি আমি প্রার্থনা কে ছেড়ে না চলে আসি তবে প্রার্থনার জীবনটাই ওরা রাখবে না। তখন আমার এছাড়া আর কি করার ছিল বলতে পারেন? আমি প্রার্থনার থেকে এত দূরে এখনো কেন বেঁচে আছি জানেন?”
“কেন?”
“তার কারণ আমি জানি প্রার্থনা এখনো বেঁচে আছে, ও নিশ্বাস নিচ্ছে এখনো। আমি বেঁচে আছি তার কারণ আমি জানি আজও প্রার্থনা আমায় ভালোবাসে, আজও ও দুহাত তুলে মোনাজাতে চায় যেন আমি ভালো থাকি। আমি সেজন্যই এখনো বেঁচে আছি।”
আরজু আর কিছু বলল না। ইলহামেরও যা বলার ছিল তা বলে দিয়েছে। ইলহামের নিজেরই মনে হলো ওর বোধহয় আর কিছু বলার বাকি নেই। আরমান আরজুকে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“এবার বুঝলেন আরু কেন পালিয়েছিল ইলহাম ভাই? ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও আমাদেরকে অনেক কিছু করতে হয়। কে চায় বলুন তো নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে ফেলতে, কে না চায় যে তার একটা সুখের সংসার হোক, তবে সবাই পারে না আরু।”
আরজু থমথমে গলায় বলল,
“বাড়ি চলুন, বাড়ি যাবো।”
কথাটা বলা আরজু হাঁটা ধরতে ধরলে পিছন থেকে ইলহামের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“প্রার্থনা কেমন আছে নীরাঞ্জনা? ওর একটা সংসার হয়েছে তাই না? প্রার্থনা সংসারী হয়ে উঠেছে। ও কি তবে এখন শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে থাকে? ওর স্বামী ওর নাম ধরে ডাকলে কি তবে ও লজ্জা পায়? আজকাল কি তবে অন্য কেউ ওকে গল্প শোনায়?”
থেমে গেল আরজু। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে থমথমে গলায় ইলহামকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সেদিন যদি একটাবার জানার চেষ্টা করতেন যে ফিরোজরা কেন আপনাকে আপাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল, তবে আমি নিশ্চিত আপনি কখনোই ওই জাহান্নামে পাঠানোর জন্য আপাকে ছেড়ে আসতেন না। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না আপনি আপার সুখের কথা ভাবতে গিয়ে কোন ন'র'কে ফেলেছিলেন।”
“মানে?”
“জানেন তো, আমার আপার হাত দুটো আর কোমল নেই, আমার আপার ঠোঁট দুটো আর হাসে না, আমার আপার চোখ দুটোতে আর কোন স্বপ্ন নেই। আমার আপার সারা শরীর জুড়ে অজস্র আঘাতের চিহ্ন। এসবের জন্য ছেড়ে রেখে এসেছিলেন আপা কে? এর থেকে যদি আপনি আমার আপার হাতটা শক্ত করে ধরে মৃ'ত্যুর মুখে পা বাড়াতেন আমার আপা হাসিমুখে মৃ'ত্যুটাকেই গ্রহণ করে নিত।”
কথাটা বলে আরজু সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না, চলে গেল। আরমান ইলহাম কে উদ্দেশ্য করে ব্যস্ত গলায় বলল,
“ভাই আমি বাড়ি গিয়ে তোমার সাথে কলে কথা বলব কেমন?”
আরমান চলে যেতে ধরলে ইলহাম আরমান ডেকে উঠে বলল,
“নীরাঞ্জনা এসব কি বলে গেল তাওফিস? প্রার্থনা ভালো নেই? আমি ওর সুখের ব্যবস্থা করতে পারিনি?”
“আমি সব বলবো তোমাকে, তবে প্লিজ ভাই এখন আরুর পিছনে যেতে হবে। আরুর মাথা ঠিক নেই। আমি বাড়ি ফিরে তোমায় কল করে খবর জানাবো। চিন্তা করো না আপা ঠিক আছে, এখন আমার কাছেই আছে।”
এতোটুকু বলে আরমান চলে গেল সেখান থেকে।
এ কেমন দোটানের মাঝে ফেলে রেখে গেল ওরা ইলহামকে। ওরা কি কেউ বুঝলো না প্রেমিকের উদ্বিগ্নতা! ওরা কি কেউ বুঝতে পারল না যে প্রেমিকার খবর পাওয়ার জন্য প্রেমিক ছটফট করতে থাকবে! ওরা কি বুঝতে পারছে না প্রার্থনার খবর না পাওয়া অব্দি শান্তি পাবে না ইলহাম।