ছেলের শোকে কল্পনা চিৎকার করে কাঁদছেন। ওনাকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত হিমি। যদিও হিমি নিজেই কাঁদছে তবে শব্দ হচ্ছে না। আপাতত কল্পনাকে সামলানোর জন্য যতটা সম্ভব নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
কল্পনার পাশে চুপচাপ বসে আছেন মুহিব হোসেন। আর তাওকীর বিরতিহীন ভাবে করিডরে পায়চারি করছে। চোখে মুখে তার চিন্তার ছাপ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটা জমেছে।
এমন সময় হন্তদন্ত পায়ে সেখানে এলো আরমান, মহিন হোসেন আর জেবা। মহিন হোসেন সোজা গিয়ে নিজের ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে চিন্তিত গলায় বললেন,
“ভাইজান, তানভীর কেমন আছে?”
মুহিব হোসেন মাথাটা তুলে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দুর্বল গলায় বললেন,
“ডাক্তার দেখছে।”
যদিও কল্পনাকে জেবার পছন্দ না তবে এমন একটা মুহূর্তে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে হলো। মনুষ্যত্ববোধ থেকে হলেও ওনাকে সান্ত্বনা দেয়া উচিত বলে ওনার পাশে গিয়ে বসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো। তবে কল্পনার সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। তিনি আহাজারি করে সমানে ছেলের জন্য কেঁদেই যাচ্ছেন।
আরমান তাওকীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“তাওকীর ভাই কি করে হলো এমনটা?”
“ট্রাক চালক পালিয়েছে।”
আরমান সন্দেহী গলায় বলল,
“এটা কি ইচ্ছাকৃতভাবে করানো হয়েছে?”
“হুম।”
আরমান অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“কিন্তু তানভীরের সাথে এমনটা কে করবে? ওর তো কারো সাথে শত্রুতা আছে বলে আমার জানা নেই। আমি তো খুঁজেও পাচ্ছিনা এমন কাউকে।”
তাওকীর গম্ভীর গলায় বলল,
“আমারও একই প্রশ্ন কে করবে তানভীরের সাথে এমনটা? আচ্ছা তাওসিফ তোর ওই বন্ধু মুনতাসিরের এখন কি অবস্থা?”
“ভালো আছে এখন।”
উত্তরটা দেয়ার পর আরমানের কেমন যেন ব্যাপারটা একটু গোলমেলে লাগলো। তাওকীর হঠাৎ করে মুনতাসিরের খবর কেন জানতে চাইলো? তাও এমন একটা পরিস্থিতিতে যখন আরমান অনুসন্ধান করতে ব্যস্ত যে তানভীরের এমন কোন শত্রু আছে কি না যে ওকে ইচ্ছাকৃতভাবে মা'রতে চায়? তার মানে কি তাওকীর মুনতাসিরকে সন্দেহ করছে?
আরমান আবারও সন্দেহী গলায় বলল,
“তুমি কি মুনতাসির কে সন্দেহ করছো?”
তাওকীর অল্প একটু হেসে বলল,
“আমি তো এখনো কিছু বলিনি তবে তোর কেন এটা মনে হলো? তবে কি ওকে সন্দেহ করার মতন কোনো কারণ আছে?”
আরমানও আলতো হেসে বলল,
“আমায় তোমার কথার প্যাঁচে ফেলার কোন দরকার নেই ভাই। তুমি কেন এই মুহূর্তে মুনতাসিরের খোঁজ করতে পারো সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। চিনি তো তোমায়।”
“তবে আমার কেন তোকে অচেনা লাগছে?”
আরমান কপাল কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“মানে এমনটা নয় তো যে মুনতাসিরের তানভীরের অপরাধটা ক্ষমা করে দেওয়ার পেছনে কোন কারণ ছিল?”
“কি কারণ?”
