সবাই নিজেদের মতন যে যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো হিমিও ঘুমিয়ে পড়েছে, তবে ঘুম আসছে না তাওকীরের চোখে। কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে। বারবার শুধু এপাশ ওপাশ ফিরছে। এক পর্যায়ে আর চুপচাপ থাকতে পারলো না। উঠে বসে একবার হিমির নাম ধরে ডাকলো। হিমি একটু নড়েচড়ে উঠলো। ওকে নড়তে দেখে তাওকীর আবার ডেকে উঠলো। হিমির ঘুমটা এবার ভেঙে গেল।
চোখ মেলে তাকিয়ে এখনো তাওকীর কে জেগে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে? তুমি ঘুমোওনি কেন এখনও?”
“এমনি। তাহিতো ঘুমিয়েছে, তুমি একটু ওকে তোমার জায়গায় শুইয়ে মধ্যে আসবে।”
“কেন, কি হয়েছে? মেয়ে যদি ঘুম থেকে উঠে দেখে তোমার পাশ থেকে সরিয়েছি কান্নাকাটি শুরু করে দেবে।”
তাওকীর আপাতত এসবের পরোয়া না করেই হিমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সে তখন দেখা যাবে। তুমি এসো না প্লিজ! না হলে আমি যাচ্ছি।”
“আচ্ছা দাঁড়াও। কিন্তু হয়েছেটা কি? তুমি তো এমন করো না।”
তাওকীর কোন উত্তর দিলো না। হিমি খুব সাবধানতার সাথে তাহিকে নিজের জায়গায় শুইয়ে দিয়ে নিজে মাঝখানে এলো। তাওকীর ওকে টেনে ধরে শোয়ালো। তারপরে নিজেও হিমি কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। কোন কথা হলো না দুজনের মাঝে। তাওকীর আর কিছু বলল না, শুধু ওকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ ঘুমোলো।
হিমির কেন যেন ব্যাপারটা সন্দেহজনক লাগলো। হঠাৎ করে হিমির মাথায় একটা কথা এলো। তাওকীর কি কিছু লুকোচ্ছে? নয়তো এমন অস্থির হয়ে আছে কেন?
প্রশ্নটা মনের মাঝে চেপে রাখতে না পেরে করেই ফেলল,
“তুমি কি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছো?”
তাওকীর চমকে উঠলো। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“না তো। কি লুকোবো?”
“আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছো।”
“কিছু নেই আমার কাছে লুকোনোর মতন। তোমার কাছে আমি খোলা বইয়ের মতন হিমি।”
“এমনটা তো আবার না যে, সেই বইয়ের দু তিনটে পৃষ্ঠে আমি পরার আগেই হয়তো তুমি কোথাও লুকিয়ে রেখেছো। তোমাকে আমি ভুল চিনছি না তো তাওকীর?”
তাওকীর হিমির এত প্রশ্নের উত্তরে ছোট্ট করে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়ো।”
হিমিও আর কোন প্রশ্ন করলো না। তাওকীরেরও আর কোন উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রইলো না। ঘুমিয়ে পড়লো দুজনে।
_________
শহরে আসার প্রার্থনারদের এক সপ্তাহ হতে চলল। ঢাকায় আসার পরেরদিনই আরজুরা আরমানের ফ্ল্যাটে চলে এসেছে। আরজু কোনমতেই প্রার্থনা কে নিয়ে আর ওখানে থাকতে রাজি ছিল না। আরজু নিজের হোস্টেলে ফিরে যেতে ধরেছিল, নয়তো ভেবেছিল কোন বাসা ভাড়া নেবে, তবে ওখানে প্রার্থনা কে রাখবে না।
