তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৩৭

🟢

বিয়েতে সাক্ষীর প্রয়োজনে আরমান খুব দূরের কাউকে ডাকতে চায়নি। মহিন হোসেন কে জানায়নি কেননা আরমান জানে যদি ওনাকে জানায় তবে পুরো পরিবার জেনে যাবে। তখন আর কোন মতেই এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করতে দিতে চাইবে না।

আরমান জানে না কি ভেবে যেন তানভীর কে ডেকেছিল। এবং খুব অবাক করার বিষয় হলো তানভীর আরমানের এক ডাকেই এসেছিল। কোন কারণও জিজ্ঞেস করেনি। আরমান শুধু বলেছিল একটা জরুরী দরকার আছে। ব্যাস এক ডাকেই তানভীর চলে এসেছিল এবং খুব খুশি মনেই চলে এসেছিল।

এখানে এসে যখন দেখল মুনতাসির আগে থেকেই আছে তখন আরো বেশী খুশি হলো। ভাবলো নিশ্চয়ই মুনতাসির আরমানকে সাহায্য করতে পারেনি। আর সেজন্যই তানভীর কে ডেকেছে। তার মানে কাজটা তানভীরকে দিয়েই হবে। তখন বেশ ভালো লেগেছিল তানভীরের।

আজ তানভীরের বেশ গর্ব হচ্ছে নিজের ভাইয়ের সাহায্যে কাজে লাগতে পেরে। আর সবথেকে বেশি ভালো লাগছে এটা ভেবে যে আরমান ভরসা করে ওকে ডেকেছে। এখন কাজটা যাই হয়ে যাক না কেন আরমান ডেকেছে ওকে ভরসা করে এটাই যথেষ্ট। বাড়ি গিয়ে কাকে কি জবাব দেবে সেসব পরের কথা। আর তাছাড়া ও তো কোন খারাপ কাজ করেনি, বিয়েই দিয়েছে।

সাক্ষীর জন্য শুধু যে কয়জন মানুষ দরকার সে কয়জনই এসেছে। আরমান শুধু ডেকেছে তানভীর আর ইলহামকে। বাকি যে একজনের প্রয়োজন ছিল মুনতাসির ব্যবস্থা করেছে।

এখন সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে। আরমান ভেবেছিল হোটেল থেকে খাবার দাবার অর্ডার করবে। তবে মুনতাসির করতে দেয়নি, কোনমতেই করতে দেয়নি। আরজু কে নিজের বোন বলেছে মুনতাসির। সেই বোনের বিয়ে যখন ওর বাড়ি থেকেই দিতে পারছে তবে সামান্য কয়েকজনকে খাওয়ানোর সামর্থ্যও মুনতাসিরের আছে।

সবাই খাওয়া দাওয়া করছে আর সোফায় চুপচাপ বসে আছে আরজু। দেখে মনে হবে ধ্যান করছে বোধ হয়। কোনমতে শুধু নিশ্বাসটা নিচ্ছে। না নাড়াচাড়া করছে, না কোন কথা বলছে। মাঝে মাঝে চোখের পলক টুকু ফেলছে।

আরমান বেশ অনেকবার খেতে বলেছে তবে রাজি হয়নি আরজু এবং খুব গম্ভীর গলায় আরমানকে খেয়ে নিতে বলেছে। এখন গলা দিয়ে খাবার না নামলেও আরমানকে খেতে হচ্ছে। খাবার মাঝে আড়চোখে কয়েকবার আরজুকে দেখলো। কেন যেন আরজুর গম্ভীর অভিব্যক্তি দেখতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে আরমানের।

একেই তো বাড়ি গিয়ে কি হবে তার চিন্তা তার ওপরে আবার আরজুর এমন গম্ভীর অভিব্যক্তি। কে জানে আরমানের কপালে কি লেখা আছে!

