তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৩৯

🟢

নিজের ঘরে আরাম কেদারায় বসে চোখ দুটো বন্ধ করে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন মিজান হোসেন। চোখ মুখের ভাবভঙ্গি ভীষণ থমথমে। বারবার শুধু ভাবছেন লোকে যখন জিজ্ঞেস করবে যে রাতের মাঝে হঠাৎ করে ছেলের বউ কোত্থেকে এলো কি জবাব দেবেন। গ্রামের সম্মানীয় মানুষ তিনি। এ ব্যাপারে কথা তো অবশ্যই উঠবে। সেই সাথে কথা উঠবে ছেলেকে দেওয়া শিক্ষার ব্যাপারে।

কি ভাববে সবাই? ছেলে মেয়ে নিয়ে পালিয়ে এসেছে। মেয়ের বাড়ির লোকজনও কিচ্ছু জানে না। এই ছেলে তার সম্মান রাখলো না।

মিজান হোসেনের এসব ভাবনার মাঝেই আরমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ঘরে ঢোকার জন্য অনুমতি চাইছে। মিজান হোসেন কোন উত্তর দিলেন না। চুপচাপ বসে রইলেন। ইচ্ছে হচ্ছে না আরমানের সাথে কথা বলার। আরমান বুঝলো অনুমতি পাবে না। তাই অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষাও করলো না, ভিতরে এলো।

আরমান সোজা এসে মিজান হোসেনের পায়ের কাছটায় বসলো। মিজান হোসেন বুঝলেন তবে তারপরও তার মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল না। আরমান একবার নরম গলায় ডাকলো,

“বাবা!”

সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না মিজান হোসেনের। তবে আরমান আশাহত হলো না। হাল ছাড়লে তো চলবে না। যেহেতু একটা ভুল করে ফেলেছে তবে ক্ষমা চাইতেই হবে। আর শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, ক্ষমা পেতেও হবে। আবারো ডাকলো,

“বাবা!”

মিজান হোসেন এবারে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“কি প্রয়োজন? নিজে তো সিদ্ধান্ত নিতে শিখে গেছো। এখন তো আর বাবাকে প্রয়োজন নেই, তবে এসেছো কেন আমার কাছে?”

“আমাকে পাঁচটা মিনিট সময় দাও কিছু বলার। তোমাকে বোঝানোর সুযোগটা অন্তত দাও। কোন পরিস্থিতিতে আমি এত তাড়াহুড়োতে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি সেটা অন্তত বোঝাতে দাও।”

“ঠিক আছে সুযোগ দিলাম। আশা করছি কোন মিথ্যে বলবে না।”

আরমান লম্বা একটা শ্বাস টেনে বলল,

“যদিও আরু আমাকে এই কথাটা বলতে নিষেধ করেছিল তবুও আমি বলছি। আসলে উনি খুব ভয় পাচ্ছিলেন বাবা। তবে আমার তোমার উপর বিশ্বাস আছে।”

মিজান হোসেন ভ্রুঁ কুঁচকে আরমানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“কি কথা?”

“আসলে বাবা ওনার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড খুব একটা ভালো না। মানে যদি একদম খাঁটি বাংলা ভাষায় শুনতে চাও তবে ওনার বাবা নাকি সন্ত্রাসী ছিলেন।”

চমকে উঠলেন মিজান হোসেন। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

“কি বলছো এসব?”

“আরে ভয় পাচ্ছো কেন বাবা? আগে ছিলেন এখন নেই। কিন্তু আরজু তেমনটা না। আসলে উনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন সেই পরিবেশটা খুব খারাপ ছিল।”

“মানে?”

