সকালে আগে ঘুম ভাঙলো আরমানের। রাতে ঘুমোনোর আগে ঘরের জানালাটা বন্ধ করা হয়নি ফলে সকাল হতে না হতেই পুরো ঘর আলোকিত হয়ে গিয়েছে। একটু যে শান্তিতে ঘুমোবে সেই উপায়ও নেই। আরমানের আবার অল্প একটু আলো চোখে পরলেই ঘুম হয় না।
ঘুম ভাঙতেই কাত ঘুরতে নিয়ে ধপ করে সোফা থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো। এমন ভাবে চেঁচিয়ে উঠলো যে আরজুর ঘুমটাও ভেঙে গেল। লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
এদিকে ঘরে কোন এক মেয়েলি কণ্ঠস্বর পেয়ে আরমান চমকালো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো বিছানার উপর আতঙ্কিত মুখ ভঙ্গিতে আরজু বসে আছে। কিছুক্ষণের জন্য আরমান নিজের ব্যথা ভুলে গেল। শুধু হা করে আরজুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ভাবল আরজু কি করে ওর ঘরে এলো? আরমান আর আরজু কি করে এক ঘরে ঘুমোতে পারে?
বেশ কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তার পর মস্তিষ্কে একটু জোর প্রয়োগ করতেই আরমানের মনে পড়ে গেল গতকালই তো আরজুর সাথে ওর বিয়ে হয়েছে। এতক্ষণ তো অন্য ধান্দায় থাকার জন্য ব্যথাটা ভুলে বসে ছিল তবে এবারে খুশির ঠেলায় ব্যাথাটা ভুলে গেল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখটায় ফুটে উঠল হাসি।
এদিকে হঠাৎ করে ঘুমের মাঝে আরমানের এমন চেঁচানোর শব্দ পাওয়ার পর উঠে দেখছে আরমান হাসছে। ব্যাপারটা ভিষণ অদ্ভুত লাগলো আরজুর কাছে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“হাসছেন কেন?”
আরমান মিটিমিটি হেসে বলল,
“আমার ভাবতেই লজ্জা করছে আরু যে গতকালই আমাদের দুজনের বিয়ে হয়েছে?”
আরজু বিরক্তি তে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“যদি লজ্জা লাগে তবে চেঁচালেন কেন? আমার ঘুম ভাঙ্গালেন কেন? লজ্জা লাগলে মানুষ এখন যেমন মিটিমিটি হাসছেন তেমন মিটিমিটি হাসে, নয়তো একবারে চুপচাপ থাকে। চেঁচায় না আপনার মতন।”
“আরে আরু ওটা তো লজ্জার জন্য চেঁচাইনি।পড়ে গিয়েছিলাম সোফা থেকে সেজন্য ব্যথায় চেঁচিয়েছিলাম। আপনি কিছুই বোঝেন না।”
আরজু কন্ঠে অনীহা সমেত বলল,
“আমি এত কিছু বুঝতেও চাই না। যাইহোক ঘুমটা যখন ভেঙে গেছে আর তো ঘুমোতেও পারবো না। এখন কি করবো আমি?”
আরমান মেঝে থেকে উঠে গিয়ে বিছানায় আরজুর পাশে বসে বলল,
“পাশে স্বামী বসে থাকতে সারাক্ষণ এত কাজ খোঁজেন কেন? আর এতই যখন কিছু করার ইচ্ছে তো স্বামীকে একটু ভালোবাসলেও তো পারেন, একটু আদরও তো করতে পারেন।”
আরজু হা করে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ আরমানের দিকে। অদ্ভুত গলায় বলল,
“আচ্ছা আরমান ভালো কিভাবে বাসতে হয়? আপনি আমাকে কিভাবে ভালোবেসে ফেললেন? আমি না জানি না কিভাবে ভালোবাসতে হয়।”
আরমান আলতা হেসে আরজুর কাঁধের উপর মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“ভালোবাসা আলাদা করে শিখতে হয় না আরু। এই যে আমি আপনার কাঁধে মাথা রাখলাম অথচ আপনি আমাকে বাধা দিলেন না এটাও কিন্তু একপ্রকারের ভালোবাসা। এই যে আমি আপনাকে এত বিরক্ত করি আপনি বিরক্ত হন ঠিকই কিন্তু তাও আমাকে ছেড়ে চলে যান এটাও কিন্তু আপনার ভালোবাসা। এই যে গতকাল আপনি শুধুমাত্র আমার সাথে থাকার জন্য নিজের ব্যক্তিত্ব থেকে বেরিয়ে, নিজের আত্মসম্মান ভুলে আমার বাবার কাছে অনুনয় করে বললেন যেন আপনাকে এই বাড়িতে থাকতে দেয় এটাও কিন্তু আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা।”
আরজু বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“আমি আপনাকে এত ভালোবেসে ফেলেছি? এতো ভালো কখন বাসলাম, কিভাবে বাসলাম?”
