তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৪৯

🟢

আরমান ফোনে মুনতাসির এর সাথে কথা বলছে। বলা যায় এক প্রকার জোড়াজুড়ি করছে মুনতাসিরকে আসার জন্য। মুনতাসির বলছে বিয়ের দিন সকাল সকাল চলে আসবে, কিন্তু আরমান নাছোড়বান্দা। ও জেদ ধরেছে বিয়ের কমপক্ষে তিন দিন আগে আসতে। তাই বলে বিয়ের দিন আসবে এটা কেমন লাগেনা! আরজুরও একটু ভালো লাগবে ওরা এলে।

দুজনের এসব কথাবার্তার মাঝেই হঠাৎ করে কোথায় থেকে যেন আরজু ছুটে এলো। আরমান আরমান বলে ডাকতে ডাকতে কোত্থেকে যেন ছুটে এলো। আরমান হকচকালো। পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখলো আরজু হাঁপাচ্ছে। চোখে মুখে কেমন যেন একটা অস্থির ভাব। আরমান কান থেকে ফোনটা নামিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে আরু? কেউ কিছু বলেছে?”

আরজু তাড়াহুড়ো করে আগে দরজাটা বন্ধ করে ছুটে আরমানের কাছে এগিয়ে এসে বলল,

“আরমান, নিচে ওরা সবাই বলছে আমাকে বিয়েতে লাল শাড়ি কিনে দেবে। আমি পরবো না লাল শাড়ি।”

আরমান যেন অবাক না হয়ে পারল না। এই একটা সাধারণ কথাকে এতটা গুরুতর ভাবে বলার কোনো মানে হয়? এভাবে ছুটে আসারই বা কি ছিল?

“ধুর আরু! এভাবে কেউ ভয় দেখায়? অল্পের জন্য হার্ট এটাক হলো না আমার।”

“কিন্তু আমি লাল শাড়ি পরবো না। আমি বলেছিলাম ওদেরকে আমি পড়বো না, ওরা জোর করছে আমাকে। আপনার তাওকীর ভাইয়ার মা তো উঠে পড়ে লেগেছে আমাকে লাল শাড়ি পরাবেন বলে। আমি পরব না মানে পরবো না। কোনমতেই পরবো না। পরবো না, পরবো না, পরবো না।”

“আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। শান্ত হন। ঠিক আছে পরতে হবে না আপনাকে লাল শাড়ি। দরকার হলে আমার টি-শার্ট পরে আপনি বিয়ে করবেন তবুও শান্ত হন।”

আরজু মোটেই রাগলো না, বরং কেমন যেন বাচ্চাদের মতন জেদ দেখিয়ে বলল,

“না আমি এগুলোর কিচ্ছু পরবো না। আর লাল শাড়িতো আমি কোনদিনও পরবো না, পরবোই না।”

আরমান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে বলুন আপনি কি পরবেন? আপনি যেটা চাইবেন সেই রঙেরই শাড়ি কিনে দেবো আপনাকে।”

মুহূর্তের মাঝে আরজুর মুখে হাসি ফুটে উঠলো। আরমান ততক্ষণে ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসেছে। আরজু গুটি গুটি পায়ে আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“আমি সাদা শাড়ি পরবো। সেই সাদা রঙের মাঝে আর কোন রং থাকবে না, শুধুই সাদা। আর আপনাকে সাদা শেরওয়ানি পরাবো।”

“তো এটা বললেই হলো আমাকে। কিনে দেবো সাদা শাড়ি।”

“কিন্তু ওরা যে বলল লাল কিনে দেবে। ওরা বারবার জেদ করছিল।”

আরমান আরজুর হাতটা ধরে একটানে নিজের পাশে বসিয়ে বলল,

“যে যা ইচ্ছে বলুক না কেন আমার পা'গ'লীর যা পছন্দ আমি সেটাই কিনে দেবো। আমার পা'গ'লী যখন বলছে সাদা পরবে তখন সাদাই পরবে।”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“আপনি খুব ভালো। আমার সব কথাই শোনেন আপনি। আমার সব আবদার রাখেন আপনি। আমি জেদ করলেও রেগে যান না।”

