তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৪৪

🟢

আরজুর যখন ঘুম ভাঙলো তখন বাজে রাত দশটা। ঘুম থেকে উঠে বিছানায় কিছুক্ষণ থ মেরে বসে থাকলো। সারা ঘর চোখ বোলালো কিন্তু আরমানকে কোথাও খুঁজে পেল না। লাইট জ্বালানো, দরজাটাও খোলা।

আরজুর মাথায় একটা প্রশ্ন এলো যে ও এই অসময়ে ঘুমিয়ে ছিল কেন। এমন অসময়ে তো আরজু কখনোই ঘুমোয়না। মস্তিষ্কে একটু জোর দিলো কারণটা খুঁজে বের করার জন্য। হুট করে মনে পড়ে গেল ঘুমোনের আগে কি কি ঘটেছিল, কি কি বলেছে আরজু বাকি সবাইকে।

মুহূর্তের মাঝে মনের মাঝে একটা চাপা ভয় সৃষ্টি হলো আরজুর। তখন আরমানের পরিবারকে না জানি আরো কত কিছু বলেছে। অল্প বিস্তর কিছু কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে ওদেরকে দেখে কিভাবে ভয় পাচ্ছিলো, কিভাবে ওদেরকে এগিয়ে আসতে দেখে আরমানের পিছনে গিয়ে লুকোচ্ছিল। না জানি আরো কত আজেবাজে কথা বলে ফেলেছে আরজু ওদেরকে নিজের বাবা ভাই ভেবে।

নিশ্চয়ই সবাই আরজুর প্রতি এখন ভীষণ রেগে আছে। আরমানও হয়তো রেগে গেছে। সেজন্যই তো এখন আরমান ঘরে নেই। কারো কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কি ওরা আরমান কে ডেকে নিয়ে ওকে বোঝাচ্ছে যেন আরজু কে ছেড়ে দেয়? হতেই পারে। আরজু অনেক বড় অপরাধ করেছে।

আরজু বিছানা থেকে নেমে গুটি গুটি পায়ে করিডরে গিয়ে নিচে উঁকি দিল। বসার ঘরে কাউকে দেখতে পেল না। ভয়টা আরেকটু বাড়লো। আরজু এবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে গেল। যেহেতু বসার ঘরে কেউ নেই তাই ওখানে আর সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। ঘুমোনোর আগে তো দেখেছিল আমেনা বেগম আর তনুশ্রী রান্না ঘরে রান্না করছিলো। তবে ওখানে যাওয়া যাক।

আরজু তাই করলো। গুটিগুটি পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এখনো তনুশ্রী আর আমেনা বেগম রান্নাঘরেই আছে। উঁকি দিতেই বুঝতে পারল আমেনা বেগম এখন তেল পিঠা ভাজছেন। আরজু তনুশ্রীকে ডাকলো ধীর গলায়,

“তনুশ্রী!”

তনুশ্রী ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে আরজু কে দেখতেই মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আরে ভাবি তোমার ঘুম ভেঙেছে। এসো এসো ভিতরে এসো। মা গরম গরম তেল পিঠা ভাজছে। খাও।”

তনুশ্রীর ব্যবহারে আরজু একটু অবাকই হলো। তনুশ্রীর ব্যবহার দেখে তো মনে হচ্ছে না যে ও আরজুর ওপরে রেগে আছে।

এদিকে তনুশ্রীর কণ্ঠে আরজুর নামটা শুনে আমেনা বেগম ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে আরজু কে বলল,

“ভিতরে এসো মা। একটা পিঠে খেয়ে বলোতো মিষ্টি ঠিকঠাক আছে কিনা।”

আরজু আর কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ভেতরে এলো। আমেনা বেগম ওর হাতে একটা পিঠে ধরিয়ে দিলেন। একটু ঠান্ডা হবার পর আরজু এক কামড় খেল। আমেনা বেগম উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“ভালো হয়েছে তো মা?”

আরজু মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“খুব সুন্দর হয়েছে।”

“মিষ্টি ঠিক আছে?”

“আমার তো ঠিকই লাগছে। এখন বাকিদের লাগবে কিনা সেটা তো বলতে পারছিনা।”

“আরে তোমার ঠিক লাগলেই হলো। বাকি সবাইকে তো অনেক পিঠে বানিয়ে খাইয়েছি কিন্তু তোমাকে এই প্রথম পিঠা বানিয়ে খাওয়াচ্ছি। তোমার পছন্দ না হলে চলে নাকি? বাকি সবাই চুলোয় যাক। তোমার পছন্দ হলেই হলো মা।”

মা ডাকটার প্রতি আরজুর একটা অদ্ভুত দুর্বলতা কাজ করে। কেউ যদি একটু ওকে মা বলে ডাকে কেন যেন তার প্রতি একটু একটু করে দুর্বলতা তৈরি হতে থাকে। আরজু জানেনা কেন এই শব্দটা ওকে এতটা দুর্বল করে ফেলে। তবে ভীষণ দুর্বল হয়ে যায় আরজু এই ডাকটা শুনলে। আরমানের বাড়ির যাদের সাথে দেখা হয়েছে গুরুজনেরা সবাই ওকে মা বলেই সম্মোধন করেছে, যে ব্যাপারটা আরজুর খুব পছন্দ।