“এক নিজের মহত্ত্ব দেখানো। প্রথমে মহান হয়ে উঠল তোর চোখে, আর তানভীরকে আরো বেশি নিচে নামাতে পারল। আর দ্বিতীয় তানভীর কে আইনের দ্বারা শাস্তি না দিয়ে হয়তো নিজেই শাস্তি দিতে চেয়েছিল।”
আরমান এবারে কিঞ্চিৎ রাগান্বিত গলায় বলল,
“প্লিজ তাওকীর ভাই তুমি মুনতাসির কে চেনো না জন্য ওর সম্পর্কে এই কথাগুলো বলতে পারছ। মুনতাসির এর মাঝে কখনোই প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যাপারটা ছিল না।”
“বিশ্বাস হলো না তোর কথাটা।”
আরমান অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“তুমি আমায় সন্দেহ করছো?”
তাওকীর মৃদু বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তোকে সন্দেহ করছিনা তাওসিফ। শুধু জিজ্ঞেস করছি মুনতাসির কে আড়াল করার জন্য তুই কিছু করছিস না তো? সত্যি করে বল।”
“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ভাই? কি আজেবাজে কথা বলছো এসব? মুনতাসির এখনো হাসপাতালে ভর্তি। ছেলেটা এখনো ঠিকঠাক করে হাঁটতে পারছে না আর তার সম্বন্ধে তুমি এসব বলছো? আগে খোঁজ নাও কে করতে পারে, তানভীর সুস্থ হলে ওর থেকে শোনো আমাদের অজান্তে ও নিজের কোন শত্রু তৈরি করেছিল কিনা তারপরে নাহয় দোষারোপ করো প্লিজ।”
আরমান কথাগুলো এবার বেশ জোরে বলায় সবার কান অব্দিই পৌঁছালো। মহিন হোসেন তাড়াহুড়ো করে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“কি হয়েছে?”
আরমান নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত গলায় বলল,
“কিছু না।”
এতক্ষণে আরমানের উপরে নজর পড়লো কল্পনার। উনি তো অনেকক্ষণ থেকেই অপেক্ষা করছিলেন আরমানের আশার। তবে ছেলের শোকে এতটাই কাতর হয়ে পড়েছিলেন যে আরমান কে খেয়াল করেননি। বসা থেকে উঠে আরমানের দিকে তেড়ে গিয়ে হিংস্র গলায় বললেন,
“তুমি… তুমি মে'রেছ আমার ছেলেটাকে তাই না? ও তো তোমারই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
কল্পনার মুখ থেকে হঠাৎ এমন কথা শুনে মহিন হোসেন চমকে উঠলেন। তবে আরমান চমকালো না। যেখানে তাওকীরই ওকে সন্দেহ করছে সেখানে কল্পনা যে সন্দেহ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। যার প্রতি আরমানের ভরসা ছিল সেই তো আরমানের ভরসাটা রাখলো না। আর কল্পনার উপরে তো কোনো আশাই রাখেনি।
তবে মহিন হোসেন ব্যাপারটা কোনমতেই মানতে পারলেন না। আরমান তো ঘরের ছেলে, ছোটবেলা থেকে আরমানকে দেখে আসছে তবুও কি করে আরমানের সম্বন্ধে এই কথাটা বললেন? মৃদু রাগী স্বরে কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“বড় ভাবি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা তাই বলে এভাবে হুটহাট তাওসিফকে দোষারোপ করবেন না। ওকে দোষ দেওয়াটা আপনার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
কল্পনা আবারও হিংস্র গলায় বলল,
“তুমি চুপ করো মহিন। তুমি তো তোমার মেজ ভাইয়ের ছেলের কোন দোষই দেখতে পাও না। তবে আমি জানি ওই মে'রেছে আমার ছেলেকে। আমার ছেলেটাকে তো দু চোখে সহ্য করতে পারে না। বাইরের ছেলেপেলের জন্য আমার ছেলেটার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, দুদিন আগে বাড়ি এসে মে'রেছে সবই তো জানো তুমি। তবে তারপরেও ওকে আড়াল করার চেষ্টা করছো কেন?”