আরমান আবারো একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলা শুরু করল। যতটুকু জানে আরজুর বিষয়ে ততটুকুই বলল। আরজুর পরিবারের সম্বন্ধে কিছু বলল, সেই সাথে বলল আরজুর একার সংগ্রামের কথা। যদিও আরমান নিজেও সবটা জানে না। তবুও যা জানে তাই বলল।

টাকার অভাবে আরজু কত কষ্ট করেছে সেসব বলল, নিজেই নিজের সমস্ত খরচ চালানোর কথা বলল, বেশিরভাগ রাতে পানি খেয়ে ঘুমোনোর কথা বলল, জামা কাপড় কিনতে না পারার কথা বলল, একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল বারবার সেলাই করে পরার কথা বলল।

সেই সাথে বলল মানুষ আর ভালোবাসার প্রতি আরজুর তীব্র অবিশ্বাসের কথা। একটা অসুস্থ পরিবেশে বড় হওয়ায় ফলে আরজুর মানুষের প্রতি ঠিক কতটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল সেসব বলল। সেই সাথে মিজান হোসেনকে এটাও খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিল যে কেন আরজুর এক কথাতেই আরমান বিয়েতে রাজি হয়েছিল। কেনই বা আরজু হঠাৎ করে বিয়ের জন্য চাপ দিয়েছিলো সবই বলল।

বলা শেষে থামল আরমান। এখন পালা মিজান হোসেনের প্রতিক্রিয়া জানার। মিজান হোসেন এখনো ঘোরের মাঝে আছেন। অদ্ভুত ভাবে আরমানের দিকে তাকিয়ে আছেন। আরমানের কেন যেন একটু চিন্তা হলো। এতগুলো কথা বলে গেল আরমান অথচ উনি একটা কিছু বললেন না ব্যাপারটা আসলেই চিন্তার।

“কিছু বলো বাবা?”

মিজান হোসেন ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“মেয়েটাকে বিয়ে করা আমি তোমায় ভুল বলছি না। বরং ভালো কাজ করেছো। আমি বাহবা জানাচ্ছি তোমায়। এমন অসহায় মেয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সাহস কজনই বা দেখাতে পারে। তবে এভাবে হুট করে আমাদেরকে না জানিয়ে বিয়েটা করে ঠিক করোনি। আমরা জানলে মেয়ের পরিবারের সাথে কথা বলতাম। পারিবারিকভাবে বিয়েটা হতো তোমাদের।”

“সেটা কখনোই সম্ভব হতো না বাবা। আমি তোমাকে হয়তো বোঝাতে পারিনি আরজুর পরিবারের ব্যাপারে সেজন্য তুমি এখনো ভাবছো পারিবারিকভাবে বিয়েটা হওয়া সম্ভব। আচ্ছা তুমি আমায় একটা কথা বলোতো, একজন মানুষের নিজের ভাইয়ের প্রতি ঠিক কতটা ঘৃণা জমে থাকলে সে তার মৃ'ত্যু কামনা করে? নিজের ভাই কতটা জঘন্য মানুষ হলে আরজু এমনটা ভাবতে পারে? আরজু চায় ওনার ভাই যেন মা'রা যায়। আর তার কারণ ওনার ভাই মা'রা গেলে নাকি অনেকগুলো মানুষের জীবন বেঁচে যাবে।”

কথাটা ভীষণ অদ্ভুত লাগলো মিজান হোসেন এর কাছে। সত্যি বলতে উনি আসলে ঠিকঠাক ভাবে আন্দাজ করে উঠতে পারছেন না আরজুর পরিবার সম্বন্ধে আরমানের কথা শুনে। করবেনই বা কি করে। আরমানও তো সবকিছু জানে না যে একেবারে শুরু থেকে সব বলবে।

তবে এখন আর এসব জেনে কি লাভ। বিয়েটা তো হয়েই গেছে। তবে চিন্তা হলো ছেলের জন্য। আরমানের ভাষ্যমতে আরজুর বাবা যদি কোন এক কালে সন্ত্রাসী থেকে থাকেন এখনো নিশ্চয়ই সম্পূর্ণভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভয় হলো যদি ওনার ছেলের কোন ক্ষতি করে দেয়।

আতঙ্কিত গলায় বললেন,

“যদি ওরা তোমার কোন ক্ষতি করে দেয়?”

