তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ২৬

🟢

সময় তখন সন্ধ্যা ছয়টা। ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত গতিতে বাইক চালাচ্ছে ফিরোজ। গন্তব্য নিজের বাড়ি। গায়ের র'ক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। বারবার শুধু আরমানের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে আরজুর করা অপমান, আবারো আরজুর করা প্রত্যাখ্যান। সেই সাথে আরমানের দেওয়া হুমকিও।

ছেলেটা বোধহয় এখনো ফিরোজকে ভালোভাবে চিনে উঠতে পারেনি। আরজুর জন্য ফিরোজ ঠিক কি কি করতে পারে সেই সম্পর্কে কোন আন্দাজ নেই। আর সেজন্যই ওভাবে চোখে চোখ রেখে ফিরোজ কে হুমকি দিতে পারল।

তবে এখন তার থেকেও বেশি রাগ হচ্ছে ফাহিমের উপর। ফিরোজ যেহেতু ছিল না ফাহিমের তো বোঝা উচিত ছিল চুপ থাকতে হবে। ওর জানা উচিত ছিল ও একা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেনা। তবে কেন অযথা ঝামেলায় জড়াতে গেল? কিছু তো সামাল দিতে পারলোই না উল্টো বিপক্ষ দলের সাথে শত্রুতা আরও বেড়ে গেল। আর নিজে হাসপাতালে ভর্তি হলো।

ফাহিম বাঁচলো না ম'রলো তাতে ফিরোজের যায় আসে না। এমনও না যে ফাহিম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে জন্য আসতে বাধ্য হয়েছে। আসতে বাধ্য হয়েছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য। নাহলে ঝামেলা আরো বেড়ে যাবে। নয়তো আরজু কে না নিয়ে ফিরোজের কোনমতেই ফেরার ইচ্ছে ছিল না। জানে আরজু স্বেচ্ছায় ফিরতো না, দরকার পড়লে জোর করে তুলেই নিয়ে আসতো।

একই উঠোনের দুপাশে দুটো ঘর। একটা আরজুদের আর একটা ফিরোজদের। বাইক থেকে নেমে ফিরোজ সোজা আরজুদের বাড়িতেই গেল কিন্তু বাড়িতে কাউকে পেলো না।

সেখানে অপেক্ষা না করে সোজা গেল নিজের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে নাসিমা কে পেল। প্রার্থনার সাথে গল্প করছে, পাশে বসে আছে ফারিহা।

শান্ত পরিবেশের মাঝে ফিরোজ যেন ঝড়ের গতিতে সেখানে প্রবেশ করল। ফিরোজকে দেখতেই মুহূর্তের মাঝেই প্রার্থনা আর নাসিমার মুখ থেকে হাসি উড়ে গেল। তবে ফারিহা খুশি হলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“চাচ্চু তুমি এসে গেছো। তুমি না বলেছিলে তোমার সময় লাগবে দুদিন?”

মন মেজাজ যতই খারাপ থাকুক তবে সেসবের কোন প্রভাব ফিরোজ কখনোই ফারিহার উপরে ফেলবে না। জোরপূর্বক হলেও নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“তোমার কথা মনে পড়ছিল আম্মা। তুমি একটু ঘরে যাও তো। কিছু আলোচনা করবো, সেইসবের মাঝে তোমায় থাকতে হবে না।”

বাধ্য মেয়ের মতন ফারিহা চলে গেলে। ফিরোজ গিয়ে ফারিহার ঘরের দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিল। যেন ভুলক্রমেও ফারিহা কিছু না দেখে ফেলে।

প্রার্থনা আর নাসিমা দুজনেই যেন বুঝতে পারলো যে ফিরোজ কিছু একটা ঘটাবে এবং তাদের ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে ফিরোজ সোজা প্রার্থনার দিকে তেড়ে গিয়ে ওর চোয়াল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“বলেছিলাম তোকে কখনো যদি জানতে পারি আরজুর ঠিকানা তুই জানিস তবে তোর কপালে দুঃখ আছে। জানি তোরা দুই জনই আরজু কে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলি। তবে কতদিন লুকিয়ে রাখতে পারলি আমার থেকে? ধরে ফেললাম তোর আরজু কে।”

ব্যথায় ককিয়ে উঠলো প্রার্থনা। সেই সাথে আরজুর খোঁজ পেয়েছে শুনে ভয়ও পেল। নাসিমা গম্ভীর গলায় শাসিয়ে ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“প্রার্থনা কে ছাড় ফিরোজ। ফারিহা কে এখানে আনতে আমায় বাধ্য করিস না।”

