তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে

পর্ব - ১৯

🟢

“কিরে কি খবর তোর? আমাকে না মে'রে ম'রবি এত সৌভাগ্য আমার হয়নি তাই না?”

আরমানের খোঁচা দেওয়া কথা শুনে তানভীর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“একদম ঠিক বলেছিস। সেজন্যই তো আবার বেঁচে ফিরে এলাম। আমার এই জীবনের সবথেকে বড় ইচ্ছে তোকে মা'রা। সেটা পূরণ না করে ম'রবো নাকি আমি?”

তানভীর এর কথা শুনে আরমান হেসে উঠলো। তাওকীরের ওদের কথাবার্তা একদমই পছন্দ হলো না। দুজনকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,

“তোদের দুজনের কথাবার্তার ধরন কিন্তু দিনকে দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এত খু'ন-খারাবির কথা কেন? আর তানভীর তোকেও বলছি যা করতে পারবি না অযথা সে সব বলিস কেন? তোর ক্ষমতা আছে আরমানকে মা'রার?”

তানভীর বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“একবার শুধু সুযোগটা পেতে দাও তারপর দেখাবো তোমাকে মা'রতে পারি কি পারি না। একদম কে'টে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেব। আমাদের গ্রামে যে নদী আছে না ওই নদীতে ভাসাবো ওকে।”

আরমান পাত্তা দিলোনা তানভীরের কথায়। তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওকে ডিসচার্জ কবে করবে?”

“আর দুদিন লাগবে।”

“দুদিন না, কালকেই ওকে ডিসচার্জ করাবো। কাল দোকানের উদ্বোধন আছে, ওকে যেতে হবে।”

আরমানের কথায় তানভীর তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কক্ষনো যাবো না। তুই ভাবলি কি করে তোর দোকানের উদ্বোধন আর আমি যাব? কি ভেবেছিস আমাকে চাকরের মতন খাটাবি?”

আরমান আলতো হেসে বলল,

“আমার দোকানে না, তোর চাচার দোকানে যাবি। তোর চাচা এখনো বেঁচে আছে। আব্বু আসছে, তাশরিফ আসছে, আম্মু, তনুশ্রী সবাই আসছে। আমাকে না হয় সহ্য নাই করতে পারলি কিন্তু ওরা তো তোর খুব প্রিয়। ওদের জন্যই যাস।”

তানভীর নরম হলো। তবে এখনও একটু ভাব দেখিয়ে বলল,

“ঠিক আছে ঠিক আছে যাবো। তবে মনে রাখিস তোর জন্য না চাচা আর বাকিদের জন্য যাব। তুই আমার কেউ না।”

আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ঠিক আছে। আমি তোর কেউ না।”

________

ফলের দোকানের সামনে বেশ অনেকক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে আছে আরজু। এতগুলো দিন মুনতাসির কে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছে অথচ একটা দিনও কিছু নিয়ে যেতে পারেনি। মাসের শেষের দিকে হওয়ায় হাতে তেমন একটা টাকা পয়সাও নেই। তারমধ্যে ফলের যে দাম, বেশিও তো নিতে পারবে না। যে কোন একটাই নেবে। কিন্তু কোনটা নেবে সেটাই বুঝতে পারছে না। কে জানে মুনতাসির কোন ফলটা খেতে পছন্দ করে।

বেশ অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর আরজু আপেল কিনলো। এরও একটা কারণ আছে।

আগে যখন আরজু অসুস্থ হত, জ্বরের কারণে মুখে খাবারের রুচি থাকতো না তখন একমাত্র আপেলটাই খেতে আরজু পছন্দ করত। তবে ওর বাবা কখনো এনে দিত না। মাঝে মাঝে এনে দিত আরজুর বড় আব্বু, ফিরোজের বাবা।

ওনার আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো ছিল না তাও মাঝে মাঝে এনে দিতেন অল্প করে। অতটুকুই আরজু রেখে রেখে খেত। তাই ভাবলো হয়তো মুনতাসিরের অসুস্থতার সময়ও আপেল খেতে পছন্দ করবে।

হাসপাতালে গিয়ে দেখল সেখানে মুনতাসিরের পুরো পরিবারসহ আরমান উপস্থিত আছে। এত মানুষ দেখে আরজুর অস্বস্তি হলো। ভেবেছিল আজ একটু মুনতাসিরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে এখন কেমন আছে। তবে এত মানুষের মাঝে কি করে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে? অদ্ভুত লাগবে না শুনতে? ওরা কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাবে না আরজুর দিকে?