আরমানও পাল্টা হেসে আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“কারণ যখন আমার আরু জেদ করে তখন ওকে দেখতে খুব মিষ্টি লাগে। সেই মিষ্টি মুখের হাসিটা আমি কেড়ে নিতে পারিনা। তাই সব আবদারগুলোও রাখতে হয় আমাকে।”

__________

আগামীকাল আরজুদের বিয়ে। ইতিমধ্যে বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে। বাড়ির সামনে সরু রাস্তাটাও ডেকোরেটরের লোকজন সুন্দর করে লাইট দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যের দিকে মুনতাসিরদের আসার কথা। একটু আগে মুনতাসির কে কল করলে জানালো আর দশ মিনিটের মতন লাগবে ওদের পৌঁছাতে।

খবরটা পেয়ে আরজু আর ঘরের ভেতরে থাকতে পারলো না। আরমানকে টেনে নিয়ে বাইরে এসেছে। একটু এগিয়ে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে আরজু আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরমান, মুনতাসির ভাইয়াদের আমার বাড়ির লোক বলে চালিয়ে দেই?”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও আরমানের মুখ ফসকে হাসিটা বেরিয়ে গেল। ওকে হাসতে দেখে আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“সমস্যা কি? হাসছেন কেন?”

আরমান হালকা করে আরজুর মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,

“এভাবে কেউ বলে পা'গলী? চালিয়ে দেওয়ার কি আছে? মুনতাসির তো এমনিতেই আপনার ভাই।”

“হ্যাঁ মুনতাসির ভাইয়া আমার ভাই, কিন্তু বাকিরা তো আর কেউ না। ওদেরকেও আমার বাড়ির লোক বলে চালিয়ে দিতাম।”

“কোন দরকার নেই। কেউ কি আর আপনাকে আপনার বাড়ির লোক সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করেছে?”

আরজু মনে করার চেষ্টা করে বলল,

“হ্যাঁ, আপনার তাওকীর ভাইয়া জিজ্ঞেস করেছিলো বারবার। শুধু আমার আপার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বুঝিনা ওনার সমস্যাটা কি। ভালো লাগে না আমার ওনাকে।”

“সেটা তো জানি। বলেছিলেন আপনি। আর কেউ জিজ্ঞেস করেছিল?”

“হ্যাঁ, আপনার তাওকীর ভাইয়ার মা জিজ্ঞেস করেছিল।”

আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কবে? আমায় তো আপনি কিছু বলেননি?”

“হ্যাঁ আপনাকে বলিনি। আপনার তাওকীর ভাইয়ার বাবাকে গিয়ে বলে দিয়েছিলাম।”

আরমান বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে বলল,

“আপনি বড় আব্বুকে গিয়ে বলে দিলেন! “

আরজু গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“হ্যাঁ। তো কি করতাম? যার বউ তাকেই তো বিচার দিতে হবে। আপনার বউ কিছু করলে তো সবাই এসে আপনাকেই বলবে, ওনার বউ আমাকে বিরক্ত করছিল তাই ওনাকে গিয়ে বলে দিয়েছি।”

“তাই বলে আপনি এত সহজে বলে দিলেন! কি বলেছিলেন গিয়ে?”

“বলেছিলাম ওনার স্ত্রী আমাকে বিরক্ত করছে। বারবার আমার বাবার বাড়ির কথা তুলে আমাকে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। আরো বলেছিলাম উনি ইচ্ছে করে আমার সাথে ঝগড়া করতে চাইছেন।”

“বড় আব্বু কি বলেছিল?”

“উনি বলেছিলেন উনি সামলে নেবেন।”

“তারপর আর কিছু করেছিল বড় আম্মু?”