তবে এখন কথা হলো আরজু ঘুমোনোর আগে যেসব কান্ড ঘটিয়েছিল সে বিষয় নিয়ে ওকে কেউ কোন প্রশ্ন করছে না। আরজু ভাবলো ওর কি নিজ থেকে কিছু বলা উচিত? তনুশ্রী কে কিছু জিজ্ঞেস করা উচিত? কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হল অযথা নিজ থেকে আবার ঝামেলা গুলো মনে করিয়ে কি লাভ।

একপর্যায়ে গিয়ে তো এটাও মনে হলো ও আবার যা ভাবছে সেগুলো সব স্বপ্ন ছিল না তো? আদৌ ওই ঘটনাগুলোকে বাস্তবে ঘটেছিল তো? নাকি আরজু অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য এমন উদ্ভট স্বপ্ন দেখেছিল? হতেই পারে। তবে কাকে জিজ্ঞেস করবে? হ্যাঁ একমাত্র আরমানই পারবে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে।

আরজু তনুশ্রীকে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তনুশ্রী আরমান কোথায়?”

“ভাইয়া তো বাহিরে উঠানো। কে যেন একটা কল করেছিল তার সাথে কথা বলছে। এক্ষুনি গেল।”

“আচ্ছা আমি যাই কেমন।”

“যাও। যদি উঠোনে গিয়ে খুঁজে না পাও তবে আমাকে বলো। আমি ভাইয়াকে ডাকার ব্যবস্থা করে দেবো।”

আরজু মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে চলে গেল। খুঁজতে হলো না কষ্ট করে আরমান কে। সদর দরজা দিয়ে বের হতেই উঠোনো আরমান কে পেল।

অনেক রাত হয়ে গেছে। এত রাত অব্দি গ্রামের মানুষজন সচরাচর জেগে থাকে না। দু একটা ঘরে যদিও লাইট জ্বলতে দেখা যাচ্ছে তবে দিনের বেলা যে সাড়া শব্দটা হয়, সন্ধ্যে অব্দিও যে চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছিল এখন সেটা হচ্ছে না। মাঝে মাঝে ঝিঝি পোকার ডাক কানে আসছে।

হুট করে আরজুর কি যেন মনে হলো। টুকটুক করে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে দু হাতে আরমানের চোখ ধরলো। বলা যায় এটাও আরমানের জন্য একটা পরীক্ষা। আরজু দেখতে চায় আরমান আদৌ ওর স্পর্শ চেনে কিনা।

আর আরমান বরাবর যেমন আরজুর সব পরীক্ষায় খুব সুন্দরভাবে উত্তীর্ণ হয় ঠিক তেমনি এবারও হলো। পাল্টা আরজুর হাতটা ছুঁয়েও দেখার প্রয়োজন হলো না। বরং হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,

“আরে আমার পা'গলীর ঘুম এত তাড়াতাড়ি ভেঙে গেল! আমি তো ভাবলাম একটু পরে গিয়ে আমার পা'গলীটাকে জড়িয়ে ধরে আমিও ঘুমিয়ে পড়বো।”

আরমান আরজু কে চিনতে পেরেছে এই কথাটা শুনে আরজু ঠিক যতটা খুশি হয়েছিল আরমানের বলা শেষের বাক্যটা শুনে ততটাই বিরক্ত হলো। আরজু ছেড়ে দিল আরমানের চোখ।

আরমান পিছন ঘুরে তাকাতেই আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“সব সময়, সব সময় আপনার একই কথা। আর কাকে কাকে বলেন আপনি এগুলো?”

আরমান একটু ভাবার ভঙ্গিতে বলল,

“বউ তো আমার একটাই। শুধু আপনাকেই বলি। অন্যের বউকে তো আর বলতে পারব না এই কথা। আমি কি ভয় পাইনা নাকি আমার আরু কে।”

আরমানের কথার প্রেক্ষিতে আরজু ওকে শাসিয়ে বলল,

“একদম ঠিক। ভয় পাবেন আমাকে। নিজের বউ ব্যতীত অন্যের বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাবেন না। একদম চোখে গরম তেল ঢেলে দেব। এই মুখ দিয়ে যদি নিজের বউ বাদে অন্য কারো প্রশংসা বেরিয়েছে তবে আপনার মুখ আমি সেলাই করো দেবো। আর যদি আপনার মস্তিষ্কে আমি বাদে অন্য কারো বিচরণ হয় তবে মনে রাখবেন আপনার মাথায় খুলি কে'টে মগজ বের করে নেব।”

আরজুর কথাটা শুনে আরমান হোহো করে হেসে উঠে বলল,

“কি এক পা'গলী কে বিয়ে করেছি দিনরাত মা'র্ডা'রে'র হুমকি দেয়। বউ এমন হলে চলে?উ হবে একটু কোমল, নরম। মাঝে মাঝেই একটু কাছে ডাকবে। আবার আমি কাছে ডাকলে সুন্দরভাবে সাড়া দেবে। কখনো নিজে এসে টুপটাপ গালে চুমু দিয়ে দেব। আবার আমি চুমু দিতে চাইলে কখনো বাধা দেবে না।”