জানে ওখানে বেশি দিন প্রার্থনা কে রাখলে প্রার্থনার অস্বস্তি হবে। হয়তো এমনটাও ভাবতে পারে প্রার্থনা যে, ওর জন্য আরজুর সংসারে কোন সমস্যা হবে। সেসব ভেবে যদি আবার প্রার্থনা গ্রামে চলে যাওয়ার জন্য জেদ করে। সেই ভয়ে আরজু আগেই বাড়ি ঠিক করার কথা ভেবেছিল। তবে আরমান আবার সেসব করতে দেয়নি। তাই বাধ্য হয়ে অগোছালো সংসারেই আরজু কে নিয়ে প্রবেশ করতে হলো।
সেই অগোছালো সংসারের আজ এক সপ্তাহ হতে চলল। রান্নাবান্না আরমান আরজুর থেকে ঢের ভালো জানে। বলা যায় প্রায় সবই জানে এবং এমন রান্না যে শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে কোন মতে খেয়ে যাওয়া নয়।
তবে আরজুর মাঝে এসব কোনো গুণই নেই। এমন না যে রান্না পারে না, পারে ওই টুকটাক কিছু খাবার, তবে যেটুকু রান্না করে তা হচ্ছে জীবন বাঁচানোর তাগিদে শুধু খেয়ে যাওয়া। আরমান ভেবেছিল ওকেই রান্নার দায়িত্বটা নিতে হবে, তবে প্রার্থনা থাকায় আর সেই কষ্টটা করতে হয়নি।
যদিও আরমান প্রার্থনা কে দিয়ে রান্না করাতে মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না। ও ভেবেছিল রান্নার জন্য কোন লোক রেখে দেবে। আরমান তো বলেছিল ওর কাকার বাড়িতে যেই মহিলা রান্না করেন তাকেই রাখবে। তবে আরজু মোটেও রাজি হয়নি। আরজু ওর সংসারে বহিরাগত কোন নারীর প্রবেশ মানতে পারবেনা, কোনমতেই না।
শেষমেষ ঠিক করেছে আরজু যা জানে তাই রান্না করবে। তবে প্রার্থনা তো জানে ওর বোন কতটুকু কি পারে, তাই শেষে নিজেই দায়িত্ব নিয়েছে আরজু কে সব শেখানোর।
তবে আজ আরমান কাউকে রান্না ঘরে ঢুকতে দেয়নি। আজ ও ঠিক করেছে নিজে রান্না করবে। প্রার্থনা কোন কাজ খুঁজে পাচ্ছিলো না। আরমান আরজুকে বলেছিল ওর কাছে অনেক বই আছে। আরজু জানে ওর আপা বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসে, তাই সেখানেই নিয়ে গেল।
আরজু খেয়াল করলো বেশ ভালোই বই আছে আরমানের কাছে। একটা বইয়ের ওপরে চোখ পরলো আরজুর। বইয়ের নামটা খুব পছন্দ হলো আরজুর, ❝প্রার্থনায় তুমি ❞।
বইয়ের নামটা পছন্দ হওয়াতে সেটা হাতে তুলে নিল। তবে নিচে লেখকের নামটা দেখে ভ্রুঁ কোঁচকালো। ইলহাম রাইয়্যান। এই লোক আবার বইও লিখেছে, আবার সেই বই আরমানের বুক সেলফে আছে। তার মানে ভালোই লেখে নিশ্চয়ই।
আরজু বইটা প্রার্থনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এই বইটা পড়ে দেখো তো আপা কি লিখেছে। এই লেখককে তো দেখলে মনে হয় লিখতে লিখতে এখন প্রাণ ত্যাগ করবে। একটু পড়ে বলোতো আমাকে কেমন লেখে। যদি আজেবাজে কিছু লেখে তবে আরমান কে আর ওনার সাথে মিশতে দেবো না।”
প্রার্থনা বইটা হাতে নিয়ে একটু হেসে উঠে বলল,
“কেন মিশতে দিবি না?”
“দেখব ওনার লেখার মাঝে কোন ব্যাপার আছে কিনা, অনুভূতি প্রখর কিনা, বাক্য বিন্যাস কেমন, শব্দের বুনন কেমন। এসব যদি ঠিকঠাক না থাকে তাহলে তো উনি পা’গল। আর পাগ’লের সাথে মিশতে দেবো কেন আরমানকে?”