“আমি কাউকে আড়াল করার চেষ্টা করছি না। আপনি নিজেও এই কথাটা খুব ভালো করেই জানেন যে তাওসিফ তানভীরকে ঠিক কতটা স্নেহ করে। মাথাটা ঠান্ডা করে গিয়ে বসুন আর ছেলের জন্য দোয়া করুন। এমন একটা মুহূর্তে তাওসিফ কে দোষারোপ করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ না।”
কল্পনা তো কারো কথা শোনার পাত্রী নন। তিনি একবার যখন মনে করেছেন যে এইসব কিছুর পেছনে আরমান আছে তার মানে আরমানই আছে এমনটাই তার ধারণা। তিনি নিজের ধারণার বাইরে কোন কিছু ভাবতে পছন্দ করেন না। পূর্বের থেকেও এবার দ্বিগুণ বেশি হিংস্র গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“শোনো তাওসিফ, যদি আমার ছেলের কিছু হয়েছে তোমাকে আমি ছাড়বো না বলে দিলাম। তোমার এই ভালো মানুষের মুখোশ আমি টেনে খুলে ফেলব।”
আরমানের খুব কষ্ট হলো আজ। হ্যাঁ এতদিন অনেক রকম ভাবে অনেক কিছুর জন্যই দোষারোপ করেছে কল্পনা ওকে তবে কখনো এতটা কষ্ট হয়নি যতটা আজ হচ্ছে। তার মাঝে তাওকীরও ভুল বুঝলো আরমানকে। ওরা ভাবলো কি করে যে আরমান তানভীরের কোন ক্ষতি চাইবে? আরমান তো সবসময় চেয়েছে তানভীরকে শুুধরে দিতে, ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে। তানভীরের অজান্তেই না জানি কতবার ওকে বাঁচিয়েছে কত কিছুর থেকে। আর সেই আরমান কিনা তানভীরের ক্ষতি করবে?
কল্পনাকে কিছু বলার ইচ্ছেই হলো না আরমানের। সরাসরি গিয়ে মুহিব হোসেনের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে কাতর গলায় বলল,
“বড় আব্বু তোমারও কি মনে হয় আমি এই কাজটা করেছি? তোমার সত্যি মনে হয় আমি তানভীরের ক্ষতি করবো?”
মুহিব হোসেন আরমানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আমার ছেলে অসুস্থ তাওসিফ। জীবন ম'র'ণে'র ব্যাপার সেজন্য আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। তবে তার মানে এটা না আমি তোমায় সন্দেহ করছি।”
“তাহলে বড় আম্মুকে কিছু বলছো না কেন?’
“ওই যে বললাম আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি।’
“বিশ্বাস করো তো তুমি আমায়?”
“বিশ্বাস না করলে তোমার কাঁধে আমার হাতটা থাকতো না।”
আরমান একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক কেউ একজন তো অন্তত ওকে বিশ্বাস করেছে।
মুহিব হোসেন হিমি কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন,
“হিমি তোমার শাশুড়ি মা কে সামলাও। আর কল্পনা তোমাকেও বলছি ছেলের শোকের থেকে বেশি তোমার এই অমানবিক আচরণগুলো না দেখালেও পারো। চুপচাপ বসো।”
কল্পনা তাও থামলেন না। আরো অনেকক্ষণ চেঁচামেচি করলেন। তবে আরমান আর সেখানে থাকতে পারলো না। মহিন হোসেন আটকাতে ধরলে জেবা ওনাকে বাধা দিয়ে বললেন,
“তাওসিফের এখানে না থাকাই ভালো।”
_________
হসপিটালে নিজের কাজের শিফটের সময় শেষ হতেই আরজু বেরিয়ে এলো হোস্টেলে ফেরার জন্য। বাইরে এসে আরমানকে দেখে থমকে গেল আরজু। পায়চারি করছে ছেলেটা। একবার এদিকে যাচ্ছে তো আবার ওদিকে যাচ্ছে। আরজু জানে আরমান এখানে ওর জন্যই এসেছে, ওর সাথেই দেখা করার জন্য এসেছে। কেননা মুনতাসিরের সাথে দেখা করার হলে তো ওপরে যেত। তবে যেহেতু যায়নি তার মানে আরজুর সাথেই দেখা করতে এসেছে।
আরজু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল তবে আরমান খেয়াল করলো না। আরমানের ওকে খেয়াল না করার বিষয়টা আরজুর পছন্দ হলো না। যদি ওর জন্যই অপেক্ষা করে তবে তো খেয়াল করা উচিত যে আরজু আসছে কি আসছে না। এভাবে পায়চারি করলেই কি হয়ে যাবে নাকি?