আরমান আরজুর গলার কাছটায় নাক ঘষে বলল,
“পা'গলিটা আমায় অনেক ভালোবাসে। আপনি না বুঝলেও আমি ঠিকই বুঝি।”
আরমান কথাটা বলতে না বলতেই আরজু ছিটকে দূরে সরে গিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
“এমন করছেন কেন? সব সময় শুধু আমাকে ছোঁয়ার ধান্দা।”
আরমান কেঁপে উঠলো প্রথম দফায়। কিছুক্ষণ পর অসহায় গলায় বলল,
“এটুকুও করবো না? কি এমন করেছি আমি?”
“অনেক কিছু করেছেন। আমার ভালো লাগেনা কেউ আমাকে ছোঁবে। এটা আমার ভীষণ অপছন্দ। আমি তো আমার আপার সাথে শুলেও কখনও আমাকে ছুঁতে দেই না সেখানে আপনি তো..আর বললাম না।”
“এভাবে বলেনা আরু। কষ্ট পাই আমি।”
“তো আমি কি করবো? সব আপনার ইচ্ছেতেই হবে? কাল যেমন আপনি নিজের ইচ্ছেতে সোফায় গিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন ঠিক তেমনি আমার ইচ্ছে ছাড়া আমাকে ছুঁতে পারবেন না আপনি।”
আরজু বুঝলো না কেন তবে হঠাৎ করে আরমানের অসহায় মুখ ভঙ্গিটা বদলে গেল। আরজু দেখেই বুঝতে পারলো আরমান রেগে গেছে। হুট করে আরজুর কাছে আরমানকে কেমন অচেনা লাগলো। আরমানকে তো কখনও এভাবে রেগে যেতে দেখেনি আরজু। তাও আবার আরজুর সাথে। তবে কি বদলে গেল আরমান?
আরজু খেয়াল করলো আরমান ওর দিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকে আসছে। আরজুর কেন যেন ভয় হলো। একবার ভাবলো মা'রবে কি আরমান।
আগে যখন ওর বাবা কিংবা প্রিথুল ওর গায়ে হাত তুলতো তখন মা'রা'র আগে তো এভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতো। তার মানে আরমানও নিশ্চয়ই মা'র'বে।
আরমান খুব কাছাকাছি আসতেই আরজু ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো আরজু নিজের গালে আরমানের ছোঁয়া অনুভব করলো ঠিকই তবে ব্যথা পেল না। কিন্তু মা'রলে তো ব্যথা পাওয়ার কথা ছিল। তারমানে আরমান মা'রে'নি। আর এই ব্যাপারটা আরজু তখনই নিশ্চিত হলো যখন আরমানের দাঁড়ির খোঁচা নিজের গালে অনুভব করলো।
আরজু চমকে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা কি করলেন আপনি? চুমু খেলেন কেন আমাকে?”
আরমান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে মৃদু ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“এত কন্ট্রোল নেই আমার নিজের উপরে। আমি পারবো না নিজেকে এত আটকে রাখতে। অন্য কিছু না হয় নাই করতে দিলেন, তাই বলে সামনে বউ বসে আছে একটা চুমুও খেতে পারব না? মামার বাড়ির আবদার নাকি? যখন ইচ্ছে হবে তখনই আপনার নরম নরম গালে টপাটপ গরম গরম চুমু খেয়ে নেব।”
আরমান তো ঢুকে গেল ওয়াশরুমে তবে বসে রইলো আরজু। কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে আরমানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। একটু পর স্বাভাবিক হতে নিজেই নিজের গালে হাত ছুঁয়ে দেখলো।
আরমানকে যতই রাগ দেখাক না কেন তবে ব্যাপারটা তো আরজুরও ভালো লেগেছে। অন্তত এটা তো নিশ্চিত হলো যে আরমান রেগে যায়নি, সবই নাটক ছিল। তবে কি ভেবেছে এই নাটকের প্রতিশোধ নেবেনা আরজু? সুদ সমেত ফেরত নেবে।
_________
আরজুর দায়িত্ব তনুশ্রীকে দিয়ে আরমান তাশরীফকে নিয়ে বেরিয়েছে। কোথায় গেছে আরজু জানে না। শুধু যাওয়ার সময় বলে গেছে খুব দরকারী নাকি কোন কাজ আছে। আরজু গুটিগুটি পায়ে গেল রান্নাঘরে। গিয়ে দেখলো আমেনা বেগম সকালের নাস্তা প্রস্তুত করছেন।
আরজু কে সেখানে আসতে দেখেই তিনি উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“আরে আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমার বাড়িতে আমার ছেলের বউ আছে। এসো মা। দেখো এটা তোমার সংসারের রান্নাঘর।”
আরজু বিস্মিত গলায় বলল,
“এটা আমার সংসার?”
