বিকালে ঠিক হলো আরজুকে নিয়ে গ্রামেরই মার্কেটে যাবে আপাতত বাড়িতে পরার জন্য কিছু জামা কাপড় কিনতে। বাড়ির নতুন বউ কে কি বারবার পুরনো কাপড় দেয়া যায় নাকি। মিজান হোসেন দুপুরে চলে গিয়েছিলেন দোকানে। যাওয়ার আগে তনুশ্রীকে বলে গিয়েছিলেন যেন বিকেলে আরজুকে সাথে করে নিয়ে যায়। আরজুকেও বলেছিলেন চলে আসতে।
বিকাল হতেই তনুশ্রী এসে বলল তৈরি হতে। তবে আরজু তনুশ্রীর সাথে একা যেতে রাজি নয়। তবে সরাসরি কথাটা আরমান কে বলতেও পারছে না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরজু তখন চুল আঁচড়াচ্ছে। গতকাল সারাদিন চুল আচড়ায়নি যার ফলে চুলে জট লেগে গেছে। কি যে এক বাজে অভ্যাসে আরজুর চুল আঁচরাতে ইচ্ছে করে না। আয়নায় তাকিয়ে দেখলো আরমান বিছানায় বসে ফোন চালাচ্ছে। একটু কেশে আরমানের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো এবং সফলও হলো।
আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবেন আরু?”
আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“না কিছু বলবো না। আসলে ইরা আপুর থেকে শুনেছিলাম মুনতাসির ভাইয়া নাকি নিজে পছন্দ করে আপুকে জামা কাপড় কিনে দেয়। ভালো লেগেছিল শুনে।”
আরমান কিছুক্ষণ অবুঝের ন্যায় শুধু তাকিয়ে থাকলো আরজুর দিকে। আসলে আরজু কি বলতে চাইছে সেটা ঠিক বোধগম্য হলো না। অনেকক্ষণ ভাবলো কিন্তু তাও বুঝতে পারল না।
“হঠাৎ করে এই কথা বলার মানে কি আরু?”
“কিছুই না। এমনি বললাম। মুনতাসির ভাইয়া কত ভালো! ইরা আপু কে নিজে পছন্দ করে জামা কাপড় কিনে দেয়। আসলে আমি তো অত জামাকাপড় পছন্দ করতে পারি না। আপনার পছন্দ অনেক সুন্দর।”
এবারে যেন আরমান কিছু কিছু আন্দাজ করতে পারছে। তবে এখনো নিশ্চিত না। কিন্তু নিশ্চিত হতে হবে।
“আপনি কি চাইছেন আমিও আপনাকে জামা পছন্দ করে কিনে দেই?”
“আমি সেটা কখন বললাম? আমি চাইনা তবে আমিতো জানি আপনি আমাকে একা ছাড়বেন না। আমি শুধু বলতে চাইছিলাম যে আপনার পছন্দের উপর ভরসা আছে আমার। চাইলে কিনে দিতে পারেন, আমি আপত্তি করব না। আপনি যাবেন তো আমার সাথে?”
“অবশ্যই যাবো। আপনাকে আমি একা ছাড়বো ভাবলেন কি করে?”
আরজু খুশি হলো। গুটি গুটি পায়ে আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আমি খেয়াল করেছি আপনি যে পাঞ্জাবি, শার্টগুলো পড়েন অনেক সুন্দর হয়। আমার ভালো লাগে আপনার পছন্দ। আমাকে অমন কিছুই কিনে দেবেন হ্যাঁ?”
“আপনি পাঞ্জাবি শার্ট কিনবেন?”
আরজু এবারে কিঞ্চিত রাগী গলায় বলল,
“আমার এমন মজা পছন্দ না।”
আরজুর এক কথাতেই আরমান চুপ হয়ে গেল। তবে হুট করে মাথায় একটা কথা খেলে গেল। আরজু খেয়াল করেছে আরমান কি কি পরতো। তার মানে মেয়েটা লুকিয়ে লুকিয়ে নিশ্চয়ই আরমান কে দেখতো। অথচ আরমানকে বুঝতেও দেয়নি। কি চালাক মেয়ে রে বাবা!
