অনেকগুলো দিন পর ইরা আজ আবার একটু বই পত্র নিয়ে বসলো। পড়াশোনায় তো আজকাল আর কোনমতেই মন বসে না। পড়াশোনার উপর থেকে মন হারিয়েছে সেই বিয়ে হওয়ার পর থেকে। তবে কি আর করার সংসার তো আর ইরার করা হচ্ছে না এখন। সবার এত কথা রাখতে গিয়ে ইরা নিজের ইচ্ছের কথাগুলো জানাতেই ভুলে গেছে।
আর তাছাড়া যেখানে ওর বাবা স্পষ্ট বলে দিয়েছিলো যে দুজনের পড়াশোনা শেষ হবার পর অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেবে সেখানে নির্লজ্জের মতন কি করে বলবে যে পড়াশোনা ছেড়ে ইরা সংসার করতে চায়?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ইরার মস্তিষ্কে আবারো মুনতাসিরের ভাবনা চলে এলো। কিন্তু না, এখন মুনতাসিরের কথা কোনমতেই ভাবা যাবে না। না হলে এই পরীক্ষায় ফেল কেউ আটকাতে পারবেনা।
মুনতাসিরকে সম্পূর্ণ অপরিচিত বানিয়ে দিয়ে ইরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিল। তবে শুরু করতে পারল না পড়াটা। সবেমাত্র বই খুলেছে ওমনি আরজু এসে বিছানায় ইরার পাশে বসলো। মিনমিনে গলায় বলল
“একটু কথা ছিল তোমার সাথে ইরা আপু।”
ইরা বইটা বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ আরজু বল। আসলে আমি পড়ি সেটা আল্লাহও বোধহয় চান না।”
“আমি কি তোমায় বিরক্ত করলাম?”
আরজু শঙ্কিত গলায় প্রশ্নটা করল। ইরা তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানিয়ে বলল,
“একদমই না। তুমি বলো কি বলবে।”
আরজু আশ্বস্ত হলো। জিভ দিয়ে ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“তোমার আর মুনতাসির ভাইয়ার বিয়ে কি করে হলো? মানে তোমাদের বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়েছিল?”
“বাড়ি থেকেই বিয়ে দিয়েছিল তবে আগে আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করেছিলাম তারপর বাড়িতে জানালে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিয়ে দিয়ে দেয় বলতে মুনতাসির আসলে প্রেম করতে চায়নি। ও সোজা বলেছিলো বিয়ে করবে।”
“তুমি আগে ভালোবাসো বলেছিলে ওনাকে?”
“হ্যাঁ। ওই তো একটা মিচকে শয়'তান। ওই ব্যাটা তো আমায় আগে থেকেই পছন্দ করে কিন্তু ও বলেনি কিছু। আগে আমার মুখ দিয়ে বের করিয়েছে তারপরে নিজে বলেছে।”
আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“ও আচ্ছা।”
ইরা বুঝলো আরজু আরো কিছু প্রশ্ন করবে তাই নিজ থেকে আগেই কিছু বাড়তি কথা বলল না। কেননা আরজু কে ওর কথার মাঝে বিরক্ত না করাই ভালো।
অল্প কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে আরজু প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“তোমরা বিয়ে কেন করেছো? তুমি ওনাকে কেন বিয়ে করলে, ভালো কেন বাসলে ওনাকে? তুমি যে বিয়েটা করলে কিভাবে বুঝলে উনি ভালো মানুষ? ভরসা করতে পারলে কি করে তুমি ওনাকে? তুমি বিয়ের আগে ওনাকে যেমন ভেবেছো উনি কি এখনো তেমনি আছেন? উনি কি তোমার প্রতি লয়াল?”
একনাগারে আরজুর মুখ থেকে এতগুলো প্রশ্ন শুনে ইরার মাথাটা ঘুরে উঠল। এই মেয়ে কত কিছু ভেবে নিয়েছে মুনতাসিরের সম্পর্কে।
“আরজু তুমি না তোমার মুনতাসির ভাইয়াকে বিশ্বাস করো। তারপরেও ও লয়াল কিনা কেন জিজ্ঞেস করলে?”
