“তানভীর! তানভীর নিচে আয়! তানভীর!”
হঠাৎ করে আরমানের চেঁচামেচির আওয়াজ বাড়িতে উপস্থিত প্রত্যেক কে চিন্তায় ফেলে দিল। হিমি নিচেই ছিল। হঠাৎ করে এখন আরমানের আগমন তার উপর আবার তানভীরের নাম ধরে চেঁচামেচি করাতে সে নিজেও ভরকে গেছে। তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে চিন্তিত গলায় আরমানকে বলল,
“কি হয়েছে তাওসিফ? চেঁচাচ্ছো কেন এভাবে? কি করেছে তানভীর?”
আরমান বহু কষ্টে নিজের রাগটুকু নিয়ন্ত্রণ করে কন্ঠে নমনীয়তা এনে হিমি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“খু'নি হয়ে গেছো ও ভাবি। খু'নিতে পরিণত হয়েছে। ওর এখন না কাউকে মা'রতে হাত কাঁপে আর না কাউকে ম'রতে দেখলে বুক কাঁপে। একটা অমানুষে পরিণত হয়েছে ও।”
হিমি আঁৎকে উঠলো। কি বলছে এসব আরমান? তানভীর কিনা খু'নি? না, এটা হতেই পারে না। হিমি জানে তানভীরের মাথা গরম, রাগ বেশি তবে ও তো বোকা। ওর পক্ষে খু'ন করা সম্ভব না কাউকে।
“কি বলছো এসব তাওসিফ? তানভীর খু'ন করতে পারে না কাউকে।”
“আমিও এমনটাই ভাবতাম ভাবি। তবে ও নিজেই আমার সেই ধারণা মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে। ওকে ডাকুন প্লিজ!”
আরমানের চেঁচামেচির শব্দ শুনে সবার প্রথমে তানভীরই নিচে নেমে এলো। ওর পিছন পিছন একে একে তাওকীর, মুহিব হোসেন আর কল্পনাও এলেন।
তানভীর কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঘুম থেকে উঠে এসেছে। পরনের জামাকাপড় কোঁকড়ানো, চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো থেকে এখনো ঘুম যায়নি। আরমানকে দেখেই বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কি হয়েছে রে তোর? সকাল সকাল ষাঁড়ের মতন চেঁচাচ্ছিস কেন? আমার বাড়িতে আমাকেই শান্তিতে ঘুমোতে দিবি না?”
তানভীর এর কন্ঠটা কানে যেতেই আরমান হিমির উপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে তানভীরের দিকে তাকালো। তানভীর কে দেখতেই মাথায় যেন র'ক্ত চড়ে বসলো। কোন কথা না বলে সোজা গিয়ে ঠাস করে একটা চ'ড় লাগালো।
হঠাৎ আরমান এভাবে আক্রমণ চালাবে সেটা বোধ হয় তানভীর নিজেও ভাবতে পারেনি। হুড়মুড় করে গিয়ে মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ল। উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। কারো যেন মনেই নেই যে তানভীর কে গিয়ে তোলা জরুরী। ওরা চুপ করে থাকলেও আরমান চুপ করে থাকতে পারলো না। মেঝে থেকে টি-শার্টের কলার ধরে তানভীর কে তুলে দাঁড় করিয়ে আরো দু'চারটে পর পর চ'ড় লাগালো।
এবারে কল্পনার ধ্যান ভাঙলো। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে তিনি ছেলেকে আরমানের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন। তবে আরমান যেন পণ করেছে কোনমতেই আজ তানভীরকে শিক্ষা না দিয়ে ছাড়বে না। কল্পনা আহাজারি করতে করতে তাওকীর আর মুহিব হোসেনকে ডাকলেন। কল্পনার আওয়াজ এ ওদের দুজনের ধ্যান ভাঙলো। তাওকীর তাড়াহুড়ো করে এসে আরমানের থেকে তানভীরকে ছাড়িয়ে নিল।
এদিকে এত মা'র খাওয়ার পরেও তানভীরের তেজ কমেনি। বরং নির্লজ্জের মতন এত মা'র খাওয়ার পরও আবার সাহস দেখিয়ে আরমান কে মা'রার জন্য তেড়ে যেতে নিল। কল্পনা খুব কষ্টে ছেলেকে আটকালেন।
এদিকে তানভীর কে এমন করতে দেখে তাওকীর একটা ধমক দিল। তাওকীরের ধমকে তানভীর চুপ করে গেল। আরমান কে উদ্দেশ্য করে শান্ত গলায় বলল,
“কি হয়েছে তাওসিফ? মা'র'ছি'স কেন ওকে?”
আরমান দাঁত পিষে বলল,
“ওকে জিজ্ঞেস করো যে ওর ঠিক কতটা অধঃপতন হয়েছে? তালুকদার বাড়ির ছোট ছেলের নতুন পরিচয় কি জানো? খু'নি।”
উপস্থিত কারোরই আরমানের কথা কোনমতেই বিশ্বাস হলো না। তবে বাদ বাকিদের থেকে তাওকীরের অভিব্যক্তি একটু আলাদা লাগলো। একটু সন্দেহ হলো তানভীরের প্রতি। সন্দেহী দৃষ্টিতে তানভীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তানভীর, তাওসিফ কি বলছে এসব? কি করেছিস তুই?”