ফিরোজ নাসিমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

“যাকে ইচ্ছে আনো তবে আজ আমি থামবো না। কোন না কোন একদিন তো ফারিহা জানতেই পারবে ওর চাচ্চু কেমন মানুষ। আমি ভয় করিনা এসবে। তবে তোমরা দুজন আমার সাথে যে খেলাটা খেলেছো তার শাস্তি তো পেতেই হবে।”

নাসিমা রাগান্বিত গলায় বললেন,

“মূর্খের মতন কথা বলিস না। যদি সেদিন আমি কিংবা প্রার্থনা আরজু কে পালাতে সাহায্য করতাম তবে ওর সাথে প্রার্থনাও যেত, আর না আমি থাকতাম। কি মনে করিস তোদের জা'হা'ন্না'মে পড়ে থাকার খুব শখ আমার?”

“প্রশ্ন তো আমার ওখানেই যে কেন প্রার্থনা কে পাঠালে না?”

“তুই মূর্খ জন্য তোর মাথায় এই প্রশ্নটা ঘুরছে। যদি আমরা আরজু কে সাহায্য করতাম তবে ওর জীবনটা অনেক সহজ হয়ে যেত। আরজু কে সাহায্য করার কোনো ইচ্ছে কখনো আমার ছিলই না। যদি সাহায্য করার হতো তবে আগে প্রার্থনা কে করতাম। তোর বুড়ো ভাইয়ের সাথে কখনোই ওর বিয়ে হতে দিতাম না।”

প্রার্থনা কে ছেড়ে দিল ফিরোজ। হুড়মুড়িয়ে গিয়ে প্রার্থনা সোফার উপরে পড়লো। নাসিমা এগিয়ে গেলেন না মেয়ের দিকে। এক নজর শুধু তাকিয়ে আবারো ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে কড়া গলায় বললেন,

“তোকে বলেছিলাম সীমার মাঝে থাকতে। বারবার অসহায় মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার স্বভাবটা ছাড়। অসহায় কিন্তু আমিও, তবে চাইলে অনেক কিছু করতে পারি। প্রার্থনা কে আমার মতন হয়ে যেতে বাধ্য করিস না।”

ফিরোজ হো হো করে হেসে উঠে তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“তোমারই বা ক্ষমতা কতটুকু? কতদিন আমাকে ভয় দেখিয়ে আটকে রাখবে? কতটুকুই বা তুমি আমাকে আটকে রাখতে পেরেছো? মনে রেখো যেদিন এই ভয় কেটে যাবে সেদিন তোমার শেষ সম্বলটুকুও ফুরুৎ হয়ে যাবে। এসব বাদ দাও। এখন আমি তোমাদের যা বলব তোমরা তেমনটা করবে।”

নাসিমা ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,

“কি?”

“তোমার মেয়ে প্রেমিক জুটিয়েছে ঢাকায় গিয়ে। তোমার জামাইয়ের নাম শুনবে নাকি? আরমান। তোমার সেই হবু জামাই আবার আমায় হুমকিও দিয়েছে। সেই জামাই কিন্তু আমারও পরিচিত, ভীষণ ভালো বন্ধুত্ব ছিল আমাদের দুজনের। তবে তোমার মেয়ের জন্য শত্রুতা হয়ে গেল। আসলেই মেয়ে মানুষ মারাত্মক জিনিস। যেখানে যাবে ঝামেলা পাকাবেই।”

নাসিমা পুনরায় ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,

“তোর সাথে বন্ধুত্ব ছিল কি করে?”

“ওকে কাজে লাগিয়ে আপার খোঁজ করছিলাম। ছেলেটা ভালোই ছিল। কোন স্বার্থ ছাড়াই উপকার করছিল। তবে এবারে আরজুর দিকে হাত বাড়িয়ে কাজটা ঠিক করেনি। এর ফল ওকে ভুগতে হবে। খুব বেশি ভালোবাসা দেখাচ্ছে আরজুর প্রতি যা আমার সহ্য হচ্ছে না। ওর চোখে আমি আরজুর জন্য যে ভালোবাসাটা দেখেছি সেটা মনে হলে ওকে খু'ন করতে ইচ্ছে করছে। তবে ওকে আমি মা'রব না। কৃতজ্ঞ আমি ওর প্রতি। তবে আরজু কে ওর হতেও দেব না।”

“আমাদের কি করতে বলছিস?”