আরজু ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“শখ কত! আপনাকে আমি কোনদিনও চুমু দেবো না। আর না আমাকে চুমু খেতে দেব।”

আরমান নিজেও পাল্টা ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,

“ভুলে যাবেন না আরু ইতোমধ্যে আমি আপনাকে অনেক চুমু খেয়ে নিয়েছি। কিন্তু আপনার এখনো চুমু খাওয়া বাকি আছে।”

কথাটা বলে আরমান আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে চোখ মুখে একরাশ কাতরতা ফুটিয়ে তুলে বলল,

“একটা চুমু দিন না আমায়। দেখুন এখন এখানে কেউ নেই। কেউ টের পাবে না। একটা, শুধু একটা চুমু দিন। ঠোঁটে দিতে হবে না, গালেই দিন।”

আরমানের কথার প্রেক্ষিতা আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“জীবনেও আমি আপনাকে চুমু খাবো না। এসব অশ্লীল কাজ এই আরজু করে না, করবেও না।”

আরমান এবারে পূর্বের থেকে আরো দ্বিগুণ বেশি কাতর গলায় বলল,

“আরু! আরু রে! ওই পা'গলী এভাবে বলবেন না। ধরে নিন আমার গাল হলো চায়ের কাপ। আপনি চুমু খাওয়ার জন্য না, চা খাওয়ার জন্য চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছেন। এরকম ভুলভাল ভেবেই একটু চুমু দিয়ে দিন আরু। নাহলে এই চুমু রোগ কিন্তু আমায় মে'রে ফেলবে।”

আরমান বুঝতে পারলো এবারে আরজুর অভিব্যক্তি একটু বদলালো। আরমানের কঠোর পা'গলীটা একটু যেন নরম হলো।

“কি হলো আরু? হঠাৎ করে চুপ করে গেলেন যে?”

আরমানের প্রশ্নের কোন উত্তর আরজু দিল না। কিছুক্ষণ আনমনে নিজেই নিজের মতন করে কিসব ভেবে গেল। কে জানে আরজুর ভাবনার জগতে কি সব চলে।

বেশ অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তা শেষে প্রশ্ন করল আরমানকে,

“আচ্ছা আমি চুমু না খেলে আপনি আর আমায় ভালোবাসবেন না?”

আরমান তড়িঘড়ি করে বলল,

“না আরু। সব সময়, সব পরিস্থিতিতে আমি আপনাকে ভালোবাসবো।”

“ঘুমোনের আগে আমি অনেক পা'গলামি করেছি তাই না? আমি কি আজেবাজে কিছু কথা বলে ফেলেছি? এমন কিছু কি বলে ফেলেছি যাতে আপনি কিংবা আপনার পরিবার কষ্ট পেয়েছেন?”

আরমান বুঝতে দিতে চাইলো না আরজু কে যে ঘুমের আগে ও কি কি বলেছে। বুঝতে পারছে আরজু হয়তো অনেক কিছুই ভুলে গেছে। কারণ তখন ভয় পেয়ে সবটা বলেছিল। হয়তো অত কিছু বলতোও না কিন্তু আবেগের বশবর্তী হয়ে বলে ফেলেছে। আর আরমান সেসব পুরনো কথা তুলতে চায় না। হেসে উঠে বলল,

“পা'গলামি তো একটু করেছেনই। আমি তো ভাবতেই পারছি না যে আমার পা'গলী কিনা সামান্য অন্ধকারে ভয় পেয়ে যায়। আরে কে কি ভয় দেখিয়েছে সেটা বড় কথা না। কিন্তু আমার পা'গলীটা যে ভয় পেয়ে গেছে এটা বড় কথা। তবে চিন্তা করবেন না আজ থেকে আপনাকে আর ভয় পেতে দেবো না।”

“আর আপনার পরিবার কিছু মনে করেনি?”

আরমান আরজুর গালে আলতো করে হাত রেখে আদূরে গলায় বলল,

“আপনার অসহায়ত্বের গল্প শুনে আমাদের সবার শুধু আফসোসই হয়েছে আরু। আমাদের সবার শুধু এতোটুকুই মনে হয়েছে যে আপনাকে হয়তো আমাদের পরিবারে আনতে অনেকটা দেরি করে ফেলেছি। অনেক কষ্ট সহ্য করে নিয়েছেন আপনি তবে চিন্তা করবেন না আর আপনাকে কষ্ট পেতে হবে না। আপনি এবার পরিবারের একটা আলাদা সংজ্ঞা জানবেন। সত্যিকারের পরিবার কেমন হয় সেটা আপনি এই পরিবারে দেখবেন।”

“ভালোবাসেন এখনো আমায়? আমাকে কেউ বাজেভাবে ছুঁয়ে ছিল এটা জানার পরও ভালোবাসবেন?”

