“তুই মে'রে'ছি'স ফাহিমকে?”
ফিরোজের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে প্রার্থনা কোন জবাব দিল না। দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার বিছানায় থাকা ফাহিমের লা'শের উপরে।
ফিরোজ আবারো প্রশ্ন করলো,
“তুই খু'ন করেছিস ফাহিমকে তাই না প্রার্থনা? না হলে ওর গলায় কিসের দাগ? ওর কপাল কা'টা কেন?”
প্রার্থনার ধ্যান ভাঙলো এবার। ফিরোজের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,
“ম'রে গেছে তাে আমি কি করবো? ওর আয়ু এতটুকুই ছিল। আমার কি দোষ?”
ফিরোজ এবারে আর নিজের রাগ সামলাতে পারল না। ঠাস করে একটা চ'ড় বসিয়ে দিল প্রার্থনার গালে। তবে প্রার্থনার মাঝে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। ফিরোজ এবারে প্রার্থনার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে দাঁত পিষে বলল,
“তুই ভাবতে পারছিস এর পরিণাম কি হতে পারে? ফাহিম আর আমার দল এমনিতেই আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। ওর দলের ছেলেরা যদি জানতে পারে যে তুই খু'ন করেছিস তবে বুঝতে পারছিস তোর কি অবস্থা করবে? কেন করলি?”
প্রার্থনা আবারও আলতো হেসে বলল,
“আরু কে যেমন বাঁচিয়েছিলে আমাকে তেমন ভাবে বাঁচাতে পারবে না? বাঁচাবে না আমায় আবির ভাই?”
ফিরোজ ছুঁড়ে মা'রল প্রার্থনা কে। দুই বোনই এক। যতসব ঝামেলা পাকিয়ে তারপরে ফিরোজকে বলবে সামলাতে। এখন আবার আবির ভাই আবির ভাই করে ওকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। পেয়েছেটা কি এরা ফিরোজকে? ফিরোজ কে তো কিছু দেবেনা, একটু ভালোওবাসবেনা অথচ ফিরোজ কে ওদের জন্য সব করতে হবে। মাথা কিনে নিয়েছে।
এদিকে ফিরোজ এখন বুঝতে পারছে না যে সবকিছু কিভাবে সামলাবে। নিজেই দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরলো। ফিরোজের সব থেকে বেশি রাগ হচ্ছে প্রার্থনার উপর। ইচ্ছে করছে আরও মা'র'তে। তবে পারছেনা।
মেয়েটার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। দেখেই বুঝতে পারছ আজও ফাহিমের কাছে মা'র খেয়েছে। গায়ে কা'টা দাগগুলো একদম তাজা। ফিরোজ একবার প্রার্থনার দিকে তাকালো।
এবারের দৃশ্যটা দেখে ফিরোজের কেন যেন একটু ভয় হলো। প্রার্থনা এখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে ফাহিমের লা'শের দিকে। মুখে তার কি তৃপ্তির হাসি। প্রার্থনা কে দেখলে এখন যে কেউ বুঝবে ওর চোখমুখে খুশি উপচে পড়ছে।
হঠাৎ করে ফিরোজের মনে একটা প্রশ্নের উদয় হলো। প্রার্থনার একার পক্ষে তো ফাহিমকে খু'ন করা সম্ভব না। পেরে উঠবে না কোনমতেই। তবে কি অন্য কেউ সাহায্য করেছে প্রার্থনা কে? কে সাহায্য করতে পারে? ফিরোজের খুব কাছের কেউ কি?
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে ফিরোজের মাথায় নাসিমার নামটা এলো। একমাত্র এই মহিলাই পারে প্রার্থনা কে সাহায্য করতে। প্রার্থনা আর কারো কাছে সাহায্য চাইবেও না। প্রার্থনার জায়গায় যদি আরজু থাকতো তবে ফিরোজকে এটা ভাবতেও হতো না যে অন্য কেউ সাহায্য করেছে কিনা।
কেননা ফিরোজ জানে আরজু একাই একশ। তবে প্রার্থনার পক্ষে বোধহয় একা এই খু'নটা করা সম্ভব না। প্রার্থনার পক্ষে তো খু'ন করাই সম্ভব ছিল না তবুও করে ফেলেছে। তবে নিশ্চয়ই ওকে অন্য কেউ সাহায্য করেছে।
আবার এগিয়ে গেল প্রার্থনার দিকে। প্রার্থনার চোয়াল ধরে মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল,
“কে সাহায্য করেছে তোকে?”
