প্রায় এক ঘন্টারও বেশি সময় যাবৎ আরমানের বাবা কল করেছে আরমানের ফোনে। আরমানের সাথে কথা বলাই উদ্দেশ্য ছিল ওনার। ইচ্ছে ছিল ছেলেকে খুব ভালোভাবে বকাঝকা করার। তবে আরমান সর্বোচ্চ এক মিনিটে কথা বলেছে, তারপরেই ফোনটা দিয়ে দিয়েছে মহিন হোসেন কে।
মহিন হোসেন দীর্ঘ এক ঘন্টা যাবৎ আরমানের হয়ে ভাইয়ের কাছে বকা খাচ্ছে। না পারছেন পাল্টা কোন জবাব দিতে, না পারছেন বেয়াদবি করে ফোনটা রেখে দিতে। ফলস্বরূপ বাধ্য হয়ে ওনাকেই কথাগুলো শুনতে হচ্ছে।
তবে অবাক করার বিষয় হলো এর জন্য আরমানের মাঝে কোন অপরাধবোধ নেই। জেবার মাঝেও বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং দুজন মিলে বিছানায় বসে বেশ হেসে খেলে আড্ডা দিচ্ছে।
আর ওদের দুজনের পাশে চুপচাপ মূর্তির মতন বসে আছে আরজু। আরমান জোর করে ধরে এনে ওকে বসিয়ে রেখেছে। আরজু আসতে চায়নি। তবে আরজু কে ঘরে একা একা রেখে এখানে আড্ডা দেওয়া যায় নাকি! একা একা থাকলে আরমানের পা'গলিটা তো আরো পা'গলি হয়ে যাবে। সেজন্য আরমান জোর করে নিয়ে এসেছে।
আরো অনেকটা সময় ভাইয়ের বকাবকি সহ্য করার পর মহিন হোসেন অসহায় গলায় বললেন,
“এবারে থামো ভাইজান। আমি বোঝাবো ওকে তাও তুমি থামো। শান্ত হও।”
অপর পাশ থেকে ভেসে এলো মিজান হোসেনের রাগান্বিত গলার স্বর।
“তোর আস্কারাতেই ও এত বিগড়ে গেছে। ওর এত উশৃংখল স্বভাবের পরেও ছোটবেলা থেকে ওর গায়ে আমায় হাত তুলতে দেসনি। যদি ছোটতে দু-চারটে চ'ড় থা'প্প'র লাগাতাম তবে আজ না এই রাজনীতিতে জড়াতো, না আমার এতটা সম্মানহানি হত।”
মহিন হোসেন তাকালো একবার আরমানের মুখের দিকে। কি সুন্দর হাসছে ছেলেটা। ছেলেটার মুখ দেখলেই তো আদর লাগে। এই ছেলেটাকে কি করে মা'রতে দিতেন উনি? ওর মুখ থেকে কাকা ডাকটা শুনতেই তো কি মিষ্টি লাগে। নিজের সন্তানের অভাব যে মহিন হোসেন আরমানকে দিয়ে পূরণ করে। তবে কি করে ছেলেটার গায়ে হাত তুলতে দিতেন? কষ্ট হতো তো। হয়তো মা'র খেত আরমান কিন্তু আঘাতটা লাগতো ওনার।
“কি যে বলোনা ভাইজান ওকে মা'রা যায় নাকি? কত ভালো ছেলে আমার। আর তাছাড়া এই যে ঘটনা হলো এতে তো ওর কোন দোষ নেই, ওকে ফাঁসানো হয়েছে।”
মিজান হোসেন তেঁতে উঠে বললেন,
“সেটা আমি আর তুমি জানি বাকি মানুষজন তো বুঝছে না সেসব। সবাই ভাবছে সারা জীবন যে মিজান মাস্টার অন্যের ছেলে মেয়েদের মানুষ করার ব্রত পালন করলো সে নিজেই তার ছেলেকে মানুষ করতে পারেনি। ওকে বলে দিও যেন আমার বাড়িতে পা না রাখে। তোমরা শাসন করবে না, তোমাদের কাছেই থাক ও।”
মহিম হোসেন হাস্যজ্জ্বল গলাতে বললেন,
“কোন সমস্যা নেই। সারা জীবন ওকে আমি রেখে দেবো আমার কাছে। এমনিতেই তো আমার সবকিছু ওরই। চিন্তা করো না আমার ছেলেকে পাঠাবো না তোমার বাড়ি। তুমি এখন ফোন রাখো।”
কথাটা বলে মহিন হোসেন ফোনটা কেটে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। মিজান হোসেনকে আরমানের সম্বন্ধে কিছু বলতে না দিলেও উনি নিজে ঠিক করলেন আরমানকে একটু বকা দেওয়া দরকার। ছেলেটা একদম হাতের মধ্যে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
মুখে রাগী ভাব ফুটিয়ে তুলে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে বিছানায় আরমানের সামনাসামনি বসে গম্ভীর গলায় বললেন,
“ভাইজানের হাত থেকে না হয় বাঁচিয়ে দিলাম কিন্তু তোকে কিছু কথা শুনতেই হবে তাওসিফ। আমিও তোকে বারবার বলেছিলাম রাজনীতি ছেড়ে দে। শুনলি না কথা। এই যে সম্মানহানিটা হলো ভাইজানের এর জন্য কি উত্তর দিবি তুই?”