আরমান বরাবর যা করে এবারও তাই করলো। জড়িয়ে ধরলো আরজু কে। আরমানের গায়ে জড়ানো শালটা দিয়ে আরজু কেউ জড়িয়ে নিল।

“আমি শুধু জানি আমার আরু পবিত্র। আমি ছুঁয়েছি আমার আরু কে। আমি শুধু জানি আমি আমার আরু কে ভালোবাসি। আর কিচ্ছু জানার কিংবা বোঝার আমার কোন দরকার নেই।”

আরজু মুখে আর কিছু বলল না। মনে মনে শুধু বলল,

“একদিন আপনি আমায় ঠিক ঘৃণা করবেন আরমান। আমিও অপরাধ করেছি। সেটা শোনার পর আমি জানি আপনিও আমায় ঘৃণা করবেন। তাই আমি কখনো আপনাকে সেটা বলবোই না।”

________

ঘরের এক কোণে মেঝের উপর চুপচাপ বসে কাঁদছে প্রার্থনা। কাঁদার সময় তার শব্দ করাও বারণ। কপালের ডান দিকে কিছুটা অংশ কে'টে গেছে। ঠোঁটের কোণেও র'ক্ত অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এছাড়া শরীরের আরো অসংখ্য জায়গায় অজস্র ক্ষতর চিহ্ন আছে। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে।

যে অমানুষ প্রার্থনার এই অবস্থা করেছে সে এখন গেছে গোসল করতে। আজ প্রার্থনার অপরাধটা ছিল বাইরের কিছু মানুষের সামনে প্রার্থনা চলে এসেছিল। তারা যখন হিংস্র জানোয়ারের মতন প্রার্থনার দিকে তাকিয়ে ছিল সে ব্যাপারটা ফাহিমের মোটেও পছন্দ হয়নি। সত্যি বলতে বাইরে থেকে কেউ এসেছিল সেই ঘটনাটা প্রার্থনার জানা ছিল না। প্রার্থনা তো বাপের বাড়ি থেকে ফিরছিল। এ বাড়ি তে ভালো লাগে না থাকতে। তাই গিয়েছিল নাসিমার সাথে একটু কথাবার্তা বলতে।

সেখান থেকে ফিরে এসে দেখে বসার ঘরে বেশ কিছু মানুষজন। প্রার্থনা ওদের চিনতো না। তবে যেহেতু ফাহিমের সাথে দেখা করতে এসেছে তারমানে সুবিধার হবে না। আগে যদি জানতো তবে প্রার্থনা নিজেই এখানে আসতো না। আর সেই অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রার্থনার উপর সেই কুকুরগুলো কুদৃষ্টি ফাহিমের সহ্য হয়নি।

যারা সে দৃষ্টি দিয়েছিল তাদেরকে কিছু করার ক্ষমতা নেই। ব্যবসার মানুষজন। তাদের সাথে ঝামেলা করলে সমস্যা হতে পারে। তবে প্রার্থনা তো আছে। প্রার্থনাকে তো শিক্ষা দেওয়া যায় তাই নিজের সমস্ত রাগ ঘরে এসে প্রার্থনার উপর মিটিয়েছে। বেল্ট দিয়ে ইচ্ছে মতো পি'টি'য়ে'ছে। নিজের সমস্ত রাগ খুব সুন্দর ভাবে প্রার্থনার উপর বের করেছে।সেই সাথে অকথ্য ভাষায় গালাগালি তো ছিলই।

এক পর্যায়ে প্রার্থনা যখন আর সহ্য করতে না পেরে ঘর থেকে পালিয়ে যেতে ধরেছিলো তখন ফাহিম পেছন থেকে ধরে ওকে দেওয়ালের সাথে মাথায় একটা জোরে বারি মা'রে। তখনই কপালের কিছু অংশ কেটে যায়। তারপর থেকে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। কিছুক্ষণ মেঝেতে পড়েও ছিল। সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন অবস্থায় না। তবে কিছু বলার কিংবা চোখ খুলে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা ছিল না।

ফাহিম শুধু মা'র'পি'ট করে থেমে থাকেনি।। নিজের রাগ মেটানোর পরে হুট করে আবার প্রার্থনা কে দেখে নিজের ভেতরে থাকা অন্যরকম একটা পশু সত্তা জেগে উঠেছিল।

আগে তো প্রার্থনা নিজের স্ত্রী ছিল না তাই তখন শুধু দুচোখ ভরে দেখতেই পারতো কিংবা মাঝে মাঝে ছোঁয়ার চেষ্টা করতো। কখন সফল হয়েছে কখনো হয়নি। তবে এখন তো প্রার্থনা ফাহিমের কেনা ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যখন যেভাবে ইচ্ছে সেখানে হস্তক্ষেপ করতেই পারে। সেজন্যই তো নিজের শারীরিক চাহিদাও মিটিয়ে তারপরে ছেড়েছে মেয়েটাকে।

একটু পরে গোসল সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফাহিম দেখলো প্রার্থনা মেঝেতে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে চুপচাপ দুই হাঁটু মুড়ে বসে আছে। ফাহিম আদেশের সুরে বলল,