ততক্ষণে আরজু আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ানো শুরু করেছে। চুলের জট ছাড়াতে একদম নাজেহাল অবস্থা। এক পর্যায়ে গিয়ে আরমান খেয়াল করল আরজু টানটানি শুরু করেছে। এমন মনোভাব যে চুল ছিড়ে গেলে যাক তবে এই জট আর ঠিক সহ্য হচ্ছে না আরজুর।
আরমান তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে আরজুর কাছে গিয়ে ওর হাত থেকে চিরুনিটা নিয়ে বলল,
“এমন করছেন কেন? ব্যথা পাবেন তো।”
আরজু নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“পেলে পাব তবু এই চুলের ঝামেলা মেটাবো। আমার আর সহ্য হচ্ছে না। প্রত্যেকদিন নিয়ম করে চুল আঁচরাতে পারি না আমি। আমার এত সময় নেই। এত ধৈর্যও নেই।”
আরমান ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“চুপচাপ দাঁড়ান। আমি আঁচড়ে দিচ্ছি সুন্দর করে।”
আরজু একবারও আপত্তি করলো না। আরমান বেশ ধৈর্য নিয়ে অনেকটা সময় ধরে চুলটা সুন্দর করে আঁচড়ে দিল। আঁচড়ানো শেষে বলল,
“বেনি করে দেবো, না খোঁপা করবেন? নাকি ছেড়ে দেবেন চুলগুলো?”
আরজু পাল্টা আরমান কে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার কি পছন্দ?”
আরমান কোনরকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই বলল,
“খোলাই রাখুন, সুন্দর লাগবে।”
আরজু আর কোন কথা বলল না। তনুশ্রী জামার সাথে মিলিয়ে একটা কানের দুলও দিয়ে গিয়েছিল। আরজু পরলো কানের দুল। আরমান খুব সুন্দর ভাবে এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলো।
ধীরে ধীরে তো ওকেই এগোতে হবে। আরমান না এগোলে তো কোন কিছুই সম্ভব না। আর তাছাড়া দুপুরে যখন আরজু ওকে জড়িয়ে ধরেছিল আবার আরমান চুমু দিয়েছিল তখন তো আরজু কিছু বলেনি। তাহলে হয়তো এখনো কিছু বলবে না। জড়িয়ে ধরাই যায়।
আরমান খুব সাহস করে পেছন থেকে দু হাতে আরজুর কোমর জড়িয়ে ধরে আরজুর কাঁধে নিজের থুতনি রাখলো। আর সব থেকে অবাক করার বিষয় হলো আরজু বাধাও দিলো না, কিছু বললও না। নিজ মনে কানের দুল পরে যাচ্ছে।
আরমান আরজুর এই শান্ত স্বভাবটা কে সবুজ সংকেত ধরে নিল। তারমানে আরমান চাইলেই পরবর্তী পদক্ষেপে এগোতে পারে। আরজু কিছু বলবে না।
আরমান খুব সাবধানতার সাথে আরজুর পিঠের উপরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে সামনে দিলো। আরজু বিরক্ত হলো। নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“চুল সামনে দিচ্ছেন কেন? দেখছেন না আমি কানের দুল পরছি?”
আরমান সাবধান হয়ে গেল। আবারো খুব সাবধানতার সাথে আরজুর কাঁধের উপরে থুতনি রাখল। এবারও আরজু কিছুই বলল না। অল্প কিছু সময় পর আরমান হঠাৎ করে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসলো। আরজুর গলার কাছে চুমু খেল।
তৎক্ষণাৎ আরজু আরমানের থেকে ছিটকে দূরে সরে গেল। আরমানও বেশ অনেকটাই দূরে সরে গেল। আরজু বিরক্তিটিতে নাক মুখ কুঁচকে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এমন করছেন কেন? সারাদিন আপনি এই ধান্দাতেই থাকেন? এ ছাড়া আপনার কোন কাজ নেই? সব সময় এখানে চুমু, ওখানে চুমু খেয়েই যাচ্ছেন তো খেয়েই যাচ্ছেন। সমস্যা কি আপনার?”