আরমান আশ্বস্ত করে বলল,

“করবে না বাবা। আরজু কে নিয়ে ওদের এত চিন্তাই নেই। ওরা খোঁজ নেয় না মেয়েটার। মেয়েটা বাঁচলো কি ম'র'ল, কি খেল, কিভাবে থাকলো কিছু যায় আসে না ওদের।”

“ভালো হলেই ভালো। দিনশেষে ছেলে মেয়েরা ভালো থাকুক সব বাবা-মা সেটাই চায়।”

“তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ বাবা, আমি যে তোমায় এ কথাগুলো বললাম তুমি আরজু কিংবা বাকি কাউকে আর বলো না। ওনার অস্বস্তি হবে। উনি আসলে ভয় পাচ্ছেন, বারবার ভাবছেন তোমরা যদি ওনার পরিবার সম্বন্ধে জেনে যাও তবে হয়তো ওনাকে গ্রহণ করবে না।”

“এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। তুমি জানাওনি ওকে তোমার পরিবার সম্বন্ধে?”

“বললাম তো বাবা উনি খুব কম বিশ্বাস করেন মানুষকে। জানিনা আমাকে কি করে বিশ্বাস করে নিলেন। আমার এত সৌভাগ্য ছিল আমি জানতাম না। আর একটা অনুরোধ রাখবে বাবা?”

মিজান হোসেন মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,

“ওনাকে একটু ভালোবেসো হ্যাঁ? তনুশ্রীকে যেমন আদর করো তেমন আদর করো। ওনাকে ভালোবাসার মানুষের খুব অভাব। বাইরে থেকে দেখতে ওনাকে হয়তো খুব শক্ত মনে হয় কিন্তু একটু ভালোবাসা পেলে নরম হয়ে যায়। একদম পা'গলি।”

“আর যদি আমার ছেলের কিছু হয়ে যায়? এই বিয়েটা করার জন্য যদি আমার ছেলের কোন ক্ষতি হয়ে যায়?”

আরমান এবারে মিজান হোসেনের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুনয়ের স্বরে বলল,

“যার ভাগ্যে যেভাবে মৃ'ত্যু লেখা আছে সেভাবেই হবে বাবা। আর আরজুর জন্য কখনোই আমার কোন ক্ষতি হবে না। তবে তাও তুমি আমায় কথা দাও যদি আমার কখনো কিছু হয়েও যায় তোমরা তার জন্য আরজু কে দোষারোপ করবে না। আমার অবর্তমানে তুমি ওনার খেয়াল রাখবে। আমি তোমায় সব থেকে বেশি ভরসা করতে পারি বাবা। তুমি আমায় কথা দাও যদি কখনো আমি নাও থাকি ওনার কোন অযত্ন তুমি হতে দেবে না।”

“আমি কি এতটা মহৎ হতে পারব বাবা, যে যার কারণে আমার ছেলের ক্ষতি হবে তাকে আমি ভালোবাসবো?”

“তোমাকে হতেই হবে বাবা। আর আমি তো বলছি আরজুর জন্য আমার কোন ক্ষতি হবে না। আমি ওনাকে কথা দিয়ে বিয়ে করেছি বাবা যে কখনো ওনাকে ভালোবাসার কমতি অনুভব করতে দেবো না। আমি সারা জীবন ওনাকে যত্নে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ওনার সব স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব নিয়েছি, ওনার জঘন্য অতীত গুলো মুছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছি। আমাকে সেসব করতেই হবে।”

_________

আজ প্রায় পুরো দিন আরজু শাড়ি পরেই থেকেছে। এখন আর নতুন করে আবার শাড়ি পরা অসম্ভব। শাড়ি দেখলেই এখন রাগ উঠে যাচ্ছে। সাথে করে তো কিচ্ছু নিয়ে আসেনি। আরজু যে এখন শাড়িটা খুলে একটা জামা পরবে সেই উপায়ও নেই।

