তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৩৮

🟢

দরজার বাইরে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আরমান আর আরজু। আরজুর চোখে মুখে যে ভয় আর অস্বস্তিটা ফুটে উঠেছিল সেটা এখন আরও তীব্র হয়েছে। আর আরমানের মুখে লেপ্টে থাকা হাসিটা এখন হারিয়ে গিয়েছে। আর ওদের দুজনের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাড়ির বাকি চারজন সদস্য।

আমেনা বেগম তো একবার ছেলের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, একবার স্বামীর মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। উনি খুশি নাকি রেগে গেছেন সেটা উনি নিজেও জানেন না। মোটকথা ওনার স্বামী যে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন উনিও সেই প্রতিক্রিয়াটাই দেখাবেন।

তবে যদি মিজান হোসেন যদি রেগে যান সে ক্ষেত্রে উনি কষ্টই পাবেন। কারণ তখন যে ছেলেটাও কষ্ট পাবে।

এদিকে বেশ অনেকক্ষণ অতিবাহিত হবার পরও আরমান যখন মিজান হােসেনের থেকে উত্তর পেল না তখন আবারো খুব কষ্টে ভয়ে ভয়ে বলল,

“বাবা আমরা বিয়ে করেছি, আজ দুপুরে।”

মিজান হোসেন সন্দেহী গলায় বলল,

“মজা করছো আমার সাথে? ঢাকা থেকে এত দূর এসে মাঝরাতে আমার সাথে মজা করছো তুমি?”

আরমান তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না বাবা। মজা করবো কেন? বিশ্বাস করো আমরা বিয়ে করেছি। দাঁড়াও বিয়ের ছবি দেখাই।”

কথাটা বলে আরমান পকেট থেকে ফোনটা বের করতে নিলে মিজান হোসেন হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলেন। মিজান হোসেনের দৃষ্টি অত্যন্ত শীতল। তবে কন্ঠ তার গম্ভীর।

“কার অনুমতি নিয়ে বিয়ে করেছো? আবার যখন বাবা মায়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়নি তখন এখানে এসেছো কোন সাহসে? আমার চোখে চোখ রেখে বিয়ের কথাটা বলতে লজ্জা করছে না?”

আরমান মিনমিনে গলায় বলল,

“লজ্জা করবে কেন বাবা? বিয়ে না করে নিয়ে এলে লজ্জা করতো। আসলে আরজুর কিছু সমস্যা ছিল সেজন্যই তো হঠাৎ করে তাড়াতাড়ি বিয়েটা করতে হয়েছে। এমনি যদি ওনাকে গ্রামে আনতাম তবে তো সেটা আরো খারাপ দেখাতো, তাই না? সেজন্য বিয়ে করে তবেই নিয়ে এসেছি।”

ছেলের কথার কোন উত্তর না দিয়ে মিজান হােসেন এবারে তাকালো আরজুর দিকে। আরমানের সাথে যতটা গম্ভীর আর রাগী গলায় কথা বলেছিলেন আরজুর সাথে তেমনভাবে কথা বললেন না। বরং একটু নরম গলায় প্রশ্ন করলেন,

“তোমার বাড়ির লোকজন জানে বিয়ের ব্যাপারে?”

হঠাৎ করে প্রশ্নটা করায় আরজু হালকা একটু কেঁপে উঠলো। বোধহয় কোন গভীর ভাবনার মাঝে ছিল যার ফলে এমনটা হলো। যদিও মিজান হোসেনের প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক তবে তাও আরজু খুবই ভয় পেল। মিজান হােসেনের প্রশ্নের কোন উত্তরই দিতে পারল না আরজু। চুপচাপ গিয়ে আরমানের পিছনে দাঁড়ালো।

আরজুর এমন আচরণে মিজান হোসেন তো চমকালেনই সেই সাথে চমকালো আরমানও। আরমান তো ভেবেছিল কখন না জানি আরজু ঠাস ঠাস করে উত্তর দিয়ে দেয়। কিন্তু এই মেয়ে আবার শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখে এত ভদ্র হয়ে গেল কি করে? সব ত্যাড়ামি শুধু আরমানের সাথে।

এদিকে আরজুর থেকে প্রশ্নের কোন উত্তর না পেয়ে মিজান হোসেন পুনরায় রাগী গলা আরমান কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ভয় দেখিয়েছো মেয়েটাকে আমাদের নিয়ে? কি বলেছো নিজের বাবা মায়ের নামে ওর কাছে যে একটা সাধারণ প্রশ্নে মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল?”