আরমান স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তুমি আছো তো। তুমি উত্তর দিয়ে দেবে।”
“আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি তাওসিফ। তুই অত্যাধিক বেয়াদব হয়ে গিয়েছিস।”
“আপনার প্রশ্রয়ে হয়েছে।”
কথাটা আরজু বলল। তিনজনে একযোগে আরজুর মুখের দিকে তাকালো। তবে আরজু বেশ স্বাভাবিক। মহিন হোসেন পুনরায় বলল,
“আমি কি করলাম মা? আমার দোষ দিচ্ছ কেন তুমি?”
“আপনিই তো সব করেছেন। এক ঘন্টা ধরে আপনি গালি শুনলেন অথচ এই কথাগুলো শোনার দরকার ছিল এই বেয়াদব ছেলের। আমি তো খেয়াল করলাম আপনার কথা। আপনি কোন মতেই ওনার দোষ দিলেনই না। আপনার কাছে তো এই লোকটা ধোয়া তুলসী পাতার থেকেও বেশি ভালো।”
মহিন হোসেন সোজা আরমানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“দেখেছিস দেখেছিস, তোকে ভালোবাসতে গিয়ে আমার কত বদনাম হচ্ছে।”
আরমান উত্তর দেওয়ার আগে আরজু আবারো বলে উঠলো,
“ওনাকে কেন বলছেন? উনি তো চাইবেনই আস্কারা পেতে। আস্কারা পেতে পেতে একদম একটা বাঁদর হয়ে গেছে। কোন ভদ্রতা নেই। যেখানে সেখানে মেয়েদেরকে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেয়, হাত ধরে হাঁটতে চায়, আমার পেছনে ঘুরে বেড়ায়, বিরক্ত করে।”
আরজু থেমে যেতেই আরমান বলে উঠলো,
“তার পরের দুটো লাইন বলুন আরু যে আমি আপনাকে ভালোবাসি, বিয়ে করতে চাই।”
আরমানের কথাটা শুনে আরজু কন্ঠে একরাশ অনিহা নিয়ে বলল,
“আপনি চাইলেই হলো নাকি। আমি করবো না বিয়ে আপনাকে।”
আরমান খুব একটা পাত্তা দিলোনা আরজুর কথাকে, শুধু হাসলো। তবে মহিন হোসেন আরজুর কথাটাকে গুরুতরভাবেই নিয়ে নিলেন। আরজু কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,
“মা তুমি ভুল বুঝছো তাওসিফ কে। ও কিন্তু খুব ভালো ছেলে। ওকে এমনি এমনি আমি আস্কারা দেইনি। আমি জানি আমি ওকে যতই আস্কারা দেই না কেন ও কখনো অন্যায় কিছু করবে না।”
“তবে বিরক্ত করে কেন আমায়?”