তানভীর আবারও তেজ দেখিয়ে বলল,
“কিছু করিনি আমি। ও অযথা আমার নামে দোষ দিচ্ছে। নিশ্চয়ই ও খু'ন করে এসে আমাকে খু'নি সাজানোর চেষ্টা করছে।”
আরমানের রাগ আরো বাড়লো। আবার তেড়ে যেতে যেতে নিলে তাওকীর এবার ওকে একটা ধমক দিলো। মুহিব হোসেন গম্ভীর গলায় আরমান কে বলল,
“তুমি কি বলছো তাওসিফ বুঝতে পারছো তো? তুমি কিন্তু অনেক বড় একটা অপবাদ দিচ্ছো? ভেবে চিন্তে কথাগুলো বলছো তো?”
আরমান এবার নিজের রাগটা একটু কমানোর চেষ্টা করে শান্ত গলায় মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি নিশ্চয়ই আমার সম্বন্ধে এতোটুকু জানো বড় আব্বু যে আমি কোন বিষয়ে না জেনে কথা বলি না? আর সেখানে কোনোকিছু না ভেবেই এখানে সোজা খু'নের অপবাদ দিতে চলে আসবো বলে তোমার মনে হয়?”
আরমানের কথার যৌক্তিকতা খুঁজে পেলেন মুহিব হোসেন। এবার ছেলের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“সত্যি করে বলো কি করেছো? তোমার স্বভাব যে বিগড়ে গেছে সেটা আমি খুব ভালো করেই টের পাচ্ছি। তবে খু'ন করার অভ্যাস হয়ে গেছে সেটা তো জানতাম না।"
তানভীর আবারও চোট দেখিয়ে বলল,
“বললাম তো বাবা আমি এসব কিছু করিনি। “
তানভীর এর কন্ঠটা অনেক বেশি মনে হলো মুহিব হোসেনের কাছে। চোখ গরম করে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“আস্তে কথা বলো আমার সাথে। তুমি বাকিদের সাথে যেভাবে কথা বলতে পারো আমার সাথে সেভাবে কথা বলতে পারো না। দেখলেনা তাওসিফ তোমার সাথে কোন গলায় কথা বলল আর আমার সাথে কোন গলায় কথা বলল? ভদ্রতা শেখো ওর থেকে।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তানভীর নিজের গলার আওয়াজ কমিয়ে বলল,
“আমি কেন ওর থেকে ভদ্রতা শিখবো? ও তো নিজেই একটা অভদ্র।"
তানভীর এর কথা সায় জানিয়ে কল্পনাও স্বামীকে অভিযোগ করে বললেন,
“ঠিকই বলেছে। ও কেন তোমার ভাইয়ের ছেলের থেকে সভ্যতা শিখবে? ওই ছেলের নিজের কোন ভদ্রতা আছে? সকাল সকাল বাড়িতে এসে গুন্ডামো শুরু করে দিয়েছে। বলা নেই, কওয়া নেই নিজের ভাইয়ের গায়ে হাত তুলছে। কত ভদ্র তোমার ভাইয়ের ছেলে সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।”
তাওকীর গম্ভীর গলায় কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মা তাওসিফ যেহেতু এই কাজটা করেছে তার মানে যৌক্তিক কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে। তাওসিফ তুই বলতো করেছেটা কি তানভীর?”
“বিপক্ষ দলের মুনতাসির এর নাম নিশ্চয় শুনেছো তুমি তাওকির ভাই? যাকে দেখলেই তানভীরের শরীর জ্ব'লে ওঠে, যার নাম, খ্যাতি কোন কিছুই তানভীর সহ্য করতে পারে না। দুদিন আগে রাতে ওর ওপর একটা হা'ম'লা হয়েছিল। বলতে পারো ছেলেটা ম'রতে ম'রতে বেঁচেছে।”
“তো এর সাথে তানভীর কি করে জড়িত?”
“মুনতাসির কে যেখানে মা'রা হচ্ছিল তার থেকে একটু দূরে তানভীরকে দেখা গিয়েছে। ও পিলারের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল আর মুনতাসির কে মা'রতে দেখে হাসছিল।”
তাওকীর কপাল কুঁচকে বলল,
“এর দ্বারা তানভীর খু'নি সেটা কি করে প্রমাণিত হয়?”
“এর দ্বারা তেমন কিছুই প্রমাণিত হয় না ভাই। তবে যে ছেলেগুলো মুনতাসির কে মা'রছিল, ওকে মা'রা শেষে যাওয়ার সময় ওদের মধ্যে থেকে একটা ছেলে এসে অল্প কিছু সময়ের জন্য তানভীর এর সাথে কিছু কথা বলে যেটা সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে।”
“সিসিটিভি ফুটেজ?”
