তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৪৩

🟢

লাইট বন্ধ করার জন্য আরজু স্টোর রুমে ঢুকলো ঠিকই তবে আরজু কে আর কষ্ট করে লাইটটা বন্ধ করতে হলো না। তার আগেই কারেন্ট চলে গেল। সারা ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। একেই তো এই জায়গাটা ভীষণ অন্ধকার ছিল তার ওপরে কারেন্ট চলে যাওয়া আরো অন্ধকার হয়ে গেছে। বলা যায় পুরো বাড়ি এখন অন্ধকার হয়ে গেছে।

মুহূর্তের মাঝে আরজুর কেমন যেন দম বন্ধ লাগলো অন্ধকারের মাঝে। পুরনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল। অন্ধকারের মাঝে মনে হচ্ছে চারিদিক থেকে ওকে কারা যেন ছুঁতে আসছে, মা'রতে আসছে।

আরজু আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে নিয়ে কিসের সাথে যেন একটা উষ্টা খেয়ে পড়ে গেল। আরজু কিছু বুঝে না উঠেই আরমান আরমান বলে চেঁচাতে লাগল।

বসার ঘর থেকে সেই ডাক কানে যেতেই আরমান আরজুর কন্ঠটা অনুসরণ করতে করতে একদম করিডরের শেষের দিকে চলে এলো। অন্ধকার হওয়ায় পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্লাশ লাইট অন করে দেখলো আরজু দরজা থেকে একটু দূরে মেঝেতে দুই হাঁটু মুড়ে বসে আরমান আরমান বলে এখনো ডাকছে। আরমান বুঝতে পারল যে এখন কাঁদছে মেয়েটা।

আরমান তাড়াহুড়ো করে মেঝেতে বসে ব্যস্ত গলায় বলল,

“এইতো আমি আরু, এইতো। কি হয়েছে? কাঁদছেন কেন এভাবে?”

আরমানের কন্ঠটা পেতেই আরজু মাথা তুলে তাকালো। আরমান বুঝতে পারলো থরথর করে কাঁপছে আরজু। আরমানের মুখটা দেখতেই আরজু এক প্রকার ঝাপিয়ে পড়লো আরমানের বুকে। এবারে আরজু শব্দ করে কেঁদে উঠলো। পাল্টা আরমানও ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

“এইতো আমি আরু। আমি আছি তো। কিচ্ছু হবে না আপনার। ভয় পেয়েছেন?”

আরজু কান্নার তোপে কিছু বলতেও পারল না। আরমানের পিঠের পাঞ্জাবিটা খামচে ধরেছে। ধীরে ধীরে আরজুর কান্না বাড়তে থাকলো। ততক্ষণে বাড়ির বাকিরাও চলে এসেছে। মিজান হোসেন চিন্তিত গলায় আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে?”

“বুঝতে পারছি না বাবা। মনে হয় ভয় পেয়েছে। তবে অন্ধকারে ভয় পেয়ে এতটা কান্নাকাটি করার মেয়ে তা আরু না। উনি এত ভীতু না।”

আমেনা বেগম বললেন,

“মেয়েটাকে আগে ঘরে নিয়ে যা।”

আরমান আবারও আরজুকে বলল,

“আরো চলুন ঘরে যাই। কি হয়েছে ওখানে গিয়ে শুনবো কেমন? আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারেন্ট চলে গিয়েছে।”

আরজুর কান্না একটু কমলো। আরমানকে ছাড়লো তবে এখনো কাঁদছে। অন্ধকারের মাঝে দরজায় চারজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো আরজু। অন্ধকারের কারণে কারো মুখই স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে না। তবে চারজন মানুষের অবয়ব খুব ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে।

আরজু আবারও আঁৎকে উঠলো। একদম সেই পুরনো দৃশ্যটার মতন লাগলো। আরজু একটা অন্ধকার ঘরের মাঝে কাঁদছে, চেঁচাচ্ছে সাহায্যের জন্য। একটু পরে সেই ঘরে ওর মা, বাবা, ভাই, বোন সবাই আসে।