প্রার্থনা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“কেউ না।”
“অবশ্যই কেউ তোকে সাহায্য করেছে। নাহলে তুই একা পেরে উঠতি ফাহিমের শক্তির সাথে?”
প্রার্থনা আবারও স্বাভাবিক গলাতেই বলল,
“কেউ করেনি সাহায্য। আগে থেকে খু'ন করার উদ্দেশ্য ছিল না। হঠাৎ করে ইচ্ছে হয়েছে। মনে হয়েছে এবারে ওর গল্পটা শেষ করা দরকার।”
ফিরোজ বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“তাই বলে তুই খু'ন করলি প্রার্থনা? তুই পারলি খু'ন করতে? ভয় করল না? এতটা সময় ধরে তুই একটা লা'শের সাথে কি করে ছিলি এই ঘরে একা? তুই তো এতটা সাহসী না। কার থেকে পেলি এত সাহস। আবার আরজু এসেছিল নাকি?”
“চোয়াল ছাড়ো। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে।”
প্রার্থনার কথা শুনে ফিরোজ ওর চোয়াল ছেড়ে দিল। সন্দেহী গলায় বলল,
“আরজু এসেছিল?”
“না তো। তবে কিছুদিন আগে যে এসেছিল না তখন আমায় সাহস দিয়ে গিয়েছিল। আমার খু'নটা করতে ভয় করেনি। আমার ভয় কেটে গিয়েছিল। আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়েছিল যদি আজ ও বেঁচে থাকে তবে আমি আর বেশি দিন বাঁচতে পারব না। সকাল হবে ও আবার মা'র শুরু করে দেবে, রাত হবে ও বাড়ি ফিরে এসে আবার মা'রবে। আবার সকাল হবে আবার মা'রবে। এভাবেই চলতে থাকবে আমার জীবন। তাই মনে হয়েছে ওকে শেষ করবো।”
“কিভাবে মা'রলি? পরিকল্পনা করলি কিভাবে? আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না প্রার্থনা যে তুই খু'ন করেছিস। তুই পারবি না করতে।”
প্রার্থনা এবারে হো হো করে হেসে উঠলো। প্রার্থনার সেই ভয়ংকর অদ্ভুত হাসিটাই যেন ফিরোজের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। এভাবে কখনো হাসতে দেখেনি ফিরোজ প্রার্থনাকে। বিয়ের পর থেকে তো আরো কখনোই না। হঠাৎ করে ফিরোজের মনে হলো প্রার্থনা বদলে গেছে, অনেক বদলে গেছে। যে ভীতু দুর্বল প্রার্থনাকে ফিরোজ চিনত এই প্রার্থনা সেই প্রার্থনা না।
বেশ অনেকক্ষণ পর প্রার্থনা নিজের হাসি থামিয়ে বলল,
“ওর খুব খিদে পেয়েছিল। আমি সেজন্য খুব যত্ন করে ওর জন্য রান্না করেছিলাম। ওকে খুব যত্ন করে পাশে বসে খাইয়েছি। আর খাবারের মাঝে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ছিলাম। কতগুলো মিশিয়েছিলাম জানিনা। হাতের কাছে যতগুলো পেয়েছিলাম সব মিশিয়ে ছিলাম।”
“তারপর?”
“তারপর আর কি ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। তারপরে ওই দেখো ওই ফুলদানি টা দিয়ে ওর মাথায় জোড়ে আঘাত করেছিলাম।”
কথাটা বলে আঙুলের ইশারায় প্রার্থনা একটা ফুলদানি দেখালো। ফিরোজ সেটা দেখে আবারো প্রার্থনা উদ্দেশ্য করে বলল,
“ম'রে গিয়েছিল তারপরে?”