এদিকে ইলহাম কে একটা ব্যাপার ভীষণ ভাবাচ্ছে। আজ এখানে আসার পরেই জানতে পারলো যে আরজুর পুরো নাম নীরাঞ্জনা আরজু। ইলহামকে ভাবাচ্ছে আরজু নামটা। একবার ভাবলো মনে উদয় হওয়া প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবল আজ আরজু আর আরমানের জীবনে একটা বিশেষ দিন। এতো ব্যস্ততার মাঝে আর এসব কথা না তোলাই ভালো। অন্য কোন দিন নাহয় জিজ্ঞেস করে নেবে।

_________

বিয়ে যখন করেছে বউকে রেখে কোথাও যাবে না আরমান। গ্রামে যেহেতু আরমান কে ফিরতে হবেই তাই সাথে করে আরজু কেও নিয়ে যাবে বলে ঠিক করলো। আরজু প্রথমে একটু ভয় পেল। যেতে চাইলো না আরমানের সাথে।

এভাবে হুট করে তো বিয়ে করতে বলল আরমানকে। এখন যদি আরমানের বাড়ির লোক না মানে? আরমান নিজের পরিবারকে কতটা ভালোবাসে, কতটা বাধ্য ছেলে সেটা একটু হলেও আন্দাজ করতে পেরেছে আরজু। এখন আরমানের বাড়ির লোকের যদি আরজু কে পছন্দ না হয়! যদি ওরা আরমানকে বলে আরজু কে ছেড়ে দিতে আর আরমান যদি ছেড়ে দেয় তবে আরজু কি করবে?

তবে আরমানকে এই প্রশ্নটা করা হয়ে ওঠেনি। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে তাই বেশি দেরি করলো না আরমান। আরজুও আর খুব বেশি না করলো না। একবার নিষেধ করেছিল তবে আরমান যখনই বলেছে যে নিজের বউকে ছাড়া যাবেনা তারপর আর আপত্তি করেনি।

তানভীর গাড়িতে করে আরমানদের বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে দিয়ে গেল। আরমানরা গাড়ি থেকে নামতে নিজেও গাড়ি থেকে নামলো। বিরক্তি মাখানো গলাতে বলল,

“বললাম আমি রেখে আসি। আবার বাসে উঠবি?”

আরমান তানভীর কে জড়িয়ে ধরে বলল,

“তুই বলেছিস এটাই যথেষ্ট। আমি ভাবতেও পারিনি তুই আমার এক ডাকে আসবি।”

“তা কেন ভাববি? কখনো কি ডেকেছিস আমায়? তোর তো মুনতাসিরকে দিয়েই কাজ চলে যায়, তানভীর কে?”

“তানভীর আমার ভাই। ধন্যবাদ তোকে সাহায্য করার জন্য। আগেই বাড়িতে কাউকে কিছু বলিস না।”

কথাটা বলে আরমান ছেড়ে দিল তানভীর কে। তানভীর আরজুর দিকে তাকালো। কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে। একদিন কথা বলেছিল আচ্ছা মতো ধুঁয়ে দিয়েছিল সেদিন আরজু তানভীরকে। তাও সাহস করে কথা বলল। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে একটু গম্ভীর গলাতে আরজু কে বলল,

“যদিও আপনাকে আমার পছন্দ না তবুও ভাবি বলে ডাকছি।......”

তানভীর কে নিজের পরবর্তী বাক্য বলতে না দিয়ে আরজু পাল্টা গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

“না ডাকলে অসুবিধা নেই। আমি আপনার মুখ থেকে ভাবি ডাক শোনার জন্য আরমানকে বিয়ে করিনি।”

তানভীর একটু নড়েচড়ে উঠে বলল,

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। যাই হোক শুনুন, বড় করে অনুষ্ঠান করাবো আপনাদের বিয়ের। তালুকদার বাড়ির বউ আপনি। আর কোন অসুবিধা হলে আমায় জানাতে পারেন। তাওসিফ আমার ভাই। সাহায্য করার চেষ্টা করব।”

আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“ঠিক আছে।”

আরমানদের থেকে বিদায় নিয়ে তানভীর চলে গেল। টিকিট কেটে আরমানরা বাসে উঠে পড়লো। বাস ছাড়তে এখনো কিছুক্ষণ বাকি আছে। বেশ অনেকটা দূরের রাস্তা। আরমানের গলাটা শুকিয়ে গেছে। ভাবলো এক বোতল পানি কিনে আনা দরকার। আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরু, আপনি একটু বসুন। আমি এক বোতল পানি কিনে আনি।”

কথাটা বলে আরমান উঠে যেতে নিলে আরজু ওর হাত টেনে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“কোথায় যাচ্ছেন আপনি? পালাচ্ছেন তাই না?”

আরমান ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“এ আবার কেমন কথা? পালাবো কেন?”

“তবে আমাকে একা রেখে যাচ্ছেন কেন? আর এক্ষুনি তো বাসা থেকে খেয়ে আসলাম আবার পানি খাওয়ার অজুহাতই বা দেখাচ্ছেন কেন? আমাকে নিয়ে চলুন।”

আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“ঠিক আছে, চলুন। তাও সন্দেহ করবেন না।”

আরমান ভেবেছিল এই কথাটা বলার পর হয়তো আরজু যাবে না। তবে না, মেয়েটা থাকলোই না। বরং আরমানের আগে আগে বাস থেকে নেমে গেল। কিছু করার নেই আরমানের। যেতে চাইছে যখন যাক।

_________

বাস চলছে তার আপন গতিতে। জানালার ধারে বসেছে আরজু। বিয়ের শাড়ি, সাজগোজ সমেতই শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে। তবে শাড়ি পরে থাকার অভ্যাস আরজুর নেই। না অভ্যাস আছে কানের দুল, মালা আর এত সাজগোজ নিয়ে থাকার। এক পর্যায়ে বিরক্ত হলো আরজু।

কানের দুল খুলে সেগুলো আরমানের হাতে দিয়ে বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

“পরবো না এসব। ইরা আপুর দেওয়া জন্য আপনার কাছে রাখতে দিলাম, নয়তো ছুঁড়ে ফেলতাম।”

“আহ্! এত রেগে যাচ্ছেন কেন আরু? আচ্ছা কি কি ভালো লাগছে না সেসব খুলে ফেলুন।”

আরজু গলার মালাটাও খুলে ফেলল। এক এক করে খোপার পিনগুলো খুলে চুলটা ছেড়ে দিল। সবকিছু আরমানের হাতে দিয়ে আবারো বিরক্তিকর গলায় বলল,

“এসব বিয়ে কে করে? এই বিয়ের সাজগোজ করার আবার মানুষের নাকি এত ইচ্ছে থাকে। ইরা আপু এমন ভাবে খোপায় পিন লাগিয়ে দিয়েছে মাথা ব্যথা ধরে গেল আমার। গলাটাও চুলকাচ্ছে মালা পরে থাকায়। আর এই শাড়ি তো অসহ্য লাগছে। মনে হচ্ছে গায়ের উপর কেউ পাথর তুলে দিয়ে রেখেছে। আর কোনদিন আপনাকে বিয়ে করব না আমি।”

আরমানের কানে না আরজুর কথাগুলো গেল, না নিজে কিছু বলার মতন অবস্থায় আছে। চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে আরজু। সাজগোজ অনেকটাই হালকা হয়ে গেছে শুধু ঠোঁটের লাল টকটকে লিপস্টিকটা এখনো তেমনি আছে। আরজু কে দেখে মনে হচ্ছে রাগের কারণে গালগুলোও লাল হয়ে উঠেছে। যদিও সবটাই আরমানের খেয়াল।