তাওকীরের কন্ঠে একরাশ বিস্ময় প্রকাশ পেল। যা আরমানের কাছে একটু অদ্ভুত লাগলো। সে নিজেও পাল্টা বিস্ময় নিয়ে বলল,
“কেন? এখানে অবাক হওয়ার কি আছে?”
তাওকীর খুব অল্প কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো বলল,
“যদি তানভীর কিছু করে থাকতো তবে কি ও সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করার ব্যবস্থা করতো না?”
“করেছে তো ব্যবস্থা। ওই এলাকার সব দোকানেই প্রায় সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা আছে এবং মুনতাসিরকে যে জায়গায় মা'রা হয়েছে তার সামনে একটা দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। পুলিশ ওখানে যাওয়ার পর জানতে পারে যে কয়েকজন লোক এসে ভয় দেখিয়ে ওদের থেকে ফুটেজটা ডিলিট করানোর ব্যবস্থা করে গিয়েছে এবং ওদেরকে খুব ভালোভাবে হুমকিও দিয়ে গিয়েছিল যেন এই বিষয়ে কাউকে কিছু না জানায়।”
তাওকীর আবারো প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
“তাহলে এক দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ যখন ডিলিট করতে পেরেছে তাহলে অন্য দোকানেরটা করতে পারলো না কেন?”
আরমান এবারে তানভীর এর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“এখানেই তো ওর ভাগ্য সহায় হয়নি। এই জায়গাটাতেই ওর ভাগ্য ওর সাথে বেইমানি করেছে।”
তাওকীর কপাল কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“মানে হলো, আমাদের ফার্ণিচারের শোরুমের একটা নতুন আউটলেট খোলার কথা ছিল ঢাকায় সেটা নিশ্চয়ই জানো?”
“হ্যাঁ জানি।”
“ওই জায়গাটাতেই আমাদের শোরুমের একটা নতুন আউটলেট হয়েছে। সব আয়োজনই শেষ শুধু আব্বু সময় পাচ্ছিলো না জন্য উদ্বোধনের তারিখটা দুদিন পরে রেখেছিলাম। সিসিটিভি ক্যামেরাও আমাদের চালু করাই ছিল। হয়তো ওরা সেটা খেয়াল করেনি কিংবা কাউকে খুঁজেই পায়নি যাকে বলতে পারে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করার কথা। আসলে সেদিন সকালেই লাগানো হয়েছে ক্যামেরা। এবার বুঝতে পারছো তো কেন ডিলিট হয়নি?”
তাওকীর খিঁচে দুচোখ বন্ধ করো নিল। রাগ হচ্ছে নিজের ভাইটার উপরে। তাওকীরের ভাই এতটা গা'ধা কি করে হয়ে গেল? যদি সত্যি এই কাজটা করেও থাকে তবে এত প্রমাণ রাখলো কি করে? তাও যখন জানে যে এই বিষয়টার সাথে আরমান সরাসরি জড়িত।
সবাই চুপ করে গেল। কেউ আর বলার মতন কোন কিছু খুঁজে পেল না। আরমান এবার কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনাকে বলেছিলাম বড় আম্মু সময় থাকতে ছেলেকে বোঝান। দেখছেন তো আজ আপনার ছেলে ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে নেমেছে? অন্যের ছেলের জীবন কেড়ে নিতেও ওকে দুবার ভাবতে হয় না এতটা অমানুষে পরিণত হয়েছে।”
কল্পনা এবারও দমলেন না। তিনি কোন মতেই আরমানের মুখ থেকে নিজের ছেলের নামে এসব কথা শুনতে রাজি না। ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
“তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না। কি প্রমাণ আছে যে তুমি যে সিসিটিভি ফুটেজের কথা বলছো সেটা সত্যি?”
আরমান এবার সত্যি অবাক না হয়ে পারলো না। তাই বলে ছেলের স্নেহে এতটাই অন্ধ হয়ে গেছেন যে সত্যিটা শোনার পরও তিনি স্বীকার করছেন না? উনি কি ভাবছেন এতে ওনার ছেলের মঙ্গল হবে? উনি কি বুঝতে পারছেন না এতে তানভীরের আরো বেশি অধঃপতন হবে? বরং এখন যদি তিনি মা হয়ে ছেলেকে শাসন করতেন, ছেলেকে সঠিক পথে আনার জন্য শোধরানোর চেষ্টা করতেন তবে তানভীরের উন্নতি হতো।
আরমান বিস্ময়াবিভূত গলায় মুহিব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বড় আব্বু তোমারও কি বিশ্বাস হচ্ছে না?”
