“কিরে তাওসিফ, খবর পেলাম তুই নাকি রাজনীতি ছেড়ে দিচ্ছিস? আমার ভয়ে নাকি?”
আরমান তখন ঘরে কি যেন একটা কাজ করছে। কি কাজ করছিল তানভীর সেসব জানে না। তানভীরের কথায় আরমান খুব বিশেষ একটা পাত্তা না দিয়ে বলল,
“তোকে দেখে তো একটা মশাও ভয় পায় না, সেখানে ভয় পাবে তাওসিফ আরমান!”
কথাটা বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। তানভীর বলল,
“তাহলে ছাড়ছিস কেন?”
“আমার বউ বলেছে তাই। আরুর পছন্দ না রাজনীতি।”
“ও বাবা, বউয়ের কথায় তাহলে আজকাল উঠছিস বসছিস।”
“হ্যাঁ, তোর কোন সমস্যা?”
তানভীর একটু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“এভাবে চেঁতে উঠছিস কেন? সবার সাথে তো ঠান্ডা মাথায় কথা বলিস। এখন মুনতাসির এলেই তো মিনমিন করে কথা বলতি, আর আমার সাথে যত চেঁচামেচি।”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“মুনতাসির এর সাথে নিজের তুলনা করিস না। ওই ছেলেটা কখনো আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। আমার সাথে কথা বলার সময় ওর দৃষ্টি থাকে সবসময় মাটির দিকে। আর ওর কন্ঠ থাকে অত্যন্ত নরম। ওর কথা শুনলেই বোঝা যায় ও ঠিক কতটা শ্রদ্ধা করে আমায়। তুই শ্রদ্ধা করিস?”
তানভীর তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তোকে করবো আমি শ্রদ্ধা? যা ভাগ তো।”
“তাহলে আমার থেকে এত ভালো ব্যবহার আশা করিস না। তুই কেন এসেছিস এখানে বলতো, ঝগড়া করতে? যদি সেই উদ্দেশ্য থাকে তাহলে চলে যা। অযথা তোর সাথে ঝামেলা করার আমার কোনো ইচ্ছে নেই তানভীর।”
আরমান নিশ্চিত ছিল তানভীর এবারে নিজে নিজে কিছু বকবক করতে করতে একসময় বিরক্ত হয়ে ঠিক চলে যাবে। তবে তেমন কিছু হলো না। বরং উল্টো তানভীর আরমানের হাত ধরে টেনে এনে ওকে বিছানায় বসালো।
আরমান মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“সমস্যা কি তোর? এখন কি মা'রা'মা'রিও করতে চাইছিস?”
তানভীর এবার দ্বিগুন বিরক্তিকর গলায় বলল,
“একদম চুপ। যা বলবো শোন। আমিও ঠান্ডা মাথায় কথা বলবো, তুইও ঠান্ডা মাথায় কথা বলবি। কেউ রাগারাগি করবো না।”
আরমান রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“ঠিক আছে বল।”
তানভীর এবার শান্ত হলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেন ছাড়বি রাজনীতি? শুধুই কি তোর বউ চায় বলে নাকি অন্য কোন কারণ আছে?”
“না, আর কোন কারণ নেই। আরু চায় না আমি রাজনীতি করি, এটাই রাজনীতি ছাড়ার সব থেকে বড় এবং একমাত্র কারণ।”
“তাই বলে এভাবে ছেড়ে দিবি? বোঝা তোর বউকে। ওই মেয়ের এক কথায় তাই বলে তোর এত দিনের শখের রাজনীতি ছেড়ে দিতে হবে?”
আরমান আলতা হেসে বলল,
“সব ছাড়তে পারে আমি আমার আরুর জন্য। যেদিন আমি আরুকে বলেছিলাম ওর এক কথায় আমি রাজনীতি ছেড়ে দেবো সেদিন ওর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠেছিল খুশিতে। ওই খুশি টুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। ছেড়ে দিলাম আমি আমার শখ। আমার সবথেকে বড় ইচ্ছেটাই তো পূরণ হয়েছে। আমার আরু কে পেয়েছি। আর কিছুর দরকার নেই।”
“কিন্তু তাওসিফ রাজনীতি তোর অনেক শখের, তোর ভালোবাসা। মনে নেই রাজনীতি করা নিয়ে তুই চাচার কাছে কত বকা খেয়েছিস? কত রাগারাগি করেছে চাচা। রাজনীতিতে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য চাচা তোকে ভার্সিটিতে পড়াতেও চেয়েছিল না, গ্রামে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল কিন্তু তুই কারো কথা শুনিসনি। আর আজ এত কষ্টে যে জায়গাটাতে পৌঁছেছিস সেটা এভাবে ছেড়ে দিবি? তোর স্বপ্ন গুলোর কি হবে?”
আরমানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“বাদ দে এসব তানভীর। সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়? জানিস আমার আরুর জীবনে কত অপূর্ণ স্বপ্ন আছে? ওর কোন ইচ্ছে কেউ কখনো পূরণ করেনি। আমিও যদি সেই একই কাজ করি তবে তো নিজেকে দেওয়া কথাটা রাখতে পারব না। আমার আরু কে সারা জীবন খুশি রাখাও আমার জীবনের একটা ইচ্ছে। ওটাই আমার স্বপ্ন এখন।”
“আরেকটু সময় নেয়া উচিৎ তোর। এত তাড়াহুড়োর মাঝে সিদ্ধান্তটা নেস না। একবার তুই রাজনীতি ছেড়ে দিলে সহজে কিন্তু আর এই জায়গাটা ফিরে পাবি না এটা মনে রাখিস।”
“আমি একবার ছাড়লে আর এই জায়গায় কখনো ফিরে আসবোও না। আমি হয়তো অনেক আগেই রাজনীতি ছেড়ে দিতাম যদি কখনো এই আশঙ্কা থাকতো যে রাজনীতির জন্য আমার বাবা-মা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু তেমন কোন ভয় ছিল না। আরুর ক্ষেত্রে এই ভয়টা আছে। যদি আরু চলে যায় আমাকে ছেড়ে তবে তো আমি থাকতে পারবো না। তার থেকে বরং রাজনীতিটাই যাক।”
“রাজনীতি ছেড়ে থাকতে পারবি?”
আরমানা আলতো হেসে বলল,
“আমার আরু ছাড়া বাকি সব কিছু ছেড়েই থাকতে পারবো আমি।”
তানভীর এবার উঠে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
“থাক তুই তোর বউকে নিয়ে। আজাইরা কথা আমার সামনে বলতে আসছে। বউকে দুইটা ধমক দিয়ে বোঝালেই তো হয়।”
আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“তুই তো নিজেই কারোর এক ধমকে থেমে যাস, আবার আমাকে বলছিস বউ কে ধমক দেওয়ার কথা।”
বিস্ফোরিত নয়নে তানভীর তাকালো আরমানের দিকে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি বললি? কার ধমকে আমি থেমে যাই?”
“কার ধমকে থেমে যাস সেটা জানা নেই, তবে আমি খুব ভালো করেই জানি তুইও বউ পাগলই হবি। তুইও বউয়ের এক ধমকেই থেমে যাবি।”
স্বস্তি পেল তানভীর। একটুর জন্য তো ভেবেছিলো আরমান বোধহয় সবটা ধরে ফেলেছে। যাক কিছু ধরতে পারেনি তবে। আর কোন কথা বাড়ালো না তানভীর। আরমান কে আরো গালি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
_______
প্রার্থনা কল করেছে আরজু কে। ফাহিম যে মা'রা গেছে এই খবরটা প্রার্থনা আরজু কে এখনও দিতে পারেনি। কেননা এই কথাটা বললেই আরজু প্রশ্ন করবে কিভাবে মা'রা গেল। হয়তো জিজ্ঞেস করবে কতটা ভয়ংকর ভাবে মা'রা গেল, মৃত্যুর আগে কতটা কষ্ট পেল। আর প্রার্থনা তো আরজু কে মিথ্যে বলতে পারবে না। আবার এটাও বলতে পারবে না যে ওই খু'ন করেছে ফাহিমকে। কেমন যেন অস্বস্তি হবে, তাই আর বলতেই পারেনি।
টুকটাক কিছু কথা বল আরজু ফোনটা রেখে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখলে তাওকীর দাঁড়িয়ে আছে।
আরজু কে তাকাতে দেখেই তাওকীর যেন একটু হকচকিয়ে উঠলো। বোধহয় একটু অস্বস্তির মাঝে পড়লো। তবে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমার আপার সাথে কথা বলছিলে?”
আরজু উপর নিচ মাথা নাড়লো। তাওকীর আবারো বলল,
“কে কে আছে তোমার পরিবারে?”