আরমান আবারো তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“আমি ভয় দেখাইনি। উনি তো ভয়ই পান না। কেন যেন ভয় পেয়ে গেল তোমার প্রশ্ন শুনে। এই আরু ভয় পাচ্ছেন কেন? সামনে আসুন।”

আরজু গেল না সামনে। বাড়ির লোকের প্রশ্নটা শুনেই আরজু ভয় পেয়েছে। কি উত্তর দেবে? আরজুর পরিবারের সম্বন্ধে যদি ওনারা জানতে পারে তবে নিশ্চয়ই আর মেনে নেবেন না। আরজু কেও খারাপ ভাববে। আর তাছাড়া নিজের বাবা ভাইয়ের পরিচয় তো ও দেবেই না।

আমেনা বেগম স্বামীর দিকে এগিয়ে এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

“বিয়েটা যেহেতু করেই ফেলেছে কিছু তো আর করার নেই। মানছি ভুল করেছে তাই বলে এখন রাগারাগি করলে তো আর কোন সমাধান হবে না। বাড়ির বউ মেয়েটা, ভয় পাচ্ছে। তুমি ছেলেকে যা ইচ্ছে বলো, মেয়েটাকে আমি ঘরে নিয়ে যাই।”

মিজান হোসেন চোখ গরম করে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আগে শুনতে তো দাও যে মেয়ের পরিবার আদৌও জানে কিনা। শেষে দেখবে তোমার ছেলেকে এসে আবার পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। কেমন পরিবারে বিয়ে করেছে সেটাও তো জানিনা। যদি অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয় তবে তোমার ছেলের অবস্থা খারাপ করে ছাড়বে।”

মিজান হোসেনের পরিবার নিয়ে তোলা কথাটা আরজুর কানে গেল। মিজান হোসেনের বলা কেমন পরিবারে বিয়ে করেছে এই প্রশ্নটা বারবার আরজুর মাথায় ঘুরতে থাকলো। আরজুর পরিবার তো ভালো না। কিন্তু উত্তরটা কি করে দেবে ওনাদেরকে? আরজুর বোধহয় আর সংসার করা হলো না। আরমানও নিশ্চয় এখন বদলে যাবে মা-বাবার কথা ভেবে।

কথাগুলো ভাবতেই আরজু ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। হঠাৎ করে আরমান নিজের পিছন থেকে কান্নার শব্দ পেতেই চমকালো। ঘাড় ঘুরে তাকিয়ে দেখল আরজুর চোখ দুটো জলে টইটম্বুর। গাল বেয়ে গড়িয়েও পড়েছে কয়েক ফোঁটা জল। আরমান উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“এই পা'গলি, কি হলো? কাঁদছেন কেন? আরে আমি রাজি করিয়ে নেব তো বাবা মাকে। এমনি ভয় দেখাচ্ছে। ঘরে ঢুকতে দেবে তো আমাদের।”

আরজু কোন উত্তর দিল না, কাঁদলো। হঠাৎ করে আরজু কে কাঁদতে দেখে মিজান হোসেনও ভরকালেন। আমেনা বেগম এবারে স্বামীর বাঁধা মানলেন না। নিজে এগিয়ে গেলেন আরজুর দিকে। আরমানকে সামনে থেকে সরিয়ে নিজে আরজুর চোখের জল মুছে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,

“আরে মা কাঁদছো কেন? তোমাকে তো বকেনি তোমার শ্বশুর। তোমাকে কিছু বলছি না আমরা। তুমি কাঁদছো কেন?”

