ভার্সিটিতে তাওকীর কে দেখে আরমান বেশ অবাক হলো। কখনো তো তাওকীর আসে না তবে আজ কেন এলো? আবার কি মুনতাসির কে নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে এসেছে? হতেই পারে। কেননা আরমান তো আর হাসপাতালে যায়নি, ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। ওর সাথে যোগাযোগ করার কোন পথ নেই।
যদিও একটা নাম্বার খোলা আছে তবে সেটা শুধুমাত্র মহিন হোসেনই জানে, আর কেউ জানে না। ওনার থেকেই তানভীরের সব খোঁজখবর নিচ্ছে আরমান। তবে আর হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। যদি তাওকীর অবিশ্বাস না করতো তবে যেত।
আরমানকে হা করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাওকীর ওর দিকে এগিয়ে এসে কোন কথা না বলেই আগে জড়িয়ে ধরলো। আরমান আরো চমকালো। বিস্ময়ের মাত্রা এতটাই ছাড়িয়ে গেছে কিছু বলতেও পারছে না। তাওকীর অপরাধী গলায় বলল,
“আই এম রিয়েলি সরি তাওসিফ। আসলে তখন মাথা ঠিক ছিল না ভাই। সেই জন্য তোকে ওসব বলে ফেলেছি। তুই তো জানিস আমি তোকে কতটা ভরসা করি? তানভীরের থেকেও বেশি আমি তোকে বিশ্বাস করি তবে তখন পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না।”
আরমান প্রশ্নাত্মক গলায় বলল,
“তবে এখন কি করে নিশ্চিত হচ্ছো আমায় নিয়ে?”
“কারণ এখন আমার মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে। তানভীরের জ্ঞান ফিরেছে। দেখতে যাবি না ওকে?”
আরমান অভিমান জড়ানো গলায় বলল,
“কেন যাব? কে হয় তানভীর আমার? ও তো আমার সব থেকে বড় শত্রু তাই না? আমি গেলে যদি আবার ওকে খু'ন করে আসি।”
তাওকীর বুঝলো আরমানের অভিমান মাখানো কথা। আরমান কে ছেড়ে দিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলল,
“রাগ হয়েছে আমার উপর? ঠিক আছে শাস্তি দিবি? দে। তবে যা হয়েছে সব ভুলে যা।”
আরমানের একটা দুর্বলতা হলো চাইলেও নিজের আপন মানুষদের উপরে খুব বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। কেন যেন কোনমতেই পারেনা। এই যে তাওকীর একবার বলাতেই রাগ গলে জল হয়ে গেল।
কি করে ফিরিয়ে দেবে এখন তাওকীর কে? এটা অসম্ভব আরমানের পক্ষে। ওকে ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব। এই যে তাওকীর এসেই ভাই বলে বুকে জড়িয়ে নিল এতেই যে আরমানের বুকটা ভরে উঠলো।
সম্পর্কে এমন টুকটাক ভুল বোঝাবুঝি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই বলে সম্পর্কটা শেষ করে দেওয়া তো কোন সমাধান হতে পারে না। তাওকীর নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেই তো এসেছে ক্ষমা চাইতে। হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য ভুল ভেবেছিল তবে এখন যে বুঝতে পেরেছে এটাই বড় কথা।
আরমান আলতো হেসে বলল,
“তুমি জানো আমি তোমায় ফিরিয়ে দিতে পারবো না সেজন্যই এখানে এসেছো তাই না?”
তাওকীর পাল্টা হেসে বলল,
“ভাই তুই আমার। কতক্ষণ দূরে সরিয়ে রাখবো?”
ক্লাসে আজ আরজুর কোনমতেই মন বসছিলো না। তবুও নিজের উপর জুলুম চালিয়ে সবগুলো ক্লাস করেছে। আজকাল একটা ভীষণ বাজে স্বভাব তৈরি হয়েছে আরজুর, আর সেটা হলো আরমানের কমতি অনুভব হওয়া। সকাল থেকে আরমান বিরক্ত করেনি আর ঠিক সেই কমতিই অনুভব করছে আরজু। বারবার খুঁজেছে। কোথায় গেল আরমান? কেন বিরক্ত করছে না? কেন পিছু পিছু ঘুরছে না আরজুর? একবার বলাতেই কি হার মেনে নিল? তার মানে সত্যিই সাত দিন আর কথা বলবে না? বাহ্ ভালো। আরজু প্রমাণ পাচ্ছে আরমান ওকে কত ভালোবাসে, সব প্রমাণ পাচ্ছে।
ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখল মাঠের একটা কোণার দিকে আরমান দাঁড়িয়ে আছে। সামনে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ওনাকে চেনে না আরজু। তবে কথা সেটা না, কথা হলো আরমান তার মানে ভার্সিটিতে এসেছে তারপরও একবার আরজুর সাথে দেখা করেনি। তার থেকেও বড় কথা আরজুর মুড খারাপ করে দিয়ে এখন হেসে হেসে গল্প করা হচ্ছে।
আরজু ভাবলো কথাই বলবে না। চুপচাপ চলে যাবে। তবে চেয়েও কেন যেন যেতে পারলো না। ইচ্ছে করলো অন্তত কিছু একটা বলে যেতে আরমান কে। কিছু না বলে গেলে আরজু শান্তি পাবে না।
আর কোন কিছু ভাবার প্রয়োজন মনে করলো না। সে একবার যখন ভেবেছে আরমানকে কিছু বলবে তবে বলবেই। কি বলবে জানে না তবে কিছু একটা বলবে।
“এত হাসছেন কেন? গতকালই তো খুব বলছিলেন মন ভালো নেই, মন ভালো নেই আর আজ যেই আমি নেই অমনি মন ভালো আছে আপনার তাই না? সকাল থেকে আমার সাথে দেখা হয়নি তাই মন খারাপের কোন কারণও নেই আপনার কাছে, তাই না?"