আরজুর এই প্রশ্নের উত্তরটা জেবা দিল। আলতো হেসেই বললেন,
“এই গুনটা তাওসিফ ওর কাকার থেকে পেয়েছে।
ওর কাকা যেমন এক সময় আমার পিছনে ঘুরতো তেমনি ও এখন তোমার পিছনে ঘোরে। এতে খারাপ কিছু নেই। আমার ছেলেটার উদ্দেশ্য কিন্তু তোমাকে বিয়ে করা। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় ওর উদ্দেশ্য খারাপ না। ও তোমাকে দু-একদিনের জন্য চায় না, সারা জীবনের জন্য চায়।”
থেমে গেল আরজু। অল্প কিছুক্ষণ থেমে আবারো বলল,
“আপনারা ওনার নামে খারাপ কিছু বলতে দেবেন না আমায় তাই না?”
মহিন হোসেন আর জেবা শব্দ করে হেসে উঠলো। আরজুর খুব অবাক লাগল ওদেরকে দেখে। নিজের বাবা-মা না হয়েও কত ভালোবাসে আরমানকে। চাচা চাচি এত ভালোবাসতে পারে জানা ছিল না। আরজুর মা বাবাই তো ওকে এতটা ভালোবাসে না।
কত সুন্দর একটা পরিবার আরমানের। সবাই আছে ওর পরিবারে। এত সুন্দর পরিবার হয় কারো! পরিবারের সবাই একজন মানুষকে এতটা ভালোবাসতে পারে! এই যে এত বড় একটা বিপদ হলো আরমানের, ওর বাবা-মার আসারও প্রয়োজন হলো না। ওর বাবা মাকে ভাবতেও হলো না আরমানকে জেল থেকে ছাড়ানোর বিষয়ে।
ওদের হাসাহাসির মাঝে হঠাৎ করে আরজু আনমনে বলে উঠলো,
“আমার বড় আব্বু খুব ভালো ছিল। তবে আপনাদের মতন না। কেউ কখনো ভালোই বাসলো না আমাকে। আচ্ছা আপনারা কি সত্যি ওনাকে ভালোবাসেন নাকি এর বিনিময়ে কিছু চাওয়া আছে আপনাদের?”
আরমানের হাস্যজ্জ্বল মুখটা চুপসে গেল। আরজুর প্রশ্ন শুনে তড়িৎ গতিতে তাকালো মহিন হোসেন আর জেবার দিকে। দুজনে বিস্ফোরিত নয়নে আরজুর দিকে তাকিয়ে আছে। আরমান ভয় পেল। ওরা না আবার আরজুকে খারাপ ভেবে নেয়। কি করে বোঝাবে যে এই প্রশ্নটা করা আরমানের পা'গলির স্বভাব। সবাইকে একই প্রশ্ন করে বেড়ায়।
আরমান কিছু বলতে নিল। তবে মহিন হোসেন ওকে থামিয়ে দিলেন। কোমল গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তুমি ভুল বলোনি আরজু। সত্যি আমাদের ওর থেকে কিছু চাওয়ার আছে।”
“তার মানে এখানেও দেনা পাওনার সম্পর্ক?”
“হ্যাঁ।”
আরজু উৎসাহী গলায় বলল,
“তবে কি চান আপনারা ওনার থেকে? আপনারা তো এমনিতেই অনেক বড়লোক। ওনার কাছে আপনাদের থেকেও বেশি টাকা আছে?”