প্রার্থনা আবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“তুই আসলেই একটা পা’গলী আরু।”
_________
আরমান রান্নাঘরে রান্না করছে একা একা। আরজু আর ঘরে চুপচাপ একা একা বসে থাকতে পারলো না। রান্না ঘরে এসে উঁকি দিয়ে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি করছেন?”
আরমান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো আরজু। মুহূর্তের মাঝে মুখে হাসি ফুটে উঠল। হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“পেঁয়াজ কা’টছি আরু, ভিতরে আসুন।”
আরজু গুটি গুটি পায়ে ভিতরে এলো। দেখলো আরমান ছু’রি দিয়ে পেঁয়াজ কাটছে।
“ও আপনি ছু’রি দিয়ে পেঁয়াজ কাটেন, বড়লোকি ব্যাপার। আমার কাছে তো ছু’রি কেনার টাকা থাকে না তাই আমার এসব বড়লোকি অভ্যাসও নেই।”
“তেমন কোন ব্যাপার না। আসলে বসে থেকে কা’টা’কু’টি করতে আমার ভালো লাগেনা, তাই এই ব্যবস্থা।”
“কি রান্না করবেন?”
“আপার জন্য মাছের ঝোল, ফারিহার জন্য মুরগির মাংস। ওদের দুজনেরই এটা পছন্দ।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর আমার জন্য আমার পছন্দের কিছু বানাচ্ছেন না?”
“আমি তো জানি আমি ভালোবেসে যা বানাবো আমার আরু তাই খেয়ে নেবে। সেজন্য আমি নিজের মন মত বানাচ্ছি।”
কে জানে আরজু সন্তুষ্ট হলো কিনা, তবে আর কোন প্রশ্ন করলো না।
আরমানকে রান্নায় টুকটাক সাহায্য করলো আরজু। সাহায্য আর কি, তেমন কিছুই তো পারে না। বরং আরমানের কাজ ধীরে ধীরে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। একপর্যায়ে গিয়ে গরম কড়াই নামাতে ধরে আরজু ছ্যাকা খেল। সেই প্রথমে যা একটু মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো। আরমান তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিল। ধড়ফড়িয়ে আরজুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“কি হলো আরু?”
আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“ছ্যাকা খেয়েছি।”
আরমান আর্তনাদ করে উঠে বলল,
“কোথায় পু’ড়ে গেল? দেখি? হাত পানিতে ভেজান।”
এরপর আরজু কে আর নিজ থেকে কিছুই করতে হলো না, আরমানই যা করার করল। আগে পানির ভিতরে হাতটা কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখলো, বরফ এনে লাগিয়ে দিল। আরো কিছুক্ষণ আফসোসও করল। একটু পর আফসোসের গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খুব জ্ব’লছে আরু তাই না?”
আরজু এবারেও স্বাভাবিক গলায় বলল,
“ছ্যাকা খেলে তো একটু জ্ব’লবেই, স্বাভাবিক। আপনি এমন করছেন কেন? এটা বাড়াবাড়ি।”
“আমার ভালোবাসাও যে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে আরু।”
হঠাৎ করে আরজুর অভিব্যক্তি তে একটু পরিবর্তন ঘটল। ভীষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকালো। তবে আরমানের সেদিকে খেয়াল নেই। সমানে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে আরজুর হাতে আর সমানে আফসোস করে যাচ্ছে।
হঠাৎ করে রান্নাঘরে প্রার্থনা আরু আরু বলে ডাকতে ডাকতে হুড়মুড়িয়ে এলো। ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে প্রার্থনা কে, কাঁদছেও। প্রার্থনা কে এই অবস্থায় দেখে আরজু উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“আপা, কি হয়েছে?”