আরজু কে তাকাতে দেখে মিজান হোসেন নিজে একটু এগিয়ে যেতে ধরলেন। তিনি দুইপা না এগোতেই আরজু ছিটকে পিছে গেল। আবারো আরমানের নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“আরমান মা'রবে আমাকে। ওই দেখুন বাবা আসছে, মা'রবে আমাকে।”

মিজান হোসেন সহ উপস্থিত সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেল। সবাই ভাবলো যেহেতু বাবা বলে ডাকছে তারমানে অবশ্যই মিজান হোসেনকেই বলছে। কিন্তু কথা হলো উনি মা'র'বেন কেন আরজুকে? এখন পর্যন্ত তো আরজুর সাথে কখনও একটু উঁচু গলায় কথাও বলেননি।

আরমান নিজেই আরজুই কে বলল,

“আরু মা'র'বে কেন বাবা আপনাকে? বাবা তো মা'র'বে না। ভয় পাচ্ছেন কেন অযথা? কি বলছেন এসব?”

আরমানের কথা আরজু শুনলো তবে মানলো না। আরজু উঠে গিয়ে আরমানের পিছনে বসে ভয়ার্ত গলায় বলল,

“উনি আমাকে মা'র'বে'ন আরমান। ওই দেখুন পিছনে ভাইয়াও দাঁড়িয়ে আছে। ভাইয়াও একটু পর মা'র'বে। মা আর আপা কিছুই করতে পারবে না, ওরা বাঁচাবেও না আমাকে। ওরা আমাকে বাঁচাতে আসলে ওদেরকেও মা'রবে। আপনি বাঁচান আমাকে। আপনিতো বাঁচাতে পারবেন।”

উপস্থিত বাকিরা আরজুর কথা না বুঝলেও এবারে আরজুর কথা আরমান ঠিকই বুঝলো। আরজু যে এখানে বাকি সদস্যদের নিজের পরিবারের লোকজন ভেবে ভয় পাচ্ছে সেটা বুঝলো। আরমানের বাবাকে নিজের বাবা ভাবছে সেই জন্যই এমন কথাবার্তা বলছে তাও বুঝলো।

এই পুরো বিষয়টা আরমানের বোধগম্য হলেও বাকি কারো বোধগম্য হলো না।

আরমান ইশারায় সবাইকে চুপ করতে বলল। নিজে পিছন ঘুরে তাকিয়ে আরজু কে একহাতে আগলে নিয়ে চোখের জলটা মুছে দিয়ে আদূরে গলায় বলল,

“আমি তো আপনাকে বাঁচানোর জন্য এসেছি আরু। আর এরা আমার বাবা মা। এনারা ভালো, আপনাকে মা'রবে না।”

আরজু অবুঝের ন্যায় আরমানের দিকে তাকালো। এরই মাঝে কারেন্টও চলে এলো। ফলে সবাই কে চেনাতে আরমানের একটু সুবিধাই হবে।

আরমানর আবারো আরজু কে বলল,

“দেখুন আরু আপনি এনাদের চেনেন। সবাই ভালো।কেউ মা'র'বে না আপনাকে।”

আরজু ভয়ে ভয়ে তাকালো সবার দিকে। অবাক করার বিষয় হলো সত্যি এই মানুষগুলো আরজুর পরিবার না। তারমানে এরা আরজু কে মা'রবেও না।

আরজু যেন এবারে একটু ভরসা পেল। আবার একটু সাহসও পেল। কান্নার তোপে তিরতির করে আরজুর ঠোঁট দুটো কাঁপছে। আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

“হ্যাঁ জানি ওনারা মা'র'বে না।”

“হ্যাঁ মা'র'বে না। চলুন আমি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে আমাদের ঘরে। কেউ মা'রবে না আপনাকে।”