“কি করতে হবে না হবে সেসব পরে এসে বলছি। তবে একটা কথা মনে রেখো, যদি এবারে আমার কথা না শুনেছো সবকটাকে জ্যান্ত ক'বর দেব।”

কথাটা বলে ফিরোজ বেরিয়ে যেতে নিয়ে আবার থেমে গেল। সোফায় পড়ে থাকা প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বুড়ো বয়সে তোর পিরীতের সোয়ামি মা'রা'মা'রি করতে গিয়ে নিজের পেট ফুটো করে বসে আছে। হাসপাতালে ভর্তি। কে জানে ম'রল কি বাঁচলো। দেখতে যাবি না? চল চল, তোকে দেখলে যদি একটু সুস্থ হয় বুড়োটা।”

প্রার্থনা অবাক হলো না। খুব বেশি ভাবান্তরও দেখা গেল না। বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ও ম'রুক বা বাঁচুক তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসেনা। বরং ম'রলে খুশি হবো। ও বেঁচে থাকলে তো বাড়ি ফিরে আবারো মা'র'ধ'র করবে তার থেকে বরং তুমি একবারে ওর লাশ বাড়িতে নিয়ে এসো।”

ফিরোজের মন মেজাজ হঠাৎ করেই কেমন যেন বদলে গেল। কেন বদলে গেল জানেনা। শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“যা চেষ্টা করবো তোর এই আশাটা পূরণ করার। যদি নাও ম'রে তবে আমি মে'রে দেবো। তবে আমার আম্মাটা কষ্ট পাবে।”

“পাবে না কষ্ট। তুমি আছো তো ওর জন্য।”

ফিরোজ আবারো শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“আমি আর কদিনই বা বাঁচবো। আজ আছি তো কাল নেই। আজ ফাহিমের পেট ফুটাে হয়েছে, কাল হয়তো কেউ আমার বুকে ফুটো করবে। লুটিয়ে পড়বো মাটিতে। ছটফট করবো মৃ'ত্যু যন্ত্রণায়। এলাকায় তো অনেকে মিষ্টি বিলাবে ফিরোজ ম'রেছে সেই খুশিতে। আর তোর বোন ঢাকার মানুষকে মিষ্টি খাওয়াবে।”

_________

ঘুম ভাঙতেই চোখ খুলে পাশে ইরা কে শুয়ে থাকতে দেখে লাফ দিয়ে উঠে বসলো আরজু। সারা ঘর জুড়ে চোখ বোলালো। কিছুই তো পরিচিত লাগছে না। এটাতো হোস্টেল না। তবে কোথায় চলে এলো আরজু?

যেই না ইরাকে ডাকতে গেল অমনি মনে পড়ে গেল গতকালের ঘটনা। কত কাহিনীই না ঘটলো গতকাল এই ঘরে। আর আরজু কিনা রাতে ঘুমোতে ঘুমোতেই ভুলে গেল সবটা। এতটা ভুলো মনা হয়ে গেল! নিজের উপরে নিজেই বিরক্ত হলো আরজু।

কিছুক্ষণ পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে আবারো শুয়ে পড়লো। এবারে আর ঘুম ধরল না কোন মতেই। এপাশ-ওপাশ ফিরতে ফিরতেই অনেকটা সময় কেটে গেল। এর মাঝে ইরার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখলো আরজু সমানে এপাশ-ওপাশ ফিরছে। ইরার একটু চিন্তা হলো। চিন্তিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে আরজু? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”

আরজু তাকালো ইরার দিকে। কিছুক্ষণ ইরার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে বলল,

“আমার জন্য তোমার ঘুম ভেঙে গেল ইরা আপু?”

ইরা তড়িৎ করতে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না না। আমার এমনি ঘুম ভেঙে গেছে। তুমি জেগে আছো কেন?”