“খাবার দে। রান্নাবান্না কিছু করেছিস না সারাদিন টইটই করে ঘুরতেই যায় তোর? কাকে কাকে দেখিয়ে বেড়াস নিজের শরীর? আমাকে দেখিয়ে সাধ মেটে না যখন আগে বললেই পারতি। বেঁচে দিয়ে আসতাম। সারাদিন রাত ব্যবসায় করতি আর টাকা কামাতি।”

প্রার্থনা কোন উত্তর দিল না। ফাহিম বুঝলো না কথাগুলো প্রার্থনার কানে আদৌ পৌঁছল কিনা। আবারো খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“রান্নাবান্না কিছু করেছিস? যা খাবার বেড়ে দে।”

বিজ্ঞাপন

ফাহিমের ধমকে প্রার্থনা এবারে মৃদু কেঁপে উঠলো। তোতলানো গলায় বলল,

“রান্না হয়নি।”

ফাহিম পূর্বের থেকেও দ্বিগুন বেশি রাগান্বিত গলায় বলল,

“সারাদিন করিস কি বাড়িতে বসে থেকে? এখন এখানে বসে না থেকে রান্না কর।”

ফাহিম খেয়াল করল প্রার্থনা নড়াচাড়া করছে না। মাথাটা আবারো গরম হয়ে গেল। মেঝেতে বসে থাকা প্রার্থনার দিকে এগিয়ে গিয়ে এক হাঁটু গেড়ে বসে এক হাতে শক্ত করে প্রার্থনার চোয়াল চেপে ধরল। খুব শক্ত করে চেপে ধরেছে। খুব ব্যথা করার কথা। হয়তো ব্যথা করছেও তবে প্রার্থনা এবারে আর্তনাদ করলো না। অনুরোধও করলো ওকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে শুধু ফাহিমের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

“দুই মিনিটের মধ্যে যদি উঠে রান্না ঘরে না গিয়েছিস তবে এবার তোকে এমন ভাবে মা'র'বো যেন এই চোখ দুটো দিয়ে তাকিয়ে থাকতে না পারিস। এখন পর্যন্ত শুুধু আমিই দেখেছি তোর শরীর এবারে সবাইকে দেখাবো। এমন ভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করব যেনো টাকাও উপার্জন করতে পারি আমি। তাই যদি নিজের ভালো চাস তো যা।”

কথাটা বলে ছেড়ে দিল ফাহিম প্রার্থনা কে। প্রার্থনা এবার উঠে দাঁড়ালো। হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তবুও হাঁটার চেষ্টা করলো। মেঝের উপরে পড়ে থাকা ওড়না গায়ে জড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। আগে বেসিনে গিয়ে মুখটা ধুলো। আয়নার দিকে তাকাইতেই নিজের মুখটা দেখে আঁৎকে উঠলো। নাকের ওখানটায় একটু রক্ত জমা হয়ে আছে। মুখে আর কত জায়গায় যে কালো দাগ হয়ে গেছে সেটা প্রার্থনা হয়তো গুনে শেষ করতে পারবে না। নিজের চেহারাটা নিজেই যেন চিনতে পারলো না।

প্রার্থনার বড্ড অপরিচিত লাগলো নিজেকে নিজের কাছে। খুব বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো না। মুখটা ধুঁয়ে চলে গেল রান্না করতে। রান্নাবান্না শেষ করে ফাহিমকে খেতে ডাকলো। ফাহিম খেলা। বেশ তৃপ্তি করই খেল।

প্রার্থনার হাতের রান্না খুব সুন্দর। আজ জেনো আরেকটু মনোযোগ দিয়ে রান্না করেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ অনেকগুলো পদ রান্না করেছে। একদম গরম গরম ভাত তরকারি দিলো ফাহিমকে।

খাওয়া-দাওয়া শেষে ফাহিম উঠে আবার নিজের ঘরে চলে গেল। যাওয়ার আগে আবার প্রার্থনা কে আদেশ করে বলে গেল তাড়াতাড়ি যেন ঘরে আসে।

বাড়িতে আজ ফিরোজ কিংবা ফারিহা কেউ নেই। সেজন্য প্রার্থনা কে বাঁচানোর মতন কেউ ছিল না। ওর কান্নার আওয়াজ শুনলে নাসিমা হয়তো আসতো তবে নাসিমা আসেনি। নাসিমা গিয়েছিলো ফারিহা কে ওর মায়ের কাছে রাখতে। মাঝে মাঝে কয়েকদিন করে ফারিহা ওর মায়ের কাছে গিয়ে থাকে। এতক্ষণে হয়তো নাসিমা আবার চলে এসেছে তবে প্রার্থনার সাথে দেখা করতে আসেনি। কারণ তিনি জানেন সব ঠিকই আছে। প্রার্থনা চিৎকার চেঁচামেচি তো আর ওনার কানে পৌঁছায়নি।

টুকটাক কিছু কাজ শেষ করে সব কিছু গুছিয়ে রেখে প্রার্থনা ঘরে এলো। দেখলো ফাহিম ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোনটা বুকের উপরে পড়ে আছে। এতটাই বেঘোরে ঘুমোচ্ছে যে ফোনটা নিজের জায়গায় রাখার সময় পায়নি। প্রার্থনা আলতো হাসলো। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ফাহিমের মাথার নিচে বালিশটা ঠিক করে দিল। গায়ে একটা কম্বলও জড়িয়ে দিল। সেই সাথে মনে মনে আফসোসও করলো এটা ভেবে যে ওষুধটা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে লোকটা।