আরমান থেমে গেল। মুখ দিয়ে হাসি তো দূর একটা শব্দও আর বেরোলো না। এখনো দেখেনি আরজু কে তবে কণ্ঠ শুনেই তো আরমান চিনতে পেরেছে।
ভয়ে বুকের ভেতরটা আরমানের কেন যেন কেঁপে উঠলো। সম্মুখে দাঁড়ানো তাওকীরের দিকে তাকাতেই দেখলো তাওকীর বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে আরমানের ঠিক পিছনে তাকিয়ে আছে। তার মানে ওর পিছনে আরজু দাঁড়িয়ে আছে।
আরমান ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। আরজুর দৃষ্টি দেখতেই ভয় বাড়লো। আমতা আমতা করে বলল,
“আরু আপনি?”
আরজু কৌতুকপূর্ণ গলায় বলল,
“ও আচ্ছা এখন আমাকে দেখে আর খুশি হন না? এখন আমাকে দেখে অবাক হন। বাহ্ ভালো। আপনি থামলেন কেন? হাসুন। আমি দেখবো আপনার হাসি। হাসুন না।”
তাওকীরের ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। আরমান কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কে এই মেয়েটা?”
আরমানের পরিচয় দিতে ইচ্ছে করলো যে ও আরজু কে ভালোবাসে। তবে কথা হলো এখন আরজু যে পরিমাণ রেগে আছে তাতে আরমান যদি এই কথাটা বলে তবে যদি বেশি রেগে যায়? আবার তাওকীর কে কিছু না বললেও তো না। তবে কি করবে আরমান?
আরমানের এই কঠিন কাজটা আরজু নিজেই সহজ করে দিল। আরমানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গম্ভীর গলায় তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি কেউ না। তবে আপনি কে? ওনাকে যে খুব হাসাচ্ছিলেন! এখন থামলেন কেন? আরো হাসান।”
“এক্সকিউজ মি! হু আর ইউ? আপনার সাহস হয় কি করে আমার সাথে এত রুড বিহেভ করার?”
আরজুর মাথায় এলো না ও কখন রুড বিহেভ করলো? আদৌ এই ছেলেটা রুড বিহেভের মানে বোঝে? আরজু যদি একবার রুড বিহেব করা শুরু করে না এই ছেলে এখানে টিকতে পারবে না। তার থেকেও বড় কথা এই লোকটা ওকে এইভাবে বলল অথচ আরমান চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে!
আরজু তাওকীরকে কিছু বলল না। সরাসরি তাকালো আরমানের দিকে।
“আমি রুড বিহেভ করছি? আপনার কিছু বলার নেই এখানে?”
আরমান ব্যস্ত গলায় বলল,
“না আরু আপনি একটুও রুড বিহেভ করেননি। আর আমার অনেক কিছু বলার আছে। দাঁড়ান আমি বলছি।”
আরমান এবার তাওকীর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাই, তুমি তানভীর কে দেখতে যাও। আমি একটু পরে আসছি।”
তাওকির গম্ভীর গলায় বলল,
“তার আগে বল এই মেয়েটা কে? তোর গার্লফ্রেন্ড?”