আরমান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“আসলে আমার চুমু খাওয়ার অসুখ আছে। আর আপনাকে দেখলেই সেই অসুখের তীব্রতা আরো বেড়ে যায়।”
আরজুর ধমকে যে এবারে কোন কাজ হলো না সেটা আরজু বুঝলো। কেননা আরমান চলে গেছে তখন অন্য ধান্দায়। তনুশ্রী আরজু কে দিয়েছে একটা লাল রঙের সালোয়ার কামিজ। আরমান খেয়াল করেছে লাল রঙে আরজু কে অসম্ভব সুন্দর লাগে। কেন এত সুন্দর লাগে আরমান জানেনা। তবে লাল রঙ আরজুকে অত্যাধিক মানায়।
তার উপরে আবার লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া। আর ওই যে বরাবরের মতন চোখে মুখে একটা তেজী ভাব। কি দারুন মানায় আরজু কে সবকিছু তে।
এদিকে এত ঝাড়ি খাওয়ার পরও আরমানের ঠোঁটে হাসি দেখে আরজু একটু ভরকালো। আবার চিন্তার মাঝেও পড়লো। এই ছেলে ভয় পেল না কেন? পুনরায় গম্ভীর গলায় বলল,
“আর এমন করবেন না। আমার ভালো লাগেনা।”
কাজ হলো না আরজুর কথায়। আরমান গুটি গুটি পায়ে আরজুর দিকে এগিয়ে গেল। চোখে মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে রেখেছে। আরমানকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আরজু ধীরে ধীরে পেছালো। পেছাতে পেছাতে এক সময় গিয়ে দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। আরজুও বুঝল ওর কাছে আর পেছানোর মতন জায়গা নেই।
এখন একটাই অস্ত্র, আরমানকে ভয় দেখাতে হবে। কিছু বলতে নেবে তবে ততক্ষণে আরমান অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছে। আরমানের চোখের দিকে তাকিয়ে আরজু যেন নিজেই কেমন ঘাবড়ে গেল। বুঝতে পারলো এই ছেলেকে এখন ভয় দেখিয়েও কাজ হবে না।
হঠাৎ করে ছেলেটা এতো সাহসী কি করে হয়ে উঠলো আরজু সেসব বুঝতে পারল না। আরমান দু'পাশের দেয়ালে হাত দিয়ে নিজের ঠিক দু হাতের মাঝখানে বন্দী করলো আরজু কে।
আরজুর দিকে বেশ অনেকটা ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“একবার ভয় কেটে গেলে খুব বিপদে পড়ে যাবেন আরু। ভয় আর কতই দেখাবেন বলুন?”
আরজু কিছু একটা বলতে চাইলো তবে বলতে পারলো না। আরজুর নিশ্চুপতা যেন আরমানকে আরেকটু সহযোগিতা করলো। শেষমেষ মনে যে ক্ষুদ্র ভয় জমা ছিল তাও যেন আর রইল না। চোখে মুখে ফুটে উঠলো একটা বিজয়ের হাসি। যেন খুব বড় কিছু অর্জন করে ফেলেছে।
আরমান ধীরে ধীরে আরো অনেকটাই ঝুঁকে গেল আরজুর দিকে। দুজনের মাঝে ব্যবধানটা এখন ওই এক ইঞ্চি মতো হবে। আরমানের নিঃশ্বাস আরজুর মুখের উপর আছড়ে পড়ছে।
আরজু বুঝতে পারলো আরমানের দৃষ্টি সরাসরি আরজুর ঠোঁটের উপরে নিবদ্ধ। আরজু আরো ঘাবড়ে গেল। এক সময় খেয়াল করল আরমান একেবারেই নিকটে চলে এসেছে। নিজের ঠোঁটে হালকা স্পর্শ অনুভব করলো আরমানের ঠোঁটের।
আর ঠিক এমন একটা মুহূর্তে দরজায় করাঘাতের একটা বিকট শব্দ ভেসে এলো দুজনের কানে। সেই সাথে তাশরীফের চেঁচানোর শব্দ। আরমান আবারও ছিটকে দূরে সরে গেল আরজুর থেকে। খেয়াল করলো হৃদ স্পন্দনের গতি হঠাৎ করে কয়েক গুণ বেরে গেছে। আরমান যেন কিছুক্ষণের জন্য এই জগতের মাঝেই ছিল না। হঠাৎ করে এই জগতে ফিরে এসে কিছু বুঝতে পারছে না।
খেয়াল করলো তখনো দরজার ওপাশ থেকে সমানে করাঘাত করেই যাচ্ছে সেই সাথে ওর নাম ধরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কোন কিছু না বুঝে আরমান হন্তদন্ত পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
তাশরীফ নিজের চকচকে দাঁতগুলো দেখিয়ে বলল,
“দেরি হয়ে যাচ্ছে তো ভাইয়া, চলো। ভাবি কোথায়?”