একটু পরে তনুশ্রী এলো ওকে জিজ্ঞেস করতে যে শাড়ি পরবে নাকি জামা পরবে। আরজু হা করে কিছুক্ষণ তনুশ্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ভাবলো কিভাবে বুঝলো এই মেয়েটা যে আরজুর এখন একটু জামা কাপড় বদলানো দরকার।

আরজু কে নিজের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তনুশ্রী যেন আন্দাজ করতে পারলো আরজুর মনের প্রশ্নটা। আলতো হেসে বলল,

“ভাইয়া পাঠিয়েছে আমায়। তুমি বলোনা ভাবি তোমার জন্য শাড়ি আনবো না জামা? এই যা তোমায় তুমি বলে ফেললাম। তুমি কি রাগ করলে?”

আরজু মোটেও রাগ করেনি। বরং ভালোই লেগেছে তুমি ডাকটা। তার থেকেও ভালো লেগেছে ভাবি ডাকটা। তনুশ্রীর মুখ থেকে ভাবি ডাকটা শুনতে খুব সুন্দর লাগলো। কই আগে তো বুঝতে পারেনি আরজু এই ডাকটা এত মিষ্টি হয়। মনে হলো আগে জানলে আরো অনেক আগেই আরমান কে বিয়ে করে নিত।

আরজু দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না রাগ করিনি। তুমি, তুমি বলেই ডেকো।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। এখন বলো কি পরবে, শাড়ি?”

“না। আমার না শাড়ি পরার অভ্যাস নেই। একটা পুরোনো জামা দেবে তোমার? নতুন দিতে হবে না। পুরোনো দিলেই হবে।”

“সরি ভাবি আজকে নতুন দিতেও পারবো না। আজকে কষ্ট করে তুমি পুরোনোই পরে নাও। কাল তোমার জন্য নতুন জামা কিনে আনবো। এখন তুমি আমার সাথে আমার ঘরে চলো। যেটা তোমার পছন্দ হয় সেটা নিও।”

আরজু আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না না আমার পছন্দ করতে হবে না। তোমার যেটা সবথেকে কম পছন্দ সেটাই দিও।”

তনুশ্রীর একটু অদ্ভুত লাগলো তবে কোনো প্রশ্ন করলো না।

“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি থাকো আমি আনছি।”

_______

ঠান্ডার দিন হলেও আরজু রাতেই গোসল করলো। ডলতে ডলতে আগে মুখ থেকে সব সাজগোজ তুললো। এতক্ষণে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরজু নিজেকে চিনতে পারছে। সালোয়ার কামিজ পরেছে। একদম সাধারণ লাগছে আরজুকে। এলোমেলো চুল, মুখে কোনো সাজ নেই।

তনুশ্রী বলে গেছে তৈরি হয়ে নিচে যেতে। আরজু এভাবে একবার যেতে ধরলো তবে পরক্ষণেই মনে হলো এভাবে গেলে তো ভালো লাগবে না ওকে দেখতে। আরমানের বাড়ির লোকদের তো পছন্দ হবে না। তবে কথা হলো আরজুর কাছে তো কোন সাজগোজের জিনিসও নেই যেগুলো দিয়ে একটু সাজবে। ঘরে থাকা ড্রেসিং টেবিলের উপর শুধু একটা চিরুনী পেল। সুন্দরভাবে শুধু চুলটা আঁচড়ালো।

ঘর থেকে বের হলো নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তবে কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছে আরজুর। এদিকে আরমানও নেই। আরজু কে ঘরে রেখে অন্য ঘরে গিয়েছিল গোসল করতে। আরমানের কি উচিত ছিল না গোসল শেষে একবার আরজুর খোঁজ নিয়ে যাওয়া। বেয়াদব ছেলে। বাড়িতে এসেছে আর ওমনি আজও খোঁজ নেওয়ার কথা ভুলে গিয়েছে। আরজু সব বুঝতে পারছে। আর এই ছেলে যে খুব তাড়াতাড়ি বদলে যাবে সেটাও বুঝতে পারছে।