আরমান আজ আবারও দ্বিতীয়বারের মতন হালকা করে আরজুর মাথায় চাটি মে'রে বলল,
“চুপ পা'গলি। কিসব আজেবাজে কথা বলেন।”
আরজু আরমানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি আজেবাজে কথা বলছি না। এই পৃথিবীতে সব সম্পর্কই দেনা পাওনার ওপর নির্ভয় করে। ওই যে বলেছিলাম মনে নেই, আপনি আমাকে ভালোবাসেন এটার বিনিময়ে আমার থেকেও ভালোবাসা চান। আর এই পৃথিবীতে সব থেকে জরুরি বস্তুটাই তো হচ্ছে টাকা।”
আরমানের ইচ্ছে করছে আরজুর মুখটা এখন চেপে ধরতে। আরমান এর এসব কথা শোনার অভ্যাস আছে কিন্তু বাকি দুজনার তো নেই। কে জানে কি ভাবছে।
আরমান মহিন হোসেন আর জেবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“উনি কিন্তু খারাপ ভাবে কথাটা বলেনি কাকা কাকি। ওনার মনে আসলে প্রশ্নই বেশি জাগে।”
আরমান কে থামিয়ে দিয়ে মহিন হোসেন বলে উঠলেন,
“তুমি একদম ঠিক বলেছো আরজু। এই পৃথিবীর সব সম্পর্কই দেনা পাওনার উপর নির্ভর করে। আমার আর জেবার একটা ছেলে ছিল, খুব অল্প বয়সে ও মা'রা যায়।”
আরমান মহিন হোসেনকে থামানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“বাদ দাও না কাকা এসব কথা। অন্য প্রসঙ্গ তোলো।”
“থামাচ্ছিস কেন? বলতে দে আমায়। জানো আরজু, আমার ছেলেটা যখন মা'রা যায় তখন আরমানের বয়সও খুব বেশি না। জেবা আর আমি যখন খুব কাঁদছিলাম তখন বাকি সবাই দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিল। শুধুমাত্র এই ছেলেটা আমাদের কাছে এগিয়ে এসে আমাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল আমরা কাঁদছি কেন। ও নাহয় আজ থেকে আমাদের বাবা-মা বলে ডাকবে। বড় হয়ে ছেলের সব দায়িত্ব ও নিজে পালন করবে। আমরা ওকে ভালোবাসি, ওকে প্রশ্রয় দেই ঠিক এই কারণেই। ওর থেকে ছেলের ভালোবাসাটা পাওয়ার লোভে।”
আরমান পাশে তাকিয়ে দেখলো জেবার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠেছে। রেগে গেল। রাগান্বিত গলায় বলল,
“এইজন্য চুপ করতে বলেছিলাম তোমাকে আমি। কাকি কেঁদে ফেলল তো। এই পা'গলি আপনিও থামুন। এই দেনাপাওনের ব্যাপার পরে আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলব।”
আরজু এবারে বিরক্তিকর গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন। একটা মানুষের কাঁদার স্বাধীনতাও নেই নাকি? সবই আপনাদের ইচ্ছেমতো করতে হবে? নিশ্চয় ওনার মনের মাঝে কষ্ট আছে জন্যই কাঁদেছে। কাঁদতে দিন না।”
থেমে গেল আরমান। জেবা নিজের কান্না থামিয়ে হাসার চেষ্টা করে বললেন,
“তুমি কিন্তু এই কথাটা একদম ঠিক বলেছিলে আরজু যে পৃথিবীতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বস্তুটাই হচ্ছে টাকা। তবে যাদের কাছে সেই টাকাটা থাকে তাদের কাছে সেই টাকার মূল্য খুব একটা বেশি থাকে না। আমাদের টাকা-পয়সার সমস্যা নেই তবে অভাব আছে শুধুমাত্র একটা বাচ্চার। একটু মা বাবা ডাক শোনার। তাওসিফ আগে আম্মু বলেই ডাকতো তবে ও যখন আম্মু বলে ডাকতো আমি আরো বেশি কাঁদতাম জন্য আর ডাকে না।”
আরজু স্বাভাবিক গলায় বলল,
“ভালোই করেছে। ডাকলে আরো আপনার বেশি কষ্ট হতো। যাই হোক, যা হয়ে গেছে সেসব তো আর বদলানো যাবে না। এই ছেলেকে নিয়ে ভালো থাকুন। আর অনেক রাত হয়েছে কান্নাকাটি না করে এখন ঘুমিয়ে পড়ুন। আমিও আসছি।”
কথাটা বলে উঠে চলে গেল আরজু। জেবা আর মহিন হোসেন দুজনেই অবাক হলেন। মেয়েটা কেমন অদ্ভুত। একটু সান্ত্বনাও দিল না। ওনারা আশা করেননি তবে দেওয়াটা বোধহয় উচিত ছিল।
আরমান সেসব বুঝতে পারল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আরুর থেকে সান্ত্বনা আশা করে লাভ নেই। উনি সান্ত্বনা দিতে জানেন না। ওনার পরিবার ওনার মনটা একদম পাথর বানিয়ে ছেড়েছে।”
জেবা আরজুর যাওয়ার পথে তাকিয়ে বলল,
“মনে আছে তাওসিফ তোমায় একজনের কথা বলেছিলাম যার সাথে তোমার আরুর মিল পেয়েছিলাম। সেও এমনই ছিল। কেন যেন বারবার ওই মেয়েটার সাথে আমি আরজুর মিল খুঁজে পাই।”
আরমান একটু হেসে উঠে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“পাবে না মিল খুঁজে কাকি। আমার পা'গলি পৃথিবীতে এক পিছই আছে।”
________
আজ আর মহিন হেসেন আরমান কে যেতেই দিল না। জেবা তো পাকাপোক্তভাবে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল যে আজ থেকে আরমান এখানেই থাকবে। আরমানের যা যা প্রয়োজনীয় জিনিস আছে সেগুলো যেন মহিন হোসেন গিয়ে নিয়ে আসে। তবুও আরমানকে ওই বাড়িতে আর যেতে দেবেন না।
আগেই ঘুমোতে গেল না আরমান। রাতে একটু আরজুর সাথে গল্প গুজব না করে কি করে ঘুমোবে। একটু পা'গলিটার পা'গলামো শুনতে হবে তো না হলে তো ঘুমই ধরবে না।
আরজুর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দেখল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা। হালকা করে টোকা দিল। আরজু ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,
“কে?”