আরজু ক্রন্দনরত গলাতেই বলল,

“সেদিন তো অনেক পছন্দ হয়েছিলো আমাকে আর আজ যখন ছেলে সত্যি সত্যি বিয়ে করে নিয়ে এসেছে আর পছন্দ হচ্ছে না আমাকে? কিন্তু আজকে তো আমি সেজেগুজে এসেছি। আজকেই তো আমাকে বেশি সুন্দর লাগার কথা।”

আরমান কপাল চাপড়ালো। ওর পা'গলির যে মাথার তার কেটে গেছে সেটা বেশ বুঝতে পারছে। সেজন্যই তো আজেবাজে কথা বলছে।

আমেনা বেগম অনেক কিছু বলে সান্ত্বনা দিলেন আরজু কে। এর মধ্যে পিছন থেকে মিজান হোসেনের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওনার কানে।

“আমেনা, ওকে নিয়ে ভেতরে এসো।”

মুহূর্তের মাঝে আরজুর কান্নাটা থেমে গেল। আমেনা বেগমের কাঁধের ফাঁক দিয়ে পিছনে দাঁড়ানো মিজান হোসেনের গম্ভীর মুখটা একবার দেখে নিল। দেখেই কেমন যেন ভয় করছে। তবে আমেনা বেগম স্বামীর সিদ্ধান্তে খুশি হলেন। নতুন বউকে এভাবে কাঁদায় নাকি দরজায় দাঁড়িয়ে কেউ!

আরজু কে নিয়ে উনি ভেতরে এলেন। ওনার পেছন পেছন আরমানও আসতে ধরলে মিজান হোসেন ওকে থামিয়ে দিল। আরমান হা করে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আসবো না?”

“না, তুমি আসবেনা। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। মেয়ের পরিবার জানে এ বিষয়ে?”

“কয়েকদিন আগে জানিয়েছিলাম বাবা। এমনিতেও ওনার পরিবারের সাথে ওনার যোগাযোগ খুব একটা ভালো না। ওদের যায় আসে না এই বিষয়ে।”

“অন্যান্য বিষয় আর মেয়ের বিয়ের বিষয় আলাদা তাওসিফ। ওনাদের জানার অধিকার আছে।”

“বাবা তুমি বুঝতে পারছ না আসলে। বিষয়টা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলি হ্যাঁ। আরজুর ওনার পরিবারের সাথে সম্পর্কে অনেক ঝামেলা আছে। সেইজন্য ওনাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে করা। ঝামেলার কারণটা হলো...…”

আরমান পুরোটা বলতে নিলে তার আগেই আরজু চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“আরমান বলুন না যে কাকা আমাদের বিয়ে দিয়েছে। আমি কয়েকদিন কাকার বাড়িতে গিয়ে থেকেও ছিলাম। তাহলেই তো আর আপনার বাবা রাগ করবে না।”

আরমান সত্যি বুঝলো না আরজু কেন হঠাৎ করে এই কথাটা বলে উঠল। হ্যাঁ এটা তো ঠিক যে আরজু কয়েকদিন থেকেছিল কাকার বাড়িতে কিন্তু মহিন হোসেন তো ওদের বিয়ের ব্যাপারটা জানতো না। পরে আসার সময় আরমান ফোন করে জানিয়েছিল।

আরমানেরও ইচ্ছে ছিল পুরো দোষটা মহিন হোসেনের ঘাড়ে চাপানোর তবে আরজু কি করে সেটা আন্দাজ করতে পারলো। আবার আরমান বলার আগেই ফাঁসিয়ে দিল। কি দারুন মনের মিল আরমান আরজুর। দারুন হয়েছে জুটিটা।

এদিকে আরজুর মুখ থেকে কাকা শব্দটা শুনতেই মিজান হোসেন বুঝে গেলেন যে আরজু কার কথা বলছে। তার মানে ওনার ছোট ভাই এই কাজটা করেছে। কিন্তু উনি যতদূর জানেন যতই আরমানকে প্রশ্রয় দিক না কেন এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতন কাজ করার কথা না মহিন হোসেনের। সন্দেহী গলায় ছেলেকে প্রশ্ন করলেন,

“মহিন জানতো?”