কথাটা বলে আরমান আরজু কে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কেউ আর কোন কথা বলল না। সবাই সরে দাঁড়ালো। যখন মিজান হোসেনের পাশ দিয়ে গেলো আরমান খেয়াল করল আরজু তাও ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরজু আরেকটু আরমানের গায়ের সাথে লেপ্টে গেল। চোখে মুখে একটা তীব্র আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। ঠিক তেমনি ভয় পেল তাশরীফের কাছাকাছি যেতে।

আরমান সোজা ওদের ঘরে গেল। ওদের পিছন পিছন বাকিরাও গেল। তবে কেউই ঘরের ভেতরে গেল না। আরমানই ইশারায় ভিতর আসতে মানা করলো। সবাই আরজু কে এই অবস্থায় রেখে যেতেও পারছে না।

আরমান আরজু কে নিয়ে সোজা বিছানায় বসালো। গ্লাসে পানি ঢেলে সেটা এগিয়ে দিলে আরজুর দিকে। আরজু হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিতে ধরল তবে আরমান খেয়াল করলো আরজুর হাত দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। গ্লাসটা ধরতেই পারবে না ঠিকমতো। আরমান আর আরজু কে গ্লাসটা ধরতেই দিল না। নিজেই সযত্নে পানিটা খাইয়ে দিয়ে ঠোঁটটা মুছে দিল আরজুর।

আরমান অনেক কিছু বলে আরজু কে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো তবে কোনমতেই কোন কাজ হচ্ছে না। আরজুর শরীরের কম্পন কমছেই না। আরমান একটা বিষয় খেয়াল করেছে আরজু যখনই কোন বিষয়ে অতিরিক্ত ভয় পায় কিংবা আকস্মিক কোনো ঘটনা ঘটে আরজুর সাথে তখন এভাবে কাঁপতে থাকে মেয়েটা। আরমান কি করবে, কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এত অভয় দিচ্ছে, এত সাহস দিতে তারপরেও তো আরজুর ভয়টা দূর হচ্ছে না।

কেন যে এভাবে ভয় পেয়ে গেল মেয়েটা বুঝতে পারছে না। কি এমন ঘটনা ঘটেছে অতীতে যার কারণে এতটা ভয় পাচ্ছে আরজু? কি এমন করেছে ওর বাবা, ভাই যে মেয়েটা এতটা ভয় পাচ্ছে? নিশ্চয়ই আরজুর অতীতের ঘটনাগুলো মারাত্মক হবে না হলে আরজুর মতো মেয়েকে ভয় পাওয়ানো অত সহজ না।

আরজুর কাঁপতে থাকা হাত দুটো আরমান নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে বলল,

“ভয় পাবেন না আরু। দেখুন আমি আপনার হাত দুটো শক্ত করে ধরে আছি। এখন আমায় একটু বলুন তো কেন ভয় পাচ্ছেন? কি করেছে আপনার বাবা, ভাই আপনার সাথে যে এতটা ভয় পাচ্ছেন?”

আরজু তাকালো আরমানের দিকে। এখনও আরজুর চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় দেখতে পেল আরমান। তবে আর কোন প্রশ্ন করলো না। অপেক্ষা করলো আরজুর উত্তরের। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আরজু কম্পিত গলায় বলল,

“আমার বাবা অনেক অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। আগে ওই ব্যবসার সূত্র ধরে অনেক লোকজন বাড়িতে আসতো। আমি দেখতাম সব। আমি একবার পুলিশকে বলেও দিতে চেয়েছিলাম। এজন্য বাবা ছোটবেলা থেকেই না প্রায়ই আমাকে একটা অন্ধকার ঘরে বন্ধ করে রাখতো। ওই ঘরটা আমাদের বাড়ির ভেতরে ছিল না। আমাদের বাড়ির পিছন দিকে একটা ছোট্ট টিনের ঘর মতন ছিল। লোকজন আসলে বাবা ওখানেই ওদের নিয়ে বসতো।”

“তারপর?”