“তুই এটা বলার জন্য এসেছিস?”
“ হ্যাঁ। কেন কি হয়েছে?”
আরমানের এখন ঠিক অবাক হওয়া উচিত না রাগ করা উচিত বুঝতে পারল না। তবে এত আফসোস হলো যা বলার বাইরে। কেন দরজা খুলতে গেল, কেন তাশরীফের কণ্ঠ শুনে এভাবে ভয় পেয়ে গেল, কেন দূরে সরে গেল। একটু যদি নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতো, নিজের ভয়ের ওপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারতো তবে এতক্ষণে কিছু একটা করে ফেলতে পারতো। আরজুও বাধা দিচ্ছিলে না।
নিজের ওপরেই রাগ হলো। এদিকে আরমান কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাশরীফ আবারো বলে উঠলো,
“কি হলো? ভাবি কোথায় বলো?”
আরমানে খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“ঘরে আছে গিয়ে দেখ। আর একটা কথা, আমার ঘরে তুই আর আসবি না। আর এলেও আস্তে ধীরে ডাকবি। এভাবে পা'গলের মতন দরজা ধাক্কাবিনা। যদি আর কখনো এই কাজটা করেছিস তাহলে দরজা খুলে সোজা তোকে থা'প্পর মা'রব আমি। বেয়াদব ছেলে কোথাকার। ভদ্রতা, সভ্যতা, আদব-কায়দা কিছু শিখিসনি তুই।”
কথাটা বলে বিড়বিড় করে তাশরীফকে আরো বেশ কিছু গালি দিতে দিতে আরমান চলে গেল সেখান থেকে। তাশরীফ আরমানের অর্ধেক কথাই বুঝলো না, রাগের কারণটা তো দূরে থাক।
ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলা আরজু ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গুটি গুটি পায়ে ভেতরে এসে বলল,
“ভাবি চলো যাই। আরেকটা কথা শোনো, তুমি আমার সাথে আমার বাইকে যাবে আচ্ছা? ভাইয়ের বাইকে উঠবে না কিন্তু।”
আরজু পিছন ঘুরে তাকিয়ে তাশরীফ কে কিছুক্ষণ বেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুব বিচক্ষণতার সাথে দেখে নিল। আরজু জানে না কেন এই ছেলেটা সব সময় ওর পিছনে পিছনে ঘোরে। খুব চায় এই ছেলেটা আরজুর সাথে ভাব জমাতে। তবে আরজুর ঠিক পছন্দ হয় না এই ছেলেটাকে।
এত ঊশৃংখল মানুষজন আরজুর পছন্দ নয়। তনুশ্রী ভালো। কি শান্ত, মিষ্টি একটা মেয়ে। দেখলেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। তবে এই ছেলেটাকে ঠিক পছন্দ হয় না আরজুর। আর এখন তো একটু একটু সন্দেহ হচ্ছে।
“তুমি সব সময় আমার পিছন পিছন ঘোরো কেন? উদ্দেশ্য কি তোমার? আর আমাকে তোমার বাইকে তুলতে চাইছে কেন? কি করবে আমার সাথে?”
তাশরীফ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এতক্ষণ মন থেকে হাসলেও এবারে জোরপূর্বক মুখে সেই হাসিটা বজায় রেখে বলল,
“কোন উদ্দেশ্য নেই আমার ভাবি। আর তোমাকে নিয়ে গিয়ে কি করবো?”