“আমারও এমনিতেই ঘুম ভেঙে গেছে।”

“ও আচ্ছা। উঠে যখন পড়েছ যাও হাত মুখ ধুঁয়ে নাও।”

আরজু কে কথাটা বলে ইরা নিজেও উঠে গেল। ফ্রেশ হয়ে আরজু বাইরে যেতেই দেখল মৃন্ময়ী, রুবিনা খাতুন, মুনতাসির সবাই উঠে পড়েছে। আরজুই বোধ হয় সবার পর উঠেছে। আরজু কে দেখে সবাই আলতো হাসলো। তবে আরজুর কেমন যেন অস্বস্তি হলো।

গতকাল কি সব পা'গলামো করেছে। সবাই নিশ্চয়ই আরজু কে মানসিক রোগী ভেবেছে। মুনতাসিরের সাথে না হয় অনেক দিনের পরিচয় তবে ওর মা আর বোন তো চেনে না তেমন আরজু কে। ওই হাসপাতালে যে কয়বার একটু দেখা হয়েছিল। আরজু তো কথাও বলতে পারেনি এগিয়ে গিয়ে। তাদের সামনে কি বাজে আচরণটাই না করে ফেলেছে।

বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারল না আরজু। আবারো ঘরে চলে গেল। দরজার কাছে যেতেই দেখল বিছানার উপর আরমান বসে আছে। কেঁপে উঠলো আরজু। তোতলানো গলায় বলল,

“আপনি এখানে কি করে এলেন?”

আরমান আলতাে হেসে বলল,

“আমি তো এখানেই ছিলাম আরু।”

আরজু জানে না কেন এই স্বাভাবিক কথাটা শুনেও ভয় পেল। বলতে গেলে হঠাৎ করে এভাবে আরমানকে বিছানার উপর বসে থাকতে দেখেই ভয় পেয়েছে। আরমানের তো এখানে থাকার কথা না। এলোই বা কখন? কোনোকিছু না ভেবেই মুনতাসিরের নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠলো।

আরজু কে হঠাৎ করে এভাবে চেঁচাতে দেখে আরমান ভরকালো। তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চেঁচাবেন না আরু। কি করেছি আমি? ওরা খারাপ ভাববে তো।”

আরজু থামল না। মুনতাসির সহ বাকি সবাই ছুটে এলো। মুনতাসির আতঙ্কিত গলায় বলল,

বিজ্ঞাপন

“কি হয়েছে আরজু?”

আরজু কম্পিত গলায় ইশারায় আরমানকে দেখিয়ে বলল,

“উনি কখন এলেন? উনি লুকিয়ে ছিলেন সারারাত এখানে।”

আরমান মাথায় হাত ঠেকিয়ে বসে পড়লো। কি করবে এই মেয়েকে নিয়ে, কোথায় যাবে এই মেয়েকে নিয়ে? কাল যেখানে ভরসা করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকলো কতটা সময় আজ আবার সকালেই বলছে লুকিয়ে ছিল। কি করবে আরমান লুকিয়ে থেকে? কি লাভ লুকিয়ে থেকে?

পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝতে পেরে বাকিরা সবাই আবার যে যার মতন কাজে চলে গেল। থেকে গেল কেবল মুনতাসির। জোরপূর্বক একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“লুকিয়ে ছিল না আরজু। আরমান ভাই আমাকে জানিয়েই থেকে গেছে। আসলে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল তো তাই আর যেতে দেইনি ওনাকে।”

মুহূর্তের মাঝে আরজু স্বাভাবিক হয়ে গেল। মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি জানতাম না। হঠাৎ করে এসে দেখি আমার ঘরে। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ওনার খারাপ কোন উদ্দেশ্য ছিল তাই লুকিয়েছিলেন আমার ঘরে।”

খাটের উপরে বসা আরমান অসহায় গলায় বলল,

“কিছু করার হলে কি সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতাম আরু? যা করার রাতেই তো করে দিতাম তাই না? আর কি করবো আপনার সাথে? করলে এক বিয়েই করব, সেটাও তো আপনাকে কবুলটা বলতে হবে।”

আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“ভাবলেন কি করে আপনাকে বিয়ে করবো আমি। একদিন একটু ভালো করে কথা বলেছি জন্য খুব বড় বড় স্বপ্ন দেখছেন।”

আরমান দাঁত বের করে হেসে বলল,

“বিয়ে করলে যে আপনি আমাকেই করবেন সেটা আমি জানি আরু। আর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আপনি যতই মিথ্যে বলুন না কেন আমি সত্যিটা জানি।”

আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কি জানেন?”