আরমান একটা ব্যাপারে খেয়াল করেছে, রেগে থাকলেই আরজুকে বেশি সুন্দর লাগে দেখতে। এই মেয়ে কিনা আবার বলে সুন্দর না, নিজের রূপ নিয়ে সন্দেহ করে। একবার আরমানের চোখ দিয়ে তো দেখুক, তবে না বুঝতে পারবে ও সুন্দর নাকি সুন্দর না।

বেশ অনেকক্ষণ থেকে আরজু বুঝতে পারছে যে আরমান হা করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তবে খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছে না। দেখা যাক কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে। তবে এক পর্যায়ে গিয়ে দেখলো আরমান নড়াচড়াও বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু হা করে তাকিয়ে আছে এবং অনেকটা সময় বেশ এভাবেই পার হয়ে গেল। একপর্যায়ে আরজু নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল,

“এক জিনিস এতক্ষণ কি দেখেন?”

জানলা দিয়ে আসা বাতাসে আরজুর উড়তে থাকা চুলগুলো আরমান কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,

“জিনিসটা যদি হয় আমার আরু তবে আমি আরো অনেকক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকতে পারি। আপনি বুঝবেন না।”

“ন্যাকামো। দুদিন পর এমনিতেই সব ভুলে যাবেন জানি। আমিতো ভয়ে আছি কোন দিন না আপনি পালান। আপনাদের কাজই তো ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়ো পালানো।”

বিজ্ঞাপন

“আপনার এক কথাতেই বিয়ে করে নিলাম পুরো পরিবারকে না জানিয়ে, সব গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে আপনার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিলাম। এত ভালোবাসি তাও সন্দেহ করবেন?”

এ পর্যায়ে হঠাৎ করেই আরজুর অভিব্যক্তি বদলে গেল। রাগী ভাবটা নিমেশের মাঝে হারিয়ে গেল। চোখে মুখে একটা তীব্র ভয় আর আতঙ্ক ফুটে উঠলো। সংকিত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনার বাড়িতে যদি আমায় মেনে না নেয়? যদি ঢুকতে না দেয় আপনার বাড়িতে? যদি আমায় পছন্দ না করে? যদি আমায় তালাক দিয়ে দিতে বলে?”

আর কিছু বলতে দিলো না আরমান আরজু কে। মুখটা চেপে ধরে বলল,

“হুঁশশ! তালাক শব্দটাও কখনো মুখে আনবেন না। কে আপনাকে গ্রহণ করলো আর কে করলো না তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। এই বুকে জায়গা দিয়েছি আপনাকে। আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কারো এই দুঃসাহস হবে না যে তাওসিফ আরমানের বুক থেকে তার পা'গলিকে কেড়ে নেবে।”

আরজুর সন্দেহ গেল না। আবারো বলল,

“যদি মেনে না নেয়? যদি বলে হয় আপনার পরিবারকে নয় আমাকে বেছে নিতে হবে? আমার তো কিছুর ঠিক নেই। যদি আপনার পরিবার আমার পরিবারের সাথে কথা বলতে চায়? আমার তো কেউ নেই।”

আরমান আলতো হেসে আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আমার পরিবার এমন না আরু। আর সত্যি বলতে আমার পরিবার এমন না জন্যই আমি এত বড় একটা কাজ করার সাহস পেয়েছি। আমি আমার পরিবারকে খুব ভালোবাসি তার মানে এইটা না যে আপনাকে কম ভালোবাসি। আপনিও তো এখন থেকে আমার পরিবারই। আপনাকেও আমি ততটাই ভালোবাসি। আর আমি আছি তো। যা আপনাকে অস্বস্তি দেয় তেমন কোন কথা উঠবে না।”

সব ঠিক ছিল তবে আরমানের একটা কথা আরজুর পছন্দ হয়নি। আরজু কে কেন বাকিদের মতন ভালোবাসবে, কেন বাকিদের সমান ভালোবাসবে? আলাদাভাবে ভালোবাসতে হবে ওকে। বাকিদের থেকে অনেক বেশি ভালোবাসতে হবে। সব থেকে বেশি ভালোবাসতে হবে আরজু কে। তবে রাগ করলো না আরজু। একটু অভিমান মাখানো গলায় বলল,

