“আরজু ফুপি তুমি এখানে কি করে এলে? কখন এসেছো?”
ফারিহার কন্ঠ পেতেই প্রার্থনা আর নাসিমা চমকে উঠলো। সেদিকে তাকাতেই দেখলো ফারিহা বিস্ময় ভরা দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রার্থনা ভয় পেল।
ফারিহা যেহেতু জেনে গেছে তার মানে ফিরোজও জেনে যাবে। বাড়িতে যে ফারিহাও আছে সেই কথাটা তো ভুলেই বসেছে। ওর ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। তার মধ্যে ফারিহা ফিরোজকে যা ভালোবাসে, ফিরোজ তো জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে মেয়েটা।
নাসিমা আর প্রার্থনা দুজনেই উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তবে আরজুর অভিব্যাক্তি ভীষণ স্বাভাবিক। আরমানের অভিব্যক্তিও একেবারে স্বাভাবিক। বাড়িতে যে আরো একজন মানুষ উপস্থিত ছিল সেটাই তো সে জানতো না। সেজন্য হঠাৎ করে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে উঠেছে।
প্রার্থনা তাড়াহুড়ো করে ফারিহার কাছে এগিয়ে গিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“মা ফিরোজ ভাইকে বলিস না এই কথাটা কেমন যে তোর আরজু ফুপি এসেছিল। কোনমতেই কিন্তু বলবি না, তাহলে খুব সমস্যায় পড়বো।”
ফারিহা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেন? চাচ্চু কি করবে? শুধু তো ফুপি কে বিয়েই করতে চায়। খারাপ তো না আমার চাচ্চু।”
ফারিহার কথা শুনে আরজু হেসে ফেলল। আরজুর হাসির শব্দ পেতেই সবার মনোযোগ আরজুর দিকে গেল। আরজু ইশারায় ফারিহা কে নিজের কাছে ডাকলো। ফারিহা গেল।
ফারিহা কাছে আসতেই ওকে জড়িয়ে ধরলো আরজু। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একটু আদরও করলো। তারপর ফারিহা কে নিজের পাশে বসিয়ে বলল,
“তোর চাচ্চু কেমন সেটা না হয় আমি নাই বললাম। দুদিন পর তুই আরো বড় হবি, তোর বুদ্ধি আরও বাড়বে তখন ঠিকই বুঝে যাবি সব। তুই বুঝতে পারবি যে তোর শরীরে জা'নো'য়া'রের র'ক্ত বইছে। তুই বুঝতে পারবি তুই জঙ্গলের মাঝে থাকিস, যেখানে সারাদিন রাত হিং'স্র প্রাণীরা ঘুরে বেড়ায়। তবে এটা ঠিক, তোর চাচ্চুর জন্যই কেউ তোর দিকে হাত বাড়াতে পারে না।”
“তবে খারাপ বলছো কেন আমার চাচ্চু কে?”
আরজু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“কেননা আমার কাছে তোর চাচ্চু নিজেই একটা জা'নো'য়া'র যে আমার দিকে হাত বাড়ায় বারবার। আর তোর বাবা হলো আরেকটা জা'নো'য়া'র যে আমার আপার দিকে হাত বাড়িয়েছে। তোর শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি যে তোর বাবা আর চাচা দুটোই জা'নো'য়া'র।”
বিস্ময়ে আরমানের মুখ হা হয়ে গেল। আরজু একবার ভাবলোও না যে একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে কথা বলছে। অন্তত ওর সামনে ওর বাবা আর চাচাকে না গালি দিলেও বোধহয় হতো। তবে এই মেয়ে তো মিথ্যে বলবে না। সবাইকে সবার সত্যিটা জানাতেই হবে।
ফারিহা এবারে চুপ করে গেল। আর কিছু বলতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আরজু নিজেই আবার ফারিহা কে বলে উঠল,
“তুই চাইলে তোর চাচ্চু কে বলে দিতেই পারিস যে আমি এখানে এসেছিলাম। যদিও ততক্ষণে আমি ওর নাগালের মাঝে থাকবো না। তবে একটা কথা মা, ওরা হয়তো আপার উপর আবার অত্যাচার করবে।”
ফারিহা মুখ ভার করে বলল,
“চিন্তা করো না, বলবো না।”
হঠাৎ করে ফারিহার চোখ পড়লো আরমানের ওপর। চিনতে পারলো ফারিহা। আঙ্গুলের ইশারায় আরমানকে দেখিয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিন্তু এই লোকটা তো বলে দেবে চাচ্চুকে। এনাকে কেন রেখেছো? উনিতো চাচ্চুর বন্ধু।”
আরমান কেঁপে উঠলো ভয়ে। কোন দিকে না তাকিয়ে সরাসরি তাকালো আরজুর দিকে। আরমান তৎক্ষণাত বলে উঠলো,
“আরু এখন আর আমি ওর বন্ধু নেই, আগে ছিলাম বন্ধু।”
আরমানের কথাটা ফারিহার ঠিক বিশ্বাস হলো না। জোর গলায় বলল,
“না ফুপি, উনি চাচ্চুর বন্ধু। আমি চাচ্চুর ফোনে ওনার ছবি দেখেছি। চাচ্চু আমাকে বলেওছিল ওনার কথা যে উনি নাকি ঢাকায় থাকা চাচ্চুর একমাত্র বন্ধু। অনেক ভালো সম্পর্ক।”
আরজু কপাল কুঁচকে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ছবিও তুলেছেন ওর সাথে?”