“না, আর কিছু করেনি।”

আরমান ফোঁস করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

“যাক বাঁচা গেল। আপনি ভাবতেও পারবেন না বড় আম্মু কতটা ভয়ংকর। আপনার এই কাজটা করার পর তো ওনার আরো ভয়ংকর হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।”

আরজু আরো কিছু বলতে চাইলো তবে পারলো না। তার আগেই দূর থেকে মুনতাসিদের আসতে দেখল। মুমতাসির নিজের পুরো পরিবার কে নিয়েই এসেছে। ওর মা, বোন, ইরা সবাই এসেছে।

অবাক করার বিষয় হলো ওদেরকে দেখতেই আরজুর মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। মুনতাসিররা আরেকটু কাছাকাছি আসতেই আরজু দৌড়ে গিয়ে আগে ইরাকে জড়িয়ে ধরলো, যেন মনে হলো কতদিন পর নিজের কাছের কোন মানুষকে দেখল।

আরমানের পরিবারের সবাই ভালো, তবে ওদের সবার সাথে পরিচয় আরমানের সূত্র ধরে। তবে ইরা আর মুনতাসির সবাই আরজুর চেনা।

ইরাকে জড়িয়ে ধরে আরজু উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“তোমরা আগে কেন আসোনি? আমি খুব খুশি হয়েছি তোমরা এসেছো জন্য।”

ইরাও পাল্টা জড়িয়ে ধরে বলল,

“আমিও তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি।”

এবারে ইরাকে ছেড়ে দিয়ে আরজু মুনতাসিরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“আপনি এত দেরি করে এলেন কেন ভাইয়া? জানেন ওরা সবাই আমার বাড়ির লোকের খোঁজ করছিল। আমি তো কাউকে বলতে পারছিলাম না আমার বাড়ির লোকের কথা। তবে এবার আপনাকে দেখিয়ে বলবো যে এটা আমার ভাইয়া।”

মুনতাসির আরজুর মাথায় হাত রেখে স্নেহপূর্ণ গলায় বলল,

“ঠিক আছে বলো। আসলে ভুলটা বোধহয় আমারই হয়ে গেল তাই না? দেরি করে এসেছি।”

“কোন ব্যাপার না। এতদিন আরমান সব সামলে নিয়েছে।”

আরজু এবারে একে একে মৃন্ময়ী আর রুবিনা খাতুনের সাথেও কথা বলল। তারপর সবাইকে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

বাড়ির দরজায় আসতেই সবার প্রথমে তানভীর আর তনুশ্রীর সাথে ওদের দেখা হলো। তানভীর মুনতাসির কে দেখেই ভ্রুঁ কোঁচকালো।

বিস্ময় ভরা কন্ঠে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুই এখানে কেন?”

মুনতাসির বা আরমান কারোরই বুঝতে বাকি রইল না তানভীরের বিস্ময়ের কারণ। তবে বিষয়টা মোটেই ভালো লাগলো না আরজুর। গম্ভীর গলায় বলল,

“আমার ভাই এসেছে তোমার কি? কোনো সমস্যা? তুমি যখন এসেছিলে তোমাকে কি আমি এই প্রশ্নটা করেছিলাম?”

“আমার বাড়িতে আমি এসেছি তুমি কেন আমাকে প্রশ্ন করবে?”

“এটা আমারও বাড়ি তারমানে আমার ভাইয়েরও বাড়ি। তুমি একদম আমার ভাইয়ের সাথে এভাবে কথা বলবে না।”

তানভীর পিছনে তাকিয়ে দেখলো মুনতাসির এর সাথে ওর পরিবারের লোকজনও আছে। হঠাৎ করে মনে হলো ওর পাশে তনুশ্রী দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াহুড়ো গলায় তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তনুশ্রী, তুই মুনতাসিরের বাড়ির লোকজন কে নিয়ে ভিতরে যা তো। আমার একটু ওর সাথে কথা আছে।”

তনুশ্রী বেশ মিশুকে। ওদের সাথে মিশতেও কোনো অসুবিধা হলো না। চলে গেল ভেতরে। তানভীর ভ্রুঁ কুঁচকে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমিও যাও। তুমি এখানে থেকে কি করবে?”