মুহিব হোসেন মুখে কোন কথা বললেন না। সরাসরি ছেলের গালে একটা চ'ড় বসালেন। তানভীর নিজের হয়ে কিছু বলতে চাইলে তিনি আবারও গালে একটা চড় বসালেন। ঘৃণা ভরা কন্ঠে বললেন,
“আজ বলতে আমার লজ্জা করছে যে তুমি আমার র'ক্ত, তুমি আমার নিজের ছেলে। এত বছর ধরে রাজনীতি করে আসছি অথচ আজ অব্দি কখনো কেউ এই মুহিব হোসেনের নামে একটা বাজে কথা বলতে পারেনি। কেউ আমার দিকে কখনো আঙ্গুল তুলতে পারেনি তবে এখন তুমি সে সুযোগটা করে দিচ্ছো। মনে রেখো যদি তোমার জন্য আমার সম্মানহানি হয় তবে কিন্তু আমি ভুলে যাব যে তুমি আমার ছেলে।”
তানভীর অসহায় গলায় বলল,
“আব্বু তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো আমি করিনি এমনটা। হ্যাঁ এটা ঠিক আমি তখন ওখানে ছিলাম। আমি দেখেছিলাম মুনতাসিরকে মা'রতে। তবু ওই জায়গাটায় ওই সময়ে যাওয়া নিছক একটা কাকতালীয় ব্যাপার ছিল। আমি এমনি গিয়েছিলাম ওখানে।”
“এমনি গিয়েছিলে তবে ওকে যারা মা'র'ছি'ল সেই ছেলেরা এসে তোমার সাথে কেন কথা বলছিল?”
“সে তো আমি ওদেরকে চিনি জন্য।”
মুহিব হোসেন আবারও ধমক দিয়ে বলে উঠলেন,
“চুপ করো। অজুহাতটাও ঠিক করে দিতে পারো না। খু'নিদের সাথে তোমার মেলামেশা কিসের?”
তানভীর নিজের হয়ে আরও কিছু বলতে চাইলো তবে মুহিব হোসেন ওকে সেই সুযোগ দিলেন না।
আরমানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কে কে জানে এই বিষয়ে?”
“আমি, কাকা আর তোমরা।”
মুহিব হোসেন এবার আরমানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আর কাউকে জানিও না এই ব্যাপারটা। ও ভুল করে ফেলেছে তবে এখন আমরা যেহেতু ওর বড় আমরা যেহেতু বুঝদার আমাদেরকেই এই ব্যাপারটা সামাল দিতে হবে।”
আরমান দু কদম পিছিয়ে গেল। ওর কাঁধ থেকে মুহিব হোসেনের হাতটা সরে গেল যার ফলে মুহিব হোসেন কথার মাঝপথেই থেমে গেলেন।
আরমান বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে মুহিব হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি এই কথাটা আমায় বলছো বড় আব্বু? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুমি আমাকে এই কথাটা বলছো। তুমি আমাকে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে বলছো? যে আমাকে সব সময় শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে লড়াই করতে? আজ অন্যায়কারী তোমার নিজের ছেলের জন্য তুমি আমাকে সেই অন্যায় টাকে প্রশ্রয় দিতে বলছো?”
“হ্যাঁ বলছি। তার কারণ তুমি জানো তানভীর বোকা। ওর এসব কিছু সম্পর্কে ধ্যান-ধারণা নেই। ও ঝোকের মাথায় একটা জিনিস করে বসেছে।”
“এতে মুনতাসিরের প্রাণ চলে যেতে পারতো বড় আব্বু।”
“আমি জানি ও অপরাধ করেছে। এখন তুমি ওর বড় ভাই, আমি ওর বাবা আমাদেরকেই তো সবটা সামলাতে হবে। আর তাছাড়া যদি খবরটা সবার সামনে আসে তবে আমার সম্মানহানি ঘটবে।”
“আর আজ যদি মুনতাসিরের কিছু হয়ে যেত তখন কি হতো? তুমি এখন তোমার সম্মানের ভয় করছো বড় আব্বু অথচ মুনতাসিরের কিছু হয়ে গেল ওর মা আর বোন ভেসে যেত। এখন যদি তুমি এই ঘটনাটা জানার পরও চুপ করে থাকো তবে পরবর্তীতে কখনো এটা প্রকাশ পেলে তোমার সম্মানহানি হবে না?”
“সেসব আমি পরবর্তীতে দেখে নেব। এখন আমি তোমাকে যা বলছি তাই করো। ফুটেজটা নষ্ট করে দাও। আর এই ব্যাপারে যেন কেউ কিছু না জানে এটা আমার আদেশ।”
আরমান কোনমতেই রাখতে পারলো না মুহিব হোসেনের কথা। তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল।
“অসম্ভব বড় আব্বু। ক্ষমা করে দিও আমায় তোমার এই আদেশ আমি রাখতে পারব না। কোন অন্যায় আদেশ আমি মানতে পারবো না। মুনতাসির আমার কাছে ঠিক কতটা দামি সেটা আমি বলে বোঝাতে পারবো না। অবশ্য ব্যাপারটা এখানে মুনতাসির জন্য না, অন্য যে কেউ থাকলে আমি এটাই করতাম। তানভীর এর শাস্তি দরকার। ওর এই বেপরোয়া জীবন-যাপনের গতিরোধ করার জন্য হলেও ওর শাস্তি দরকার।”
মুহিব হোসেন গম্ভীর গলায় আরমান কে বললেন,
“তবে তুমি আমার আদেশ পালন করবে না?”
