বেশ অনেক রাত পর্যন্ত আরজুর সাথে গল্প করেছে আরমান। ঘুমােতে ঘুমােতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন সকাল বাজে দশটা। তাও ঘুম থেকে ওঠেনি। ঘুমের মাঝেই দরজায় জোরে জোরে করাঘাতের শব্দ পেল। সেই সাথে মহিন হােসেনের গলার স্বরও পেল। বিরক্ত হলো আরমান। ঘুমুঘুমু গলাতেই একবার চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“পরে এসো কাকা।”
মহিন হোসেন বুঝলেন আরমানকে এখন ঘুম থেকে তোলা বেশ মুশকিল হবে। তাই তিনিও একটি বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন,
“তাড়াতাড়ি ওঠ। আরজু চলে যাচ্ছে।”
কিসের ঘুম, কিসের পরে ওঠা। লাফ দিয়ে উঠে বসলো আরমান। গা থেকে কম্বলটা ছুঁড়ে মে'রে দরজা খুলে ব্যস্ত গলায় বলল,
“কই আরু? কেন চলে যাচ্ছে?”
“জানতাম এটা বললেই উঠে যাবি। কোথাও যাচ্ছে না তোর আরু। এখন ঘরে চল, তোর সাথে কিছু কথা আছে।”
আরমান নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“তুমি এমন কেন? আমার ঘুম সহ্য হলো না? কাকিকে বলবো?”
মহিন হোসেন ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,
“চুপ। সাহস তো কম না। আমার বউয়ের ভয় আমাকে দেখাস। ভিতরে চল গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সেসব শুনলে এমনি তোর চোখ থেকে ঘুম উড়ে যাবে।”
শেষের দিকে মহিন হোসেনের কন্ঠটা গুরুতর আকার ধারণ করল। আরমান ঘরে এলো। ওর পিছন পিছন মহিন হোসেনও ভেতরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলেন। মেঝেতে পড়ে থাকা কম্বলটা তুলে নিয়ে সেটা মুড়ি দিয়ে বিছানার উপর বসলো আরমান। চোখে আর ঘুম নেই, তবে অলসতা আছে।
“বলো কি বলবে?”
“তানভীরের এক্সিডেন্ট যে ট্রাকের সাথে হয়েছিল সেই ট্রাক চালকের খোঁজ পেয়েছি। জানিস, খোঁজ করে দেখলাম ওই ড্রাইভার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় মাফিয়ার বেশ কাছের লোক।”
আরমান কপাল কুঁচকে বলল,
“মাফিয়ার মানে?”
“মাফিয়া মানে মাফিয়া। ওর নামে অনেকগুলো কেস আছে, মার্ডারের কেসও আছে। তবে প্রভাবশালী হওয়ায় বারবার জামিন পেয়ে যায়। অস্ত্র পাচার, মাদক পাচার সবের সাথে জড়িত। এমনকি নারী পাচারেও হাত আছে। আপাতত পলাতক। ও কেন তানভীর কে মা'রতে চাইলো? এমন একটা লোকের সাথে তানভীরের কি যোগাযোগ থাকতে পারে?”
ভাবনার মাঝে পড়ে গেল আরমান। সত্যিই তো এমন পলাতক আসামির সাথে তানভীরের কি যোগাযোগ থাকতে পারে। অবশ্য তানভীরের যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা নেই। সম্ভাবনা বেশি তাওকীরের যোগাযোগ থাকার। আরমান তো এ বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত ছিল যে তাওকীরকেই মা'রার উদ্দেশ্য ছিল। যদিও তাওকীর স্বীকার করেনি।
“কাকা তানভীর না, তাওকীর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ আছে। কিন্তু কেন?”
“আমিতো নিজেও সেটা বুঝতে পারছি না। রাজনৈতিক কোন সূত্র নেই, ব্যবসার কোন সূত্র নেই। ওর ব্যবসায়ই তো সম্পূর্ণ আলাদা। তাহলে তাওকীরের সাথে কিসের যোগসূত্র? আমি সত্যি বুঝে উঠতে পারছি না।”
“আচ্ছা নাম কি মাফিয়ার? কোন ছবি দেখাতে পারবে?”
“নাম জেমস। ছবি আপাতত আমার কাছে নেই। পরে দেখাতে পারবো।”
উঠে দাঁড়ালো আরমান। তোয়ালেটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে পিছনে বসে থাকা মহিন হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“রেডি হও যাও। বড় আব্বুর বাড়ি যেতে হবে।”
“আগেই কি তাওকীর কে জানানো ঠিক হবে?”