“যাব না। আমি আমার ভাইয়াকে নিয়েই ভিতরে যাব। তুমি ভিতরে যাও।”

তানভীর এবারে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর বউকে ভিতরে যেতে বল তাওসিফ।”

আরমান পাল্টা রাগী গলায় বলল,

“একদম আমার বউয়ের সাথে এভাবে কথা বলবি না তানভীর। আমার আরুর সাথে কেউ এভাবে কথা বলুক আমার সেটা মোটেও পছন্দ না। ভদ্রভাবে কথা বল। সেটা হোক সম্পর্কে খাতিরের কিংবা আমার বউ হিসেবে।”

আরজু তানভীরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। মনে মনে ভাবলো,

“আরমানের সামনে আমাকে অপমান করা! দেখিয়ে দিল না নিজের জায়গাটা।”

আরজু এবারে মুনতাসির কে বলল,

“ভাইয়া, চলুন ভেতরে যাই। যার তার সাথে কথা বলতে নেই।”

আরজু মুনতাসির কে নিয়ে ভিতরে যেতে ধরলে তানভীর পথরোধ করে দাঁড়ালো। এবারে আরজুর কে কিছু না বলে সরাসরি মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“শোন, এসেছিস ভালো কথা কিছু বললাম না......”

তানভীরকে নিজের কথা শেষ করতে না দিয়ে আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“তোমার কিছু বলায় এখানে কিছু হবেও না।”

আরজুর পাশে দাঁড়ানো আরমান মিনমিনে গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“একটু থামুন আরু। একটু তো ওকে কথা বলতে দিন।”

“ও আমার ভাইয়ার সাথে এভাবে কথা বলছে কেন? বাড়িতে আসা অতিথিকে আপনারা এভাবে অপমান করেন?”

মুনতাসির বুঝলো আর একটু যদি তানভীর কিছু বলে তবে আরজু কে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নিজে থেকেই তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

বিজ্ঞাপন

“দেখো তানভীর, তোমার সাথে ঝামেলা করার জন্য ভার্সিটি পড়ে আছে। আমি এখানে এসেছি আমার বোনের বিয়ের উদ্দেশ্যে তাই বলছি অযথা কোন ঝামেলা করো না।”

তানভীর খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“তোর সাথে ঝামেলা করার আমারও কোনো ইচ্ছে নেই।।”

আরমান এবারে তানভীরকে ধমক দিয়ে বলল,

“একটা থা'প্পর দেব এবার তোকে তানভীর। সমবয়সী ঠিক আছে কিন্তু মুনতাসির যেখানে সম্মান দিয়ে তোকে তুমি বলে ডাকছে সেখানে তুই বারবার তুই তুকারি করছিস কেন? তোকে সামলানোর জন্য কিন্তু আমি একাই যথেষ্ট তবে আমি এখানে ঝামেলা করতে চাই না। তাই আমায় বাধ্য করিস না বড় আব্বু কিংবা তাওকীর ভাইকে ডাকতে।”

তানভীর এবারে বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আরে আমাকে আমার কথাটা তোরা কেউ সম্পূর্ণ করতে দিবি?”

মুনতাসির ইশারায় আরমানকে থামতে বলে নিজে আবারো বিনম্র গলায় তানভীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ঠিক আছে, বলো তুমি কি বলবে।”

তানভীর এবারে আঙ্গুল উঁচিয়ে মুনতাসিরকে শাসিয়ে বললো,

“এসেছিস ভালো কথা তবে তোকে যেন তনুশ্রীর আশেপাশে না দেখি। ভুলেও তনুশ্রীর দিকে নজর দিবি না।”

মুনতাসির প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তনুশ্রী কে?”

“এত সাধু সাজার দরকার নেই। ওকে তো বিয়ে করার জন্য লাফাচ্ছিলি আবার এখন এমন ভাব দেখাচ্ছিস যে চিনিসই না।”

মুনতাসির বুঝলো তানভীরের সাথে কথা বলে লাভ নেই। সরাসরি আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরমান ভাই, তনুশ্রী কে? ও কার কথা বলছে?”

আরমান ইতস্তত গলায় বলল,

“আমার বোনের নাম।”

“তো আমি ওনার দিকে তাকাবো কেন?”

