গ্রামে আসতে না আসতেই সবাই অনুষ্ঠানের তোড়জোড়ে লেগে পড়েছে। মিজান হোসেনরা তিন ভাই বেরিয়ে পড়েছেন গ্রামের সবাইকে বিয়ের দাওয়াত দিতে। ওনারা ঠিক করেছে নিজেরাই সবার বাড়ি গিয়ে বউ ভাতের কার্ড দিয়ে আসবেন। আর বাদ বাকি যারা দূরের আত্মীয় কিংবা গ্রামের বাইরে থেকে যাদেরকে দাওয়াত দিতে হবে তাদের কাছে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে তাওকীর, তানভীর আর তাশরীফের উপর। তাশরীফ কে দায়িত্ব দেওয়া আর না দেওয়া সমান। তাই সবশেষে ঠিক হয়েছে তাশরীফ তাওকীরের সাথে সাথে থাকবে। তানভীরের আবার কাউকে প্রয়োজন নেই। সে একাই একশ।
দুপুরের পর পর বিকেলের একটু আগে যে যার কাজ মতো বেরিয়ে গেল। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর তানভীর বেরোবে। আরমান কোথায় যেন একটা বেরিয়েছে। আরজুর ঘরের ভেতরে একা একা ভালো লাগছে না। তনুশ্রী কে খুঁজলো, পেল না। আমেনা বেগমকে জিজ্ঞেস করলে উনি জানালেন তনুশ্রী নাকি বাইরে গেছে।
আরজু ওকে খুঁজতে নিজেও বাইরে গেল। বাইরে গিয়ে দেখলো তনুশ্রী তানভীর এর সাথে কথা বলছে। আরজু এগিয়ে গিয়ে তনুশ্রীর নাম ধরে ডাকলো একবার।
“তনুশ্রী!”
আরজুর কন্ঠটা কানে যেতেই তনুশ্রী কেঁপে উঠলো। হুট করে ওর কেঁপে ওঠার কারণটা আরজুর ঠিক বোধগম্য হলো না।
“কেঁপে উঠলে কেন? আমি তো ভয় দেখাইনি তোমায়।”
তনুশ্রী খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“আসলে ভাবি হঠাৎ করে ডেকেছো তো তাই। হ্যাঁ বলো না কি বলবে তুমি।”
“কোথাও যাচ্ছো নাকি?”
“হ্যাঁ ভাবি। আসলে তানভীর ভাইয়া একা একা যাচ্ছে তো তাই ভাবলাম আমিও যাই।
বাড়িতে ভালো লাগছিল না।”
তনুশ্রী কথাটা বলতেই তানভীর ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি ওঠ তো। তোর জন্য এত অপেক্ষা করতে পারব না।”
তানভীর কথাটা বলতেই আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“বাইকে যাবে একসাথে তোমরা?”
তানভীর বলে উঠলো,
“হ্যাঁ যাবো, তো?”
আরজু এবারে তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি উঠবে ওর বাইকে?”
“হ্যাঁ উঠবো। সমস্যা কি? আমি তো অনেকবারই উঠেছি।”
“ওহ্! তার মানে মাঝে মাঝে তোমাকে ও বাইকে তুলতে চায়?”
তনুশ্রী জোরপূর্বক হেসে বলল,
“হ্যাঁ।”
আরজু তাকালো তানভীরের দিকে। বলা যায় তানভীর একটু বিরক্তই হলো। মৃদু বিরক্তিকর গলায় তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোর ভাই কোথায় রে? বউকে রেখে যায় কোথায়?”
আরজু এবারে সরাসরি তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“জানো তনুশ্রী তোমার ভাইও আমাকে শুধু ওর বাইকে তুলতে চাইতো। তবে আমি উঠতাম না। কারণ আমার তোমার ভাইয়ার উদ্দেশ্যে ভালো লাগত না। এই ছেলেটা ভালো না তুমি জানো?”