আরজুর মুখটা চুপসে গেল। আরমান তো বলেছিল ওর পরিবার সম্বন্ধে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না তবে এই লোকটা কেন জিজ্ঞেস করছে।
তাওকীর বোধহয় আরজুর অস্বস্তি বুঝতে পারলো। প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করলো,
“তোমার কয় ভাই বোন?”
এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে আরজুর কোন সমস্যা নেই। কেননা আরজু নিজেই ঠিক করে নিয়েছে ওরা কয় ভাই বোন।
“দুই বোন আমরা। আমি ছোট, আমার একটা বড় আপা আছে।”
ভাইয়ের কথা উল্লেখ করলো না আরজু তাই তাওকীরের একটু সন্দেহ হলো। ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“আরমান যে বলেছিল তোমার নাকি একটা ভাইও আছে?”
আরজু একটু ভাবনা চিন্তার মাঝে পড়ল। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“ছিল, এখন নেই। ম/'রে গেছে।”
“কিভাবে মা'রা গেল? বয়স তো কম ছিল মনে হয়?”
আরজু আবারো একটু ভাবনার মাঝে পড়ে গেল। বলে তো দিল ভাই মা'রা গেছে, এখন কিভাবে মা'রা গেছে সে সম্বন্ধে কি বলবে। অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তা শেষে আবারো বলে উঠলো,
“জানিনা কি করে মা'রা গিয়েছিল। আমি তখন ছিলাম না বাড়িতে।”
তাওকীর আর কোন প্রশ্ন করলো না। যদিও একটু সন্দেহ হলো। তবে একটা বিষয় তাওকীরের জানা খুব দরকার। আমতা আমতা করে প্রশ্ন করলো,
“তোমার বোনের নাম কি?”
তাওকীরের এবারের প্রশ্নটা শুনে আরজুর কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হলো। বারবার তাওকীরের আরজুর পরিবার সম্বন্ধে, বিশেষ করে ওর বোনের সম্বন্ধে খোঁজখবর করাটা কেন যেন সন্দেহ লাগছে। কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“আপনি কি করবেন জেনে? আপনার আমার পরিবার সম্বন্ধে জানার এত আগ্রহ কেন?”
তাওকীর অস্বস্তি মাখানো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“এমনি আরকি। এর আগের দিন আরমান কে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমার বোনের নাম, ও বলতে পারেনি।”
“তো আমার বোনের নাম জানার জন্য আপনি এত উতলা হচ্ছেন কেন? কি দরকার?”
“না কিছু দরকার নেই, এমনিতেই।”
“ও আচ্ছা। প্রার্থনা আমার আপার নাম।”
তাওকীর আবারও প্রশ্ন করলো,
“ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোথায় থাকো তুমি? গ্রামের নাম কি তোমার?”
আরজু ভাবলো গ্রামের নামটা মিথ্যে বলা ঠিক হবে না। এমনও তো হতে পারে হয়তো আরমান কিছু বলে দিয়েছে। এখন তো মনে হচ্ছে ভাইয়ের কথাটা বলেই হয়তো ভুল করেছে। কে জানে আরমান আগে কিছু জানিয়েছে কিনা। সেজন্য গ্রামের নামটা মিথ্যে বলল না। বলে দিল গ্রামের নামটা।
গ্রামের নামটা শুনতেই তাওকীর কেমন যেন কেঁপে উঠলো। এই ঠান্ডার দিনেও হঠাৎ করে তাওকীরের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখা পাওয়া গেল। আরজুর দৃষ্টি সূঁচালো হলো। তাওকীর চটপট নিজের দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল। একবার ভাবলো এখন এখান থেকে চলে যাওয়া দরকার, কিন্তু পরক্ষণে আবার মনে হলো না এভাবে হঠাৎ করে চলে গেলে আরজুর সন্দেহ বাড়তে পারে।
আর তাছাড়া তাওকীরের মনে যে প্রশ্নগুলোর উদয় ঘটেছিল সেগুলোর তো উত্তর এখনো পায়নি।
তাওকীরের ঘাবরে যাওয়া মুখটা দেখে আরজু সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করলো,
“আপনি কি কিছু লুকোচ্ছেন? আপনি আমার থেকে কিছু জানতে চাইছেন তাই না? আমি বুঝতে পারছি আপনি খুব গোপন কিছু আমার থেকে জানতে চাইছেন।। সেজন্য আপনি ঘামছেন। না হলে এটা ঘামার আবহাওয়া না।”
তাওকীর জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“না তেমন কিছু না।”
“তবে আমার গ্রামের নাম শুনে এভাবে চমকালেন কেন?”