প্রার্থনা একটু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“না, তখনও ম'রেনি। একদম কই মাছের প্রাণ। আমি দ্বিতীয়বারও মে'রে ছিলাম তারপর একটু নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল শরীরটা। তবে তখনো বোধহয় নিঃশ্বাস চলছিল। তারপরে আমি ওড়না দিয়ে ওর গলা পেঁচিয়ে ধরেছিলাম। ম'রে গেছে তারপর। ম'রে গেছে ফাহিম।”
কথাটা বলে প্রার্থনা আবারও হো হো করে হেসে উঠলো। ফিরোজ হা করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। একবার প্রার্থনা কে হাসতে দেখছে, তাে একবার ফুলদানির দিকে তাকাচ্ছে, তো একবার ফাহিমের দিকে। তবে ফিরোজের এখন ঠিক কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না। একপর্যায়ে যখন দেখলো প্রার্থনার হাসি থামছেই না রাগের মাথায় আরেকটা চড় বসিয়ে শাসিয়ে বলল,
“একদম চুপ। আমাকে বলেছিস বলেছিস আর কাউকে কথাগুলো বলবি না। এখানে থাক। আমি তোর মা কে ডেকে আনছি।”
কথাটা বলে ফিরোজ সত্যি গেল নাসিমা কে ডাকতে। পুরো বাড়িতে তখন প্রার্থনা একা ফাহিমের লা'শটার সাথে। প্রার্থনা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ফাহিমের লা'শে'র দিকে। ফাহিমের নিথর দেহটা বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে প্রার্থনার পৈশাচিক আনন্দ হলো। ধীরে ধীরে হাসি হাসি মুখটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেল।
হঠাৎ করে প্রার্থনা মৃত ফাহিমের গালে কষিয়ে একটা চ'ড় বসালো। একটা চড় মে'রেই থামলো না। সবশেষে ফাহিমের লাশের উপরে থুতু ফেলে ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলল,
“তুই একটা জানোয়ার। আর তোকে মা'রা'র জন্য আমার বিন্দু পরিমাণ কোনো আফসোস নেই।”
___________
ফজরের পরপরই ফাহিমের জানাজা হয়ে গেল। খুব তাড়াতাড়ি কবর দেওয়াও শেষ করা হলো। রাতের মাঝে সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিল ফিরোজ ওর লোকদেরকে নিয়ে। এমনিতেই জানে ফাহিম মা'রা যাওয়ার খবর শুনে কেউই আসবে না। ওরা যে শ্রেণীর মানুষ সেই শ্রেণীর মানুষই আসবে। গ্রামের কেউই হা হুতাশও করবেনা। তাই অযথা দেরি করে লাভ নেই। আর তাছাড়া যত তাড়াতাড়ি কাজটা শেষ করা যায় ততই ভালো।
কবর দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে ফিরোজ দেখলো প্রার্থনা সোফায় বসে আছে চুপচাপ। ওর পাশে চিন্তিত মুখ ভঙ্গি নিয়ে বসে আছে নাসিমা। ফিরোজ নাসিমা কে উদ্দেশ্য করেই বলল,
“স্বামী ম'রে'ছে, তোমার মেয়েকে একটু তো কাঁদতে বলো। ভদ্রতার খাতিরে হলেও একটু কাঁদুক।”
নাসিমা গম্ভীর গলায় বললেন,
“মানুষ ম'রলে কাঁদে জানোয়ার ম'রলে না। শহরের অলিতে গলিতে রোজ না জানি কত কুকুর মা'রা যায় কাঁদিস তুই? কাদিস না তো। তবে আমার মেয়েকে কাঁদতে বলছিস কেন? কুকুর মা'রা গেলে ভদ্রতার খাতিরে কাঁদিস তুই?”
ফিরোজ নাসিমার দিকে তেড়ে গিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলল,
“একদম আমার সাথে গলাবাজি করবেনা। তোমার জন্য তোমার দুই মেয়ের এই অবস্থা হয়েছে। আমি সাহায্য করবো আবার আমাকেই দেমাগ দেখাবে এসব চলবে না। আমি যদি বাঁচাতে পারি তোমাদেরকে তবে মা'র'তেও পারি সেটা মনে রেখো।”
এবারে নাসিমা উত্তর দেয়ার আগে প্রার্থনা নিস্তেজ গলায় বলে উঠলো,
“জানি তো সেটা ফিরোজ ভাই। তুমিও যে অমানুষ হয়ে গেছো সেটা তো জানি।”
কথাটা কোথাও একটা গিয়ে আঘাত করলো ফিরোজ কে। খুব গভীরভাবে আঘাত করলো। তবে সেটা বুঝতে দিল না প্রার্থনা কে। রাগী গলায় বলল,
“এতই যখন বুঝিস তবে সাহায্য চাইলি কেন আমার কাছে?”