এবারও আরমান কে উত্তর দিতে না দিয়ে আরজুই নাক শিটকে বলল,
“ছিঃ! আমি ওনার গার্লফ্রেন্ড হতে যাব কেন? গার্লফ্রেন্ড শব্দটা কতটা নোংরা জানেন? খবরদার এসব নোংরা শব্দ আমার নামের সাথে লাগাবেন না।”
তাওকীর চমকে উঠল আরজুর কথাগুলো শুনে। কথাগুলো পরিচিত লাগলো।
তবে বেশিক্ষণ ভাবার সময় পেল না। তার আগেই আরমান তাওকীর কে বলল,
“তাওকীর ভাই, ও আমার পরিচিত। অনেক ভালো সম্পর্ক আমার সাথে। মুনতাসির কে চেনো তো? ওর বোন।”
তাওকীর ছোট্ট করে উত্তরে বলল,
“ওহ্।”
আরমান আরজুর দিকে তাকাতেই দেখল আরজু কটমট দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ করে তাওকীর এর মাঝে একটা চাপা অস্থিরতা জেগে উঠলো। সেখানে আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করল না। আরজুর সাথেও আর কোন কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। আরমানের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
আরমান একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে আরজুকে বলল,
“এভাবে কেউ কথা বলে আরু? ওটা তো আপনার ভাসুর ছিল।”
আরমান খেয়াল করলো আরজু ওর কোন কথার উত্তর দিচ্ছে না। এখনো সেই একই ভাবে কটমট করে তাকিয়ে আছে। আরমানের ভয়টা আবারো জেগে উঠলো। কি ভুল করল বুঝতে পারছে না।
আমতা আমতা করে বলল,
“আরু আপনি কি রেগে আছেন আমার উপরে?”
আরজু যেন এই প্রশ্নটারই অপেক্ষা করছিল। ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“কেন? আমি কেন রেগে থাকবো? আমি আপনার উপর রাগবোই বা কেন? আমি আপনার কেউ হই না, আপনি আমার পরিচিতও না তবে আপনার উপর রাগ করার কোনো মানেই আসে না। আমি হলাম মুনতাসির ভাইয়ার বোন, বুঝতে পেরেছেন? আমি শুধুই মুনতাসির ভাইয়ার বোন।”
আরমান বোকা বোকা হেসে বলল,
“সেই সাথে আপনি তো আমার আরু, আমার পা'গলি।”
আরজু আবারো চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আমি আপনার কিচ্ছু না। কাপুরুষ কোথাকার। খুব তো ভালোবাসেন ভালোবাসেন বলে চেঁচান অথচ নিজের বড় ভাইয়ের সামনে সেটা বলার সৎ সাহস নেই? আবার কত বড় সাহস আমাকে বলে গার্লফ্রেন্ড।”
আরমান অসহায় গলায় বলল,
“তো কি বলতাম? যদি বলতাম আপনাকে ভালোবাসি তাও তো আপনার সমস্যা হতো।”
আরজু কিছু সময়ের জন্য থেমে গেল। ভাবলো সত্যি আরমান এই কথাটা বললেও রেগে যেত। তাহলে এখন যখন কিছু বলেই পরিচয় দেয়নি তখন রেগে যাচ্ছে কেন?
আচ্ছা আরজু কি অযৌক্তিক কথাবার্তা বলছে? আরমানকে তো পছন্দ করে না তবে আরমানের ওকে পরিচয় দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টা এত প্রভাব ফেলছে কেন? আচ্ছা আরজু কি নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে? যা করতে চাইছে না তাই কি হচ্ছে আরজুর সাথে?
আরমান যেন খুব সহজে আরজুর মনের কথাগুলো পড়ে নিতে পারলো। হঠাৎ করে খেয়াল করল মেয়েটা ঘামছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে আরজুর কপালের ঘাম টুকু মুছে দিতে দিতে চিন্তিত গলায় বলল,
“আমার পা'গ'লিটাকে নিয়ে যে কি করি! এত রেগে যান কেন আরু?”
আরজুর কন্ঠটা একটু নরম হলো। তবে এখনো গম্ভীর ভাবটা পুরোপুরি যায়নি।
“অকারণে আমি রেগে যাই না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে ভুল হয়ে গেছে আমার। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না কি করলে আপনি রেগে যাবেন। আমি চাইনি আপনাকে রাগাতে। এরপর থেকে যেই জিজ্ঞেস করুক না কেন আপনার পরিচয় আমি সরাসরি বলে দেব যে আপনি আমার ভবিষ্যত বউ।”
আরজু তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
"বউ! এই শব্দটা আপনার মুখ অব্দিই থাকবে সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। আবার ভাববেন না আপনার বউ হওয়ার আমার খুব শখ। আমি শুধু আপনাকে বোঝাতে চাইলাম আপনার দৌড় কতদূর।”
আরমান আলতাে হেসে বলল,
“আমার দৌড় কতদূর আপনি সেটা জানেন না আরু। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, দৌড়ে যত দূরেই যাই না কেন আপনাকে নিয়েই যাব।”
_________
“অযথা মা'রছো কেন ওকে? মা'রতে তো মানা করছি না তবে দোষ করলে তবে মা'রো। অকারণে সবসময় মা'রার কি দরকার?”
