জানালার ধারে চুপচাপ বসে আছে প্রার্থনা। ঘরটা আজ প্রার্থনার কাছে বেশ অন্যরকম লাগছে। এই মুহূর্তে পরিবেশটা আজ প্রার্থনার কাছে ভীষণ অন্যরকম লাগছে। প্রতিবার যখন সারা ঘর জুড়ে দৃষ্টি বোলাচ্ছে তখন মনে হচ্ছে এই ঘরটা নতুন। আবার হঠাৎ করেই মনে পড়ছে কাল রাতে ওই বিছানায় একটা লা'শ পড়েছিল, একটা জা'নো'য়া'রে'র লা'শ পড়েছিল যে জা'নো'য়া'র টাকে প্রার্থনা নিজ হাতে মে'রে ফেলেছে। মাঝে মাঝে এসব ভেবে ভয়ে গা শিউরে উঠছে প্রার্থনার। আবার মাঝে মাঝেই খুশিতে ঠোঁটে ফুটে উঠছে হাসি।
প্রার্থনার আসল অনুভূতিটা ঠিক কি তা বুঝতে পারছে না। প্রার্থনার এসব ভাবনার মাঝেই ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো ফিরোজ। ও কে এভাবে ঢুকতে দেখে প্রার্থনা প্রশ্ন করলো,
“কি হয়েছে?”
ফিরোজ সরাসরি প্রার্থনার দিকে তেড়ে এসে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত পিষে বলল,
“তুই জানতি আরজু বিয়ে করেছে?”
প্রার্থনা বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“আরু বিয়ে করেছে?”
“হ্যাঁ করেছে। সত্যি করে বল প্রার্থনা তুই জানতিস আরজু বিয়ে করবে?”
“না আমি জানতাম না কিচ্ছু।”
“বিশ্বাস করি না আমি। তুই সব জানতিস তাই না? তোরা দুই বোন মিলে ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিলি। কিসের এত শত্রুতা তোদের আমার সাথে? আমাকে কেন এত কষ্ট দিলি তোরা? আরজুর মনে নাহয় মায়া দয়া নেই, কিন্তু তোর কি আমার প্রতি মায়া হলো না? তোকে এত বড় বিপদের হাত থেকে আমি বাঁচালাম তার পরেও মায়া হলো না?”
“আমি জানতাম না ফিরোজ ভাই এই ব্যাপারে কিছু। হ্যাঁ এটা ঠিক আরু আমায় বলে গিয়েছিল যে ও যেকোনদিন বিয়ে করে নেবে তবে আমি সত্যি ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নেবে। বিশ্বাস করো আমি জানতাম না।”
ফিরোজ চিৎকার করে উঠে বলল,
"তোর আরু বিয়ে করে নিয়েছে। বিয়ে না করে ও থাকতে পারছিল না তাই করে নিয়েছে। আরুর বিয়ের ছবি দেখবি? দেখাচ্ছি।”
কথাটা বলে ফিরোজ ওর ফোন থেকে আরজুর বিয়ের ছবিটা বের করে প্রার্থনার হাতে দিলো। প্রার্থনা কিছুক্ষণ মনোযোগ সহকারে ছবিটা দেখলো। আরজুর ঠোঁটে হাসি লেপ্টে আছে। মুহূর্তের মাঝে প্রার্থনার ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠলো। প্রার্থনা কে এভাবে হাসতে দেখে ফিরোজ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“হাসছিস কেন?”
প্রার্থনা হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমার আরু জিতে গেছে ওর জীবনে। দেখো, যে আরু ভালোবাসার নাম শুনলেও ঘৃণায় মুখ কুঁচকে রাখতো আজকে সেই আরু নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে করতে পেরে হাসছে।”
“আর আমার অস্থিরতা তোর চোখে পড়ছে না তাই না?”
প্রার্থনা চোখ তুলে তাকালো ফিরোজের দিকে। স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তোমাকে তো আমি বলেছিলাম তুমি ফিরোজ হয়ে থাকলে কোনদিনও আরু কে পাবেনা। তোমার কাছে আরু এতটা গুরুত্ব ছিলনা ফিরোজ ভাই। যার কাছে আমার আরুর গুরুত্ব ছিল তাকে আমার আরু পেয়ে গেছে।”
“তোর খারাপ লাগছে না আমার জন্য প্রার্থনা? আমি জানি আরজুর মনে আমার জন্য কোন মায়া নেই কিন্তু আমি ভেবেছিলাম তুই কষ্ট পাবি। অন্তত একটু হলেও তোর খারাপ লাগবে আমার জন্য। তোরও কষ্ট হচ্ছে না?”