আরজু বেশ স্বাভাবিক গলায় উত্তরে বলল,
“আমি ওনাকে বিশ্বাস করি কিন্তু তোমার মুখ থেকে ওনার সম্বন্ধে যা জানতে পারবো সেটাই ঠিক হবে। আমিতো ভুল হতেও পারি তাই না?”
“আরে না তুমি একদম ঠিক। আমার মনু একদম খারাপ ছেলে না।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“মনু কে?”
“আরে আমার মুনতাসির। ওকে আমি ছোট্ট করে ভালোবেসে মনু বলে ডাকি।”
আরজু নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ভালোবাসলে এভাবে ছোট করে ডাকতে হয়?”
“ডাকতে হয় এমন কোন নিয়ম নেই, তবে ডাকতেই পারো তুমি। ও বাকি সবার কাছে মুনতাসির হলেও আমার কাছে শুধুমাত্র মনু।”
আরজুর হঠাৎ করে মনে পড়লো আরমানের বলা একটা কথা। আরমান বলেছিল ওকে ভালোবেসে ছোট করে আরু বলে ডাকে। তার মানে আরমান ঠিকই বলেছিল ভালোবেসে ছোট করে ডাকা যায়। তারমানে ছেলেটা সত্যি ভালোবাসে।
আরজু কে চুপ করে যেতে দেখে ইরা বলে উঠলো,
“যে প্রশ্নগুলো করলে উত্তর শুনবে না?”
আরজু তাড়াহুড়োর কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই শুনবো।”
ইরা আলতো হেসে বলল,
“আমি জানিনা কিংবা কখনো জানার সুযোগই হয়ে ওঠেনি যে মুনতাসির একজন প্রেমিক হিসেবে কেমন। তবে হ্যাঁ ও স্বামী হিসেবে ভীষণ ভালো। আমাদের বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে হয়েছে, অনুষ্ঠান করে করা হয়নি। আমার বাবা বলেছে আগে আমরা দুজন পড়াশোনা শেষ করব, মুনতাসির চাকরি করবে তারপরে অনুষ্ঠান করে বিয়ে হলে আমি ওর বাড়িতে যাব। তবে জানো যবে থেকে আমাদের বিয়ে হয়েছ আমার সব খরচ ও চালায়। এমনটা না যে ওর টাকা-পয়সা অঢেল। ও কষ্ট করে উপার্জন করে আমার খরচ চালায়।”
“আর কি কি করে তোমার জন্য?”
“খুব বেশি কিছু করেনি ও আমার জন্য, কখনো তেমন কিছু করার প্রয়োজনও হয়নি। তবে ভালোবাসে আমায়। রোজ নিয়ম করে আমার খোঁজ নেয়, আমার যে কোন বিপদে আমার সবার প্রথমে ওর নামটাই মনে পড়ে। জানো আরজু তোমায় নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে এমন মানুষের খুব অভাব। তবে মুনতাসির আমায় ভালোবাসে। বিয়ের আগে ওকে যেমন দেখেছিলাম বিয়ের পরে তার থেকেও আরো হাজার গুণ বেশি ভালো হয়েছে। দায়িত্বজ্ঞান ওর বরাবরই বেশি। এই বিষয়ে আমি ওর প্রতি কখনো কোন অভিযোগ করার সুযোগ পাইনি। কোন কিছু নিয়েই কখনো ওর প্রতি আমি অভিযোগ করার সুযোগ পাইনি।”
“এবার বল তুমি ওনাকে বিশ্বাস করলে কি করে? মানে তোমার কেন মনে হল যে ওনাকে বিয়ে করলেই তুমি ভালো থাকবে?”
