তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ৩২

🟢

আরজুর হোস্টেলে এসে ওকে পেল না আরমানরা। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে সেও কিছু বলতে পারলো না। আরমানের কাছে তো আরজুর ছবিও নেই যে দেখাবে। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল দুজনের। কোথায় যেতে পারে মেয়েটা? যাওয়ার তো কোন জায়গাই নেই। নিজের বাড়িতে যে ফিরে যাবেনা এই ব্যাপারে আরমান নিশ্চিত। দেখে এসেছে ওখানকার পরিস্থিতি।

বেশ কিছু জায়গার কথা আরমানের মাথায় আসছে যেখানে আরজু যেতে পারে। অনেক ভাবনা চিন্তা করে মুনতাসিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মুনতাসির তুমি একবার ভার্সিটিতে গিয়ে দেখো। এমনটাও হতে পারে হয়তো আমাকে কিংবা তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে ওখানে গিয়েছে। তারপরে তোমার বাড়িতেও যাও। বাড়ির রাস্তায় ভালো করে দেখতে দেখতে যেও। তোমার বাড়ি তো চেনে, ওখানেও যেতে পারে।”

মুনতাসির সায় জানিয়ে বলল,

“ঠিক আছে ভাই। আপনি কোথায় খুঁজবেন?”

“আমি হসপিটালে যাব। ও তো ওখানে চাকরি করে। দেখি ওখানে পাই কিনা। তারপরে পার্কে যাব। পা'গলীটা ওখানে থাকতে পারে।”

মুনতাসির চলে গেল ভার্সিটির পথে। আর আরমান গেল হসপিটালে। সেখানে গিয়েও আরজু কে পেল না। এখন শেষ ভরসা পার্ক।

আরমানের কেন যেন মন বলছে আরজু কে পেলে ওখানেই পাবে। ওই জায়গাটাই তো আরজুর সব থেকে প্রিয়। মুনতাসিরও ফোন করে বলেছিল ভার্সিটিতে নেই। অবশ্য এখন ভার্সিটিতে যাবেই বা কেন এটা আরমানের আগেই বোঝা উচিত ছিল।

এত কিছু না ভেবে আরমান সোজা গেল পার্কে। একেই তো মনটা অস্থির হয়ে আছে তার ওপর আবার ঢাকা শহরের যানজট। পারলো না আরমান শুধু আকাশ দিয়ে উড়ে যেতে।

আশেপাশের গাড়ির মালিকদের কে গালিও দিল। ওদের কে এখনই রাস্তায় বেরোতে হয়েছিল! আরমান একটু চলে যেত পার্কে তারপর না হয় যানজট লাগতো। বিরক্তিকর।

অবশেষে চল্লিশ মিনিটের প্রচেষ্টায় আরমান পার্কে আসতে পারলো। বাইকটা পার্ক করে দৌড়ে ভিতরে গেলো। আশপাশটা বেশ ভালোভাবে খুঁজে দেখল। অনেক বড় পার্ক, কে জানে কোথায় বসে আছে। আদৌ আছে কিনা সেটাও তো জানে না।

হাঁপিয়ে গেল আরমান। মনে মনে নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে বলল,

“বুড়ো হয়ে গিয়েছিস নাকি যে এতোটুকুতে হাঁপিয়ে গেলি।”

তবে নিজেকে যতই গালাগালি করুক হাঁপিয়ে তো গেছে। ভাবলো দু মিনিট একটু বসা যাক। পাশে একটা বেঞ্চে বসে পড়লো।

হঠাৎ করে মাথা তুলে সামনে তাকাতেই আরমানের থেকে একটু দূরে একটা বেঞ্চে বসা একটা মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটাকে পিছন থেকে দেখা যাচ্ছে। মাথায় ওড়না দেয়া, পাশে আবার একটা ব্যাগও রাখা। তবে আরমানের চিনতে ভুল হলো না। ওটা আরজু। বহুবার আরজু কে এই জামা পরে দেখেছে।

তবে তাও যেন আরমানের বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হলো। আসলে ভয় পেয়ে আছে তো সেজন্য। আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না। ছুটে গিয়ে মেয়েটার সামনে দাঁড়ালো।

আরজুই বসে আছে। আরমানের মনে হলো মাথার উপর থেকে অনেক বড় একটা বোঝা নামলো যেন। মেয়েটা কি সুন্দর নিশ্চিন্তে চুপচাপ বসে আছে। আরমান দেখলো আরজুর হাতে ওর ফোনটা। তারমানে নিশ্চয়ই ইচ্ছে করেই মেয়েটা ফোন বন্ধ করে রেখেছে। তাহলে রাগটা কি উঠবে না?