প্রার্থনা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“আমার জীবনটা তো নষ্ট তুমি করেই দিয়েছো ফিরোজ ভাই। তবে আরুর জীবনটা নষ্ট হয়নি। আরু একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। তুমি ওকে ভালোবাসো কিনা সেই বিষয়েই তো আমার সন্দেহ আছে।”
প্রার্থনা কথাটা বলার সাথে সাথে ফিরোজ আঙ্গুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলল,
“খবরদার প্রার্থনা আমার ভালোবাসার উপর সন্দেহ করে কোন প্রশ্ন তুললে তোর জিভ টেনে ছিঁ'ড়ে ফেলবো আমি।”
প্রার্থনা কেন যেন ভয় পেল না। আবারও তাচ্ছিল্য গলাতে বলল,
“তোমার ক্ষমতা আছে। তুমি চাইলে সেটা করতেই পারো। তবে তাই বলে সত্যিটা তো আর মিথ্যে হয়ে যাবে না ফিরোজ ভাই। তোমার ভালোবাসায় আমি ততদিন বিশ্বাস করতাম যত দিন না তোমার পা ঐ নিষিদ্ধ পল্লীতে পড়েছে, যতদিন না তুমি আরুর শহরে থাকা নিয়ে ওর প্রতি নোংরা ইঙ্গিত করেছো।”
ফিরোজ এবারে প্রার্থনার চোয়াল চেপে ধরে দাঁত পিষে বলল,
“তোর থেকে এত জ্ঞান শুনতে আসিনি আমি। যা করতে বলছি চুপচাপ সেটা কর। আরজু কে ফোন কর।”
ফিরোজ ভেবেছিল প্রার্থনা কে দিয়ে আরজু কে ফোন করাতে বেশ বেগ পেতে হবে তবে তেমন কিছুই হলো না। প্রার্থনা রাজি হয়ে গেল।
“ঠিক আছে করছি। তুমি না বললেও করতাম। আমার আরু কেমন সংসার করছে জানতে হবে তো আমায়।”
ছেড়ে দিল ফিরোজ প্রার্থনা কে। নিজেকে যেন আরো অসহায় মনে হলো। কেউ নেই যে ফিরোজের এই কষ্টের দিনে একটু ওকে বোঝাবে, একটু ওকে সান্ত্বনা দেবে।
প্রার্থনা কল করলো আরজুর নাম্বারে। আরজু তখন নিজের ঘরে চুপচাপ বসে আছে। খবর পেয়েছে আরমানের বাড়ির লোকজন প্রায় এসে গেছে। আরমান ওদেরকে এগিয়ে আনতে গেছে। আরজু কেও যেতে বলেছিল সাথে তবে আরজু যেতে রাজি হয়নি। ওর অস্বস্তি হচ্ছে।
হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা হাতে নিয়ে প্রার্থনার নাম্বারটা দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ করে বলল,
“আপা, কেমন আছো তুমি?”
প্রার্থনা নিজেও হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমি ভালো আছি আরু। তুই আগে বল তোর সংসার কেমন কাটছে?”
প্রার্থনার মুখ থেকে এমন কথা শুনে আরজু চমকালো। ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“তুমি কি করে জানলে আমার সংসারের কথা?”
“ফিরোজ ভাই বলল।”
“ও কি করে জানলো?”
“কি করে জেনেছে সেসব কথা বাদ দিয়ে তুই আগে বল তোর সংসার কেমন কাটছে?”
আরজু উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“খুব ভালো কাটছে আপা। জানো এই শুক্রবার আমাদের বিয়ের অনেক বড় করে অনুষ্ঠান হবে।”
আরজু কথাটা বলতেই ফিরোজ প্রার্থনার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। প্রার্থনা কে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না। ফোনটা নিজের কানে ধরে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কোন সাহসে তুই বিয়ে করেছিস? তুই কি ভেবেছিস আমি তোকে ছেড়ে দেবো? না তোকে ছাড়বো, না তোর আরমান কে ছাড়বো। সবকটাকে শেষ করব।”
ফিরোজের থেকে এমন হুমকি শোনার পরেও আরজুর মাঝে কোনো ভয় দেখা গেল না। নিজের অভিব্যক্তিতে বদল ঘটিয়ে কণ্ঠ গম্ভীর করে তুলে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোকে আমি এর আগেও বলেছি আমি যদি ম'রি তোকে মে'রেই ম'র'বো। আর একটা কথা, তোর প্রতি আমার কিছু কৃতজ্ঞতা আছে সেজন্য তুই এতদিনেও বেঁচে আছিস, কিন্তু ভুলেও যদি আরমানের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছিস তুই ভাবতেও পারছিস না আমি তোর কি অবস্থা করব। আমার আরমানের দিকে চোখ তুলে যদি তাকাস তোর চোখ আমি উপড়ে ফেলব ফিরোজ।”
হঠাৎ করে ফিরোজের রাগটা কমে গেল। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেল। বিছানার উপর ধপ করে বসে নির্জীব কন্ঠে বলল,
"কবুল বলার সময় কি একবারের জন্যও আমার কথা মনে পড়েনি তোর আরজু? একবারও মনে হয়নি যে এই খবরটা পেলে আমি ঠিক কতটা ভেঙে পড়বো?”