হঠাৎ করে আরজুর মনে হলো যে আরমান এখানে ওর জন্য আসেনি। অন্য কোন কারণে এসেছে। আর যেহেতু আরজুর সাথে দেখা করতে আসেনি তাই আর ওর সাথে কথা বলার কোন প্রয়োজনও নেই। নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চুপচাপ সোজা হেঁটে চলে যেতে নিলে আরমানের সাথে ধাক্কা খেল। অবশ্য ধাক্কা খাওয়াটা নিতান্তই কাকতালীয় ব্যাপার নাকি আরজু ইচ্ছে করে এমনটা করেছে সেটা আরজু ব্যতীত আর কেউ জানে না।
আরমান খেয়াল করলো আরজু কে তবে আরজু এমন একটা ভাব দেখালো যেন আরমান কে টেরই পায়নি। নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো চলে যেতে ধরলে আরমান হাত টেনে ধরল। তাড়াহুড়ো কন্ঠে বলল,
“চলে যাচ্ছেন কেন?”
আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“এখানে তো থেকে যাওয়ার কথা না আমার।”
“ওমা! আমায় চোখে পরলো না?”
“আমার চোখের পাওয়ার কমে গেছে।”
আরমান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল,
“এমন ত্যাড়ামো করছেন কেন আরু?”
আরজু আবার নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“আমি ত্যাড়া তাই।”
আরমানের এবারও অবাক হওয়ার কথা ছিল তবে হলো না। বরং দাঁত বের করে হেসে বলল,
“এই আরু আপনি তো দেখছি অনেক বদলে গেছেন। আজকাল কেমন করে আমার সাথে কথা বলেন দেখেছেন? একদম ইয়ের মতন করে কথা বলেন।”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“ইয়ে কি?”
আরমান মুখে একটু লজ্জা ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“যাহ এসব মুখে বলা যায় নাকি? আমার কি লজ্জা করে না?”
আরজু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“ছেলেদের লজ্জা পাওয়ার ব্যাপারটা খুবই বাজে একটা স্বভাব। ছেলেরা লজ্জা কেন পাবে?”
“ও তার মানে আপনি চাইছেন আমি নির্লজ্জ হই? কিন্তু কথা হলো মেয়েরা লজ্জা পায় তবে আমাদের সম্পর্কে আপনি তো লজ্জা পান না। আমিও যদি লজ্জা না পাই তাহলে ব্যাপারটা কেমন সটান হয়ে যায় না? দুজনেই যদি লাগাম ছাড়া কথাবার্তা বলি তবে তো প্রেমটা জমবে না আরু।”
আরজু আর এসব প্রেম-টেমের কথার দিকে গেল না। কাট কাট গলায় বলল,
“নিজের মূল্যবান সময় আমার পিছনে কেন নষ্ট করছেন সেটা বলুন?”
আরমান আলেতা হেসে বলল,
“আমার সেই মূল্যবান সময়ের থেকেও আপনার মূল্য বেশি তাই।”
“শুকনো কথায় চিরে ভিজবে না”
“তবে ভেজা কথায় ভিজিয়ে দেবো।”
আরজু এক ঝটকায় আরমানের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা ধরল। আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরজুর পিছন পিছন হাঁটা ধরলো।
আরজু বুঝতে পারলো ওর পিছন পিছন আরমান আসছে কিন্তু কিছু বলছে না। পাত্তা দিল না ঠিক। ভাবলো হাঁটতে হাঁটতে এমনি থেমে যাবে। বড়লোকের ছেলে! ওর কি এত হাঁটার অভ্যাস আছে! সারাদিন তো বাইক নিয়ে ঘোরাফেরা করে। তবে আরজুর অনেক অভ্যাস আছে হাঁটার।
বেশ অনেকটা সময় হাঁটার পরেও আরজু খেয়াল করলো আরমান ওর পেছন পেছনই আসছে। বিরক্ত লাগলো আরজুর, আবার ভালোও লাগলো।
কিছুদূর যেতেই একটা চায়ের দোকান নজরে পড়লো আরজুর। কি ভেবে যেন থেমে গেল। পিছন ফিরে তাকিয়ে আরমান কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,
“চা খাওয়াবো আপনাকে, খাবেন?”