“ওমা এটা তো তোমারই সংসার। আমার অবর্তমানে তো তোমাকেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে। তুমি তো এই বাড়ির বড় বউ।”
যাক তবে শেষ মেষ আরজুরও একটা সংসার হলো। আরজুর কাঁধেও দায়িত্ব পড়লো। আরজু নিজেও পাল্টা হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমায় কি করতে হবে বলুন? আমি করি কিছু।”
আরজু নিজ থেকে কাজ করতে চেয়েছে ব্যাপারটা খুব ভালো লাগলো আমেনা বেগমের। তবে নতুন বউকে তো উনি কোন কাজ করতে দেবেন না। তবে শেষমেষ আরজুর জোরাজুরিতে ভাবলো একটা সহজ কাজই দেওয়া যাক।
“তোমার শ্বশুর চা চেয়েছিল। তুমি বরং চা বানিয়ে ওনাকে দিয়ে এসো, খুশি হবেন।”
এই দায়িত্বটা পেয়ে আরজু সন্তুষ্ট হলো। কেননা বাদ বাকি অন্য কিছু রান্না করতে না পারলেও চা বানানোর অভ্যাস তাও আছে। তারপরও আরজু আমেনা বেগমের থেকে শুনে শুনে সবটা করলো।
চা বানানোর শেষে কাপে ঢেলে নিয়ে গেল মিজান হোসেনের ঘরে। আরজু তো ঘর চেনেনা। তাই তনুশ্রী ঘরটা চিনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করলো। আরজু কে ভিতরে পাঠিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল দরজায়। যদিও তনুশ্রীর ভরসা আছে নিজের বাবার ওপর যে উনি এমন মানুষই না যে নতুন বউ এর সাথে খারাপ আচরণ করবে। সে যতই ওনার ছেলের প্রতি রাগ থাকুক না কেন। তবুও মনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করলো। আরমান মিজান হোসেনের সবথেকে আদরের। সেই আদরের ছেলে এমন একটা কাজ করলো। বলা যায় না হয়তো মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা কষ্ট থেকে আরজুর সাথে খারাপ আচরণ করে ফেললেন।
নিজের আরাম কেদারায় বসে মিজান হোসেন তখন বই পড়ছেন। পাশের ছোট্ট টেবিলটায় খবরে কাগজটা পড়ে আছে। সেটাও পড়া শেষ। আরজু কে দেখে তিনি বইটা পাশে রেখে দিলেন। বইয়ের সাথে সাথে চোখের চশমাটাও খুলে রেখে দিলেন। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে আরজুর দিকে তাকালেন।
মিজান হোসেনের ঠোঁটে হাসিটা দেখতেই আরজুর অনেকটা ভয় কেটে গেল। তবে এখনো ভয় লাগছে। কাঁপাকাঁপা হাতে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিল মিজান হোসেনের দিকে। উনি খেয়াল করলেন আরজুর হাতটা কাঁপছে। তিনি সময় ব্যয় না করে কাপটা হাতে নিয়ে মৃদু চিন্তিত গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“হাত কেন কাঁপছে মা? শরীর খারাপ তোমার?”
আরজু থমকে গেল কিছু সময়ের জন্য। একেই তো মিজান হোসেনের নরম কণ্ঠস্বর তার উপর আবার মা ডাক। তার উপরে আবার চিন্তা করছেন উনি আরজুর জন্য। সব মিলিয়ে অল্পের জন্য আরজুর দুচোখ ছাপিয়ে জল বেরোলো না। খুব কষ্টে নিজের কান্না নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“না আমি ঠিক আছি। আর এই চা টা আমি বানিয়েছি।”
“তাই নাকি? এতদিন তোমার শাশুড়ির হাতে চা খেয়েছি এবার থেকে তাহলে তোমার হাতের চা খাব।”
আরজু একটু অবাক হয়ে বলল,
“আপনি রোজ আমার হাতের বানানো চা খাবেন?”