আরজু ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
”বিয়ে একটা পবিত্র কাজ। আর এমন পবিত্র কাজের সময় কোনো জানোয়ারের কথা ভাববো এতটা অধঃপতন আমার এখনো হয়নি।”
“কোনোদিন কি আমার প্রতি তোর বিন্দুমাত্র কোন ভালোবাসা তৈরি হয়নি আরজু? ফিরোজের প্রতি না হয় নাই হলো পুরোনো আবিরের প্রতিও কি তোর কোন দুর্বলতা ছিল না?”
আরজু কে উত্তরটা দিতে একটুও ভাবতে হলো না। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“তুই জানিস আমি কাউকে ক্ষমা করতে পারি না। আজকের ফিরোজই যে কোন এক সময় আবির ছিল সেটা ভাবতেও আমার লজ্জা করে এখন।”
“আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আমি পেলাম না আরজু। আমি তোকে জিজ্ঞেস করেছি আবিরের প্রতি তোর কোন দুর্বলতা ছিল কি ছিল না?”
“জানিনা। তুই কি এখনো সেই পুরনো আবির আছিস নাকি যে আমি পুরনো কথা মনে রাখবো?”
ফিরোজা কাতর গলায় বলল,
”আমি খুব ভালোবাসি তোকে আরজু। তোকে বাঁচানোর জন্য কি কি করেছি সেসব ভুলে গেছিস তুই তাই না? আমার ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই তোর কাছে?”
আরজু এবারে কন্ঠে একরাশ ঘৃণা সমেত বলল,
"কিচ্ছু ভুলিনি আমি। না আমাকে বাঁচানোর কথা ভুলেছি আর না আমার আপার জীবন ধ্বংসের কথা ভুলেছি। আর ভালোবাসা? তুই আমাকে এমনই ভালোবাসিস যে অন্য নারীর শরীর না ছুঁলে তুই ছটফট করিস। এমন ভালোবাসার স্থান আমার পায়ের নিচেও হবে না। আর এমন প্রেমিক কে আমি পায়ে পিষে মা'রি।”
হঠাৎ করে ফিরোজার চোখ দুটো কেমন ভিজে উঠল। প্রার্থনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়াল করছে সব। এর আগের দিন আরজুর সাথে কথা বলার সময় ফিরোজের জন্য মায়া হয়েছিল প্রার্থনার। আজ একটু আগে অব্দি মায়া হচ্ছিলো না তবে এখন কেন যেন হুট করে খারাপ লাগলো ফিরোজের জন্য। তবে আরজু বিয়ে করাতে প্রার্থনা খুশি খুব। ওর জীবনটা যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে তবে আরজু সুখে আছে এটাই অনেক।
ফিরোজ আবারো আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরমানের কয়েক মাসের ভালোবাসার কাছে আমার এত বছরের ভালোবাসা হেরে গেল তবে আরজু? আমি তো তোকে বলেছিলাম তুই একবার আমার হয়ে যা সব ছেড়ে দেবো। আমাকে একটা সুযোগও দিলি না।”
“তোর মতন একটা জা'নো'য়া'রের হবো আমি? শোন ফিরোজ, তোর কখনো আমাকে প্রয়োজন ছিলই না। তুই সব সময় সবকিছুর পরে আমাকে প্রাধান্য দিয়েছিস।”
ফিরোজ জোর গলায় বলল,
“ছিল গুরুত্ব। কিন্তু আজ তোর বিয়ের কথাটা শুনে তো আমি আমার জীবনের লক্ষ্যই হারিয়ে ফেললাম। আমি আমার বেঁচে থাকার কারণই হারিয়ে ফেললাম। এভাবে অসহায় বানিয়ে দিলি আমায় আরজু?”