ফাহিম দাঁত কিড়মিড়িয়ে ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার যখন মন চাইবে আমি তখনই ওকে মা'রবো। তুই হাত ছাড়।”
“আমার জেদ তুলো না। আমি যখন বলেছি তুমি ওকে এখন মা'রবে না তারমানে মা'রবে না। ছাড়ো।”
ফাহিম আবারও কটমট করে বলল,
“আমার কিন্তু র'ক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে ফিরোজ। হাত ছাড়।”
ফিরোজ ছাড়লো না ফাহিমের হাত। বরং আরো শক্ত করে ধরলো। প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি করেছিস প্রার্থনা যে মা'রছে তোকে?”
প্রার্থনা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“আসলে আমার শরীরটা ভালো ছিল না সেজন্য রান্না করতে দেরি হয়ে গেছে। আমি জানতাম না যে উনি এত তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবেন।”
“এটাই তোর অপরাধ?”
“হ্যাঁ।”
“ঠিক আছে তুই ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নে।”
ফিরোজ বলল তবে প্রার্থনা সাহস করে ঘরের দিকে পা বাড়াতে পারলো না। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো ফিরোজের দিকে। তা দেখে ফিরোজ ঝাড়ি মেরে বলল,
“যেতে বললাম না আমি তোকে? আবার ওর দিকে তাকাচ্ছিস কেন? শোন প্রার্থনা এটা ফিরোজের রাজ্য। এখানে আমার রাজত্ব চলে। এসব মন্ত্রী, সেনাপতির কথা এখানে চলবে না। যা ঘরে যা। “
প্রার্থনা এবারে আর দাঁড়ালো না। সেখান থেকে চলে গেল।
প্রার্থনা চলে যেতেই ফাহিম এক ঝটকায় ফিরোজের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ক্রোধে হিশহিশ করতে করতে বলল,
“আজ কিন্তু তুই বাড়াবাড়ি করলি ফিরোজ। তুই আমাকে ওর সামনে ছোট করলি।”
ফিরোজ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“নিজের বউয়ের সাথে হার জিতের খেলা বাদ দাও। মেয়েটা তো ভালোই। বিয়ে যখন করেছো চুপচাপ সংসার করো না। এত অশান্তি কিসের? এই বয়সে তো আর বিয়েও করতে পারবে না। এবারে ফিরোজ আর তোমাকে কোন মেয়েও এনে দেবে না।”
ফাহিম সন্দেহী দৃষ্টিতে ফিরেজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হঠাৎ করে তোর কি হলো বল তো? কাল রাত অব্দি তো ওর গায়ে হাত তুললে তোর গায়ে ফোস্কা পড়তো না। তবে আজ হঠাৎ করে কি হলো? নজর পড়লো নাকি আবার ওর উপরে?”
ফিরোজ তেড়ে গিয়ে দুহাতে ফাহিমের শার্টের কলার ধরে দাঁত পিষে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি। শোন, এই ফিরোজেরও একটা মন আছে, যেই মনে কারো জন্য ভালোবাসাও আছে। এই মনটা এখনো তোর মতন পুরোটা পশুতে পরিণত হয়নি, বুঝতে পেরেছিস?”
ফাহিম ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,
“তবে পুরোটা পশুতে পরিণত কর নয়তো তোরই সমস্যা হবে। আজ তোর মাঝে আমি আবির কে দেখতে পেলাম ফিরোজ।”
ফিরোজ চমকে ফাহিমের দিকে তাকালো। ফিরোজ কে চমকাতে দেখে ফাহিম আবারও বলল,
“আবিরের কি পরিণতি হয়েছিল মনে আছে তো? আবিরের শোচনীয় অবস্থার কথা মনে আছে তো?”
ছেড়ে দিলে ফিরোজ ফাহিমকে। ফাহিম ছিটকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরোজ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভুলে যাস না ফিরোজ তোকে কোথায় থেকে তুলে এনে আমি কোথায় বসিয়েছি। তুই আমার র'ক্ত না তারপরও তোকে ভাই বানিয়েছি। আজ যেই রাজত্বের বড়াই তুই করিস সেই রাজ্যের রাজা তোকে আমি বানিয়েছি। এই ফাহিম বানিয়েছে তোকে। তাই বলছি আবিরের পরিণতির কথা যদি তোর মনে থেকে থাকে তবে নিজের মনটাকে পুরোপুরি পশুর মনে পরিনত কর। নয়তো আবিরের মতনই দুমুঠো ভাতের জন্য লোকের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে, নিজের প্রতিশোধ পূরণের জন্য আইনের দরজায় ঘুরতে হবে যেখানে তুই জানিস আইন কিছুই করবে না তোর জন্য।”
কথাগুলো বলে ফাহিম চলে গেল। ফিরোজ অস্থির হয়ে পড়ল। অনেকগুলো বছর পর আবারও আজ আবির নামটা ফাহিম ফিরোজকে মনে করিয়ে দিল। কেন মনে করিয়ে দিল? না করলে কি হতো না?