“জানাতে তো হবেই। ভাইয়ের চোখে অস্বস্তি দেখলে তবেই না নিশ্চিত হব যে ওই জেমস এর সাথে ভাইয়ের যোগাযোগ আছে কি নেই। আর অবশ্যই প্রসঙ্গটা তুলতে হবে ভাবীর সামনে। যদি সত্যিই কোন যোগাযোগ থেকে থাকে তবে ভাই এমনিতেই তোতলাবে।”
মহিন হোসেন একটু চিন্তিত গলায় বললেন,
“তুলবো হিমির সামনে এই কথাগুলো? ও তো চিন্তা করবে।”
“সরাসরি বলবো না তো। তুমি এমনি জেমস জেমস বলে চেঁচাবে। জেমসের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো একটু বলবে, ও কি কাজ করে, ওর সহযোগী কারা এই বিষয়গুলো নিয়ে একটু বলবে। ও পলাতক, তোমরা ধরার চেষ্টা করছো এগুলো বলবে।”
“তাহলে হিমির সামনে বলার কি দরকার?”
আরমান আলতা হেসে বলল,
“দুর্বলতা কাকা দুর্বলতা। ভাবী হলো ভাইয়ের দুর্বলতা। আঘাত করছি না দুর্বলতায়, শুধু সেই দুর্বলতাটাকে কাজে লাগিয়ে সত্যিটা বের করার চেষ্টা করছি। ভাবীর সামনে মিথ্যে বলতে অবশ্যই ভাইয়ের বুক কাঁপবে।”
_________
মাঝে বেশ অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। ভার্সিটিও খুলেছে। আরজু আবার নিজের হোস্টেলে ফিরে গেছে।
সকাল থেকেই আরমানের মন মেজাজ ভীষণ খারাপ। গ্রামে যাবে আজ। গ্রামের কিছু মাতব্বরের সাহস অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে। আজ নাকি আবার সালিশ ডেকেছে। সেই সালিশে আবার মিজান হোসেনকে যেতেও হবে।
আবার কয়েকটা ছোকরা নাকি তাশরীফকে থাপ্পর মে'রেছে। আবার মিজান হোসেনের অনুপস্থিতি তে নাকি কিছু মহিলারা এসে আমেনা বেগম আর তনুশ্রীকে খোঁচা দিয়ে যায়। তাদের স্বামী আর ছেলেরা মিলে হুমকি দেয় মিজান হোসেন আর তাশরীফকে।
তনুশ্রীর যাতায়াতের পথে নাকি সেই ছোকরারা আজেবাজে কথা বলে। অত্যাধিক সাহস বেড়ে গেছে। বোধহয় ভুলে গেছে কার পরিবারের দিকে হাত বাড়িয়েছে। আরমান মনে মনে ঠিক করেছে সবকটার গিয়ে যদি ঠ্যাং না ভেঙেছে তবে নিজের নাম বদলে ফেলবে।
দুপুর বারোটায় টায় সালিশ বসবে, আরমানকে তার আগেই পৌঁছাতে হবে। মিজান হোসেন তো কিছু জানায়নি ওকে, বাড়ির কেউই জানায়নি তাশরীফ ব্যতীত। ভাগ্যিস তাশরীফ জানিয়েছিল। আরমান আর বাকি কাউকে জানায়নি। বাকিদেরকে জানালে আবার ঘটনাটা একটু বেশিই জটিল হয়ে যাবে।
বেরোনোর আগে আরমানের ফোনে একটা কল এলো মুনতাসিরের নাম্বার থেকে। আরমান ফোনটা রিসিভ করে ব্যস্ত গলায় বলল,
“মুনতাসির, বলো।”
“হামিদ কে গ্রেফতার করেছে আরমান ভাই।”
“এটাতো হওয়ারই ছিল। ভুল দিকে হাত বাড়িয়ে ছিল। ওর ঠিক করা সাক্ষীরা ওর বিরুদ্ধেই সাক্ষী দিয়েছে। আচ্ছা যাই হোক, এখন ফোনটা রাখছি। আমি গ্রামে যাচ্ছি। ফ্রি হলে তোমাকে কল দেব।”
আরমানের ব্যস্ততা দেখে মুনতাসিরও ফোনটা রেখে দিল। আরমান দরজায় তালা লাগাতে লাগাতে আরজুর নাম্বারে ফোন দিল। তবে আরজু ফোনটা রিসিভ করলো না। আরমান আরো দু-তিনবার কল করলো তবে আরজু তাও রিসিভ করলো না। ভাবলো হয়তো ক্লাসে আছে।
