হোস্টেলে ফিরে এসেছে আরজু। ভাবছে প্রার্থনা কে একবার কল করবে। এতদিন যোগাযোগ রাখেনি ফিরোজ কিছু জেনে যাবে সেই ভয়ে কিন্তু এখন তো ফিরোজ সব জেনে গেছে তবে যোগাযোগ রাখতে আর কোন বাধা নেই।
নতুন সিমে প্রার্থনার নাম্বার খুঁজে পেল না আরজু। মনে হয় সেভ করা হয়নি। পুরনো একটা ডায়েরি থেকে প্রার্থনার নাম্বারটা বের করলো।
সময় ব্যয় না করে আরজু কল করলো। রিং হলো। তবে প্রার্থনা নিজের নাম্বারটা বদলায়নি! আরজু একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। প্রথমবার রিং হয়ে গেল কিন্তু প্রার্থনা কলটা রিসিভ করলো না। একটু সময় নিয়ে আরজু আবারো কল করলো। এবারে একবার রিং হতেই প্রার্থনা ফোনটা রিসিভ করলো। অপরিচিত নাম্বার জন্য সালাম দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,
“কে?”
প্রার্থনার কন্ঠটা শুনতেই আরজুর কান্না পেল। এতদিনের জমিয়ে রাখা সব কষ্ট গুলো যেন কান্না হয়ে গলায় আটকে গেল। আরজু খেয়াল করলো ওর মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না।
এদিকে অপর পাশ থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে প্রার্থনা আবার বলে উঠল,
“কে বলছেন? চুপ করে থাকার হলে ফোন করেছেন কেন অযথা?”
“আপা, আমি তোমার আরু।”
চমকে উঠল প্রার্থনা। ফিরোজের বেডের পাশে দাঁড়ানো তখন প্রার্থনা। ফিরোজ খেয়াল করলো প্রার্থনা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে? কে ফোন করেছে?”
প্রার্থনা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“কলেজের বন্ধু।”
“তোর আবার বন্ধুও আছে! পরকীয়া করছিস নাকি?”
প্রার্থনা হালকা তুতলে বলল,
“না না বান্ধবী। আমি কথা বলে আসছি।”
ফিরোজ মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“সত্যি বান্ধবী না অন্য কেউ? কি এমন কথা বলবি যে আলাদা ভাবে বলতে হবে?”
প্রার্থনা ভয় পেল। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। তবে ফিরোজের সামনে ধরা পড়লে চলবে না।
স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করল,
“না বান্ধবীই। আসছি আমি।”
ফিরোজকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রার্থনা চলে গেল। করিডরের একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়িয়ে ফোনের অপর পাশে থাকা আরজু কে উদ্দেশ্য করে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“তুই কেন কল করেছিস আরু? ফিরোজ ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। তুই ঠিক করিস নি কল করে। ফোন রাখ আর কখনো আমায় কল করবি না।”
অপর পাশ থেকে আরজু অসহায় গলায় বলল,
“ওই জা'নো'য়া'রে'র যা জানার তা তো জেনেই গেছে আপা। তোমরাও আমায় লুকিয়ে রাখতে পারলে না, আমি নিজেও লুকিয়ে থাকতে পারলাম না। তবে আর এই লুকোচুরির দরকার কি?”
আরজুর কথার গুরুত্ব প্রার্থনা নিজেও উপলব্ধি করতে পারলো। ঠিকই তো বলেছে ফিরোজ যেন না জানতে পারে সেজন্যই তো এতগুলো দিন হলো আরজুর সাথে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। এখন যখন জেনেই গেছে যে আরজু ঢাকায় থাকে তবে আর এই লুকোচুরির কি দরকার? আরজু কোন ভার্সিটিতে পড়ে সেটাও তো জেনে গেছে তবে এবারে আর লুকোচুরির কোন দরকার নেই।
প্রার্থনার মনে পড়লো অনেকগুলো মাস পর নিজের আদরের আরুর কন্ঠটা শুনতে পেল। এতক্ষণ তো ভয়ে কথাটা মাথাতেই ছিল না। এ পর্যায়ে এসে প্রার্থনার কন্ঠটা নরম হয়ে এলো। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“কেমন আছিস আরু?”