আরমান একহাতে মাথা চুলকে বলল,

“আসলে আমার ইচ্ছে ছিল তনুশ্রীর সাথে তোমার বিয়ে দেওয়ার, কিন্তু তুমি তো আগেই বিয়ে করে নিয়েছো। সেই কথাই তানভীর বলছে।”

আরমানের কথাটা শেষ হতেই তানভীর আবারও মুনতাসির কে শাসিয়ে বলল,

“শুনেছিস তো। এখন এই কথাটা ভালোমতো মাথায় ঢুকিয়ে রাখ, তনুশ্রীর সাথে কথা বলা তো দূর ওর দিকে চোখ তুলেও তাকাবি না।”

তানভীর ভেবেছিল ওর এভাবে শাসানোর প্রেক্ষিতে মুনতাসিরও ওকে পাল্টা শাসাবে কিংবা কড়া গলায় কিছু বলবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরাবরের মতন স্মিত হেসে বলল,

“নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। আমি মানুষ হিসেবে কেমন সেটা তুমি না জানলেও আরমান ভাই নিশ্চয়ই জানেন। যদি আমায় নিয়ে এই ধরনের কোন ভয় থাকতো তবে আমি জানি আরমান ভাই কখনো আমাকে এখানে ডাকতেনই না। আর সব থেকে বড় কথা আমার সাথে আমার স্ত্রী আছে। আমার স্ত্রীর উপস্থিতি তে কিংবা অনুপস্থিতিতে অন্য কোন নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর কথা আমি ভাবতেও পারি না। এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমার না।”

মুনতাসিরের এত বিনয়ী কন্ঠে তানভীর একটু দমে গেল। কন্ঠটা এবার পূর্বের থেকে নরম করে বলল

“ঠিক আছে, ঘরে যা।”

এবারে ঘরের ভেতরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো ওরা। আরমান আর মুনতাসির আগে গেল। আরজু ওদের পেছনে থাকলো। যাওয়ার আগে ও নিজে তানভীর কে শাসিয়ে বলল,

“আজ প্রথমবার জন্য কিছু বললাম না। আর যদি কখনো আমার ভাইয়ের সাথে এরকম ব্যবহার করতে দেখেছি সরাসরি গিয়ে তোমার বাবাকে বলে দেব। তোমাকে সোজা করার জন্য তোমার বাবা কিংবা আরমান কে যদিও দরকার নেই, আমি একাই যথেষ্ট। ভার্সিটিতে একবার খোঁজ নিয়ে দেখো কতজন বেয়াদব ছেলে আমার হাতে চ'ড় খেয়েছে। আর তাছাড়া তনুশ্রী তো আছেই।”

কথাটা বলা আরজু ভেতরে চলে গেল। সব কথা ঠিক ছিল তবে শেষের কথাটায় তানভীর একটু চমকালো। হঠাৎ করে তনুশ্রীর ভয় কেন দেখালো আরজু?

_________

সোফায় বসে কাঁদছে ফারিহা। ফাহিম মা'রা যাওয়ার খবরটা আজ বাড়ি ফিরে পেল। ফিরোজ ওকে খবরই দেয়নি। খবর দেওয়ার মতন কোন পরিস্থিতিও ছিল না। তখন যদি ফারিহা কে খবর পাঠাতো তবে অনেকটা দেরি হয়ে যেত ফারিহা কে আনতে আনতে। ততটা সময় ফিরোজের লা'শটা এভাবে রাখা নিরাপদ মনে হয়নি।

যত তাড়াতাড়ি ফাহিম কে কবর দিতে পারতো ততই ভালো হতো। মাঝখানে তিন-চার দিন কেটে গেছে তাও খবরটা দিতে পারেনি। কেননা খবর দেওয়ার মতন পরিস্থিতিতে ছিল না। যবে থেকে খবর পেয়েছে আরজুর বিয়ে তবে থেকে কেমন যেন ঘর বন্দি হয়ে গেছে ফিরোজ। কোন কিছুই আর টানে না ওকে।