তবে আরমান নিজেকে বোঝালো রাগলে চলবে না। এখন যদি আরমান রেগে যায় তবে আরজুও রেগে যাবে। আরমানকে ঠান্ডা থেকে আরজু কে বোঝাতে হবে।

“আরু!”

ডাকটা আরজুর কানে গেল ঠিকই তবে মাথা তুলে তাকালো না আরমানের দিকে, একটু নড়লোও না। আরমানের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে আরজু আরমানকে টের পেয়েছে তবে কথা বলছে না। আরমান কাতর গলায় বলে উঠলো,

“এমন কেউ করে আরু? চিন্তা হয় না আমার? কখন থেকে খুঁজছি আপনাকে, ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছেন। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তো আমি। ওদিকে মুনতাসিরও খুঁজে বেড়াচ্ছে আপনাকে।”

আরজু এবারও কিছু বলল না, চুপ করে বসে থাকল। আরমান কারণ খুঁজে পাচ্ছে না আরজুর নীরবতার। তবে মনে হলো আগে মুনতাসির কে কল করে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে পেয়েছে আরজু কে। তারপরে না হয় আরজুর নীরবতার কারণ খুঁজবে।

তাই করলো। ফোন করে মুনতাসির কে বলল যে আরজু কে পেয়েছে। ফোনটা রেখে এবার আরমান আরজুর পাশে বসলো। আরজুর দিকে ঘুরে বসে হালকা গম্ভীর গলায় বলল,

“কি হয়েছে আপনার? কথা বলছেন না কেন?”

উত্তর দিল না আরজু। আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“আমাকে না বললে বুঝবো কি করে আরু যে কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে? কারো সাথে কোন ঝামেলা হয়েছে? নাকি আপার কথা আবার মনে পড়ছে? ঠিক আছে আজ রাতে আবার নিয়ে যাব আপনাকে আপার কাছে তাও কথা বলুন।”

আরজু তাকালো আরমানের দিকে। বেশ স্বাভাবিক দৃষ্টি। স্বাভাবিক গলাতেই বলল,

“কেন এসেছেন এখানে? আপনার ব্যস্ততার মাঝে আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না বলেই তো কিছু জানাইনি আপনাকে। আপনিও ব্যস্ত ছিলেন তাই কিছু জানতেও চাননি। তবে এখন এখানে এলেন কেন? সময় নষ্ট হচ্ছে তো আপনার।”

আরমান থতমত খেল। একনাগারে মেয়েটা নিজের মন মতই সব কথা বলে গেল। আরমান কখন বলেছে যে আরজু ওকে বিরক্ত করে? কখনই বা নিজের এত ব্যস্ততা দেখালো? পা'গলিটার মাথা বোধহয় সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে।

“এভাবে কেন বলছেন আরু। আমি কি কখনো আপনাকে বলেছি যে আপনি আমাকে বিরক্ত করেন কিংবা আমি কি কখনো আপনাকে আমার ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়েছি?”

“অজুহাত দেখান নি তো। অজুহাত দেখালে তাও মেনে নিতাম। আপনি তো এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে অজুহাত দেখানোর সময়টুকুও পাননি। প্লিজ চলে যান এখান থেকে। আমি একা ছিলাম, একাই আছি আর একাই থাকতে চাই।”

আরমান ভাবল আজ সকাল থেকে আরজুর খোঁজ নেয়নি জন্য রাগ করেছে মনে হয়। তবে এমনটা তো নতুন না। আরজুর মন মেজাজ এর ঠিক থাকে না সেজন্য আরমান খুব ঘন ঘন ফোন করার সাহস পায় না। তবে আজ রাগ করল কেন?