ইরা কে ভাবনা চিন্তা করতে হলো না। ও জানে কেন মুনতাসির কে বিয়ে করেছে। তৎক্ষণাৎ উত্তরে বলল,
“ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওকে। গ্যারান্টি তো আমরা কারোরই দিতে পারবো না। বিয়ে তো করতেই হতো কাউকে না কাউকে, বিশ্বাসও সেক্ষেত্রে তাকে করতেই হতো। এখন সে খারাপ হবে না ভালো হবে সেটা তো পরের ব্যাপার। তার মানে তো এটা না যে আমি কখনো কাউকে বিশ্বাসই করব না। আমি ওকে বিশ্বাস করেছিলাম আর ও আমার বিশ্বাসটা রেখেছে। কেন মনে হয়েছিল ওকে বিশ্বাস করা যায় জানিনা। তবে ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম আর এটাই ওকে আমায় বিশ্বাস করাতে বাধ্য করেছিল।”
আরজুর ভালো লাগল ইরার কথাগুলো। প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর ইরা খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে আরজু আজ আরো ভালোভাবে নিশ্চিত হলো যে মুনতাসির নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ।
তবে একটা ব্যাপারে এখনো সন্দেহ আছে সেটা হলো আরমান আদৌ ভালো মানুষ কিনা। হয়তো ভালো মানুষ তবে কোথাও একটা ঘাপলা তো নিশ্চয়ই আছে। আরজুর কেন এমনটা মনে হয় জানেনা তবে ঘাপলা তো অবশ্যই আছে। না হলে বস্তিতে যাওয়ার কথাটা কেন বলল না? কেন সাতদিন সময় নিল?
ইরার পাশ থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিয়ে আরজু সোজা ছাদে চলে গেল। সচরাচর ছাদে আসা হয় না আরজুর। মাঝে মাঝে একটু কাপড় শুকোতে দিতে আসা হয়, এছাড়া আর আসা হয় না।
অন্যান্য দিক থেকে আরজু কর্মঠ হলেও সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠার দিকটায় আরজু ভীষণ অলস।
আরমানের নাম্বারটা বের করে দীর্ঘ দশ মিনিটের বেশি সময় ভাবলো কল দেওয়া উচিত হবে কি হবে না। ব্যস্ত নেই তো আরমান? যদি ফোন দিলে বিরক্ত হয়?
পরক্ষণেই আরজুর মনে হলো যদি ভালোবাসে আরমান তবে বিরক্ত হবে কেন? যত ব্যস্তই থাকুক না কেন যদি আরজু কে সত্যিই ভালোবেসে থাকে তবে সেই ব্যস্ততার মাঝেও আরজুর ফোন রিসিভ করতে হবে। আর যদি রিসিভ না করে কিংবা বিরক্ত হয় তবে আরমান ভালোবাসে না আরজু কে। নিঃসন্দেহে আরমান তার মানে খারাপ মানুষ।
এখন আরমান ভালো না খারাপ এটা পরীক্ষা করার জন্য হলেও আরজু কে কল করতেই হবে। এবং তাই করলো।
তবে ঠিক করলো কল করে আরজু আগেই কথা বলবে না। দেখবে আরমান ওর নাম্বারটা মুখস্থ করে রেখেছে কিনা। যদি চিনতে না পারে তবে কথাই বলবে না। ফোনটা কেটে দেবে। যার জীবনে আরজুর গুরুত্ব নেই সেখানে আরজু থাকবে না।
দুরুদুরু বুক নিয়ে আরজু কল দিল। ভয় করলো। যদি আরমান চিনতে না পারে তবে কষ্ট পাবে তো আরজু। যদি চিনতে না পারে তার মানে আরমানের জীবনে আরজুর গুরুত্ব নেই।
আরজুর এসব ভাবনার মাঝেই ফোনটা রিসিভ করল আরমান। আরজুর সব ভয় দূর করে দিয়ে আরমান হাস্যজ্জ্বল গলায় বলে উঠলো,
“আরে আমার পা'গলি আজ এই সময় কল করলো যে? ভালো করেছেন কল করে। আমারও আপনার কথা খুব মনে পড়ছিল তবে ফোন দেওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না।”
অতি কষ্টেও আজকাল আরজুর আর কান্না আসে না তবে আজ হঠাৎ করে এখন কেন যেন খুশিতে কাঁদতে ইচ্ছে করলো। আরমান চিনতে পেরেছে ওকে। তার মানে ওর নাম্বারটা মুখস্ত করে রেখেছে বা সেভ করে রেখেছে।
তবে নিজের আবেগ আরমানকে দেখানো যাবে না। দেখালে প্রশ্রয় পেয়ে যাবে ছেলেটা। নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনি আমার সাথে কি করতে চান?”
আরজুর মুখ থেকে হঠাৎ এমন প্রশ্নে আরমান থতমত খেয়ে গেল। প্রশ্নটা কেমন যেন উদ্ভট শোনালো না! কি করবে আরমান আরজুর সাথে?