আরমান আরজুর নাম্বারে একটা মেসেজ দিয়ে রাখল। যেন আরমান কে ফোনে না পেলে মেসেজ দেখে কারণটা বুঝতে পারে।
_________
ক্লাস শেষে আরজু ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে দেখলো আরমানের নাম্বার থেকে অনেকগুলো কল এসেছে। আবার দেখলো একটা মেসেজও এসেছে। মেসেজটা পড়ল আরজু।
❝আরু, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে আমি গ্রামে যাচ্ছি। ফিরতে কয়েকদিন সময় লাগবে। আপনার সাথে দেখা করে যেতে পারলাম না জন্য দুঃখিত। আসলে কাজটাই ভীষণ জরুরী। যদি ঠিক সময়ে ফোন ধরতে না পারি তবে রাগ করবেন না কিন্তু। নিজের খেয়াল রাখবেন। আমার পা'গলীর যেন কোনো অযত্ন না হয়।❞
আরজু বুঝতে পারলো সত্যি খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজই পড়ে গেছে আরমানের। না হলে তো এভাবে বলত না।
আরজু নিজেই কল করলো আরমানের নাম্বারে। একবার রিং হতেই আরমান ফোনটা রিসিভ করলো।
“হ্যাঁ আরু, বলুন? ক্লাসে ছিলেন আপনি? আমি কল দিয়েছিলাম আপনাকে। আমার মেসেজটা দেখেছেন?”
আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“হ্যাঁ দেখেছি।”
“রাগ করবেন না কেমন আমি আপনার সাথে দেখা করে আসতে পারিনি বলে। আসলে গ্রামে খুব ঝামেলা হয়েছে। আজ দুপুর বারোটার মধ্যে আমাকে গ্রামে পৌঁছাতে হবে। ফিরতে হয়তো কয়েকদিন সময় লাগবে। কবে ফিরবো তা ঠিক বলতে পারছি না।”
“আপনি রওনা দিয়েছেন?”
“হ্যাঁ। এইতো মাঝ রাস্তায়। আর এক ঘন্টা লাগবে পৌঁছাতে।”
হঠাৎ করে আরজুর মাথার মধ্যে কি যে খেলে উঠলো আরজু নিজেও বুঝতে পারল না। হুট করে বলে উঠলো,
“ফিরে আসুন।”
ফোনের অপর পাশে থাকা আরমান ভরকালো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেন আরু? সত্যি বলছি খুব দরকার যেতেই হবে আজ।”
ফিরে আসুন বলা পর্যন্ত ঠিক ছিল তবে আরজু এবারে যে কথাটা বলল তা শুনে আরমানের বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। নিজের কানকে কোনমতেই বিশ্বাস হলো না। আরমান নিশ্চিত যে আরজু ভুল করে কথাটা বলেছ।
আরজু সহজ সাবলীল গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বিয়ে করবো আপনাকে। আজ দুপুর বারোটার মধ্যেই বিয়ে করব।”
আরমানের খুশি হওয়া উচিত নাকি উচিত না তা বুঝে উঠতে পারল না। কি হলো আবার আরজুর? হঠাৎ করে আজই বিয়ের ভূত চাপলো কেন মাথায়? আর তাছাড়া গ্রামে যে যেতেই হতো। অর্ধেক রাস্তা তো চলে এসেছে। আরজু কে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো,
“আরু আসলে হয়েছেটা কি, গ্রামে না আজ একটা সালিশ বসবে। আপনি আজকে বিয়ে করতে চাইছেন তো, আজকেই বিয়ে করবো কথা দিচ্ছি। তবে রাতে করি?”
আরজু এবারও বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আজই বিয়ে করবো এবং দুপুর বারোটার মধ্যেই করবো। ফিরে আসুন আপনি। আর আসার সময় আমার জন্য একটা লাল শাড়ি কিনে আনবেন বিয়েতে পরার জন্য। আপনার পছন্দের কেমন?”