ওষুধ না খেলে তাড়াতাড়ি সুস্থ হবে কি করে? আর যদি সুস্থ না হয় তবে কাল আবার কি করে মা'রার শক্তি পাবে? প্রার্থনা ভাবলো না ওষুধটা খাওয়াতেই হবে। হালকা করে একটু ফাহিমকে ঝাঁকালো। ফাহিম নড়েচড়ে উঠলো ঠিকই তবে কথা বলল না। ফাহিমকে নড়তে দেখে প্রার্থনা বলল,

“ওষুধ খাবেন না? ওষুধ খেয়ে ঘুমোন। ইনফেকশন বেড়ে যাবে কিন্তু।”

ফাহিমের পক্ষ থেকে কোন উত্তর ভেসে এলো না। আবারো ঘুমিয়ে পড়লো। প্রার্থনা আর কিছু বলল না। লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে নিজেও পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

________

রাত তখন বেশ ভালেই হয়েছে। সময়টা তখন হয়তো বারোটার কাছাকাছি হবে। শহরের অন্যান্য জায়গা নিস্তব্ধ হলেও একটা জায়গা এখন লোকসমাগমে ভরপুর। চারিদিকে আলো, লোকজনের আনাগোনা লেগেই আছে। কেউ আসছে তো আবার কেউ যাচ্ছে। বিরাট জমজমাট পরিবেশ।

ফিরোজের ঠিকানা সোজা টুম্পার ঘর সেটা সবাই জানে। তাই ফিরোজকে আলাদা করে আর কিছু বলতে হলো না কাউকে।

বেশ অনেকদিন পর আজ আবারো ফিরোজের পা এই নিষিদ্ধ পল্লীতে পড়ল। ফিরোজ কে দেখতেই লাইলি গদগদ হয়ে বলল,

“আরে সাহেব এতদিন পর কই থিকা আইলা? ভুইলা গেছো নাকি আমারে?”

ফিরোজ গম্ভীর গলায় বলল,

“তোকে মনে রাখার কোন কারণ নেই। এমনটাও না যে তোর জন্য এখানে আসি। আমি আসি টুম্পার জন্য। টুম্পা কোথায়? ঘরে পাঠা।”

কথাটা বলে ফিরোজ যেতে নিলে লাইলি ওর পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে বলল,

“আরে সাহেব খাড়াও। তোমার লগে কিছু কথা আছে।”

“তাড়াতাড়ি বল সময় নেই।”

লাইলি রসিয়ে রসিয়ে বলল,

“এত তাড়া কিসের? এতদিন পর আইছো হের লাইগা নাকি? তা যখন থাকতেই পারো না তো চইলা আসবা। টাকা-পয়সার সমস্যা হইলে আমি দেইখা নিমু। তোমার লগে কি আর আমার টাকা পয়সার সম্পর্ক নাকি। ফিরি তে দিয়া দিমু তোমার টুম্পারে তোমারে।”

ফিরোজ এবারে বিরক্তি মাখানো গলায় বলল,

“তোর আজেবাজে কথা বাদ দিয়ে কাজের কথা বল। এই ফিরোজ ফ্রিতে কিছু নেয় না।”

লাইলি বুঝতে পারলো ফিরোজের এখন মজা করার মন মানসিকতা একদম নেই। সোজা কাজের কথায় এলো।

“আসলে সাহেব বাজারে মাইয়ার সংকট লাইগা গেছে। এখানে তো সব মাইয়া পুরান হইয়া গেছে। এক মাস হইলো নতুন মাইয়ার চালান আসতেছে না। রেট বাইড়া গেছে। তুমি যদি একটু সাহায্য করতা উপকার হইত।”

“এই লাইনের সাথে আমার যোগাযোগ আর নেই।”

কথাটা বলে ফিরোজ চলে যেতে নিলে লাইলি আবারও পথ রোধ করলো। ফিরোজ এবার প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। অগ্নিদৃষ্টিতে লাইলীর দিকে তাকাতেই লাইলি মিনমিনে গলায় বলল,

“বুঝতেই পারতাছো সাহেব বিপদে পড়ছি। নতুন মাইয়া না আইলে ধান্দা চলতাছে না। এক মাইয়া দ্যাখতে দ্যাখতে সবার চোখ কানা হইয়া গেছে। তুমি ব্যবস্থা করে দাও না। সবচাইতে সুন্দরী মাইয়ারে খালি তোমার জন্যই রাখুম। যেমন টুম্পারে রাখছি।”

লাইলি কথাটা বলতেই হঠাৎ করে ফিরোজ এক হাতে শক্ত করে ওর চোয়াল চেপে ধরল। লাইলী ব্যাথা পেল। ওকে এভাবে ধরতে দেখে ওর কিছু সাঙ্গোপাঙ্গে এগিয়ে আসতে নিলে লাইলি হাত উঠিয়ে ওদেরকে থামতে বলল। লাইলির ইশারায় ছেলেগুলো থেমে গেল। লাইলি অস্পষ্ট গলায় বলল,