কন্ঠে একরাশ বিস্ময় সমেত বলল,
“কি করবো আমি আপনার সাথে?”
“কি করবেন সেটাই তো জিজ্ঞেস করলাম। আপনার উদ্দেশ্য কি? আপনি কি আমার সাথে প্রেম করতে চান নাকি আমাকে বিয়ে করতে চান নাকি কিছুদিন পর ছেড়ে চলে যাবেন?”
ছেড়ে চলে যাবে এই উত্তরটা তো সঠিক না, তাই আরমান এই উত্তরটা বলবে না। তবে প্রেম করতে চায় নাকি বিয়ে করতে চায় এই দুটোর মাঝে কোনটা বললে আরজু সন্তুষ্ট হবে সে বিষয় নিয়ে দোটানার মাঝে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল আরজুর সেদিনকে তাওকীর কে বলা কথাটা।
যদি আরজু গার্লফ্রেন্ড শব্দটা পছন্দ না করে তবে নিশ্চয় প্রেম শব্দটাও পছন্দ করবে না।
সবশেষে আরমান ঠিক করলো রাগলে রাগবে তবুও আরমান নিজের আসল উদ্দেশ্যটাই বলবে। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
“আমি আপনাকে বিয়ে করবো আরু। তারপর আমার ছেলে মেয়ের মা বানাবো আপনাকে। আর তারপর আমার নাতি পুতির দাদি-নানি হবেন আপনি।”
আরজু হকচকালো। যদি সামনাসামনি আরমান এই কথাটা বলতো তবে লজ্জায় হয়তো দৌড় দিতো অন্যদিকে। ভাগ্যিস ফোনে কথাটা বলেছিল আরমান নয় তো কি হতো আরজুর। আরমান তো বুঝে ফেলতো যে আরজুও লজ্জা পায়, যেটা আরজুর জন্য ভীষণ লজ্জাজনক ব্যাপার হত।
ভালো লাগলো আরমানের কথাটা। তবে সেসব তো বুঝতে দেওয়া যায় না। মৃদু রাগী কন্ঠে বলল,
“বেশি দূরে চলে যাচ্ছেন। অসভ্যতামা হয়ে যাচ্ছে।”
আরমান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“হলে হবে। আমার যেটা উদ্দেশ্য সেটাই বলেছি। মিথ্যে বললেও তো সমস্যা হয়ে যেত, সত্যি বলেছি তাও সমস্যা।”
“এত জোরে কথা বলছেন কেন আমার সাথে?”
তৎক্ষণাত আরমান মিইয়ে গেল। নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে অপরাধী গলায় বলল,
“আমার ভুল হয়ে গেছে আরু, আর এমনটা হবে না।”
আরজু ভাবতেও পারেনি ওর একটা ধমকে আরমানের কন্ঠটা এতটা শান্ত হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে আরজুর ভালো লাগাগুলো যেন বাড়তেই থাকলো। আরমান সত্যি তবে আলাদা। উদ্দেশ্য যেহেতু প্রেম করা না সোজা বিয়ে করা তারমানে তো ছেলেটা ভালো।
এরপর বেশ অনেকক্ষণ আরমান একা একাই কথা বলে গেল। নিজেই প্রশ্ন করলো, নিজেই উত্তর দিল। আরজুর থেকে উত্তর পাওয়ার আশাও রাখল না। বেশ অনেকটা সময় চুপচাপ আরমানের কথা শোনার পর কি ভেবে যেন আরজু বলে উঠলো,
“আজ হসপিটাল থেকে এক ঘন্টা আগেই ছুটি পাব।”
আরমান থেমে গেল। যা ভাবছে সেটাই কি ঠিক? আরজু কি ইচ্ছে করে কথাটা আরমান কে শুনিয়ে বলল? তার মানে আরজু আরমান কে ওই এক ঘন্টা সময় দিল?