আরজুর এমন আবদারের পর আরমান আর কোনমতেই দ্বিমত পোষণ করতে পারল না। গ্রামে বসুক সালিশ, যা হওয়ার হবে। সেই সমস্যার সমাধান আরমান রাতে গিয়ে পরের দিনও করতে পারবে। তবে আরজু যে আবদারটা করেছে আরমানের কাছে এই আবদারটা আরমান ফেলতে পারবে না।
“আসছি আমি। আপনি বারোটার মধ্যে বিয়ে করতে চেয়েছেন, তাই হবে। আপনি এক কাজ করুন মুনতাসিরের বাড়িতে চলে যান। ওখানে দেখা হচ্ছে কেমন?”
থমকালো আরজু। এত সহজে আরমান রাজি হয়ে গেল কি করে? বলল তো গ্রামে নাকি অনেক জরুরী কাজ আছে, আবার অর্ধেক রাস্তা চলেও গেছে তারপরও আরজুর দুবার বলাতেই রাজি হয়ে গেল!
আরজু সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি সত্যি আসবেন নাকি আশা দেখিয়ে আমায় বসিয়ে রাখবেন?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“আরু, আমি আসছি আপনার জন্য আমার পছন্দে কেনা লাল শাড়ি নিয়ে। আপনি শুধু একটু অপেক্ষা করুন। আজই আমার আরু কে লাল টুকটুকে বউ বানিয়ে আমার ঘরে তুলবো।”
_________
বিয়ে, প্রেম, ভালোবাসা এই শব্দগুলা আরজুর কাছে ভীষণ ঘৃণিত ছিল। পুরো অবিশ্বাস্য ছিল। একটা সময় তো আরজু নিজেই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে প্রেম ভালোবাসাতে তো জীবনে জড়াবেই না, বিয়েও করবে না কখনো।
বিয়ে তো তাকেই করা যায় যাকে ভালোবাসা যায়। কেউ তো কাউকে ভালোবাসতেই পারে না, সবাই শুধু অভিনয় করে ভালোবাসার। কিংবা হয়তো নিজের কোন স্বার্থ পূরণের জন্য ক্ষণিক সময়ের জন্য ভালোবাসেও।
আর আরজুর এসব ক্ষণিকের নাটক ভীষণ বিরক্তিকর লাগতো। এত মিথ্যে আরজুর পছন্দ না। তার আরজু ঠিক করেছিল সারা জীবন একাই থাকবে। সঙ্গীর কোন দরকার নেই।
ছোটবেলা থেকেই তো আরজু একাই বড় হয়েছে। যখন পাশে খুব দরকার পড়েছে কাউকে তখনও তেমন কাউকে পায়নি। প্রার্থনা পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে তবে ঠিক পারেনি। আরজু নিজের আশেপাশে যে পরিবেশে দেখেছে তাতে কখনো এটা মনে হয়নি যে পৃথিবীতে ভালো মানুষও থাকতে পারে। এই পৃথিবীতে এমন কোন মানুষও থাকতে পারে যে সত্যিকারে আরজু কে ভালোবাসতে পারবে, যার ভালোবাসায় আরজু বিশ্বাস করতে পারবে।
তবে কিভাবে যেন হঠাৎ করে পেয়ে গেল আরজু এমন একটা মানুষ। প্রথম দিনের বৃষ্টি ভেজা আলাপনে আরমান বলেছিলো যে কোনো অসুখে বোধহয় আরজুর মনটা মরে গেছে। একদমই মিথ্যে বলেনি সেদিন আরমান, ঠিকই বলেছিল। খুব ভয়ংকর একটা অসুখে আরজুর হৃদয়টা সত্যি ম'রে গিয়েছিলো। অবিশ্বাসের অসুখে। ভালোবাসার প্রতি তীব্র ঘৃণা থেকে আরজুর মনটা মরে গিয়েছিল। সেই হৃদয়ে আর কারো প্রতি কোন নমনীয়তা, কোন ভালোবাসা জন্মাতো না।
তবে আরজু নিজের সেই অসুখের ওষুধটা পেয়েছে। আরমান সারিয়ে দিয়েছে আরজুর সে অসুখটা। নিজের ভালোবাসা আর যত্ন দিয়ে আরজুর মনে ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছে আরমান।
বলা যায় পাথরে ফুল ফোটানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে আরমান। নয়তো কি সেই পাথরহৃদয়ের মানবী আরজু যে ভালোবাসা শব্দটা শুনলেও ভয়ে আৎকে উঠতো সেই মানুষটা কি আর নিজ থেকে আরমানকে বিয়ের কথা বলে?