“আমি তোকে অসহায় বানাইনি। তোর জীবনের লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য কোনোটার মাঝে কখনো আমি ছিলামই না। তোর লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা পাওয়া, তারপর আকাঙ্ক্ষা আপাকে খুঁজে বের করা। আর আরমানের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র আমার মন জয় করা, আমার মনে ওনার জন্য ভালোবাসা তৈরি করা। জানি পুনর্জন্ম সম্ভব না। তবে তুই যদি আরো দশটা জন্মও পেয়ে যাস তবুও আরমানের মতন হতে পারবি না। আর সেজন্য তুই কখনো আরজু কেও পাবি না। কল করিস না আমাকে। তোর সাথে কথা বলার রুচি হয় না আমার।”
কথাটা বলে আরজু ফোনটা রাখতে ধরলে আবারো ফিরোজের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। কি ভেবে যেন আরজু ফোনটা কাটল না। মনে হলো ফিরোজের কথাটা শোনা দরকার। আবারো ফোনটা কানে ধরল। ফিরোজ নিস্তেজ গলায় বলল,
“আমি ভেবেছিলাম যে করেই হোক না কেন তোকে ঠিক পেয়ে যাব। তুই তো আমার কাছেই ছিলি সেজন্য হয়তো তোর প্রতি অতটা মনোযোগ দেইনি। আপার খোঁজ পাচ্ছিলাম না সেজন্য বোধহয় ঐদিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছি। তাই বলে ভাবিনি তোকে হারিয়ে ফেলবো আরজু। তোকে ভালোবাসি আমি। তোকে এখনো ভালোবাসি।”
ফিরোজের কন্ঠের অসহায়ত্ব আরজুর মনকে বিন্দুমাত্র নরম করতে পারলো না ফিরোজের প্রতি। বরং তীব্র ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য সমেত বললো,
“অমানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা থাকতে পারেনা, আর যার হৃদয়ে ভালোবাসা থাকতে পারে সে কখনো অমানুষ হতে পারে না। আর আমি বিশ্বাস করি তুই একটা অমানুষ। সুতরাং তোর মনে ভালোবাসা থাকতে পারে না। আর যদিও বা থেকে থাকে ঘৃণা করি সেই ভালোবাসা কে আমি।”
কথাটা বলে আরজু এবারে ফোনটা কেটে দিল। ফিরোজ সেটা বুঝতে পেরে কান থেকে ফোনটা নামালো। হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল ফোনটা। প্রার্থনা এগিয়ে এসে ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কষ্ট হচ্ছে?”
ফিরোজ ছলছল দৃষ্টিতে প্রার্থনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের ওপর কেউ পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। মনে হচ্ছে কি যেন একটা হারিয়ে ফেললাম। মনে হচ্ছে এখন আর বেঁচে থাকারই কোন কারণ নেই আমার কাছে। বিশ্বাস কর প্রার্থনা এতটা কষ্ট এর আগে কক্ষনো হয়নি। আমি যেন কোনদিন বুঝতেই পারিনি যে আমি আরজুকে এতটা ভালোবাসি। ও এইভাবে কেন আমায় কষ্ট দিল রে?”
প্রার্থনা আলতো হেসে বলল,
“আমার বোন আমাকে দেওয়া কষ্টের প্রতিশোধ নিয়েছে। মনে আছে তুমি কিভাবে আমার থেকে আমার ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছিলে? এর থেকেও হাজার গুণ বেশি কষ্ট তুমি আমাকে দিয়েছিলে। আর আজ আমার বোন সেটার প্রতিশোধ নিয়েছে।”
ফিরোজ একটুও রেগে গেল না, বরং এবার একটু কেঁদে উঠে বলল,
“অন্য কোন ভাবে প্রতিশোধ নিতি। এর থেকে ভালো মে'রে ফেলতি আমায় যেমন ফাহিমকে মা'রলি। তাও আরজু কে পর বানিয়ে দিলি কেন?”