আরজু থ হয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলো। খেয়াল করল সবাই হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কেউই বুঝতে পারছে না আরজু আসলে করতে চাইছে টা কি।

মুনতাসির হয়তো একবার মনে মনে ভাবল আরজু হয়তো অন্য কারো কেবিনে যেতে নিয়ে মুনতাসিরের কেবিনে চলে এসেছে। তাই এমন হা করে দাঁড়িয়ে আছে।

সবাই চুপ করে থাকতে পারলেও আরমান চুপ থাকতে পারলো না। আরজুর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

“আরে আমার পা'গ'লি যে! আরু দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিতরে আসুন।”

আরমানের এমন ডাকে আরেকটু অস্বস্তি অনুভব করলো আরজু। সবার দিকে তাকিয়ে দেখলো ইরা আর মৃন্ময়ী ঠোঁট টিপে হাসছে। মুনতাসির মাথা নিচু করে বসে আছে। রুবিনা খাতুন ভীষণ স্বাভাবিক। ওনার কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। উনি কেবল মনে প্রাণে দোয়া করছেন যেন ছেলেটা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে।

আরজু আরমান কে পিছনে ফেলে গুটি গুটি পায়ে ভেতরে এলো। আপেল গুলো ইরার হাতে দিয়ে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আসলে আমি তো জানি না আপনি কি খেতে পছন্দ করেন। আবার আপনাকে যে জিজ্ঞেস করবো সেই সাহসও হয়নি। তার কারণ মাসের শেষ, আমার হাতে তেমন টাকাও নেই। যদি আপনার পছন্দের খাবারটা না আনতে পারতাম। আমি দেখেছি অসুস্থ মানুষের জন্য সবাই ফলই নিয়ে যায়। আপেল নিয়ে এসেছি, আপনি খাবেন?”

উপস্থিত প্রত্যেকে হা হয়ে আরজুর কথা শুনলো। এবার আরজু রুবিনা খাতুন এর মনোযোগও কেড়ে নিল। ওনার মতন মানুষও অবাক না হয়ে পারলো না। মুনতাসিরের ঠিক কি বলা উচিত বুঝতে পারছে না।

মুনতাসির কে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু আবারো বলে উঠল,

“আপনি খাবেন না?”

মুনতাসির এবারও কোন উত্তর দিতে পারলো না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে রুবিনা খাতুন এগিয়ে এসে ব্যতিব্যস্ত গলায় বললেন,

“খাবেনা কেন মা? নিশ্চয়ই খাবে। তুমি এত ভালোবেসে এনেছো নিশ্চয়ই খাবে।”

“উনি তো কিছু বলছেন না।”

মুনতাসির এবারে হুশে ফিরলো। অল্প একটু হেসে আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নিশ্চয় খাব আরজু। আমার আপেল ভীষণ পছন্দ। তুমি যে আমার জন্য এনেছো এতেই আমি অনেক খুশি হয়েছি।”

আরজু ছোট্ট করে উত্তরে বলল,

“আচ্ছা।”

কথাটা বলে আরজু চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। দরজা অব্দি গেলোও তবে কেবিনের বাইরে পা রাখতে পারলো না। আরমান হাত ধরে টেনে এনে মুনতাসিরের পাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালো। মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জানো মুনতাসির তোমার বোনের মাঝে কিন্তু অনেক পরিবর্তন এসেছে। ভার্সিটিতে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আমাকে বলেছে আমি শুধুমাত্র মুনতাসির ভাইয়ার বোন। অথচ দেখো সংকোচে আজ তোমাকে জিজ্ঞেসও করতে পারছে না তুমি কেমন আছো, ভাইয়া বলে ডাকা তো দুর। তুমি একটু তোমার বোনকে বলে দাও কেমন আছো?”