“আমাকে ওখানে বন্ধ করে রাখতো বাবা। অন্ধকারের মাঝে টানা দু-তিন দিন বন্ধ করে রাখত। খাবার, পানি কিচ্ছু দিত না আমাকে। ঝড় বৃষ্টির যাই হয়ে যাক না কেন বাবার দয়া হতো না। আমাকে ওখানেই রেখে দিত।”

“সেজন্য আপনি অন্ধকারকে এত ভয় পান?”

“হ্যাঁ। আমি কোন কিছুকে ভয় পাই না, আমি কাউকে দেখে ভয় পাই না শুধু অন্ধকার বাদে। আগে যখন ছোট ছিলাম তখন তো আমি এতটা সাহসী ছিলাম না। আমার অন্ধকারে খুব ভয় লাগতো। তার মধ্যে ভাইয়া এসে আরো ভয় দেখিয়ে যেত আমাকে। যখন খুব জোরে জোরে বাজ পড়তো আমি খুব চেঁচাতাম, কান্না করতাম কিন্তু তাও বাবার দয়া হতো না।”

এবারে আরজু কাঁদলো না ঠিকই তবে আরমান কাঁদলো। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য মুখ দিয়ে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো না, শুধু চুপচাপ মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

আরজুর কথাগুলো শুনে দরজার বাইরে দাঁড়ানো আমেনা বেগমও আঁচলে মুখ গুজে কাঁদলেন। তনুশ্রীও কাঁদলো। তাশরীফের মাথায় অর্ধেক কথা ঢুকলো অর্ধেক কথা ঢুকলো না। বাকি মিজান হোসেন থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

আরমানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মাঝেই আরজু আবার বলে উঠলো,

“এটাই ভয়ের আসল কারণ না। আরো কারণ আছে।”

আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি?”

“আমাকে যখন ওভাবে আটকে রাখতো আমার রাগ আরো বাড়ত। ধীরে ধীরে আমার মনে একটা জেদ চেপে বসেছিল যে আমি বাবাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেবোই। যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আমাকে বন্দী করে রেখেছে আমিও তাদেরকে জেলে ঢোকাবোই।”

“কি করেছিলেন আপনি?”

“আমাদের বাড়িতে অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতে বাবা। একবার একটা ড্রাগসের ভিডিও বানিয়ে ছিলাম আমি। আমি সেটা সাহস করে নিজে গিয়ে থানায় জমা দিয়েছিলাম জানেন? তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি।”

আরমান বিস্ফোরিত নয়নে তাকালা আরজুর দিকে। কি সাংঘাতিক মেয়েটা। কি মারাত্মক জেদ। আবার এই মেয়ে কিনা এমন হাউমাউ করে কাঁদছিল, ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল ভাবা যায়!

“তারপর কি হলো?”

আরজু এবারে হো হো করে হেসে উঠল। আরমান তো ভরকালোই সেই সাথে দরজার বাইরে দাঁড়ানো বাকি চারজন মানুষও ভরকালো। মেয়েটা এই হাসছে তো এই কাঁদছে। কেমন অদ্ভুত না!

যে মেয়েটি একটু আগেও কাঁদছিল, এত ভয় পাচ্ছিল তার পক্ষে কি এত তাড়াতাড়ি আবার এভাবে হাসা সম্ভব?

আরমানের কাছে আরজুর হাসিটা ভীষণ অদ্ভুত লাগলো। ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“কি হলো আরু? হাসছেন কেন এভাবে?”