আরজু এবারে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“ভালো নেই আপা। তোমায় ছাড়া একটুও ভালো নেই আমি। আমি জানি তুমিও ভালো নেই। ওই জা'নো'য়া'র'টা তোমায় মা'রে নিশ্চয়ই তাই না? আমার ফুলের মতন আপার গায়ে নিশ্চয়ই এখন ওই জা'নো'য়া'রে'র দেয়া অনেক ক্ষতর চিহ্ন আছে তাই না?”
প্রার্থনা তাকালো নিজের হাতের দিকে। হাতের অনেক জায়গাতেই জখমের চিহ্ন। শরীরের অসংখ্য জায়গায়, বলা যায় প্রত্যেকটা জায়গাতেই ফাহিমের দেয়া ক্ষতর চিহ্ন রয়েছে।
মাঝে মাঝে এমন ব্যবহার করেছে ফাহিম প্রার্থনার সাথে যে প্রার্থনার নিজেকে মানুষই মনে হয় নি। মনে হয় ফাহিম কোন জড় বস্তু কে আঘাত করে যার কষ্ট হয়না।
ফাহিমের এই জঘন্য আচরণের কারনও খুঁজে পায়না কখনো প্রার্থনা। প্রার্থনা তো স্বভাবে আরজুর মতন না যে ফাহিমের প্রত্যেকটা অন্যায়ের যোগ্য জবাব দেবে। মুখে মুখে তর্ক করার স্বভাবও প্রার্থনার নেই। যখন যা বলেছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চুপচাপ তা মেনে নিয়েছে। তারপরেও ফাহিমের এই অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
তবে আরজু কে এখন এগুলো বলা যাবে না। এমনি মেয়েটা চিন্তায় আছে তার উপরে আবার ফিরোজও জেনে গেছে ওর খবর। প্রার্থনা জানে আরজু ওকে নিয়েই বেশি চিন্তায় থাকে। তার উপর আবার এখন যদি এত কিছু বলে মেয়েটা আরো চিন্তা করবে। নিজের সবটুকু কষ্ট আড়াল করার চেষ্টা করে বলল,
“আমি ঠিক আছে আরু। আমার শরীরে কোন আঘাতের দাগ নেই।”
আরজু এবারে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“একদম আমার কাছে মিথ্যে বলার চেষ্টা করবে না আপা। ওই জা'নো'য়া'র তোমায় ভালোবাসে তুমি আমায় এটা বোঝাতে চাইছো? চিনি না আমি ওকে? আজ তিন বছর হলো না হয় বাড়ি থেকে দূরে আছি কিন্তু তার আগে অনেকগুলো বছর আমি ওই জা'হা'ন্না'মে কাটিয়েছি আপা। ওই জা'হা'ন্না'মের কিটগুলোর স্বভাব আমি খুব ভালোভাবেই জানি।”
প্রার্থনা বরাবরই আরজুর কণ্ঠের তেজে মুগ্ধ হয়। কি করে পারে মেয়েটা এত সাহস নিয়ে কথা বলতে? প্রার্থনা তো পারেনা। আরজু নিজেও জানে ও কত বড় বিপদের মাঝে আছে। ফিরোজ মানেই তো একটা আতঙ্ক। তবে তারপরেও আরজুর কন্ঠের তেজ কমে না। মেয়েটা এত সাহস পায় কোথা থেকে কে জানে!
কেন যে প্রার্থনা একটু আরজুর মতন সাহসী হতে পারল না! একটু সাহসী হতে পারলে তো আজ নিজের জীবনেও হয়তো সুখী হতে পারতো। সাহিত্যের হাত ধরে সবার আড়ালে হয়তো পালিয়ে যেতে পারতো। তবে এতটা সাহসী প্রার্থনা কখনো হয়ে উঠতে পারেনি।
“তুই একটুও বদলাসনি আরু। এমন সাহসীই থাকিস, না হলে কিন্তু ফিরোজ ভাই আরো সাহস পেয়ে যাবে।”
“চিন্তা করোনা আপা। তোমাকেও খুব তাড়াতাড়ি আমি নিয়ে আসবো আমার কাছে। আরমান বলেছে আমায় সাহায্য করবে।”
আরমান নামটা চেনা লাগলো প্রার্থনার কাছে। ফিরোজ বলেছিল এই নামটা। আরজুও যখন বলছে তার মানে ফিরোজ মিথ্যে বলেনি। তবে ফিরোজ যে সম্পর্কের কথা বলেছিল সত্যিই কি আরজুর সাথে লোকটার সে সম্পর্কই আছে?
কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে প্রার্থনা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“এই আরমান কে আরু? ফিরোজ ভাই বলছিল তোর সাথে নাকি সম্পর্ক আছে?”
আরজু একটু বিব্রত হলো, অস্বস্তিও হলো বলা যায়। আরমানের কি পরিচয় দেবে বুঝতে পারছে না। অনেক ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“আরমান হলো আরমান। ওই আমার পিছন পিছন ঘোরে আরকি।”
“এটা আবার কেমন পরিচয় হলো? পিছন পিছন ঘোরে মানে কি? তোরা দুজন দুজনকে পছন্দ করিস?”
আরজু চেয়েও কেন যেন অস্বস্তির জন্য বলতে পারল না কিছু। নিজের মনের কথা সম্পূর্ণ আড়াল করে বলল,
“উনি পছন্দ করেন আমায়। সারাদিন আরু আরু বলে পিছন পিছন ঘোরে। ফিরোজকেও হুমকি দিয়েছে আমার জন্য। সারাদিনই তো চেঁচায় যে আমায় নাকি ভালোবাসে।”
“তুই ভালোবাসিস না?”
“আমি কেন ওনাকে ভালোবাসতে যাবো? তুমি জানো না আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করিনা। এমনি পিছন পিছন ঘুরে বেড়ায়, খারাপ লাগে তাই জন্য কথা বলি। এর চাইতে বেশি কিছু না। তবে জানো তো আপা এখানে আমার একটা ভাই আছে, মুনতাসির ভাইয়া। আমার বাবা-মায়ের ছেলের থেকে হাজারগুন ভালো। হাজারগুন ভালো কেন বলছি, মুনতাসির ভাইয়া সব থেকে ভালো।”
প্রার্থনা একটু সন্দেহী গলাতেই বলল,
“তুই নিশ্চিত তো আরু যে উনি ভালো? কাউকে এত সহজে বিশ্বাস করবি না।”
আরজু আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“উনি ভালো, খুব ভালো। আমাকে খুব স্নেহ করে। আরমানের থেকেও অনেক বেশি ভালো।”
প্রার্থনা আরও কিছু বলতে চাইলো তবে তার আগেই কেবিনের ভিতর থেকে ফিরোজের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। প্রার্থনা কেঁপে উঠল। ভয়ার্ত গলায় আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরু এখন ফোন রাখি। ফিরোজ ভাই আর ফাহিম দুজনেই হাসপাতালে ভর্তি। ওখানেই আছি আমি। ফিরোজ ভাই ডাকছে আমায়।"
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
"ওদের আবার কি হয়েছে?"
"কার সাথে যেন মা'রা'মা'রি করেছে। দুজনকেই ছু'রি মে'রে'ছে। এরা যে কবে বাড়ি যাবে কে জানে।"
আরজু খুশি হলো। সন্তুষ্ট গলায় বলল,
"ঠিকই আছে। দোয়া করো যেন ওদের লা'শ বাড়ি ফেরে।"
"ঠিক বলেছিস। এখন রাখি। তুই আর কল করিস না কখনো আমার কাছে। তোর নাম্বার থেকে গেল আমার কাছে, যদি কখনো সুযোগ পাই আমি কল করব।”
আরজু মৃদু বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে তো বললাম আপা এখন আর ভয় করে কোন লাভ নেই। ফিরোজের যা জানার সব জেনে গেছে। আমি রোজ এখন নিয়ম করে তোমার খোঁজ খবর নেব। আর চিন্তা করো না খুব তাড়াতাড়ি আমি তোমাকে আমার কাছে নিয়েও আসবো।”
আরজুর কথায় অসম্মতি জানিয়ে প্রার্থনা বলল,
“তার কোন দরকার নেই। জানিস তো আরু আমার কেন যেন মনে হয় ফাহিম খুব তাড়াতাড়ি ম'রবে, তাও ফিরোজের হাতে। অযথা এই কটা দিনের জন্য আর ঝামেলা বাড়াস না। তুই ভালো থাক, তাহলেই আমি ভালো থাকবো।”
কথাটা বলে প্রার্থনা ফোনটা কেটে দিলে। আরজু কে আর কিছু বলার সুযোগই দিল না।
ফোনটা কেটে দিয়ে প্রার্থনা সোজা কেবিনে গেল।
এক পাশের বেডে ফাহিম বেঘোরে ঘুমোচ্ছে, দ্বিতীয় বেডে ফিরোজ শুয়ে আছে।