আরজুর অস্বস্তি আরও বাড়লো। বাড়তে বাড়তে তুমুল পর্যায়ে চলে গেল। এখন এখানে দাঁড়িয়ে থাকাও ভীষণ কঠিন হয়ে গেল। মনে হচ্ছে হঠাৎ করে যদি আরজু অদৃশ্য হয়ে যেতে পারতো তবে বোধহয় ভালো হতো। অন্তত সবার এই অদ্ভুত দৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে পারতো। তবে আরজু জানে সে সব সম্ভব না।

আরজু কে চুপ করে থাকতে দেখে মুনতাসির আলতাে হেসে বলল,

“তোমার ভাইয়া ভালো আছে আরজু। আর আরমান ভাই শুনুন, আপনি আমার বোনকে বেশি বিরক্ত করবেন না। ও কিন্তু বলে দিয়েছে ও আমার বোন। তার মানে বুঝতেই তো পারছেন আরজুর প্রতি আমার দায়িত্ব কতটা। আর যদি একান্তই বিরক্ত না করে নাই থাকতে পারেন তবে বলবো সরাসরি বিয়ে করে নিন।”

আরজু বিস্ফোরিত নয়নে মুনতাসিরের দিকে তাকালো। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,

“আপনি এসব কথাও বলেন? আপনাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম।”

মুনতাসির ঘাবরে গেল। একটু তো মজা করেই কথাটা বলেছিলো। তবে এই একটা সামান্য কথার জন্য আরজু খারাপ ভেবে নিল।

এদিকে আরজুর মুখ থেকে এমন কথা শুনে আরমান শব্দ করে হেসে উঠলো। ধপ করে বেডের উপর বসে হাসতে হাসতে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

বিজ্ঞাপন

“একদম ঠিক হয়েছে মুনতাসির। কি ভেবেছো যে সারাজীবন ভালো সেজে থাকবে আর আমাকে খারাপ বানাবে? আরু একদম ঠিক বলেছেন। এই ছেলে খুব একটা সুবিধার না। দেখলেন না কেমন লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে। অথচ এমন ভাব দেখাতো যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। আরে আমি তো ওকে বাচ্চা ভাবতাম। নাক টিপলে দুধ বের হবে সে আবার বিয়েও করে নিয়েছে ভাবা যায়!”

আরজু গম্ভীর গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপনি চুপ করুন। উনি বরাবরই ভালো ছেলে। আপনার সংস্পর্শে এসে খারাপ হয়ে যাচ্ছেন। আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না। প্রথম দিন থেকেই আমি জানি উনি ভালো মানুষ, আর তেমনই জানি আপনি খারাপ। ওই যে একটা কথা আছে না সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। ওনার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।”

মুহূর্তের মাঝে আরমানের হাসি থেমে গেলে। এবারে শব্দ করে হেসে উঠল ইরা আর মৃন্ময়ী। ওদেরকে হাসতে দেখে আরজু একটু অবাক হলো। হাসার মতন কোন কথা বলল কি? মনে তো হয় না।

আরমান শুধু অসহায় দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে থাকলো। এতগুলো মানুষের সামনে এভাবে অপমান না করলেই হতো না? আজ আরমান একটু ভালোবাসে জন্য কিছু বলতে পারল না। অন্য কেউ বললে না এই কথা দেখিয়ে দিত আরমান ভালো না খারাপ।

মুনতাসির আরজু কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি তোমার খারাপের জন্য কথাটা বলিনি আরজু। তুমি তো আমায় বিশ্বাস করো, আমি সেজন্যই আরমান ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ের কথাটা বলেছি। আমি জানি ভাই তোমায় ভালোবাসে। এই বিষয়ে নিশ্চিত যে ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ে হলে তুমি খারাপ থাকবে না। সেজন্যই বলছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পর্কটাকে একটা হালাল নাম দাও। আল্লাহর রহমত থাকবে সেই সম্পর্কে।”

আরজু আর সেখানে দাঁড়াতেই পারলো না। বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। মুনতাসির ব্যতিব্যস্ত গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমি কি ভুল কিছু বলে ফেললাম আরমান ভাই? গিয়ে দেখুন না আরজু রাগ করলো নাকি আবার? এখনই মনে হয় এই কথাটা বলা আমার উচিত হয়নি।”