“জানিনা। আসলে সাহায্যটা চেয়েছিলাম আমার আবির ভাইয়ের কাছে। বর্তমানের ফিরোজ বাঁচাবে সেটা ভাবিনি। তুমি আমাকে বলোতো তুমি কেন আমাকে বাঁচালে? আমার আবির ভাই হওয়ার জন্য বাঁচালে নাকি অন্য কোন কারণে? ফিরোজের তো আমাকে বাঁচানোর কথা ছিল না।”
ফিরোজ একটু দুর্বল হতে চাইলো তবে পারলো না। নিজেকে শক্ত রেখেই আবারো প্রার্থনা কে সাবধানী গলায় বলল,
“শোন প্রার্থনা বারবার আমার সামনে আবির নাম তুলবি না। আবির নেই, ম'রে গেছে। আর আজ আমি তোকে নিজের স্বার্থে বাঁচিয়েছি।”
“তাই নাকি। কি স্বার্থ এখানে তোমার?”
সত্যি বলতে ফিরোজ কোন স্বার্থে বাঁচায়নি প্রার্থনা কে। মনে হয়েছিল প্রার্থনা কে বাঁচানো উচিত তাই বাঁচিয়েছে। তবে এখন স্বার্থের কথাটা যেহেতু প্রার্থনা কে বলেই ফেলেছে আর প্রার্থনা পাল্টা জিজ্ঞেস করেছে কি স্বার্থ তার মানে উত্তরটা দিতেই হবে। ফিরোজ কিছুক্ষণ ভেবে একটা অজুহাত বানিয়ে বলল,
“যদি আরজু জানতে পারে আমি তোকে বাঁচিয়েছি ও খুশি হতে পারে আমার উপরে। বলা যায় না হয়তো খুশি হয়ে আমার কথা মেনে নিল। এবার বুঝলি তো কোন স্বার্থ বাঁচিয়েছি তোকে। ফালতু যতসব।”
কথাটা বলে ফিরোজ নিজের ঘরে চলে গেল। ফিরোজ চলে যেতেই প্রার্থনা উঠে দাঁড়ালো। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই নাসিমা পিছন থেকে প্রশ্ন করে উঠলো,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“ঘরে যাচ্ছি মা।”
“কেন? এখানে বসে থাকো আমার সাথে।”
প্রার্থনা আলতো হেসে বলল,
“না মা ঘরে যাব। গোসল করব আগে। তারপর আলমারি থেকে একটা রঙিন শাড়ি বের করে পরে আমি সাজবো। খুব সুন্দর করে সাজবো। এবার আমার বেরঙিন জীবনের রং ফিরে আসবে মা। আমি এবার বাঁচতে পারব। খুব সুন্দর ভাবে বাঁচতে পারব। কেউ আর আমায় মা'রবে না। রোজ রোজ আমার আর কারো ভয়ে কাঁপতে হবেনা।”
কথাটা বলে প্রার্থনা চলে যেতে নিলে পিছন থেকে নাসিমা গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“কি ভেবেছো তোমার সেই প্রেমিক এখনও অপেক্ষায় আছে তোমার? এই ভুল ধারণার মাঝে থেকোনা। এতদিনে নিশ্চয়ই সে তার নিজের সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। তোমার ভালোবাসায় এত জোর ছিল না প্রার্থনা। নয়তো কি সে একটা দিনের জন্য এসে খোঁজ নিতে পারত না যে তুমি বেঁচে আছো না ম'রে গেছো?”