আরমান চমকে উঠলো। হা করে তাকিয়ে থাকলো আরজুর দিকে। আরজু ভাবছে একবার শুধু আরমান নিষেধ করুক তারপর আরজু ওকে বোঝাবে অবহেলা ঠিক কাকে বলে।
তবে তেমন কিছুই হলো না। আরমান হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,
“আপনি বললে তো বি'ষও খেয়ে নেব আরু। আর চা খাবো না এটা হতে পারে?”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“এটা বারাবাড়ি হয়ে গেল না?”
আরমান নিজের হাসি থামিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল,
“সরি। আর বলবো না। চলুন চা খাই।”
আরজু আর কোনো কথা বাড়ালো না। দুকাপ চা অর্ডার দিয়ে বেঞ্চে গিয়ে বসলো। আড়চোখে আরমান আরজুর দিকে তাকাতেই দেখলো আরজু নিজের ওড়না হাতে প্যাঁচাতে ব্যস্ত। আরমানের মনে হলো অস্বস্তি হচ্ছে বোধহয় আরজুর। তাই আরজুর পাশ থেকে উঠে গিয়ে আরজুর মুখোমুখি বেঞ্চটার উপরে বসলো। আরজু একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল।
কিছুটা সময় চুপ থাকার পর আরমান কাতর গলায় বলে উঠলো,
“আজ আমার মন ভালো নেই আরু।”
আরজুর ওপর আরমানের কথাটা তেমন একটা প্রভাব ফেলল না। আরজু স্বাভাবিকভাবে বলল,
“তো?”
আরমান পূর্বের থেকেও বেশি কাতর গলায় বলল,
“তো আমার মনটা একটু ভালো করে দিন না আরু।”
“অদ্ভুত তো! আমি কি করে আপনার মন ভালো করে দেবো?”
আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তাও ঠিক বলেছেন। আপনি তো আর আমায় ভালোবাসেন না যে আমার মনটা ভালো করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। থাক আপনাকে আর কষ্টও করতে হবে না।”
কথাটা বলে আরমান থেমে গেল। মনটা সত্যি খারাপ হয়ে গেল। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আরজু একবার আড়চোখে তাকালো আরমানের দিকে। মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে মনটা খারাপ হয়ে গেছে। আরজুর খারাপ লাগলো তবে আরমান যেটা চাইছে সেটাও আরজুর পক্ষে করা সম্ভব না। যার নিজের মনেই সারাদিন বিষাদ ভরে থাকে সে কি করে অন্যের মনে আনন্দ আনতে পারে? হাসানোর দায়িত্বটা তো আরমান পালন করে, মন খারাপ হলে সেই মনটা ভালো করার দায়িত্ব তো আরমান পালন করে তবে আজ হঠাৎ করে যদি সেই দায়িত্বটা আরজুকে দিতে চায় তবে ও কি ভয় পাবে না? অবাক হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়?