আরমান হেসে উঠে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“হ্যাঁ কাকা জানতো তো। কাকাই তো আমাকে এই বুদ্ধিটা দিয়েছে। আমি জানাতে চেয়েছিলাম তোমাদেরকে কিন্তু কাকা বলল এখন জানালে দেরী হয়ে যাবে। কাকা পরে সবটা সামলে নেবে, আমি যেন আপাতত বিয়েটা করে নেই।”

মিজান হোসেনের বিশ্বাস হলো না ঠিক আরমানের কথাটা। আরমানের ছোটবেলা থেকে একটা অভ্যাস, নিজে দোষ করে সেই দোষটা মহিন হোসের ঘাড়ে চাপানো। অবশ্য এটা হয়েছে মহিন হোসেনের প্রশ্রয়ের কারণেই।

তাও মিজান হোসেন বিশ্বাস করতে পারলেন না আরমানের কথাটায়। সোফায় গিয়ে বসলেন। ফোনটা হাতে নিয়ে মহিন হোসেনের নাম্বারে কল করলেন। তবে নাম্বারটা বন্ধ পেলেন। গম্ভীর গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“মহিনের নাম্বারটা বন্ধ কেন? তুমি বুদ্ধি দিয়েছো?”

“না বাবা কাকা ভয়ে বন্ধ করে রেখেছে। তাহলে বাবা যেহেতু বড় একজন সাথে ছিলই আমি ভিতরে আসি এখন?”

মিজান হোসেন আবারও বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“এমন কাজ কেন করলে? গ্রামে এই কথাটা জানাজানি হলে আমার সম্মানহানি হবে সেটা তুমি জানতে না? বারবার আমার সম্মানহানি করতে কি খুব ভালো লাগে? আমায় জানালে কি তোমাদের বিয়েটা আমি দিতাম না? আমি তো বলেছিলাম তোমাকে যদি কোন পছন্দ থেকে থাকে তবে আমাকে বলো। তবে এই কাজটা কেন করলে?”

এবার একটু অপরাধবোধ কাজ করলো আরমানের মাঝে। সে জানতো কখনোই তার বাড়ির লোক এই বিয়ে তে আপত্তি করত না। আরজুর অতীত, পরিবার কোন কিছুই ওদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলত না। তবে কিছু করার ছিল না। আজ যদি বিয়েটা না করতো তবে হয়তো আরজুর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলত। সে ক্ষেত্রে হয়তো কখনো আরজুকে বিয়ে করাই হতো না। কোন উত্তর দিতে পারলো না আরমান। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।

মিজান হোসেনের বুক চিরে আবারো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আর কোন কিছু বলার ইচ্ছেই হলো না তার। ঘরে চলে যেতে ধরলে আরজু ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

থেমে গেলেন মিজান হোসেন। ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,

বিজ্ঞাপন

“কিছু বলবে?”

আরজু উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“হ্যাঁ। আসলে আরমান খুবই ভালো ছেলে। আপনাদের শিক্ষা অনেক ভালো আঙ্কেল। আসলে কোন বাবা মা তাদের ছেলে মেয়েকে যে এতটা ভালোবাসে সেটা আমি আরমানের থেকে প্রথম শুনেছিলাম আর বিশ্বাসও করেছিলাম।”

“সেই বাবা-মার ভালোবাসার মূল্য এভাবে রাখলে তোমরা?”