প্রার্থনা এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“আমি কারো আশায় নেই মা। আমি এজন্য খুশি যে আজ থেকে আমায় আর কেউ মারবে না। ওই জানোয়ারটার বউ বলবে না আমাকে কেউ। আমি এই জন্য খুশি যে ওই জানোয়ারটা আজ থেকে আর আমায় ছুঁতে পারবে না। আর আমার ভালোবাসায় জোর ছিল মা। সেজন্যই সাহিত্য আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চলে গিয়েছিল। আমি জানি আমার ভালোবাসা সত্যি ছিল। আর আমি এটাও জানি সাহিত্য কে আমি আর পাব না।”
__________
ফিরোজ ঘুমিয়েছে খুব বেশিক্ষণ সময় হয়নি। এক ঘন্টাও হয়েছে কিনা সন্দেহ। ঘরে এসেছে বেশ অনেক্ষন হলো তবে ঘুম ধরতে অনেকটা সময় লেগে গেছে। যতবার ঘুমোতে ধরছে ততবার শুধু চোখের সামনে প্রার্থনার সেই অদ্ভুত হাসিটা ভেসে উঠছে। কি নির্মমভাবে ফাহিমকে মে'রেছে সেই কথাগুলো মনে পড়ছে।
আর ভাবছে যদি প্রার্থনার জায়গায় আরজু থাকতো না জানি ফাহিম কে আরো কত নৃশংস ভাবেই না খু'ন করতো।
আচ্ছা আরজু কি এভাবে ফিরোজ কে মা'রতে পারে? প্রার্থনার ফাহিমের প্রতি যতটা না ঘৃণা ছিল তার থেকে হাজারগুন বেশি ঘৃণা আরজুর ফিরোজের উপরে জমে আছে। আরজু তো ভয়ও পায় না। তবে কি আরজু ফিরোজ কে মা'রবে? কখনো কি মা'রার কথা ভেবেছে?
এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তবে খুব বেশিক্ষণ ঘুমোতে পারল না। ফোনটা সাইলেন্ট করে ঘুমোয় নি আর এটাই ফিরোজের জীবনের সবথেকে বড় ভুল।
রিংটোনের আওয়াজ কানে যেতেই আশপাশ হাতরে ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করে কানে ধরে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“তোদের কোন বা'লেরই আমার ঘুম সহ্য হয় না? বল আবার কে ম'র'লো?”
অপর পাশ থেকে ভেসে এলো বেশ পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর। মিষ্টি করে বলল,
“শুভ সকাল ফিরোজ ওরফে আবির।”
কন্ঠটা কানে যেতেই এক মুহূর্তের মাঝে ফিরোজের দুই চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল। চোখ খুলে ফোনের অপর পাশে থাকা মানুষটাকে উদ্দেশ্য করে সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“আরমান?”
আরমান হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“এই না হলে আমার বন্ধু। কণ্ঠ শুনেই চিনে ফেলেছো। কেমন আছো বন্ধু?”
এমনিতেই তো ফিরোজের মাথাটা গরম ছিল তার মাঝে আরমানের এমন অদ্ভুত কথাবার্তার ধরন। হ্যাঁ একসময় বন্ধু ছিল তবে এখন কি আর ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আছে? বন্ধু বলে ডাকাটা কি আরমানের সাজে?
“ভুলে গেলে আমাদের শেষ বার সাক্ষাতের কথা? বন্ধু বলে কিন্তু আর ডাকা যায়?”
আরমান বেশ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“আরে বাদ দাও তো সেসব কথা। বন্ধুত্বের মাঝে তো একটু ঝগড়াঝাঁটি হবে তাই বলে কি বন্ধুত্ব ভেঙে ফেললে চলে। অন্যান্য দিনগুলোতে বন্ধুকে ভুলে থাকলেও অন্তত জীবনের বিশেষ কিছু দিনে এই বন্ধুগুলোকে ভুলে থাকা যায় না।”
ফিরোজ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কিসের বিশেষ দিন?”
“আরে আমার বিয়ে ফিরোজ। তোমাকে তো অবশ্যই আসতে হবে।”
“তোমার বিয়ে?”
“হ্যাঁ আমার বিয়ে। মানে বিয়ে হয়ে গেছে এখন শুধু রিসিপশনটা বাকি।”
ফিরোজের মাথার উপর দিয়ে গেল যেন কথাগুলো। তার মানে আরমান বিয়ে করে নিল সত্যি? আরজুর সাথে ঝামেলা হয়েছিল নাকি ফিরোজের ভয়ে? আসল ব্যাপারটা কি? সেদিন আরজুর প্রতি খুব ভালোবাসা দেখিয়েছিলো, এত তাড়াতাড়ি সেই ভালোবাসা হারিয়ে গেল?
সে যাই হোক ভালোই হয়েছে। অযথা তৈরি হওয়া একটা পথের কাঁটা নিজ থেকেই সরে গেছে। ফিরোজ কে আর আলাদা করে কিছু করতে হলো না।
“এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলে আরজু কে? একটু তো লড়াই করতে পারতে আমার সাথে? এত দুর্বল প্রতিপক্ষ তুমি সেটা আমি ভাবিনি আরমান।”
“কে বলল তোমায় আরু কে ছেড়ে দিয়েছি? আমার আরু কে আমি ছেড়ে দেবো ভাবলে কি করে তুমি ফিরোজ?”