আরমান একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“বোধহয় তুলেছিলাম, আমার ঠিক মনে নেই। আমি তুলিনি ও তুলেছিল, তাও জোর করে। আমার দোষ নেই।”
আরজু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ভালো।”
আরমানের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে আরজু রেগে গেছে কিংবা হয়তো মন খারাপ করলো। তাড়াহুড়ো করে আরজুর দিকে এগিয়ে গিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
“আরু ভুল হয়ে গিয়েছে তো। আর তুলবো না ছবি ওর সাথে। এখন কি আর ওর সাথে ছবি তোলার মতন আমার সম্পর্ক আছে বলুন?”
“না না তুলতেই পারেন ছবি ওর সাথে। বন্ধুত্বও রাখতে পারেন। আমার জন্য তো এত ভালো বন্ধুত্ব নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। দুটোকে একসাথে খু'ন করবো।”
আরমানের কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। আরজু কে কিছু না বলে পাশে বসা ফারিহা কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমার নাম কি?”
“ফারিহা।”
“নাইস নেম। সো ফারিহা, তুমি কেন আমার সাথে এই শত্রুতাটা করছো? আমি কি ক্ষতি করেছি তোমার? তুমি কি জানো তোমার ফুপি এমনিতেই কতটা জটিল মানুষ। কত কষ্টে ওনার বিশ্বাস অর্জন করেছি। তুমি কি জানো এই যে তুমি সন্দেহটা ওনার মনের মাঝে ঢুকিয়ে দিলে এটা ভাঙাতে আমার কত দিন কষ্ট করতে হবে?”
ফারিহা কাচুমাচু করে বলল,
“আমি কি করেছি? আমি যা দেখেছি তাই তো বলেছি। চাচ্চুর ফোনে আপনার ছবি ছিল।”
আরমান আবারও কিছু বলতে চাইলো তবে তার আগেই আরজু ওকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“একটা বাচ্চার সাথে আপনার তর্ক করতে হবে? কোন সেন্স নেই।”
থেমে গেলে আরমান। অপমানে মুখটা শুকিয়ে গেল। চুপচাপ গিয়ে আবার নিজের পূর্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। আরজু সময়টা দেখে নিয়ে বলল,
“এখন আমাদের যাওয়া উচিত আরমান।”
আরমান ঘড়িতে সময় দেখল একবার। আড়াইটা বাজে। আরেকটু সময় বোধহয় থাকা যাবে, সমস্যা হবে না। আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর এক-দেড় ঘণ্টা থাকতে পারবো, সমস্যা হবে না।”
এতক্ষণে প্রার্থনার মনে হলো ওদেরকে কিছু খেতে দেওয়া উচিত। এই মাঝরাতে এসেছে কে জানে রাতে কোন কিছু খেয়েছে কিনা।
“আরু খেয়ে এসেছিস তোরা? আমি ভাত দেই!”
আরজু আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খাবেন কিছু আপনি?”