প্রার্থনা হাতে থাকা বইটা আরজুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তুই দেখ এটা, এটা আমার সাহিত্যর লেখা বই। এই বইটা আমার সাহিত্য লিখেছে, আমার আর সাহিত্যর গল্প আছে এই বইয়ে।”
চমকে উঠলো আরজু। সাহিত্য কে সেটাতো আরজু খুব ভালো করেই জানে, তবে হঠাৎ করে প্রার্থনা ওর নাম কেন নিচ্ছে এই বইটা পড়ে। এটা তো সাহিত্যর লেখা হতে পারে না। আরজু তো চেনে এটা কার লেখা বই।
তবে প্রার্থনার বলা কথা আরমান বুঝলো না। সাহিত্য কে সেটা তো ও জানে না।
প্রার্থনার হাতে থাকা বইটা দেখে চিনতে পারলো। নিজে থেকেই প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপা, এটা ইলহাম রাইয়্যান নামক একজন লেখকের লেখা। আমি চিনি ওনাকে।”
প্রার্থনা জোর গলায় বলল,
“ও ইলহাম না, ও আমার সাহিত্য। আমি হলফ করে বলতে পারি এটা সাহিত্যর লেখা। আমি চিনি ওর লেখা।”
আরমান আরো কিছু প্রশ্ন করার আগেই আরজু বলে উঠলো,
“কি করে বুঝলে? এতটা নিশ্চিত হচ্ছো কি করে? আমি দেখা করেছি এই মানুষটার সাথে। ওনার নাম তো অন্য কিছু।”
প্রার্থনা বুঝলো ওর খালি মুখের কথায় বিশ্বাস করবে না। বইয়ের উৎসর্গ পাতাটা বের করে আরজুকে সেটা দেখিয়ে বলল,
“এখানে যা লেখা আছে এটা পড়।”
আরজু পড়লো উৎসর্গ পাতায় লেখা দুটো লাইন,
❝উৎসর্গ করিলাম সেই প্রার্থনা কে, যে চিরকাল আমার প্রার্থনায় রয়ে যাবে।❞
আরজু পড়াটা শেষ করতেই প্রার্থনা আবারো বলে উঠলো,
“সাহিত্য আমাকে বলেছিল ওর লেখা প্রথম বইটা ও উৎসর্গ করবে আমায়। ও এই লাইনটাই আমাকে বলে রেখেছিল। আরু তারপরে তুই দেখ, বইয়ের শেষে লেখা অসমাপ্ত। প্রথম দুটো পাতা পড়েই আমি বুঝতে পেরেছি এটা আমার আর সাহিত্যর অসমাপ্ত প্রেম কাহিনী ও লিখেছে। গল্পের শিমুল আর নিয়াজের যেভাবে দেখা হয়েছিল, সেভাবেই আমার আর সাহিত্যর দেখা হয়েছিল। নিয়াজ শিমুলকে ঠিক সেই সেই কথাগুলোই বলেছে যেগুলো সাহিত্য আমায় বলতো আরু। প্রথম দুটো পৃষ্ঠা পড়ার পর সন্দেহ হওয়ায় আমি বইয়ের শেষে পড়েছি। তুই দেখ যে ঘটনাটা আমার আর সাহিত্যের বিচ্ছেদের জন্য দায়ী সেই ঘটনাটাই হুবহু তুলে দেওয়া। এরপরও বলবি এটা আমার সাহিত্যর লেখা না?”