আরজু একবার আরমানের দিকে তাকালো যে দরজায় এখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের সম্পূর্ণ দোষ আরজু নিজের কাঁধে নিয়ে বলল,

“দোষটা আমার আঙ্কেল। আমি জোর করে ছিলাম ওনাকে।”

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আরমান হালকা করে একটু আরজু কে ধমক দিয়ে বলল,

“চুপ। দোষ আমার।”

আরমান শান্ত ভাবেই ধমক দিয়েছিল। ওটাকে ধমক দেওয়া বলে মনে হবেও না। তবে আরজু ধমক দেওয়ার মতন করেই ধমক দিয়ে বলল,

“আপনি চুপ করুন। দেখছেন না আমি কথা বলছি। ওহ্ আঙ্কেল যেটা বলছিলাম, সব দোষ আমার। আসলে আমার শিক্ষায় সমস্যা ছিল। আমি পরিবারে গুরুত্ব অতটা বুঝি না, আমাকে কেউ বোঝাইনি। আসলে হুট করে ওনাকে বিয়ে করার কথা বলে দিয়েছিলাম। আমি তখন বুঝিনি যে এই সিদ্ধান্তটার কারণে ওনার পরিবার মানে আপনারা এতটা কষ্ট পাবেন। যদি বুঝতাম তাহলে হয়তো আমি এমন করতাম না। ওনাকে পরীক্ষা করার ছিল সেজন্য হঠাৎ করে বিয়ের কথাটা বলেছিলাম।”

মিজান হোসেন ফের ভ্রুঁ কুঁচকে বলেন,

“কিসের পরীক্ষা?”

“আসলে আপনার ছেলে ভার্সিটিতে আমার পিছনে পিছনে ঘুরতো। বেশ অনেকদিন বিরক্ত করেছে। যেখানে যেতাম চলে যেত পিছন পিছন। তারপরে বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু আমার বিশ্বাস হতো না ওনাকে। আজ সকালে উনি বললেন গ্রামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে, অর্ধেক রাস্তা চলেও এসেছেন। আমার আসলে ওনার থেকে গুরুত্ব প্রয়োজন ছিল। তাই আমি ওনাকে বলি যে আজই বিয়ে করবো, উনি যেন চলে আসেন। উনি তাই এসেছেন। আমাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার ওনার প্রতি বিশ্বাসও জন্মেছে তাই বিয়েও করে নিয়েছি।”

“তাই বলে হঠাৎ করে এভাবে বিয়ে করে নেবে? যদি তোমার পরিবার রাজি না হয়?”

আরজু মলিন হেসে বলল,

“যায় আসে না ওদের। আমার থাকার কোন জায়গা ছিল না, আমার যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না, আমায় একটু ভরসা দেবে এমন কোন মানুষ ছিল না, আমায় ভালোবাসবে এমন কোন মানুষ ছিল না, আমার আপন কেউ ছিল না। তবে আরমানকে দেখে না খুব নিজের মনে হয়েছিল সেজন্য লোভী হয়ে গিয়েছিলাম। আর হঠাৎ করে বিয়ে করে নিয়েছি।”

“তো কি করতে বলছো এখন আমায়?”

আরজু এবারে অসহায় কন্ঠে বলল,

“জানি ছেলেকে পর করে দেবেন না কখনো। তো ছেলের সাথে আমাকেও একটু থাকতে দেবেন আপনাদের সাথে? আমাকে একটা পরিবার দেবেন? আমার আরমান ছাড়া আর কেউ নেই। আপনারা কি আমার পরিবার হবেন?”

আরজুর কথাটা শুনে আরমানের বুক ফেটে কান্না পেল। এখানে ওর বাবা মা না থাকলে এখনি দৌড়ে গিয়ে নিজের পা'গলিকে বুকের মাঝে আগলে নিত। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতো,

“আমি আছি তো আরু। আর কাউকে লাগবে না আপনার। আমি আপনাকে এত ভালোবাসবো যে কখনো কারোর অভাববোধ হবে না আপনার।”

তবে এসব কিছুই আপাতত বলতে পারলো না আরমান। তাকালো মিজান হোসেনের দিকে ওনার অভিব্যক্তি বোঝার জন্য।

এদিকে কথাগুলো বলে আরজু মাথা নিচু করে ফেলল। আবারো বোধহয় একটু কাঁদলো তবে এবারে আর শব্দ হলো না। রাগ তো হচ্ছে মিজান হোসেনের ছেলের ওপরে। অন্যের মেয়ের ওপরে তিনি কখনোই রাগ দেখাবেন না। আবার যে মেয়েটা এখন তার বাড়ির বউ।