আরমান সরাসরি প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপা ভাত খাব না, তবে এক কাপ চা দেওয়া যাবে? এই ঠান্ডার দিনে বাইকে আসতে আসতে জমে গিয়েছি। তার মধ্যে কথায় কথায় আপনার বোনের এমন খু'নো'খু'নি করার স্বভাব, আবার এখানে এসে আপনাদের হাতের কা'টা'রি আর ব'টি। আমার না অবস্থাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। একটু চা খেলে যদি ঠিক হয়।”
প্রার্থনা আলতে হেসে বলল,
“এক্ষুনি আনছি।”
প্রার্থনা যেতে ধরলে আরজু ডেকে উঠে বলল,
“আপা পানি গরম করার দরকার নেই। ঠান্ডা পানির মাঝে একটু চিনি আর চা পাতা গুলিয়ে নিয়ে এসো। এমনিতেও তুমি চা বানিয়ে আনলে উনি শরবত বানিয়েই খাবে সেটাকে। অযথা কষ্ট করার দরকার নেই।”
প্রার্থনা হেসে উঠে পাশে ফারিহাকে দেখিয়ে বলল,
“বুদ্ধিটা খারাপ না। আমার মাঝে মাঝে ফারিহার জন্য এভাবে চা বানাতে ইচ্ছে করে। ছোট মানুষ তাও চা খাবে ঠিকই, তবে গরম না একদম ঠান্ডা শরবত বানিয়ে খাবে। যেকোনো খাবারই ঠান্ডা না হলে খায় না। যাইহোক আপনাদের দুজনের জন্য শরবত আর আমাদের জন্য চা বানিয়ে আনছি।”
নাসিমা আর আরমান বাদে বাকি তিনজনই হাসলো। আরমান হাসলো না নিজের অপমানের জন্য, তবে নাসিমা কেন হাসলো না তা কে জানে।
_______
“আপা তুমি চলো না আমার সাথে, কেউ টের পাবে না, ধরতেও পারবেনা কেউ। চলো না আপা।”
সমানে আরজু এই দুটো লাইনই বলে যাচ্ছে আর প্রার্থনা সমানে না করেই যাচ্ছে। এক পর্যায়ে গিয়ে আরজু রেগে গেল। রাগান্বিত গলায় বলল,
“তুমি না গেলে আমিও আর যাব না এখান থেকে। এখানেই থেকে যাব। আসুক ওই ফিরোজ। দেখি ও কি করে।”
প্রার্থনা আরজুর গালে হাত রেখে আদূরে গলায় বলল,
“আমার জীবনে আর নতুন করে কিছু শুরু হওয়ার নেই আরু। আমার নতুন করে কোন কিছু শুরু করার ইচ্ছেও নেই। তবে আমি এখান থেকে চলে গেলে ফারিহা একা হয়ে যাবে, মা একা হয়ে যাবে। যেখানে নতুন করে আর কিছু শুরু হওয়ারই নেই তবে অযথা এই দুটো মানুষকে ফেলে রেখে যাই কি করে বলতো?”
আরজুর পাশে দাঁড়ানো আরমান এবারে প্রার্থনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তো সবাই চলুন। এখানে থাকার তো কোন দরকার দেখছিনা।”
আরমানের কথায় সায় জানিয়ে আরজু বলল,
“হ্যাঁ আপা, চলো সবাইকে নিয়ে যাব। ওখানে গিয়ে সবাই মিলে কিছু না কিছু একটা ঠিক করে নেব। আর একবার এখান থেকে বেরোতে পারলে ফিরোজ আর কিছুই করতে পারবে না।”
“চুপ কর আরু। একেই তো তুই আমার কথা না শুনে এসেছিস এখানে। এর জন্য আমি কিন্তু রেগে আছি। এখন এসব কথা থাক, তোরা চলে যা। কখন কোথায় থেকে ফিরোজের লোক দেখে ফেলবে বুঝতেও পারবো না।”
আরজু অনেক জোড়াজুড়ি করলো তবে প্রার্থনা কোনমতেই রাজি হলো না। শেষে আরজুরা যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো।
আরজু যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আরমান ওর হাত টেনে ধরল। আরজু কারণ বুঝতে পারলো না। হা করে আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আরমান বলে উঠলো,
“আপনার মা কে বলুন। উনি আশা করে আছে যে আপনি ওনাকে বলবেন। একবার তাকিয়ে দেখুন অস্বস্তিতে আপনার কাছে আসতেও পারছে না, দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এতটা কঠিন হওয়াও ঠিক না আরু। আপনার মা আপনাকে ভালোবাসে, হয়তো পরিস্থিতির কারণে দেখাতে পারেনি।”
আরজু আড়চোখে একবার দূরে দাঁড়ানো নাসিমা কে দেখে নিয়ে আরমানকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,
“দায় শুধু আমার একার না আরমান। উনি তো মা, উনি কি চাইলে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতে পারতেন না আমাকে? কই আপনার মা কে তো বলতে হয়নি আমায় জড়িয়ে ধরার কথা। উনি তো আমায় চেনেন না তবুও তো আমাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। তবে যে মানুষটা আমাকে জন্ম দিল, আমার নিজের মা উনি কেন এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতে পারলেন না?”