“আমারও তো সেটাই প্রশ্ন। আমি খেয়াল করেছি তুমি খুব করে চাও যেন আমি তোমার সাথে একটু কথা বলি কিন্তু এর কারণ কি? তোমার কি কোন উদ্দেশ্য আছে?”
তাশরীফ মিনমিনে গলায় বলল,
“আমার একটাই উদ্দেশ্য ভাবি তোমার সাথে একটু বন্ধুত্ব করার। আসলে তুমি তো সবার সাথে কথা বলো শুধু আমার সাথে কথা বলো না। আপুর সাথেও কত মিল তোমার। তুমি তো আমার একমাত্র ভাবি। আমার তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু তোমার বোধহয় আমাকে পছন্দ হয়নি।”
ছেলেটার উদ্দেশ্য সৎ। সেই সাথে কথাবার্তা শুনেও আরজু বুঝতে পারলো ছেলেটা খারাপ না। ছোট মানুষ, ইচ্ছেটাও ছোট মানুষের মতনই। না আরজু বোধহয় একে ভুল সন্দেহ করেছে। ছেলেটা উশৃঙ্খল হোক তবে ভালো। উশৃঙ্খল তো আরমানও তবে আরমান ভালো। আর যেহেতু আরমানের ভাই তবে ও হয়তো ভালোই হবে।
এবারে আর গম্ভীর না বরং মৃদু হেসে বলল,
“ঠিক আছে। আজ থেকে তোমার সাথেও কথা বলবো। আর যাওয়ার সময় তোমার বাইকেই যাবো।”
তাশরীফ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“থ্যাঙ্কস ভাবি।”
________
আগামীকাল মিজান হোসেনের দুই ভাই নিজেদের পুরো পরিবারকে নিয়ে আসবেন সেই জন্য আজ বাড়ির পরিবেশটা উৎসবমুখর মনে হচ্ছে। আমেনা বেগম আগে যারা ওনাকে বাড়ির কাজে সাহায্য করেন তাদেরকে দিয়ে সবার ঘরগুলো পরিষ্কার করালেন। বিকালে যখন আরজু কে নিয়ে সবাই জামা কাপড় কিনতে গিয়েছিল তখনই ফেরার পথে আরমান বাজারে করে নিয়ে এসেছে।
রাতের রান্নাবান্না শেষ করে আমেনা বেগম এখন লেগে পড়েছেন পিঠে বানাতে। অনেক রকমের পিঠে বানাতে হবে। অনেকদিন পর তাও এই শীতের দিনে সবাই গ্রামের বাড়িতে ফিরছে। একটু পিঠে না খাওয়ালে হয় নাকি। ওনাকে সাহায্য করছে তনুশ্রী। রান্নাবান্নার কাজে আবার আমেনা বেগম বাড়ির কাজের লোকদের সাহায্য পছন্দ করেন না। পরিবারের মানুষদের জন্য রান্না করবেন তিনি নিজেই সবটা করবেন। ওই তনুশ্রী টুকটাক যা সাহায্য করে।
ওনার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আরজু। এই ব্যাপার গুলো আরজুর কাছে বেশ বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন আসবে জন্য এত তোড়জোড় এর আগে আরজু কখনো দেখেনি। ওদের বাড়িতে তেমন আত্মীয়-স্বজন আসতো না। আসলেও ওই চোর ডাকাতরাই আসতো। ওদেরকে আবার কিসের আপ্যায়ন করবে। দেখলেই তো আরজুর ইচ্ছে করতো ব'টি নিয়ে গিয়ে সবগুলোর গলায় একটা করে কো'প বসাতে।
আর এখানে আরমানের চাচারা আসবে জন্য কত আয়োজন করা হচ্ছে। আমেনা বেগম নিজে কত খুশি। এই পিঠে পুলি বানানো নিয়েও এত তোড়জোড় আরজু কখনো দেখেনি। গত কয়েক বছর ধরে পিঠে খাওয়াও হয় না। আগে বাড়িতে থাকতে নাসিমা বানাতেন। তবে বেশিরভাগ সময়ই আরজুর খাওয়া হত না। মাঝে মাঝে খেতে ইচ্ছে করত না,আর মাঝে মাঝে পেতই না।
এমনটাও কখনো হয়নি যে নাসিমা মেয়ের জন্য আলাদা করে একটু তুলে রাখবেন। পিঠে কিভাবে বানাতে হয় সেই সব বিষয়েও আরজুর ঠিকমতো জ্ঞান নেই। নামও ঠিক করে জানে না সবগুলো পিঠের।