“না বড় আব্বু আমি পারবো না এই আদেশটা পালন করতে। ওর মাথায় খু'ন করার ভূত অনেকদিন আগে থেকেই চেপেছে। এতদিন তো শুধু আমার পেছনে পড়েছিলো এখন লেগেছে মুনতাসিরের পেছনে। আর তানভীর শোন তোকে একটা কথা বলি, দ্বিতীয় দিন যদি আর কখনো তোর জন্য মুনতাসিরের গায়ে একটা আঁচড়ও লেগেছে সেই দিন আমি সত্যি ভুলে যাব যে তুই আমার ভাই। আজ সবার সামনে মে'রে'ছি, সেদিন যে তোকে কোথায় কিভাবে, মা'রব তুই টেরও পাবি না।”
কথাটা বলে আরমান চলে গেল। মুহিব হোসেন ইশারায় তাওকীর কে নিজের ঘরে আসতে বলে তিনি ওপরে চলে গেলেন। কল্পনা ছোট ছেলেকে ধরে হা হুতাশ করতে লাগলেন, কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিলেন। ওনার কান্নাকাটিতে তানভীর নিজেই বিরক্ত হলো।
হিমি তাওকীরের কাছে এগিয়ে গিয়ে ধীর গলায় বলল,
“তুমি তাওসিফের সাথে কথা বলো।”
তাওকীর হিমি কে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না। ও তানভীরের কিছু হতে দেবে না।”
তাওকীরের কথাটা হিমির মাথার উপর দিয়ে গেল। প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
“কি বলছো এসব?”
“ঠিকই বলছি। তাওসিফকে আমি চিনি, ও যতই বলে যাক না কেন তানভীরের শাস্তি চায় কিন্তু আমি জানি তানভীর শাস্তি পেলে ওই সব থেকে বেশি কষ্ট পাবে। ও স্নেহ করে তানভীরকে। যদিও আমার ভাইটা পা'গল। চিন্তা করো না তাওসিফ সব দিক সামলে নেবে। আমাকে কিছু করতে হবে না। তারপরেও আমি প্রস্তুত থাকবো যদি কিছু করার প্রয়োজন হয় তো।”
হিমি আর কিছু বলল না। তাওকীর এবারে তানভীরের সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়িয়ে আফসোসের কন্ঠে বলল,
“এতটা গাধামো কেউ করে? গতকাল রাতেও তো আমায় বলতে পারতি। কিছুটা হলেও তো সামাল দিতে পারতাম ব্যাপারটা।”
তাওকীরের কথা শুনে তানভীর অবাক হলো। বুঝলো না তাওকীরের এখন এই কথাগুলো বলার মানে কি। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে অপরাধী গলায় বলল,
“ভুল হয়ে গেছে ভাই।”
“আর যেন এমন ভুল কক্ষনো না হয়। আর তাওসিফের সাথে দেখা হলে দরকার পড়লে ওর পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে নিবি। মনে রাখিস তুই একবার ওকে ভাই বলে ডাকলে ওর সব রাগ গলে জল হয়ে যাবে।”
তাওকীরের কথা শুনে কল্পনা আপত্তি জানিয়ে বলল,
“আমার ছেলে কেন ওর পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইবে? ওর যোগ্যতা কি আমার ছেলের সামনে?”
তাওকীর শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“মা জাতি যে আসলেই পুত্র প্রেমে অন্ধ হয়ে যায় সেটা তোমায় না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। তাওসিফের কতটুকু কি যোগ্যতা সেটা তো দেখিয়েই গেল মা। ও যদি চাইতো তবে আসার সময়ই পুলিশ নিয়ে আসতে পারতো। তাওসিফ চাইলে অনেক কিছুই সম্ভব ছিল তবে ও চায়নি। আর সেটা তোমার ছেলের ভাগ্য ভালো বলে হয়েছে। আর তোমার ছেলে যে দোষ করেছে সেটা কিন্তু ও নিজের মুখেই স্বীকার করেছে। তাই অযথা ওকে আর আড়াল করার চেষ্টা করো না।”
________
“আপনি কি চান আরমান ভাই?”
মুনতাসিরের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আরমান ওর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারলো না। আরমান কেন যেন কোথাও গিয়ে নিজেকেই সবকিছুর জন্য দায়ী মনে করছে। মনে হচ্ছে তানভীর ওর উপরে রাগ থেকে আরমানের কাছের মানুষের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। আর তাই মুনতাসির কে বেছে নিয়েছে। আর এমনিতেও মুনতাসির এর সাথে আরমানের ভালো সম্পর্ক জন্য তো তানভীর হিংসা করতো মুনতাসির কে। কোন না কোন এক দিক দিয়ে আরমানের এসব কিছুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে হলো।
আরমানের নীরবতার মাঝের অব্যক্ত ভাষাটুকু মুনতাসির পড়ে নিল খুব অনায়াসে। হোক অল্পদিনের পরিচয় তবে বুঝতে শিখেছে মুনতাসির আরমানকে। তাও যথেষ্ট ভালোভাবেই বুঝতে শিখেছে।
“আপনার খারাপ লাগছে তানভীরের জন্য তাই না?”