আরজুর মাথাটা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। আদৌ ইলহামই সাহিত্য কিনা এই সন্দেহটা আপাতত থাক, তবে আরজুর মাথায় একটা কথাই এলো যদি সত্যিই ইলহাম সাহিত্য হয়ে থাকে তবে ওর সাথে অনেক বোঝাপড়া বাকি আছে আরজুর। অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ইলহামকে। সেই সাথে প্রার্থনার ধারে কাছেও আর ওই কাপুরুষ, ভীতুটাকে ঘেষতে দেবে না আরজু।
আরজুর এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ করে আরমান বলে উঠলো,
“এক মিনিট আরু। ইলহাম ভাই তো ছদ্মনামে লেখে। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম ওনার আসল নাম সত্যি সাহিত্য। উনিতো গ্রামে এই নামেই পরিচিত। তবে লেখার ক্ষেত্রে উনি ছদ্মনামটা ব্যবহার করেন এবং আমাকেও বলেছেন যেনো আমি ওনার আসল পরিচয়টা কাউকে না দেই। কারণ এই শহরে ওনার একমাত্র পরিচিত বলতে আমি আছি।”
এবারে আর কোন সন্দেহ রইল না প্রার্থনার। মেয়েটা সেই শুরু থেকেই কাঁদছে। এবারে কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল। হেসে উঠে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুই দেখেছিস আরু, আমি বলেছিলাম না এটা আমার সাহিত্য। আমার সাহিত্যের লেখা আমি চিনতে পারব না। কত কবিতা লিখেছে ও আমাকে নিয়ে, ওর কত লেখা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি আমি, আমাদের কত স্মৃতি আছে ওর লেখা নিয়ে। আর আমি চিনবো না সাহিত্যের লেখা এটা হতে পারে।”
আরজুর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গম্ভীর গলায় বলল,
“যদি ইলহাম লোকটাই তোমার সেই ভীতু, কাপুরুষ প্রেমিক সাহিত্য হয়ে থাকে তবে তোমার সাথে দেখা করার আগে ওনাকে আমার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে আপা। আমার সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হবে। তবে উনি তোমার দেখা পাবেন না হয়তো। আমি এক ভুল তোমাকে আর দ্বিতীয়বার করতে দেব না।”
কথাটা বলে আরজু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল, প্রার্থনা কে আর কিছু বলার সুযোগও দিল না। আরমান পেছন থেকে ডাকলো আরজু কে কয়েকবার নাম ধরে, তবে আরজু সাড়া দিল না। প্রার্থনা উৎকণ্ঠিত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া, ও কি সাহিত্যের বাড়ি চেনে?”
আরমান চিন্তিত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে।”
“তাহলে আমার মনে হচ্ছে আরু সেখানেই যাচ্ছে। ওকে আটকাতে হবে ভাইয়া। আরুর মাথা গরম আছে, সাহিত্যকে সহ্য করতে পারে না, ঘৃণা করে। ওকে আটকান।”
আরমান নিজেও বুঝলো আরজুর মাথা প্রচন্ড গরম হয়ে আছে। আরজু যে প্রার্থনার ব্যাপারে কতটা ভয়ানক হতে পারে সেটা বোধহয় আরমান একটু একটু আন্দাজ করতে পারছে। রান্নাবান্না অমনি রেখে দৌড় দিল। ততক্ষণে আরজু বেরিয়ে গেছে। আরমান সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই আরজু কে দেখতে পেল। দৌড়ে গিয়ে আরজুর হাত টেনে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“ওই শয়’তা’নের বাড়ি যাচ্ছি।”
“আহ্ আরু, এভাবে বলতে হয় না। ইলহাম ভাই অনেক ভালো।”
আরজু সাবধানী গলায় বলল,
“খবরদার ওনার হয় তরফদারি করবেন না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে করবো না, তবে একসাথে যাই।”
আরজু একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“ঠিক আছে যান, বাইক বের করুন। আমি বাইরে অপেক্ষা করছেি।”
আরমান একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। গ্যারেজ থেকে আরমান বাইকটা নিয়ে বাইরে বের হয়ে এসে দেখলো আরজু নেই। আশেপাশে খুঁজলো, কয়েকবার আরজু নাম ধরে ডাকলো তবে তাও আরজুর দেখা পেল না। কপাল চাপড়ালো আরমান।
ততক্ষণে প্রার্থনাও নেমে এসেছে নিচে। আরমানকে একা দেখে উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
“আরু কই ভাইয়া?”