“পা'গলি, আমি।”
ভেতর থেকে আবার আরজুর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“পা'গলি বললে খুলবো না। আমি পা'গলি না।”
“আরে ওটা তো আমি ভালোবেসে ডাকি।"
“আপনার ভালোবাসার দরকার নেই আমার। ঠিকঠাক নামে ডাকুন নাহলে খুলবো না।”
আরমানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আরজু যখন বলেছে ঠিক নামে না ডাকলে খুলবে না তার মানে খুলবেই না। তার মানে আজ আবারও আরমানকেই হার মানতে হবে।
“আরু দরজাটা খুলুন।”
ভেতর থেকে আরজু কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুললো। আরজু চোখ ছোট ছোট করে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি কাজ?”
আরমান দাঁত বের হেসে বলল,
“আরু বাইরে খুব ঠান্ডা।”
“তার আগে বলুন উদ্দেশ্য কি? কি করতে এসেছেন?”
“একটু কিছুক্ষণ গল্প করবো আপনার সাথে। তারপরে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বো। এখানে সারারাত থাকবো না।”
আরজু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“আপনি থাকতে চাইলেই থাকতে দিলাম নাকি। অসভ্য ছেলে।”
“এত গালি দেন কেন আমায়? কি করেছি আমি?”
আরমানের অসহায় মুখটা দেখে আরজু হেসে ফেলল। ভালো লাগলো আরমানের অসহায়ত্ব দেখে। হঠাৎ করে আবার আরজুর হাসার কারণটা আরমান বুঝলো না। বোঝার চেষ্টাও করলো না। এখন জিজ্ঞেসও করল না, আবার সমস্যা হয়ে যেতে পারে।
আরজু সরে দাঁড়ালো দরজার কাছ থেকে। ওর পিছন পিছন আরমানও গুটি গুটি পায় ভেতরে গেল। আরজু সোজা গেল বারান্দায়। ঠান্ডা মেঝের উপরেই বসে পড়ল। আরমান কেও ইশারা করলো বসতে। আরমানও বসলো।
আরমান কিছু বলতে ধরলে আরজু থামিয়ে দিল ওকে। নিজেও কিছু বলল না, আরমান কেও কিছু বলতে দিল না। আরমান নিরুপায়। আরজু যখন মানা করেছে তখন কিছু বলা যাবে না, রেগে যেতে পারে আবার। বসে রইলো। দীর্ঘক্ষণ পর আরজু নিজ থেকে বলে উঠলো,
“যার আপনার সাথে বিয়ে হবে সে অনেক কিছুই পাবে। আপনার মতন একটা ভালো ছেলেকে পাবে, আপনার মায়ের মতন একজন ভালো শ্বাশুড়ি পাবে, আপনার পরিবারের মতন একটা ভালো পরিবার পাবে।”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, সেই সৌভাগ্যবতী আপনিই হবেন আরু।”
আরজু মলিন হেসে বলল,
“আমি হব না। আমার ভাগ্য অত ভালো না। দেখবেন একদিন হুট করে হয় আমি হারিয়ে যাব, নাহয় আপনি হারিয়ে যাবেন। নয়তো দেখবেন আপনার ভালোবাসা হারিয়ে গেল।”
আরমান আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“কখনোই হবে না এমনটা।”
আরজু তাকালো আরমানের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আবার প্রশ্ন করল,
“আপনি পার্কে আমার পিছে পড়েছিলেন কেন? আমার তো মনেও ছিল না আপনার কথা আর আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন?”