“তুমি খাওয়ালেই খাবো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে খাওয়াবো।”
মিজান হোসেন ভাবলেন আরজু বোধ হয় এখন চলে যাবে। তবে আরজু গেল না। মিজান হোসেন চায়ে চুমুক দিয়ে আরজুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কিছু বলবে তুমি?”
আরজু কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে আবারো বলল,
“আমি বানিয়েছি চা।”
মিজান হােসেনের এবারে কেন যেন মনে হলো আরজু একটু প্রশংসা শুনতে চাইছে ওনার মুখে। ওনারই ভুল হয়েছে। চা তো ভালো হয়েছে, ওনার প্রশংসা করা উচিত ছিল। বাহবা দেওয়া উচিত ছিল। দিন দিন যেন ওনার জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে।
“ওহ্ আমি তো প্রশংসা করার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তোমার শাশুড়িও এত সুন্দর চা বানাতে পারেনি কখনো।’
খুশিতে আরজুর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো। তবে আরেকবার নিশ্চিত হওয়া দরকার। সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি চায়ের প্রশংসা করলেন?”
“হ্যাঁ। খুব সুন্দর হয়েছে চা। দাঁড়াও।”
কথাটা বলে মিজান হোসেন উঠে গিয়ে আলমারি খুললেন। কি করছেন জানে না আরজু। একটু পরে এসে আরজু কে হাত বাড়াতে বললেন। আরজু কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ নিজের হাতটা বাড়ালো। আরজুর হাতের মুঠোয় টাকা দিয়ে বললেন,
“আজ প্রথমবার রান্না করেছো এই বাড়িতে। এটা তোমার উপহার।”
আরজুর একবারও না করতে ইচ্ছে হলো না। সঙ্গে সঙ্গে টাকাটা নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“আমার বাবাও কখনো আমার রান্নার প্রশংসা করেনি। আমি তো আমার বাবাকে কখনো চা বানিয়ে খাওয়ায়নি। আপনি খুব ভালো। এই প্রথম বাবার বয়সী কেউ আমায় উপহার দিল। আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনি খুব ভালো, একদম আরমানের মতন।”
কেমন অবুঝের মতন আচরণ করলো আরজু। মিজান হোসেন অবাক হলেন সামান্য প্রশংসা আর সামান্য উপহারেই এতটা খুশি হওয়ার কারণে। সেই সাথে তিনি এটাও বেশ ভালোই বুঝতে পারলেন এই মেয়েটাকে খুশি করার জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট বিষয়েই মেয়েটা খুশি হয়ে যেতে পারে।
_________
দিনের বেলা এখন তেমন একটা ঠান্ডা পড়ে না। তবে রাতে এখনো বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে। তবে গ্রামাঞ্চল হওয়ায় দিনের বেলাতেও হালকা পাতলা ঠান্ডা পড়েছে। আরমানের পরনে এখনো সেই রাতের টি-শার্ট আর লুঙ্গি। শুধু বেরোনোর আগে একটা চাদর জড়িয়েছে গায়ে।
এদিকে তাশরীফ সোয়েটার, জ্যাকেট, চাদর, আবার মাথায় টুপিও লাগিয়েছে। শুধু গলায় মাফলারটা জড়ানো বাকি। আর সেটা বারবার মনে হয়েই যেন ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে।
জমির আল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের জমিতে গিয়ে দাঁড়ালো আরমান। খালি পায়ে এসেছে আরমান। ঘাসের উপর জমে থাকা শিশিরে পা ভিজে গেল। তবে একটুও অস্বস্তি হলো না আরমানের। অনেকগুলো দিন পর খালি পায়ে হাঁটলো। অনুভূতিটা দারুণ। গ্রামে খুব একটা আসা হয় না এখন তবে একবার এলে আর ফিরতে মন চায় না। মন চায় যেন এই সবুজের সমারোহের মাঝেই শান্তিতে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে।