“আসলে আমার একটা বন্ধু থাকতো ওই গ্রামে সেজন্য অনেক দিন পর গ্রামের নামটা শুনে একটু চমকালাম। তো কি যেন বললে তোমার আপার নাম?”
“প্রার্থনা।”
তাওকীর বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে কপালে ঘামটুকু মুছে নিয়ে ফের জিজ্ঞেস করল,
“আর কোন নাম আছে নাকি তোমার আপার? গ্রামেই থাকে? বিয়ে হয়ে গেছে? পড়াশোনা কতদূর, কোন ভার্সিটি থেকে পড়েছে?”
আরজুর সন্দেহ বাড়লো। এবারে তো নিশ্চিত যে নিশ্চয়ই কোন ঝামেলা আছে। আর তাছাড়া সব থেকে বড় কথা এই লোকটা বারবার ঘুরে ফিরে আরজুর বোনের ওপরে কেন যাচ্ছে? কেন বারবার প্রার্থনা কে নিয়ে প্রশ্ন করছে? আচ্ছা এই লোকটা কি সাহিত্য, যাকে ভালোবেসে আজ প্রার্থনার জীবনটা এমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল?
আরজু তাওকীরের প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর না সন্দেহী গলায় বলল,
“আপনি কে? আপনি কি সত্যিই তাওকীর নাকি আপনার অন্য কোন নাম আছে? আমাদের গ্রামের সাথে আপনার কোন যোগসূত্র আছে তাই না?”
তাওকীর তাড়াহুড়ো করে বলল,
“না না তোমার গ্রামের সাথে আমার কোন যোগসূত্র নেই। আমি এখন আসছি। আর আমার নাম তাওকীরই। এই একটাই আমার পরিচয়।”
কথাটা বলে তাওকীর হতদন্ত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। আরজু পিছন থেকে কয়েকবার থামুন থামুন বলল তবে তাওকীর থামলো না, নিচে চলে গেল।
আরজু বুঝে উঠতে পারলো না তাওকীরের আসলে সমস্যাটা কি? কি লুকোতে চাইলো আরজুর থেকে? আর বারবার কেনই বা প্রার্থনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলো?
___________
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আড্ডা দেওয়া শেষে সবাই যে যার মতোন ঘরে চলে গেল ঘুমোনোর জন্য। আরজু আর আরমানও নিজেদের ঘরে চলে এলো। আরমানই দরজা বন্ধ করলো। আরজু আগেই এসে বিছানার উপরে বসে পড়েছে। আরমান দরজা বন্ধ করতেই আরজু হাতের ইশারায় ওকে কাছে ডাকলো। আরজুর ডাকার ভঙ্গিমা দেখে আরমানের ভীষণ হাসি পেল। তবে হাসলো না। পা'গলীটা আবার মন খারাপ করতে পারে।
আরমান চুপচাপ এগিয়ে এসে বসলো আরজুর পাশে। আরজু কম্বলটা আরমানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“পা তুলে বসুন। অনেকক্ষণ কথা আছে আপনার সাথে, ঠান্ডা লাগবে।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“এই ঠান্ডার দিনে আমাকে মেঝেতে ঘুমোতে হয় আরু তখন আপনার মনে হয় না যে আমার ঠান্ডা লাগবে। একটু বিছানায় ঘুমোতে দিলে কি হয়?”
আরজু চোয়াল শক্ত করে বলল,
“আমি কি বলেছিলাম আপনাকে নিচে ঘুমোতে? আপনি নিজ ইচ্ছেতে গিয়েছিলেন।”
“তবে আবার নিজের ইচ্ছেতে চলে আসি?”
“কক্ষনো না। আপনি কোনদিন বিছানায় ঘুমোতে পারবেন না। আপনাকে সারা জীবন মেঝেতেই ঘুমোতে হবে। আর মেঝে তে না ঘুমোলে সোফাতো আছে, সোফায় ঘুমোন।”
আরমান অসহায় মুখ করে বলল,
“না আরু সোফায় ঘুমোনো যায় না। ঘাড় ব্যথা ধরে যায়। আপনি এতো নির্দয় হচ্ছেন কেন আমার প্রতি?”