আরমানও ছেড়ে দিয়েছে আশা। আরজুর মতন কাঠখোট্টা মানুষের থেকে যেখানে সান্ত্বনাই আশা করা যায় না সেখানে আরমান ভাবলই বা কি করে ওর মন খারাপের কথা শুনে আরজুুর মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা যাবে? কিংবা মেয়েটা ওর মন ভালো করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠবে? তাও যদি আরজু আরমান কে ভালোবাসতো তবে একটা কথা ছিল কিন্তু যেখানে ওর মনে আরমানের প্রতি কোন অনুভূতিই নেই সেখানে এসব আশা করা যায় না।
“মন খারাপ হলো এমন এক জিনিস যাকে বাড়তে দিলে বাড়বে, আর বাড়তে না দিলে বাড়বে না। সবটাই নির্ভর করছে আপনার উপর। আপনার পরিস্থিতি কখনোই সম্পূর্ণ আপনার অনুকূলে থাকবে না। একটা বিষয়ে অনুকূল থাকলেও বাদ বাকি দশটা বিষয়ে আপনার অনুকূলে থাকবে না। মন খারাপ এমন একটা শব্দ যা প্রতিনিয়ত প্রতিটা মানুষের সাথে থাকে। যারা বলে যে আমার কখনো মন খারাপ হয় না কিংবা আমার মন খারাপ নেই তারা এই শব্দটাকে এড়িয়ে চলতে চায়। আর দিনশেষে জীবনে তারাই জিতে যায়। আর যারা নিজের সেই মন খারাপ গুলো দূর করার চেষ্টা না করে অন্যের কাছে গিয়ে এর সমাধান খোঁজে দিনশেষে আপনার মতন তারাই মন খারাপ নিয়েই বসে থাকে।”
আরমান চমকে তাকালো আরজুর দিকে। এই ব্যাপারে যে আরজুর মুখ থেকে কোন কথা বের হবে সেটা তো আশাই করেনি। তবে আরজু কি ওকে সান্ত্বনা দিল? আরমানকে কি বোঝাতে চাইলো যে যত মন খারাপ দেখাবে সমস্যা তত বাড়বে? নিজের সমস্যাগুলোর সমাধান নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে, অন্যের কাছে সমাধান খুঁজতে গেলে সমস্যা আরও বাড়বে, জীবন আরও জটিল হবে?
আরমান কিছু বলতে চাইলো তবে তার আগেই আরজু আবারো বলে উঠলো,
“এটা ভাবার দরকার নেই যে আমি আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছি। সান্ত্বনা শব্দটা আমার সাথে যায় না। আমি শুধু আপনাকে বোঝাতে চাইলাম নিজের মন খারাপের কথা অন্যকে বলে লাভ কি? দেখুন আপনি আমার কাছে এসে মনটা ভালো করতে চাইলেন অথচ আমি কিন্তু আপনার মনটা আরও বেশি খারাপ করে দিলাম তাই না?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“কোনো ব্যাপার না আরু। তবে আপনার কাছে সুখ খুঁজতে চাওয়াও কি অপরাধ আরু? আমি তো ভালোবাসি আপনাকে।”
আরজু এবার একটু বিরক্তিকর গলাতে বলল,
“সব কথায় ভালোবাসা শব্দটাকে টেনে আনেন কেন? ভালোবাসা মানে কি কোন দায়বদ্ধতা? আপনি আমাকে ভালোবাসেন বা আমি কাউকে ভালোবাসি তার মানে কি এটাই যে আমাকে তার মন খারাপ গুলো দূর করার দায়িত্ব বাধ্য হয়ে নিতে হবে? সম্পর্কে বাধ্যবাধকতা কেন থাকবে? ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষটার প্রতি কি মন থেকে এই দায়িত্ব গুলো পালন করা যায় না?”
আরমান তাড়াহুড়ো গলায় বলল,
“না আরু আমি আপনাকে বাধ্য করিনি। আমি জানি আপনি এখনো আমাকে ভালোবাসেন না। হয়তো আমার মাঝেই ভালোবাসার মতন কিছু নেই কিন্তু তাই বলে আমি আপনাকে জোর করছি না। এমনি বলেছিলাম। আপনি খারাপ ভাববেন না।”
আরজুর বুক চিরে এবার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তবে সেটা আরমান কে বুঝতে দিল না। কন্ঠটা একটু নরম করে বলল,
“দেখুন আরমান আমার থেকে এসব আশা করবেন না। আমি পারিনা এসব। আমি জানিনা কি করে অন্যের মন খারাপ দুর করতে হয়। সারাদিন তো আমি নিজের খারাপ মনটা সাথে নিয়ে ঘুরি। আপনাকে কখনো ভালোবাসতে পারব কিনা আমি জানিনা, আমি চেষ্টাও করবো না। তাই বলছি আমার থেকে এসব আশা রাখবেন না।”
“রাখছি না আশা।”
“বুদ্ধিমানের মতন কাজ করছেন। তাই বলছি আমাকে জোর করবেন না। এমন কিছু বলবেন না যেন আমার এই বিষয়গুলোকে বাড়তি একটা চাপ মনে হয়। যদি আমার ইচ্ছে হয়, যদি আপনার মন খারাপ আমার উপরে প্রভাব ফেলে তবে আমি অবশ্যই চেষ্টা করতে পারি সেটা দূর করার। তবে বলে বলে করানোর কি দরকার? এতে তো আপনার নিজেরও একটা আত্মসম্মানের ব্যাপার থাকে তাই না?”