প্রার্থনা জানে না কেন তবে দু'ভাইকে আহত অবস্থায় থেকে পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে। ফিরোজ তো সুস্থ ছিল তবে গতকাল রাতে ফাহিমকে দেখতে আসার সময় ওর উপরও একটা আক্রমণ হয়। ছু'রি'কা'ঘা'তে আহত হয়েছে ফিরোজ। খুব বেশি যদিও আঘাত পায়নি। সেজন্যই তো এক রাতের মাঝেই অনেকটা তরতাজা হয়ে উঠেছে।
প্রার্থনা কে আসতে দেখে খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“তোর সোয়ামি ম'রতে বসেছে আর তোর বান্ধবীর সাথে কিসের এত পিরীতের গল্প? খাবার দাবার কিছু এনেছিস বাড়ি থেকে? গিলবো, দে।”
প্রার্থনা কোন কথা না বলে টিফিন বক্স থেকে খাবার বের করে প্লেটে করে ফিরোজের দিকে বাড়িয়ে দিল। খাওয়ার মাঝে বেশ অনেকবার ফিরোজ আড়চোখে প্রার্থনার দিকে তাকালো। প্রার্থনা কে দেখেই মনে হচ্ছে কোন কিছু নিয়ে আতঙ্কে আছে। ধীরে ধীরে ফিরোজের সন্দেহ বাড়লো। এক পর্যায়ে প্রশ্ন করেই ফেলল,
“চোরের মতন করছিস কেন? কিছু লুকোচ্ছিস?”
প্রার্থনা কেঁপে উঠে বলল,
“না তো।”
ফিরোজ ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। আপাতত আর কিছু বলল না। চুপচাপ নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিল। প্রার্থনা আশ্বস্ত হলো। ভাবল ফিরোজ বুঝতে পারিনি যে আরজু ওকে কল করেছিল।
বোকা মেয়েটা বুঝতেও পারলো না যে, ও যতটা সময় আরজুর সাথে কথা বলছিল পুরোটা সময় ফিরোজ পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।
________
হোস্টেলের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আরজু। আরমান আসবে বলেছে, সেজন্যই দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচ মিনিট হলো দাঁড়িয়ে আছে তবে আরমান আসছে না। আরমানের বলা নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গিয়েছে, তারপরও আরমানের খোঁজ নেই।
ঠিক ঠিক সাত মিনিট পর আরমান বাইক নিয়ে এলো। হেলমেট পরেনি আজ। হাস্যজ্জ্বল গলায় যেই না আরজু কে কিছু বলতে যাবে অমনি আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“সাত মিনিট দেরি হয়েছে আপনার। কি মনে হয় আমার হাতে এত সময় আছে যে আপনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবো আমি? আপনি বেকার হতে পারেন কিন্তু আমি বেকার নই।”
আরজুর করা অপমানে আরমানের মুখ থেকে হাসিটা উড়ে গেল। মুহুর্তের মাঝে মেয়েটা হাসি খুশি মনটা খারাপ করে দিতে পারে। তবে কোন ব্যাপার না। আরমানের এসব সয়ে গেছে। উড়ে যাওয়া হাসিটাকে আবার বন্দী করে ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল,
“রাস্তায় অনেক যানযট ছিল আরু। আমার কোন দোষ নেই।”
আরজু আর সেসব কথায় গেল না। সরাসরি কাজের প্রশ্ন করল।
“নিচে আসতে বলেছেন কেন?”
“আজ আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাব। খুব সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে যাব। আপনার মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“আপনি ভাবলেন কি করে আপনি নিয়ে যাবেন আর আমি যাবো? যদি আপনি আমায় ফিরোজের কাছে নিয়ে যান! আর তাছাড়া মুনতাসির ভাইয়াও কিছু জানে না।”
আরমান কপাল চাপরে বলল,
“মুনতাসির আপনাকে কি পানি পড়া খাইয়েছে বলুন তো, আমিও খাওয়াবো। মুনতাসির কি এমন করলো যে আপনি ওর বশীভূত হয়ে গেলেন? আর আমি করেছিটা কি?”
"এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতন সময় আমার হাতে নেই। কোথায় নিয়ে যাবেন সেটা আগে বলুন?”