“আমি এমনই। এমন জেনেই আমাকে বিয়ে করেছেন। সমস্যা হলে রেখে আসতে পারেন আমায়, আমার কোন আপত্তি নেই।”
আরমান কিঞ্চিত রাগী গলায় বলল,
“সব সময় এমন ছাড়ার কথা বলবেন না তো, আমার ভালো লাগেনা। বিয়ে যখন করেছি সারা জীবনই রেখে দেবো আমার কাছে। সে আপনি নিজের পাশে ঘুমোতে না দিলেও সই।”
“আচ্ছা এসব কথা ছাড়ুন। আমার একটা কথা আছে আপনার সাথে। আজ আপনার তাওকীর ভাইয়া আমাকে আমার পরিবারের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলো। আমি গ্রামের নামটা সত্যি বলে দিয়েছি কিন্তু আমার ভাইয়ার ব্যাপারে বলেছি আমার ভাই ম'রে গেছে।”
আরমান আৎকে উঠে বলল,
“সে কি, ম'রে গেছে কেন বলতে গেছেন? বেঁচে আছে তা আপনার ভাইয়া।”
“হ্যাঁ বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু ও তো ভালো না। যদি ওর ব্যাপারে নাম জেনে খোঁজ খবর নেয় তখন তো সব জেনে যাবে। এমনিতেও আমার জন্য আমার ভাই বেঁচে নেই। আপনি একটু সামলে নেবেন হ্যাঁ?”
আরমান আশ্বস্ত করে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে সামলে নেব। তবে আর আপনার কাউকে কিছু বলতে হবে না। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবেন আরমানের থেকে শুনে নিতে, ঠিক আছে?”
আরজু আলতো হোসে ঘাড় কাত করে বলল,
“ঠিক আছে।”
“আমি তাহলে এখন উঠবো?”
আরমানের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“সমস্যা হচ্ছে এখানে বসে থাকতে?”
“সত্যি বলতে সমস্যা একটু হচ্ছেই। আপনার এত কাছাকাছি থাকাটা আসলে ঠিক না। আপনার গাল দুটো ভীষণভাবে আমাকে আকৃষ্ট করছে। আর.... আর আপনার ঠোঁটদুটো, সেগুলো যে কি করছে না বলি। বেয়াদবি হয়ে যাবে।”
আরজু খুব বেশি একটা পাত্তা দিলো না আরমানের কথায়। কেননা জানে এখন আরজুর থেকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় পেলে আরমান আবারও চুমু খাওয়া শুরু করে দেবে। আরজু আপত্তি করে ঠিকই তবে ছেলেটা তো ওকে চুমু না খেয়ে ছাড়ে না। আর যখন খাওয়া শুরু করে একসাথে চার-পাঁচটা টপাটপ খেয়ে ছাড়ে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দুজনে বসে থাকলো। আরমান তো তাকিয়ে আছে আরজুর মুখের দিকে। খুব কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। আপাতত আরজু কে দেখেই না হয় মনটাকে শান্ত করা যাক।
এদিকে আরজু তখন খুব গভীর ভাবনার মাঝে নিমগ্ন। মুখ ভঙ্গি তার ভীষণ গম্ভীর। কি যেন একটা ভাবছে, খুব কঠিন কিছু ভাবছে মনে হয়।
দীর্ঘ একটা সময় এভাবে ভাবনা-চিন্তার পর আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি একদিন অনেক বড় রাজনীতিবিদ হতেন তাই না? এমপি, মন্ত্রী তারপর প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেতেন?”