বেশ অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। আমেনা বেগম অনেক গল্প করলেন আরজুর সাথে। এক পর্যায়ে গিয়ে যখন উনি রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তখন আরজুর আর সেখানে মন টিকলো না। কি করবে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে। নিজেকে একদম অপদার্থ মনে হচ্ছে।
বসার ঘরে এসে দেখলো মিজান হোসেন আরমানের সাথে কোন একটা বিষয়ে জরুরী বৈঠকে বসিয়েছেন। আরজু একটু দাঁড়ালো। আরমানকে দেখে মনে হচ্ছে মিজান হোসেনের কাছে বকা খাচ্ছে। মাথাটা নামিয়ে রেখে চুপচাপ বসে আছে। কোন কথার উত্তর দিচ্ছে না।
আরজুর দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই মিজান হোসেনের কণ্ঠস্বর ওর কানে ভেসে এলো। আরমান কে উদ্দেশ্য করে রাগী গলায় বলছেন,
“গ্রামে আসতে না আসতেই গুন্ডামি শুরু করে দিয়েছো। কি ভেবেছো যে শহরে তোমার ভার্সিটিতে যেমন মা'রা'মা'রি করো গ্রামে এসেও তেমন মা'রা'মা'রি করে আমার সম্মান ডোবাবে? আর চেয়ারম্যান কে ফোন করে কি বলেছো?”
আরমান বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“কি বলেছি? কিছুই তো বলিনি।”
“ঠান্ডা গলায় হুমকি দিয়েছো তুমি ওনাকে। নিজের চাচাদের ভয় দেখাও। সব সময় এমন ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না। তোমার কাছে ক্ষমতা আছে জন্যই যে দেখাতে হবে এমন কোন বিষয় না। আমি নিজেকে বাকি আর পাঁচটা মানুষের মতন সাধারন ভাবতে পছন্দ করি। তাই আমার জন্য কোন নিয়ম বদলাবে না। বুঝতে পেরেছো?”
আরমান বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তোমার জন্য কোন নিয়ম না বদলালেও আমার বাবার জন্য বদলাবে। পুরো গ্রামের মানুষের সামনে কেউ একজন আমার বাবার থেকে কৈফিয়ত চাইবে আর আমার বাবা চুপচাপ তাকে কৈফিয়ত দেবে এটা আমার সবচেয়ে অপছন্দের। আমার বাবা কোনো অপরাধী না যে অন্য কেউ তার বিচার করবে। আমি বড় আব্বুর ভয় দেখাইনি। আমি শুধু ওনাকে কল করে বলেছি, আমার বাবা কে যেন সালিশে যেতে না হয়। আমায় যেন ওনাকে নিজের ক্ষমতা দেখাতে না হয়। ব্যস, এতটুকুই বলেছি।”
আরমানের এমন গা ছাড়া ভাব দেখে মিজান হোসেন অবাক না হয়ে পারলেন না। ছেলেটা পুরো বিগড়ে গেছে। রাজনীতি করে করে আরো একদম লাগামহীন হয়ে পড়েছে। কোন ভয় নেই শরীরে। বকতেও পারছেন না এখন আর। ওনার প্রতি ছেলের এত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেখার পরে কি করে বকবেন।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে আরজুও বিরক্ত হলো। ভালো লাগছে না কোন কিছুই। ওই যে বারবার নিজেকে অপদার্থ মনে হচ্ছে। কারো কোন কাজে আসছে না এখানে। আসার পর থেকে কি করেছে? মাঝে মাঝে আরমানকে বিরক্ত করেছে, নয়তো শাসিয়েছে, খাওয়া দাওয়া করেছে, ঘুরেছে ফিরেছে। এর থেকে বেশি তো আর কিছু করেনি। এটা কি কোন জীবন হতে পারে? পড়াশোনা যে করবে বইও নেই। আর পড়ার ইচ্ছেও নেই। এদিকে আরমানও ব্যস্ত। তবে করবেটা কি আরজু?
সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতালায় গেল। এই বাড়িটা অনেক বড় আর পুরনো। আরমানের থেকে শুনেছে পুরনো জমিদার আমলের বাড়ি। গ্রামাঞ্চলেও যে এত সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ি হয় সেটা আরজুর জানা ছিল না। ওদের বাড়িটাও তো গ্রামে ছিল তবে এমন সুন্দর আর জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। বিশাল বড় বাড়ি আরমানদের। ঠিক কতগুলো ঘর আছে সেটা আরজু জানে না।
মাঝে মাঝে মনে হয় এক কোণা থেকে অন্য কোণায় গেলে বোধহয় আরজু হারিয়ে যাবে। আজ সকাল অবধি সবগুলো ঘরই তালা দেওয়া ছিল তবে এখন আর তালা নেই ঘর গুলোতে। কেননা একটু আগে আমেনা বেগম সবার আসার জন্য পরিষ্কার করিয়েছেন ঘরগুলো।
হাঁটতে হাঁটতে একটা ঘরের দরজার সামনে যেতেই আরজুর কানে অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো এবং কন্ঠটা যে তাশরীফের সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। দরজাটা খোলা আছে। আরজু একটু উঁকি দিল।
দেখলো বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে তাশরীফ। ওর সামনে একটা ল্যাপটপ রাখা। ল্যাপটপে কি দেখা যাচ্ছে আরজু সেটা জানে না। তবে যা দেখা যাচ্ছে সেটা দেখেই তাশরীফ হো হো করে হেসে উঠছে। নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে আরজু প্রশ্ন করেই ফেলল,
“কি দেখছো?”
কন্ঠটা কানে যেতেই তাশরীফ দরজার দিকে তাকালো। আরজুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাফ দিয়ে উঠে বসলো। হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“আরে ভাবি তুমি এসেছো আমার ঘরে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভিতরে এসে বসো।”
আরজু গুটি গুটি পায়ে ভেতরে এসে আঙ্গুলের ইশারায় ল্যাপটপটা দেখিয়ে বলল,
“কি দেখছো? কি এমন দেখাচ্ছে ওখানে যে এত হাসছো তুমি?”
“আরে আমি তো মুভি দেখছি। তুমি দেখবে?”
“দেখব? আমি তো দেখি না।”
“আরে দেখো না তো কি হয়েছে? আরে আমার সাথে দেখো, তুমিও হাসবে।”
“তুমি নিশ্চিত আমি হাসবো?”
তাশরীফ জোর গলায় বলল,
“হাসবে না মানে? হাসতে বাধ্য তুমি। এখানে বসো।”
তাশরীফের কথা শুনে আরজু সত্যিকে বসলো। কিন্তু সমস্যা হলো তাশরীফ দেখছে হিন্দি মুভি। আর আরজু হিন্দি ভাষাটা বোঝেনা। কে কি বলে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছেনা। এদিকে তাশরীক সমানে হেসেই যাচ্ছে তো হেসেই যাচ্ছে। এক পর্যায়ে বিরক্ত হলো আরজু। এসেছিল একটু হাসার জন্য তবে এখানে বিরক্তি বাড়লো। উঠে দাঁড়ালো আরজু। তাশরীফ হা করে আরজুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি হলো ভাবি উঠলে কেন?”
আরজু বিরক্তি মাখানো গলাতে বলল,
“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই ভাষা আমি বুঝিনা। অযথা বসে থেকে কি করবো এখানে? তাই চলে যাচ্ছি।”
কথাটা বলে আরজু যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই তাশরীফ তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আরে যেও না ভাবি, যেওনা। আমি বাংলা মুভি দিচ্ছি তাও যেওনা।”
আরজু কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকলো তাশরীফের মুখের দিকে। ছেলেটার চোখ মুখে কেমন যেন একটা অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। যেন খুব করে অনুরোধ করছে আরজুকে থেকে যাওয়ার জন্য। আরজুর ব্যাপারটা যেমন অদ্ভুত লাগলো তেমন আবার ভালো লাগলো। যে ছবিটা দেখে তাশরীফ এত আনন্দ পাচ্ছিল, এত ভালো লাগছিল শুধুমাত্র আরজুর জন্য সেটা বদলে অন্য কিছু চালাবে। আরজুর পছন্দের এত গুরুত্ব আছে ওর কাছে।
“তুমি আমার পছন্দের জন্য তোমার পছন্দ বদলাবে?”