“বুঝতে পেরেছি। আপনি শান্ত হন এবার।”
আরজু থামলো। আরমানও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবার চায়ের কাপে চুমুক দিল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আরজুর মাথায় কিছু একটা ঘুরলো। কিছু কথা হঠাৎ করে বিরক্ত করা শুরু করলো যা এতক্ষণ করছিল না। অনেকবার নিজের মনকে বোঝালো যে আরমান কে এই প্রশ্নটা করবে না, কোনমতেই করবে না কিন্তু অবশেষে না করে আর থাকতেও পারল না।
আরমানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি তো বলেন আপনি আমায় ভালোবাসেন। মানে আপনি বলেন। আবার একটু আগে বললেন আপনার মনও খারাপ। তো কথা হচ্ছে যদি আপনি আমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাকেন তবে আমি সাথে থাকার পরেও কেন আপনার মন খারাপ হবে? আপনার মনটা আলাদা করে ভালো করতে হবে কেন?”
আরজু ভেবেছিল আরমান হয়তো বিচলিত হবে ওর এই প্রশ্নে কিংবা আরমানের মাঝে অস্থিরতা দেখা যাবে। হয়তো বা কিছু লুকোনোর চেষ্টা করবে আরজুর থেকে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং আরমান আলতো হেসে বলল,
“আপনার সাথে থাকলে সেদিনই আমার খারাপ
মনটা পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে যেদিন আমার
আর আপনার দুজনের মনটা এক হয়ে যাবে,
যেদিন আমাদের দুজনের মন খারাপের কারণগুলো এক হয়ে যাবে, মন ভালো করার কারণগুলোও এক হয়ে যাবে। যেদিন আপনি আমার না বলা কথাগুলো বুঝবেন, আর যেদিন আমিও আপনার সব না বলা কথা বুঝে যাব।”
আরমানের এক কথাতেই আরজু সন্তুষ্ট হলো। তাই পাল্টা আর কোন প্রশ্ন করলো না।
চা খাওয়া শেষে আরজুই বিল দিল। আরমান নিজেই দিতে চেয়েছিল বিলটা তবে আরজুর গম্ভীর কণ্ঠ শুনে দ্বিতীয়বার আর বলার সাহস হয়নি।
“আর তো মনে হয় আপনার সাথে যেতে দেবেন না?”
আরমানের প্রশ্নটা শুনে আরজুর একটু হাসি পেল, তবে হাসলো না। মুখে গম্ভীর ভাবটা ফুটিয়ে রেখে বলল,
“না প্রয়োজন নেই। নিজের রাস্তায় যান। তবে আপনাকে কিছু বলার আছে।”
আরমানের নেতিয়ে যাওয়া মুখটায় হাসি ফুটে উঠলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“হ্যাঁ আরু বলুন।”
আরজু নিজের ভাবনায় কথাগুলো সাজালো। ভাবেনি যে আজ আরমানের সাথে দেখা হবে তাই কথাগুলো আজ আরমানকে বলার কোন উদ্দেশ্যও ছিল না। যার ফলে সাজানোও হয়নি। কথাগুলো সাজানো শেষে আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“যতটুকু আপনাকে দেখেছি তাতে আমার মনে হয়েছে আপনি মানুষটা খারাপ না। তবে অন্যকে দিয়ে আমায় মিথ্যে বলালেন কেন? আমার পিছনে লোক লাগালেন কেন?”
আরমান ভ্যাবাচ্যাকা খেল। ও কখন এসব করলো? আরজুর পেছনের লোকই বা লাগালো কখন? মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি মেয়েটার?