দলের লোকজন এসে মাঝে মাঝে ডেকে যায়, দেখা করতে আসে তবে ফিরোজ সেসবে পাত্তা দেয় না।

ফারিহার সাথে আজ ওর মা মানে ফাহিমের প্রথম স্ত্রীও এসেছে। প্রার্থনার কাছে অপরিচিত না মিতা। বেশ অনেকগুলো বছরই মিতাকে ফাহিমের সাথে সংসার করতে হয়েছে, সে বাধ্য হয়েই হোক আর যাই হোক। সেই সূত্র ধরে প্রার্থনা সহ বাকিদের সাথেও যথেষ্ট ভালো পরিচয় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মিতা মুক্তি পেয়েছিল এই সংসার থেকে। আর তার পেছনে একটা বিরাট বড় ভূমিকা পালন করেছিল ফিরোজ।

বলা যায় যদি ফিরোজ সাহায্য না করতো তবে মিতা এই সংসার থেকে কখনো বের হতে পারত না। তবে যখন খবর পেয়েছিল যে ফাহিম প্রার্থনা কে বিয়ে করেছে তখন মনে হয়েছিল মিতা বোধহয় সংসার থেকে না বেরোলেই পারতো। ওর জীবনটা তো শেষ হয়েই গিয়েছিল অন্তত প্রার্থনার জীবনটা বেঁচে যেত।

ফারিহা এসেছে সেই খবরটা পেয়েও ফিরোজ বেরোয়নি ঘর থেকে। প্রার্থনার মিতার সামনে দাঁড়াতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। যে মানুষটাকে এক সময় ভাবি বলে ডাকতো আজ সেই মানুষটার সাথে প্রার্থনার সম্পর্ক গিয়ে দাঁড়িয়েছে সতীনে। কি অদ্ভুত তাই না!

প্রার্থনার অস্বস্তিটা বোধহয় মিতা একটু বুঝতে পারল। নিজ থেকে প্রার্থনার দিকে এগিয়ে গিয়ে আলতো হেসে বলল,

“তুই এভাবে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আছিস কেন প্রার্থনা? তোর তো কোন দোষ নেই।”

প্রার্থনা অস্বস্তি মাখানাে গলায় বলল,

“আসলে ভাবি, আমাদের সম্পর্কটা কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। তোমার চোখের চোখ রাখতে আমার লজ্জা লাগছে।”

“ধ্যাত পা'গলী! তুই আগেও যেমন আমার কাছে আমার বোনের মতন ছিলি এখনো তেমন আছিস। মাঝে শুধু একটা শয়তানের কুদৃষ্টি পড়ে গিয়েছিল তোর ওপর। তবে এখন তো তুই মুক্ত। শোন, আমার মতন ভুল করিস না। নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর।”

প্রার্থনা মলিন হেসে বলল,

“আমার জীবনে গোছানোর মতো আর কি বা বাকি আছে। সব শেষ ভাবি। আমার গায়ে কলঙ্ক লেগে গেছে ওই জানোয়ারটার বউ হিসেবে। কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাব না।”

“নিশ্চয়ই পাবি। তোকে শান্তি দেওয়ার জন্যই হয়তো ফাহিমের ম'র'ন হলো। ফিরোজ কোথায় রে?”

“ফিরোজ ভাই তো ঘরে। কয়দিন হলো ঘর থেকে বেরই হয় না। আমি খাবার দিয়ে আসি, ঠিকমতো খায় কিনা জানিনা।”

মিতা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“ওর হঠাৎ করে কি হলো? ভাইয়ের মৃ'ত্যুর শোক নিশ্চয়ই পালন করবে না।”

“আরে না। আরুর বিয়ের খবর শোনার পর থেকে এমন মনম'রা হয়ে গেছে।”

মিতা চমকে উঠে বলল,

“আরজু বিয়ে করেছে! কবে?”