ফিরোজের কপালের মাঝে তৈরি হওয়া ভাঁজটা আরো গাঢ় হলো। আবারো প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মানে কি? তুমি যে বললে বিয়ে করেছো?”
“আরে বিয়েটা তো আমার আর আরুরই। মানে রিসিপশনটা। বিয়ে তো হয়ে গেছে আরো কয়েকদিন আগে।”
এবারে আর ফিরোজ শুয়ে থাকতে পারল না। লাফ দিয়ে উঠে বসলো। কিছুক্ষণ মস্তিষ্কে চলল আরমানের বলা কথাটা। বিয়ে কয়েকদিন আগে হয়ে গেছে। মানে আরজু বিয়ে করে নিলো আরমানকে? এটা অসম্ভব? আরজু তো এসব প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাসই করেনা সেখানে আরমানকে বিয়ে করে নেবে কি করে। নিশ্চয়ই এই ছেলে সকাল সকাল মজা করছে ফিরোজের সাথে। একটু ঝাড়ি মেরে বলল,
“মশকরা করছো আমার সাথে? সকাল সকাল এসব আজেবাজে কথা বলার জন্য তুমি আমার ঘুম ভাঙ্গালে?”
আরমান হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“মজা করব কেন? আর তোমাকে ফোন করার কারণটা হচ্ছে তোমার খাটাখাটনি একটু কমাবো। শুনলাম ভার্সিটিতে নাকি লোক পাঠিয়েছিল আমার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে, আমার ঠিকানা জোগাড় করতে। পেয়েছো কিছু কি?”
উত্তর দিল না ফিরোজ। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আরমান নিজেই হেসে উঠে বলল,
“পাবে না সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। তোমাকে বলেছিলাম তো ফিরোজ ওটা আমার এলাকা। আমার ইচ্ছে ব্যতীত আমার সম্বন্ধে একটা তথ্যও তুমি জানতে পারবে না। ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই শুক্রবার নিজের পুরো পরিবার নিয়ে চলে এসো। এখানে অনেক সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে আসবে। দেখো কাউকে পছন্দ হলে আমি বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবো। চিন্তা করো না। শহরে যেমন আমার প্রভাব আছে ঠিক তেমনি গ্রামেও আমার অনেক প্রভাব আছে।”
“তুমি মিথ্যে বলছো। আরজু বিয়ে করতে পারে না?”
“অবশ্যই পারে। ভালোবাসলে সব পারে। আমার আরু আমাকে ভালোবেসেছে আর সেই জন্য আমাকে বিয়েও করেছে।”
ফিরোজের কোনমতেই বিশ্বাস হলো না আরমানের কথাটা। রাগান্বিত গলায় বলল,
“অসম্ভব। আরজু বিশ্বাসই করেনা এসবে। তোমাকে ভালোবাসবে কি করে? তুমি আমাকে ভুল বোঝাতে চাইছো তাই না? কি ভেবেছো এসব বললে আমি আরজুর থেকে দূরে সরে যাব। আরজু বিয়ে করলে প্রার্থনা জানবে না? আমি এক্ষুনি প্রার্থনা কে গিয়ে জিজ্ঞেস করছি।”
কথাটা বলে ফিরোজ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো প্রার্থনা কে জিজ্ঞেস করার জন্য তবে ঘর থেকে বের হতে পারলো না। তার আগেই আরমান বলে উঠলো,
“একবার তোমার হোয়াটসঅ্যাপ চেক করো। আমার আর আরুর বিয়ের ছবি পাঠিয়েছি।সেই সাথে আমার বাড়ির ঠিকানাও। দেখে বলো কেমন লাগছে। আমায় আর আরু কে একসাথে খুব সুন্দর মানিয়েছে সবাই বলছিল।”
ফিরোজের কোন কিছু শুনতে ইচ্ছে করলো না। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ছবিটা বের করল। হ্যাঁ সত্যি আরজু লাল টকটকে শাড়ি পরে আছে। বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছে আরমান। বিয়ের ছবি। তারমানে সত্যি বিয়ে করে নিল আরজু।