“এই যে আপনি আমাকে একটু একটু ভালোবেসে ফেলেছেন। না হলে কি আর এমনি এমনি আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন। আমি সব বুঝি আরু, সব বুঝি।”

আরজুর একটু অস্বস্তি হলো। আরজু বুঝতে পেরেছে যে কাল অনেক বড় বোকামি করে ফেলেছে। আসলে পরিস্থিতিই তখন এমন ছিল যে নিজেকে আর সামলাতে পারেনি। ঠিক ভুল কোন কিছু বিচার করার মতন ক্ষমতাই ছিল না। শুধু ইচ্ছে করেছিল আরমান কে আঁকড়ে ধরে বসে থাকতে। কেন ইচ্ছে করেছিল জানেনা। তবে এখন আরমানের এসব বিষয় নিয়ে খোঁচানো একদম পছন্দ হচ্ছে না।

সরাসরি মুনতাসির কে গম্ভীর গলায় বলল,

“ওনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিন ভাইয়া। উনি বারবার একই কথা নিয়ে আমাকে খোঁচাচ্ছেন, বিরক্ত করছেন। ওনার এখানে থাকার কোন প্রয়োজন নেই।”

মুনতাসিরের ঠিক কি বলা উচিত বুঝে উঠতে পারলো না। আরমান কে তো বের করে দিতে পারবে না। আবার আরজু কে না বললেও ক্ষেপে যেতে পারে। বলা যায় না হয়তো রেগে গিয়ে আবার নিজেই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হবে। এই মেয়ের কোন বিশ্বাস নেই। তবে করবেটা কি?

আরজু কে কিছু না বলে মুনতাসির অসহায় দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকালো। আরমান বুঝলো মুনতাসিরের অসহায়ত্ব। খারাপ লাগলো ওর জন্য। ছেলেটা সহজ সরল। আরজু কে সামলানোর ক্ষমতা মুনতাসিরের মাঝে নেই। এই পা'গলীটাকে সামলাতে পারলে এক আরমানই পারবে।

বিছানা থেকে উঠে গিয়ে আরজুর হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে বিছানায় বসালো। আরজুর সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কড়া গলায় বলল,

“একদম চুপ। বেশি সাহস বেড়ে গেছে। আর একবার যদি আমাকে বাড়ি থেকে বের করার কথা বলেছেন তুলে নিয়ে যাব কিন্তু আপনাকে আমার বাড়িতে। আর মুনতাসির কে এত জ্বা'লাচ্ছেন কেন? এমনিতেই বেচারা আমাদের দুজনের জন্য কাল রাতে বউয়ের সাথে থাকতে পারলো না।”

মুনতাসির লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিয়ে অস্বস্তি মাখানো গলায় বলল,

“ভাই এসব কেমন কথাবার্তা?”

আরমান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“আরে লজ্জা পাচ্ছো কেন? বিয়ে যখন করেছো বউয়ের সাথে থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। এক বছর হয়ে যাচ্ছে বিয়ের। এতদিন তো নিশ্চয়ই থেকেছো, কাল আমাদের জন্য পারলে না।”

“থামুন ভাই।”

“আরে আবার লজ্জা করে। চিন্তা করো না আজ আমি আমার পা'গলি কে নিয়ে চলে যাব। আজ আর তোমাদের দুজনের মাঝে আমরা থাকবো না। শুনুন আরু আজকে কিন্তু আর এখানে থাকা যাবে না। আপনার ইরা আপুকে ছেড়ে দিতে হবে মুনতাসিরের জন্য।”

আরজু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“তখন থেকে কি একই কথা বলে যাচ্ছেন। মুনতাসির ভাইয়া আর ইরা আপু একসাথে থাকে না। ইরা আপু বলেছে ওদের এখনো বাসর ঘরই হয়নি। খালি আগে আগে অযথা এক কথা বলা।”

ঝোঁকের বসে কথাটা বলে ফেলেছে আরজু। আরমানও বলছিল তবে এভাবে হয়ত বলেনি, যার ফলে আরমান নিজেও একটু লজ্জা পেয়ে গেল।

মুনতাসিরের অবস্থা বেগতিক। ইরা তখন নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। আরজুর বলা বেফাঁস কথাটা ওর কানেও গেল। সামনে আরমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো লজ্জা পেল। ইরা চুপচাপ ভেতরে এসে নাস্তার ট্রেটা বিছানার উপর রেখে আবার সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল। পিছন পিছন মুনতাসিরও চলে গেল।

ওদের যাওয়ার পরে আরজু বিস্ময় ভরা কন্ঠে আরমান কে বলল,

“ওরা এভাবে বেরিয়ে গেল কেন?”