প্রার্থনা এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“মৃত্যু তো শাস্তি না। মৃত্যু হলে তো তুমি পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে। তোমাকে তো বেঁচে থেকে অনুভব করতে হবে ভালোবাসাকে না পাওয়ার কষ্টটা ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে। তোমাকে বুঝতে হবে ফিরোজ ভাই, তুমি জীবনে ঠিক কি কি পাপ করেছ। তোমাকে বুঝতে হবে তুমি কতটা সহজে আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছো।”
_________
আরমানের বাড়ির সবাই গ্রামে এসে পড়েছে। আরমান আরজুকে একপ্রকার টেনের নিচে নিয়ে গেল। আরজু নামতেই চাইছিল না। যদি নিচে এত মানুষজন না থাকতো তবে না হয় আরমান কোলে করে নামাতো তবে সেটা তো এখন সম্ভব না। তাই বলা যায় আরজু কে একপ্রকার হাত ধরে টেনেই নামালো। আর টেনে নামানোর সময় আরমান অনুভব করতে পারলো আরজুর শক্তি অনেক। মেয়েটা না খেলেও কম শক্তি না। আরমানের ঘাম বেরিয়ে গেছে আরজু কে টেনে নামাতে।
তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো নিচে আসার সঙ্গে সঙ্গে আরজু খুব ভদ্র হয়ে গেল। চুপচাপ আরমানের পাশাপাশি দাঁড়ালো। আরজু কে দেখতেই সবার আগে জেবা ওর দিকে এগিয়ে এলো। পরিচিত একটা মুখ দেখতেই আরজুর মুখে হাসি ফুটে উঠলো। নিজেই জেবা কে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কেমন আছো কাকি?”
জেবা নিজেও পাল্টা জড়িয়ে ধরে বলল,
“ভালো আছি। আমি তো ভাবিইনি পরের বার যখন তোমার সাথে দেখা হবে তখন একেবারে আমার ছেলের বউ হিসেবে পাবো তোমাকে।”
আরজু জেবা কে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“কাকা কোথায়?”
“তোমার কাকা আসছে। তার তো গ্রামে আসার পর থেকে খোঁজই মিলছে না।"
আরজু হয়তো আরো কিছু বলতো তবে তার আগেই কল্পনা ওর দিকে এগিয়ে এলো।আরজু কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকলো ওনার মুখের দিকে। চিনতে পারলো না। আর যেহেতু চিনতে পারলো না তাই কথা বলার প্রয়োজনও মনে করল না ।
কল্পনা আরজুর থেকে একটা সালাম আশা করেছিল তবে সেটা যখন পেলেন না তখন গম্ভীর গলায় বললেন আরমান কে উদ্দেশ্য করে,
“নিজেও যেমন, বিয়েও করেছে তেমন মেয়েকে। চাচি শাশুড়িকে দেখে একটা সালাম দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না।”
আরমান খুব একটা পাত্তা দিলো না ওনার কথায়। এদিকে ওনার কথা একটুও পছন্দ হলো না আরজুর। আরমান কিছু বলতে নিল তবে তার আগেই আরজু নিজ থেকে বলল,
“আপনি তো পরিচয় দেননি যে আপনি আমার চাচি শাশুড়ি। চিনি না সেজন্য কথা বলিনি।”
“এখন তো চিনলে।”
“ও আচ্ছ। আপনি জোর করেই সালাম নেবেন সেটা বুঝতে পারিনি। আসসালামু আলাইকুম।”
আরজুর কথা শুনে তাশরীফ হেসে উঠলো। কল্পনা চোখ গরম করে ওর দিকে তাকাতেই বেচারা থেমে গেল। কল্পনা এবারে আবারো আরজুর দিকে তাকিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে একের পর এক প্রশ্ন করতেই থাকলেন।
“নাম কি? কোথায় থাকো? কি করো? পড়াশোনা করো নাকি চাকরি বাকরি করো? বাড়ি কোথায়? পরিবারে কে কে আছে? বাবা কি করে? মা কি করে? সত্যিই পরিবারের অমতে বিয়ে করেছো নাকি পরিবারই বলেছিল আবার আরমানকে ধরতে?”
কল্পনার শেষের প্রশ্নটা উপস্থিত কারোরই পছন্দ হলো না। সোফায় চুপচাপ বসা তাওকীর মৃদু বিরক্তিকর গলায় নিজের মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা ঠিকঠাক প্রশ্ন করো।"
কল্পনা বিরক্তিকর গলায় বললেন,
“তুই চুপ থাকতো। কেমন মেয়ে বিয়ে করে আনলো সে সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে না? এই মেয়ে, তোমাকে যে সব জিজ্ঞেস করলাম একে একে উত্তর দাও।”
আরমান এবারে নিজে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“বড় আম্মু একটু ভদ্রভাবে কথা বললে ভালো হয়। আপনার এমন ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত হলেও আরু না।”
আরমান আরও কিছু বলতো তবে তার আগেই আরজু ওকে থামিয়ে দিয়ে সামনে দাঁড়ানো কল্পনার দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলাতেই বলল,
“আপনি অত্যাধিক প্রশ্ন করেন। আপনি অনেক কথাও বলতে পারেন। এত কথা বলতে বিরক্ত লাগে না? আমার তো শুনতেই বিরক্ত লাগছে।”
উপস্থিত সবাই এবারে বিস্মিত নয়নে আরজুর দিকে তাকালো। খুব বেশি কেউ উপস্থিত নেই এখানে। তাওকীর, তানভীর, তাশরীফ, তনুশ্রী, হিমি আর জেবা। আরমান বুঝতে পারলো ওর আরুর তার কে'টে গেছে। জেবা তাড়াহুড়ো করে আরজু কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আরজু উনি আমার বড় জা। সম্পর্কে উনি তোমার বড় আম্মু হয়। এভাবে কথা বলতে নেই।”
আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমি তো কিছু বলিনি কাকি। উনিতো অতিরিক্ত প্রশ্ন করছেন সেটা বললাম। তুমি তো এভাবে বলো না।”
“হ্যাঁ আমি বলিনা এভাবে, কিন্তু সবাই তো এক না তাই না?”