তবে সত্যি বলতে আরমানের থেকে এমন একটা কাজ কখনো আশা করেননি উনি। ওনার ছেলে তো অনেক বিচক্ষণ ছিল তবে এমন হঠকারিতায় এত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত যে কি করে নিয়ে নিল কে জানে। তবে এখন যেহেতু বিয়েটা করেই ফেলেছে আর তো কিছু করার নেই। ফেলে তো আর দিতে পারেন না ছেলে, ছেলের বউ কে।

তার ওপর আবার আরজুর এমন আকুতি। এই আকুতি ফেরানো অসম্ভব।

আরজুর মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন,

“ঘরে যাও। তনুশ্রী, নিয়ে যাও ওকে ঘরে।”

কথাটা বলে মিজান হোসেন ঘরের দিকে চলে গেলেন। পিছন থেকে আরমান চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“বাবা আমি আসবো না?”

মিজান হোসেন কোন উত্তর দিলেন না, চুপচাপ ভেতরে চলে গেলেন। এতক্ষণে সারা শব্দ পাওয়া গেল তনুশ্রী আর তাশরীফের। দুজনে একযোগে আরজুর দিকে এগিয়ে এলো। তনুশ্রী যদিও শান্ত শিষ্ট তবে তাশরীফ ভীষণ উশৃঙ্খল। সিঁড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে আগে আরজু কে নিজের পরিচয় দিল,

“হ্যালো ভাবি, মাইসেল্ফ তাশরীফ। আপনার দেওর। আর আপনি যে আরজু সেটা এতক্ষণে জেনে গিয়েছে। নাইস টু মিট ইউ।”

কথাটা বলে তাশরীফ নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো আরজুর দিকে। আরজু শুধু সেদিকে তাকালো, হাত বাড়ালো না। তনুশ্রী হালকা করে একটা চড় লাগিয়ে তাশরীফ কে পাশে সরিয়ে দিল। হাস্যোজ্জ্বল গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাবি আমি তনুশ্রী। তাওসিফ ভাইয়ার ছোট বোন। আর ও হলো তাশরীফ, আমাদের দুজনের ছোট ভাই। চলুন ঘরে নিয়ে যাই আপনাকে।”

তনুশ্রীর ব্যবহারটা আরজুর ভীষণ পছন্দ হলো। আলতো হেসে মাথা নাড়িয়ে শুধু সম্মতি জানালো। তনুশ্রী নিয়ে গেল আরজু কে। এদিকে দরজায় তখনও আরমান দাঁড়িয়ে আছে। তাশরীফ গিয়ে হাত ধরে ওকে টেনে ঘরের ভেতরে আনলো। এতক্ষণে আমেনা বেগম ছেলেকে একটু আদর করার সুযোগ পেলেন।

“কেমন আছিস বাবা? আর এভাবে কাউকে কিছু না জানিয়ে কেউ বিয়ে করে নেয়? তোর বাবা তো কষ্ট পেল।”

আরমান মিনমিনে গলায় বলল,

“একা একা তো করিনি, কাকা ছিল।”

“আমাকে বোকা বানাতে চাইছিস? জন্ম দিয়েছি তোকে। এমনি এমনি এত বড় হোসনি, আমি মানুষ করেছি। মহিন তোকে যতই প্রশ্রয় দিক না কেন কিন্তু এটা করতে সাহায্য করবে না। বেচারাকে শুধু শুধু ফাঁসিয়ে দিলি।”

আরমান এবারে দু হাতে আমেনা বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কি করে তুমি সব বুঝে চাও বলো তো? আর চিন্তা করো না, বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমি বাবাকে ঠিক রাজি করিয়ে নেব। আর আমার বাবা কি ভিলেন নাকি যে ছেলে বিয়ে করে এনেছে আর ছেলের বউকে মেনে নেবে না? আমি জানি বাবা ঠিক মেনে নেবে। শুধু একটু ক্ষমা চাইতে হবে বাবার কাছে। ও আমি চেয়ে নেব, চিন্তা করো না।”