“লাগতাছে সাহেব।”

ফিরোজের মাঝে বিশেষ কোন হেলদোল দেখা গেল না। বেশ স্বাভাবিক গলাতে বলল,

“তোর ঘরে আমার প্রথম পা পরেছিল টুম্পার জন্য। আর এখনো আমি টুম্পার জন্যই এখানে আসি। টুম্পা ছাড়া কোন মেয়ের সাথে কখনো আর শুইনি। তাই এসব কথা বলবিও না। আমি এখানে আসি শুধু মাত্র টুম্পার জন্য।”

কথাটা বলে ফিরোজ লাইলি কে ছুঁড়ে মা'রল। ফিরোজ লাইলির সাথে আর কোনো কথা বলল না। ফিরোজের জন্য আলাদা করে একটা ঘর বরাদ্দ আছে। সেখানে চলে গেল সোজা। ফিরোজ চলে যেতেই লাইলি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। আবার একটু রাগও হলো। ফিরোজের দেমাগ বেড়ে গেছে। তবে লাইলির কিছু করার নেই। এই জায়গায় এই ব্যবসাটা চালানোর পেছনে ফিরোজের হাত অনেক। অনেক রকম ভাবে সাহায্য করেছে।তাই ফিরোজকে খ্যাপাতে পারবে না।

ফিরোজকে মিনিট পাঁচেকের মতন অপেক্ষা করতে হলো। একটু পরে এলো টুম্পা। রঙচঙে পোশাকের সাথে ভারী সাজগোজ। তবে ফিরোজের এসব পছন্দ না। টুম্পা ওর কাছে এভাবে কখনো আসেও না। কেননা টুম্পা জানে সাজগোজ পছন্দ করে না ফিরোজ। টুম্পা দরজা বন্ধ করে এগিয়ে আসতেই ফিরোজ বলল,

“এত সেজেছো কেন? তুমি জানো না আমার এত সাজগোজ পছন্দ না?”

টুম্পা আলতো একটু হেসে বলল,

“চিন্তা করো না তোমার কাজে কোন রকম কোন সমস্যা হবে না। খদ্দেরের আমাকে পছন্দ হবে কি হবে না সেটা তো আমি জানি না তাই সাজগোজ করে আসতে হয়। যেহেতু আমার খদ্দেরের পছন্দ না তবে সাজ তুলে ফেলবো।”

ফিরোজ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“এভাবে কথা বলছো কেন আমার সাথে?”

টুম্পা আবারো বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“যেভাবে বাকি সবার সাথে কথা বলি সেভাবে তোমার সাথেও কথা বলছি। সাজগোজ তুলে ফেলবো নাকি এমনই রাখবো?”

ফিরোজ বেশ অবাক হলো টুম্পার এমন কথায়। তবে পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল টুম্পার সাথে ওর শেষ দেখার কথা। তখনো টুম্পা রেগে ছিল ওর ওপরে। বোধহয় এখনো সেই রাগটা যায়নি। তার মধ্যে বেশ অনেকদিন হলো ফিরোজ এখানে আর আসে না। দেখা-সাক্ষাৎ কথাবার্তা কিছু হয়নি টুম্পার সাথে। ফিরোজ ভাবলো সেজন্যই বোধহয় রেগে গেছে।

টুম্পা এখনো নিজের জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ফিরোজ উঠে টুম্পার দিকে এগিয়ে এসে পকেট থেকে একটা নুপুর জোড়া বের করে টুম্পার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এটা তোমার জন্য। রুপোর নূপুর। তুমি পরে থেকো ভালো লাগবে তোমায় দেখতে।”

টুম্পা নুপুরটা হাতে নিল ঠিকই তবে সেটা ছুঁড়ে মেঝেতে ফেলল। মৃদু রাগী গলায় বলল,

“এসব আলগা পিরীত আমার সাথে দেখাতে আসবে না একদম। আমার সহ্য হয় না এসব। ভালোবাসি বলো একজনকে, শরীর দরকার অন্যজনের, আবার উপহারও দাও অন্যজনকে। আসল চরিত্রহীন তো তোমাদের মতন পুরুষ কে বলে ফিরোজ, যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের চরিত্র বিক্রি করে। আমি তো বাধ্য হয়ে এখানে পড়ে আছি। আর তুমি স্বেচ্ছায় এখানে আসো আমার মতন নোংরা একটা মেয়ের কাছে।”

মুহূর্তের মাঝে ফিরোজের ভালো মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। শক্ত করে টুম্পার চুলের মুঠি ধরে দাঁত পিষে বলল,

“আমাকে রাগাস না টুম্পা। তুলে আন নুপুরটা।”

টুম্পা নিজেও পাল্টা দাঁত পিষে বলল,

“তুলবো না। আমি তার থেকে উপহার নেবো না যে আমায় ভালোবাসে না।”

“আমি ভালোবাসতে পারবো না তোকে।”

“তবে আমার শরীর কেন প্রয়োজন হয়? তুমি যদি তোমার আরজুকে ভালোবেসে থাকো তবে বারবার আমার কাছে ছুটে আসো কেন? আর যদি আমার শরীর তোমাকে আমার প্রতি এতটাই আকর্ষিত করে তবে আবার বলো কেন আরজু কে ভালোবাসো? তুমি আগে নিজে নিজেকে প্রশ্ন করো তো ফিরোজ তুমি আসলে চাও কি?”