আরমান এবারে নিজেও আদুরে গলায় বলল,
“এত অভিযোগ রাখতে নেই পা'গ'লি। হয়তো ওনারও কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল যার কারণে আপনার সাথে একটু খারাপ আচরণ করেছে। তবে একটা কথা ভেবে দেখবেন উনি সাহায্য না করলে সেদিন কিন্তু আপনি ঢাকায় ফিরতে পারতেন না। আজও উনি সাহায্য না করলে আমরা আপনার আপার সাথে দেখা করতে পারতাম না। আপনারই তো মা, একবার গিয়ে একটু ভালো করে কথা বলে আসুন।”
আরজু ঠায় সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। আরমান বুঝলো একে দিয়ে কাজ হবে না। নিজেই হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে নাসিমার সামনাসামনি দাঁড় করালো। তারপর পিছন থেকে হালকা করে একটু ধাক্কা দিল।
আরজু নাসিমার গায়ের উপরে পড়লো। তবে তার পরে আরমানকে নিজ থেকে কিছু করতে হলো না। আরজু নিজেই ধরল। নাসিমার অজান্তেই গাল বেয়ে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। নিজেও পাল্টা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
আরজু কিছু বলল না, কাঁদলো না শুধু জড়িয়ে ধরতে হবে জন্য হয়তো জড়িয়ে ধরে থাকলো। তবে কিছুক্ষণ পর নাসিমা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“তোমাকে আমি কঠিন বানিয়েছি জন্যই তুমি টিকে আছো আরজু। আমার থেকে ভালোবাসা পেলে তুমি অল্প আঘাতেই দুর্বল হয়ে যেতে। তোমাকে এভাবে গড়ে তুলতে যেমন তোমায় কষ্ট করতে হয়েছে ঠিক তেমনি আমাকেও অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তোমাকে জন্ম দেওয়া আমার জন্য একটা লড়াই ছিল, ঠিক তেমনি তোমাকে বড় করে তোলাও আমার জন্য লড়াই ছিল। আর এত লড়াইয়ের মাঝে থাকতে থাকতেই এখন তুমি নিজে লড়াই করতে শিখে গেছো। তোমার মা হিসেবে আমি গর্বিত আরজু।”
আরজুর এবারও কান্না পেল না। তবে কি যেন একটা ভেবে নাসিমা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পেলে আপার সাথে তোমাকেও নিয়ে যাব।”
আরো কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো নাসিমার গাল বেয়ে। আরজু নাসিমা কে ছেড়ে দিয়ে একটু ব্যাঙ্গাত্মক গলাতে বলল,
“তোমার কু'লা'ঙ্গা'র ছেলে কোথায়? আর আমার জন্মদাতা বাপের কি খবর?”
নাসিমা মলিন হেসে বলল,
“ওদের এখনো তো খারাপ থাকার সময় আসেনি।”
আর কোন কথা বলল না আরজু। আরমান এর কাছে এসে বলল,
“একটু দূরে যান তো। আপাকে কিছু বলার আছে। একদম আড়ি পেতে শোনার চেষ্টা করবেন না। তাহলে কিন্তু আমি আপনার সাথে ঢাকা ফিরব না বলে দিলাম।”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“শুনবো না রে পা'গ'লি, শুনবো না।”
কথাটা বলে আরমান একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। আরজু প্রার্থনার কাছাকাছি এসে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এই লোকটাকে তোমার ভালো লেগেছে আপা?”