“বাকিদের যতটা ভালোবাসেন আমাকেও ততটা ভালোবাসেন। বাহ্, ভালো।”

আরমান এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আরে আমার পা'গলিটা দেখি বাচ্চামোও করে। আরু, আর একটা কথা মনে পড়লো।”

আরমান খুব উৎসাহ নিয়ে কথাটা বলল যার ফলে আরজু আগ্রহ খুঁজে পেল।

“কি?”

আরমান আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আজ থেকে আমি আর আপনি একসাথে থাকবো, একসাথে ঘুমোবো। আজকে আমাদের বাসর রাত।”

আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করলো,

“তো?”

“তো মানে আজ আমাদের বাসর রাত

মানে বলতে চাইছিলাম যে বোঝেন না আজকে কি হয়। মানে আমি আর আপনি একসাথে থাকব।”

“আগে দেখুন আমাদের বাড়িতে তোলে কিনা। আর বাসর রাত নিয়ে এত লাফালাফির কি আছে। বিয়ে যেহেতু করেছি আপনার সাথেই তো থাকতে হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আপনার কি অন্য কিছু ইচ্ছে ছিল নাকি?”

আরমান থতমতো খেল। কি করে বাসর রাত শব্দটাকে এতটা স্বাভাবিক ভাবে বলে ফেলল আরজু? আরমান তো নিজেই একটু একটু ভয়ে ছিল এই কথাটা বলতে। তার মানে আরজুর কাছে এই পুরো ব্যাপারটা স্বাভাবিক। তারমানে আরমান আজ চাইলে এগোলেও এগোতে পারে।

কথাটা ভাবতেই হেসে উঠলো। আরজু কারণ জিজ্ঞেস করলো তবে আরমান কিছু বলল না। আরজু খেয়াল করলো আরমান এখনো ঠোঁট টিপে হাসছে। কে জানে কি হয়েছে। এই পা'গল নাকি আবার আরজু কে পা'গল বলে। নিজেই তো একটা পা'গল।

_________

রাত তখন বেশ অনেকই হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ ঘরের আলো তখন নিভে গেছে। অনেকে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে তালুকদার বাড়িতে।

বসার ঘরে সোফায় বসে মিজান হোসেন টিভিতে খবর দেখছেন। আমেনা বেগম রান্না করছে আর ওনাকে সাহায্য করছে তনুশ্রী। সারাদিন চিন্তার মাঝে থাকায় রাতের রান্না করতে আজ একটু দেরি হয়ে গেছে। অন্যদিকে তাশরীফ নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে কি করছে কেউ জানে না। তবে পড়াশোনা যে করছেনা এটা সবাই জানে।

সবার ভিন্ন ভিন্ন কাজের মাঝে সদর দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো। শব্দটা রান্নাঘরে থাকা আমেনা বেগম আর তনুশ্রীর কানেও গেল। আমেনা বেগম তনুশ্রী কে সময়টা জিজ্ঞেস করলেন। তনুশ্রী বলল দশটা বাজে। আমেনা বেগমের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেলো।

এত রাতে তো কেউ কখনো আসে না। তবে এই ঝামেলার সময় কে এসেছে? আবার কেউ ভয় দেখাতে এসেছে কিনা কে জানে। এইবারে কোন ক্ষতি করে যাবে না তো? আমেনা বেগম ফিসফিস করে তনুশ্রী কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“উপরে তাশরীফের ঘরে যা। আর ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিবি। একদম নিচে নামবি না। আমি আর তোর বাবা দেখছি কে এসেছে।”

তনুশ্রী যেতে না চাইলেও আমেনা বেগম জোর করে ওকে পাঠিয়ে দিল। এদিকে চিন্তায় পড়েছে স্বয়ং মিজান হোসেনও। রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত পায়ে আমেনা বেগম ছুটে এসে বললেন,

“হ্যাঁ গো, দরজা কি খুলবে? এত রাতে কে এলো?”