তবে ভয়ও হলো। আদৌও আরজু এটাই বোঝাতে চেয়েছে তো ওকে নাকি আবার অন্য কিছু বোঝাতে চাইলো? আরমানের নীরবতার মানে যেন বুঝতে পারলো আরজু। নিজেই আবারো বলে উঠলো,
“ওই এক ঘন্টা আমি পার্কে গিয়ে বসে থাকবো। তবে হ্যাঁ আমি চাই না কেউ আমায় বিরক্ত করতে আসুক। যদিও জানি আপনি কথা শুনবেন না আমার।”
এবারে আরমান নিশ্চিত হলো। আলতো হেসে বলল,
“আগেই যাবেন না কেমন। আমি এসে নিয়ে যাবো আপনাকে সেই সাথে আজকে একজনকে সাথে করে নিয়ে আসবো। পরিচয় করিয়ে দেবো আপনার সাথে।”
আরজু সন্দেহী গলায় বলল,
“আপনার বউ?”
আজকাল আরমান এমন প্রশ্নে আর অবাক হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমার বাবার বউ মানে আমার মা কে মানে আপনার হবু শ্বাশুড়ি কে আনবো।”
কথাটা আরমান বলল ঠিকই তবে অপর পাশ থেকে আরজুর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে দেখলো কলটা কেটে গেছে। আরজুর ফোনের ব্যালেন্স শেষ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কাকে নিয়ে আসবে সেটাও শুনতে পেল না। আরমান আর ইচ্ছে করেই কল ব্যাক করল না। একবারে গিয়ে না হয় আলাপ করিয়ে দেবে।
_________
বাড়িতে সবাই মিলে পরিকল্পনা করছে যে আজ রাতে সবাই বাইরে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করবে। বাড়ির ছোট থেকে বড় সবাই যাবে। পরিকল্পনার শেষে ঠিক হলো বিকালেই বের হবে। আশপাশটা ঘুরে তারপর রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে বাড়ি ফিরবে।
তবে ওদের পরিকল্পনা থেকে আরমান আমেনা বেগমকে বের করে আনলো। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল আরমান আমেনা বেগমকে নিয়ে একা বেরোবো, তাদের সাথে আর কেউ যাবে না।
তাশরিফ অবশ্য অনেকক্ষণ আরমানের পিছনে ঘ্যানঘ্যান করলো যে ও সাথে যাবে তবে আরমানের মন গলল না। তনুশ্রী একবারের জন্যও যেতে চাইলো না। কেননা এই দলে গেলে তানভীরের দেখা পাওয়া যাবে না। আর ওই দলে গেলে আরমান না থাকলে তানভীরের সাথে বেশ ভালোই সময় কাটানো যাবে, বাকিরা কেউ বুঝবেও না তেমন কিছু।
শেষমেষ তাশরিফ আরমানের থেকে একটা ধমক খেয়ে চলে গেল। তাশরিফ চলে যেতেই আরমান জোর করে সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে মায়ের কাছে এলো। আরমান কিছু বলার আগেই আমেনা বেগম নিজেই বলে উঠলেন,
“কিছু কি হয়েছে বাবা? তুই হঠাৎ আমাকে একা নিয়ে যাবি কেন?”
আরমান আমেনা বেগমের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। আমেনা বেগমের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“তোমায় ভরসা করে একটা কথা বলি কেমন মা, বাবাকে বলো না যেন। বাবাকে বললে সব শেষ।”
আমেনা বেগম আতঙ্কিত গলায় বললেন,
“কি করেছিস তুই?”
“না মা তেমন কিছু না। আসলে তোমার ছেলের একটা মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে।”
আরমান দ্বিতীয় কোন বাক্য বলার আগেই আমেনা বেগম উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,
“আগে বলিস নি কেন আমায়? আর এটা লুকোতে হবে কেন? তোর বাবার সাথে কথা বলে বিয়ের ব্যবস্থা করি তোর?”
আরমান শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“যাকে পছন্দ করেছি সেও আমার মায়ের মতন পা'গলি। আর এই দুই পা'গলি কেই আমি খুব ভালোবাসি। এখনই বাড়িতে কাউকে কিছু বলো না। আগে তো ওকে ভালো করে রাজি করাতে হবে তাই না?”