_________

তনুশ্রী আরজু কে আরমানের ঘরে রেখে গিয়েছে। বলেছে ফ্রেশ হতে, একটু পর আসবে আবার। এদিকে সেই কথা আরজু ভুলেই গেছে। ক্রমাগতভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে আর অপেক্ষা করছে আরমান আসার। একটু পর আরমান এলো। আরমান ভিতরে ঢুকতেই আরজু তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,

“দরজা বন্ধ করুন।”

আরমান চোখে মুখে একটু লজ্জা ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আরে আরু এত তাড়াহুড়ো কিসের? রাত তো এখনো বাকি আছে। সবাই জেগে আছে এত তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করা যায় নাকি।”

আরজু রাগান্বিত গলায় বলল,

“দরজা বন্ধ করতে বলেছি আমি। আপনি বন্ধ করবেন নাকি আমি করব?”

আরমান পড়লো মহা ঝামেলায়। এখন যদি দরজা বন্ধ করে আর সেটা যদি তাশরীফ কিংবা তনুশ্রী টের পায় তাহলে হয়ে গেল। আরজু কে তো কিছু বলবে না যা বলার আরমান কে বলবে।

তবে কোন উপায় নেই। যেহেতু আরজু বলেছে দরজা বন্ধ করতে হবে তার মানে করতেই হবে। নিরুপায় আরমান গিয়ে দরজা বন্ধ করলো। আরজু আরমানের হাত ধরে টেনে এনে বিছানায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“আপনার বাবা আমার পরিবার সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করেছে? আপনি কিছু বলেছেন কাউকে? আপনি বলেছেন আমার বাবা সন্ত্রাসী ছিল? আপনি কি বলেছেন আমার ভাই অমানুষ?”

“না তো। এসব তো কাউকে বলিনি আমি। আপনাকে কেউ কিছু বলেছে নাকি?”

“না, আমায় কেউ কিছু বলেনি।”

“তাহলে অযথা এতো ভয় পাচ্ছেন কেন? আর এখানে ভয় পাওয়ারই বা কি আছে? আপনি তো আর সন্ত্রাসী না।”

আরজুর অস্থিরতা কমলো। থেমে গেল। বেশ অনেকক্ষণ আনমনে কিছু ভাবলো। হুট করে আবার অস্থির হয়ে উঠল। অস্থির গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরমান, আপনি কাউকে বলবেন না যে আমি সন্ত্রাসীর মেয়ে কেমন? আপনি..... আপনি বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলে দেবেন। আমি বলতে গেলে ধরা পরে যাব। কাউকে বলবেন না আমার অতীতের কথা।”

আরজুর এলোমেলো চুলগুলো আরমান দুহাতে ঠিক করে দিয়ে বলল,

“কিসের অতীত? আমার আরুর কোনো অতীতই ছিল না বলে আমি ধরে নিলাম। আমিই আমার আরুর বর্তমান, আমিই আমার আরুর ভবিষ্যত। আমার আরু আমার সব, আমি আমার আরুর সব। ব্যাস, কথা শেষ। সবাই শুধু জানবে আমি আমার আরু কে ভালোবাসি।”

আরজু শান্ত হতে পারল না। নিজের চুল থেকে আরমানের হাতটা নামিয়ে নিজের দু হাতের মুঠোয় সেটাকে আঁকড়ে ধরে সংকিত গলায় বলল,

“আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন না তো আরমান? কখনো আবার আমি পুরনো হয়ে যাবো না তো আপনার কাছে? আপনি বদলে গেলে আমি কিন্তু সত্যি পা'গল হয়ে যাব সেদিন।”

আরমান হাসলো আরজুর কথা শুনে। গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,

“পা'গল তো আপনাকে হতেই হবে আরু। আমার ভালোবাসায় আপনাকে পা'গল হতেই হবে। এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই আপনার কাছে।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প