আরজুর মুখ থেকে এমন কথা শুনে তনুশ্রী ভ্যাবাচ্যাকা খেল। অবাক হলো তানভীরও। বিস্ময় সমেত বলল,
“এই মেয়ে কি করেছি আমি তোমার সাথে যে আমাকে খারাপ বলছো? বিয়ে দিলাম তোমাদের তারপরও তুমি আমাকে খারাপ বলছো? আচ্ছা অকৃতজ্ঞ মেয়ে তো তুমি।”
“তুমি সাহায্য না করলে আরমান ঠিক অন্য কোন ব্যবস্থা করে নিতো। যাই হোক তুমি নিজেই বলো তুমি কি খুব ভালো? তুমি কি আমাকে ভার্সিটিতে বিরক্ত করোনি? দুদিন আমার পথ আটকিয়ে আজেবাজে প্রশ্ন করেছো। জানো তনুশ্রী, ও তোমার ভাইয়ার নামে অনেক আজে বাজে কথা বলে। এই জন্য ওকে আমার একদম পছন্দ না।”
তানভীর মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
“দরদ উতলে পরছে।”
তানভীর বিড়বিড় করে কথাটা বলেছিল যেন আরজু শুনতে না পায়। তবে আরজু শুনলো। সরাসরি তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখেছ তনুশ্রী আমি তোমায় বলেছিলাম না এই ছেলেটা খুব একটা ভালো না। আমি আরমান কে বলে দেব যে ও তোমাকে নিজের বাইকে তুলতে চাইছিল।”
তানভীর রাগান্বিত গলায় তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোর ভাবি কি পা'গল তনুশ্রী? এ তো আমার মাথাটা ঘুরিয়ে তুলল। তাওসিফ কোথায় ওকে আগে ডাক।”
তনুশ্রী চোখ গরম করে তানভীরের দিকে তাকাতেই তানভীর থেমে গেল। তনুশ্রী শান্ত গলায় আরজু কে বুঝিয়ে বলল,
“ভাবি, তানভীর ভাইয়া তো আমার চাচাতো ভাই হয়। খারাপ উদ্দেশ্য কেন থাকবে বলো? আমি গেলে কোন সমস্যা হবে না।”
আরজু একটু চমকালো। বেশ অনেকক্ষণ বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তনুশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকলো। অনেকক্ষণ পর বলল,
“এই ছেলেটা তোমার চাচাতো ভাই হয়?”
তনুশ্রী এবারে জোরপূর্বক হেসে বলল,
“হ্যাঁ।”
“ও আচ্ছা। আমি আসলে ভুলে গিয়েছিলাম। এত সম্পর্ক, আত্মীয়-স্বজন তো তাই আমার মনে থাকে না, আসলে ভুলে গেছি। আচ্ছা ঠিক আছে যাও তুমি। আমি ঘরে যাই।”
কথাটা বলে আরজু সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। চুপচাপ ঘরে চলে গেল।
তানভীরের যে এখন আরজুর সাথে ঠিক কি করতে ইচ্ছে করছে নিজেও ভেবে পাচ্ছে না। মাথায় আ'গু'ন জ্ব'ল'ছে। তেঁতে উঠে কিছু বলতে নেবে তবে তার আগেই তনুশ্রী ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
“ওভাবে কথা বলছিলে কেন আমার ভাবির সাথে? আর তুমি ভাবিকে বিরক্ত করো ভার্সিটিতে? কয়জন মেয়েকে বিরক্ত করো এভাবে? আর তোমাকে বলেছিলাম না আমার ভাইয়ার নামে আজেবাজে কিছু কথা বলবে না।”
মুহূর্তের মাঝে তানভীর শান্ত হয়ে গেল। মিনমিনে গলায় বলল,
“মাথা গরম করে দিচ্ছিল যে তোমার ভাবি কি করতাম?”