মুনতাসিরের এই প্রশ্নের জবাব আরমান দিলো। আফসাস ভরা কন্ঠে বলল,
“কি বলি বলতো? ছোটবেলা থেকে ওর আমার সাথে হিংসে। আমি জানিনা ওর কেন সবসময় আমার সাথেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব থাকে। ও তো আমার থেকে বয়সেও ছোট তারপরেও আমাকে সহ্য করতে পারে না। আমি এত চেষ্টা করেছি ওকে বোঝানোর যে আমি ওকে কতটা স্নেহ করি কিন্তু ও বুঝতেই চায় না।”
“খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। আপনি আপনার ভাই কে স্নেহ করেন আর ও আপনাকে পছন্দ করে না এখানে খারাপ লাগবে এটাই স্বাভাবিক।”
“খারাপ তো লাগছে। খুব কষ্ট হচ্ছে ওর জন্য তবুও যে অপরাধটা ও করেছে সেটা ক্ষমার অযোগ্য মুনতাসির। ওর একটা শাস্তি পাওয়া দরকার।”
“এর প্রভাব কি আপনার উপরে পড়বে না? আপনার পরিবারের চাপ কি আপনার উপরে পড়বে না? মনোমালিন্য, অশান্তি কি সৃষ্টি হবে না?
“জানি। সব জানি। আজ সকালে বড় আব্বুর সাথে অশান্তি করে এসেছি। এই প্রথম হয়ত আমি ওনার কোন আদেশ পালন করিনি। তার কারণ বড় আব্বুর আদেশটা ছিল অন্যায়। আমি জানি এর জন্য অনেক অশান্তি হবে, মনোমালিন্য হবে, হয়ত সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু তাতে আমার যায় আসে না। তুমি আমার খুব কাছের একজন মুনতাসির। তোমার প্রতি এই অন্যায়টা আমি সহ্য করতে পারবো না।”
মুনতাসির আলতো হাসলো। আরমান অপেক্ষা করলো মুনতাসিরের কিছু বলার জন্য। মুনতাসির বেশ কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরমান ভাই একটা কথা মাথায় এলো।”
“কি কথা?”
“ভুলে যান না যে আমার ওপর হামলাটা ইচ্ছাকৃত ভাবে করানো হয়েছিল। ধরে নিন ছিনতাইকারীরা এমন করেছে। আর তানভীর ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু মজা নিচ্ছিলো। এমনিতে ও আমাকে বাঁচাবে এমনটা ওর থেকে আশা করা যায় না। ধরে নিন সবটাই ছিল কাকতালীয় একটা ব্যাপার, কোন কিছুই পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না।”
আরমান লাফ দিয়ে বসা থেকে উঠে বসে মুনতাসিরের কথার তীব্র বিরোধিতা করে বলল,
“অসম্ভব মুনতাসির। তুমি আমার জন্য এসব বলছো তাই না? আমার খারাপ লাগবে না। আর বাড়িতে অশান্তি হলে আমি সব সামলে নেব।”
“বাদ দিন না ভাই এসব। আমি ভুলে যেতে চাই সবকিছু। আমার তো কিছু হয়নি। আমার জীবন হারানোর ভয়ের কারণ একটাই আমার মা আর বোন। আমি জানি ইরাবতী নিজেকে সামলে নিতে পারবে। আমি ওকে তেমন ভাবেই সবটা বুঝিয়েছি। আর আমার কিছু হয়ে গেলে আমার মা আর বোনকে যে আপনি সামলাতে পারবেন সেটাও বুঝে গিয়েছি। এসব কেসের ঝামেলায় তানভীর আরো বিগড়ে যাবে। তার থেকে বরং ক্ষমা করে দেই ওকে। যদি ও ভালো হয়ে যায়!”
“তুমি কিন্তু ভুল করছো মুনতাসির। ও ভালো হওয়ার না।”
“না হলে না হবে সেটা ওর ব্যাপার। তবে আমি চাইনা আপনি কষ্ট পান। আমার জন্য আপনাকে কোন ধরনের কোন ভোগান্তিতে পড়তে হোক আমি সেসব চাই না। কেউ আপনাকে খারাপ কথা বলবে আমার জন্য সেসবও আমার ভালো লাগবে না। আপনি আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান। ছেড়ে দিন এসব কথা।"
আরমান অবাক না হয়ে পারলো না। ছেলেটা ওকে এত ভালোবাসে, এতটা শ্রদ্ধা করে যে নিজের এত বড় আঘাতকারী মানুষকেও ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত? এই ছেলেটাকে আরমান না ভালোবাসা কি করে থাকবে? তানভীরই বা কি করে এই ছেলেটাকে এত ঘৃণা করে?
আরমান কে এক দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুনতাসির বলে উঠলো,
“কিছু ভাবছেন?”