ওপরে দাঁড়িয়ে নিচে উঁকি দিতেই বসার ঘর দেখতে পেল। সেখান থেকে খাবার টেবিলও দেখা গেল। বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের দেখতে পেল আরজু তবে দেখতে পেল না আরমানকে। সবাই বোধহয় কাজে ব্যস্ত। কিন্তু আরজু কে তো নিচে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে তনুশ্রীকেই ডাকলো।

“তনুশ্রী!”

আরজুর ডাকটা কানে যেতেই তনুশ্রী মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,

“হ্যাঁ ভাবি, নিচে এসো।”

আরজু ইতস্তত গলায় বলল,

“আসবো?”

“হ্যাঁ আসবে। সবাই একসাথে খাবার খাব।”

তনুশ্রীর থেকে ইতিবাচক উত্তর পেয়ে আরজু যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। আরজুর পাশের ঘর থেকে তৎক্ষণাত দরজা খুলে আরমান বের হলো। আরমানকে দেখে আরজু থমকালো। আরমানও গোসল করে বেরিয়েছে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো আরমানের পরনে এখন টি শার্ট আর লুঙ্গি। এর আগে কখনো আরমান কে লুঙ্গি পরে দেখেনি।

সুন্দর লাগছে ছেলেটাকে দেখতে। সুন্দর মানুষ যা পরে তাতেই ভালো লাগে। সবে মাত্র গোসল করে বেরিয়েছে। মুখের উজ্জ্বলতা আরো বেড়েছে। তবে কথা হলো আরমান কে লুঙ্গি পরে দেখে আরজুর হাসি পেল।ফলস্বরুপ ফিক করে হেসে দিল।

আরমান বুঝলো না আরজুর হাসির কারণ। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“হাসলেন কেন আরু?”

বিজ্ঞাপন

আরজু নিজের হাসি থামিয়ে বলল,

“আপনাকে এর আগে কখনো লুঙ্গি পরে দেখিনি তো তাই।”

“কেন? ভালো লাগছে না আমায় দেখতে? আমার জানামতে আমি তো সুন্দর, যা পরি তাতেই আমায় ভালো লাগে।”

এই পর্যায়ে গিয়ে আরমানের কথাটা শুনে আরজুর মুখ ভঙ্গি কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠলো। কে জানে কি বুঝলো। তবে হুট করে আরজুর এভাবে থমথমে হয়ে যাওয়া আরমানকে ভাবালো। চিন্তিত গলায় বলে উঠলো,

“কি হলো আরু, ভুল কিছু বলে ফেললাম?”

“না, কিছু না। নিচে চলুন।”

কথাটা বলে আরজু আগে আগে হাঁটা দিল। আরমান ওর পিছন পিছন গেল। কিছু করার নেই। যেহেতু আরজু কিছু বলেনি তাই জোর করা উচিত হবে না।

আমেনা বেগম বাদে বাকি সবাই চেয়ারে বসে পড়েছে। আরমান জানে ওর জন্য বরাদ্দ চেয়ার কোনটা। নিজে গিয়ে সেখানে বসে পড়লো। তবে আরজু বসতে পারল না। সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো। আরমান নিজের পাশে জায়গা ফাঁকা দেখে ঘাড় ঘুরে পিছনে তাকিয়ে দেখল ওর ঠিক পিছনে আরজু দাঁড়িয়ে আছে। আরমান ইশারায় নিজের পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বলল,

“বসুন আরু?”

আরজু নিশ্চিত হতে বলল,

“বসবো?”