আরমানের কথা অনুযায়ী মুনতাসিরের বাড়িতে এসেছে আরজু। আরমানও এসেছে। আয়োজন হচ্ছে বিয়ের। রান্নাবান্না করছে রুবিনা খাতুন। ওনাকে টুকটাক সাহায্য করছিলো ইরা আর মৃন্ময়ী। অবশ্য ইরা এখন রান্নাবান্না করছে না। আরজুর জন্য আরমানের কিনে আনা লাল টুকটুকে শাড়িটা পরিয়ে আরজু কে তৈরি করার জন্য এসেছে।
এদিকে আরজুর সেসবে কোন ধ্যান জ্ঞান নেই। ইরা শাড়ি পরাতে ধরলে আরজু ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“একবার আরমানকে ডেকে দেবে আপু? কথা ছিল ওনার সাথে।”
“যা কথা বলবে বিয়ের পরে বলবে। এখন সাজগোজ করো।”
“না না না, আগে ওনাকে ডাকো।”
ইরা বুঝল আরজু শুনবে না ওর কথা। জেদ উঠে গেছে। শাড়িটা বিছানার উপর রেখে গেল আরমানকে ডাকতে। একটু পর আরমান এলো। চোখে মুখে তার খুশি উপচে পড়ছে। হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“কি হলো আরু? ইরা বলল আমার পা'গলির নাকি তার কেটে গেছে।”
আরজু বিছানায় বসে ছিল। আরমানের কন্ঠ পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি সত্যি বিয়ে করবেন নাকি আবার বিয়ের আগ মুহূর্তে পালিয়ে যাবেন? আপনার সত্যি বিয়েটা করার ইচ্ছে আছে?”
আরমান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“পালাবো কেন বিয়ের আগে? আর বিয়ে করার ইচ্ছে আবার মিথ্যে মিথ্যে হয় নাকি?”
“ফেঁসে যাবেন কিন্তু। একবার বিয়ে করলে সারা জীবন আমি আপনার সাথে থাকবো, সারা জীবন বিরক্ত করব। ছোট ছোট কথায় আপনার ভুল ধরব, রেগে যাব। মনে রাখবেন, একবার যদি আপনি আমার হয়ে যান তবে অন্য কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলেও তাকাতে দেবো না। রাগ উঠলে আমার মাথা ঠিক থাকে না, আজেবাজে কথা বলে দিতে পারি। এত কিছু জানার পরেও ফাঁসতে চান?”
আরমান হেসে উঠলো। আলতো করে আরজুর গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“কিছু কিছু বন্দিত্বে অসম্ভব রকমের শান্তি থাকে আরু। কিছু কিছু পরাধীনতার মাঝেও থাকে অসম্ভব রকমের আনন্দ। কবুল বলে আপনাকে বিয়ে করব মানে আপনার ছোট ছোট প্রত্যেকটা ভালোমন্দ দিক গ্রহণ করবো।”
আরজু আবারো আরমানকে সাবধান করে বলল,
“ফেঁসে যাবেন কিন্তু। আমি কিন্তু একবার ধরলে আর ছাড়বো না।”
“কতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরবেন? আমার থেকেও বেশি?”