আরজু হাসতে হাসতেই বলল,

“আমাদের দেশের আইন কেমন জানেন? যে অপরাধীর বিরুদ্ধে আপনি প্রমাণ জোগাড় করে দেবেন সেই অপরাধীকে থানায় ডাকা হবে তারপর তাকে সম্মান করা হবে, চেয়ারে বসানো হবে, চা নাস্তা খাওয়ানো হবে। তারপর সেই অপরাধী পুলিশের পকেটে কিছু টাকা গুঁজে দেবে আর সেই প্রমাণটা হাওয়া হয়ে যাবে। অপরাধীর কোন বিচার হবে না। আমি আসলে বুঝতেই পারিনি যে কি করে ওই এলাকায় এত অবাধে এই অন্যায় কাজগুলো চলছিলো। কেন পুলিশ কিচ্ছু বলে না। কারণ তাদেরকে তো টাকা দেওয়াই থাকে।”

বিজ্ঞাপন

বুঝে গেল তারপরের ঘটনাটা আরমান। তবে আরজুর সাথে না জানি তারপর আরো কত অমানবিক ঘটনা ঘটেছিল। আরমান কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“আপনার সাথে এর পরে কি করেছিল ওরা?”

আরজুর হাসিটা থেমে গেল। আবারো চোখে মুখে সেই তীব্র ভয়টা ফুটে উঠলো। আবারো কম্পিত গলায় বলল,

“অনেক কিছু করেছিল। এইবার আমাকে যে ঠিক কতদিন বন্ধ করে রেখেছিল ওই ঘরটাতে আমি জানিনা। আমি এক সময় চেঁচানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কাঁদার মতন শক্তিও আমার আর অবশিষ্ট ছিল না। প্রথমদিনে মে'রে'ছি'ল বাবা। দ্বিতীয় দিন মে'রে'ছি'ল আমার ভাই। আমি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম ঠিকই তবে মানসিকভাবে আমি তখনও অতটা ভেঙে পড়িনি। এর একটা কারণ বলি?রাগ করবেন না কিন্তু।”

আরমান তাড়াহুড়াে গলায় বলল,

“আরে করবো না রাগ। বলুন আপনি।”

“আমি জানতাম ওরা আমাকে মা'রতে পারবে না, মা'র'বেও না। কারণ আমাকে মা'র'লে ওদের সমস্যা হবে।”

“কেন সমস্যা হবে?”

“আবির ওদের বাঁচতে দিত না।”

কথাটা বলে আরজু আবারো হেসে উঠলো। আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“আবির কে?”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“এখন যাকে ফিরোজ হিসেবে চেনেন তখন ও আমার জন্য আবির ছিল। তারপর ধীরে ধীরে ফাহিম ওকে নিজের দলে টানলো, ভাই বানালো। তারপর নিজের নামের সাথে মিলিয়ে ওর নামটাও বদলে রাখলো ফিরোজ।”

আরমানের যেমন অবাক লাগলো তেমন একটু রাগও হলো। এত ভরসা কেন থাকতে হবে আরজুর ফিরোজের উপর? বলতে পারল না যে ওরা যদি আরজু কে মা'রতো তাহলে আরমান ওদের গিয়ে মে'রে দিয়ে আসতো।

নিজের ভাবনার উপরে নিজেই বিরক্ত হলো আরমান। তখন তো ও আরজু কে চিনতও না। তবে কি করে এই কথাটা বলবে আরজু।

সে যাই হোক, এখনই রাগ করলে চলবে না। ধৈর্য নিয়ে শুনতে হবে। আরজু যতই ফিরোজের প্রশংসা করুক না কেন তবুও আরমানকে ধৈর্য ধরতেই হবে। তবে এই ফিরোজের কাহিনীটা ঠিক বুঝলো না।

“ফিরোজ যখন আপনাকে বাঁচাতোই…...”

আরমান কে নিজের কথা শেষ করতে না দিয়েই আরজু বলে উঠলো,

“ফিরোজ না। আবির বাঁচাতো আমায়। সব বিপদ থেকে আমায় আবির বাঁচিয়েছে। এখনকার অমানুষ ফিরোজ না।”

আরমান আরজুর কথাটা মেনে নিয়েই বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। আবির যখন আপনাকে বাঁচাতোই তবে এতদিন কোথায় ছিল? আর যখন আপনাকে বন্দি করে রাখত তখনই বা কোথায় ছিল আপনার আবির?”