এদিকে তাশরীফের মাঝে এমন বিশেষ কোনো অনুভূতি লক্ষ্য করা গেল না। আপাতত কাঁপছে। বাধ্য হয়ে এসেছে আরমানের সাথে। জানে না এলে মা'র খাবে। এই একটা কারণে তাশরীফের মনে হয় আরমান গ্রামে না আসাই ভালো। এলেই ওর উপর জোর জুলুম চালায়।
যেদিকে চোখ যাচ্ছে শুধু সরষের খেত দেখা যাচ্ছে। চারিদিকটা হলুদ ফুলে ভরা। আপাতত এখানে কোন কাজে আসেনি আরমান শুধু এসেছে সকাল বেলা একটু নিজেদের জমিগুলো দেখতে। ফলন কেমন হচ্ছে সেগুলো দেখতে।
এদিকে তাশরীফ এই জায়গা গুলো রোজই দেখে। ফলস্বরূপ একটু বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ভাইয়া, এখানে কেন এসেছি আমরা? এগুলো আমি রোজ দেখি। তুমি না হয় দেখো না। তুমি একা আসতে।”
আরমান চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
“সোজা হয়ে দাঁড়া। তুই তাওসিফ আরমানের ভাই। তনুশ্রীও তো তোর মতন করে না। ছেলে হয়ে মেয়েদের মতন আচরণ করিস কেন? আর সব সময় মিন মিন করে কথা বলবি না। বুক টান করে তেজ সমেত কথা বলবি। যদি গলা কেঁপেছে তবে তোর একদিন কি আমার যে কয়দিন লাগে।”
তাশরীফ একটু তেজ দেখিয়েই বলল,
“আমার বুক টান করতে হবে না। ঠান্ডার দিনে বুক টান সবার হবে না। তোমার র'ক্ত গরম তুমি বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি গেলাম।”
কথাটা বলে তাশরীফ সত্যি চলে যেতে নিলে পিছন থেকে আরমান ওর ঘাড় চেপে ধরলো। তাশরীফ ব্যথায় ককিয়ে উঠে বলল,
“ছেড়ে দাও না ভাইয়া। আমি বাড়ি যাব। আমি ঘুমোবো।”
আরমান এবার কন্ঠটা একটু নরম করে বলল,
“সারাটা জীবন তো ঘুমিয়েই কাটালি। একটু তো দায়িত্ব নিতে শেখ যেন অন্তত আমি না থাকা অবস্থায় তোকে দেখে মানুষজন ভয় করে। আমি গ্রামে থাকলে কারো সাহস হবে বাবার সাথে উঁচু গলায় কথা বলার? আমি যখন শহরে থাকি তোকে গ্রামে রেখে দেই যেন বাবা ভরসা পায়। সেই তোকে দিয়ে তো কোন কাজই হয় না উল্টো নিজে মা'র খেয়ে বসে থাকিস। এটা কোন কথা হলো।”
তাশরীফ এবারে মিনমিনে গলায় বলল,
“বাবাকে ওরা অনেকজন মিলে ভয় দেখায়। ওরা তো গুন্ডা আমি তো আর গুন্ডা না। আর তাছাড়া বাবা আমাকে কথা বলতে মানা করে। তবে আপুকে যারা বিরক্ত করছিল ওদেরকে তো আমি ভয় দেখিয়েছিলাম। সেজন্যই তো ওরা মে'রে'ছিল।”
আরমান আবারও ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“তুই উল্টো দুটো লাগিয়ে দিতে পারিস নি। তারপর কি হতো, কে তোকে নিয়ে বিচার বসাতো সেসব আমি দেখে নিতাম। তোর ভাই আছে তো।”
তাশরীফ অসহায় গলায় বলল,
“আমার এত সাহস নেই ভাইয়া। আমার ভয় করে।”
আরমান ফোঁস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তাশরীফ ছোট মানুষ এখনো, সেজন্য ভয় পায়। আরমানের মতন বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্য তাশরীফের বয়সী থাকতেও আরমানের মাথা আর র'ক্ত দুটোই গরম ছিল। ওদের বংশের কোন ছেলের মাথাই তাশরীফের মতন এতটা ঠান্ডা না। হ্যাঁ তাওকীর কে একটু ঠান্ডা বলা চলে। তবে তাওকীর বুঝেশুনে কাজ করে। আর মাথা গরম হলো তানভীর আর আরমানের। তবে তাশরীফের মতন কেউ না।
আরমান তাশরীফের ঘাড়ের পিছন দিয়ে কাঁধের উপর হাত রেখে বলল,
“চল এখন চাচির বাড়িতে শীতের পিঠা খেয়ে আসি। আজকাল আর চাচিরা দাওয়াত দেয় না। কিপটে হয়ে গেছে সবাই।”
তাশরীফ আতঙ্কিত গলায় বলল,
“ওখানে যাব? বাবা যদি বকা দেয়?”
আরমান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“দেবে না। শীতের দিনেও গ্রামটা বেশি উত্তপ্ত হয়ে আছে। সবাইকে ঠান্ডা করার জন্যই তো এসেছি।”