“এইতো কয়েকদিন হলো।”

মিতা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলল,

“যাক, আরজুর জীবন বেঁচে গেছে। আচ্ছা তুই থাক, আমি একটু ফিরোজের সাথে দেখা করে আসি।”

এ বাড়ির কোন কিছুই অপরিচিত না মিতার কাছে। ফিরোজের ঘরটা চিনতেও তাই অসুবিধা হলো না। গিয়ে দেখলো দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। একবার ফিরোজের নাম ধরে ডাকলো। ভেতর থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না। মিতা আবারো ডাকলো,

“ফিরোজ, আমি মিতা। কথা আছে তোমার সাথে। দরজাটা খোলো।”

কিছুটা সময় পর ফিরোজ এসে দরজাটা খুলে দিল। ফিরোজের চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। কে জানে না ঘুমোনোর জন্য নাকি কাঁদার জন্য। চুল গুলো কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। অগোছালো ফিরোজ যেন আরেকটু বেশি এলোমেলো হয়ে গেছে।

মিতাকে দেখে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো,

“তোমার এখানে কি প্রয়োজন?”

“কিছু কথা ছিল তোমার সাথে। চলো ভিতরে গিয়ে কথা বলি।”

অনিচ্ছা সত্বেও ফিরোজ আসতে দিলো মিতাকে ভেতরে। মিতা যখন বলেছে দরকারি কথা তাহলে আসলেই কথাটা দরকারি। কেননা অযথা গল্প করতে আসবে না মিতা ফিরোজের সাথে।

মিতাকে ঘরের ভিতর নিয়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে প্রশ্ন করলো,

“কি কথা?”

“তুমি জানো ফিরোজ, আমার প্রতি যেমন তোমার কৃতজ্ঞতা আছে ঠিক তেমনি তোমার প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা আছে। তুমি আমাকে ওই জানোয়ারের সংসার থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করেছো।”

“আর তো কোন উপায় ছিল না। আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছো।”

“আর কি করতাম বলো? তোমার দুর্বলতা না থাকলে আমায় সাহায্য করতে না। তুমি তো স্বার্থপর।”

“এত কথা বলে লাভ নেই। কি বলতে এসেছো সেটা বলো।”

মিতা একটু সময় নিয়ে বলল,

“ফারিহা আমার নিজের মেয়ে না ঠিকই তবে সেই ছোট্টবেলা থেকে আমি ওকে বড় করে তুলেছি নিজের মেয়ের মতন করে। তুমি আর আমি বাদে এই কথাটা কেউই জানে না, এমনকি ফাহিম নিজেও জানত না যে ফারিহা ওর মেয়ে না।”

মিতাকে আর এগোতে না দিয়ে ফিরোজ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“এসব কথা তো আমি এখন শুনতে চাইছি না। এমনও না যে এসব কথা আমার অজানা।”

“হ্যাঁ জানি, তবে তাও তোমাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিলাম।”

“কি বলতে চাইছো সরাসরি বলো।”

“ফারিহা কে এখানে রেখোনা। যদি তুমি ওর একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ চাও তবে ওকে এই গ্রামে রেখো না। শুধু এই গ্রামে না আমি বলবো তোমার আশেপাশেই ওকে রেখো না।”

“কি বলতে চাইছো আমি আমার আম্মার বিপদের কারণ হবো?”

মিতা স্বাভাবিক গলায় বলল,

“তুমি নিজেও খুব ভালো করেই জানো যে যদি ফারিহার বিপদ হয় তবে সেটা তোমার কারণেই হবে। তোমাদের মতন সন্ত্রাসীদের জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। কে কখন কোথায় মে'রে রাখবে তোমরা নিজেও জানো না, ঠিক যেমন ফাহিম ম'রলো।”

মিতা কথাটা বলতেই ফিরোজ কেমন যেন একটু সতর্ক হয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলো,

“ফাহিমের মৃত্যুটা আকষ্মিক ছিল। ওকে কেউ মা'রেনি, এমনি ম'রেছে।”

“আমাকে বোকা বানিয়ো না। ও যদি এমনি এমনি ম'রতো তবে তুমি এত তাড়াহুড়ো করে ওকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে না। এই কয় বছরে তোমাদের সাথে থেকে এতটুকু অন্তত বুদ্ধি হয়েছে আমার ফিরোজ।”