আরমান খুব ভালোভাবে আরজুকে খেয়াল করলো। কেন যেন মনে হচ্ছে আরজু মিথ্যে রাগ দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে আরজু চাইছে আরমান ওকে বুঝুক। বুঝুক আরজুর রাগটা সত্যি না, এর পেছনে একটা সূক্ষ্ম অভিমান লুকিয়ে আছে।

আরমান বসা অবস্থাতে আরজুর দিকে একটু এগিয়ে গেল। কন্ঠ কোমল করে বলল,

“আমি কি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আমার পা'গলিকে? আপনি কষ্ট পেয়েছেন কোন কারণে তাই না? কি হয়েছে আমায় বলুন?”

হঠাৎ করে আরজুর কঠিন অভিব্যক্তিটা কেমন নরম হয়ে গেল। শুকনো চোখ দুটো জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠলো। আরজুর চোখ ভরতি জল দেখে আরমান ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“কি হলো আরু? খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি কি?”

আরজু শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,

“সবাই হোস্টেল থেকে নিজেদের বাড়িতে চলে যাচ্ছিল কিন্তু আমি কোথায় যাব। আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। আমার নিজের কোন বাড়ি নেই। সবাইকে তাদের বাবারা ফোন করে বলছে বাড়িতে চলে আসতে, নয়তো ভাইয়েরা এসে নিয়ে যাচ্ছে, আমার কেউ নেই। আপনি তো জানতেন এমনটা হবে। সকাল থেকে আপনি একটা বারও আমাকে কল করে খোঁজ নেননি। মুনতাসির ভাইয়াও একবারও আমার খোঁজ নেয়নি। কেউ নেই আমার, কেউ না। আপনারা সবাই পর।”

আরমানের নিজেকে খুব বড় অপরাধী মনে হলো। সত্যিই এই কাজটা ঠিক করেনি। আরমানের বোঝা উচিত ছিল যে আরজু এমন একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। আরমানের কি খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল না? কিসের ব্যস্ততা, কিসের এত কাজ যে আরজুর খোঁজ নেওয়ার সময় পায়নি? এসব কি নিতান্তই অজুহাত না?

অবশ্যই অজুহাত। আবারও ভুল করে ফেলল আরমান। আবারও কষ্ট দিয়ে ফেলল আরজুকে। বেঞ্চ থেকে নেমে আরজুর সামনে দুই হাঁটু গেড়ে বসে অপরাধী গলায় বলল,

“আমার ভুল হয়ে গেছে আরু। আসলে অনেক সকালে বেরিয়েছিলাম, এর মাঝে বিশ্বাস করুন খুব ব্যস্ত ছিলাম। আমি সকালে ব্রেকফাস্ট অব্দি করিনি। দুপুরে যখন বাসায় ফিরলাম তখন আবার মুনতাসির এলো। ভেবেছিলাম মুনতাসির চলে গেলে আপনার খোঁজ নেব।”

“কোন দরকার নেই আমার খোঁজ নেওয়ার। আমি সারা জীবন নিজেই নিজেকে সামলে এসেছি, ভবিষ্যতেও সামলাতে পারবো। কি ভেবেছেন আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি আমি? আপনাকে ছাড়া একটা দিনও চলবে না আমার? কি ভেবেছেন এখন আপনার জন্য কাঁদছি? মোটেও না। আমি কাঁদছি আমার ভাগ্যের জন্য। আমার নিজের বাড়ি না থাকার কষ্টে কাঁদছি।”

“ভুল হয়ে গেছে আরু আর করব না কখনো। আমি আসলে বুঝতে পারিনি।”

আরজু কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আমার কেউ নেই আরমান। আসার সময় দেখছিলাম অনেকের বাড়ির লোক এসে নিয়ে যাচ্ছো ওদের, বারবার ফোন করে খোঁজ করছে যে ঠিক আছে কিনা। আমায় নিয়ে কারো চিন্তা নেই। আমার বাবা নেই, আমার ভাই নেই, আমার মা থেকেও নেই, একটা আপা আছে যে আমার থেকেও বেশি অসহায়। আর এক আছেন আপনি। সেই আপনিও খোঁজ নিলেন না আরমান।”

কথাগুলো বলে আরজু আরেকটু শব্দ করে কাঁদলো। আরমানের কেমন যেন নিজেকে পা'গল পা'গল লাগলো। কি করবে বুঝে উঠতে পারছেনা। একবার যখন আরজু কেঁ'দে'ছে তার মানে সহজে থামানো যাবে না। কারণ মেয়েটা কাঁদে না। খুব সামান্য কারণে তো কখনোই কাঁদে না। তার মানে নিশ্চয় আজ খুব বেশি কষ্ট পেয়েছে।