“আর বলবেন না আপা, এই পা’গলীটা আমায় বোকা বানিয়ে চলে গেছে একা একা। না জানি ইলহাম ভাইয়ের কপালে কি আছে আজ।”
__________
পান্ডুলিপি লেখায় ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছে ইলহাম। বরাবর যেমন ব্যস্ততায় দিন কাটে তেমনি সময় কাটছে। ওই যে খাওয়া-দাওয়ার সময়ও হচ্ছে না যেন। সময় পেলেও খাওয়ার ইচ্ছে নেই। ঘরের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জিনিসপত্র। কোথাও কলম, কোথাও খাতা, কোথাও বা বই।
টেবিলের উপর চার-পাঁচ টা চায়ের কাপ পড়ে আছে। লিখতে লিখতে আবারো ঘুম পেয়ে গেল। ভাবলো আর এক কাপ চা খেতেই হবে। তবে টেবিলের উপর পড়ে থাকে চায়ের কাপগুলো আর নিয়ে গিয়ে ধুঁয়ে রাখার ইচ্ছে হলো না। ভাবলো আরো কয়েকটা কাপ জমা হোক, তারপরে না হয় একসঙ্গে সবগুলো ধোঁয়া যাবে।
ইলহাম রান্না ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই কলিংবেলের শব্দ পেল। কে আবার এলো ওর বাড়িতে। এই ঢাকা শহরে এমন একটা অবস্থা ইলহামের যে যদি ও ম’রে পড়েও থাকে তাও বোধহয় লা’শটা কঙ্কাল হয়ে যাওয়ার পর মানুষ খোঁজ পাবে। তবে হঠাৎ করে আজ জীবিত মানুষটার খোঁজ নিতে কে চলে এলো।
দরজা খুলে সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে ইলহাম চমকালো। আরজু, তাও আবার একা, কিন্তু হঠাৎ কেন এসেছে। কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের সুরে বলল,
“আরে নীরাঞ্জনা হঠাৎ আপনি, তাও একা?”
“শুধু নিরাঞ্জনা না, নিরাঞ্জনা আরজু। চেনা গেল?”
ভ্রুঁ কোঁচকালো ইলহাম। হঠাৎ করে এভাবে নিজের নামটা শোনালো কেন আরজু। আরজু নামটা চেনে ইলহাম, তবে এভাবে বলছে কেন। তবে কি ইলহাম যা সন্দেহ করেছিল সেটাই ঠিক। পুনরায় ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“হঠাৎ এভাবে নিজের নামটা বলছেন যে? না চেনার কি আছে, আপনি তো আমার পরিচিত।”
“শুধু পরিচিত না, ভীষণ পরিচিত। একটু ভালো করে আমার পরিচয়টা তবে দেই। আমি প্রার্থনার বোন আরজু। সেই প্রার্থনা যাকে আপনি ঠকিয়েছেন, যাকে একা অপমানিত হতে রেখে ভীতু কাপুরুষের মতন পালিয়ে এসে নিজে এখানে সুখে শান্তিতে থাকছেন। সেই প্রার্থনার বোন আমি যার আপনার বিরহে জীবনটা ধ্বংসের পথে পৌঁছেছে, আমি সেই প্রার্থনার বোন যে আপনার কারণে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু হারিয়ে ফেলেছে।”
ইলহামকে কোন কিছু ভাবার ফুরসত দেয়ার ইচ্ছে হলো না আরজুর। প্রচন্ড ঘৃণা জমে আছে এই মানুষটার উপর। ঠিক কতটা যে ঘৃণা জমে আছে সেটা হয়তো আরজু ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। রাগে ঘৃণায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ইলহামকে কসিয়ে একটা চ’ড় লাগানোর জন্য উদ্যত হলো। হাতও তুলল। হঠাৎ করে কান্ডটা ঘটায় ইলহাম খিঁচে চোখ বন্ধ করলো, তবে ভাগ্যক্রমে আরজুর হাতের চ’ড়টা ইলহামের গালে পড়লো না। তার আগে আরমান এসে ধরে নিয়েছে সেই হাতটা।
“কি করছেন আরু? উনি বয়সে বড় আপনার থেকে।”
আরজু রাগান্বিত গলায় বলল,
“বয়সে বড় জন্য সব অপরাধ ক্ষমা হয়ে যেতে পারে না আরমান। উনি যে পাপটা করেছেন তার জন্য একটা চ’ড় কেন, ইচ্ছে তো করছে পায়ের জুতো খুলে ওনাকে পে’টাতে। বিশ্বাস করুন ওনার উপরে আমার যতটা রাগ আর ঘৃণা জমে আছে, আমি অনায়াসে ওনাকে খু’ন করতে পারি এবং আমার এক ফোঁটা আফসোসও হবে না।”