আরমান জোরপূর্বক হেসে বলল,

“আপনি তো খুব ভালো কথা বলেছেন সেই জন্য। কোথায় কি বলতে হবে কিচ্ছু জানেন না আপনি আরু।”

আরজু সত্যি বুঝলো না কিছু। ভুলটা কি বলেছে? যা শুনেছে তাই তো বলেছে। সত্যিটা বললেও এদের কাছে দোষ, মিথ্যেটা বললেও দোষ তবে বলবে কি। এরা কি চায় আরজু চুপ করে থাকুক, কিছু না বলুক? যত্তসব।

______

সকালের নাস্তা শেষ করে আরমান যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। আরজুও যেতে চাইলো তবে আরমান মানা করলো। আরজু প্রথমে শুনতে চাইলো না আরমানের কথা, তবে পরে আরমান একটু ধমক দেওয়াতে থেমে গেছে।

আরমানের কাছ থেকে ধমক খেয়ে খারাপ লাগেনি আরজুর। অধিকার দেখিয়েছে আরমান। আরজুর ভালোর জন্য বলেছে। বলা যায় সব মিলে মন্দ লাগেনি আরজুর।

যাওয়ার আগে আরজুর থেকে বিদায় নিতে এলে আরজু ওকে থামালো। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে ইতস্তত গলায় বলল,

“বড় আপার কোন খোঁজ পেয়েছেন আপনি?”

“না আরু। এতটা সহজ নয়। দশ বছর আগে একটা মানুষ হারিয়ে গেছে তাকে খুঁজে বের করা কি এতটাই সহজ? এটাও তো জানি না যে আদৌও বেঁচে আছেন কিনা?”

আরজু অনুরোধের স্বরে বলল,

“ফিরোজের জন্য বড় আপাকে খোঁজা থামাবেন না দয়া করে। আমার বড় আপা খুব ভালো ছিল, একদম আমার বড় আব্বুর মতন। আমার বড় আপাকে খুঁজে দেবেন একটু?”

এই প্রথম বোধহয় আরজু আরমানের থেকে কিছু চাইলো। আরমান আরজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“আমার পা'গলি যখন বলেছ আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। তবে কথা দিতে পারছিনা আরজু। আমার এতটাও ক্ষমতা নেই যে সারা বাংলাদেশ খুঁজে ওনাকে বের করতে পারবো।”

“তবে আমি যদি কারো ঠিকানা দেই তাকে বাঁচাতে পারবেন?”

তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্নটা করলো আরজু। আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কাকে?”

“আমার আপাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নিয়ে আসতে পারবেন আমার আপাকে? ওই জা'নো'য়ার গুলোর হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন?”

আরমান কিছুক্ষণ ভাবলো। ভাবনাচিন্তে শেষ আরজু কে আশ্বস্ত করে বলল,

“ঠিক আছে। এই নিয়ে পরে কথা বলছি আপনার সাথে। সব কিছু শুনে তারপরে ভাববো কি করা যায়।”

আরজু সন্তুষ্ট হলো। মনে মনে ভীষণ কৃতজ্ঞ হলো আরমানের প্রতি। আনমনে একবার ডেকে উঠলো আরমানের নাম ধরে।

“আরমান!”

বরাবরই আরজুর ডাকে মুগ্ধ হয় আরমান। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। নিজেও আলতো হেসে বলল,

“হ্যাঁ আরু।”

আরজু আরমানের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে ভাবলো,

“একদম ঠিক ভেবেছেন আপনি, যদি কখনো কাউকে বিয়ে করি তবে আপনাকেই করবো। জানিনা ভাগ্যে কি আছে। তবে আমি আপনার সাথে সংসার করতে চাই আরমান। ভালোবাসলে কেবল আপনাকেই বাসা যায়।”

কথাগুলো মনেই রয়ে গেল আরজুর। মুখে আর বলতে পারল না। আরমান তাড়া দিয়ে উঠলে আরজু আলতো হেসে বলল,

“কিছু না।”

আরমান আর বাড়তি কোন প্রশ্ন করল না। আরজু কিছু না বললেও যেন অনেক কিছুই বুঝে গেল। নিজেও মনে মনে ভাবলো,

“আপনি মুখে কিছু না বললেও আপনার দৃষ্টি অনেক কিছুই বলে দিয়েছে আমায় আরু। কোন অপূর্ণতা রাখবো না আমি আপনার জীবনে। আপনার কোন ইচ্ছে অপূর্ণ থাকবে না।”

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প