“মাথা ঠান্ডা রাখবে। মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না সেই আবার আমার ভাইকে অসভ্য বলো। অসভ্য তো তুমি। বেয়াদব একটা।”
“প্লিজ তনুশ্রী, তুমি তাওসিফ এর জন্য আমার সাথে ঝগড়া করবে না। আর যার জন্য যা ইচ্ছে করো কিন্তু তাওসিফ না। তুমি জানো আমি ওকে সহ্য করতে পারিনা।”
“আমার ভাইকে সহ্য করতে না পারলে আমি তোমাকে আগেও বলেছি আমাদের সম্পর্কটা এগোবে না। আমার ভাই না চাইলেও এই সম্পর্কটা এগোবে না। তাই বলছি এমন কিছু করোনা যেন আমাদের সম্পর্কে ভাইয়া দ্বিমত পোষণ করে।”
“ঠিক আছে ঠিক আছে। সে দেখা যাবে এখন উঠো।”
চলে গেল তনুশ্রী সেখান থেকে। তনুশ্রীরা চলে যেতেই আরজু আবারও সেখানে এলো। অনাকাঙ্খিতভাবেই তনুশ্রী আর তানভীরের কথোপকথন আরজু শুনে ফেলল। আরজুর শোনার ইচ্ছে ছিল না।
তখন তো হঠাৎ করে তনুশ্রী যখন বলল যে তানভীর ওর চাচাতো ভাই আর আরজুর যখম সবটা স্মরণে এলো তখন একটু অস্বস্তি অনুভূত হচ্ছিলো। তাই চটপট সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। না হলে আরজুর উদ্দেশ্য তো ছিল এখন আরমানকে খোঁজা। সেজন্যই দরজার কাছে গিয়ে থেমে গিয়েছিল। ভেবেছিল তনুশ্রী চলে গেলে আরজু বেরোবে। সেই সুযোগেই তানভীরের কথাগুলো কানে এলো।
বেশ অনেক কিছুই বুঝতে পারলো আরজু। তবে যাই হোক সেসব কথা এখন ভেবে লাভ নেই। আরজুর এখন দরকার আরমানকে।
আরমান কোথায় আছে আরজু কিছুই জানে না। গ্রামের রাস্তাঘাটও খুব একটা চেনা নেই। কোন দিকে যাবে সেটা বুঝতেও পারছে না। তবে আরমান যেখানেই থাক না কেন আরজু কে ওকে খুঁজে বের করতেই হবে। কেননা আরজুর এখনই আরমানকে দরকার।
আশেপাশে তাকিয়ে একটা নির্দিষ্ট দিক নির্বাচন করলো আরজু। পথে কাউকে পেলে না হয় জিজ্ঞেস করা যাবে আরমানের ব্যাপারে।
সময়টা তখন বিকেলের দিকে। গ্রামের ছেলে মেয়েরা তখন খেলাধুলা করছে। বাড়ির বউরা তখন আবার রাতের রান্নায় ব্যস্ত। কয়েকটা বাচ্চাকে দাঁড় করিয়ে আরজু জিজ্ঞেস করলো,
“আরমানকে দেখেছো?”
বাচ্চাগুলো অবুঝের ন্যায় বলল,
“হেইডা কেডা?”
“আরমান! আরমানকে চেনো না তোমরা? আরমান কে খুঁজছি।”
“চিনি না। অন্য কাউরে জিগান।”
কথাগুলো বলে বাচ্চাগুলো আবারও খেলায় মেতে উঠলো। আরজু আর ওদের জিজ্ঞেস করল না। যেহেতু চেনেই না জিজ্ঞেস করে কি লাভ।
যেতে ধরলে একটা ডাক ভেসে এলো আরজুর কানে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল টিনের দরজার সামনে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা বসে আছে। আরজু তাকাতেই হাতের ইশারায় আবার ডেকে উঠলেন,
“ওই মাইয়া, তোমারেই ডাকতাছি। এইদিকে আহো।”
আরজু পিল পিল পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। নিজ থেকে কোন প্রশ্ন করলো না। অপেক্ষা করলো ভদ্র মহিলার কিছু বলার। উনি নিজেই প্রশ্ন করলেন,
“কাউরে খুঁজতাছো? কোন বাড়ির মাইয়া তুমি?”
“আমি আরমানের বউ।”
ভদ্রমহিলা শুনতে না পেয়ে আবারো প্রশ্ন করলেন,
“কেডা?”
“আমি আরমানের বউ।”
“কি কও হুনতে পাই না ক্যান? গলায় কি জোর নাই নাকি? জোরে কও।”
বিরক্ত হয়ে তিনি কথাটা বললেন। আরজু এবারে একটু জোরেই বলল,
“আমি আরমানের বউ।”
“আরমান? হেইডা কেডা? কার বউ লাগো তুমি? কোন গেরামের বউ হইয়া কোন গেরামে আইছো জামাইরে খুঁজতে?”
আরজু একটু বিরক্ত হয়েই বলল,
“এই গ্রামেই থাকে। আপনি চেনেন না।”
ভদ্রমহিলা বেশ গর্বের সাথে বলল,
“এই গেরামের এমন কোন পোলা নাই যারে আমি চিনি না। তুমি ভুলে এই গেরামে আইছো।”
আরজু এবার একটু গম্ভীর গলায় বলল,
“বললাম তো আমি ভুলে আসিনি। আমি আরমানের বউ। এই গ্রামেই থাকি। তালুকদার বাড়ির বউ আমি।”
ভদ্রমহিল এবারে ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,
“তালুকদার বাড়ির বউ? তা কার বউ তুমি?”