“আজ যদি তুমি সেই আবিরই হতে তবে হয়তো অনেক কিছু বদলাতে পারতো ফিরোজ ভাই। যে আরজুকে পাওয়ার জন্য এত কিছু করছো যদি তুমি সেই আবির হতে পারতে তবে আরজু হয়ত নিজ থেকেই তোমার কাছে ধরা দিত।”
কন্ঠটা প্রার্থনার ছিল সেটা ফিরোজের চিনতে ভুল হলো না। প্রার্থনার কথাটা শুনে মুহূর্তের মাঝে ফিরোজের সব অস্থিরতা কেটে গেল। স্রোতবিহীন নদীর মতন শান্ত হয়ে উঠলো। মাঝ রাতে ব্যস্ত শহর যেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায় ঠিক তেমন নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। তবে বুকের ভেতরে যেন একটা তোলপাড় বয়ে গেল। ঠিক সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতন।
আ'গুনে পু'ড়ে যাওয়ার পর ক্ষতস্থানটা যেমন জ্বা'লা করে তেমনই জ্বা'লা করছে হৃদয়টা। কি বীভৎস্য একটা অনুভূতি হচ্ছে এখন ফিরোজের। তবে আফসোস কেউ নেই ফিরোজের জীবনে ওর ব্যথা গুলো দেখার মতন।
পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল প্রার্থনা দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত কণ্ঠে বলল,
“ওহ্ তুই। এখনো যাসনি ঘরে?”
“কেন তুমি সেই আবির হয়ে থাকতে পারলে না? খুব কি দরকার ছিল অমানুষ হবার? যাকে খোঁজার জন্য তোমার মাঝে এত পরিবর্তন আনলে, যাকে খোঁজার জন্য এই ক্ষমতার লোভে তুমি নিজেকে অমানুষ বানালে তাকে খুঁজে যদি পাও তবে সেদিন কি উত্তর দেবে তাকে ভেবেছো?”
এবারও ফিরোজ কোন উত্তর দিতে পারল না। ফিরোজ জানে না ও কি বলবে। কি জবাব দেবে তাকে, কি বলে সান্ত্বনা দেবে যে ফিরোজ কেন এ পথে এসেছে। আদৌ কি কোন বাধ্যবাধকতা ছিল নাকি ফিরোজ স্বেচ্ছায় এই পথ বেছে নিয়েছে?
এই সমাজে সবার কাছে লাথি ঝাটা খেতে খেতে কি ক্ষমতার লোভে পড়ে ফিরোজ এই রাস্তায় আসেনি? কেউ তো জোর করেনি ফিরোজকে কখনো এই পথে আসার জন্য তবে কেন এসেছিলো? নিজের ইচ্ছেয়।
“ঘরে যা তুই।”
প্রার্থনা ঘরে গেল না। কেন যেন আজ ফিরোজকে কয়েকটা কথা বলতে ইচ্ছে করলো। খেয়াল করল গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে সেটুকু মুছে নিয়ে বলল,
“জানো ফিরোজ ভাই আমার এখনো মনে পড়ে ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা যখন তোমায় ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাকতাম। জানো আমার এখনো মনে পড়ে যখন তুমি আমার আর আরজুর জন্য এক টাকার চকলেট গুলো এনে দিতে। আবার আমার সেই দিনগুলোর কথাও মনে পড়ে যখন দেখলাম ধীরে ধীরে তুমি বদলে যাচ্ছিলে।”
ফিরোজ এবারে রাশভারী কন্ঠে বলল,
“ঘরে যেতে বলেছি তোকে প্রার্থনা।”
“বুক কাঁপছে তাই না? আজ যদি তুমি নিজেকে না বদলাতে তবে কতই না ভালো হতো। ফারিহার চোখে চোখ রেখে তুমি ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতে। ওকে কেউ আজেবাজে কোন কথা শোনাতে পারতো না। তুমি ঠিক থাকলে হয়তো আমার জীবনটা নষ্ট হতো না, ভাইয়া ঠিক থাকতো। আর সব থেকে বড় কথা কি জানো? তুমি ঠিক থাকলে হয়তো তুমি আজ আরজুকে পেয়ে যেতে।”
ফিরোজ এবারে আর সহ্য করতে পারল না। হুংকার ছেড়ে প্রার্থনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ঘরে যা প্রার্থনা।”
প্রার্থনা কেঁপে উঠলো। আর কিছু বলতে পারলো না ফিরোজকে। চলে গেল ঘরে।
ফিরোজ সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। পা'গল পা'গল লাগছে নিজেকে। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করল খুব কি দরকার ছিল এই পথটা বেছে নেওয়ার?