আরজু শান্ত দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমার আবির না। ও কখনোই আমার ছিল না বুঝতে পেরেছেন?”

আরজুর এক কথাতেই আরমানের রাগ অনেকটা কমে গেল। তারমানে আরজু শুধুমাত্র আরমানেরই। যাক ভালো লাগলো।

“আচ্ছা ঠিক আছে বুঝতে পেরেছি। তার পরে বলুন।”

“আবির গ্রামে অনুপস্থিত থাকা অবস্থাতে আমার বাবা, ভাই আমায় মা'র'তো, গালাগালি করতো। ও সবসময় আমার আশেপাশে থাকতো না। কারণ ততদিনে অনেকটাই ওর সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে। তবে ওই ঘরটাতে আটকে রাখতে পারতো না আমায়। ওই সময় আবির গ্রামে ছিল না। একজন খোঁজ দিয়েছিল বড় আপার। আবির ওখানে গিয়েছিল ওর ভাই ফাহিমের সাথে। আমি জানতাম ও খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে। আর ও একবার ফিরলে আমাকে এখানে রাখতে পারবে না। আমি ওর আশায় ছিলাম না, তবে আমি জানতাম ও আসবে।”

আরমান কিঞ্চিত অভিমান মাখানো গলাতে বলল,

“আশাতেই ছিলেন। আপনি যাই বলুন না কেন এটা মানবো না আমি।”

আরজু আরমানের কথাটা মেনে নিয়ে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। আশাতেই ছিলাম। তবে আবির ঐ দিন আসতে একটু দেরি করে ফেলেছিল। আমি আপনাকে বলেছিলাম না আমি আমার ভাইয়ের মৃত্যু কামনা করি। আসলে ও আমার ভাই না। ওকে জা'নো'য়া'র, কুকুর যার সাথেই তুলনা করি না কেন তাও কম হবে। ওই শু'য়ো'রে'র বা'চ্চা রাতভর মদ গিলে সকালবেলা ওর বন্ধুকে আমার ঘরে পাঠিয়েছিল।”

আরমান চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“কিইইই?”

আরজু এবারে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“জানেন, যখন দরজা খুলে আবছা আলো ঘরে ঢুকলো আমি তাকাতে পারছিলাম না। পিটপিট করে চোখ খুলে দরজায় যখন একটা পুরুষালী অবয়ব দেখতে পাই তখন আমি ভেবেছিলাম ওটা বোধহয় আবির। আমি ভেবেছিলাম আমি এবার এখান থেকে মুক্তি পাবো। তবে জানেন ওটা আবির ছিল না।”

আরমান ঘৃণায় দু চোখ খিঁচে বন্ধ করে বলল,

“আপনার ভাইয়ের বন্ধু ছিল?”

“হ্যাঁ। ও ছিল আরেকটা শু'য়ো'রে'র বাচ্চা। ও আমাকে খুব বাজে ভাবে ছুঁয়েছিলো আরমান। বিশ্বাস করুন আমার তখন নড়াচড়ার শক্তিও ছিল না। আমি যে কাউকে ডাকবো আমার সেই শক্তিও ছিল না। আরে কতদিন হলো আমাকে খাবার দেয়নি। শুধু মাঝে মাঝে একটু পানি দিত। তাও আমি নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ওকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলাম, চেঁচাচ্ছিলাম তবে আমার ভাগ্য ভালো জানেন তখনই আবির এসেছিল।”

কথাটা বলে আরজু আবারও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আরমানও আবারও চোখের জল আটকে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলল। আরজু কে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। আরজুর মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,