প্রার্থনা হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“হ্যাঁ। খারাপ লাগার তো কোনো কারণ নেই।”
“যে কোনদিন বিয়ে করে নেব আরমান কে। হয়তো তোমায় খবর দিতে পারব না আপা। হয়তো আমার বিয়েতে তুমি থাকবেও না। দোয়া করো আপা যেন অন্তত আমার সংসারটা সুখের হয়। যে কোনদিন, যেকোনো সময় ওনাকে বিয়ে করে নেব।”
__________
ভোরের আলো ফুটে গেছে। চারিদিক তখনো কুয়াশায় ঢাকা, ঠান্ডা আবহাওয়া। অপূর্ব সুন্দর লাগছে সবকিছু দেখতে। এর মাঝে বাইকে ভ্রমনটা যেন আরও বেশি রোমাঞ্চকর লাগছে আরজুর কাছে।
যাওয়ার সময় একটা জায়গা দেখে গেছিল। হাইওয়ের ধারে একটা ফাঁকা জায়গা। আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রাতে জায়গাটা দেখতে বেশ সুন্দর লেগেছিল। রাস্তার ধার দিয়ে সারি সারি গাছ লাগানো। বেশ ভালো লেগেছিল জায়গাটা। শান্তিপূর্ণ একটা জায়গা মনে হয়েছিল।
ফেরার পথে সেই রাস্তায় আসতেই আরমানকে বাইক থামাতে বলল। একদম হুড়মুড়িয়ে তাড়াহুড়ো গলায় বলল। আরমানও তেমনি হুড়মুড়িয়ে বাইকটা থামিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
“কি হলো আরু?”
আরজু বাইক থেকে নেমে থমথমে গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“অনেক তো বাইকের তেল নষ্ট করলাম, চলুন এবার একটু তেল বাঁচাই। একটু হাঁটুন। জমিদারের নাতির মতো সারাদিন বাইকে করে ঘোরার স্বভাব ছাড়ুন।”
“বললেই তো নামি। এত অপমান করার কি আছে। পেয়েছিলেন এক আমার মতন সহজ সরল মানুষ। এজন্য এত অপমান করতে পারলেন। আপনার মুনতাসির ভাইয়াও এত অপমান সহ্য করবে না।”
আরজু একটু হাসলো। মনে মনে বলল,
“সেজন্যই তো আপনি সবার থেকে আলাদা আরমান। আর সেজন্যই আমার মনে আপনার জায়গাও সবার থেকে আলাদা।”
দুজনে হাঁটা ধরল। আরমান সত্যি জানেনা আরজু কেন হঠাৎ করে হাঁটতে চাইলো। কারণটা জিজ্ঞেস করতেও ভয় করছে। যদি আবার বলে বুঝে নিন, তবে আরমান কি করে বুঝবে।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে আরমান আর চুপ করে থাকতে পারলো না। আরজু কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,
“আমরা হাঁটছি কেন আরু?”
আরজু আবার আলতো হেসে বলল,
“ব্যায়াম করাচ্ছি। শরীরে তো জং ধরে গেছে। সারাদিন শুধু খান আর বাইকে করে ঘুরে বেড়ান। ব্রয়লার মুরগি হয়ে যাবেন কিছুদিন পর।”
আরমানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আরমান বুঝতে পারে না আরজু ওকে অপমান করে কি শান্তি পায়। তবে নিশ্চয়ই শান্তি পাই, সেজন্যই তো অপমান করে। আর যেহেতু শান্তি পায় তাই আরমানও আর বাঁধা দেয় না। করুক অপমান তার পরেও যদি পা'গলিটা একটু ভালো থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর হাইওয়ের ধারে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান দেখতে পেল। আরমানকে কিছু না বলে আরজু সেখানে গিয়ে বেঞ্চের উপর চুপচাপ বসে পড়ল। আরমান একটু এগিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ করে পাশে আরজু কে দেখতে না পেয়ে চমকালো। পিছনে তাকিয়ে দেখলো আরজু বেঞ্চের উপরে বসে আছে। আবারো পিছিয়ে এসে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ছোট্ট করে একটা ডাকও তো দিতে পারতেন আরমান বলে। এভাবে একা একা বসে পড়লেন?”