অনেকক্ষণ ভাবল। ভাবার পর মনে হলো দরকার ছিল কি ছিল না সেসব ফিরোজ জানেনা। তবে হ্যাঁ আজ এই ক্ষমতার জন্য বেঁচে থাকতে পারছে। এই ক্ষমতার জন্যই হারিয়ে যাওয়া কোন প্রিয় মানুষের খোঁজ করতে পারছে। তাহলে এই পথে আশাই ঠিক আছে।
__________
ঘড়ির কাটায় সময় তখন রাত তিনটে। মাঝরাতই বলা চলে। নিশ্চিন্ত মনে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে আরমান। জানালাটা খোলা রেখেছে। শীতের দিন হওয়ায় হিমেল হাওয়া প্রবেশ করছে সেখান দিয়ে। আরমান কম্বলের নিচে গুটিশুটি হয় শুয়ে আছে। পুরো ঘর অন্ধকার, কোথাও কোন শব্দ হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ শব্দ করে বেজে উঠলো আরমানের ফোনটা।
এমন শান্তির ঘুম ভাঙার জন্য আরমান প্রচন্ড বিরক্ত হলো। একবার ভাবলো এত তাড়াতাড়ি সকাল হয়ে গেল কি করে? কম্বলের ভেতর থেকে মাথা বের করে দেখলো ঘরটা এখনো অন্ধকার, বাইরেও অন্ধকার। তার মানে এখনো সকাল হয়নি। তবে এই মাঝরাতে ফোন করছে কে?
ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল অপরিচিত একটা নাম্বার। আরমান একবার ভাবলো রিসিভ করবে না, নিশ্চয়ই এই মাঝ রাতে বিরক্ত করার জন্য কেউ ফোন করেছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হলো পরিচিত কেউও তো হতে পারে। মুনতাসির এখনো হাসপাতালে আছে, ওদিকে তানভীরও হাসপাতালে আছে ওদের আবার কিছু হলো না তো।
কোনরকম সময় ব্যয় না করে আরমান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে সালাম দিল। অপর পাশ থেকে কারো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো না। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ফোনটা কে'টে গেল।
আরমান অবাক হলো। যদি ফোন কা'টারই ছিল তবে দিল কেন এই মাঝ রাতে? মানে আরমানের ঘুমটা ভাঙানোই কি এর উদ্দেশ্য ছিল?"
বিরক্তিতে আরমানের সর্বাঙ্গ ছেয়ে গেল। কোত্থেকে আসে এসব জনগণ? মানে এদের কি সত্যি কোন কাজ নেই যে রাত তিনটের সময় একটা মানুষকে ফোন করে বিরক্ত করছে?
ফোনটা আবার পূর্বের জায়গায় রেখে দিয়ে আরমান ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আবারও ফোনটা বেজে উঠলো।
আরমান ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো সেই একই নাম্বার থেকেই কল এসেছে। আরমান এবার মনে মনে প্রস্তুতি নিল যে যদি এবারেও কথা না বলেছে তবে নির্ঘাত আরমান গালি দিয়ে দেব কয়েকটা। তাও এমন এমন গালি দেবে যেটা ফোনের অপর পাশে থাকা মানুষ জীবনেও শোনেনি।
নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী আরমান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কে বলছেন?”
অপর পাশে থাকা মানুষটা কিছু একটা বলে উঠতে ধরেও যেন আবার থেমে গেল। হালকা একটা আওয়াজ এলো আরমানের কানে। বুঝল যে সে কিছু বলতে নিয়ে থেমে গেল। কন্ঠটা মেয়েলি মনে হলো আরমানের কাছে এবং একটু পরিচিতও যেন লাগলো।
আরমাম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই বলে উঠলো,
“আরু?”
আরজু চমকে উঠলো। ও তো এখনো কথা বলেনি তবে কি করে আরমান চিনলো? ওর নাম্বারও তো আরমানের কাছে থাকার কথা না।
এবারেও অপর পাশ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আরমান অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেল যে আরজুই ফোন করেছে। কেন ফোন করেছে, কোত্থেকে ওর নাম্বার পেল সে সব প্রশ্ন আপাতত আরমানের মনে আসলো না। সব থেকে বড় কথা আরজুই কিনা সেই বিষয়ে একশ শতাংশ নিশ্চিত হতে হবে। আরমান আবারো বলে উঠলো,
“আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার আরু তাই না? কথা বলুন আরু। আমি একদম বিরক্ত হইনি এত রাতে আপনি কল করায়। আমি জেগেই ছিলাম।”
আরমানের কথাতে আরজু এবার একটু আশ্বস্ত হলো। ধীর গলায় বলে উঠলো,
“আমি আরজু।”
এতক্ষণে আরমান নিশ্চিত হলো। তবে এবারে বিস্ময় কাজ করল। প্রথমত আরজু ওর নাম্বার পেল কোথা থেকে? তার ওপর আবার এত রাতে কল করছে কেন? হ্যাঁ এটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে এত রাতে কেন কল করেছে? কোন সমস্যায় পড়েছে কি? চিন্তিত গলায় বলল,
“কোন সমস্যা হয়েছে কি আরু? এত রাতে ফোন করেছেন যে?”