আরজুর এমন প্রশ্নে সবাই চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। আরমান কিছু বলার আগেই আমেনা বেগম নিজে এগিয়ে এসে আরজুকে ধরে বসিয়ে দিলেন আরমানের পাশের চেয়ারটায়।

আজ সবাই বাদ। আমেনা বেগম আগে খাবার পরিবেশন করবেন ছেলের বউকে। তবে খাবার পরিবেশন করার আগে তিনি আরজু কে অপরাধী গলায় বললেন,

“আসলে মা আমি তো জানতাম না যে তোমরা আজকে আসবে। তুমি কি খেতে পছন্দ করো সেসবও কিছু জানি না। আজকে একটু এসব দিয়ে খেয়ে নাও, কাল তোমার পছন্দমত রান্না করবো কেমন?”

আরজু তাড়াহুড়ো করে বলল,

“না না আমার জন্য আলাদা করে রান্না করার কি আছে? আমাকে তো রাতে খেতে না দিলেও চলবে। আমি তো পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারি।”

আরেক দফা সবাই বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো আরজুর দিকে। আমেনা বেগমের হাতটা থেমে গেল। মিজান হোসেন তাকালেন ছেলের দিকে। আরমানও তাকালো ওনার দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। আরমান যেন নিজের দৃষ্টির মাধ্যমে আরজুর অসহায়ত্ব বোঝাতে চাইলো ওনাকে। মিজান হোসেন ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নরম গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“রাতে না খেয়ে ঘুমোবে কেন? তুমি এই বাড়ির বউ। এখন বিয়েটা যে পরিস্থিতিতেই হোক না কেন বউ তো তুমি এই বাড়ির।”

আরজু সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,

“আপনি মেনে নিয়েছেন?”

“উপায় তো নেই আর।”

“তার মানে উপায় থাকলে মেনে নিতেন না?”

মিজান হোসেন একটু নড়েচড়ে উঠে বললেন,

“না, তেমনটা না।”

“তবে আপনি যে বললেন আর কোন উপায় নেই। এর থেকে তো এটাই বোঝা যায় উপায় থাকলে আপনি আমাকে মেনে নিতেন না। তবে কোন ব্যাপার না, দয়া করে হোক, মায়া করে হোক বা স্বেচ্ছায় হোক আপনি মেনে নিয়েছেন এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।”

আমেনা বেগম থামিয়ে দিলেন সবাইকে। খাওয়ার সময় এত কথাবার্তা তার ঠিক পছন্দ হয় না। এই এত কথা বলার জন্য প্রত্যেক বেলাতেই তাশরীফ ওনার কাছে বকা খায়। থেমে গেল সবাই।

আমেনা বেগম সবাইকে খাবার পরিবেশন করলেন ঠিকই তবে বেশি যত্ন করলেন আরজুর। আরজু খেলো খুবই অল্প। একেই তো অস্বস্তি হচ্ছে, তার ওপর আবার রাতে খাওয়ার অভ্যাস তেমন একটা নেই। যার ফলে এখন আর ক্ষুধা লাগে না।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আরমান আরজুকে নিয়ে আবার নিজের ঘরে এলো ঘুমোনোর জন্য। ঘরে ঢোকার পর এবার আরমানই দরজাটা বন্ধ করলো। আরজু কে আর কিছু বলতে হলোনা।

আরজু আগে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে যাওয়ার সময় ভেজা চুলটাই খোপা করে গিয়েছিল। সেই খোপাটা আগে খুলল। এমন পরিপাটি চুল আরজুর ঠিক পছন্দ হলো না। হাত দিয়ে নিজের পরিপাটি চুল গুলো এলোমেলো করলো। এবার দেখতে একদম পুরনো আরজুর মত লাগছে। আরজু পিছনে ঘুরতেই আরমানের সাথে ধাক্কা খেল। আরজু ভয়ে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে?”