চিন্তিত গলায় মিজান হোসেন বললেন,

“আমিও তো সেটাই ভাবছি। কারো তো আসার কথা না।”

“আগে গিয়ে শোনো কে এসেছে। দরজাটা আগেই খুলো না। আমি কি মুহিব ভাই বা মহিন কে কল করবো?”

মিজান হোসেন বাধা দিয়ে বললেন,

“না থাক দরকার নেই। ওরা অতো দূর থেকে কি করবে। তুমি ভয় পেয়ো না আমি দেখছি কে।”

সদর দরজার দিকে এগিয়ে মিজান হোসেন গম্ভীর গলায় আগন্তুক কে উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন,

“কে?”

মিজান হোসেনের কানে ভেসে এলো পরিচিত কন্ঠস্বর। কণ্ঠটা যে আরমানের সেটা চিনতে ভুল হলো না মিজান হোসেনের। তবে ভ্রুঁ কোঁচকালেন। এত রাতে আরমানের তো আসার কথা না।

মিজান হোসেন ঠায় কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এর মাঝে আবার আরমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“বাবা দরজা খোলো, আমি তাওসিফ।”

আরমানের বলা এবারের কথাটা আমেনা বেগমের কানেও গেলো। ততক্ষণে তনুশ্রী আর তাশরীফও নেমে এসেছে। থাকতে পারেনি তনুশ্রী ওপরে। নিচ থেকে কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছিলো না। ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল যা হওয়ার হবে। আর ওর পিছনে পিছনে ওর ওড়না ধরে নেমেছে তাশরীফ।

কন্ঠটা যে আরমানের সেটা তো নিশ্চিত মিজান হোসেন। এখন কোন খবর না দিয়ে কেন এলো সেটা তো দরজা খুলে ওকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে। তাই উনি দরজা খুললেন।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো দরজা খুলে আরমানের সাথে একটা মেয়ে কেও দেখতে পেলেন। লাল শাড়ি, হালকা একটু সাজগোজ করা। চুলটা আবার খোপা করে নিয়েছিল আরজু। মেয়েটার চোখে মুখে তীব্র অস্বস্তি। মিজান হোসেন বিস্ময় ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,

“এই মেয়েটা কে? এত রাতে তোমার সাথে কেন?”

আমেনা বেগম চেনেন আরজুকে। আরমানের সাথে আরজু কে দেখতেই তিনি হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এসে বললেন,

“আরে মা তুমি এসেছো!”

আমেনা বেগম মেয়েটাকে চেনেন এটা শুনে মিজান হোসেন আরো অবাক হলেন। স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তুমি চেনো?”

আমেনা বেগম কিছু বলতে নিয়ে থেমে গেলেন। আরজুর আসল পরিচয়টা আরমান কাউকে বলতে নিষেধ করেছিলো তাই থেমে গেলেন। আমেনা বেগমকে চুপ করে থাকতে দেখে মিজান হোসেন বুঝলেন তার স্ত্রীর সবকিছু জানে তবে ছেলের জন্য ওনাকে কিছু বলবে না। তাই উত্তরটা আরমানের থেকেই জানতে হবে। কন্ঠটা এবার গম্ভীর করে বলল,

“কে এই মেয়েটা? এত রাতে একটা মেয়েকে নিয়ে গ্রামে এসেছো কেন?”

আরমান হাস্যজ্জ্বল গলাতে বলল,

“উনি আরজু বাবা। তোমাদের ছেলে মানে আমার বিয়ে করা বউ। আমরা আজকেই বিয়ে করেছি। এখন বিয়ে করে তো বউকে শ্বশুরবাড়িতেই আনব তাই না? তোমাদের দোয়া নিতে এলাম।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প