আমেনা বেগম বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“হ্যাঁ তাও ঠিক বলেছিস। মেয়ের অমতে তো আর বিয়ে দিতে পারি না।”
“হ্যাঁ। আর সেজন্যই আজ আমি তোমাকে নিয়ে যাব ওর সাথে দেখা করাতে। আসলে মা ওর নিজের পরিবারের সাথে সম্পর্ক মনে হয় ঠিক না। ওর বাবা মার সাথে খুব দূরত্ব, ওর পুরো পরিবারের সাথেই ওর খুব দূরত্ব। আমি তো আমার মাকে চিনি, আমার মা খুব ভালো। তুমি একটু গিয়ে ওকে আদর করে দিও তো। ওকে একটু বুঝিয়ো তো মায়ের ভালোবাসা কেমন হয়। আর সেই সাথে তোমার ছেলের নামে একটু বেশি বেশি প্রশংসা করবে। জানো ওর বিশ্বাস আমি মানুষটা ভালো না।”
আমেনা বেগম আলতো করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“সেটা তুই না বললেও আমি ওকে আদর করবো। আমার বড় ছেলের বউ হবে বলে কথা ওকে আমি আদর করবো না? আর আমার ছেলের আর আলাদা করে প্রশংসা করার কি আছে। আমার ছেলে তো ভালোই। হীরের টুকরো ছেলে আমার। লাখে কেন, কোটিতে কেন সারা দুনিয়া খুঁজলেও আমার ছেলের মতন আর একটা ছেলে পাওয়া যাবে না।”
আরমান পাশ ফিরে দুহাতে মায়ের কোমর পেঁচিয়ে ধরে অসহায় গলায় বলল,
“সে আমি তোমার ছেলে জন্য তোমার কাছে এত ভালো। কিন্তু আমার আরু আমায় এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি গো মা।”
______
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আরজুর মন-মেজাজটা হঠাৎ করে ভীষণ বিগড়ে গেল। এক ঘন্টা আগেই হাসপাতাল থেকে বের হতে পারবে ভেবে একটু আগে যে আনন্দটা হচ্ছিল এখন আর সেটা হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে, আর কোনদিন এই হাসপাতালে পা না রাখতে।
এক রোগীর পরিবারের সাথে টুকটাক কথা কাটাকাটি হয়েছে। আরজু যথা সম্ভব নিজের ভদ্রতা বজায় রেখেছে আর ওনারা বোধহয় সেটারই সুযোগ নিয়েছেন।
তবে চাইলেও এই চাকরিটা ছাড়ার কোন উপায় আরজুর কাছে নেই। টাকার প্রয়োজন আরজুর, অনেক টাকার প্রয়োজন।
অবশেষে কাজের সময় শেষ হলো আরজুর। এত ঝামেলার মাঝে ভুলেই গেল যে আরমানের আসার কথা ছিল। আরমান বলেছিল আগেই যেন না যায়।
হাসপাতাল থেকে বেরোতে নিলে হঠাৎ করে আরজুর সামনে এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালো। একেই আরজুর মন মেজাজ খারাপ ছিল তার ওপরে আবার খুব বিরক্তিকর একজন মানুষের মুখ দেখতেই সর্বাঙ্গে আ'গুন ধরে গেল যেন। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গম্ভীর গলায় বলল,
“পথ আটকালেন কেন?”
রিয়াদ স্মিত হেসে বলল,
“কথা বলার জন্য আরজু। আজকাল তো তোমার দেখাই পাওয়া যায় না, কথাও বলো না আর আমার সাথে।”
আরজু আবারো গম্ভীর গলায় বলল,
“প্রয়োজন ছাড়া কি কোনদিন আমি আপনার সাথে কথা বলেছি?”