থেমে গেল আরজু। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল,
“চলে যান। আর ইরা আপুকে পাঠিয়ে দিন। আরেকটা কথা শুনুন, আমি কিন্তু খুব সুন্দর না। সাজলেও আমাকে সুন্দর লাগবে না। সবার সামনে আমাকে নিজের বউ হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগবে না তো? আপনি তো আবার দেখতে সুন্দর।”
আরমান এবার সেই দুঃসাহসীক কাজটা করেই ফেলল। আরমান বুঝতে পারছে আরজু কে দেখে আরজুর মাঝে অস্থিরতা কাজ করছে। ভেতরে ভেতরে খুব চিন্তিত আরজু। আরমান একটা বিষয় খেয়াল করেছে আরজুর অস্থিরতার মধ্যে আরমান যদি ওকে একটু জড়িয়ে ধরে মেয়েটা খুব তাড়াতাড়ি শান্ত হয়ে যায়।
জড়িয়ে ধরলো আরমান আরজুকে। কিছু বলে আরজু কে সান্ত্বনা দিল না আরমান, শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আরমান ভেবেছিল আরজু ধরবে না। এমনটা আশা করাও যায় না। তবে আরজু পাল্টা জড়িয়ে ধরলো আরমানকে। আরমান যতটা শক্ত করে ধরেছিল তার থেকেও বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এবং শুধু জড়িয়েই ধরল না বরং একটু কেঁদে উঠে বলল,
“আপনি কিন্তু সত্যিই ফেঁসে যাবেন। আবার ছেড়ে চলে যাবেন না তো? আপনি যদি ছেড়ে চলে যান তবে সেই শোক কাটিয়ে কিন্তু উঠতে পারবো না আমি। যদি যাওয়ার হয় তবে আগেই যান।”
আরমান আরজুর চুলের মাঝে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আপনি ছাড়তে বললেও তো কখনো ছাড়তাম না সেখানে নিজের ইচ্ছেয় ছাড়বো ভাবলেন কি করে? আজ আপনার এক ডাকে কেন ছুটে এসেছি জানেন? যেন আমার ভালোবাসায় আপনার কোন সন্দেহ না হয়।”
“তার মানে সত্যি বিয়েটা করবেন।”
“তৈরি হয়ে নিন। সব প্রশ্নের উত্তর কবুল বলার মাধ্যমেই পেয়ে যাবেন।”
________
টুকটুকে লাল রঙের জামদানি শাড়ি পরলো আরজু। এর আগে কখনো শাড়ি পরেনি আরজু। জীবনে একবারের জন্যও কখনো শাড়ি পরেনি। না তেমন কোন আনন্দ অনুষ্ঠান হয়েছে, না এমনি এমনি শাড়ি পরে সেজেগুজে ছবি তোলার ইচ্ছে জেগেছে কখনো। বাড়িতে থাকাকালীন সারাদিন একটা আতঙ্ক আর অশান্তির মাঝে কাটতো। যাই করত না কেন মনে হতো কখন না জানি আরজুর বাবা কিংবা ভাই এসে তাতে বাধা দেয়। এত সুখ কি কখনো ছিল নাকি জীবনে যে শখ করে শাড়ি পরবে?
আরজুর কাছে নিজের মাপের কোন ব্লাউজও ছিল না। পরলো ইরার ব্লাউজ। তবে আজ প্রথমবার শাড়ি পরায় বেশ ভালোই বেগ পেতে হচ্ছে আরজু কে। ইরা খুব সুন্দরভাবে সেফটিপিন দিয়ে প্রয়োজনীয় জায়গা গুলোয় শাড়িটা আটকে দিয়েছে। আঁচলটা হাতের ওপরে ছেড়ে রেখেছে, যেটা আরজুর ইচ্ছেতেই হয়েছে।
সাজগোজ আরজু তেমন পারে না, তেমন পছন্দও না। তবে ইরার জোরাজোরিতে মুখে হালকা একটু ফাউন্ডেশন লাগালো। ইরা চিকন করে চোখে একটু লাইনার দিয়ে দিল। সেই সাথে ঠোঁটে পরিয়ে দিল লাল টুকটুকে লিপস্টিক। সাথে কানে আর গলায় লাল পাথরের গয়না।
আরজুর চুলটা বেঁধে দিতে ধরেই ইরা পড়লো বিপাকে। কি সুন্দর ঘন চুল অথচ যত্নের অভাব। কে জানে কত দিন হলো তেল দেয় না। চুলটা বোধহয় ঠিকঠাক করে আঁচড়ায় না। ইরা বকা দিতে দিতে সুন্দর করে একটা খোপা করে দিল। সামনে ছোট কয়েকটা চুল ছেড়েও দিল।
সাজানো শেষে আরজু কে চেয়ারে বসিয়ে একবার দূরে দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখলো ইরা। অসম্ভব সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। তবে কিসের যেন একটা অভাব। সুন্দর লাগছে তবে বউ বউ লাগছে না।
এদিকে এতক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরেও ইরার থেকে কোন প্রশংসা না পেয়ে আরজু ভাবলো ওকে নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না। হতাশ গলায় বলল,
“বলেছিলাম ইরা আপু ভালো লাগবে না আমায়। অযথা এত কষ্ট করলে।”
কথাটা বলে আরজু সর্বপ্রথম খোপাটা খোলার প্রস্তুতি নিলো। ইরা দৌড়ে গিয়ে ওর হাত ধরে মৃদু রাগী গলায় বলল,
“ধ্যাত মেয়ে। কি সব বলো? তোমাকে এভাবে দেখলে না আরমান ভাইয়া কবুল বলার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে।”
“তাহলে তুমি প্রশংসা করলে না কেন?”