তাশরীফ সহজ সাবলীল গলায় বলল,
“হ্যাঁ। কি সমস্যা? তোমার যখন ভালো লাগছে না তখন অন্য ছবি দেখাই যায়।”
“কিন্তু তোমার যদি সেটা পছন্দ না হয়?”
“আরে না হলে না হবে। তোমার জন্য দেখে নেব। তুমি বসো।”
আরজু বসলো না। শুধু আলতো হেসে বলল,
“তুমি অনেক ভালো। আজ দেখবো না, অন্য কোনদিন তোমার সাথে মুভি দেখব। এখন আর ভালো লাগছে না। তবে তুমি অনেক ভালো। তোমাকেও পছন্দ হয়েছে আমার।”
কথাটা বলে আরজু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তাশরীফ হা করে কিছুক্ষণ আরজুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। দুহাতে মাথা চুলকালো। বুঝতে পারলো না আরজুর কথাগুলো। তবে সেদিকে আর বেশি মনোযোগও দিল না। আবারও কম্বলমুড়ি দিয়ে ল্যাপটপের উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।
আরজু হাঁটতে হাঁটতে একদম করিডরের শেষে কোণার দিকে একটা ঘরের সামনে এলো। এই দিকটা একটু অন্ধকার। এখানকার লাইটটাও জ্বালানো নেই। একদম কোণার দিকের ঘরটার দরজা খোলা দেখল। আরজু দেখে বুঝলো এটা স্টোর রুম। ভেতরের লাইটটাও জ্বলছে। আরজুর মনে হলো লাইটটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। অযথা কারেন্ট বিল উঠছে। না জানি কত টাকা নষ্ট হবে।
তবে ভিতরে যেতে ধরে একবার ভয়ও লাগলো। বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে বুঝলো এই ঘরে কোন জানালা নেই। এমন বন্ধ জায়গা আবার আরজুর পছন্দ না। তার মধ্যে করিডরের এই জায়গাটাও একটু অন্ধকার। একটু ভয় ভয় করছে। একবার ভাবলো যাবে না আবার ভাবলো না কি হবে। সবাই তো বাড়িতেই আছে। লাইট বন্ধ করে দিয়ে আবার চলে।
রান্নাঘরে তখনো আমেনা বেগম আর তনুশ্রী পিঠে বানানোর প্রস্তুতি করছেন। আর বসার ঘরে আরমান তখনও মিজান হোসেনের কাছে বকা খাচ্ছে। এতসব আলোচনার মাঝে হঠাৎ করে আরমানের কানে আরজুর চেঁচানোর শব্দ ভেসে এলো। এবং আরমানের নাম ধরেই একবার দুবার না সমানে চেঁচাতেই আছে তো চেঁচাতেই আছে।
রুহ কেঁপে উঠলো আরমানের ভয়ে। আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও আরজু কে দেখতে পেল না। রান্নাঘর থেকে ততক্ষণের তনুশ্রী আর আমেনা বেগম ছুটে এসেছে। ওদেরকে দেখে আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আরু কোথায়?”
তনুশ্রী ভয়ার্ত গলায় বলল,
“আমি তো জানি না। ভাবি যে কখন রান্নাঘর থেকে চলে এসেছে আমি তো দেখিনি।”
এর মাঝে আবারো আরজু আরমানের নাম ধরে চেঁচালো। শব্দটা অনুসরণ করে বুঝতে পারলো উপর থেকে শব্দ আসছে। আর কোন কিছু ভাবলো না আরমান। “আসছি আরু” বলে চেঁচিয়ে নিজেও সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উপরে চলে গেল।