কষ্ট পাওয়াটাও তো স্বাভাবিক। সত্যিই তো এক আরমানই ছিল, সেও যদি আরজুর খোঁজ না নেয় তবে আর কে নেবে।

অনেক সাহস করে আরমান আরজুর চোখের জলটুকু মুছে দিল। দুই হাতের আজলায় আরজুর মুখটা নিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“দয়া করে এভাবে কাঁদবেন না আরু। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। সব দোষ আমার। আমি খুব বোকা। আমি বুঝতে পারিনি যে এই কারণে আপনি এতটা কষ্ট পাবেন। আপনার যা শাস্তি দেওয়ার দিন, তবে তাও এভাবে কাঁদবেন না। আমি কি করলে আপনি কান্না থামাবেন বলুন আমি সেটাই করবো।”

আরজু কোন উত্তর দিল না। শুধু কাঁদলো।

কোন কিছু না ভেবে আরমান আজ দ্বিতীয় বারের মতন আরজু কে জড়িয়ে ধরলো। আরমান ভেবেছিল আরজুর কান্না বোধহয় বাড়বে, তারপর ধীরে ধীরে কমে আসবে। কেননা প্রথম দিন ঠিক এমনটাই হয়েছিল। তবে আজ তেমনটা হলো না। হঠাৎ করে আরজু শান্ত হয়ে গেল।

খুব বেশিক্ষণ আরমান জড়িয়ে ধরে থাকলো না। আরজুর কান্নাটা থেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ছেড়ে দিল। আবারো আরজুর চোখের জল টুকু মুছে দিয়ে আদূরে গলায় বলল,

“এই নিয়ে আপনাকে আর ভাবতেই হবে না যে আপনি কোথায় যাবেন, কার বাড়িতে থাকবেন। চলুন আজ এক্ষুনি বিয়ে করবো। যা হওয়ার হবে তবে আজই বিয়ে করবো।”

কথাটা বলে আরমান উঠে দাঁড়ালো। চোখে মুখে তার দৃঢ় ভাব। যা বলেছে তা করেই ছাড়বে। তবে আরজুর অভিব্যক্তি অন্যরকম। ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“আমি কেন আপনাকে বিয়ে করতে যাব? আপনাকে আমি কোনদিনও বিয়ে করব না।”

আরমান ভরকালো। এই মেয়ের কি সত্যি মাথায় সমস্যা আছে নাকি। এইতো একটু আগেই বলল এক নাকি আরমানই আছে, আবার আরমানকে অভিযোগ করে কাঁদলো, আবার আরমান জড়িয়ে ধরায় তো কিছু বলল না উল্টো কান্না থেমে গেল। এর মানে কি বোঝা যায় না যে আরজুর আরমানের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। আবার এখন বলছে ওকে নাকি কোনদিনও বিয়ে করবে না। সত্যিই এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে।

“আমাকে বিয়ে করবেন না তো কাকে বিয়ে করবেন? ফিরোজ কে?”

“দরকার পড়লে তাই করবো তবুও আপনাকে করব না।”

বিজ্ঞাপন

আরমান মৃদু রাগী গলায় বলল,

“আর একবার অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা মুখে তুললে বিশেষ করে ফিরোজের কথা বললে, জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো আপনাকে বলে দিলাম।”

আরজু চোখ মুখ কঠিন করে বলল,

“কবুল আমাকেই বলতে হবে। এই হুমকি অনেক বছর হলো ফিরোজ আমাকে দিচ্ছে। আমি ওকেও পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি ম'রবো তবুও কবুল বলবো না। বিয়ে করবেন কি করে?”

আরমানের বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। ধপ করে আবার বেঞ্চে বসে পড়লো। আরজুর কান্না থেমেছে ঠিকই তবে রাগে দুঃখে এখন আরমানের কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

তবে কেঁদেও লাভ হবে না। আরু সান্ত্বনা দেবে না, আরমানের মতন জড়িয়েও ধরবে না। অযথা নিজের সম্মানহানি হবে।

ওদের আলোচনার মাঝে সেখানে মুনতাসির এলো। আরজু কে দেখতে পেয়ে চিন্তিত গলায় বলে উঠলো,

“ফোন কেন বন্ধ করে রেখেছিলে আরজু?”