“আরে আমি প্রশংসা তো করতাম কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তোমাকে বউ বউ লাগছে না। কেন বউ বউ লাগছে না সেই রহস্যটা উদঘাটন করছিলাম।”
আরজু অবাক কন্ঠে বলল,
“আলাদাভাবে আবার বউ বউ লাগে দেখতে!”
ইরা একটু হেসে উঠে বলল,
“হ্যাঁ লাগে। দাঁড়াও আমি আসছি।”
কথাটা বলে ইরা ছুটে গেল মৃন্ময়ীর ঘরে। মৃন্ময়ীর আলমারি থেকে বেছে বেছে একটা সোনালী রঙের জর্জেট এর ওড়না আনলো। ওড়নাটা ভালো করে আরজুর মাথায় আটকে দিয়ে সন্তুষ্ট গলায় বলল,
“এবার একদম বউ বউ লাগছে দেখতে। আরমান ভাইয়ের বউয়ের মতন লাগছে।”
আরজু পুনরায় অবাক কণ্ঠে বলল,
“ওড়না দেওয়া তে ওনার বউ বউ লাগছে কিভাবে?”
ইরা কপাল চাপরে বলল,
“হায়রে! এই মেয়েকে নিয়ে আমি কি করি! সাধে কি আর আরমান ভাইয়া তোমায় পা'গলী বলে। একবার দেখোতো আয়নায় নিজেকে বউ বউ লাগছে কিনা?”
আরজু ঘুরে দাঁড়ালো। সত্যি মাথায় ওড়নাটা দিয়ে অন্যরকম লাগছে। এটা পরার আগেও আয়নায় নিজেকে দেখেছিল আরজু। বেশ ভালোই লাগছিল আরজুর কাছে নিজেকে। তবে এখন অন্যরকম লাগছে। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“আরমানের বউ বউ লাগছে?”
_________
“মা কবুল বলো।”
কাজীর কথাটা শুনে ঘোমটার আড়াল থেকে আরজু তাকালো আরমানের দিকে। ঘোমটার আড়াল থেকেই আরজু বুঝতে পারল, আরজু এখনো কবুল না বলায় আরমান চিন্তায় পড়ে গেছে। চোখ মুখ শুকিয়ে উঠেছে।
আরমানের এমন অবস্থা দেখে আরজুর একটু হাসি পেল। কি ভেবেছে এই ছেলে আরজু পিছিয়ে যাবে? কখনোই না। যদি আরজুর পেছানোর হতো তবে আরজু কখনো এগোতোই না।
তবে আরজুর সন্দেহ আছে আরমান পিছিয়ে যাবে কিনা। শেষ একবার আরমান কে সাবধান করে দিয়ে বলল,
“কবুল বললে কিন্তু বিয়ে হয়ে যাবে। শেষবারের মতন বলছি সত্যি বিয়ে করতে চান তো? ফেঁসে যাবেন কিন্তু।”
এই মুহূর্তে আরজুর এই কথাটা কোনমতেই হজম হলো না আরমানের। সব থেকে বেশি বদ হজম হলো বোধহয় কাজীর। আজ অবধি যত ছেলে মেয়ের বিয়ে পড়িয়েছেন তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা কান্নাকাটি করেছে। আবার কিছু মেয়ে কোনরকম কান্নাকাটি ছেড়ে কবুল বলে দিয়েছে। তবে বিয়ের আগ মুহূর্তে কবুল বলার সময় হবু বরকে কখনো কেউ এই কথাটা বলেনি। হয়তো তিনি ভাবলেন পাত্রীর মাথার সমস্যা আছে। সেজন্যই বাড়িতে ছোট পরিসরে আয়োজন করে বিয়ে হচ্ছে, আত্মীয়-স্বজনদের ডাকা হয়নি।
এদিকে আরমানের ইচ্ছে করছে বাদবাকি সব কিছু থামিয়ে আগে আরজুর মুখ থেকে জোর করে কবুল বের করতে। তর সইছে না আরমানের। তার মধ্যে এই মেয়েটার আবার আজেবাজে কথা। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ফাঁসলে আমি ফাঁসবো, আপনাকে ভাবতে হবে না। দয়া করে কবুল টা বলুন, আমার ভয় করছে।”
আরজু হাসলো। আরজুর সেই হাসিটা আরমানের দেখার সৌভাগ্য হলো না। আরজু কবুল বলল। আরজুর বলতে বেশ অনেকটা সময় লেগেছিল তবে আরমানের বলতে বোধ করি তিনবার কবুল বলতে তিন সেকেন্ড সময় লাগলো।