“রেগে যাচ্ছো কেন আরজু? আমি তো খারাপ কিছু বলিনি। ও আচ্ছা বুঝতে পেরেছি সারাদিন অনেক কাজ করেছো তাই মাথা গরম আছে। চলো একটা ক্যাফেতে গিয়ে বসি। কফি খেতে খেতে একটু গল্প গুজব করি।”
আরজু হাসলো। লোকটার সাহস খুব বেড়ে গেছে। কতটা সাহস বেড়ে গেলে আরজু কে কফি খেতে যাওয়ার কথা বলে ওনার মতন একটা মানুষের সাথে। আরজু একবার লোকটার মাথা থেকে পা অব্দি দেখে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“চেহারা তো দেখতে মানুষের মত, গায়ের সাদা অ্যাপ্রন আর গলায় ঝোলানো স্টেথোস্কোপ দেখে ডাক্তার মনে হয়, তবে আচরণ কেন কুকুরদের মতন? সারাদিন এমন মেয়েদের পেছনে ঘুরঘুর করেন কেন? খুব ভালো লাগে কি কুকুরদের? তবে একটা কাজ করুন আজ থেকে বাড়িতে না গিয়ে রাতে রাস্তায় ওদের সাথে ঘুমোনো শুরু করুন। তাহলে অন্তত আমার এতটুকু ধরে নিতে সুবিধা হবে যে কুকুরদের কাজই লেজ উঠিয়ে মানুষের পিছু পিছু ঘোরা।”
আরজুর সহজ ভাষায় করা অপমানটা বুঝতে বাকি রইলোনা রিয়াদের। তবে খুব একটা গায়ে মাখলো না। কেননা বরাবর আরজু ওকে অপমানই করে আসছে। আরজুর কাছে এর বেশি কিছু আশা করা যায় না। হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“একদম ঠিক বলেছো, আমার স্বভাবটা একটু কুকুরদের মতনই আছে। আর আমার প্রিয় হলে কেবলমাত্র তুমি। এই দেখো না তুমি যেখানেই থাকো না কেন তোমার গন্ধে গন্ধে আমি চলে আসি তোমার কাছে।”
আরজু ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“আপনাকে একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। ছোটবেলায় আমার খুব প্রিয় একজনকে একটা কুকুর কা'মড়ানোর চেষ্টা করেছিল। তো যেহেতু মানুষটা আমার প্রিয় ছিল আমার তো কষ্ট হবে তাই না? আমার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো কুকুরটার উপর। আমি কা'টারি দিয়ে মা'রতে মা'রতে কুকুরটাকে প্রায় মে'রেই ফেলেছিলাম। তাই আপনার মতন কুকুর কে দেখে আমি আর ভয় করি না। ওই কুকুরটার থেকেও আপনার খারাপ অবস্থা করতে পারব।”
আরজুর ঠান্ডা গলায় দেওয়া হুমকিটা রিয়াদ গায়ে মাখলোনা। মেয়ে মানুষকে দেখে আবার কিসের ভয়, তাও আরজুর মতন অসহায় মেয়ে মানুষ। যার আগে পিছে আজ অব্দি কখনো রিয়াদ কাউকে দেখেনি। আর যতদূর খোঁজ পেয়েছে আরজুর আগে পিছে কেউ নেই। এরকম দু একটা কথা তো বলবেই। তবে ক্ষমতা বলা অব্দি, কিছু করতে পারবে না।
আরজুর দেওয়া হুমকিটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে রিয়াদ বলল,
“ওই কুকুর আর আমার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। আর আমার তো কাউকে কামড়ানোর ইচ্ছে নেই, আমি তো ভালোবাসবো তোমায়। দেখো তোমার কাছে টাকা নেই যা আমার কাছে আছে, আর আমার কাছে তুমি নেই যা তুমি আমায় দিতে পারো। তো চলো দুজনে দুজনকে দুজনের প্রয়োজনীয় জিনিসটা দিয়ে দেই।”
ঘৃণায় আরজুর শরীর রি রি করে উঠলো। ইচ্ছে করলো দুটো চড় লাগিয়ে দিতে রিয়াদের গালে। চড়টা হয়তো মা'রতোও, তবে তার আগেই আরজুর কানে ভেসে এলো একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর।
“কি হয়েছে আরু?”
ডাকটা কানে যেতেই রিয়াদ ঘাড় ঘুরিয়ে আরমানের দিকে তাকালো। এর আগে কখনো দেখেনি ছেলেটাকে। ফলস্বরূপ চিনতে পারল না।
আরমান কিছুক্ষণ রিয়াদের দিকে তাকিয়ে থেকে আরজুর দিকে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল,
“কোন সমস্যা আরু? কিছু কি হয়েছে? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
আরজু কয়েক সেকেন্ড আরমানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। সত্যিই কি আরজুর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ওর কিছু একটা হয়েছে? কে জানে। অবশ্য বোঝা না গেলে আরমানই বা কি করে বুঝলো?
আরজু কে চুপ করে থাকতে দেখা আরমান আবারো বলে উঠল,
“কিছু বলবেন আপনি আমায়? কি হয়েছে আমায় বলুন?”
আরজু উত্তর দেওয়ার আগে রিয়াদ আরমান কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,
“আপনি কে?”
আরমান ঘাড় ঘুরিয়ে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“সেম কোয়েশ্চেন। আপনি কে?”