“আর বলতে হবে না। আর কিচ্ছু বলতে হবেনা। আমি কিছু শুনতে চাই না। আপনি কেন ভয় পান, কাকে দেখে ভয় পান আমার কিচ্ছু জানার দরকার নেই। আমি এতোটুকু আপনাকে কথা দিচ্ছি আজ থেকে আপনি আর ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়বো না।”

আরজু নিজেও দুই হাতে শক্ত করে আরমান কে জড়িয়ে ধরে বেশ অনেকক্ষণ কাঁদলো। অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। অনেকক্ষণ কাঁদার পর আরজু শান্ত হলো। নিজ থেকে আরমানকে ছেড়ে দিলো। আরজু নিজেই নিজেকে এবারে স্বাভাবিক করলো। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো,

“জানেন আরমান, এরপরে ওই শু'য়ো'রে'র বাচ্চা কে আমি আর কখনো দেখিনি। আমি জানি আবির ওর কি অবস্থা করেছিলো। এমন আরোও অনেক কারণে ওর প্রতি আমার সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে যায়। যার কারণে আমি আজও ওকে খু'ন করতে পারিনি। ও ভালো না তবে ও ভালো ছিল। ও কার জন্য ভালো ছিল, কার জন্য ছিলনা আমি জানিনা। তবে আমার জন্য ও ভালো ছিল।”

“অনেক কিছু করেছে আপনার জন্য ফিরোজ?”

আরজু আনমনে বলল,

“হ্যাঁ। ওকে দিয়ে আমি সব করাতে পারতাম। আমার মুখ ফুটে শুধু কিছু বলার অপেক্ষা ছিল আর ও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যেত। ওর জন্য আমি অনেকবার অনেক বিপদ থেকে বেঁচেছি। তবে ও বদলে গেল। আবির থেকে ফিরোজ হয়ে গেল। একসময় ওর ক্ষমতার দরকার হয়ে গেল। আর আমার কাছে আবির হয়ে গেল অমানুষ। আমি ওর সব অপরাধ ক্ষমা করলেও ওর একটা অপরাধী কোনদিন ক্ষমা করব না। ও আমার আপার জীবন নষ্ট করেছে। ওর এই অপরাধের কোন ক্ষমা হয় না।”

আরমান নিজেই আবার সযত্নে আরজুর চোখের জল মুছিয়ে দিল। দু হাতের আজলায় আরজুর মুখটা নিয়ে কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল,

“ওই কু'ত্তা'র বাচ্চাগুলোকে আমি পেলে টুকরো টুকরো করে কা'ট'বো। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আরু, যারা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে আমি তাদের ব্যবস্থা করবই। আর খুব ভয়ানক ভাবে করবো। আর আপনার ভাই! একবার শুধু ওকে আমার সামনে পড়তে দিন, আমি ওর কি অবস্থা করব ও ভাবতেও পারছেনা।”

আরমানের কথাটা শুনে আরজু আঁৎকে উঠে বলল,

“না আপনি কিছু করবেন না। আপনি কখনো ওদের সামনে যাবেনই না। আমাকে কথা দিন আপনি কিছু করবেন না? ওরা কখনো জানবেই না আমাদের কথা। আমরা আর কোনদিন আমার গ্রামে যাব না।”

“কিন্তু আরু এভাবে ওদের ছেড়ে দেবো? এত কষ্ট দিয়েছে ওরা আপনাকে, আপনি চান না ওরা শাস্তি পাক?”

“আমি শুধু আপনাকে চাই আরমান। আমার আর কিচ্ছু দরকার নেই। আমার পরিবার খুব খারাপ। আমি জানি আপনি খুব ভালো। ওদের সাথে আপনি পেরে উঠবেন না। ওরা যদি আপনার কোন ক্ষতি করে দেয় তবে আমি কি করবো বলুন? আপনি কখনো ওদের সামনে যাবেন না কথা দিন আমায়?”