আরমান কিছু বলল না। এগিয়ে গিয়ে মুনতাসির কে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। মুনতাসিরও পাল্টা জড়িয়ে ধরল আরমান কে। কেউ কিছু বলল না তবে এই নীরবতাই যেন দুজনের দুজনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর ভরসা সবটুকুই প্রকাশ করলো।
_______
মুনতাসিরের সাথে আরো কিছুটা সময় কাটিয়ে আরমানের একটা জরুরী কল আশায় বেরিয়ে আসতে হলো। আজ আর সাথে করে বাইকটা আনেনি। গাড়ির জন্য রাস্তায় দাঁড়াতেই হঠাৎ করে রাস্তার অপর পাশে দেখলো আরজু দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার জন্যই বোধহয় অপেক্ষা করছে। আরজু কে দেখতেই আরমানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। জোরে একবার ডাকলো আরজু কে, সেই সাথে হাত নাড়িয়ে আরজুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল।
“আরু!”
আরমানের এক ডাকেই আরজু ওকে দেখতে পেল। আরমানের সেই ডাকে শুধু আরজু না আশেপাশের অনেকেই তাকিয়েছে।
আরমান ইশারায় আরজুকে ওখানেই থাকতে বলল। গাড়ি ঘোরার ফাঁকফোকর দিয়ে ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে আরজুর কাছে গেল আরমান। গিয়েই হাসি হাসি মুখে বলল,
“কেমন আছেন আরু?”
আরজু নিজের স্বভাব সুলভ গম্ভীর গলায় বলল,
“রোজ যেমন থাকি আজও তেমনি আছি।”
আরমান আশা করেছিলো যে আরজু ওকে পাল্টা জিজ্ঞেস করবে কেমন আছে। তবে তেমন কিছুই হলো না। হতাশ হলো আরমান। নিজ থেকেই বলল,
“আমিও ভালো আছি আরু। আপনাকে দেখে আরো বেশি ভালো লাগছে।”
“ওহ্। সামনে থেকে সরুন রাস্তা পার হতে হবে।”
আরজুর এমন সোজাসাপটা কথাবার্তায় আরমানের একটু খারাপ লাগলো। তবে খুব বেশিক্ষণ সেই খারাপ লাগাটাকে স্থায়ী হতে দিল না। এমনটা তো হয়েই থাকে। আরজুর থেকে এর চেয়ে বেশি আর কিছু আশা করা যায় না। আশা করা যায় না যে আরজু আরমানের সাথে প্রেম আলাপ করবে। আরজু কে নিয়ে এসব ভাবা পাগলামো বৈ আর কিছুই না।
আরমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরজু ওকে পাশ কাটিয়ে একটু সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অপেক্ষা করলো রাস্তাটা একটু ফাঁকা হওয়ার। আরমানের ধ্যান ভাঙলো। তৎক্ষণাত আরজুর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলল,
“আরে আরু আপনি একা এত ভিড়ের মাঝে রাস্তা পার হতে পারবেন না। আমি আছি তো। আমি আপনাকে পার করে দিচ্ছি। আপনার হাত দিন।”
কথাটা বলে আরমান আরজুর হাত ধরার জন্য হাতটা বাড়ালো তবে আরজু আরমানের দিকে কপাল কুঁচকে তাকাতেই আরমান দমে গেল। নিজের ভুলটা ধরতে পেরে নিজের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা গুটিয়ে নিয়ে মেকি হেসে বলল,
“হি হি মজা করছিলাম। আপনি আমার পিছন পিছন আসুন। ধরবো না আমি আপনার হাত।”
আরজু কিছু বলল না। অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল তবে এখনো আরমান ওকে রাস্তা পার করিয়ে দিতে পারলো না। তার কারণ রাস্তায় প্রচুর গাড়ি। আরমান অপেক্ষা করছে রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা হওয়ার জন্য তারপর আরজু কে নিয়ে পার হবে যা কখনোই সম্ভব না।
বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর আরমান আরজু কে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করবেন না আরু আমি আপনাকে ঠিকভাবে রাস্তার ওই পারে নিয়ে যাব। আসলে অনেক ভিড়। এত ভিড়ের মাঝে রাস্তা পার হওয়াটা ঠিক না।”
আরজু এবারও কোন উত্তর দিলো না। এরপর আরো পাঁচ মিনিটের বেশি অতিবাহিত হয়ে গেল। তবে এখনও আরমান রাস্তা পার হতে পারেনি। এক পর্যায়ে আরমান নিজেও বিরক্ত হয়ে গেল।
হঠাৎ করে খেয়াল করলো ওর হাতটা কেউ যেন ধরেছে। পাশে তাকাতেই দেখল আরজু ধরেছে। বিস্ময়ে আরমানের মুখ হা হয়ে গেল। কম্পিত গলায় বলল,
“আরু আপনি আমার হাত ধরেছেন!”