আরমান মুচকি হেসে বলল,

“একদম ঠিক কথা বলেছো ছেলে। তোমার কথা শুনে বিয়ে করার ইচ্ছে জেগে গেল। এখন গিয়ে দেখি আমার পা'গ'লি'টাকে রাজি করাতে পারি কিনা।”

কথাটা বলে আরমান বেরিয়ে যেতে নিয়ে আবারও থেমে গেল। পিছন ফিরে তাকিয়ে মুনতাসির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কাল সকালে কিন্তু তোমার ডিসচার্জ করাবো আমি। তারপর দোকানে নিয়ে যাবো আমার সাথে।”

মুনতাসির মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই আরমান চলে গেল। দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। ভাবলো আরজু নিশ্চয় এতক্ষনে চলে গেছে। এবং হলোও তাই।

আরমান বাইরে এসে দেখলো আরজু বেশ অনেক দূরেই এগিয়ে গেছে। আরমান দৌড়ে গেল সেদিকে। আরজুর কাছাকাছি যেতেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল, তবে হাফাচ্ছে। আরজু নিজের হাঁটা থামালো না। আড় চোখে একবার আরমান কে দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল,

“বাইক আনেননি?”

“না আরু।”

“কেন?”

“খারাপ হয়ে গিয়েছে। ঠিক করতে হবে।”

কথাটা আরমান মিথ্যে বলল। তবে আজ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছে। আরমান জানে যদি বাইক আনেও তবুও হাজার দিন চেষ্টা করলেও নিজের বাইকে আরজু কে তুলতে পারবেনা। আরমান তো একটু আরজুর সাথে হাঁটতে চায়, একটু সময় কাটাতে চায়। আর ঠিক সেই কারণেই বাইক আনেনি। তবে আরজু কে এই কথাটা বলা যাবে না। কে জানে আবার যদি খারাপ ভেবে নেয়।

তবে আজ আরমান ধরা পড়েনি। আরজু বিশ্বাস করে নিয়েছে একবারেই ওর কথাটা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরজু আবারো প্রশ্ন করল,

“আপনার কাছে কি টাকা নেই ঠিক করার মতন সেজন্য ঠিক করছেন না? সেজন্য হাঁটছেন?”

আরমান জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বলল,

“হ্যাঁ। আসলে এই মাসে একটু টানাটানি চলছে। গ্রাম থেকে বাবা টাকা পাঠায়নি।”

আরজু তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,

“আপনার খুব সমস্যা চলছে? টাকা লাগবে? আমার কাছে এখন নেই কিন্তু দুদিন পর আমি ধার দিতে পারব আপনাকে। আপনার বাড়িতে খোঁজ নিয়েছেন তো? আপনার বাবা-মার সমস্যা হচ্ছে না তো কোন? আমি একটু বেশি করে টাকা ধার দিয়ে দেব। দরকার হলে ওনাদেরকে একটু পাঠিয়ে দেবেন।”

আরমান আরজুর দিকে তাকিয়ে দেখল গুরুতর ভঙ্গিতে আরজু কথাটা বলছে। আরমানের খারাপ লাগলো। কেন যে মিথ্যে বলতে গেল। আরজু তো সত্যি ভেবে নিয়েছে। কত ভালো মন মেয়েটার, কত পরিষ্কার মন। আরমান তো টাকা চায়ওনি।

আবার শুধু আরমানের কথাই চিন্তা করছে না সেই সাথে চিন্তা করছে আরমানের বাড়ির অবস্থা। অথচ আরমান জানে আরজু নিজেই অনেক কষ্ট করে চলে। একটু আগেই তো হাসপাতালে বলে এলো মাসের শেষ, হাতে টাকা নেই। দুদিন পরে হয়তো টাকা পাবে। না জানি নিজের কত প্রয়োজন আছে। অথচ তার ভেতর থেকেও আরমানকে দিতে চাইলো।

আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু আবারো বলে উঠল,

“দেখুন এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আপনার বাবার কষ্ট হবে ভেবে যে আপনি ওনার থেকে টাকা চাননি এটাই তো অনেক বড় কথা। কয়জন ছেলে মেয়ে বোঝে বলুন তো নিজের বাবা-মায়ের পরিস্থিতি? আপনি দুদিন অপেক্ষা করুন আমি আপনাকে টাকা ধার দেব। আপনি সুযোগ বুঝে আমাকে আবার ফেরত দিয়ে দেবেন।”