বরাবরের ন্যায় আরমান দাঁত বের হেসে বলল,

“কিছু না।”

“তো পিছে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

“এমনি।”

বিরক্ত হলো আরজু। একেই তো আরমানের কথার মাঝে কোন যুক্তি খুঁজে পেল না। তার মধ্যে এমন বিনা কারণে আরমানের হাসা। বিরক্ত লাগে এই ব্যাপার গুলো আরজুর। আরমানকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

আরজুর এখন প্রধান কাজই হলো পুরো ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখা। ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। দেয়ালে টানানো একটা ছবি দেখতে পেল। ছবিতে অনেক মানুষকে দেখা যাচ্ছে। আরজু আন্দাজ করলো এখানে আরমানের পুরো পরিবার। তবে এখানে আরমান কোনটা সেটা হলো প্রশ্ন। অনেক গুলো বাচ্চাকেই তো দেখা যাচ্ছে। পিছন ঘুরে আরমানকে ডাকতে ধরলো অমনি আবারও ধাক্কা খেল আরমানের সাথে।

আরজু বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

"এমন ছুঁকছুঁক করছেন কেন আপনি? কি সমস্যা? সেই থেকে দেখছি আমার পেছন পেছন ঘুরছেন, বখাটেদের মতন ছোঁয়ার চেষ্টা করছেন।"

আরমান চোখ-মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলে বলল,

"বিয়ের আগে ছুঁলেও সমস্যা, বিয়ের পরে ছুঁলেও সমস্যা এ কোন বিপদে পড়লাম। বউকে ছুঁলেও যদি বখাটে হই তাহলে তো আমার কচু গাছের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়া উচিত।"

আরজু চোয়াল শক্ত করে প্রশ্ন করলো,

“সত্যি করে বলুন উদ্দেশ্য কি আপনার?”

আরমানের মনে হলো এটাই মোক্ষম সুযোগ নিজের উদ্দেশ্য বলার। যেহেতু আরজু নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করেছে তাই এখনই বলতে হবে। নাহলে পরে আর এই সুযোগ পাওয়া যাবে না।

আরমানের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি বদলালো। আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে গেল। আরমান কে নিজের দিকে ঝুঁকতে দেখে আরজু পিছন দিকে ঝুঁকে গেল। আরমান আরেকটু ঝুঁকে গেল আরজুর দিকে। একপর্যায়ে আরজু পিছিয়ে যেতে ধরে পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে তাল হারালো। খপ করে আরমানের টি-শার্ট খামচে ধরলো আরজু। আরমান আবারো সুযোগের সদ্ব্যবহার করে একহাতে আরজুর কোমর পেঁচিয়ে ধরে সম্মোহনী গলায় বলল,

"আমার চোখের দিকে তাকান আরু। কিছুই কি বুঝতে পারছেন না? আপনি কি বুঝতে পারছেন না আমি কি চাইছি?"

আরজু তাকালো আরমানের চোখের দিকে। আজ আরজুর তীরের ফলার ন্যায় ধারালো দৃষ্টিতেতেও আরমান বিভ্রান্ত হলো না। পলকহীন ভাবে তাকিয়ে রইলো। বেশ অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকার পর আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,

"পারছি তো বুঝতে। সব বুঝতে পারছি। ঘরে একলা একটা অসহায় মেয়ে কে ছোঁয়ার লোভে চোখ দুটো চিকচিক করছে।"

আরমান আর এক সেকেন্ডও ধরে থাকতে পারলো না আরজু কে। তৎক্ষণাত আরজু কে ছেড়ে দিয়ে বেশ অনেকটা দুরে দাঁড়ালো। আরজুর বলা শেষের বাক্যটা শুনে আরমান এতটাই বেশি লজ্জা পেয়ে গেছে যে এই মুহূর্তে আরমানের পক্ষে চোখ তুলে তাকানোও সম্ভব না।

সেই সাথে আরমান আরেকটা কথা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারলো যে আরমান যতই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করুক না কেন আরজু চাইছেই না আরমানকে সুযোগটা দিতে। আর আরজু কে রাগানোর কোন মানেই হয় না।

আরমান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনি বিছানায় শুয়ে পড়ুন আরু। আমি সোফায় ঘুমিয়ে যাব।”

আরজু কপাল কুঁচকে বলল,

“কোথায় ঘুমোবেন?”