আরজু ইতস্তত গলায় বলল,
“আমি আপনাকে বিরক্ত করেছি তাই না? আমি জানি বিরক্ত করেছি।”
“একদমই না। আমি বললাম না আমি ঘুমোইনি। আমি জেগে ছিলাম।”
“এত রাতে কে জেগে থাকে?”
“আমি ব্যবসার কিছু কাজ করছিলাম। আপনিও তো জেগে আছেন।”
“আমি ঘুমোচ্ছিলাম কিন্তু জেগে গেছি। আপনার নাম্বার কিভাবে পেলাম জানতে চাইবেন না?”
আরমান আলতো হেসে বলল,
“না সেসব জানার আমার কোন প্রয়োজন নেই। আপনি যে আমাকে কল করেছেন এটাই আমার জন্য বড় ব্যাপার। যদি আপনি নিজে থেকে বলতে চান তবে বলতে পারেন আর না বলতে চাইলে কোন দরকার নেই বলার।”
আরজু চুপ করে গেল। আরমানও চুপ করে গেল। আরমান তো বুঝতে পারছে যে আরজু কিছু একটা বলার জন্যই ওকে এত রাতে কল করেছে। বরাবরের মতন আজও আরমান আরজু কে সময় দিল নিজের কথাগুলো গোছানোর জন্য। কিছু সময় পর আরজু নিজ থেকেই বলে উঠলো,
“মুনতাসির ভাইয়ার থেকে আপনার নাম্বারটা নিয়েছিলাম। জানিনা কেন নিয়েছিলাম। আপনার থেকে চাইতে মন চায়নি তাই ওনার থেকে নিয়েছিলাম। আমি না একটা স্বপ্ন দেখেছি। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম স্বপ্নটা দেখে। আপনি আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দেন তাই ভাবলাম স্বপ্নটা নিয়ে আপনাকেই বলি। আপনি হয়তো আমাকে বলতে পারবেন আমার এমন স্বপ্ন দেখার মানে।”
আরমান সন্তুষ্ট হলো। আরজু ওকে এতটা জায়গা দিয়েছে নিজের মনের মাঝে! এতটা ভরসা যোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছে আরমান আরজুর জন্য!
“আচ্ছা দেখি বলুন তো আরু কি এমন স্বপ্ন যা আমার আরু কে ভয় পাইয়ে দিলো? আজ এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা তো আমি করেই ছাড়বো। এই স্বপ্ন আমার পা'গ'লিকে এই ঠান্ডার দিনে জাগিয়ে রেখেছে, শাস্তি তো ওকে পেতেই হবে।”
“আরমান!”
ভীষণ অদ্ভুত একটা কন্ঠে আরজু হঠাৎ করে ডেকে উঠলো। কেমন একটা অসহায়ত্ব যেন ছিল আরজুর সেই কন্ঠের মাঝে। আরমান তৎক্ষণাত জবাবে বলল,
“হ্যাঁ আরু বলুন।”
“আমি না স্বপ্নে একজনকে খু'ন করেছি। খুব বিভৎসভাবে খু'ন করেছি। জানেন আমার সারা শরীর র'ক্তে ভিজে গিয়েছিল। মানুষটা মা'রা যাওয়ার পরও আমি অনেকক্ষণ ছু'রি দিয়ে ওনাকে আঘাত করছিলাম। ওনার শরীরের র'ক্ত আমার চোখে মুখে ছিটকে এসে পড়ছিল তবুও আমি নিজেকে থামাতে পারছিলাম না। আমার একটা পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিল ওনাকে মা'রতে পেরে।”
আরমান থমকে গেল আরজুর স্বপ্নটা শুনে। কি ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখেছে আরজু। আজ আরমান আরো একবার নিশ্চিত হলো যে ওর আরু সত্যিই সবার থেকে আলাদা। কোন ছেলে কোন মেয়ের পেছনে ঘুরলে সেই মেয়ে নিশ্চয়ই দিনরাত তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে সেসব বিষয়েই স্বপ্ন দেখতো। আর এখানে আরমানের আরু স্বপ্ন দেখছে কাউকে খু'ন করার। আরমানের তো একবার মনে হলো সেই ব্যক্তিটা আবার আরমান ছিল না তো যাকে আরজু খু'ন করছিল?
নিজের ভাবনার উপরে নিজেরই হাসি পেল আরমানের। তেমনটা হলে কি আর আরজু ওকেই কল করতো নাকি।
আরমানকে চুপ করে যেতে দেখে আরজু পুনরায় বলে উঠল,
“জানেন আমি ওনাকে কেন মে'রে'ছি'লা'ম?”