আরজু নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“সেজন্যই তো আমি সবার সাথে এক ব্যবহার করিও না। তুমি ভালো, কিন্তু ওনাকে আমার ভালো লাগছে না।”
আরজু কথাটা বলার সাথে সাথেই জেবা ওর মুখ চেপে ধরে বলল,
“চুপ। এভাবে বলতে নেই। উনি শুনলে কষ্ট পাবে তো। আজ প্রথম দেখা করছো ওনার সাথে এভাবে বলতে নেই মা।”
কথাটা বলে উনি আরজুর মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। আরজু অবুঝের ন্যায় প্রশ্ন করলো,
“তাহলে বলবো না এভাবে কথা?”
“না বলো না। আমার সাথে যেভাবে কথা বলো সেভাবেই কথা বলো।”
আরজু মাথা নাড়িয়ে আবারও কল্পনার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
“কি কি যেন প্রশ্ন করেছিলেন? ভুলে গিয়েছি।”
কল্পনা এবারে তেঁতে উঠে বললেন,
“থাক দরকার নেই উত্তর দেয়ার। তোমার দেমাগ দেখে তো আমি প্রশ্নগুলো নিজেই ভুলে গিয়েছি।"
কথাটা বলে কল্পনা হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। কল্পনা চলে যেতেই এবারে হিমি এগিয়ে এলো আরজুর দিকে। হিমির মুখে লেপ্টে আছে হাসি। কেন যেন হিমি কে দেখেই ভালো লাগলো আরজুর। বুঝতে পারলো হাসিটা নির্ভেজাল।
হিমি এগিয়ে এসে আরজুর গালে আলতো করে হাত রেখে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমি তোমার বড় জা। আমি এই বাড়ির বড় বউ, আর তুমি হলে মেজো বউ। আমি হিমি।”
হিমির ব্যাপারে আরজুর যে বিষয়টা সবথেকে ভালো লাগলো সেটা হলো হিমি নিজ থেকে কোন আজেবাজে প্রশ্নই করেনি শুধু নিজের পরিচয়টা দিল। আরজু নিজেও হাস্যোজ্জ্বল গলায় হিমিকে সালাম দিয়ে বলল,
“আমার নাম আরজু। আমি আরমানের বউ।”
আরজুর কথাটা শুনে উপস্থিত তিনজনে হেসে উঠলো। আরজুর পাশে দাঁড়ানো আরমান হিমির দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“আমার পা'গলি বউ ভাবি।”
ওদের কথাবার্তার মাঝে মিজান হোসেন এবারে তার দুই ভাইকে নিয়ে ভিতরে এলেন। ওদেরকে আসতে দেখে হিমি ধীর কণ্ঠে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“উনি তোমার বড় চাচার শ্বশুর, আর উনি ছোট চাচা শ্বশুর।”
আরজু যেন বুঝেই গেল হিমি ওকে কি বোঝাতে চাইছে। শুধু মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। মহিন হোসেনের সাথে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন দরকার নেই। মিজান হোসেন তাই মুহিব হোসেন কে নিয়ে আরজুর দিকে এগিয়ে এসে নিজেই পরিচয় করে দিলেন,
“ভাইজান, আরজু। আমাদের বাড়ির নতুন বউ।”
আরজু সালাম দিল। সোফার বসা কল্পনা অবাক না হয়ে পারলেন না। মেয়েটা তো আচ্ছা বজ্জাত। সবাইকে সালাম দিল, সবার সাথে ভালোভাবে কথাও বলল শুধু ওনার সাথে বলল না। মনে মনে উনিও ঠিক করলেন এর প্রতিশোধ উনি নিয়েই ছাড়বেন অন্তত উনি যতদিন এখানে আছে এই মেয়েটাকে একটা দিনের জন্য শান্তিতে থাকতে দেবেন না।
মুহিব হোসেন সালামের জবাব দিয়ে আলতো হেসে বললেন,
“তোমার সব থেকে বড় পরিচয় এখন তুমি তালুকদার বাড়ির বউ। আমাদের বাড়িতে কিন্তু আগে একটা মেয়ে ছিল, তনুশ্রী। তারপরে এলো হিমি। তারপর থেকে হলো আমাদের বাড়িতে দুটো মেয়ে। এখন থেকে আমাদের বাড়ির তিনটা মেয়ে। আমাদের হিমি যেমন এই পরিবারটাকে ভালোবাসে তেমনভাবে তুমিও ভালোবেসে আগলে রেখো। তুমিও আমাদের কাছে ভীষণ আদরের।”
আরজু একটু সন্দেহী গলাতে প্রশ্ন করলো,
“আপনারা সবাই আমাকে আদর করবেন? আমি আপনাদের সবার কাছে প্রিয়? সত্যি বলছেন নাকি মন রাখার জন্য বলছেন?”