আরমান জানে আরজুর সাথে এত আজেবাজে কথা বলে লাভ নেই। মেয়েটা যখন বলেছে উত্তর দেবে না তার মানে দেবেনা। আর ঠিকানা না বললে হয়তো ওর সাথে যাবেও না।
“আপনি তো পড়াশোনায় অনেক ভালো, নিশ্চয়ই বই পড়তে ভালোবাসেন। এমন একটা জায়গাতেই আপনাকে নিয়ে যাব যেখানে আপনি অনেক বই পাবেন। আপনি চাইলে সেখান থেকে আপনার পছন্দমত বই নিয়েও আসতে পারেন কয়েক দিনের জন্য। পড়া হয়ে গেলে আবার ফেরত দিয়ে দেবেন।”
আরজু মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আপনার কি মনে এই দুনিয়ার সব বই পড়ার শখ আমার মাঝে আছে? সামনে আমার সেমিস্টার। আপনার জন্য সেসবই পড়া হয়নি এখনো।”
আরমান অসহায় গলায় বলল,
“চলুন না আরু। দেখুন আপনাকে বাইকে তুলবো বলে বাইকটাও পরিস্কার করে নিয়ে এসেছি। দেখুন আজ হেলমেটও আনিনি আপনি বিরক্ত হন বলে। ও আরু চলুন না! আরু! আরু গো, চলুন না!”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে কিছুক্ষণ আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আরমান বুঝতে পারছে আরজু ভাবছে কি উত্তর দেওয়া যায়।
মনে মনে দোয়া দরুদ পড়া শুরু করলো যেন আরজু রাজি হয়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর আরজু গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“আপনি যখন জেদ করেন আমার ভালো লাগে। আমি জানি আপনি মানুষটা খুব একটা সুবিধার না, তবে যেহেতু জেদ করছেন তাহলে যাচ্ছি।”
আরমান শুধু একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বাড়তি একটা শব্দও উচ্চারণের প্রয়োজন মনে করলো না।
তবে আজ আর আরজু যে জামা পরে ছিল সেই জামা পরে যেতে রাজি হলো না। পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে আবারো ঘরে গিয়ে একটা জামা পরে বেরিয়ে এলো। সাজগোজ করার প্রয়োজন হয় না তাই সময়ও লাগলো না বেশি। শুধু জামাটা পরে বেরিয়েছে। চুলও আঁচড়ায়নি মেয়েটা।
আরজুর এমন অবস্থা দেখে আরমান আবারও কপাল চাপড়ালো। হাতের সাহায্যে সামনের চুলগুলো ঠিক করে দিল, কিছু ছোট চুল কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,
“এই পা'গলি, চুল না আঁচরে কেউ বের হয়? আমি নাহয় ভালোবেসে পা'গলি বলে ডাকি কিন্তু এভাবে দেখলে তো মানুষজন সত্যিই পা'গলি ডাকবে। এরপর থেকে অন্তত চুলটা আঁচড়ে বের হবেন। সাজগোজের দরকার নেই।”
আরজু আনমনে বলে উঠলো,
“আপনার ঠিক করে দিতে কি খুব বেশি কষ্ট হলো? আমি ভুলে যেতেই পারি। কিন্তু আপনি যে এত ভালোবাসি ভালোবাসি বলে চেঁচান তো সামান্য চুল ঠিক করে দিতে পারবেন না? আমার ভালো লাগেনা তবে আপনার ভালোবাসার পরীক্ষা এটা।”
আরমান আলতা হেসে তৃতীয়বারের মতন আরজুর গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,
“আমার পা'গলি দিন দিন সোজা হচ্ছে। বসুন।”
আজ আর আরজু অবাক হলো না, কিছু বললও না। চুপচাপ বাইকে উঠলো। তবে অবাক করার বিষয় হলো আরমান কে নিজ থেকে বলতে হলো না ওকে ধরে বসার কথা। আরজু নিজেই আরমানের কাঁধের উপর হাত দিয়ে বসলো।
তারপর আরমান কে শাসিয়ে বলল,
“হঠাৎ করে ব্রেক চাপবেন না যেন আমি হুড়মুড়িয়ে আপনার গায়ের উপরে পড়ি। যদি এমনটা হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে নেমে যাব আমি।”
এত কিছু কি আর আরমানের কানে যায়! পিছনে বসেছে ওর আরু, তার উপরে আবার কাঁধে হাত রেখেছে। শান্তি আর শান্তি।
উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“যান আপনার জন্য আজকে ব্রেকই চাপবো না। প্রয়োজন পড়লেও না।”