“হ্যাঁ। তারপরে বেশ কয়েকদিন আপনার গান শোনার লোভে এসেছিলাম। সেদিন বৃষ্টির মাঝে আপনার গাওয়া গানটা শুনতে এতটা সুন্দর লাগছিল না আরু কি বলব।”
“আপনার পছন্দ হয়েছিল আমার গান?’
“হ্যাঁ খুব সুন্দর লেগেছিল। আমি তো একদমই ভালো গান গাইতে পারি না।”
আরজু তীব্র উৎসাহ নিয়ে বলল,
“একটা শোনান আমায়। দেখি কতটা খারাপ গান গান আপনি।”
আরমান অস্বস্তি মাখানা গলায় বলল,
“না আরু। আমার গান শুনলে আপনি জ্ঞান হারাবেন।”
আরজু আবদার করে বলল,
“একটা গান শোনান না। ❝সখি ভালোবাসা কারে কয়❞ এই গানটা শোনান। সুন্দর লাগবে আপনার কন্ঠে।”
আরমান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“সুন্দর লাগবে না আরু। আপনি গানের আসল সুরই ভুলে যাবেন।"
আরজু রাগী চোখে আরমানের দিকে তাকাতেই আরমান থেমে গেল। বুঝলো না গাইলে পা'গলী খেপে যাবে।
গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে দু লাইন গাইলো আরমান,
❝সখী ভাবনা কাহারে বলে?
সখি যাতনা কাহারে বলে?❞
আরমান আর সামনে এগোতে পারলো। না তার আগেই আরজু হেসে উঠলো। একদম উদভ্রান্তের মতন হাসছে। আরমানের লজ্জা লাগলো প্রথমে কিন্তু তারপরেই যখন মনে হলো আরমানের গানের জন্য ওর পা'গলী হেসেছে তখনই ভালো লাগলো।
কিছু বলল না আরমান। হাসতে দিলা আরজু কে। চোখ বন্ধ করে আরজুর হাসির শব্দই মনোযোগ দিয়ে শুনল। সেই শব্দটা আরমানের কাছে খুব সুন্দর একটা সুরের মতন লাগলো।
হঠাৎ করে আরজুর হাসি থেমে গেল। আর আরমানের কানে ভেসে এলো আরজুর গান।
❞সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে।
তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’—
সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়।
সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুখের শ্বাস?
লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ?❞
থামলো আরজু। তাকালো আরমানের দিকে। আরমান চোখ দুটো বন্ধ করে আরজুর গাওয়া গান অনুভব করছিল। এবারে আরমানও চোখ খুলল। আরমান বিমোহিত কন্ঠে বলল,
“যার গানের গলা অন্যের হৃদয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দিতে পারে তার হৃদয় এত কঠিন কি করে হলো আরু?”
আরজু আলতো হেসে বলল,
“আমার হৃদয় কঠিন না আরমান। সবাই শুধু তাদের প্রতি কঠোরতা দেখাতেই আমায় বাধ্য করে। এই দেখুন আপনার প্রতি কিন্তু এখন আমি আর কঠিন হই না।”
“তবে কি ভালোবেসে ফেলেছেন আমায়?”
আরজু দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসলো। চোখ দুটো বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“এতো কঠিন প্রশ্ন আমায় করবেন না আরমান। ভালোবাসি কিনা জানিনা, তবে…....”
“তবে কি আরু?”
“আপনাকে খুব নিজের নিজের লাগে। মনে হয়, ভালোবাসলে আপনাকেই বাসা যায়। ভরসা করা গেলে আপনার ভালোবাসাকেই করা যায়। ভালোবাসি কিনা জানিনা, তবে আপনাকেই আপন আপন লাগে।”