যেই মাত্র না কাজী বলে উঠল যে ওদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে অমনি আরমান খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো। উচ্ছ্বাসিত গলায় বলে উঠলো,
“পেয়ে গেছি আমার পা'গলি কে।”
উপস্থিত প্রত্যেকে একযোগে হেসে উঠলো। স্থান, কাল, মানুষজন সব ভুলে বসে আরমান নিজের জায়গা থেকে উঠে গিয়ে আরজু কে আবারো জড়িয়ে ধরলো। ধরলো তো ধরলো একেবারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো। তবে এবারে আরজু আর পাল্টা জড়িয়ে ধরলো না। এতো মানুষের সামনে আরমান জড়িয়ে ধরায় বরং আরজু একটু লজ্জাই পেল। লজ্জা পেল মুনতাসিরও।
তবে আরমানের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আরজু কে ছেড়ে দিয়ে ওর ঘোমটা উঠিয়ে কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো। ঠোঁট ছোয়ালো আরজুর গালেও।
মুনতাসির আর সেখানে থাকতে পারলো না। কাজী কে নিয়ে চলে গেল। তবে বাকি সবাই নির্লজ্জ। তাই কেউ আর গেল না।
এদিকে লজ্জায় আর বিস্ময়ে আরজু যেন জমে গিয়েছে। কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তবে এতকিছুর মাঝে আরজু কে সবথেকে বেশি অবাক করলো আরমানের ভেজা চোখ দুটো। আরজু বুঝতে পারছেনা কেন আরমানের চোখ দুটো ভিজে উঠেছে। আরমানের চোখের পাতায় হাত রেখে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কাঁদছেন, আরমান?”
আরমান আরজুর হাতটা শক্ত করে ধরে আরজুর হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেয়ে বলল,
“এটা খুশির কান্না আরু। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না আমি আজ আমার জীবনের কত বড় খুশি পেয়ে গেলাম। আপনাকে ভালোবাসা আমার জন্য খুব সহজ ছিল আরু, তবে আপনায় আমাকে ভালোবাসানোটা খুব কঠিন ছিল। আপনি হয়ত বুঝবেন না রোজ একটু একটু করে আপনার মনে নিজের জন্য ভরসা তৈরি করতে আমার ঠিক কতটা কষ্ট হয়েছে, তবে আমি জানি। আর সেদিন যখন আপনি আমায় ভুল বুঝলেন তখন আমার ঠিক কতটা কষ্ট হয়েছিল সেটাও আপনি বুঝবেন না।”
“খুব কষ্ট হয়েছিল?”
“হ্যাঁ আরু। জানেন, আপনি যখন আমায় অবজ্ঞা করতেন, অবিশ্বাস করতেন আমার খুব কষ্ট হতো। প্রথমদিকে এতটা হতো না, তবে যখন আপনাকে অতিরিক্ত ভালোবেসে ফেললাম তখন বেশি হতো। আমি আপনাকে বুঝতে দিতাম না কিছু তবে খুব কষ্ট হতো আমার। আপনার চোখে সেদিন আমার জন্য ঘৃণা দেখে শুধু কান্না পাচ্ছিলো।”
আরজু শুধু হা করে তাকিয়ে থাকলো আরমানের দিকে। আরমান নিজেকে স্বাভাবিক করে দু চোখ মুছে নিয়ে আলতো হেসে বলল,
“তবে আজ আর আমার কোনো কষ্ট নেই। আমি আমার কষ্টের ফল পেয়েছি। আমি পেরেছি আপনার মনে আমার জন্য ভালোবাসা তৈরি করতে। আমি পেরেছি ভালোবাসার প্রতি আপনার বিশ্বাস তৈরি করতে। কেউ বুঝবে না আমি আজ কি অর্জন করেছি। তবে আমি জানি, আজ আমি আমার জীবনের সবথেকে বড় আনন্দের কারণ কে অর্জন করেছি। আজ আমি আমার আরু, আমার পা'গলি কে অর্জন করেছি।”