আরজু রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“বললাম তো আরমানের বউ। শুনতে পান না? সমস্যা কি আপনাদের সবার? আমি আরমানের বউ বললে কেউ বিশ্বাস করেন না কেন? অন্য কেউ এসে বললে তো ঠিকই বিশ্বাস করেন। সবাই সব সময় শুধু আমার সাথেই এমন করেন কেন? আমি আরমানের বউ। আমি আরমানেরই বউ।”
কথাটা বলে আরজু আর সেখানে দাঁড়ালো না, চলে গেল।
ভদ্রমহিলা বিড়বিড় করে বোধ হয় আরজু কে কিছু গালিগালাজ করলেন। তবে আরজু সেসবে পাত্তা দিল না। আরেকটু সামনে যেতেই সেদিনের সেই ভদ্র মহিলা কে দেখলো। আরজুর চেনা চেনা লাগলো, তবে থামলো না। আরজু কে থামতে হলোও না, উনি নিজেই এগিয়ে এসে হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আরে তুমি একা একা বাইর হইছো ক্যান?”
আরজু থামলো। কিছুক্ষণ ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ওনাকে চেনার চেষ্টা করল। আরজুর সেই পুরনো স্বভাবটা এখনো যায়নি। ভুলে যায় মানুষকে। মনে রাখতে পারে না। বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মনে পড়লো ওনাকে। সঙ্গে সঙ্গে একটু রাগী ভাব নিয়ে বলল,
“সেদিন আপনি বিশ্বাস করেননি যে আমি আরমানের বউ।”
“হ। কিন্তু এহন জানি তো তুমি আমাগো তাওসিফের বউ। কই যাইতাছো?”
“আরমানকে খুঁজে পাচ্ছিনা। কই আছে জানেন?”
“ওই তো নদীর ঐদিকে যাইতে দেখলাম। কইলো গোয়ালের থেইকা দুধ নিব। যাও ঐ দিকে যাও, পাইয়া যাইবা।”
ভদ্রমহিলা শুধু আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন একদিকে যাওয়ার জন্য। আরজু দেখলো লম্বা একটা পথ। আবারো ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ভ্রুু কুঁচকে বলল,
“ওইদিকে তো সরু একটা পথ। কোন পর্যন্ত যাব, কোথায় গিয়ে থামবো? আপনি চলুন না একটু সাথে।”
ভদ্রমহিলা এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন। আরজুকে নিয়ে গেলেন সাথে করে। একটু দূর থেকে বাড়িটা দেখিয়ে উনি বললেন,
“ওইহানে যাও। ওইহানে তাওসিফ রে পাইয়া যাবা। আমি যাই।”
আরজু বাড়ির উঠানে গিয়ে আগে আরমানের নাম ধরে ডাকলো।
“আরমান! আমি এসেছি। আরমান!”
আরমানের ডাকটা কানে যেতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। আরজু কে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি এখানে কি করে এলেন আরু একা একা?”
আরমানের এত প্রশ্ন আরজুর কানে গেল না। আরমানকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। বিজয়ের হাসি। যেন খুব বড় কিছু অর্জন করে ফেলেছে। গুটি গুটি পায়ে আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমি খুঁজে বের করেছি আপনাকে। জানেন কত কষ্ট করে আপনাকে খুঁজে পেয়েছি আমি?”
আরজুর মুখের হাসিটা দেখে মুহুর্তের মাঝে আরমানের ভালো মন মেজাজটা আরো ভালো হয়ে গেল। আরজুর পা'গলামিতে একটু আস্কারা দিয়ে বলল,
“দারুণ একটা কাজ করেছেন কিন্তু। আমাকে খুঁজে বের করা অনেক কঠিন ছিল। কেননা কেউ জানেই না আমি কোথায় এসেছি।”
“হ্যাঁ, সেজন্য তো চিনতে পারছিলো না কেউ আপনাকে। কিন্তু আমি ঠিক খুঁজে বের করেছি।”
আরমান হেসে উঠে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু এখানে কেন এসেছেন?”