“আপনার সাথে ঘুমোবোনা আমি চিন্তা নেই। আপনি বিছানায় ঘুমোন। আমি সোফায় ঘুমিয়ে পড়বো।”

আরজু আবারও বেশ অনেকক্ষণ আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। কে জানে কি ভাবলো, কি বুঝলো। কিছুক্ষণ পর গম্ভীর গলায় বলল,

“ঠিক আছে ঘুমোন। আমিও ঘুমোবো।”

আরমানের কেন যেন নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো। তবে কিছু করার নেই। আরজুও তার মানে সত্যিই চাইছে না যে আরমান ওর সাথে ঘুমোক। বাধ্য হয়ে কম্বল নিয়ে কি সোফায় শুয়ে পড়লো। আরজু ঘুমোলো বিছানায়।

আরমান ঠিক করলো আজ আর আরজু কে দেখবেই না। না হলে দেখলেই মনের মাঝে আজেবাজে ইচ্ছে চলে আসবে। একদম কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। তৎক্ষণাত ভেসে এলে আরজুর কণ্ঠস্বর।

“আরমান!”

আরমান যেন আবার একটা আশার আলো দেখতে পেল। তাড়াহুড়ো করে কম্বলের নিচ থেকে বের হয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“হ্যাঁ আরু।”

“আচ্ছা আরমান বাড়ির বউদের কি করতে হয়? আমাকে তো এই বাড়িতে নিয়ে এলেন কিন্তু আমার এখন করনীয় কি? কাল সকালে উঠে আমি কি করবো? কি করলে আপনার বাড়ির লোকজন খুশি হবে?”

প্রথমত আরমান আশাহত হলো। ভেবেছিল আরজু অন্য কিছু বলবে। তবে এই কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ভাবনায় থাকা আজেবাজে চিন্তাগুলো মাথা থেকে বের করে দিয়ে আরমান আলতো হেসে আরজু কে আশ্বস্ত করে বলল,

“এমনিতেই আমার বাড়ির লোকজন খুশি আরু। আপনাকে আমার বাড়ির লোকদের খুশি করার জন্য আলাদা করে কিছু করতে হবে না।”

“কিন্তু আমি করবোটা কি এখানে? কি করতে হয় বাড়ির বউদের আমি তো এসব কিছু জানি না। আমাকে একটু বলুন না।”

“কিছু করতে হবে না। আপনি সারাদিন আমার সাথে থাকবেন তাহলেই হবে।”

আরজু সন্দেহী গলায় বলল,

“এতোটুকু করলেই হয়ে যাবে?”

“হ্যাঁ। এখন ঘুমিয়ে পড়ুন, অনেক রাত হয়েছে। গুড নাইট।”

কথাটা বলে আরমান অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আসলে আরজুর দিকে তাকিয়ে থাকলে আরমানের সমস্যা হচ্ছে। কথা বললে তো আরো সমস্যা হচ্ছে। বলা যায় না শয়তান প্ররোচনা দিতে পারে। আর যদি শয়তানের প্ররোচনাশ পড়ে গিয়ে আরমান নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তবে সমস্যা হয়ে যাবে।

এদিকে আরমানের এত তাড়াহুড়ো পছন্দ হলো না আরজুর। চোখ মুখ গম্ভীর করে বিড়বিড় করে বলল,

“মনে থাকে যেন, স্বেচ্ছায় সোফায় গিয়ে ঘুমিয়েছেন। আপনার যে আমার সাথে ঘুমোতে অসুবিধা হবে জানতাম না। তবে একবার যখন আলাদা ঘুমিয়েছেন আপনি ভাবতেও পারছেন আমার সাথে একই বিছানায় ঘুমোতে চাইলে আপনাকে কতটা কষ্ট করতে হবে।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প