হঠাৎ করে আরজুর মুখ থেকে এমন কথায় আরমান একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“প্রধানমন্ত্রী হওয়া কি অতই সোজা আরু! তবে এমপি হয়ে যেতাম হয়তো।”
“আপনি রাজনীতি ছাড়বেন না কেমন? আপনি রাজনীতি করুন, আমার কোন অসুবিধা নেই।”
হঠাৎ করে আরজুর কথাটা আরমানের হজম হলো না। কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হলো। কিছুক্ষণ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলো হঠাৎ করে কেন এই কথাটা বলল। তবে কোন কারণ খুঁজে পেল না।
হুট করে মনে পড়ে গেল আজ সন্ধ্যায় তানভীরের সাথে হওয়া কথা শুনে নিয়েছিল বোধহয় আরজু। সেই থেকেই নিশ্চয়ই কথাগুলো বলছে।
আরমান ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,
“আরু শুনুন, আমার কাছে আপনার থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। এসব রাজনীতি একটা সাধারণ শখ মাত্র। দুদিন পর আমি ঠিক ভুলে যাবো। তবে আমার কাছে আপনার খুশিটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি তো আমাকে জোর করে ছাড়াচ্ছেন না। আমি নিজের ইচ্ছেতে ছাড়ছি আপনার খুশির জন্য।”
আরজু আলতো হেসে বলল,
“আপনি যে আমার খুশির জন্য এত কিছু ভেবেছেন সেটাই অনেক। কেউ কখনো আমার খুশির কথাই ভাবেয়নি, আর সেখানে আপনি আমার খুশির জন্য নিজের খুশিটা বিসর্জন দিতে চেয়েছিলেন তাই অনেক। আসলে আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছি জানেন তো, ভাগ্যে যা আছে তা হবেই। দেখুন না আমি কখনো ভাবতাম নাকি আমার জীবনে কোন আরমান আসবে, কিন্তু এসে তো গেল। ঠিক তেমনি আপনার ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। রাজনীতি করলেও হবে, না করলেও হবে।”
“আরু আপনি কিন্তু ভুল ভাবছেন। আমার কোন আপত্তি নেই রাজনীতি ছাড়তে। আমার একটুও কষ্ট হবে না বিশ্বাস করুন। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনাকে ভালোবেসে আমি সব করতে পারি। আপনার খুশির জন্য আমি সব করতে পারি।”
আরজু বসা অবস্থাতেই আরমানের দিকে এগিয়ে গেল এবং অবাক করার বিষয় হলো আজ দ্বিতীয় বারের মতন আরজু নিজ থেকেই দুই হাতে আরমানের গলা জড়িয়ে ধরল। আরমানের কাঁধের উপর আলতো করে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি যখন এমপি হবেন তখন সবাই আমাকে এমপির বউ বলবে। আমার খুব ভালো লাগবে শুনতে। তখন তো আপনার অনেক ক্ষমতা হবে। তখন ফিরোজ আমার ধারের কাছেও আসতে পারবেনা। আমি আপাকেও নিয়ে আসবো। ফিরোজের সাহসই হবেনা আর আমার দিকে তাকানোর। তাই আপনি রাজনীতি করুন।”
“সে তো ফিরোজের এখনো ক্ষমতা নেই আমার আরুর আশেপাশে আসার।”
“জানি তো, কিন্তু যে মানুষটা আমার খুশির দায়িত্ব নিয়েছে, আমার স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব নিয়েছে আমি এতটা স্বার্থপর নই আরমান যে তার স্বপ্নগুলোকে গলা টি'পে মা'রবো। আমার রাজনীতি করে নিয়ে কখনো আপত্তি ছিল না তবে হঠাৎ করে আপনাকে হারানোর ভয় ঢুকে গেছিলো ভেতরে। অনেক রাজনীতিবিদরা ম'রে যায়। ভেবেছিলাম আপনার যদি তেমন কিছু হয়ে যায়, কিন্তু পরে মনে হলো মানুষ তো ম'রেই। সময় হলে আমরাও ম'রে যাব।”
কথাটা বলে আরজু ছেড়ে দিল আরমানকে। আরমানের মুখোমুখি বসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো। আরমান মুচকি হেসে আলতো করে আরজুর গালে হাত রেখে বলল,
“আপনি সত্যি মন থেকে কথাটা বলছেন তো আরু? নিজের উপর জোর জবরদস্তি চালাচ্ছেন না তো?”
আরজু আবারো আলতো হেসে বলল,
“না আরমান। চলুন আজ থেকে আমরা কিছু কাজ ভাগাভাগি করে নেই। আপনি আমার স্বপ্ন পূরণ করবেন, আর আমি আপনার স্বপ্নগুলো পূরণে একটু একটু সাহায্য করবো। আর আপনি আমায় অনেক ভালোবাসবেন। আর ফিরোজকে কখনো আমার ধারের কাছেও আসতে দেবেন না। এতোটুকু হলেই হবে।”
“আরে পা'গলী এমনিতেই আমি আপনাকে ভালোবাসবো। আর ফিরোজ একবার এসে তো দেখাক। আমার আরুকে কে আমি দিলে তো।”
আরমানের কথায় আরজু ভীষণ খুশি হলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“হ্যাঁ ওকে দেবেন না। আমি শুধু আপনার, আর আপনি শুধু আমার।”
আরমান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“ঠিক আছে। আমি আপনার, আর এই পা'গলীটা শুধুই আমার। আর কাউকে দেবো না।”