মুহিব হোসেন সহ উপস্থিত প্রত্যেকে আরো এক দফা ভরকালো। ভ্যাবাচ্যাকার মাঝে পড়লো আরমান। আরমান মুহিব হোসেনকে কিছু বলতে নিলে মুহিব হোসেন হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে আরজুর মাথায় হাত রেখে স্নেহপূর্ণ গলায় বললেন,
“অবশ্যই। তুমি আমাদের সকলের কাছে খুবই প্রিয়। আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি তাওসিফ এই পরিবারের আমাদের সবার সব থেকে আদরের ছেলে। তুমি তার বউ, তবে ভাবতে পারছো তোমার আদর কতটুকু হবে!”
আরজু অবুঝের মত প্রশ্ন করলো,
“কতটুকু?”
“সব কথা বলতে নেই। তুমি বরং বুঝে নিও।”
“কেন? বললে কি হবে?”
“আমি বললে হয়তো তোমাকে বোঝাতে পারবো না। ভালোবাসা, আদর এসব তো পরিমাপ করে বোঝানো যায় না তাই না? এসব তো বুঝে নিতে হয়।”
“ও আচ্ছা এবার বুঝতে পেরেছি। ঠিক আছে বুঝে নেব।”
মুহিব হোসেন আর কিছু বলল না। সবাই যে যার ঘরে চলে গেল বিশ্রাম নিতে। আরমান এবারে আরজু কে টেনে উপরে নিয়ে গেল।
দরজাটা বন্ধ করে আরজু কে বিছানার উপর বসিয়ে নিজে মেঝেতে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো আরজুর সামনে।
“আরু শুনুন, আমি আপনাকে বোঝাই কেমন?”
আরজু মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে বোঝান।”
“আমার পরিবারের সবাই ভালো। শুধু বড় আম্মু মাঝে মাঝে একটু ত্যাড়া কথা বলবে। তবে আপনি কিছু বলবেন না কেমন? আমি আছি তো। আমি যা উত্তর দেওয়ার দিয়ে দেব।”
আরজু বাধ্য মেয়ের মতন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
“আরেকটা কথা, আপনার যা প্রশ্ন, যত ধরনের প্রশ্ন সব আমাকে করবেন। কোন কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে, কোন কিছু নিয়ে সন্দেহ থাকলে আমায় বলবেন। নিচে সবার সামনে তৎক্ষণাৎ বলার দরকার নেই, রাতে ঘরে এসে আমাকে সব বলবেন কেমন? দরকার পড়লে আমি সারারাত জেগে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব। তবে সবাইকে বারবার এভাবে প্রশ্ন করবেন না হ্যাঁ?”
আরজু আবারো বাধ্য মেয়ের মতন মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে, করবো না।”
আরমান হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“এই না হলে আমার পা'গলি! কত সুন্দর আমার কথা শোনে। এই খুশিতে একটা চুমু খাই আরু?”
“না।”
আরজুর উত্তরটা শুনে মুহূর্তের মাঝে আরমানের হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল। চুপসে যাওয়া মুখে বললো,
“সবকিছুতে হ্যাঁ শুধু আমি চুমু খেতে চাইলেই না।”
এবারে আরজু হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“হ্যাঁ। আপনাকে না বলতে আমার ভালো লাগে। আপনি যখন এমনি এমনি মন খারাপ করেন আমার খুব ভালো লাগে। এরপর আপনি বায়না করবেন, আমার সেটাও ভালো লাগে। বারবার আপনাকে না বলতে ভালো লাগে। তবে এখন আমার একটা জিনিস করতে ইচ্ছে করছে। আপনাকে জড়িয়ে ধরি একবার?”