মুহূর্তের মাঝে আরজুর মুখ থেকে হাসি উবে গেল। গম্ভীর গলায় বলল,
“কেন? আপনার সমস্যা? খুশি হননি আপনি?”
আরমান বুঝলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। চট করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আরে না না খুশি হবো না কেন? আমার তো এটা ভেবে ভালো লাগছে যে আমার পা'গলীটা কত কষ্ট করে আমাকে খুঁজে বের করেছে। আচ্ছা ঠিক আছে এসব কথা বাদ দিন, চলুন আমার কাজ হয়ে গেছে।”
“কি কাজে এসেছিলেন?”
“মা আপনাকে কি যেন বানিয়ে খাওয়াবে তো বাড়িতে গরুর দুধ শেষ হয়ে গিয়েছিল সেটা আনতে পাঠিয়েছিল।”
“ও আচ্ছা। চলুন এখন যাই। এখানে আর থাকবো না।”
আরজু কথাটা বলে আরমানের হাত ধরে নিজেই আগে হাঁটা দিল। যাওয়ার আগে আরমান আরজু কে নিয়ে নদীর ধারে গেল। এই বাড়িটা একদমই নদীর কাছাকাছি। একটা বিরাট বড় গাছের নিচে দাঁড়ালো। কি গাছ সেটা আরজু জানে না। আরমান কে জিজ্ঞেস করাও হলো না। বেশ বড়সড় একটা গাছ, ডালপালাও ছড়িয়ে গেছে। গাছের নিচটা বেশ সুন্দর ছায়া। এই জায়গাটা উঁচু। এই জায়গা থেকে একটু নিচে নেমে এগোলেই নদীর পানি ছোঁয়া যায়।
আরজু আর নিচে নামলো না। পানি দেখে কেমন যেন ভয় ভয় লাগলো। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলো। হঠাৎ করে আরজু বলল,
“এখানে একটা দোলনা থাকলে খুব ভালো হতো। মাঝ রাতে কিংবা শীতের সকালে দোলনায় বসে থাকতে খুব ভালো লাগতো। তবে আপনাকে নিয়ে না, একা একা।”
আরমান জানে আরজু ওকে খোঁচা দিয়ে আনন্দ পায়। সেজন্য আরমানও আনন্দ পায়। আরজু কে আরেকটু আনন্দ দেওয়ার জন্য অসহায় গলায় বলে উঠলো,
“এভাবে কেউ বলে আরু? আমি তো কষ্ট পাই। আমি চাই সব সময় আপনার সাথে সাথে থাকতে আর আপনি শুধু আমাকে দূরে দূরে রাখতে চান।”
আরমান কথাটা বলতেই আরজু খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ওই যে আরমানকে বিরক্ত করতে খুব ভালো লাগে তাই।
আরমান আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। এখন আর কোন কিছু বলে আরজুর হাসির মাঝে বাধা সৃষ্টি করার কোন মানেই হয় না। এই হাসির দৃশ্যটা বড় বিরল। খুব সৌভাগ্যবানরাই হয়তো এই হাসির সাক্ষী হতে পারে।
বাড়ি ফেরার সময় আবার সেই একই পথে দিয়ে ফিরতে হলো ওদেরকে। সেই বাচ্চাগুলো এখনো খেলছে। আরমান কে দেখতেই ওরা এগিয়ে গেল আরমানের দিকে। কি সব যেন কথাবার্তা বলল। আরজু বেশ অবাক হলো। এই বাচ্চা গুলো না একটু আগেই ওকে বলেছে আরমানকে চেনে না। তার মানে সবগুলো মিথ্যাবাদী। এই ছোট বয়সে মিথ্যে বলতে শিখে গেছে।
আরজু আরমান কে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,
“ওদের সাথে কথা বলবেন না। ওরা সবাই মিথ্যাবাদী। আমি ওদেরকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আপনি কোথায় আছেন সেটা না হয় নাই বলতে পারলো কিন্তু আপনাকে চিনতেই অস্বীকার করেছে।”
আরমান একটু ভ্যাবাচ্যাকার মাঝে পড়লো। পা'গলীটা আবার ক্ষেপে গেছে। কে জানে কি জিজ্ঞেস করেছে, আর বাচ্চাগুলো আবার না বুঝে কি উত্তর দিয়েছে। আরমানের এসব ভাবনার মাঝে একটা বাচ্চা বলে উঠল,
“আপনে তো আমাগোরে আরমানের নাম জিগাইছিলেন। আমরা তো তাওসিফ ভাইরে চিনি। আরমান কেডা জানি না।”
এবারে বুঝতে পারলো আরমান আসল কথাটা। ভাবলো নিজেই আরজুকে বোঝাবে। পাশে তাকাতেই দেখল আরজু নেই। আশেপাশে তাকাতেই দেখল সেই বয়স্ক ভদ্রমহিলার দিকে এগিয়ে গেছে। আরজু কে আবার আসতে দেখে ভদ্রমহিলা ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,
“আবার আইছো ক্যান?”