“আমি এই হসপিটালে ডাক্তার, রিয়াদ। আরজুর কে হন আপনি?”
“সেসব জেনে আপনার কাজ কি?”
কথাটা বলে আরমান আরজুর দিকে তাকাতেই আরজু নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“আমি আপনার কি হই আরমান ওনাকে বলুন। আপনি আমাদের সম্পর্কের যে নামটা দিতে চান সেটাই ওনাকে বলুন।”
আরমানের সন্দেহ এবার আরো বাড়লো। আরজু এভাবে কেন বলতে বলল? তবে যেহেতু আরজু পরিচয় দিতে বলেছে তবে দেওয়াই যায়।
তার আগে আরমান আরজুর হাতটা শক্ত করে ধরে রিয়াদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“এটা আমার হবু বউ। বিয়ে করবো ওকে কিছুদিনের মধ্যে।”
বিস্ময়ে রিয়াদের মুখ হা হয়ে গেল। আরজুর পেছনে এমন শক্ত কেউ তবে আছে।
আরমানের জবাবে আরজু সন্তুষ্ট হলো। পুনরায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা আরমান, ধরুন কেউ আমায় বিরক্ত করছে, আমায় আজেবাজে কথা বলছে, অপমান করছে তো তাকে কি করবেন? খু'ন করতে পারবেন না?”
সব ঠিক আছে কিন্তু খু'ন করার কথাটা শুনে আরমান চমকে উঠলো। জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,
“খু'নোখু'নিতে যেতে হবে কেন আরু? যে আপনাকে বিরক্ত করছে তাকে বাঁচিয়ে রেখে আমার ক্ষমতা দেখাবো। এখন নাম বলুন তো কে বিরক্ত করছে আপনাকে? পাঁচ মিনিটে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে এমন ডোজ দেবো জীবনে আর আপনার নাম মুখে আনবে না।”
রিয়াদ কতটুকু কি ভয় পেল সেটা আরজু জানে না তবে মুখ চোখ দেখে মনে হলো আগের থেকে এখন একটু হলেও আরজু কে দেখে ভয় করবে। তবে আরজু এখনই আরমানকে রিয়াদের কথা কিছু বলল না। আলতো হেসে বলল,
“কেউ না। এমনি বলে রাখলাম আপনাকে। চলুন এখান থেকে। আমি কুকুরদের সহ্য করতে পারি না, এলার্জি আছে আমার।”
আরমানের মনে হলো আরজু যেন কথাটা রিয়াদ কে উদ্দেশ্য করেই বলল। যদি রিয়াদ উপস্থিত না থাকতো তবে আরমান হয়তো নিজেকেই ভেবে নিত। তবে আজ আরজু অনেক ভালো ব্যবহার করছে আরমানের সাথে। তাই এসব ভাবার কোন দরকার নেই।
আরমানকে নিজের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরজু আর কোন কথা না বলে নিজেই টেনে আরমান কে নিয়ে বাইরে চলে গেল।
বাইরে আসতেই আরমানের হাতটা ছেড়ে দিয়ে আরজু স্বাভাবিক গলায় বলল,
“দেখুন এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। ওই ডাক্তারটাকে ভয় দেখানোর ছিল জন্য আপনাকে বললাম পরিচয় দিতে। ভাববেন না আপনার মুখ থেকে বউ ডাক শোনার জন্য আমি ম'রে যাচ্ছিলাম। আমাদের সম্পর্কটা প্রথম দিনের মতই আছে। আপনি আমার কেউ না।”
আরমান ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“আমি যে কার কি সেটা বুঝতেই পারছি। থাক আর মুখে বলতে হবে না। এখন চলুন তাে আপনাকে একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। দাঁড়িয়ে আছে মা।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কার মা?”
“আরে আমার মা আর আপনার শ্বাশুড়ি। চলুন।”
আরজু থেমে গেল। পা দুটো যেন আর নড়তে চাইছে না। হা করে আরমানের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে আরমান কি বলল।
আরমান বুঝলো এই মেয়ে নিজ থেকে আর নড়বে না। তাই হাত ধরে আবার টেনে নিয়ে গেল। আর কতদিন যে মেয়েটাকে জোর করে নড়াতে হবে কে জানে।