ফিরোজ আর এই নিয়ে কোন কথাই বাড়াতে চাইলো না। কেননা কথায় কথায় না জানি কখন আবার প্রার্থনার নাম উঠে আসে যেটা ফিরোজ চায় না।

“কথাটা সম্পূর্ণ করো আম্মা কে নিয়ে।”

“ফারিহা কে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দাও, প্রার্থনার সাথে। ঠিক যে কারণে তুমি ফাহিমের সাথে প্রার্থনার বিয়েটা দিয়েছিলে সেটাতো এখনো পূরণ করা সম্ভব। তুমি চেয়েছিলে ফারিহার দায়িত্বে যেন বিশ্বস্ত কেউ থাকে। আমি চাইলে ফারিহা কে আমার কাছে রাখতে পারি সারা জীবন তবে ওর ভবিষ্যত ভালো হবে না ফিরোজ। আমার আশেপাশে থাকা মানেই অনেক নোংরা মানুষরা থাকবে হয়তো সেখানে। কেননা আমি একসময় ফাহিমের বউ ছিলাম। তাই বলছি প্রার্থনার সাথে ওকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দাও। ওদের দুজনের ভবিষ্যৎ টাই সুন্দর হবে।”

“আর আমার কি হবে? কেউ তো নেই আমার। আম্মাকেও পাঠিয়ে দেবো দূরে।”

“তোমাদের মতন মানুষদের কেউ থাকেও না। তোমরা কারোর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যই না। আরজুও তোমার হাত ছাড়া হয়ে গেল এজন্য।”

মিতা কথাটা বলার সাথে ফিরোজ অগ্নিদৃষ্টি তে ওর দিকে তাকিয়ে সাবধানী গলায় বলল,

“ভুলেও আরজু কে নিয়ে কোন কথা তুলবে না।”

মিতা তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“কেন গায়ে লাগছে? শুনতে তো তোমাকে হবেই ফিরোজ। কত মানুষের ভালোবাসা তার থেকে কেড়ে নিয়েছো, কত মানুষের সুখের জীবন তার থেকে কেড়ে নিয়েছো। এই গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ তোমাদের দুই ভাইয়ের অশান্তিতে ঠিকমতো বাঁচতে পারে না। সারাদিন ভয়ে ভয়ে কাটাতে হয়। সেখানে তুমি ভালো থাকবে তোমার প্রিয় মানুষকে নিয়ে ভাবলে কি করে?”

“অকৃতজ্ঞ হচ্ছো? তোমাদের তো কাজই তাই। ভুলে যেওনা যদি ফিরোজ সাহায্য না করতো তবে আজও তুমি ফাহিমের হাতে মা'র খেতে।”

“সাহায্যটাও কিন্তু তুমি তোমার স্বার্থেই করেছিলে। কেননা ফারিহার আসল পরিচয়টা আমি জানতাম। ফারিহা আমার আর ফাহিমের মেয়ে না সেটাও আমি জানতাম। আর এই কথাগুলো লুকোনোর জন্যই তুমি আমায় সাহায্য করেছিলে। তাই ভেবো না আমায় সাহায্য করার জন্য আমি তোমায় মহান ভাববো। যদি ফারিহার ব্যাপারটা না থাকতো তবে আমি এখানে ফাহিমের হাতে মা'র খেতে খেতে ম'রে গেলেও তুমি আমায় সাহায্য করতে না।”

ফিরোজ রাগান্বিত গলায় মিতা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বেরিয়ে যাও। আর কোনদিন আমার চোখের সামনে আসবে না।”

“যাচ্ছি চলে। তবে আমার কথাটা মাথায় রেখো, যদি সত্যি ফারিহা কে ভালোবেসে থাকো, যদি সেই মানুষটাকে দেওয়া কথা রাখতে চাও তুমি, তবে ফারিহা কে প্রার্থনার সাথে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দাও। এমন কোথাও পাঠিয়ে দাও যেখানে তোমার ছায়াও ওদের জীবনে আর থাকবে না।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প