আরমান আলতাে হেসে বলল,

“না আরু লাগবে না। আমার কাছে জমানো টাকা আছে আমি বরং ওগুলো দিয়ে দেবো আমার বাবা মাকে। আপনি ভাববেন না।”

আরজু আর কিছু বলল না। আবারো হাঁটা ধরল। হঠাৎ করে আরজু হোঁচট খেল। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেছে। অসহায় কন্ঠে বলল,

“এখনই এটাকে ছিঁড়ে যেতে হলো!”

আরজুর মুখের দিকে তাকাতেই আরমান অসহায়ত্ব দেখতে পেল। কে জানে এখন এই স্যান্ডেল ছাড়া হোস্টেল অব্দি ফিরে যাবে কি করে সেই অসহায়ত্ব নাকি আবারো নতুন করে একটা স্যান্ডেল কেনার জন্য টাকা খরচ করতে হবে সেই অসহায়ত্ব!

আরজু খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটতে শুরু করলে আরমান থামিয়ে দিয়ে বলল,

“এত কষ্ট করে হাঁটতে হবে না আপনাকে। ধরুন আমার স্যান্ডেলটা পরে নিন।”

আরজু আপত্তি জানিয়ে বলল,

“লাগবে না। সামনে মুচি আছে ওখান থেকে স্যান্ডেলটা ঠিক করে নেব।”

“বললাম তো আমারটা পরে নিন।”

কথাটা বলে আরমান নিজের স্যান্ডেলটা খুলে দিল। কি ভেবে যেন আরজু পরে নিল। কেন পরলো জানেনা তবে পরতে ইচ্ছে করলো। নিজে আবার হাতে নিজের স্যান্ডেলটা তুলে নিতে ধরলে আরমান বাধা দিল। আরজু নিজের ছেঁড়া স্যান্ডেলটা হাতে নেওয়ার আগেই আরমান নিজেই হাতে নিল। অন্য হাতে আরজুর হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটা দিল।

আরজু জানে না কেন তবে ওর ভালো লাগলো। কেউ বোধহয় কখনও এভাবে শক্ত করে আরজুর হাতটা ধরেনি, কেউ কখনো আরজু কে নিয়ে এত ভাবোনি।

মুচির কাছে স্যান্ডেলটা দিতেই তিনি নাক শিটকে বললেন,

“আপা, এরে আর কত জোড়া তালি মারুম? দুইদিন আগেই তো সেলাই দিয়া নিয়া গেলেন। এইবারে আর সেলাইয়ে কাম হইব না। এইবার একটা নতুন কিনা লন।”

আরজু গম্ভীর গলায় বলল,

“স্যান্ডেলটা কি আপনি পরবেন নাকি নতুন কেনার জন্য টাকা আপনি দেবেন? দুটাের কোনটাই আপনার কাজ না। আপনার কাজ ঠিক করা, সেটাই করুন।”

মুচির মুখ থেকে হাসিটা সরে গেল, সেই সাথে আরমানের মুখ থেকেও। নিজের হাতের মধ্যে থাকা আরজুর হাতটা ছেড়ে দিল। ভাবলাে আরজুর পরবর্তী আক্রমণের শিকার না আবার ওই হয়। আরজু একবার নিজের হাতের দিকে তাকালো। কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আরমান আরজুর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আরু, আমায় যে টাকাটা ধার দিতে চাইলেন না ওখান থেকে কিছু টাকা দিয়ে নিজের জন্য একটা স্যান্ডেল কিনে নেবেন।”

আরজু আবারও গম্ভীর গলায় বলল,

“যখন প্রয়োজন মনে করবো কিনে নেব। অনেকদিন থেকেই নিজের প্রয়োজনগুলো নিজে বুঝেই কিনছি, কেউ কখনো কিছু বলেনি। এখনো আমাকেই আমার প্রয়োজনগুলো বুঝে নিতে দিন।”

আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। বুঝতে পারলো এখন আর কিছু না বলাই ভালো।

বিজ্ঞাপন
তোর পিরীতে পাগল হইলাম রে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় চমৎকার একটি সামাজিক গল্প