“কেন?”
“উনি, উনি আমার আপার সাথে অসভ্যতামো করছিলেন। আমি আমার আপাকে খুব ভালোবাসি। আর ওই লোকটা আমার আপাকে খুব বাজে ভাবে ছুঁয়ে ছিল। আমার আপা খুব কাঁদছিল। জানেন, আমার আপা খুব সহজ সরল। ও না নিজেকে বাঁচাতে পারে না এদের হাত থেকে। আমি আমার রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ওকে মে'রে ফেলেছি। আচ্ছা আমি কি অন্যায় করেছি কোন?”
আরমান সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“মোটেই কোনো অন্যায় করেননি। ওই লোকটা খারাপ ছিল তাই ওকে মে'রে'ছেন। আর এটা তো স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নের মধ্যে খু'ন করা কোন অন্যায় না।”
“এটা স্বপ্ন ছিল না আরমান। এটা সত্যি।”
আরমান কপাল কুঁচকে বলল,
“মানে? এটা সত্যি হবে কেন?”
আরজু হুঁশে ফিরে এলো। নিজের বলা পূর্বের কথাটা মিথ্যে প্রমাণ করার জন্য বলল,
“না ভুল বলেছিলাম। এটা স্বপ্ন ছিল, সত্যি না। এই পুরোটাই স্বপ্ন ছিল।”
আরমান একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে হেসে উঠে বলল,
“তাই বলুন। কয়েক মুহূর্তের জন্য তো আমি আপনার কথা শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আরু। ভেবেছিলাম আমার পা'গলি'টা আবার সত্যি খু'ন করলো নাকি।”
“না এটা স্বপ্ন ছিল।”
“হ্যাঁ এটা স্বপ্ন ছিল। এখন এইসব চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমোন। এত রাত অব্দি জাগা ঠিক না শরীরের জন্য। আমি কাল ভার্সিটিতে আপনার সাথে দেখা করব কেমন? তখন না হয় আরো যত প্রশ্ন আছে সবের উত্তর দেব। এখন গিয়ে ঘুমোন।”
“আর একটা প্রশ্ন করি?”
আরমান সম্মতি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা করুন।”
আরজু জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“যদি আপনি কখনো জানতে পারেন আমি খু'নি তবে কি করবেন? বাকিদের মতন আপনিও নিশ্চয় আমায় ঘৃণা করবেন তাই না? এখন যেমন আপনি বলেন আমায় ভালোবাসেন তখন আর ভালোবাসবেন না তাইতো? নিশ্চয়ই আমাকে আর আরু বলেও ডাকবেন না?”
কেমন কেমন যেন প্রশ্ন করে মেয়েটা। কোথ থেকে পায় এসব প্রশ্ন যে প্রশ্নগুলো শীতের দিনেও আরমানের ঘাম ঝরিয়ে দেয়? আরমান জানতে পারবে কেন যে আরজু খু'ন করেছে? তবে কি আরজু সত্যিই কোন খু'ন করেছে?
“আপনি কি কোন খু'ন করেছেন আরু?”
“হ্যাঁ। এই যে স্বপ্নে করলাম।”
আরমান কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
“ওটা তো স্বপ্ন ছিল। থাক আপনি এখন এসব কথা বাদ দিন তো। সাধে কি আর পা'গ'লি বলি। আর শুনুন, আমার পা'গ'লি কে আমি সবসময়ই ভালোবাসবো। আমার পা'গ'লির গুন গুলোকে যেমন ভালোবাসবো তেমনি আমার পা'গলির যদি কোন দোষ থাকে সেগুলোকে শুধরে দিয়েও ভালোবাসবো। তবুও ভালোবাসবো।”
আরজু সন্দেহী গলায় বলল,
“তাই?”
“হ্যাঁ। বলেছিলাম না আরু আপনাকে শুধু ভালোইবাসা যায়। এখন ফোনটা রাখুন আরু। না হলে কিন্তু আমার এখন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করবে। আর আমি সেই পা'গল প্রেমিকদের মত ছুটে আপনার হোস্টেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো আপনাকে এক নজর দেখার জন্য।”
“তো আসুন।”
আরমান এবারে শোয়া থেকে উঠে বসে বিস্মিত গলায় বলল,
“সত্যি আসবো?”
আরজু সন্দেহী গলায় বলল,
“আমি বললে আপনি আসবেন?”
“একবার বলেই তো দেখুন।”
আরজু একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“না থাক লাগবে না, ঘুমোন।”
আরমান একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল
“আচ্ছা ঠিক আছে ঘুমোন। আর একটা কথা, ভালোবাসি আপনাকে আমার পা'গ'লি আরু।”