আরজু একবার চোখ তুলে তাকালো মুনতাসিরের দিকে। গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনার কি তাতে?”

মুনতাসির থতমত খেল। হঠাৎ করে আরজুর রাগের কারণটা ঠিক বুঝতে পারলো না, তাও আবার ওর উপরে। কি করলো মুনতাসির। দু দিন হলো তো কথাই হয় না। অবুঝের ন্যায় বলল,

“আমি কি করেছি আরজু যে আমার উপরে রেগে আছো?”

আরজু পূর্বের মতন গম্ভীর গলায় বলল,

“কিছু করেননি আপনি। কি করবেন?”

“কিছু তো অবশ্যই করেছি না হলে রেগে আছো কেন।”

আরজু তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“রেগে থাকবো কার উপরে? রাগ করা যায় নিজের মানুষের উপরে। আপনি তো আমার নিজের কেউ না, তবে রাগ করবো কেন?”

মুনতাসির বুঝল ঘটনা ভয়াবহ। আরজুর পাশে অসহায় মুখ নিয়ে বসে থাকা আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরমান ভাই কি হয়েছে? ব্যাপারটা কি? আপনি কিছু করেছেন কি? আপনার রাগ কি আরজু আমার উপরে দেখাচ্ছে?”

আরমান তেঁতে উঠে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“হ্যাঁ সব দোষ আমার। তুমি তো সাধু। এই ছেলে দুদিন হলো যে বোনের খোঁজ নাও না সেদিকে খেয়াল নেই? এখন এসেছো আমার দোষ দিতে। আমার মাথা কিন্তু গরম হয়ে যাচ্ছে মুনতাসির। আর একটা কথাও বলবে না তুমি।”

মুনতাসিরের এই মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগলো। দুজনেই রাগ দেখাচ্ছে ওর ওপরে। তবে এই রাগের মাঝে আরমান একটা কাজের কথা বলেছে, সেটা হলো দুদিন হলো আরজুর খোঁজ নেয় না জন্য আরজু রাগ করেছে।

আসলে মুনতাসির তো রোজই কল করতে চায় তবে ভাবে যদি আরজুন মন মেজাজ খারাপ থাকে আর খারাপ কিছু ভেবে নেয় বা রেগে যায়। মুনতাসির নরম গলায় আরজুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরজু আসলে আমি ভয়ে তোমাকে কল করতে পারি না। ভাবি যদি তুমি রেগে যাও।”

আরজু স্বাভাবিক গলায় প্রশ্ন করল,

“মৃন্ময়ীর ক্ষেত্রেও কি এমনটাই করতেন? দিনশেষে র'ক্তের সম্পর্কের বোন আর বানানো বোনের মাঝে একটা পার্থক্য থেকেই যায়। মৃন্ময়ী রেগে গেলে আপনি হয়তো উল্টো ওকে শাসন করবেন, আবার কিছুক্ষণ পর আদর করে বোঝাবেন তবে যোগাযোগ ঠিকই রাখবেন। কিন্তু আমি তো নিজের বোন না সেজন্য মাসখানেক কেন বছর খানেক পরও আমার খোঁজ নেওয়া যায়, তেমন কোন ব্যাপার না।”

‘না আরজু এমনটা না। আমি সত্যি তোমাকে নিজের বোনের মতনই দেখি।”

আরজু আলতো হেসে বলল,

“ওই যে বোনের মতন দেখেন। আমি অভিযোগ করছি না আপনার প্রতি। অভিযোগ করাটা হয়তো উচিতও না। তবে আজ আবারও আমার মনে হলো জানেন, আমার কেউ নেই।”

মুনতাসির অসহায় দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকালো যে অনেক আগে থেকেই মুনতাসিরের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুনতাসির বুঝলো আরমানও একই জায়গায় ফেঁসে গেছে। তবে এখন আরজুকে কি করে বোঝাবে এটাই বড় কথা।

__________

“এই পা'গলি, ব্যাগ আমায় দিন। খাওয়া-দাওয়া তো কিছু করেন না, শরীরে এত শক্তি নেই যে পাঁচ তলা উঠবেন এই ব্যাগ নিয়ে।”

আরমানের হাতে ব্যাগটা দিল না আরজু। বরং সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করলো,

“কোথায় নিয়ে এলেন এটা আমাকে? উদ্দেশ্য কি আপনার?”