সবশেষে ছবিটা হলো আরমান আর আরজুর রিসেপশনের কার্ডের। সেখানে খুব সুন্দর ভাবে আরমান আর আরজুন নামটা দেখতে পেল। তবে তো আর কোন সন্দেহই রইল না। তার মানে সত্যি আরজু বিয়ে করে নিয়েছে।
ফোনের অপর পাশ থেকে আবারও ভেসে এলো আরমানের কণ্ঠস্বর। ফিরোজ ফোনটা কানে ধরলো। আরমান বলে উঠলো,
“আরুর মনে তোমার জন্য কখনোই কোন ভালোবাসা ছিল না ফিরোজ। তবে পুরনো আবিরের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতাবোধ এখনো আছে। এখনো আরু পুরনো আবিরকে মানুষ বলে গণ্য করে। তবে ফিরোজকে করতে পারে না। আরুর চোখে ফিরোজের তুলনা কোন নিকৃষ্ট পশুর সাথেও হয় না। তুমি বোধহয় আবির থাকলেই পারতে। এমনও হতে পারতো হয়তো আরজু নিজ থেকে তোমার কাছে ধরা দিত। তবে তুমি যে ফিরোজ হয়ে গিয়েছো এর জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি পেয়ে গিয়েছি আমার আরু কে।”
ফিরোজ এবারে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,
“সত্যি বিয়ে করেছে আরজু তোমাকে? তোমরা একসাথে থাকছো এখন?”
আরমানও এবারে বেশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আরু আমায় ভালোবাসে ফিরোজ। জোর করে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। যদি তোমার প্রতি আরুর বিন্দুমাত্র কোন দুর্বলতা থেকে থাকতো তবে কখনোই আমি ওর মনে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারতাম না। তবে ওই যে বললাম না পুরনো আবিরের প্রতি আরুর এখনো কিছুটা কৃতজ্ঞতা থেকে গেছে। তাই বলছি এমন কিছু করো না যেন সেটুকুও নষ্ট হয়ে যায়। আমার কাছ থেকে যে তুমি আরু কে কেড়ে নিতে পারবে না সেটা নিশ্চয়ই বুঝে গেছো। তুমি চাইলে হয়তো অনেক রকম ভাবে অশান্তি তৈরি করতে পারো তবে একটা কথা মনে রেখো দিনশেষে আমার কাছে তোমাকে হারতেই হবে। তাই বলছি আরুর মনে নিজের জন্য আর ঘৃণা তৈরি করো না। রাখছি।”
ফোনটা রেখে দিল আরমান। ফিরোজ ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লো। হঠাৎ করে নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগছে। খুব দুর্বল লাগছে। আজ মনে হচ্ছে ফিরোজ সত্যি ক্ষমতার পিছনে বেশি ছুটতে গিয়ে আরজু কে হারিয়ে ফেলল।
তবে ক্ষমতার যে ফিরোজের দরকার ছিল। এই ক্ষমতা না থাকলে তো এতদিন আরজু কে রক্ষা করতে পারত না। না জানি ক্ষমতার জোরে কতবার কত বিপদ থেকে আরজু কে বাঁচিয়েছে। তবে এতসবের মাঝে বোধহয় আরজুর প্রতি লক্ষ্য রাখাটা দরকার ছিল। নিজেকে সংযত করা উচিত ছিল। অন্তত টুম্পার কাছে যাওয়াটা উচিত হয়নি।
সেই থেকেই তো আরজুর আরো বেশি ঘৃণা তৈরি হয়েছিলো ফিরোজের প্রতি। ফিরোজ বুঝতে পারে না ও কেন কিসের টানে টুম্পার কাছে গিয়েছিল। আর কোন মেয়ের কাছে তো কখনো যাওয়া হয়নি।
তবে নিশ্চয়ই আরজুর প্রতি ভালোবাসায় কোন কমতি থেকে গিয়েছিল না হলে তো অন্য কোন মেয়ে ফিরোজকে আকর্ষণ করতে পারতো না। তারমানে ভুলটা কি ফিরোজেরই? নিশ্চয়ই তাই হবে। আরমান তো নিজের ভালোবাসা দিয়ে ঠিক আরজুর মন গলাতে পারলো। তবে নিশ্চয়ই ফিরোজের ভালোবাসায় কমতি ছিল জন্য আরজু কে পেল না।