আরমান বিস্ফোরিত নয়নে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্যি?”
আরজু উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
আরমান বসা অবস্থায় দুহাত মেলে বলল,
“এই বুকে যখন ইচ্ছে তখন ঝাপিয়ে পড়তে পারেন আরু। কোন বাধা নেই। আমি সযত্নে আপনাকে আগলে নেব।”
আরজু আর একটুও অপেক্ষা করলো না। সত্যি দু'হাতে আরমানের গলা জড়িয়ে ধরল। আরমানও পাল্টা জড়িয়ে ধরল। আরজু খুব শক্ত করে আরমানকে জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতার গলায় বলল,
“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন আরমান। আজ নিচে সবার ব্যবহার আমার খুব ভালো লেগেছে, শুধু আপনার বড় আম্মু বাদে। আপনি আমাকে যে কত কিছু দিয়েছেন আপনি ভাবতেও পারবেন না। আপনি তো আমাকে গোটা একটা পরিবার দিয়েছেন যেটা আমার কোনদিনও ছিল না।”
আরমান আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“আরো অনেক কিছু দেব আপনাকে আরু। যা যা আপনার জীবনে ছিল না সেই সবকিছু দেব।”
“আচ্ছা।”
ওদের কথা বার্তার মাঝে নিচ থেকে কেউ একজন আরমানকে ডেকে উঠল। বোধ হয় তানভীর ডাকলো। আরমান আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরু ছাড়ুন। নিচে যাই একটু। তানভীর ডাকছে।”
হঠাৎ করে আরজুর কি মনে হলো কে জানে। আরো শক্ত করে আরমান কে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ছাড়বো না। কে গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে আমি না যে ডাকছে সে?”
আরমান কোনরকম কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়া বলল,
“অবশ্যই আমার পা'গলী।”
“তাহলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকুন। যে ইচ্ছে আপনাকে ডাকুক আপনি যাবেন না। আমি তো আপনার আরু, আমি তো আপনার বউ। আপনি আমার কথা শুনবেন।”
আরমান বুঝলো পা'গলীকে ক্ষেপিয়ে লাভ নেই। যদিও আরমান খুব ভালো করেই জানে একটু পরে আরজু নিজেই ছেড়ে দেবে। তাই আর ওকে রাগালো না। আরজুর কথায় সায় জানিয়ে বলল,
“ঠিক আছে এভাবে জড়িয়ে ধরেই বসে থাকব। আপনি আমার আরু, আপনি আমার বউ, আপনার কথাই শুনবো।”
আরমানের থেকে এই সামান্য আস্কারা পেয়ে আরজু ভীষণ খুশি হলো। সেই সাথে আরমানের ধারণা সত্যি হলো। বেশিক্ষণ জড়িয়ে ধরে বসে থাকলো না আরজু। দুই তিন মিনিট পরে আরমানকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“এখন যান। আমার যা পরীক্ষা করার ছিল হয়ে গেছে।”
আরমান উঠে দাঁড়িলো। আরজু এখনো বসে আছে বিছানার উপর। চোখে মুখে তার তৃপ্তির হাসি। আরমান আরজুর দু গালে আলতো করে হাত রেখে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আপনাকে আমি ততটা ভালোবাসি আরু যতটা বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই। বিশ্বাস করুন আপনার প্রতি আমার ভালোবাসার এক শতাংশও মিথ্যে না, কোন ছলনা নেই আমার ভালোবাসায়। আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি।”
আরজু নিজেও পাল্টা হেসে বলতে ধরলো,
“আমিও আপনাকে........”
অর্ধেক বলে থেমে গেল আরজু। বলতে পারল না আর। আরমান বুঝতে পারলো আরজু বলতে পারছে না। জানে পা'গলীটা এসব কথা মুখে বলতে পারে না। কি দরকার মুখে বলার। নিজের আচরণ দিয়ে তো আরজু বুঝিয়ে দেয় যে আরমান কে ও ভালোবাসে। আরজু যে গর্ব করে সবার সামনে বলে ও আরমানের বউ এটাই তো আরমানোর জন্য যথেষ্ট। এবারে আরমান আরজুর দু গালে দুটো চুমু খেয়ে বলল,
“আমি যে আপনার ভালোবাসায় পা'গল সেটা পুরো দুনিয়া জানুক। তবে আপনিও যে আমার ভালোবেসে পা'গলী সেটা আর কারো জানতে হবে না। আমি জানলেই হবে।”