আরমান দাঁত বের করে হেসে বলল,

“উদ্দেশ্যে তো আপনাকে বিয়ে করার, করবেন?”

“বলেছি তো করবো না আপনাকে বিয়ে। অন্য কাউকে করব। আপনাকে ভালো লাগে না আমার।”

আরমান এবার কোনো উত্তর দিল না। আরজু খেয়াল করল কেমন হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, একদম হ্যাংলাদের মত। আরজুর একটু অস্বস্তি হলো। কিছুক্ষণ পর আরমান নিজ থেকেই হেসে উঠলো। তারপর আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“আপনার পা'গলামি গুলো আমার খুব ভালো লাগে আরু। চলুন পা'গলি এখন উপরে যাই, পাগলামি পরে করবেন।”

কথাটা বলে আরমান আরজুর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে অন্য হাতে আরজুর হাতটা ধরল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে ধরলে হঠাৎ করে আরমানের মনে হলো সিঁড়ি দিয়ে কেন উঠবে, লিফট আছে তো।

“আরে আরু দেখেছেন মাথাটা আমার খারাপ হয়ে গেছে। অযথা আপনাকে কষ্ট করাতে ধরেছিলাম। লিফট আছে চলুন, লিফটে যাই।”

আরমান লিফটের দিকে পা বাড়াতে নিলে আরজু ওর হাতটা টেনে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল,

“না, লিফটে যাব না, আমার দম বন্ধ লাগে।

সিঁড়ি দিয়েই উঠবো।”

“আরে আমি আছি তো সাথে। আমি শক্ত করে ধরে থাকবো আপনার হাত।”

“হাত ধরে থাকার ব্যাপার না, আমার সমস্যা হয় বন্ধ জায়গায়। আপনার ইচ্ছে হলে লিফট দিয়ে আসুন আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠবো। না হলে উঠবই না, চলে যাব।”

আরমান তাড়াহুড়ো করে বলল,

“না না যাবেন না। ঠিক আছে চলুন সিঁড়ি দিয়েই উঠবো। মাত্র তো পাঁচ তলা, পাঁচশ তলা হলেও সমস্যা ছিল না। আমি আমার আরুর জন্য সব করতে পারি।”

কথাটা বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। পাঁচতলা উঠতে উঠতে আরমানের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। হাঁপিয়ে গেছে আরজুও তবে অত কিছু প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করলো না। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। আরমান হাঁপানো গলায় বলল,

“ম'রে গেলাম আরু। না জানি কতদিন পর আবার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম।”

আরজু কিছু বলল না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় এসেছে। একটু পর আরমান কলিং বেল বাজালো। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে মহিন হোসেন এসে দরজা খুলে দিলেন।

সামনে আরমানের সাথে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন, তার ওপর আবার আরমানের হাতে একটা বড় ব্যাগ। চমকে উঠলেন মহিন হোসেন।আরমানের সাথে থাকা মেয়েটা নিঃসন্দেহে আরজুই হবে, তবে ব্যাগ কেন ওদের হাতে?

তারমানে উনি যা সন্দেহ করছেন সেটাই কি ঠিক? এই বিষয়ে তো উনি নিশ্চিত যে আরমান কোন আকাম-কুকাম করলে সরাসরি ওনার বাসাতেই এসে উঠবে। নিজের সাথে সাথে ওনাকেও ফাঁসাতে হবে যে।

মহিন হোসেন চেঁচিয়ে নিজের স্ত্রীর নাম ধরে ডাকলেন। জেবা হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এসে বললেন,

“কি হয়েছে? চেঁচাচ্ছো কেন?”

সত্যি বলতে হঠাৎ করে মহিন হোসেনের চেঁচানোর কারণটা আরমান নিজেও বুঝতে পারেনি। প্রশ্নাত্মক গলায় মহিন হোসেন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চেঁচাচ্ছো কেন?”

মহিন হোসেন নিজেও পাল্টা চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“তুই কাউকে কিছু না জানিয়ে সরাসরি বিয়ে করে নিয়ে চলে এলি তাওসিফ। অন্তত আমাকে তো একবার জানাতে পারতি। মানে তুই নিজেও ম'রবি, আমাকেও মা'রবি। এখন আমি সামলাবো কি করে সবটা?”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প