আরমানকে চমকে দিয়ে আরজু অপরাধী গলায় বলল,
“দুঃখিত। আর হবে না এমনটা।”
আরমানের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। বাইকটা দাঁড় করিয়ে একবার আরজুর পাশে বসতে চাইলো। পরে মনে হলো আরজুর অস্বস্তি হতে পারে। তাই আরজুর সামনের বেঞ্চে বসলো।
আরমানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওকে দ্বিতীয়বারের মতন অবাক করে দিয়ে আরজু নিজেই আরমানের পাশে গিয়ে বসলো।
আরমান যেন আর এসব সহ্য করতে পারছে না। পাশে যদি এখন মুনতাসির থাকতো তবে সত্যি ওর গায়ের উপরে ঢলে পড়ত। তবে যেহেতু আরজু আছে এমনটা করা যাবে না।
তবে জ্ঞান না হারালেও আরজু কে জিজ্ঞেস তো করতেই হবে যে এমন কেন করছে। হঠাৎ করে এত পরিবর্তনের মানে কি।
“আরু কি হলো আপনার? বেশি ঠান্ডায় কি সত্যিই পা'গল হয়ে গেলেন?”
আরজু শুধু হাসলো। আরমানের প্রশ্নের কাঙ্খিত জবাবটা না দিয়ে অন্য কথা বলল,
“চা খাওয়াবেন? সাথে দুটো বিস্কিট?”
আরমান ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,
“আমার পা'গলি চা খাবে আর আমি খাওয়াবো না? চাচা দু কাপ চা আর আপনার দোকানের সব বিস্কিট দিন তো।”
চা খাওয়ার পুরো সময়টাতে দুজনের মাঝে আর কোন কথা হলো না। চা খাওয়া শেষে চায়ের বিল দিয়ে আরমান আবারও হাঁটা শুরু করতে চাইলো তবে আরজু বাঁধা দিল।
“বাড়ি ফেরার ইচ্ছে নেই আরু?”
“আছে তো। একটু এখানে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। দেখুন আবহাওয়াটা খুব সুন্দর।”
আরজু বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কে জানে এত কি দেখছে! আরজু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, আর আরমান তাকিয়ে আছে আরজুর দিকে।
আরমান এর কাছে কোন কিছুর সৌন্দর্যই আরজুর সৌন্দর্য কে ছাপিয়ে যেতে পারে না। সেজন্যই তো আরজু মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতিকে দেখছে, আর আরমান মুগ্ধ হয়ে দেখছে আরজু কে।
বেশ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ করে আরজু আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“জানেন আরমান, ইরা আপু আমায় বলেছিল ইরা আপুর যখন খুব বেশি কষ্ট হয় কিংবা খুব বেশি আনন্দে থাকে তখন মুনতাসির ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলে নাকি খুব ভালো লাগে। তার কারণ ইরা আপু মুনতাসির ভাইয়াকে ভালোবাসে। আমার মনটা আজ খুব ভালো আছে। আমি জানিনা আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা তবে আমারও আপনাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে আজ। তবে ধরবো না।”
আরজুর প্রথম দিকের কথাটা শুনে আরমান যতটা খুশি হয়েছিল শেষের বাক্যটা শুনে ঠিক ততটাই মন খারাপ হয়ে গেল। অসহায় গলায় বলল,
“কি হবে একটু জড়িয়ে ধরলে আরু? আচ্ছা আমি ধরি?”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটু প্রশ্রয় পেলে একদম মাথায় উঠে নাচতে শুরু করেন আপনি।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আরমান। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চলুন আরু বিয়ে করে নেই। এই দূরত্ব আর ভালো লাগছে না।”
আরজু আলতো হেসে বলল,
“দূরত্ব তো নেই। মন তো মনকে ছুঁয়ে নিয়েছে, অনুভূতিরাও নিজেদের বাসস্থান খুঁজে পেয়েছে। দুটো মানুষ শত মাইল দূরে থেকেও কেবলমাত্র ভালোবাসার টানে একে অপরকে অনুভব করতে পারে। সেখানে আমি তো আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। দূরত্ব তো তাহলে রইল না আর।”