ফিরোজ ছেড়ে দিল টুম্পাকে। লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিয়ে নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। এবার একটু শান্ত গলাতে বলল,

“আমি এখানে মেজাজটা ভালো করতে এসেছি। হুদাই খারাপ করে দিস না। আরজুর প্রসঙ্গ এখানে তুলিস না।”

“অবশ্যই তুলবো। আমি খুব খুশি জানিস তো যে আরজু পালাতে পেরেছিলো তোর কাছ থেকে। কারণ তুই আরজুর যোগ্য না। তোর মতন একটা চরিত্রহীন কাপুরুষ কখনো আরজুর জীবন সঙ্গী হতে পারে না। ওই মেয়েটা খুব সাহসী জন্যই তো তোর খাঁচা থেকে পালাতে পেরেছে। তুই কোনদিন আরজু কে পাবি না। ধরে নে এটা আমার অভিশাপ।”

ফিরোজ টুম্পার দিকে তেড়ে আসতে নিলে ওর ফোনটা বেজে উঠলো। একটু কিছুক্ষণের জন্য বেঁচে গেল টুম্পা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফিরোজ দেখলো প্রার্থনার নাম্বার। সময় দেখলো বারোটা পার হয়ে গিয়েছে। ফিরোজের কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো। এই অসময়ে প্রার্থনা কেন কল করেছে? বাড়িতে তো ফারিহাও নেই যে ওর কিছু হবে। তবে কি প্রার্থনার কিছু হলো নাকি কোন সমস্যা হলো?

ফিরোজ সময় ব্যয় না করে তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করলো।

“কি হয়েছে প্রার্থনা? এত রাতে ফোন করছিস কেন?”

ফোনের অপর পাশে থাকা প্রার্থনা নির্জীব গলায় বলল,

“ফাহিম ম'রে গেছে।”

ফিরোজ চমকে উঠে বলল,

“কে ম'রে গেছে?”

“ফাহিম।”

“পা'গল হয়েছিস? মাথা খারাপ হয়েছে? কি গিলে ফোন করেছিস? ফাহিমের মদ তুই গিলে বসে আছিস নাকি?”

“না, রাতের খাবারই খাইনি। কিচ্ছু খাইনি।”

"সেজন্য ভুলভাল বকছিস। যা তাড়াতাড়ি চুপচাপ গিলে ঘুমিয়ে পড়। অযথা আমাকে বিরক্ত করিস না।”

ফিরোজ ভেবেছিল প্রার্থনা বোধহয় আর কিছু বলবে না তবে না আবারও প্রার্থনার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“ফিরোজ ভাই, ফাহিম ম'রে গেছে। রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে ছিল। সুস্থ মানুষই ঘুমিয়েছিল। একটু আগে হঠাৎ করে কেমন যেন করছিল। বুকে ব্যথা হচ্ছিল বোধহয়। তারপরে ম'রে গেল। আমি চেক করেছি নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। ফাহিম আর নেই ফিরোজ ভাই।”

ফিরোজের এবারও কেন যেন বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হলো। তবে এটা তো মজা করার বিষয় না। প্রার্থনা এভাবে মজা করার মেয়েও না। তাও আবার অসময়ে কল করে মজা করবে এমন একটা বিষয় নিয়ে? তবে সকালেই তো একটা সুস্থ মানুষকে বাড়িতে রেখে এলো। হ্যাঁ সেলাইয়ের জায়গাটায় ইনফেকশন হয়েছিল ঠিকই। অবস্থা একটু খারাপ ছিল তাই বলে ম'রে যাওয়ার কথা না। এভাবে হুট করে ম'রে গেল কি করে।

ফিরোজ সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করলো,

“তুই মজা করছিস না তো প্রার্থনা? সত্যি ম'রেছে ফাহিম?”

প্রার্থনা এবারে হোহো করে হেসে উঠলো। ভীষণ অদ্ভুত লাগলো ফিরোজ এর কাছে প্রার্থনার সেই হাসিটা। যেন উদ্ভ্রান্তের মতন হাসছে।

“প্রার্থনা হাসছিস কেন? ঠিক আছিস তুই? কি করেছিস তুই ফাহিমের সাথে?”

প্রার্থনা হাসতে হাসতেই বলল,

“মুক্তি পেয়েছি আমি। আমার আজ নিজেকে স্বাধীন মনে হচ্ছে। আজ আমি খুব খুশি। আমার পথের কাঁটা উপড়ে ফেলেছি। ফাহিম ম'রে গেছে ফিরোজ ভাই, ম'রে গেছে। আমার জীবনের অশান্তি ম'রে গেছে। একটা জানোয়ার ম'রে গেছে।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প