“কি বলছেন এসব আরু? আমি লোক লাগাইনি আপনার পিছনে?”
“লোক লাগিয়েছেন, মিথ্যেও বলেছেন। আপনি যে ওই বস্তিতে যাননি সেই কথাটা আমায় অন্যকে দিয়ে মিথ্যে বলিয়েছেন। আপনি গিয়েছিলেন ওখানে।”
আরমান এবারে বুঝলো আরজুর প্রশ্ন গুলোর মানে। যাক ভালোই হয়েছে প্রশ্নগুলো আরজুই তুলেছে। আরমানেরও কিছু উত্তর জানার আছে। আরমান পাল্টা প্রশ্ন করল,
“তার আগে বলুন আপনি কেন আমার খোঁজ করতে গিয়েছিলেন? সেদিন কি সত্যি ওখানে কোন প্রাইভেটের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন নাকি অন্য কোন কাজ ছিল?”
“আপনাকে জবাবদিহি করবো আমি ভাবলেন কি করে?”
আরমান বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“ওমাহ! আমার থেকে জবাবদিহি চাইলেন আর আমি চাইতে পারবো না?”
আরজু ভ্রুঁ কুঁচকে সন্দেহী গলায় বলল,
“তার আগে বলুন বিশ্বাস করেন না আমায়? যদি ভালোবেসে থাকেন তাহলে বিশ্বাস অবশ্যই করতে হবে। আর বিশ্বাস না করলে ভালোবাসেন না।”
আরমান তাড়াহুড়ো করে বলল,
“করি তো বিশ্বাস আরু। আপনাকে আমি অনেক বিশ্বাস করি।”
“তবে আমি আপনাকে করি না। বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম তবে এখন আর করি না। বলুন কি কাজে গিয়েছিলেন ওই বস্তিতে?”
আরমান কাচুমাচু মুখ করে বলল,
“বলা যাবে না আরু। অনেক ঘাপলা আছে ব্যাপারটায়।”
“সেই ঘাপলাটাই আমি জানতে চাই। সেই সাথে আপনার মাঝে কি কি ঘাপলা আছে সেগুলোও জানতে চাই।”
আরমান অসহায় কন্ঠে বলল,
“আমি নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ আরু।”
“অসম্ভব।”
“এটা কিন্তু অদ্ভুত হয়ে গেল। আপনি আমাকে আপনাকে বিশ্বাস করতে বলেন অথচ আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন না এটা কেমন কথা?”
“ভালো আপনি আমাকে বাসেন, আমি আপনাকে ভালোবাসি না। তাই বিশ্বাস করার দায় আপনার, আমার না।”
আরমান হতাশ গলায় বলল,
“তাও ঠিক বলেছেন। হ্যাঁ আমি ভালোবেসেছি, সব দায় আমারই।”
“তবে বলুন কেন গিয়েছিলেন?”
আরমান একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“এক সপ্তাহ সময় দিন। এক সপ্তাহ পর বলব আপনাকে।”
মেনে নিল আরজু আরমানের কথা। গম্ভীর গলায় বলল,
“ঠিক আছে মানলাম আপনার কথা। তবে এক সপ্তাহ কোন যোগাযোগ করবেন না আমার সাথে। আপনার ছায়াও যেন এক সপ্তাহ আমি না দেখি, তবে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে। যেদিন ঐ কারণটা আমাকে বলতে পারবেন সেই দিনই আমার সামনে আসবেন, আমার সাথে কথা বলবেন। আল্লাহ হাফেজ।”
কথাটা বলেই আরজু হনহন করে হাঁটা ধরল। আরমান কিছুক্ষণ সেখানে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপরে যখন বুঝলো আরজু অনেক দূর চলে গেছে নিজেও দৌড় লাগালো ওর পিছনে। এই অভিমান আজ রাতেই ভাঙাতে হবে। সাতদিন কথা না বলে আরমান থাকতে পারবে না। পা'গ'ল হয়ে যাবে তো।
দূর থেকেই একবার গলা ছেড়ে ডাকল আরজু কে,
“আরু! আরু গো দাঁড়ান।”