আরজু কোন উত্তর দিল না। আরমানের হাত ধরে টেনে নিয়ে রাস্তা পার করলো। ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার ফাঁকফোকর দিয়েই পার হয়ে গেল। এদিকে আরমানের এসবে কোন হুশ নেই যে আরজু ওকে নিয়ে রাস্তা পার হয়েছে। ও তো এক দৃষ্টিতে হাতের দিকে তাকিয়ে আছে যেই হাতটা আরজুর হাতের দখলে।
রাস্তার এপারে আসতেই আরজু আরমানের হাতটা ছেড়ে দিল। আর তখনি আরমানের ধ্যান ভাঙলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো রাস্তা পার হয়ে গিয়েছে। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল,
“আমরা এই পাশে কখন এলাম?”
আরজু গম্ভীর গলায় বলল,
“যখন আপনি বোকাদের মতন আমার হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তখন। আপনার আশায় থাকলে কোনদিনও আমি রাস্তা পার হতে পারতাম না।”
আরমান এবার একটু অপমানিত বোধ করল। সত্যি কি খুব বেশি দেরি করে ফেলেছে? সেই সাথে বোকামিটাও কি বেশি হয়ে গেছে?
আরজুর মনের মাঝে অনেকক্ষণ থেকে একটা প্রশ্ন ঘুরছে। প্রশ্নটা করবে করবে অনেকক্ষণ থেকে ভাবছে অবশেষে করেই ফেলল। প্রশ্নাত্মক গলায় আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা আপনি যখন এপাশ থেকে ওই পাশে গেলেন তখন তো খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। তখনো রাস্তায় ভিড় ছিল, এখনও রাস্তায় ভিড় আছে। তবে আমাকে নিয়ে পার হওয়ার সময় এত দেরি করছিলেন কেন? কারণটা কি আমি সাথে ছিলাম জন্য?”
আরমান অসহায় দৃষ্টিতে আরজুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ আরু। আপনি সাথে ছিলেন, একটা তো আলাদা দায়িত্ব আছে তাই না? আপনাকে তো ভালোভাবে রাস্তা পার করে আনতে হবে।”
“তারমানে আপনি বলতে চাইছেন আপনি আমাকে নিয়ে ভয়ে ছিলেন? আপনার আমার জীবনের পরোয়া হচ্ছিল তাই তো?"
“হ্যাঁ। আমি সবসময় আপনাকে সেইফ রাখতে চাই। অন্তত আমি যতক্ষণ আপনার সাথে থাকব ততক্ষণ যেন আপনার কোন কিছু না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে চাই।”
আরজু কিছুক্ষণ নিরবে ভাবনাচিন্তা করে সন্দেহী গলায় বলল,
“সত্যি আপনার আমার জীবনের পরোয়া হচ্ছিল জন্য পার হচ্ছিলেন না? কিন্তু এটা তো সম্ভব না। আমার বাঁচা ম'রা নিয়ে কেউ কখনো এতটা ভাবেনি। কেউ আমার জীবনের এতটা পরোয়া করবে এমনটা হতেই পারে না।”
আরমানের অভিব্যক্তি এবারে স্বাভাবিক হলো। জোর গলায় বলল,
“না আরু আমি আপনার জন্যই রাস্তাটা একদম ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। আপনার জীবনের পরোয়া কার আছে বা কার নেই আমি জানিনা। তবে আমার কাছে আছে। আপনি আমার কাছে অনেক মূল্যবান।”
আরজু পুনরায় অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“মিথ্যে বলছেন। এমনটা হতেই পারে না।”
আরমান আলতো হাসলো। আরজুর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“এমনটাই যে হয়েছে আরু। ভালোবাসি তো আপনাকে। আপনার ভালো থাকার সাথে যে আমার ভালো থাকাও জড়িত। আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, কি করে এই বোকা বোকা প্রশ্নগুলো করে ফেলেন আপনি যেগুলো শুনে আমার আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে আপনাকে? ইচ্ছে করে আপনার গাল দুটো টেনে দেই ঠিক এইভাবে।”
কথাটা বলে আরমান সত্যি আরজুর একটা গাল টেনে দিল। এতটা অবাক আরজু এর আগে কখনো হয়নি যতটা আরমানের এই কাজে হলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় গলায় বলল,
“কি করলেন এটা আপনি?”
আরমানের মাঝে কোন ভয় দেখা গেল না, কোন সংকোচ দেখা গেল না। বরং নিঃসংকোচে আলতো হেসে বলল,
“আদর করলাম আমার আরুকে। আমার আরু কে শুধু ভালোবাসা যায়। কবে যে আপনাকে নিজের করে পাবো আমি জানিনা, কবে যে আপনার চোখ থেকে আমার জন্য অবিশ্বাস দূর করতে পারবো আমি তাও জানিনা। তবে দেখবেন আমি ঠিক করে নেব। আপনাকে আমি এত ভালোবাসবো, এত ভালোবাসবো যে আপনিও বিশ্বাস করবেন ভালোবাসা বলতেও কিছু হয়। এটা আমার নিজের কাছে করা প্রতিজ্ঞা আরু আমি আপনাকে আমায় ভালোবাসতে বাধ্য করব।”