আরমান প্রথমে একটু আপত্তি করলো কথা দিতে। কেননা আরজু কে কথা দিলে সে কথা ফেলতে পারবে না আরমান। তবে আরজু আবার নাছোড়বান্দা। আরমানের থেকে কথা নিয়েই ছাড়লো। আরমান নিরুপায়। আরজু কে ফেরানোর সাধ্য তার নেই।

দরজার বাইরে তখন আর কেউই দাঁড়িয়ে নেই। সব কথা বলা শেষে আরমান যখন জড়িয়ে ধরেছিল তার পরপরই সবাই চলে গিয়েছিল। ওদের কারো আর কোন কিছু শোনার নেই। যা শোনার শুনেই নিয়েছে।

আরজু এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে পুরোপুরি ভয়টা যেন এখনো কা'টেনি। আরমান আরজু কে শুইয়ে দিল। একটু ঘুমোনোর জন্য বলল। ঘুমোলে হয়তো ভালো লাগবে।

আরমান মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আরজু খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল। আরজু ঘুমোতেই আরমান বেরিয়ে এলো। লাইটা বন্ধ করলো না, দরজাও বন্ধ করল না।

বসার ঘরে আসতেই দেখল সেখানে আমেনা বেগম আর মিজান হােসেন বসে আছে। দুজনের চোখ মুখের অভিব্যক্তি কেমন থমথমে। আরমান বুঝল এই থমথমে ভাবের কারণ।

আরজুর অতীত শুনে, পরিবারের ব্যাপারে শুনে হয়তো ওনাদের বিষয়গুলো পছন্দ হয়নি। এমনও হতে পারে হয়তো আরজু কে নিয়ে ওনাদের মনের মাঝে একটা ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে, হয়তো আবারো ভাবছে আরজুর জন্য আরমানের কোন ক্ষতি হয়ে যাবে কিনা।

আরমান এগিয়ে গিয়ে মিজান হোসেনের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ইতস্তত গলায় বলল,

“বাবা আসলে......”

মিজান হোসেন হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলেন আরমানকে। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বেশ শান্ত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আরজুর এখন দুটো পরিচয়। প্রথমত ও তাওসিফ আরমানের স্ত্রী। আর দ্বিতীয়ত তালুকদার বাড়ির বউ। আরজুর অতীতে কি ছিল, আরজুর পরিবার কেমন ছিল এসব বিষয়ে আজ থেকে এই বাড়িতে আর কোন কথা উঠবে না। এটা আমার আদেশ। আজ থেকে কখনো কোন বিষয়ে কেউ আরজুর পরিবারকে টানবে না কিংবা আরজুর অতীতকে টানবে না।”

আরমান বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“বাবা তোমার কোন অভিযোগ নেই? তোমাকে তো আমি সেদিন এতো কিছু বলিনি।”

“তোমার প্রতি কেন অভিযোগ থাকবে? আর মেয়েটার প্রতি কি অভিযোগ করব? যার নিজের মনে হাজারো অভিযোগ জমা হয়ে আছে। ওর তো কোন দোষ নেই। একবার ভাবো তো মেয়েটা ঠিক কতটা কষ্ট পেলে সামান্য অন্ধকার ঘরে এভাবে চেঁচায়, থরথর করে কাঁপে, নিজের ভাইয়ের মৃত্যু কামনা করে। এই বিষয়ে আমার আর কোন কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু বলবো এই বাড়িতে যেন ওই মেয়েটার কখনো কোনো অযত্ন না হয়। তোমার কাছে যেন কখনো আরজুর অসম্মান না হয়। মনে রেখো বাবা এই কথাটা।”

আরমান হাসলো। কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“কখনো অসম্মান হবে না বাবা। কোন কিছুই কখনোই আমার চোখে ওনার সম্মান কমাতে পারবেনা, আর না আমার মনে ওনার জন্য ভালোবাসা কমাতে পারবে। তুমি যে আমায় এতটা সমর্থন করেছো এর জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞ থাকব আমি তোমার কাছে। আমি সত্যি ভুল চিনিনি আমার পরিবারকে।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প