“আমি যদি এই গ্রামে কোন আরমানকে বের করতে পারি তবে আপনি কি করবেন?”
ভদ্রমহিলা আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন,
“পারবা না।”
“ধরুন যদি পারি তবে কি করবেন সেটা বলুন?"
“ঠিক আছে, যাও বাম গান কাইট্টা ডান পাশে লাগামু।”
আরজু বক্র হেসে বলল,
“কান কা'টা'র জন্য তৈরি হন।”
কথাটা বলে আরমানকে টেনে এনে ভদ্রমহিলার সামনে দাঁড় করিয়ে বলল,
“এই দেখুন, জলজ্যান্ত একটা আরমান। এই গ্রামের তালুকদার বাড়ির ছেলে। নিন এখন কান কাটুন।”
আরমান আরেক দফা ভরকালো। আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“কি আবোল তাবোল বলছেন আরু?”
“আমি আবোল তাবোল বলছি না। উনিই আমাকে বলেছেন আরমান নামে নাকি কেউ এই গ্রামে থাকে না। আমি বারবার বললাম আমি আপনার বউ উনি শুনতেই পেলেন না। আমি বললাম আমি তালুকদার বাড়ির বউ উনি তাও বিশ্বাস করলেন না। উনি বলেছেন আমি যদি এই গ্রামে আরমানকে বের করতে পারি তাহলে উনি বাম কান কেটে ডান পাশে নিয়ে আসবেন। তো ওনাকে করতে বলুন সেটা।”
ভদ্রমহিলা খ্যাক খ্যাক করে উঠে বললেন,
“এইডা তো আমাগো তাওসিফ। তুমি আরমান আরমান করো ক্যান? তাওসিফ, তোর বউয়ের কি মাথার সমস্যা নাকি? নতুন বউ হইয়া আমার লগে ঝগড়া করে। শহুরে মাইয়ার এই এক জ্বা'লা। এরা শ্বশুরবাড়ি আসে সবার মাথায় চাবাইয়া খাওয়ার জন্যে।”
আরমানের বউ যত অন্যায়ই করুক না কেন তবুও আরমান ওর বউয়ের নামে এত কথা কারো কাছ থেকে শুনতে রাজি নয়। নিজেও পাল্টে রাগী গলায় বলল,
“সবাই তোমার মতো না দাদী। তোমার না হয় উদ্দেশ্য ছিল শ্বশুর বাড়ির সবার মাথা চিবিয়ে খাওয়ার। সে করতে করতে নিজের কানের বারোটা বাজিয়েছো। নিজের ছেলের বউ, ছেলে কাউকে তো শান্তি দাও না। আবার এসেছো আমার বউয়ের দুর্নাম করতে।”
আরমান এভাবে বলায় আরজু ভীষণ খুশি হলো। এদিকে ভদ্রমহিলা কিছুই শুনতে পেলেন না। কানের সমস্যা আছে তার। উনি বিড়বিড় করে কি সব বলতে বলতে নিজে নিজেই ঘরে চলে গেলেন। আরমান আর সেখানে থাকলো না। আরজু কে নিয়ে চলে গেল। আরজু পিছন ঘুরে বাচ্চা গুলোর দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“সবগুলো মিথ্যাবাদী।”
আরমান এবারে আরজুর মুখ চেপে ধরে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ধুর পা'গলী! সব জায়গায় এত পা'গলামি করে নাকি? আমাকেও খু'ন করার কথা বলে, বাদবাকি মানুষকেও খু'ন করার কথা বলে, আবার মানুষের কান কা'টা'কা'টির কথা বলে। আপনি তো দেখি আমাকে গ্রাম ছাড়া করবেন।”